আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ল্যাপটপ স্ক্রিনে দু জোড়া নিরলস দৃষ্টি মিনিটখানিক ধরেই আটকে আছে। একটা সময় মাভিশা প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে নজর ফেরালেও ইয়াসিফের ধারাল চাহনি চুম্বকের মতো এঁটেই রইল। খেয়াল করল মাভিশা, রুক্ষভাষী সুন্দর পুরুষটার নমনীয় চোয়ালও ধারাল কঠিন হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। ওর কাঁধের ওপর হাত রেখে মাভিশা ফিসফিসিয়ে বলল, ‘কাম ডাউন, ইয়াসিফ। উত্তেজিত হয়ো না প্লিজ।’
এবার ইয়াসিফও লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি ফেরাল মাভিশার পানে। মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, মাভিশা৷ তুমি আমাকে প্রত্যাশা থেকেও অনেক বেশি হেল্প করেছ। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’
-‘থ্যাঙ্কস বলার প্রয়োজন নেই, ইয়াসিফ।’ বলেই মাভিশা আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘কারণ, আমি তোমার স্বার্থে হেল্প করিনি। করেছি ওর জন্যই। ওর এমন পেইনফুল, হোমলেস, লোনলি লিভিং লাইফ আমাকে, আমার মম-ড্যাডকে আর সব থেকে বেশি আঙ্কেল এডওয়ার্ডকে কষ্ট দিচ্ছে৷ আমরা ওকে ফেরাতি পারছি না, বোঝাতে পারছি না কিচ্ছু। জানি, ওর জীবনের বিষাদময় গল্পটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। কিন্তু তাই বলে কোনো লক্ষ্য ছাড়া, কোনো গন্তব্য ছাড়া ও এভাবে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে! আমি বলা যায় বাধ্য হয়েই তোমার শরণাপন্ন হয়েছি।’
বিনা উত্তরে সোফা ছেড়ে উঠে ইয়াসিফ ফাঁকা কফির মগ দুটো নিয়ে রান্নাঘরে এলো। জিজ্ঞেস করল মাভিশাকে, ‘আরেক মগ প্রয়োজন তোমার?’
-‘নাহ।’
-‘আই নিড আ হার্ড ড্রিঙ্ক। ডু ইউ নিড?’
-‘তুমি নাও। আমার দরকার নেই।’
মুখটা জলদগম্ভীর ইয়াসিফের৷ সেখানে মারিহামের জন্য এক ফোঁটাও আবেগের দেখা পেলো না মাভিশা৷ সে বুঝতে পারছে না, মারিহামের হদিস জানিয়ে কি ভুল করল? মারিহামের প্রতি ইয়াসিফের রাগ থাকা অবশ্যই স্বাভাবিক৷ তা জানে মাভিশা। কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল, যতই রাগ পুষে রাখুক ইয়াসিফ– মারিহামের সঠিক পরিচয় উদ্ঘাটন হওয়ার পর কোনো ক্ষতি সে করবে না মারিহামের। কিন্তু এখন যে ওর অভিব্যক্তি দেখে দ্বিধাদ্বন্দ সৃষ্টি হচ্ছে তার মনে।
ভাবনাচিন্তার মাঝে হঠাৎ কাচের টি-টেবিলে আওয়াজ হতেই চমকে উঠল মাভিশা। মদের বোতল আর গ্লাসটা টি-টেবিলে রেখে আবারও রান্নাঘরে গেছে ইয়াসিফ। কাচের বাটি ভর্তি কিছু স্ন্যাকস নিয়ে ফিরে এলো সে। বাটিটা দেখে মাভিশা বলল, ‘ড্রিঙ্কসের সঙ্গে স্ন্যাকস খেলে হজমশক্তি খারাপ হতে পারে আর পেটের অনেক সমস্যাও বাড়তে পারে৷’
-‘তাহলে ওটা তোমার জন্য।’ বলেই ইয়াসিফ গ্লাস ভর্তি মদ ঢেলে সোফায় গা হেলিয়ে বসল, ‘তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও, মাভিশা৷ জেট ল্যাগ কাটেনি নিশ্চয়ই?’
-‘না, ঠিকই বলেছ। টায়ার্ড লাগছে খুব।’
-‘তাহলে তুমি রেস্ট করো৷ আমি ততক্ষণ আমার কেস স্টাডি করি৷’
জবাবে সৌজন্য হাসি ফিরিয়ে দিয়ে মাভিশা ইয়াসিফের বেডরুমের পাশের রুমটিতে চলে গেল। ওরা এখন চট্টগ্রাম সেই হোটেলের সেই একই সুইটে। চার বছর আগে এই সুইটেই ওরা তিনজন এক সঙ্গে কতগুলো সময় কাটিয়েছিল! তারপর মাভিশা বিদায় নিলেও ইয়াসিফ আর মারিহাম টানা তিনটি মাস এখানেই এক সঙ্গে থেকেছে। আজ আবারও ইয়াসিফের এখানে আসা কেবল মাভিশার জন্যই। গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই মাভিশা ওকে কল করে এবং জানায়, সে বাংলাদেশ আসছে। দেখা করবে সে ওর সঙ্গে আর কিছুদিন থাকবেও ওর সঙ্গেই। তাই বাধ্য হয়েই চার বছর পর অতি অপছন্দের এই সুইটেই ওঠা ওকে নিয়ে৷ এই চার বছরে বহুবার সে মাভিশার থেকে মারিহামের হদিস পেতে চেয়েছে। কিন্তু মাভিশা আজকের পূর্বে ওকে একবারও সহায়তা করেনি৷
গ্লাসের সুরাটুকু এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। এক ফোঁটা পানিও মেশায়নি তাতে। গলা, বুক জ্বলে ছাড়খাড় হয়ে যেতে চাইছে যেন। বোতলটা নিয়ে ড্রয়িংরুম থেকে নিজের ঘরে এসে দরজাটা আটকে দিলো৷ বিছানায় বসে ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে মারিহামের বর্তমান ছবিগুলোই আবারও দেখতে থাকল নির্নিমেষ। ছবিগুলো তোলা ইস্তানবুল শহরের প্রাণকেন্দ্র গ্র্যান্ড বাজার থেকে। একদম বাঙালি বেশে সেখানে ঘুরছে মারিহাম। মাভিশার থেকেই পাওয়া এই ছবিগুলো৷ চার বছরের ব্যবধানে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে মারিহামের মাঝে৷ ঘাড় অবধি ছোটো থাকা সেই চুলগুলো পিঠের মাঝ অবধি নেমেছে তার। আর চোখে কালো চিকন ফ্রেমের চশমা। কিন্তু ওয়েস্টার্ন পরিচ্ছদের বদলে তার পরনে যে ইয়াসিফ কখনো শালীন বেশে সেলোয়ার-কামিজ দেখবে, তা বোধ হয় অকল্পনীয়ই ছিল ওর কাছে। কিন্তু ও বুঝে গেছে, এই বেশটা কেবলই মারিহামের ছদ্মবেশ। এই মুহূর্তে যে ছবিটা দেখছে ইয়াসিফ, সেখানে মারিহাম একটা দোকানে দাঁড়িয়ে বই পড়ছে। যতবারই সে দেখছে তাকে, ততবারই ওর মানসপটে ভেসে উঠছে ফ্লোরেন্স বেশে প্রথমবার দেখা মারিহামকে আর ওর সঙ্গে কাটানো শেষ রাতটার মুহূর্ত। এতগুলো দিন ধরে দমিয়ে রাখা ওর বুকের মাঝের দহন এই মুহূর্তে স্ফুলিঙ্গ হয়ে ছুটে আসতে চাইছে বুক চিরে৷ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতেই মাভিশাকে ঘরে পাঠিয়ে দিতে হলো তখন।
বোতলে এক চুমুক দিয়েই ইয়াসিফ চোখজোড়া বুজল। অতীতের দিনগুলোকে স্মরণ হতে থাকল আজ বহুদিন বাদে।
আলিয়া মেহজাবিনই যে এলিন, তা বিশ্বাস করার পরই ইয়াসিফ নিজ তাগিদেই তাকে খুঁজে বের করার মিশনে নেমে পড়েছিল। তখন মারিহামের থাকার বন্দোবস্ত চট্টগ্রামের ওই হোটেলেই করেছিল সে। রাত হোক আর দিন, কোনো ক্লু পেলেই সে মারিহামকে সঙ্গে করেই বেরিয়ে পড়ত আলিয়ার খোঁজে। ওর তদন্ত অনুযায়ী আলিয়ার শেষ গন্তব্য গাজীপুরই ছিল৷ তাই মাহতাব শেখ আর তার দুই ছেলের সকলরকম কর্মস্থান আর তাদের বিশ্বস্ত সকল কর্মীদের সন্দেহের তালিকায় ফেলে ইয়াসিফ একটা একটা করে সব জায়গাতে খুঁজতে আরম্ভ করে আলিয়াকে। এরকমই একদিন মারিহামকে নিয়ে ইয়াসিফ কাপাসিয়া উপজেলার এক গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হয়। জাহিদ শেখের একজন ব্যক্তিগত সহকারীর নিবাস সেখানে৷ বলা ভালো, লোকটি ওর বাবার ডান হাতও ছিল। কিন্তু গত দুই মাস যাবৎ তাকে চাকরি থেকে বহিস্কার করেন জাহিদ সাহেব৷ তদন্ত করার পর ইয়াসিফ আশি শতাংশ নিশ্চিত হয়েছে, আলিয়ার গুম হওয়ার পেছনে ওর নিজের বাবারই হাত আছে৷ আর তাকে এ দায়িত্ব একমাত্র মাহতাব শেখ ছাড়া অন্য কেউ দিতেই পারে না৷ জাহিদ সাহেবের ওই বহিস্কৃত ডান হাতকে ধরতে পারলেই তার পেট থেকে সব খবর বের করা আহামরি কষ্টের না।
তাই তো ঘন বৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করেই সে চলে আসে লোকটির গ্রামে। কিন্তু লোকটিকে সে মুহূর্তে তার বাড়িতে গিয়ে খুঁজে পায় না ওরা। বাড়ির লোকেদের থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, তার ঢাকা থেকে ওই রাতেই বাড়ি ফেরার কথা৷ তাই ইয়াসিফ মারিহামকে নিয়ে বাজারের মধ্যে গাড়িতে বসেই অপেক্ষা করে৷ বাইরে তখন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। বাজারের সব দোকান-পাটই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, শুধু ভাতের হোটেলগুলে ছাড়া। রাত সাড়ে এগারোটার সময় মারিহাম হঠাৎ ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে৷ ঘুমকাতুরে ইয়াসিফ তখন সিট এলিয়ে দিয়ে ঘুমে কুপোকাত। তাকে বিরক্ত চোখে দেখে মারিহাম একাই গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে চলে আসে। একটা মাসে বাঙালি খাবার-দাবারে সে ভালোই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। দুই প্লেট খিচুড়ি প্যাকেট করে নিয়ে গাড়িতে ফিরতে ফিরতে ভিজে জবজবে হয়ে যায় তার শরীর৷ ছাতাটা নিয়ে যেতে একদম ভুলে গিয়েছিল সে।
ঠিক ওই সময়ে ক’জন বখাটে গোছের লোক মারিহামকে দূর থেকে দেখে এগিয়ে আসে গাড়ির কাছে৷ জানালার কালো কাচ ভেদ করে ভেতরটা দেখা সম্ভব হয় না তাদের। ধারণা করেছিল তারা, বড়োলোকের কোনো মেয়ে একাই গাড়িতে হবে হয়ত৷ সাথে বড়োজোর কোনো ড্রাইভার থাকতে পারে শুধু৷ তাই দুঃসাহস দেখিয়ে জানালায় অনবরত টোকা দিতে শুরু করলে মারিহাম ভ্রু কুটি করে চুপচাপ খেতে খেতেই বাইরের লোকগুলোকে লক্ষ করতে থাকে। ওদিকে শব্দে ইয়াসিফের ঘুম ভেঙে গেলে সে বিড়বিড়িয়ে মারিহামকে বিশ্রী এক খিস্তি দিয়ে চোখ মেলে তাকায়। ‘অসহ্য! এত শব্দ করো কেন?’ মারিহাম ইয়াসিফের প্রশ্নে বিরক্তি নিয়েই ফিরে তাকায়। কিন্তু নিরুত্তর থাকে সে৷ জানালার বাইরে লোকগুলোর ডাকাডাকি আর ধাক্কাধাক্কি বেড়ে গেছে ইতোমধ্যে। ঘুমের রেশ কাটে তখন ইয়াসিফের। চোখ ডলে নিয়ে জানালার দুই ধারে পাঁচ-ছয়জনকে কাচে গুতাগুতি করতে দেখে যা বোঝার বুঝে নেয়। ধমক সুরে মারিহামকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি বাইরে নেমেছিলে?’
মারিহাম তখনো জবাব দেয় না। নির্বিকার ঢঙে চুপচাপ খেতে থাকে কেবল। কারণ, ইয়াসিফের ঠিকঠাক হুঁশ থাকলে সে নিজেই দেখতে পাবে ব্যাপারটা। আর দেখেও তাই ইয়াসিফ৷ ওর নিজের কোলের ওপরও খিচুড়ির একটা প্যাকেট পড়ে আছে৷ যেটা এত সময়ে লক্ষ করেনি সে। কিন্তু খুশি হওয়ার বদলে ভয়ানক মেজাজ খারাপ নিয়ে মনে মনে আরও বিশ্রী কয়েক গালি দেয় মারিহামকে। ওর মেজাজের মতিগতি টের পেয়েও মারিহাম বলে, ‘আগে খেয়ে নাও। তারপর যা করার কোরো।’
-‘তুমি খাও’, চেঁচিয়ে বলে ওঠে ইয়াসিফ, ‘ঠেসে ঠেসে খাও।’
-‘প্রচণ্ড ওয়েলি আর মশলাযুক্ত। নয়ত দুটো প্যাকেটই খাওয়া যেত।’
তুঙ্গে ওঠা মেজাজ নিয়ে ইয়াসিফ একবার ভাবল, চুপচাপ গাড়ি টেনে চলে যাবে সামনে। কিন্তু গ্রাম থেকে তো বের হওয়া যাবে না আজ রাতে। বাবার ডান হাতটাকে আজই ধরতে হবে যে। আর গ্রাম থেকে বের না হলে এই বখাটেগুলোও আবার পেছন ছাড়বে না৷ এলাকার এই স্থায়ী মানুষগুলো বেশ সাহসী আর বিপজ্জনকও হয়ে থাকে। অতঃপর বাধ্য হয়ে ছাতা নিয়ে নেমে যায় সে বৃষ্টির মাঝে। মারিহামের খাওয়া শেষ। সে খাবারের এঁটো প্যাকেটটা জানালা খুলে বাইরে ফেলতেই আবার বখাটেগুলোর নজরে পড়ে। তাদের দেখে মএবার মুচকি হাসে সে। ইয়াসিফ তা দেখে একটা নোংরা বাংলা গালি ছুঁড়তে গিয়েও বহু কষ্টে সংযত করে নেয় আর লোকগুলোর সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে শুরু করে৷ তারা জিজ্ঞেস করছে ওদের দুজনের পরিচয়, কী সম্পর্ক, কোথার থেকে এসেছে, এখানে কেন গাড়িতে বসে আছে৷ তারা বেশ অনেকক্ষণ ধরেই নাকি ওদের গাড়িটাকে লক্ষ করছিল। ইয়াসিফ তাদের সেসব প্রশ্নের গোছানো উত্তর দিলেও তারা যে ধান্দা নিয়ে এসেছে, তা বুঝতে পেরে আর শান্ত থাকতে পারেনি সে। চাকরি জীবনে সে কত দুর্নীতিবাজ বড়ো বড়ো নেতাদের পকেট খসিয়েছে আর খসিয়ে যাচ্ছে, তা হিসেব ছাড়া। আর এই রাস্তার সামান্য বখাটেগুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য নাকি এখন ওকেই পঞ্চাশ হাজার গচ্ছা দিতে হবে! উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে মারিহামকে সে ইংরেজিতে বলে বসে, ‘টাকার বদলে সরাসরি তোমাকে চাইলে সিরিয়াসলি এক সেকেন্ডও দেরি করতাম না দিয়ে দিতে।’
মারিহাম তবুও শান্ত চোখে তাকিয়ে দরাজ কণ্ঠে বলে ওকে, ‘তুমি তাহলে সে প্রস্তাবই রাখো না! আমার আপত্তি নেই। টাকার অনেক দাম৷ যেটা বাংলাদেশে এসে তা খুব বেশিই বুঝতে পারছি আমি। ফিফটি থাউজ্যান্ড টাকা তো কম নয়।’
জবাবে এবার ইয়াসিফ ওর বিশ্রী একটা গালি জোরেই বলে ওঠে মারিহামের উদ্দেশ্যে৷ তার অর্থ মারিহাম না বুঝতে পারলেও সামনের বখাটেগুলো শুনে অবাকই হয়৷ অমন দুর্দান্ত সুন্দরীকে ইয়াসিফ নির্লজ্জ একটা গালি দিতে পারল কীভাবে? গালিটা শুনে মারিহাম নেমে আসে গাড়ি থেকে৷ পরনে ওর লাল রঙা ব্লাউজ আর কালো রঙা প্যান্ট ভেজা প্রায়। ইয়াসিফের ছাতার নিচে এসেই আচমকা সে ইয়াসিফের পকেট থেকে ওর ওয়ালেট বের করে নেয়। তারপর ওর আইডি কার্ডটাও টেনে বের করে লোকগুলোর চোখের সামনে ধরে ইয়াসিফকে বলে, ‘পাওয়ার হাইড রাখার জন্য নিশ্চয়ই চাকরি করছ না?’
কাজটা একেবারেই পছন্দ করল না ইয়াসিফ। নিজের পরিচয় গোপন সে তো আর এমনি এমনি রাখে না৷ এমনকি মারিহামের কাছেও ওর বিশেষ পরিচয় লুকোনো৷ এতটাই রেগে উঠল সে, কার্ডটা এক ঝটকায় মারিহামের হাত থেকে কেঁড়ে নিয়ে সামনের বখাটেগুলোর একজনের গালে আচমকা দানবীয় এক থাপ্পড় মেরে বসল। সেই সাথে অশ্রাব্য কিছু গালিও জুটল তাদের। মূলত মারিহামের ওপর হওয়া রাগটাই প্রকাশ করল সে। লোকগুলোও ওর পরিচয় কী তা বোঝার পর হাতজোড় করে, ওর পা ধরে মিনতি আরম্ভ করে। তাদের মাফ করার বদলে এলোপাথাড়ি কতগুলো কিল, থাপ্পড়, লাথি কষে তারপর ক্ষান্ত হয়। ব্যাপারটা হলো– ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর মতো হলো কাজটা। মারিহামের ওপর এমনিতেই তার আগের অপরাধের জন্য রাগ জমা হয়ে আছে৷ আর সে রাগ দমিয়ে রাখছে শুধু আলিয়ার হদিস না পাওয়া অবধি। কিন্তু মারিহামের আজকের দুঃসাহসিক কর্মটা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিলো ইয়াসিফের। বখাটেগুলোকে মাত্রাতিরিক্ত মারধোরের একটাই কারণ, যেন মারিহাম ওর রাগকে জানে এবং ভীতিবোধও করে।
বখাটেগুলোকে ছেড়ে দিয়ে ইয়াসিফ রাগের চোটে ছাতাটাও ছুঁড়ে ফেলে দিলো৷ বৃষ্টির ছাটে ভিজেই গেছে সে। তাই ছাতাটাকেও ওর রাগের শিকার হতে হলো আরকি। মারিহাম যারপরনাই বিরক্তি দেখিয়ে বলল, ‘আর কি কাজে লাগবে না ওটা? শুধু শুধু ফেলে দিলে।’
-‘তোমাকেও ওভাবেই ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারলে প্রচুর আরাম লাগত।’ দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলেই এগোলো গাড়ির দিকে।
-‘আমাকে তোলার সাধ্যি আছে তোমার?’ তিরস্কার সুরে বলতে দেরি শুধু মারিহামের, কিন্তু ফিরে এসে তাকে এক কাঁধে তুলে নিতে দেরি হলো না ইয়াসিফের। প্যাসেঞ্জার সিটে তাকে ঠাস করে বসিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল সে, ‘ওয়েট তোমার আসলেই বেশি। কিন্তু আমার থেকে বেশি নয়।’
মিটমিটিয়ে হাসল মারিহাম। ইয়াসিফ ভেবে পায় না, মেয়েটা কেন ওকে কোনোভাবেই ভয় পেতে চায় না? যা অন্যায় করেছে ওর সঙ্গে, তারপরও নির্ভয়ে ওর সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকতে বিন্দু পরিমাণ ভয় পায় না কখনো। কিন্তু কেন পায় না? হতাশ হয়ে গাড়িতে উঠল। এরপর অনেকটা সময় দুজন নীরব থাকল৷ এর মাঝে ওরা আবার ফিরে এলো সেই লোকটির বাড়িতে। রাত তখন বারোটা। মারিহাম বলল, ‘এত রাতে আবার খোঁজ জানতে গেলে তারা তো আমাদের সন্দেহ করবে আর তোমার ড্যাডের অ্যাসিসট্যান্টকেও তো এলার্ট করে দিতে পারে।’
-‘হুঁ, তাহলে সকালে যেতে হবে।’
-‘এখন কি ফিরে যাব? কোনো হোটেলে থাকি।’
-‘আবাসিক হোটেলে পোষাবে না তোমার।’
আসলেই যেখানে সেখানে থাকার মতো মানসিক প্রস্তুতি এখনো গড়ে ওঠেনি মারিহামের। তাই তো ইয়াসিফকে অপহরণ করে চড়া দামে বাংলো ভাড়া করে থাকতেও কোনো দ্বিধা করেনি৷ সেই ব্যাপারটা ইয়াসিফ ভালোভাবেই মাথায় রেখেছে।
-‘তাহলে এই গাড়িতেই রাতটা পার করে দিই। প্রবলেম নেই।’ বলল মারিহাম।
-‘প্রবলেম হলেও কিছু করার নেই। পেছন সিটে গিয়ে শুয়ে পড়তে পারো।’
-‘তুমি তাহলে অর্ধেক রাত ঘুমাও। আমি জেগে থাকি এখানে। তারপর তোমার ঘুম হলে আমি যাব পেছনে।’
-‘বাহ্! বিবেকও কাজ করে তোমার?’
খোঁচাটা গায়ে নিলো না মারিহাম। গাড়িটা কাঁচা রাস্তার এক পাশে আনল ইয়াসিফ। রাস্তার এক পাশে খোলা মাঠ আর অন্য পাশে শালবন। তবে লোকালয়ের ভেতরেই আছে ওরা। তাই ডাকাত পড়ার ভয় নেই অন্তত।
গায়ের ভেজা শার্টটা আর পরে থাকা সম্ভব হলো না ওর। ঠান্ডা লাগছে বেশ। ওকে শার্ট খুলে ফেলতে দেখে মারিহামেরও খেয়াল হলো, সে ওর চেয়েও বেশি ভেজা অবস্থায় আছে। তাই সেও খুলে নিলো পরনের ব্লাউজটা। বাইরে যাতায়াত কালে সে সব সময়ই স্পোর্টস ব্রা ব্যবহার করে বিধায় ভেজা জামাটা খুলে ফেলতে কোনোরকমই সঙ্কোচ করল না।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৮
ড্রাইভার সিটে ইয়াসিফ তখন সটান বসে ব্যাক মিররে স্থির চোখে তাকিয়ে। ভেতরের উপোসি সত্তাটা মারিহামের খামখেয়ালিপনায় নিদ্রা ভেঙে উঠতে চাইছে। ঠোঁট গোল করে লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ধীরস্বনে মারিহামকে বলল, ‘তুমি পেছনে চলে যাও। গিয়ে ঘুমাও।’
ব্লাজউটা দিয়ে মাথা মোছায় ব্যস্ত মারিহাম। ইয়াসিফের কথায় জবাব দিলো, ‘আমার ঘুম পেলে তোমাকে বলতে হত না। তাই তুমিই যাও।’
-‘ও.কে।’ কেমন দুর্বল শোনাল ইয়াসিফের কণ্ঠ। দরজাটা খুলতে উদ্যত হতেই মারিহাম আবার বলে উঠল, ‘ঘুম না এলে কিছুক্ষণ গল্প করি চলো। তোমার ফ্যামিলির ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ।’
-‘আচ্ছা।’
