Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬
ইসরাত জাহান দ্যুতি

এত জঘন্য আর অপমানজনক কথা শোনার পর লজ্জায়, কষ্টে দু’চোখ ভিজে উঠল দীধিতির। নাওফিল তাকে কতটা নিচুতে নামিয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই ওর। বান্ধবীদের পরামর্শে দীপ্তর সাথে হুট করে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াটা কতটা বুদ্ধিমতীর কাজ হয়েছে তা এখন তাকে ভাবাচ্ছে। নাওফিল থেকে আত্মরক্ষার জন্য নামমাত্র সম্পর্কে জড়ালেও মাত্র চারদিনেই সে বেশ বুঝে গেছে, দীপ্তকে নিয়েই তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে। দীপ্ত সব কিছু ভেবেচিন্তেই এগিয়েছে। কিন্তু সে তো আগেপিছে আর কিছু ভাবেনি শুধু নাওফিল থেকে রক্ষা পাবার কথাটুকু ছাড়া। যতটুকু জানে সে, এরা স্কুল জীবনের বন্ধু। সেই তাদের মধ্যেই আরেকজনের সাথে প্রেমে জড়িয়ে সারা জীবনের ভেজাল ঘাড়ে নিলো না তো সে? ভবিষ্যতে এমন কিছুও তো হতে পারে যে, দীপ্ত বন্ধুদের পরামর্শেই সব সময় চলাফেরা করছে! কিংবা নাওফিল মনে মনে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অন্যভাবে পরিকল্পনা করে তার কোনো ক্ষতি করল! একটা সমাধান জরুরি ছিল। কিন্তু সেই সমাধানটা দীপ্তর মাধ্যমে করার ভাবনাটা কতটুকু সঠিক হলো তা নিয়ে সে এই মুহূর্তে সন্দিহান।
দীপ্তদের কথার মাঝে হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে পড়ে তামান্নাদের তাড়া দিলো দীধিতি, ‘আমাদের যেতে হবে। তোরা ওঠ।’
দীপ্ত বাধ সাধল, ‘একটু পরে যাও। আমি পৌঁছে দিয়ে আসব।’

-‘না, আমরা চলে যেতে পারব।’
ঐশী, তামান্না, তন্বীও দাঁড়িয়ে পড়ল। দীপ্ত আবারও বলল ওদেরকে পৌঁছে দেওয়ার কথা। নাওফিল ওদের দিকে না তাকালেও ওদের এমন ন্যাকামো প্রেমের কথোপকথন শুনে রাতুলের দিকে ঠান্ডা চাহনিই দিলো কেবল।কিন্তু ওই চাহনির ঝাঁঝটুকুই সাংঘাতিক আকারে ফেলল রাতুল দীপ্তর ওপর, ওর ঘাড়টার ওপর একটা থাবা মেরে বলে বসল সে, ‘শালা আমার! বউ হওয়ার আগেই বউয়ের ন্যাওটা হয়ে গেছ! এক লাত্থি মেরে বুড়িগঙ্গায় ফেলব।’
এইটুকু শোনার পর দীধিতি আর এক সেকেণ্ডও দাঁড়াল না। হনহন করে ওখান থেকে চলে গেল। দীপ্ত কটমট করে তাকাল রাতুলের দিকে, ও কিছু বলার পূর্বেই নাওফিল উঠে এসে ঘুঁষি মেরে বসল ওর পেটে। পেট চেপে ধরে আর্তনাদ করে দীপ্ত চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী শুরু করলি শালা সাইকো!’

নাওফিলও দাঁড়াল না। টিএসসি থেকে বেরিয়ে গেল। সবুজ, শিহাব বুঝতে পারছে কাহিনি একটা হয়েছে। যার কারণে নাওফিল চটে গেছে৷ দীপ্ত ওর যাবার পথে হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে থেকে রাতুলকে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে কী হলো ওর?’
রাতুল বলার আগেই তুষার জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘তুই দীধিতিকে প্রপোজ করার আগে আমাদের জানালি না কেন?’
-‘আরে আমি রুমানের মতোই তোদের সারপ্রাইজড করতে চেয়েছি। হয়েছেটা কী? এটা নিয়েই কি রিয়্যাক্ট করল নাওফিল?’
পিঠের ওপর কিল বসিয়ে রাতুল জবাব দিলো, ‘পাপ করেছিস৷ ভাবিকে বউ বানানোর প্রস্তাব দিয়েছিস দীধিতিকে।’
কথাটার মর্মার্থ উদ্ধার করে বিস্ফারিত চোখে তাকাল সবুজ আর শিহাব। শিহাব আগে রুক্ষ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘নাওফিল কবে দীধিতিকে প্রপোজ করেছে? আমরা জানি না কেন?’
সবুজ বলল, ‘দীধিতি ওকে তাহলে রিফিউজড করে দীপ্তকে অ্যাক্সেপ্ট করল! কীভাবে সম্ভব?’
মাথা ধরে গেল দীপ্তর, ‘কী বলিস এসব?’ বলেই দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘জলদি নাওফিলের ফ্ল্যাটে চল।’

রুমান যেদিন থেকে জানতে পেরেছে ঐশীও দীধিতিকে বুঝিয়েছে দীপ্তর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর জন্য, এমনকি শুরুটাই করেছে ওরা তিন বান্ধবী মিলে, সেদিন থেকে কথা বলা একদম বন্ধ করে দিয়েছে সে ওর সঙ্গে। বললেও এই কাজটার জন্য মিনিটে মিনিটে ওর রাগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ঐশীকে। খুব বিচ্ছিরি একটা পরিস্থিতিতে আটকেছে সে। দীধিতিকে দেওয়া নাওফিলের ভিডিয়োটা দেখার পর থেকে বান্ধবীকে এই বিপজ্জনক মানুষের হাত থেকে বাঁচানোটাই বড়ো মনে করেছে ও। কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছে সে এই ভেবে, রুমানের মতো এত ভালো একটা ছেলে কী করে শুধু বন্ধুর স্বার্থের কথা চিন্তা করে অন্য একটা মেয়ের বিপদ নিয়ে ভাবছে না?
দীপ্ত এত সহজে দীধিতিকে প্রস্তাব দিতো না। তামান্না আর তন্বীই ওর সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করে গল্প জমিয়েছে আর সেই গল্পে গল্পে জানিয়েছে ওকে, দীধিতি নাওফিলকে নয়, ওকে পছন্দ করে ফেলেছে৷ এরপর দীপ্ত দু’দিন চিন্তাভাবনা করেই এই সম্পর্কটা তৈরির জন্য এগিয়েছে।

গতকাল দীধিতি যে ভীষণ অপমান বোধ করেছিল তা বুঝতে পেরেও দীপ্ত একটাবার কল করেনি ওকে। এতে দীধিতি ধরেই নিয়েছিল যে, নাওফিলের জন্যই দীপ্ত নিশ্চয় এ সম্পর্ক আর এগোতে দেবে না৷ এ নিয়ে তামান্না, তন্বীর চিন্তার শেষ নেই। কিন্তু দীধিতির মনে হচ্ছিল, বেশ বড়ো একটা বোঝা ঘাড় থেকে নেমেছে ওর। তামান্না আর তন্বীর এই চিন্তার অবসান ঘটল দুপুরের সময়। নাওফিলের বাসার ছাদে যে ক্লাবটা বানিয়েছে ওরা, সেখানেই দীপ্ত আজ সবাইকে ট্রিট দেবে। ওই ক্লাবে আবার যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই দীধিতির। এমনকি রুমান ছাড়া ঐশীও যাবে না। তামান্না আর তন্বীও না করে দিয়েছে। এভাবে একটা বাসায় গিয়ে ব্যাচেলর ছেলেদের মাঝে থাকা ওদের জন্য খুব অস্বস্তিকর। তার জন্য অবশেষে দীপ্ত বসুন্ধরাতে আসতে বলল ওদের। রুফটপেই সেলেব্রেট করবে ওরা৷ এতে আর আপত্তি করল না কেউ, শুধু ঐশী ছাড়া।

যাবার মতো ইচ্ছাটা না থাকলেও দীধিতি দুপুরের মধ্যে দুই বান্ধবীকে নিয়ে চলে এল বসুন্ধরায়। নাওফিলকে সকাল থেকেই কল করে কেউ পায়নি৷ তাকে মেসেজে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেকক্ষণ পরও নাওফিলের দেখা নেই। নাওফিল আসবে না এমনটা তো ও বলেনি, এদিকে ফোনটাও তুলছে না। খাবার অর্ডার করেও কেউ খেতে পারছে না নাওফিল না আসা অবধি। দীপ্তসহ প্রত্যেকেই ওকে অনবরত কল করে যাচ্ছে। রাজনীতিতে দীপ্তর পরিবার যুক্ত থাকলেও নাওফিলের বাবার আর ওর মতো শত্রু ওদের নেই। এত শত্রু কেন ওদের এ নিয়ে ওরা বেশ ভাবে। নাওফিলকে নিয়ে ওদের প্রত্যেকের মাঝেই সব সময় একটা ভয় আর চিন্তা কাজ করে। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছে তো ওর বিপদ-আপদ। দীধিতি বিরক্ত হতে হতে এক পর্যায়ে বলেই ফেলল, ‘যদি ওনাকে ছাড়া সেলেব্রেটটা না করা হয় তবে আমরা যাই।’

ওর কথার কোনো উত্তর দিলো না কেউ। খাবার যেহেতু অর্ডার করা হয়ে গেছে সেটা তো আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আপাতত ওরা মধ্যাহ্নভোজ সেড়ে নিলো। খাওয়া, আড্ডা চলতে চলতে বিকাল চারটা বেজে গেল। দীধিতিরা চলে যাবার প্রস্তুতি নিতেই তুষারের কাছে কল এল নাওফিলের ড্রাইভারের নাম্বার থেকে। রিসিভ করার পর ওপাশ থেকে শুনতে পেল, সকালবেলা গাজীপুরের ফ্যাক্টরি থেকে জরুরি কল এসেছিল নাওফিলের কাছে। দ্রুত বের হতে গিয়ে ফোনটা বাসায় ফেলে যায় ও। আর যাবার পথেই হঠাৎ করে ওদের গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করে বসে। দু’জনেই এ যাত্রায় বেঁচে গেছে, ক্ষয় ক্ষতিও খুব বেশি হয়নি। তবে দু’জনকেই কমপক্ষে পনেরোটা দিন বাসায় বিশ্রামে থাকতে হবে। কিন্তু নাওফিল এদিকে বাসায় কাউকে জানাতে দেবে না তার অবস্থার কথা। হাসপাতাল থেকে ওকে নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই ওর ফ্ল্যাটে চলে এসেছে ড্রাইভার। সে বাসায় চলে যাবে। কিন্তু নাওফিলকে একা ফেলে যাওয়াটা তো আর ঠিক হবে না। তাই বাধ্য হয়েই ওর থেকে তুষারের নাম্বার নিয়ে সে খবরটা জানাল।
তুষারের থেকে সবাই নাওফিলের অবস্থার কথা জেনে কেউ আর দেরি করল না। ওর বাসার পথে রওনা দিলো। এমনকি তামান্না আর তন্বীও মানবতা বোধ রক্ষার্থে নাওফিলকে দেখার জন্য গেল ওদের সাথে। তবে দীধিতির মধ্যে মানবতা বোধ নয়, বরং কষ্ট অনুভব হলো খুব। দীপ্তদের মতো চিন্তা ওরও হতে থাকল নাওফিলের জন্য। তাই এ খবর শোনার পরই দীপ্তকে সেই আগে বলে ওদের সাথে যাবার কথা।

প্রায় বিকাল পার করেই পৌঁছল ওরা নাওফিলের বাসায়৷ এত সময় ড্রাইভারটাই বসে ছিল ওর কাছে। চোটগুলো তারই বেশি লেগেছে। তাই সবুজ এসেই তাকে বাসায় পৌঁছে দেবার জন্য নিয়ে চলে গেল। আড়ষ্টতা নিয়ে দীধিতি সেদিনের বেডরুমটাই ঢুকল৷ নাওফিলকে সবাই ঘিরে রেখেছে, এখনো দেখতে পায়নি ওকে৷ মাথায় আর চোয়ালে আঘাতটা লেগেছে ওর। তামান্না আর তন্বীকে দেখেই নাওফিল বুঝে গেল দীধিতিও এসেছে। ওরা কথা বলতে থাকল ওর সাথে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তো আর আসেনি দীধিতি। সবাই কথা বলছে, শুধু সে-ই বোকার মতো পিছে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা তো ভালো দেখায় না। এগিয়ে এল সামনে, তখনি দু’জনের চোখাচোখি হলো৷ নাওফিলের ব্যান্ডেজ করা মাথা আর ফর্সা চোয়ালের রক্ত জমা অংশটুকু দেখে চোখের সামনেই নিজের বাবার মুখটা মনে পড়ল ওর। সাংঘাতিক অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান তিনি। ওঁর মৃত মুখটা যখন দেখেছিল দীধিতি, তখন এমনভাবে মাথা আর মুখের চারপাশে ব্যান্ডেজ করা ছিল। নাওফিলকে এভাবে দেখে বাবার কথা মনে পড়েই প্রচণ্ড কান্না পেল ওর, ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকে, অশ্রুনীরে ডোবা চোখদু’টোই চেয়ে রইল ওর দিকে। দীধিতির হঠাৎ এমন কান্না কান্না মুখটা দেখে বন্ধুরা খুশি হলেও আপাতত তা কেউ প্রকাশ করল না। নাওফিলও দেখে তেমন একটা পরোয়া করল না, এমনকি অবাকও হলো না। বন্ধুরা ভাবল, হয়তো রেগে আছে এখনো সে দীধিতির ওপর। কিন্তু নাওফিলের মনটা ওর জন্য একটু নরম করতে তুষার বুদ্ধি করে বলল, ‘এই শরীরে তো গোসল করতেও পারবি না। মাথা পানিতে ভেজানো নিষেধ নিশ্চয়ই। শরীরটা উষ্ণ গরম পানিতে মুছে দিই তাহলে।’

এ কথাগুলো শুনেই দীধিতি বলে উঠল, ‘যদি অসুবিধা না হয় তো আমি পানিটা গরম করে নিয়ে আসি?’
তুষাররা যেন এমন কিছুর শোনার অপেক্ষাতেই ছিল ওর থেকে৷ মুহূর্তেই তুষার সম্মতি জানাল। তারপরই আবার দীপ্ত বলল, ‘কিছু তো খাওয়াও জরুরি। রেস্টুরেন্টের রিচফুড খাওয়ানো ঠিক হবে না। যে মেয়েটা এসে দেখাশোনা করে যেত সব, ও কই? আসার পর তো ওকে দেখলাম না। রান্নাবান্না কিছু করে রেখেছে না কি?’
নাওফিল বলল, ‘ফিরে আসার পর ওকে আমি আসতে নিষেধ করে দিয়েছি৷ মেয়েটাকে সহ্য হচ্ছিল না কিছু দিন।’
কথাটা বলার সময়ও নাওফিলের চেহারায় বিরক্ত বোঝা গেল।
-‘কেন? কী সমস্যা? এখন তোর কাজকর্ম করে দেবে কে?’ শিহাব জিজ্ঞেস করল।
-‘আব্বুর খাস স্পাই একটা। ভাবগতি কিছুই ভালো লাগে না আমার। আজকের ঘটনাও বলে দিতো থাকলে।’
তুষার বলল, ‘ও না জানালে যেন চাচার জানার কোনো সুযোগ নেই?’
-‘যে সুযোগ ছিল সে সুযোগ আপাতত নেই।’
-‘মানে তুই সব…’

কথাটা তুষার পুরো বলার পূর্বেই দীধিতিদের উপস্থিতি স্মরণে এল ওর, দ্রুত কথা ঘোরাল, ‘তাহলে রান্নাবান্না নিয়ে ঝামেলা হয়ে গেল না?’
তন্বী বলল, ‘আচ্ছা আমরা যেহেতু তিনটা মেয়ে আছিই। আমরা তিনজন না হয় কিছু রান্নাবান্না করে দিয়ে যাই।’
তামান্না জিজ্ঞেস করল ওদেরকে, ‘পারমিশন আছে তো কিচেনে যাবার?’
শিহাব অল্প হেসে উত্তর দিলো, ‘কিচেনে যাবার পারমিশন সব সময়ই আছে। তোমরা এই উপকারটুকু করলে আমরা খুশিই হবো।’
নাওফিল বলল তখন, ‘প্রয়োজন নেই। তোমরা বাসায় চলে যাও। ওরাই করবে।’

-‘কেন ভাইয়া? আমরা এটুকু করলে কি আপনার খারাপ লাগবে?’ তামান্না জিজ্ঞেস করল।
-‘আহা তেমনটা নয় তো। গেস্ট হয়ে এসে নিজেরাই হোস্ট হয়ে এসব করলে আমার ভালো লাগবে না।’
দীধিতি মাথা নুইয়ে ছিল। নাওফিলের দিকে তাকাতেই কেমন যেন খুব অস্বস্তি লাগছিল ওর। দীপ্তকে হঠাৎ বলল সে, ‘কিচেনে যাচ্ছি আমরা।’
-‘চলো, চিনিয়ে দিই।’
-‘চিনে নিতে পারব, সমস্যা নেই।’
নাওফিল কিছু বলল না আর৷ যাবার সময় রাতুল বলল, ‘দীধিতি, একটু কষ্ট করে ফ্রিজ থেকে কিছু ফল বের করে কেটে দিয়ে যাবে আপু?’
-‘হ্যাঁ ভাইয়া, দিয়ে যাচ্ছি।’
তারপরই তুষার বলল, ‘তার আগে পানিটা গরম করে দিয়ে যাও আপু।’
তামান্না আর তন্বী ওদের অকপটে এমন আবদার করা দেখে বেশ অবাক হলো। যেন মনে হচ্ছিল, নাওফিলের জন্য দীধিতিকেই এসব করতে হবে৷ আবার দীধিতির কান্না পাওয়া চেহারাটা দেখেও ভাবাচ্ছে ওদের। মূল ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না ওরা।

হোস্টেল ফিরে আসার পর তন্বী আর তামান্না শুধু দীধিতির অস্থিরতা দেখছিল। এটুকু ওরা বুঝে গেছে আজ, স্বল্প সময়েই দীধিতি নাওফিলের প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। শুধু মাঝের ওই অঘটনটা না দেখলে নাওফিলের প্রতি এই দুর্বলতা বোধ হয় আরও বেড়ে যেত ওর। তন্বী প্রশ্ন করেই বসল ওকে, ‘ভালোবেসে ফেলেছিস নাওফিলকে?’
প্রশ্নটা শুনে দীধিতি এক মুহূর্ত দেরি করল না উত্তর দিতে, ‘কীসের মধ্যে কী বলিস? এত বেশি প্রেম জাগেনি আমার যে, ওইরকম একটু অসুস্থ মাথার মানুষকে নিয়ে এখনো জল্পনা কল্পনা করব। শুধু খারাপ লাগছে খুব।’
তামান্না জিজ্ঞেস করল, ‘মায়া হচ্ছিল ওইভাবে দেখে?’
-‘হুঁ।’
আর কিছু বলল না ওরা। নাওফিলের খবরটা জানার খুব ইচ্ছা হচ্ছে দীধিতির। ভাবতে ভাবতে দীপ্তকে কল করল, রিসিভ হতেই জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘আপনি কি চলে এসেছেন ওনার বাসা থেকে?’

-‘হ্যাঁ, অনেকক্ষণ আগেই। আমি আর শিহাব চলে এসেছি।’
-‘কী অবস্থা এখন ওনার? বাসা থেকে কেউ জানতে পারেনি এখনো?’
-‘জানাতে দিলে তো জানবে। আমি তো সন্ধ্যার পরেই চলে এসেছি। তখন দেখে এসেছিলাম ঘুমিয়ে পড়তে। ফোন করার সুযোগ পাইনি আর। আব্বার সাথে একটা কাজে এসেছি বাইরে।’
মৃদুস্বরে ‘ওহ’ বলে দীধিতি চুপ হয়ে গেল। দীপ্ত বলল তখন, ‘আমি ফোন করব তোমাকে রাতে। আর যদি এখনি খোঁজ নিতে চাও তো তুষারের নাম্বার দিচ্ছি। ওকে ফোন করে খোঁজ নাও। ভালোই হবে এতে। নাওফিল একটু রেগে ছিল না আমাদের ওপর? তুমি একটু সহজভাবে কথাবার্তা বললে রাগটা থাকবে না আর।’
দীধিতি দ্বিধান্বিত হলো, নাওফিলের থেকে সে শুধু দূরেই থাকতে চায়। কিন্তু দীপ্তর কথাগুলো কি শোনা উচিত? সত্যিই কি নাওফিল সহজ হবে ওর সঙ্গে? ভাবনার মাঝেই দীপ্ত তুষারের নাম্বার মেসেজে পাঠাচ্ছে বলে কল রেখে দিলো। মিনিটখানিক সময় যেতেই মেসেজ করে দিলো ও।

নাওফিলের থেকে দূরে থাকতে চেয়েও মন চাইছে দীধিতির, একটু খবর যদি জানতে পারত ওই মানুষটির?আজকের আগের দিনগুলোতে ওকে নিয়ে মিনিটখানিক সময়ও ব্যয় করে ভাবেনি সে। ওর কথা মনে পড়লে ওর প্রতি শুধু ভয়, রাগ আর ঘৃণাটাই উপলব্ধি হয়েছে। ওই ফ্ল্যাটে যাবার পর নাওফিলের ব্যান্ডেজ করা শুকনো মুখটা এমন বাজেভাবে ওকে ধাক্কা দিলো যে, ওখান থেকে ফিরতেও ইচ্ছা করছিল না তখন। যা কিছু করা প্রয়োজন সবটাই নাওফিলের পাশে থেকে করতে মন চাইছিল। আর যতটুকু সময় দেখেছে নাওফিলকে, চেয়েও কান্না আটকে রাখতে পারেনি ওর জন্য। সে মানুষটা কিন্তু এর আগে কখনোই এতখানি আবেগি ছিল না। বাবা মারা যাবার পর থেকে নিজের মা আর বোন ছাড়া কারও প্রতি এত বেশি দুর্বলতা অনুভব করেনি সে, যতটা নাওফিলকে আজকে দেখার পর থেকে করছে। এবং আরও একটা অসম্ভব ভাবনা উপলব্ধি হচ্ছে ওর। যে বিকৃত রূপে দেখেছিল সেদিন সে নাওফিলকে, ওই রূপটা যেন মিথ্যা। যতবারই ওকে মুখোমুখি দেখেছে, ততবারই খুবভাবে বিশ্বাস করতে মন চাইছে ওর যে, ওইদিনের নাওফিলটা মিথ্যা…এই সুন্দর ছেলেটির চেহারাটাই শুধু সরল নয়…সরল এই ছেলেটির অন্তরও। সে পারেই না কোনো মানুষকে সামান্যতম আঘাত করতে।

মনের দোটানা কাটিয়ে দীধিতি রাত সাড়ে দশটায় তুষারের ফোনে করল করল। এত দ্রুত রিসিভ হলো ওপাশ থেকে, মনে হলো তুষার ফোনটা হাতে নিয়েই বসে ছিল। খুব সুন্দর সুরে সালাম দিয়ে তুষার ফোন করা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইল। দীধিতি গলা পরিষ্কার করে সহজভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘দীপ্ত আপনার নাম্বারটা মেসেজ করেছে ভাইয়া। নাওফিল, মানে ওনার খবর জানার জন্য কল করলাম। কেমন আছেন এখন উনি?’
-‘জ্বর এসেছে ওর আপু। মাথার চোটটা বেশি না হলেও কমও না। একটু চিন্তাতেই আছি ওর মাথার অবস্থা নিয়ে।’
-‘ওহ, ওনার বাসার কাউকে জানাননি? জানালে তো বোধ হয় ভালো হতো।’
-‘বাড়ির ছোটো ছেলে আর ভীষণ আদরের। কল্পনাও করতে পারবে না কতটা আদরের। ওর বাবা-মা তো স্ট্রোক করবেই, ছোটো চাচা-চাচি, ভাই-বোন, সবাই পাগল হয়ে যাবে৷ এর থেকে সাংঘাতিক অবস্থা হলেও জানাতে দেবে না ও।’

-‘আপনারা ছেলেরা আর কতটুকু খেয়াল নিতে পারবেন? মা কিংবা চাচিরই তো প্রয়োজন ছিল খুব।’
-‘কিছু তো করার নেই। আমরাই যতটা পারব করব। কোনো নার্সের সেবাও নেবে না ও। আমরা আর ঘরের মানুষ ছাড়া নিজের কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেয় না। পুরো অদ্ভুত একটা মানুষ ও।’
-‘রাতে কিছু খেয়েছেন? কী করছেন উনি এখন?’
-‘তোমরা থাকতে ওই যে খাইয়েছিলাম। এখন অবধি আর কিছু খাওয়াতে পারিনি। খেতে পারছে না কিছু। বলল ভর্তা কিছু করলে খাবে। এখন কিচেনে এসেছি আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা বানাতে। আর ও শুয়ে আছে।’
-‘খেয়েছে তো তাহলে সেই সন্ধ্যায়। এতক্ষণ না খেয়ে আছেন?’
-‘চেয়েছি তো খাওয়াতে। শুনছে না। তুমি কি ওর সাথে কথা বলতে চাও?’
-‘না না, কথা বলতে চাই না।’ মাথা নেড়ে চকিতে বলল ও।
তুষার হাসল, ‘এত ভয় পাচ্ছ? ভয়কে একটু জয় করে দেখোই না। এমনও মনে হতে পারে তখন, সব দেখায় সত্য হয় না। নাও, কথা বলো।’

বলেই ফোনটা এগিয়ে দিলো নাওফিলকে। এত সময় নাওফিলের পাশে বসেই স্পিকার অন করে কথা বলছিল ও। পাশেই নাওফিল শুয়ে শুনছিল। সবুজ আর রাতুলও বিছানার এক কোণে বসে ফোন চাপছে আর মিটিমিটি হাসছে। দীধিতির বুক ধড়ফড় করছে, নাওফিলের আওয়াজ ওপাশ থেকে এখনো পায়নি। আর আদৌ নাওফিল ফোনের ওপাশে আছে কি না বুঝতে পারছে না সে। দু’মিনিটের মতো নীরব মুহূর্ত কাটল ওদের মাঝে। হঠাৎ দীধিতি শুনতে পেল ফোনের ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ। টের পেল নাওফিল ফোনটা ধরে আছে তবে। এভাবে তাহলে নিশ্চয়ই আর চুপ থাকা উচিত নয়! জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছেন এখন?’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো না নাওফিল, কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি অনেক।’
কণ্ঠটা শোনার পর আড়ষ্টতা হঠাৎ আপনা আপনি গায়েব হয়ে গেল দীধিতির। জিজ্ঞেস করল এবার, ‘এখনো কিছু খাননি কেন?’

-‘যা রান্না করে দিয়ে গেছ তা খেতে ইচ্ছা করছে না।’
একদম কাটাকাটা সুরে বলল নাওফিল। একটা বাইরের মানুষ এসে যতটুকু সম্ভব রান্নাবান্না করে দিয়ে এসেছে, সেটাই কি ঢের নয়? একটুখানি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত কি ছিল না? অথচ কথার সুরটা দেখো, যেন ঘরের বউয়ের ওপর মেজাজ দেখাচ্ছে। ভীষণ লজ্জা পেল দীধিতি। বোধহয় তা বুঝতে পারল নাওফিল, বলল, ‘ওরা খেয়েছে। রান্না নাকি টেস্ট হয়েছে খুব। কিন্তু আমার মুখে ভালো লাগছে না।’
কথাগুলো শুনে আবার সহজ হলো দীধিতি। আর এটুকু বুঝতে পারল, কাটাকাটা কথা বলারই স্বভাব নাওফিলের। নীরবে হাসল ও, বলল, ‘জ্বরের জন্য ভালো লাগছে না। কিন্তু নিজের সুস্থতার জন্য একটু জোর করে হলেও খান। দ্রুত ভালো হতে হবে তো।’
-‘কেন? তোমার আর দীপ্তর ন্যাকামি প্রেম দেখার জন্য? আমি বিছানাতে পড়ে থাকলে তোমার তো ভালোই হবে। এই ফাঁকে বিয়েটাও করে নিয়ো, বুঝেছ?’
-‘এখন কি এগুলো নিয়ে কথা না বললে হতো না?’
-‘না তো, কীভাবে হবে? তুমি আমাকে রিফিউজড করেছ। তারপর আমার বন্ধুকেই…! আমার জায়গায় তুমি থাকলে কী করতে বলো? একদম অনেস্টলি বলো। ম্যানম্যান করবে না। আমি সত্যিই শুনতে চাই।’
-‘আমি আর আপনার পিছুই নিতাম না।’
-‘ওকে আমিও আর তোমার পিছু নেব না। তোমার বিয়ে দেখব।’
দীধিতি কথা বলতে পারল না। কিন্তু খারাপ লাগছে এবার ওর। একটু সময় চুপ থাকার পর বলল, ‘রাত তো অনেক হচ্ছে। একটু কিছু খেয়ে নিয়েন।’
-‘তুমি এসে খাইয়ে দিয়ে যাও। তাহলে একটু কেন, পুরোটাই খাবো। সঙ্গে তোমার হাতটাও পিস পিস করে কেটে খেয়ে নেব।’

ভয় তো দূরে থাক, কেন যেন হাসি পেয়ে গেল দীধিতির। হেসেও ফেলল সে, ‘আপনি সেদিন যা দেখিয়েছেন আমাকে! আপনি আমার জায়গায় থাকলে কী করতেন? আমার সামনে আর আসতেন? এভাবে কি কথা বলতে পারতেন আমার সাথে? মনে পড়লে এখনো আমার বমি পায়। আপনার বন্ধুরা কি জানে না এসব? ওনাদের সামনে সেদিন একদম চেপে গেলেন। ওই ঘটনার পর কোন মেয়ে চাইবে আপনাকে মানতে?’
-‘তোমার সাহস আছে এটা মানতেই হবে। আর এ জন্যই তো তোমাকে পছন্দ করেছি। বললাম না, তুমি ভয় না পেয়েই ফেঁসে গেছ।’
-‘আশ্চর্যজনক! আপনার সাথে কথা বললে, আপনাকে দেখলে বিশ্বাসই করতে মন চায় না সেদিন অত ভয়ঙ্কর কাজটা আপনিই করেছিলেন৷ নয়তো দেখুন, আমি ভুক্তভোগী হবার পরও আপনার সাথে কত সহজভাবে কথা বলতে পারছি।’

-‘ভয় তো সবাই-ই পাবে আমার ওইদিনের ঘটনার সম্মুখীন হলে। কিন্তু আমি চাইছি খুব অনন্য একজনকে। যে আমাকে ভয় পাবে না। আমার মনে হয়েছে তুমিই সেই একজন। ধরো, তোমার সামনে বসে ওই যে সেদিনের ভিডিয়োতে যেমন ডেডবডিটা কাটাছেঁড়া করছিলাম, ওরকম কিছু করব। আর তুমি নির্বিকারভাবে আমার পাশে বসে থাকবে। কিংবা বিরক্ত অভিব্যক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করবে, “আর কতক্ষণ লাগবে, নাওফিল?” আমার রক্তাক্ত হাত, মুখ পুরো শরীরটাকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে দেবে।’
-‘ইয়া আল্লাহ! আপনি কি সুস্থ পাগল?’
-‘ভয়কে জয় করার ক্ষমতা তোমার নেই? সাধারণের মাঝে অসাধারণ হওয়ার ক্ষমতাটা অর্জন করতে চাও না তুমি?’
-‘তাই বলে এভাবে? আপনার মতো আমার এই জীবনে এমন অদ্ভুত মানুষ দেখিনি। কথা তো নয়, যেন এতক্ষণ থ্রিলিং মিস্ট্রি গল্প শুনলাম।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৫

-‘তুমি নিজেই ভেবে দেখো। আমি যাকে চাইছি, তুমিই কিন্তু সেই। না হলে এতক্ষণ যা বললাম আমি, তোমার বদলে অন্য কেউ হলে কল কেটে ফোন বন্ধ করে রাখত। আমার গল্পের রহস্য উদ্ধারের দায়িত্বটা নাও তুমি, আমাকে ভালোবাসো, দীধি।’
***প্রতিদিন আমার বলার ওপর কি পাঠকরা মন্তব্য করতে ইচ্ছুক হন? তাছাড়া কি ইচ্ছা হয় না করতে?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here