আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘ইউ আর আ ভেরি ব্রেভ গার্ল! আই অ্যাম ইমপ্রেসড!’
ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে বলা কথাগুলোই কিরণ অবাক হয়ে দীধিতির কানেকানে বলে বসল, ‘এরা কি ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্ট গ্রুপের, আপু? আমি তো জঙ্গি ভেবেছিলাম।’
বোনের প্রশ্ন কানে পৌঁছলেও দীধিতি সামনের নারীকে জহরিদের মতো পর্যবেক্ষণে মশগুল। উচ্চতায় কমপক্ষে পাঁচ ফিট আট অথবা নয় ইঞ্চি। কালো মুখোশে মুখটা আড়াল থাকলেও চোখ আর ভ্রুজোড়ার অংশটুকু দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি এ দেশেরই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো– কেন ওদের বাঁচাল সে?
-‘আর ইউ নট আ টেরোরিস্ট?’ প্রশ্নটা করল দীধিতি।
দীর্ঘ উচ্চতার অজ্ঞাত মেয়েটি হাসল বোধ হয় মুখোশের আড়ালে। তা চোখ দেখেই বুঝতে পারল ওরা। জবাব দিলো সে, ‘আমি তোমাদেড় মঙ্গলকামী এই মুহূর্তে। চিন্তা কোড়ো না৷ কিছুক্ষণেড় মধ্যেই এখানেড় সবাই-ই মুক্ত হয়ে যাবে।’
এবার কিরণের সঙ্গে দীধিতিও অবাকের শীর্ষে পৌঁছল, মেয়েটিকে সাবলীলভাবে বাংলা বলতে দেখে৷ দু’একটা শব্দ একটু অন্যরকম শোনালো শুধু৷ আর র-এর উচ্চারণটা ড় হয়ে গেছে কেবল।
-‘কে আপনি? চেনেন কী করে আমাদের?’ জিজ্ঞেস করল এবার কিরণ।
-‘তোমাকে চিনি না, প্রিয়। তবে ধারণা করছি তুমি শড়োনেড় সিস।’
-‘আমাকেই বা কীভাবে চিনলে তুমি?
দীধিতির তুমি সম্বোধনে খুশি হলো মেয়েটি। তাও স্পষ্ট হলো চোখের তারায়। বলল, ‘চিনিয়েছে বিশেষ একজন। কিন্তু তোমাড় সঙ্গে এভাবে দেখা হোক সেটা চাইনি। কিন্তু কী কড়াড়! ভাগ্য। এখন কিছুক্ষণেড় জন্য লুকিয়ে পড়ো দুজন৷ কেউ এদিকে আসবে না যদিও৷ সময় এবং সুযোগ হলে দেখা হবে আবাড় আমাদেড়।’
-‘কিন্তু তুমি তোমার পরিচয়টা তো দিলে না’, উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করল দীধিতি, ‘তুমি আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হলে কী করে? আর এখানে সন্ত্রাসের দলটা ঢুকলই বা কী করে?’
-‘এখানে ঢোকা খুব কি কষ্টেড়?’ হাসতে হাসতেই বলল মেয়েটি, ‘তোমড়া যেভাবে ঢুকেছ, টেরোরিস্টও সেভাবেই ঢুকেছে।’
-‘পসিবল না। আর্মস সমেত ধরা পড়ার কথা।’
-‘কিন্তু যাদেড় কাছে ধড়া পড়ার কথা, তাড়া নিজেড়াই যদি… ! এটা বহুদিন ধড়ে কড়া পড়িকল্পনা, শড়োন। এখন জলদি লুকিয়ে পড়ো। আমি এদেড় দুজনেড় ব্যবস্থা কড়ছি।’
কথাগুলো বলেই মেয়েটা চেতনাশূন্য সন্ত্রাসদুটোর দু’পা ধরে অনায়াসেই টেনে নিয়ে গেল ওদেরকে তাজ্জব বানিয়ে রেখে। এরপর লুকিয়ে কাটাল ওরা বিশ মিনিট। এই বিশ মিনিটের মাঝে নেটওয়ার্ক কোনোক্রমেই কাজ করেনি। চতুর্থ ফ্লোরে কী ঘটছে, পুলিশ বা সেনাবাহিনির আগমনই বা ঘটেছে কি-না, কিছুই বোঝা গেল না। ঠিক আধা ঘণ্টা পর আবার হইচইয়ের শব্দ কানে এলো৷ সাধারণ মানুষের ছোটাছুটি দেখতে পেলো ওরা লুকিয়েই। তারা যেন মুক্তি পেয়েই এই মল থেকে বেরিয়ে পড়ার জন্য হুড়োহুড়ি করছে। কিরণকে রেখে দীধিতি লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে দেখল, সত্যিই সবাই মুক্তি পেয়ে গেছে। এবং অসংখ্য পুলিশ ঢুকে পড়েছে ভেতরে। তাহলে কি এতটুকু সময়ের মধ্যেই ধরা পড়ে গেল আতঙ্কবাদীর দলটা? কী করে সম্ভব সেটা?
কিরণকে নিয়ে দীধিতি আর অপেক্ষা করল না ওখানে। এস্কেলেটরে দাঁড়াতেই আচমকা ওদের পেছনে এসে দাঁড়াল সেই মেয়েটা। দীধিতি তার আপাদমস্তক দেখে মুক হয়ে রইল শুধু৷ মেয়েটা মুচকি হেসে বলল, ‘যে আটজনেড় দলটা এখানে ঢুকেছিল, তাদেড় মাঝেই একজন বেইমানি করেছে বলেই ওড়া এত সহজে পুলিশের কাছে ধড়া পড়ে গেছে।’
-‘অবিশ্বাস্য!’ বিস্ময় নিয়ে দীধিতি বলল, ‘কীভাবে, কী হলো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কে বলো তো? এত চেনা লাগছে কেন তোমাকে? যেন আমার…’
-‘যেন তোমার হাজবেন্ডের ফ্যামিলির কেউ মনে হচ্ছে দেখে?’ মুচকি হাসতে হাসতেই দীধিতির মুখের কথা কেড়ে নিলো সে।
-‘ভাইয়ার মতোই লাগছে আমার কাছে।’ বিড়বিড় করে বলল কিরণ।
কিন্তু দীধিতি এতটাই হতবাক হয়ে গেছে যে, কিরণকে বলতে পারল না– নাওফিলের চেয়েও নাওফিলের মায়ের সঙ্গে বহু অংশে মিল মেয়েটির। যাকে কিরণ কোনোদিন দেখেইনি।
-‘কে তুমি?’ ক্ষীণ সুরে মেয়েটিকে আবারও জিজ্ঞেস করল দীধিতি।
মেয়েটি তখন হাসি থামিয়ে দীধিতির কানের কাছে মুখটা এগিয়ে আনল, ‘মিস জাইমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগের চেষ্টা কোরো না, ডিয়ার। সে এখন এসবি’র(স্পেশাল ব্রাঞ্চ) হাতে বন্দি। আর আমি তার মাধ্যমেই তোমাদের হদিস পেয়েছি। তাই আমার কথাও আপাতত তোমার হাজবেন্ড বা অন্য কাউকেও জানিয়ো না। সময় হলে আমি নিজেই তোমাদের সঙ্গে দেখা করব। মুখোমুখি হব আমার ভাইয়ের।’
-‘তারপর চলন্ত এস্কেলেটরেই দ্রুত পা ফেলে চলে গেল সে৷ একজন টেরোরিস্ট হলে কি খোলামেলাভাবে চলত মারিহাম? আর সে বছর যে জঙ্গি দলটিকে আটক করেছিল আমাদের এজেন্সি, তাদের ধরা পড়ার পেছনে মারিহামেরই পূর্ণ সহযোগিতা ছিল কিন্তু।’ থামল দীধিতি কথা শেষে। গম্ভীর দৃষ্টিজোড়া স্থির রইল তখন ইয়াসিফের মুখপানে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, ইয়াসিফ ঠোঁট এক কোনে নিয়ে হাসছে দীধিতির শেষ কথাগুলো শুনে৷ ‘কী হয়েছে?’ থমথমে গলায় বলল দীধিতি, ‘আমি হাসবার মতো কথা বলেছি বলে মনে হয় না।’
-‘তুমি যতবার আমাকে এই গল্পটা বলেছ, স্মরণ। ততবারই কোনো না কোনো বাক্য তুমি হয় বাদ দিয়েছ আর নয়ত নতুন করে যুক্ত করেছ। তুমি কেন আমার কাছে কিছু ব্যাপার লুকোতে চাইছ, আমি সেটাই বুঝতে পারছি না।’
চরম বিরক্তিতে দীধিতি ভ্রু সঙ্কুচিত করে বলল ওকে, ‘মারিহাম আমার আত্মার কেউ নয় বা ওর ভাইও আমার স্বামী নেই যে, ননদ বলে ওকে সেইফ করার জন্য উঠেপড়ে লাগব আমি৷ একটা গল্প গত চার বছরে কম করে হলেও বিশবার শুনিয়েছি আপনাকে৷ সেই বিশবারের প্রতিটা শব্দ আপনি রেকর্ড করে রাখলেও আমি তো আর তা হুবহু মুখস্থ করে রাখিনি। রাখলে প্রতিবারই একই বাক্য থাকত। একটু উনিশ-বিশও হত না।’ বলেই উঠে পড়ল দীধিতি।
-‘রাগ কোরো না প্লিজ, স্মরণ। তুমি ওকে যতটা ভালো ভাবছ, ও ততটাই ডেঞ্জারাস। অবশ্যই সেদিন কোনো স্বার্থের কারণে ও তোমাদের বাঁচিয়েছিল আর যে দলে ও যুক্ত হয়েছিল। সেই দলটাকেও কোনো স্বার্থেই ধরিয়ে দিয়েছিল। এমনকি তোমার জাইমা মামনিকেও। যদি ভালোই হত সে, তাহলে আমার সঙ্গে খেলত না। আচ্ছা বাদ দিই আমাদের ব্যক্তিগত ওই ব্যাপারগুলো৷ তাহলে এটা আমাকে বোঝাও, যেদিন নাওফিলের সঙ্গে ওর দেখা হবে সেদিন ও কেন নিজের খুনের নাটকটা সাজাল?’
-‘সেটার উত্তর তো ও-ই দিতে পারবে৷ জাইমা আন্টির সঙ্গে কী করে ও যোগাযোগ করল, মিস আলিয়ার নিখোঁজের গল্পটাও সত্য কি-না, এসবের উত্তর আপনি আমার বলা ওই ঘটনা থেকে বের করতে পারবেন না, ভাইয়া। যতবারই শোনেন।’
তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে ইয়াসিফ নীরবেই দীধিতির কথাগুলো শুনল। অন্তত মিনিট দুই কোনো কথায় বলল না সে। সেই ফাঁকে দীধিতি কফির ফাঁকা মগটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেছে৷ ইয়াসিফ নিজের মগে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে পড়ল আর বলল ওকে, ‘মারিহামের সঙ্গে আমার দেখা হবেই হবে, স্মরণ। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সে সময়টা শুভ না-কি অশুভ হবে, তা জানা নেই।’
প্রসঙ্গটা এড়াতে দীধিতি জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘আপনি আমাকে কেন সামনের অপারেশনটাই নিতে চাইছেন না, ভাইয়া?’
-‘ধুর! আমি তোমাকে না নিতে চাইবার কে?’
-‘আমি এই অবধি আসার জন্য যতটুকু সুবিধা পেয়েছি, তার পেছনে আপনার পরোক্ষ সহায়তা ছিল যেমন। তেমন বর্তমান আমাকে রাঙামাটি থেকে ঢাকা আসতে হলো যে কারণে, সে কারণের পেছনেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা আপনিই রেখেছেন।’
হাসল ইয়াসিফ, ‘তুমি কীজন্য যেন আমাকে খুব বেশিই ভালো মনে করো, স্মরণ। এজন্যই ভাবছ চট্টগ্রামের অপারেশনটা থেকে তোমাকে দূরে রাখার বন্দোবস্ত আমিই করেছি। যাতে তোমার কোনো ক্ষতি না হয়, তাই না? আবার আমি বলাতেই তুমি এই ফ্ল্যাটগুলোর অধিকার বুঝে নিলে। আমি আদতে অত ভালো বা উদার মানুষ না, স্মরণ৷ নেহাৎ তুমি আমার সেলফিশ ভাইটার…’
-‘থামুন’, উচ্চস্বরেই বাধা দিলো দীধিতি ইয়াসিফকে। ‘পরের কথাটা আর কখনোই উচ্চারণ করবেন না, ভাইয়া৷ আমি বিগত চার বছর যাবৎ ডিভোর্সি। আপনার ভাইয়ের বউ আমি আর নই। যতই বলুন, ডিভোর্সের ভ্যালিডিটি ছিল না৷ কিন্তু সে যথাস্থানে সিগনেচার বসিয়েছিল৷ ওটাই যথেষ্ট। আমি সেদিনই একদম অন্তর থেকে তাকে তালাক দিয়েছি৷’
-‘অসহ্য!’ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে উঠল ইয়াসিফ, ‘মেয়ে লোকের এরকম বাড়াবাড়ি বোঝাটা আমাকে প্রচণ্ড রাগায়। পুরো কথা না শুনে ভাষণ দেওয়ার অভ্যাসটা বাদ দেবে আজকে থেকে। ওকে? তোমাদের বিচ্ছেদের ব্যবস্থা আমাকে দিয়েই করানো হয়েছিল। তাই আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে না এ ব্যাপারটা।’
নিজেকে সামলাল দীধিতি ইয়াসিফকে রেগে উঠতে দেখে৷ শান্ত গলায় বলল শুধু, ‘আপনিই তো তখন বলতে গেলেন ওই কথাটা।’
-‘কোন কথাটা? আমি বলতে চেয়েছি নেহাৎ তুমি আমার সেলফিশ ভাইটার বউ ছিলে এক কালে৷ বিয়েটাও আমিই দিয়েছিলাম তোমাদের। কিন্তু তোমাকে ও ডিভোর্স দেওয়ার পর নিজের অপরাধবোধ থেকে তাই কিছুটা স্বজনপ্রীতি মনোভাব দেখিয়েছিলাম, যখন চাকরিতে জয়েন করো তুমি৷ কিন্তু আমি আমার কাজের কাছে আর কখনই কাউকে স্বজনপ্রীতি দেখাইনি আর দেখাইও না৷ তোমার ক্ষেত্রেও না৷’
-‘আচ্ছা বাদ দিন। বসবেন না আর?’
-‘না৷’
-‘আমি মিস্টার রাফিয়ান রাফির সঙ্গে ঠিক ইজি হতে পারব না, ভাইয়া৷ যতবার তিনি দেখা করেছেন আমার সঙ্গে, আমাকে নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ততবারই অন্যরকম লেগেছে।’ চোখে-মুখে করুণ এক অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বলল দীধিতি।
ইয়াসিফের উত্তপ্ত মেজাজ সে অভিব্যক্তি দেখে ঠান্ডা হলো৷ একটু হাসতেও ইচ্ছা করল। কিন্তু গাম্ভীর্যটুকু ধরে রাখতেই কঠোর গলায় বলল, ‘সরকারের হুকুমজারি করাই তোমার কাজ নয় কি? আমাকে এসব বলে লাভ নেই। আমি সরকারের সঙ্গে প্রতিদিন ওঠাবসা করি না৷ যারা করে, তাদের কাছে গিয়ে মিনতি করতে পারো। আসছি।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬১
আমার অনিয়মিত কাজের জন্য শুধু আপনারাই ক্ষিপ্ত না৷ ফেসবুক কতৃপক্ষও ক্ষিপ্ত৷ তাই রিচ এক্কেবারে তলানিতে পাঠিয়ে দিয়েছে৷ আপনারা একটু কষ্ট করে পর্বগুলো শেয়ার করেন আর মন্তব্য করেন সকলে৷ তবে দয়া করে সেটা স্টিকার, ইমোজি না৷
