আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
তাওসিফ না-কি কিরণ? প্রণয়ঘটিত অঘটনটা আসলে কার বেলাতে আগে ঘটেছিল? দীধিতি আর নাওফিলের সুখময় অতীতের কিছু পাতা উলটালে এ ব্যাপারে কিরণ আর তাওসিফের মাঝে খুব একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি৷ তবে যে কোনো একজনকে দিয়েই শুরুটা হয়েছিল বটে। তাওসিফের প্রতি কিরণের শক্ত আচরণগুলোর পর তাওসিফ দেখা হলেই হঠাৎ হঠাৎ গম্ভীরতার মুখোশ থেকে বেরিয়ে টিপিকাল বেয়ায়-বেয়াইন সম্পর্কের ভেতর ঢুকে পড়ত। মজা করার ছলে কিরণকে আরও রাগিয়ে দেওয়া আর লজ্জা পায়িয়ে দেওয়াটা রীতিমতো তার নিজের কাছেই উপভোগ্য লাগতে শুরু করেছিল৷ ছোটো কিরণ তখন নিজের বিরহ ভুলে তাওসিফের থেকে পালিয়ে বেড়ানোর ধান্দা খুঁজে বেড়াত শুধু। দীধিতি ব্যাপারগুলো লক্ষ করলেও খুশি হয়েছিল এ ভেবেই যে, সৌরভের প্রত্যাখ্যান থেকে পাওয়া দুঃখগুলো তো অন্তত ভুলতে শুরু করেছে বোনটা৷ যেটা নাওফিলের সঙ্গে দীধিতি শেয়ারের পর নাওফিল আবার তাওসিফকে আড়ালে আবডালে তা নিয়ে একটু দুষ্টু দুষ্টু মশকরা শুরু করে কিরণকে জড়িয়ে।
রুনার বিষয়টি তখনো পুরোপুরি সমাধা হয়নি৷ ওর পেট থেকে কথা বের করা যে বেশ কঠিন, তা তাওসিফ বা নাওফিল, কেউ-ই আন্দাজ করেনি। যে রাতে রুনাকে রুফটপে ডেকে তাওসিফ ছোটোখাটো কিছু টর্চার করতে শুরু করে, সে রাতে রুনা ওর জবানিতে একটা কথায় শুধু বলেছিল কাঁদতে কাঁদতে, ‘জাকির স্যার আমাকে কোনো অভিসন্ধি নিয়েই পাঠাননি।’ তারপরই জ্ঞান হারায় সে। অথচ হাতের নখদুটো তখনো পুরোপুরি তুলে আনেনি তাওসিফ৷ শেষে ওরা দু’ভাই বাধ্য হয়ে রুনাকে রুমানের হাতে তুলে দেয়। পুলিশের ঘা ওদের মতো সাধারণ মানুষের দেওয়া আসলে সম্ভব নয় আর তা অনুচিতও৷ তখন ইয়াসিফ চট্টগ্রাম মারিহামকে নিয়ে ব্যস্ত। নয়ত রুনার দায়িত্বটা তার হাতেই যেত।
রুমান নিজের মতো করে চেষ্টা চালিয়ে অবশেষে যে তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারে রুনার থেকে–
নাওফিল আর দীধিতির বিয়ের পর থেকেই দীধিতির ক্ষতির উদ্দেশ্যে রুনাকে ব্যবহার করেছিল তাওফিস আর ইয়াসিফের একমাত্র বোন ফিহা৷ এবং ফিহাকে পুরোদস্তুর সাহস আর সহযোগিতা করেছিলেন খুশি বেগম। সাবালিকা হওয়ার পর থেকেই ফিহা নাওফিলকে খুব পছন্দ করত। ব্যাপারটা জানাজানিও হয়ে যায় বাড়িতে। কিন্তু একই ছাদের তলায় ওরা ভাই-বোনের মতো বড়ো হয়ে হঠাৎ করে সম্পর্কটা পালটে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিণত করা নাওফিলের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। তাই জাকির শেখও রাজি হননি মেজো ভাইয়ের প্রস্তাবে। তাছাড়া ফিহা পরিবারের কাছে যে মেকি শিষ্টতা আর শালীনতা নিয়ে চলাফেরা করে, আদতে মেয়েটার স্বভাব সম্পূর্ণ তার উলটোটাই৷ ইয়াসিফ সব সময় বাড়ির বাইরে থাকার ফলে শাসনটা কেবল তাওসিফের থেকেই পেয়েছে ফিহা। কিন্তু বড়ো হওয়ার পর বা ভার্সিটিতে যাওয়ার পর সেই শাসনটাও কমিয়ে দিতে হয়। অন্যদিকে তাওসিফের শাসনের চেয়েও অধিক আশকারা পেয়েছে মেয়েটা মা আর বাবার দিক থেকে। এসব মাহতাব শেখের চোখের আড়ালে থাকলেও অন্যদের আড়ালে তো আর ছিল না। নাওফিলের জন্য তাই ফিহাকে কখনই পছন্দ করেননি জাকির শেখ।
তাই বলে আশা ছাড়েনি ফিহা। কারণ, নাওফিলের শান্ত আর নম্র আচরণের কারণে ওর বিশ্বাস ছিল, ধীরে ধীরে ঠিকই সহজ হবে নাওফিল ওর সঙ্গে। তার মাঝে সে নিজেকে আরও উপযুক্ত, যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু যাকে নিয়ে ফিহার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সে যে ওর নিজস্ব পৃথিবীর বাইরে আরও কত সুদূরপ্রসারী একেকটি পরিকল্পনা নিয়ে দিন গুজরান করে, তা আর জানা ছিল না ওর। দীধিতির সঙ্গে বিয়েটা হওয়ার সংবাদ কানে যাবার পর সেদিনই নিজের নানাবাড়ি থেকে ছুটে আসতে চেয়েছিল। বহু কষ্টে মেয়েকে সামলেছিলেন তাওসিফের মা। গাজীপুর ফিরে আসার পর দীধিতিকে যখন দেখেছিল সে, কষ্টটা ওর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল আরও তখন। নিঃসন্দেহেই ওর চেয়েও দীধিতি দ্বিগুণ সুশ্রী যে। এজন্যই তাহলে নাওফিল বিয়ের আগে ওকে নিয়ে একটাবারও ভাবেনি!
এমন ভাবনা নিয়ে ক’বার নাওফিলের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করেছিল সে। কিন্তু ইয়াসিফ বা তাওসিফ বোনের কষ্ট বুঝলেও কঠিন হয়ে ছিল তারা ওর প্রতি। পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, নাওফিল আর দীধিতির ধারে কাছেও যেন ততদিন অবধি না ঘেঁষে সে, যতদিনে সে স্বাভাবিক না হতে পারে। ভাইদের সেই নিষ্ঠুরতায় ফিহাকে এলোমেলো করে তোলে বেশি। এবং এই ফিহার এই দুঃসময়টিকেই কাজে লাগিয়ে খুশি বেগম সদ্ব্যবহার করেন৷ প্রথম যখন ফিহা বড়ো চাচির ভাবনাগুলো জানে, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করা এবং আধুনিক মানসিকতা পোষণ করায় ওসব সিহর সম্বন্ধে কথাবার্তা একদমই বিশ্বাস করেনি৷ জাদু করে স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা করা যাবে? আবার নাওফিলকেও নিজের বশে আনতে পারবে? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে রাত-দিন ভেবে একাকার করার পর রুনা চূড়ান্তভাবে মগজ ধোলাই করতে সফল হয় ফিহার। তারপর দীধিতির ব্যবহৃত পোশাক, চিরুনিতে থাকা চুল, এসব সংগ্রহও করে আনে রুনা নিজেই। জান্নাতি বেগমের মাঝে দীধিতিকে নিয়ে যতটুকু ঘৃণ্য অনুভূতি ছিল, তা আরও বেশি বেড়েছিল প্রতিনিয়ত ফিহার মুখে দীধিতি বিরুদ্ধে কূট মন্তব্য শুনতে শুনতে।
গত সাতদিনের মাঝে আজ বেশ সহজেই পা ফেলতে পারছে নাওফিল। বাইরে যাতায়াতে খুব একটা অসুবিধা হবে না ভেবে জাকির শেখ আজ তাকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়ে গেছেন। এই সাতদিনে বাসার দুটো ফ্রিজে মিষ্টি আর ফলে ভরপুর অবস্থা৷ এই নেতা, সেই নেতা, যে-ই তার সঙ্গে সাক্ষাতে এসেছে, প্রত্যেকেই হাতভর্তি করে এসেছে এসবে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের সঙ্গে তাকে দলীয় নানানরকম ব্যাপারে আলোচনা করে যেতে হয়েছে নিজের চেয়েও ভারী বয়সের বোরিং মানুষগুলোর সঙ্গে। সত্যি বলতে, ভোটে জেতার প্রথম তিনটে বছর তার মন সমাজকল্যাণমুখি থাকলেও পরের বছর থেকেই সব কিছুর প্রতি কেমন প্রবল অনীহা চলে আসে৷ যেদিকেই তাকায়, মনে হয় যেন সব শূন্য। ঘরে ফিরলে পূর্বের দিনগুলোর মতোই হাহাকার করে উঠত বুকটা। সে নিজের সব হারানোর যন্ত্রণা থেকে নিজের মনটা জোরপূর্বক অন্যদিকে বিমুখ করতে চেষ্টা করেছে প্রতিনিয়ত। কিছু সময়ের জন্য তাতে সফল হলেও একটা সময়ে গিয়ে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আবার। বহুদিন ভেতরের স্তূপীকৃত ব্যথাগুলো কাউকে বলা হয়ে ওঠে না।
কিন্তু আজ সে সব ভুলে ভীষণ খুশি৷ জাকির শেখ তার চাওয়া পূরণ করেছেন। আজ থেকেই ছত্রিশ জন পুলিশ তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টা পালাক্রমে তারা নাওফিলের বাসা, কর্মস্থল, সবখানেই নিরাপত্তা দেবে। এবং সাংবিধানিক পদবিধারী হিসেবে বাইরে যাতায়াতের সময় তার সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকবে সাদা পোশাকে দুজন গানম্যানও। যাদের মাঝে একজন গানম্যান অতি ঘনিষ্ঠজন তার। আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা কেবল।
অফিসের কেবিনে বসে ম্যানেজারকে নিয়ে জাকির সাহেব কোম্পানির চলমান প্রজেক্ট ফাইল দেখছিলেন। খুব দ্রুতই নিজের ব্যবসাটাও বুঝে দেবেন তিনি নাওফিলকে৷ তা এখনো জানাননি তিনি ছেলেকে। তাই কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন একে একে৷ যাতে ম্যানেজার সহজেই সব বুঝিয়ে দিতে পারে নাওফিলকে৷ এর মাঝেই দরজায় নক করল তার ব্যক্তিগত সহকারী। জানাল, পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে একজন অফিসার দেখা করতে এসেছেন তার সঙ্গে৷ তা শুনে স্বভাবজাত গম্ভীর রাখা মুখটা তার কিছুটা কোমল হয়ে উঠল কেন যেন। ম্যানেজারকে বললেন পরে আসতে৷ আর পিএ ছেলেটিকে বললেন, ‘স্পেশাল কিছু নাশতা পাঠাও দ্রুত।’
‘স্পেশাল’ শব্দটা শুনে পিএ মনে মনে একটু অন্য কিছুই ভেবে বসল। কারণ, অফিসার একজন নারী৷ শুনেছে তার বস গত চার বছর যাবৎ বিপত্নীক। হ্যাঁ, খুশি বেগম মৃত এমনটাই জানে সবাই৷ তাই সুন্দরী নারী অফিসারের হঠাৎ আগমনকে শুদ্ধ পন্থায় আর ভাবতে পারল না সে। কেননা, এমন মন্ত্রী মিনিস্টারদের ওঠাবসা তো হয়ে থাকে কম বয়সী সুন্দরীদের সাথে।
কেবিনের দরজায় দ্বিতীয়বার নক পড়লে জাকির সাহেব ভরাট কন্ঠে অনুমতি দিলেন, ‘আসুন, অফিসার।’
দীধিতি ভেতরে আসা মাত্রই জাকির শেখ মৃদু হাসলেন, ‘কেমন আছ, স্মরণ?’
-‘আই অ্যাম ভেরি ওয়েল, স্যার।’ কাঠিন্য মুখে জবাবটা দিয়ে অনুমতি চাইল, ‘ক্যান আই সিট?’
-‘ওহ স্যরি স্যরি। বসো প্লিজ।’
দীধিতি বসার আগে গান হোলস্টার থেকে গানটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। বসার পর জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনি আর আপনার ছেলে কি এই আর্মসের ওপর ভরসা করেন?’
-‘হ্যাঁ, করি।’ উত্তরটা দিলেও তিনি বুঝতে পারলেন না, কেন প্রশ্নটা রাখল দীধিতি!
-‘তাহলে আমাকে সুপারিশ করে নেওয়ার কী কারণ, ঠিক বুঝিনি। যেখানে গান ব্যবহারে আপনার ছেলে নিজেই প্রচণ্ড পারফেক্ট।’
-‘একজন পুলিশের প্রধানও গান চালানোই দক্ষতা রাখেন৷ তবুও তাকে সঙ্গে বডিগার্ড রাখতে হয়।’ মুচকি হেসে বললেন জাকির, ‘আমরা ফর্মাল আলাপ থেকে বেরিয়ে কিছুটা ব্যক্তিগত সম্পর্কে ঢুকি, স্মরণ? আমরা নিশ্চয়ই প্রথমবার পরিচিত হচ্ছি না?’
-‘নিশ্চয়ই না। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বলতে কোন সম্পর্ককে ইঙ্গিত করছেন, তা পরিষ্কার করলে কথা বলতে সু্বিধা হত।’
-‘আমার ছেলের ওয়াইফ।’ কোনো ভণিতা ছাড়াই বললেন জাকির সাহেব।
-‘এক্স ওয়াইফ, স্যার।’ কাটা কাটা স্বরে শুধরে দিয়েই বলল দীধিতি, ‘স্যরি, এটা আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক হতে পারে না৷ তাই স্যার বলেই সম্বোধন করছি৷ তাছাড়া অতীতে আপনাকে কখনো বাবা বলেও ডাকা হয়নি, আর না বিয়ের আগে আঙ্কেল।’
-‘যেখানে ডিভোর্সের পেপারই নেই, সেখানে তুমি কী করে আমার ছেলের এক্স ওয়াইফ হলে, স্মরণ?’
-‘যদি এই ব্যাপারে ডাউট ক্লিয়ারের জন্য আমাকে ডাকা হয়ে থাকে, তাহলে পেপার পেতে হলে পুনর্বার ডিভোর্সের জন্য কোর্টে এবার আমাকেই আবেদন করতে হবে। যেহেতু কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে আপনার ছেলে তালাকের অনুমতি প্রদান করেনি আমাকে।’ কথাগুলো শেষে একটু পল থমকে থাকল দীধিতি। তারপর শান্ত সুরে বলল, ‘ভুলটা আসলে আমারই হয়েছিল। যেদিন জেনেছিলাম পেপার নেই, সেদিনই আমার কোর্টে অ্যাপ্লিকেশন করা উচিত ছিল।’
-‘রিল্যাক্স, স্মরণ’, জাকির শেখ নরম স্বরে বললেন, ‘আমি এসব বলার জন্য তোমাকে ডাকিনি। তোমাদের বিচ্ছেদ ঘটার পেছনে আমারই তো ভূমিকা ছিল। মানে তুমি যেটা জানো আরকী। তো আবার কেন তোমাকে আমার ছেলের লাইফে টেনে আনছি, সেটা তোমার জানার অধিকার আছেই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৩
হাসল দীধিতি, ‘যখন জেলে তিন ঘণ্টা কাটানোর পর আপনি ইয়াসিফ ভাইয়ার সঙ্গে এলেন আমাকে মুক্ত করতে, তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। আপনার কখনই কোনো ভূমিকা ছিল না, আপনার ছেলের সাথে আমার বিচ্ছেদের পিছে। তবে আপনি এও চাননি, আমি আপনার ছেলের জীবনে আসি।’
-‘সত্যিই চাইনি। এখনো তা অস্বীকার করব না।’
