আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬০
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘জানালার বাইরে থেকে হাত ভেতরে আন, জাদ।’ ম্যাকবুকে নজর বিদ্ধ থাকলেও জাকির সাহেব কাজের ফাঁকে ছেলের দিকে খেয়াল করতেও ভুলছেন না। দীধিতির ঢাকা ফেরার সংবাদটা নাওফিলের বুকের ভেতর উথাল-পাতাল ঢেউ তুলছে। তা যেন ওর শান্ত চোখে তারাতে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছেন তিনি৷ আর শুকনো মুখটা তাতে আরও বেশি কেমন মলিন লাগছে ছেলেটার৷ খারাপ লাগলেও বিশেষ কিছু করার নেই যে তার। ‘জাদ?’ ললিত গলায় ডেকে বললেন ওকে, ‘দুর্বল লাগলে সিটে মাথা এলিয়ে দে। চোখদুটো বুজে থাক।’
বাবার আদেশ মান্য করতে দেরি করল না নাওফিল৷ কিন্তু মাথাটা সিটের বদলে বাবার কাঁধেই এলিয়ে দিলো সে৷ জীবনে প্রথমবার নিজের ভঙ্গুর হৃদয়টা নিয়ে আশ্রয় নিলো আজ বাবার কাছে। সারাজীবন শক্ত থাকা জাকির সাহেবও আজ-কাল অল্পতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন ছেলের জন্য৷ সত্যি বলতে তিনি বুঝতে পারেনি, দীধিতির সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটার পর নাওফিলের মাঝে আমূল-পরিবর্তন ঘটবে৷ তাছাড়া, প্রথম তিনটা বছর নাওফিল বরাবরের মতোই চুপচাপ আর নিরুদ্বেগই ছিল৷ তারপরই হঠাৎ করে একদিন প্রলয় বয়ে আনল সে শেখ বাড়িতে। যেদিন মাহতাব শেখ কোম্পানিতে সকলের সামনে নিজের চেয়ারের পরবর্তী মালিক হিসেবে ঘোষণা করলেন ওকে, সেদিন থেকেই বাড়ির সকলের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা এক লহমায় বদলে গেল। বলা ভালো, বদলে ফেলল নাওফিল নিজেই। মাহতাব শেখ যে নাতিদের মাঝেও ভেদাভেদ করেন, তার প্রমাণও মিলল সেদিনই। জাকির সাহেব তাই কেবল ওইদিনটাতেই তার মুখোমুখি হয়েছিলেন আর পরামর্শস্বরূপ বলেছিলেন, ‘অন্তত এই তিন ভাইয়ের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করবেন না। আপনার আধিপত্য টিকে থাকবে ততদিন, যতদিন এই তিন ভাই একত্র থাকবে৷ আর এদের মাঝে যদি একবার দূরত্বটা তৈরি হয়, তাহলে অনর্থও ঘটতে পারে।’
সব সময় অবজ্ঞার সঙ্গে দেখে আসা ছেলেটির কথাগুলো মাহতাব শেখ সেদিনও অবজ্ঞায় করলেন। যা দেখে আর একটি বাক্যও ব্যয় করেননি জাকির সাহেব এতগুলো দিনেও৷ কেবল সুযোগ পেলে নাওফিলকে বোঝানোর চেষ্টাটা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু নাওফিল যে নিজের সিদ্ধান্তেই অটল৷ শেষ একটা বছর ধরে তাই জাকির সাহেব হারে হারে টের পাচ্ছেন– দীধিতির সঙ্গে বিচ্ছেদটাই মঙ্গল শুধু দীধিতির হলেও অমঙ্গলটুকু বরাদ্দ হলো একমাত্র তার ছেলেটার জন্য। তিনি নিজেও তো জীবনের প্রথম নারীর মায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি খুব সহজে। অথচ সে নারী ছিল দুশ্চরিত্রা আর প্রতারক। কিন্তু দীধিতি যে সরল, কোমল, সুন্দর। কীভাবেই বা তাকে ভুলবে নাওফিল? শুধু যদি সেদিন মাহতাব শেখে তৈরি করা ফাঁদে পা না দিতো মেয়েটা!
অতীতের ভয়াবহ সেই সন্ধ্যা!
আশি বছর পেরিয়েও মাহতাব শেখ শিরদাঁড়া উঁচিয়ে স্পষ্ট চাঁছাছোলা কণ্ঠে দুটি অভিমত রাখলেন সেদিন নাওফিলের সামনে।
– ‘আমার বড়ো ছেলের নামে মিথ্যা অভিযোগ, মিথ্যা প্রমাণ সাজিয়ে পুলিশ কেস করে যে মেয়ে আমাদের সকলের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি। তাকে নিয়ে আমিও একবারই ভেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছি তোকে৷ তোর বউকে মানহানি মামলা ঘাড়ে করেই জেলে যেতে হবে, জাদ। তাতে তার ক্যারিয়ার বরবাদ হলো না-কি জীবন বরবাদ হলো৷ সে চিন্তা আমার নয়, তোরও নয়। আমার কাছে আমার অর্জিত সম্মান বহু দামী। তার জীবনের চেয়েও দামী। তবে তার জীবন বা ক্যারিয়ার যদি তোর কাছে মহামূল্যবান হয়ে থাকে, তবে তা বাঁচাতে চাইলে তাকে ত্যাগ করতে হবে তোর। আমি বেঁচে থাকতে ওই বেইমান রেজার বেয়াদব, উশৃঙ্খল মেয়েকে এক মুহূর্তও তোর সঙ্গে মেনে নেব না। যদি তুই আমার সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওকে নিয়ে ঘর করতে চাস তাহলে জেনে রাখ– ওর ভাগ্যে সংসার নেই৷ এত বড়ো অপরাধের পর ওকে আমি মুক্তভাবে জীবনযাপন করতে দেব না।’
দীধিতি বাড়ির মূল ফটকের বাইরে ছিল সেই মুহূর্তে। নাওফিল যেন ওকে অবিশ্বাস না করে, এটুকু বোঝাতেই ওর সঙ্গে দেখা করার জন্য ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিল৷ গেটের সিকিউরিটিদের ওপর কড়া নির্দেশ জারি করা– তাকে যেন বাড়ির ত্রিসীমানাও না ঘেঁষতে দেওয়া হয়৷ ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়নি সেদিন দীধিতি৷ তাই বাইরে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করে যাচ্ছিল, নাওফিল আসবে ভেবে৷ কিন্তু ওই মানুষটির দেখা আর পায়নি সে। দুটো ঘণ্টা ঠায় অপেক্ষার পর ইয়াসিফকে হঠাৎ কাঠিন্য বেশে এগিয়ে আসতে দেখে৷ ইয়াসিফ এসে তাকে কাঠ গলায় জানিয়ে দেয়, ‘জাদ তোমাকে আর কখনোই দেখতে চায় না। তুমি চলে যাও, স্মরণ। এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে আর এ বাড়ির সম্মান নষ্ট কোরো না।’
জলে থইথই করা চোখদুটোই নির্বাক চেয়ে দীধিতি ইয়াসিফকে দেখতে থাকে তখন স্তব্ধ হয়ে। তার পরিস্থিতি দেখে সেদিন হয়ত ইয়াসিফের খুব করুণা বা মায়া হয়েছিল! তাই মাহতাব শেখের চড়া মেজাজের কথা ভুলে নিজের গাড়িতে করেই দীধিতিকে পৌঁছে দিয়েছিল উত্তরার বাড়িতে। আর বলে এসেছিল, ‘আজকের এ দুর্ভোগের জন্য নিজেকে দায়ী কোরো না, স্মরণ। জাদকেও কোরো না। হয়ত এটা তোমাদের ভাগ্যে লেখায় ছিল। আগামী দিনটা আরও কঠিন হবে তোমার জন্য। নিজেকে তাই কঠিন করো।’
বাসাতে পৌঁছতেই জাকির সাহেব ডেকে তুললেন নাওফিলকে। সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল নাওফিল৷ গাড়ি থেকে নামার আগে আচমকা বাবার হাতটা টেনে ধরল সে৷ ভীষণ শীতল কিন্তু সংগোপনে থাকা জেদটা বজায় রেখে বলল তাকে, ‘আমি আপনার কথা শুনছি, সব আদেশ নিষেধ পালন করছি। কেন আব্বু? কারণ, আমার চাওয়া আপনাকে পূরণ করতেই হবে।’
প্রশ্রয় দিতে চাইলেন না জাকির ছেলের সেই জেদকে। কঠিন করেই বললেন তাই, ‘আমি ক্ষমতার অপব্যবহার আজ অবধি করিনি, জাদ৷ আমি মাহতাব শেখ নই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫৯
-‘কিন্তু আপনি নাওফিল শেখের বাবা’, মুচকি হেসে বলল নাওফিল, ‘আপনার ছেলে ক্ষমতা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। সেটা তো জানেনই।’
মেজাজ খারাপ নিয়ে জাকির মোটা ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেলে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে৷ ছেলে বাবার সে মেজাজকে পাত্তা দিলে তো! ক্রাচ নিয়ে একাই নেমে পড়ল গাড়ি থেকে নাওফিল। ‘ঘুম হয়নি ঠিকঠাক। ঘুমিয়ে পড়ব ঘরে গিয়েই৷ কিন্তু ঘুম থেকে জাগার পর আমি গুড নিউজ শুনতে চাই, আব্বু।’ চলতে চলতেই কথাগুলো ফেলে গেল সে জাকির সাহেবের উদ্দেশ্যে।
