আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি
ঘড়িতে রাত একটা কুড়ি। নির্ঘুম নাওফিল তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে সবেই মোনাজাত শেষ করেছে। আকস্মিকভাবে কলিংবেলটা বেজে উঠল তখনই। এবং অধৈর্য ব্যক্তিটি একটা পল বিরতি দিচ্ছে না। যেন বোঝাতে চাইছে, ভীষণ তাড়া মানুষটির৷ নাওফিল তা বুঝলও। সেই সাথে আশঙ্কা হলো, কোনো বিপদ হলো কিনা! সিকিউরিটি গার্ড অথবা কেয়ারটেকার কেউ হবে কি? না-কি দীধিতি? শেষে স্মরণে আসা নারীটির কথা ভেবেই নাওফিল তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলো। জায়নামাজাটাও ভাঁজ করে রেখে আসেনি। আজ সারাটাদিনে জোর করেই সে দীধিতিকে নিজের সঙ্গে রেখেছে। চোখের আড়ালও হতে দেয়নি৷ কিন্তু একটিবার তার কাঁধেও হাত রেখে কোনো সান্ত্বনামূলক কথা বলেনি। কেবল দেখে গেছে, নাজুক মেয়েটির সহন ক্ষমতা কতটা! আর তা দেখতে দেখতে মনে মনে বউকে প্রশংসা করতেও ভোলেনি।
ডোরহোল থেকে দরজার ওপাশের মানুষটিকে দেখে ওর অভিব্যক্তি স্বাভাবিক হলো। দরজাটা খুলে দিলে সামনের মানুষটি ফোলা ফোলা চোখদুটো তুলে মৃদুস্বরে ওকে জানাল, ‘আই অ্যাম স্যরি।’
-‘কেন?’ কারণটা বুঝেও গম্ভীরমুখে প্রশ্নটা করল নাওফিল।
দীধিতি সে কথার কোনো জবাব দিলো না৷ একই গলাতেই বলল ওকে, ‘গোটা দিন পেরিয়ে এখন স্যরি শুনে তুমি ধিক্কার জানাতেই পারো।’
-‘এ ব্যাপারে ভালো বা খারাপ কোনো অনুভূতিই অনুভব হচ্ছে না। তাই ধিক্কার জানানোর কথাও আসছে না। কিন্তু এত রাতে কি শুধু স্যরি বলতেই আমার দরজায় এসেছ? সেটা জানতে কৌতূহল হচ্ছে।’
-‘আই নিড ইয়োর হেল্প।’ আলতো কেঁপে উঠল দীধিতির গলা।
নাওফিলের চোখ-মুখের অভিব্যক্তির কোনো বদল ঘটল না এবারও। ‘ঘরে এসো।’ ছোটো করে প্রলম্বিত শ্বাস ছেড়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল সে। দীধিতি ভেতরে এসে সোফায় বসতে গেলে সে দরজা আটকাতে আটকাতে বলল তাকে, ‘আমাকে বেডরুমে যেতে হবে।’
-‘আমি অপেক্ষা করছি।’
-‘প্রয়োজন নেই। অনাহূতের মতো রাবিশ আচরণটা স্কিপ করো শুধু।’ বলে সে গটগটিয়ে সিঁড়িতে উঠে গেল।
দীধিতি কোনো বাকবিতন্ডায় গেল না। নীরবেই নাওফিলকে অনুসরণ করে চলে এলো ওর ঘরে। দাঁড়িয়ে পড়ে দেখতে থাকল ওকে। জায়নামাজ ভাঁজ করে ক্যাবিনেটের ড্রয়ারে রাখতে রাখতে দীধিতিকে জিজ্ঞেস করল সে, ‘ডিনার করা হয়েছে?’
প্রশ্নটা এড়িয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল সে সরাসরি। ‘আমার মা অস্ট্রেলিয়াতে কোথায় আছে তুমি জানো, তাই না?’
কিন্তু নাওফিলও জবাবের বদলে তার মতোই প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘চোখে-মুখে পানি দিলে দাও। নয়ত বোসো বিছানায়। আমি চেঞ্জ করে নিই।’
প্রচণ্ড অধৈর্য দীধিতি৷ ‘প্লিজ, নাওফিল! বলো না?’
-‘বলব না বলেছি?’ বিরক্তি নিয়ে তাকাল নাওফিল। ভার কণ্ঠে আদেশ করল, ‘বসো আগে।’
মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে দীধিতি বিছানায় বসলে তারপর পাজামা-পাঞ্জাবি বদলাল নাওফিল। তবে ট্রাওজার ছাড়া গায়ে কোনো জামা রাখল না সে৷ নির্জীব নিষ্ক্রিয় মূর্তি বনে থাকা দীধিতি চোখের সামনে নির্লজ্জ স্বামীর পোশাক বদলানো সবটাই দেখল নির্বিকার চোখে৷
পানির গ্লাসটা ভরে ফিরে নাওফিল বসল এসে। গ্লাসটা তার হাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী সাহায্য কামনা করছ তুমি আমার থেকে?’
কয়েক চুমুক পানিতে গলা ভিজিয়ে নিয়ে দীধিতি বলতে শুরু করল, ‘আমি আমার মায়ের কাছে যেতে চাই। আমি জানি, তুমি বা তোমার পরিবার তার খোঁজ জানো। মায়ের কাছে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করে দিতে পারবে? তার বিনিময়ে আমি জিজ্ঞেস করব না, সব কিছু জেনেও কেন এতগুলো দিনে আমাকে জানতে দেওয়া হলো না।’
-‘তোমার বক্তব্য শুনে আমার তিনটা কথা জানতে মন চাইছে।’
-‘কী কথা?’
-‘কেন তোমার বিশ্বাস, আমি বা আমার পরিবার তোমার মায়ের হদিস জানি? এবং জানার পর কেন তোমাকে জানতে চাইলাম না? আর তুমি কি তোমার বাবার হদিস পেতে চাও না?’
এতক্ষণে নাওফিলের চোখে তাকাল দীধিতি। বলল, ‘গতকাল তোমাকে রাগের মাথায় যা বলেছি, তা সহ্য করার মতো ছিল না। তোমার জায়গায় আমি হলে হয়ত গায়ে হাতও তুলে বসতাম। মাম্মামের থেকে সবটা শোনার পরই আমি নিজের অন্যায় উপলব্ধি করেছি আর এও বুঝতে পেরেছি, তোমাকে বলা কথাগুলোর জবাবই তুমি মাম্মামের মাধ্যমে দিয়েছ আমাকে। এ ব্যাপার থেকেই এটাও বুঝতে পেরেছি, তুমি জানো আমার মায়ের ব্যাপারে সব কিছুই। তাই তার খোঁজও নিশ্চয়ই জানবে। কিন্তু তবুও আমাকে জানাওনি কারণ, আমি তোমার আব্বুর বিরুদ্ধে ভুল প্রমাণ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম। তাতে তো একটু হলেও তোমার পরিবারের মান নষ্ট হয়েছে। এই রাগেই বলোনি কিছু আমাকে। আর যে মানুষটির জন্য আমি সত্যিই নাজায়েজ সন্তান হলাম, আমার মায়ের সঙ্গে নিকৃষ্ট অন্যায় হয়েছে, তার পরিচয় জানার ইচ্ছে হচ্ছে না এ কথা বলব না। কিন্তু তার মুখদর্শনের ইচ্ছেটা অন্তত হচ্ছে না।’
-‘পরিচয়? তোমার মাম্মাম কি বলেননি তোমার বাবা মানুষটি কে?’
-‘মাম্মাম স্যামুয়েল নামের ব্যক্তিটিকে আমার বাবা বোঝাচ্ছিল৷ কিন্তু মায়ের সঙ্গে তো আরও তিনজন…’ বলতে পারল না দীধিতি পুরো কথাটা৷ ঠোঁট চেপে ধরে দৃষ্টি নুইয়ে ফেলল। নাওফিলের সামনে চোখের পানি ফেলতে চাইছে না সে কোনোভাবেই। তবুও চোখদুটো নোনাপানিতে ভরে উঠল তার৷ নাওফিল পাশে বসেই বিকারশূন্য হয়ে দেখে গেল শুধু৷ হাতটা পর্যন্ত স্পর্শ করল না দীধিতির।
সে সামলে ওঠার পর নীরস কণ্ঠে তাকে জানাল নাওফিল, ‘মিহাদ আর কিরণের রিসিপশন পার্টি হওয়ার একদিন পর অস্ট্রেলিয়ার ফ্লাইট ধরব আমরা। ছটা টিকিট বুকিং দেওয়া শেষ।’
বেশ আশ্চর্য হলো দীধিতি। তাকে কিছুই না জানিয়ে টিকিটও কাটা শেষ! তাহলে আগামীতে যা যা হতে যাচ্ছে, সেটাও নিশ্চয়ই নাওফিলের সিদ্ধান্ত আর পরিকল্পনা মাফিকই হবে। শুধু জিজ্ঞেস করল ওকে, ‘ছজন কে কে?’
-‘তোমার বোন আর ভগ্নিপতি নাকি অস্ট্রেলিয়াতেই হানিমুন করবে। তাই আমাদের সাথেই যাবে ওখানে৷’
-‘আমাদের বলতে বাকি আরও দুজন?’
-‘নিহাদ আর মাভিশা। তোমাকে তোমার গন্তব্যে ছেড়ে আমরা তিনজন ইস্তানবুল যাব বিশেষ কাজে।’
-‘আমাকে কখন জানাতে অস্ট্রেলিয়া যাবার কথা?’
-‘হয়ত যাবার আগের দিন। কিংবা কালই জানাতাম।’
শোনার পর কতক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে নত দৃষ্টিতেই বসে রইল দীধিতি। খুব ইচ্ছা করছে তার, কষ্টকর অনুভূতিগুলো এই মুহূর্তেই নাওফিলের কাছে প্রকাশ করতে৷ কিন্তু নিজেদের সম্পর্কহীন পরিস্থিতির কারণে গোটাদিন যেমন সে কান্না চাপিয়ে কেবল কর্তব্য পালনে অটল থেকেছে। তেমন কিছুক্ষণ আগ অবধিও কেবল জড়তা-সংকোচ নিয়ে একা একাই গুমরে মরেছে ঘরে বসে। সারা বাসায় একাকীত্ব তাকে আজ গ্রাস নিতে চাইছিল সেই দিনগুলোর মতো– যেদিনগুলোতে এই ঢাকার বাইরে কাটাতে হতো তাকে। প্রচণ্ড হাঁসফাঁস লাগছিল বলেই আর পারেনি একা থাকতে। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছুঁড়ে অবশেষে নাওফিলের দোরগোড়ায় এসে পড়ে। আসার পর ভাবেনি, এমন অকল্পনীয় সংবাদটা পাবে সে। কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত তার নাওফিলকে। কিন্তু কীভাবে জানাবে, তা ঠিক বুঝে পাচ্ছে না। এবার বোধহয় নিজের ঘরেও ফেরা উচিত। কিন্তু নিজের ঘর! আদৌ কি সেটা তার নিজের? সর্বক্ষণই তো মনে হয়, সে নাওফিলের দানকৃত সম্পদে বসবাস করছে। আজ এই দানটুকু তাকে না করলে হয়ত ভাড়া কম থাকা কোনো ঘিঞ্জি অঞ্চলে ছোট্ট একটা বাসা নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানাতে হত। এমনকি এই মুহূর্তেও যদি নাওফিল তাকে মায়া বা করুণা না করত, তাহলে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে মাকে খুঁজে বের করার মতো সাধ্য তার হত না। গত সাড়ে চার বছর যাবৎ তার জীবনের সমস্ত ভালো কিছুর পেছনে এই পুরুষেরই অবদান। তেমনই আজকের এই একাকিত্বের পেছনেও। তবে খারাপ তো আর নেই। হয়ত তাদের এই বিচ্ছেদ হওয়ারই ছিল। এবং তার জন্য আশি ভাগ দায়ী সে নিজেই। তাহলে খামোখা কেন সে নাওফিলকে দোষারোপ করে যাচ্ছিল? কেন ওর প্রতি ঘৃণায় বা প্রকাশ করছিল? এর কোনোটাই ওর প্রাপ্য নয়। বরং তার মতো গর্ভস্রাব, অভিভাবকহীন এক মেয়ে ওর মতো রাজপুত্রের যোগ্য ছিল না কোনোদিনই। যদি না ওকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করে সে জোরপূর্বক ওর জীবনে প্রবেশ করত, তাহলে আজ কোনো আমীর বাবার রাজকন্যাই জায়গা পেত ওর পাশে।
যে মাহতাব শেখের আদেশ নাওফিলকে বাধ্য করল তাকে ছেড়ে দিতে, সেই মানুষটির আদেশেই একদিন অন্য কোনো নারীকেও গ্রহণ করতে বাধ্য হবে সে। ভবিষ্যতে হয়তবা এমনই একটি দিন অপেক্ষা করছে। তা বেশ ভালোভাবে বুঝে গেছে দীধিতি। তাই আর নতুন করে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করার মানেই হয় না। বরঞ্চ যতদ্রুত সম্ভব মায়ের খোঁজ নিয়ে বাংলাদেশ ছাড়বে সে। তারপর তালাকাপত্রে সই করে নাওফিলকে পাঠিয়ে দেবে। ওই ভয়ঙ্কর দিনটা আসার আগেই সবকিছু করে ফেলতে হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীধিতি ধন্যবাদ জানানোর আশায় পাশ ফিরে নাওফিলের দিকে তাকাল৷ কিন্তু আশ্চর্য! সে কোথায়? ‘নাওফিল?’ গলা উচিঁয়ে ডাকল ওকে দীধিতি। কোনো সাড়া এলো না। লোকটা কখন ঘর ছেড়েছে? টেরই পেলো না সে! বেরিয়ে যাবার জন্য উঠে পড়তেই নাওফিল এলো। হাতে বড়ো এক খাবারের ট্রে। ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে রইল দীধিতি। ‘এসব কী?’ অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলে নাওফিল ইশারায় বসতে বলল তাকে। সে বসল না। বলে উঠল, ‘আমার পেট ফাঁকা নেই। কিছুই খাওয়া সম্ভব নয়৷ তবে ধন্যবাদ তোমাকে সবকিছুর জন্য৷ আমি নিজের ঘরে যাব এখন। ঘুম পাচ্ছে।’
-‘নিজের ঘরেই আছ।’ ট্রে বিছানাতে রাখতে রাখতে তাকে বলল নাওফিল, ‘খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুমাতে বাধা দেওয়া হবে না।’
ওর শান্ত অভিব্যক্তির কথায় দীধিতি বুঝে ফেলল, দারুণ এক জেদ ধরবে সে ঠিক সকালের মতোই। তাই কোনো তর্কে না জড়িয়ে নীরবেই ঘর ছাড়তে উদ্যত হলো। আর অমনি নাওফিল চেঁচিয়ে উঠে বলল ওকে, ‘মায়ের যাবতীয় তথ্য যদি পেতে চাও, বিনা বাক্যে আমার কথা মানো, স্মরণ। তাছাড়া তুমি ভাবছ আমি নিজের কোনো বেনিফিট ছাড়াই স্রেফ উদারচিত্তে তোমাকে তোমার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবো। কিন্তু বাস্তবে সেটা একেবারেই ভুল ধারণা তোমার।’
রীতিমতো চমক নিয়ে ফিরে দাঁড়াল দীধিতি। তার চকিত দৃষ্টি দেখে নাওফিল শীতল সুরে বলল, ‘আমার কন্ডিশন আছে, মিসেস স্মরণ। প্লিজ এসে বসুন আর খেতে খেতে আমার কন্ডিশনও জেনে নিন।’
-‘বাট এই মুহূর্তে আমি একটা দানাও দাঁতে কাটতে পারব না, স্যরি। আই প্রমিজ, কাল আপনার সমস্ত কন্ডিশন শুনব আর মানবও। আসছি এখন।’
-‘দাঁতে কাটতে হবে না। গিলে ফেললেই হবে।’ বলে মুচকি হাসল নাওফিল। দীধিতিকে এমন সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে ওর আরও হাসতে মন চাইলো। কারণ, ওর এই জোরাজোরির ব্যাপারটাই কয়েক ঘণ্টা আগে হলে এতক্ষণে কত যে গালি খেতে হত!
দীধিতি তবুও আর দাঁড়াতে চাইলো না। কিন্তু দরজার বাইরে পা ফেলার পূর্বেই নাওফিল দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে টেনে ধরল তাকে। আর চলন্ত অবস্থায় টেনে ধরায় দীধিতির গায়ে জড়ানো ওড়নাটা পুরোপুরি চলে এলো ওর হাতের মাঝে৷ যেটা একেবারেই হলো অনিচ্ছাকৃত। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল দীধিতি। জ্বলন্ত চাউনি নিয়ে ওর দিকে ফিরে তাকাতেই তার নাইটি পরিহিত শরীরের বক্ষ বিভাজিকায় চোখ বিঁধে গেল নাওফিলের। কয়েক পলেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ওর বুকের মধ্যের কামজ প্রেম।
-‘সুযোগে এমন ধরনের অসদ্ব্যবহার ভালো পুরুষেরা করে না। নিশ্চয়ই জানো তুমি।’ রাগকে গিলে ফেলে স্বাভাবিক সুরেই বলতে চেষ্টা করল দীধিতি।
কিন্তু যে কথার অর্থই মিথ্যা অপবাদ হয়ে দাঁড়ায়, সে কথা স্বাভাবিক কায়দায় বললেই কী আর রাগের সঙ্গে বললেই বা কী? দীধিতির কব্জি চেপে ধরে এক টানে তাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো নাওফিল। হাত ছাড়ল না। শক্ত করে ধরেই টেনে নিয়ে এসে বসিয়ে দিলো একদম বিছানার মাঝে। জলদগম্ভীর মুখে বলল তাকে, ‘সব সময় অত নাটক ফাটক সম্ভব না আমার পক্ষে। যার ওপর আমার পূর্ণ হক, তার অযৌক্তিক নাটক দেখার ধৈর্য নিয়েও আমি সব সময় বসে থাকি না।’ ওড়নাটা বিছানার মাঝে ছুঁড়ে ফেলে নিচে বসল সে, দীধিতির কোলের কাছে দু হাঁটু গেড়ে। ট্রে থেকে দুধের গ্লাসটা নিয়ে তার মুখের সামনে ধরল। ‘দুধটা খেতে খেতে আমার কন্ডিশন শুনে নাও।’
-‘তুমি কোন হক আদায়ের কথা বললে?’ রাগ আর দমিয়ে রাখতে পারল না দীধিতি।
-‘চার বছর আগে যে হকে এক সঙ্গে থেকেছি, সেই হক।’ জবাবে বলল নাওফিল।
-‘তাহলে এই চার বছরে সেই হক কোথায় ছিল তোমার?’ গলা চড়ে গেল তার। চোখ ঠিকরে জলের সঙ্গে রাগের উত্তাপও বেরিয়ে আসছে যেন।
-‘জানো না তুমি?’
-‘জানি না’, চেঁচিয়ে উঠল দীধিতি, ‘আমি মানতে পারি না, আমাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে তোমার হাজারটা মহা মহা যুক্তিগুলো। চারটা বছরে কতগুলো দিন, কতগুলো রাত আমাকে এই কষ্ট বুকে নিয়ে থাকতে হয়েছে একা একা, তা হিসাব করে দেখেছ?’
-‘দেখেছি।’ দীধিতির চোখের পানি মুছিয়ে তার ঠোঁটের সঙ্গে মিশিয়ে ধরল গ্লাসটা। চুমুক না দেওয়া অবধি গ্লাস চেপে ধরেই রইল সে। অতঃপর বাধ্য হয়ে দীধিতি কয়েক চুমুক দেওয়া হলে নাওফিল বলল তাকে, ‘যদি ভেবে থাকো যন্ত্রণা একাই সয়েছ তুমি চৌদ্দশত ষাটটা দিন, তাহলে তোমাকে স্বার্থপর বলতেই হবে৷ কারণ, নিজের কষ্ট নিয়েই তুমি ভেবেছ শুধু। আমি এক বিবাহিত পুরুষ হয়ে এতগুলো দিন শুধু মানসিক যন্ত্রণাতেই ছটফট করিনি। স্ত্রীর সান্নিধ্য ছাড়া শারীরিক চাওয়া পাওয়ার কষ্টেও ভুগেছি। আল্লাহর কসম, তাও দ্বিতীয় কোনো নারীর সান্নিধ্য লাভের চিন্তাও করিনি৷ এই ফিজিক্যাল নিডসের জন্য তুমি কতটা ভুগেছ, স্মরণ? আমার থেকেও বেশি? সত্যি বলবে।’
-‘কিছুই বলব না আমি। তবে রোজ স্বচক্ষেই দেখেছি তোমার উপভোগ্য জীবনের বহু ছবি।’
এবার আর না হেসে থাকতে পারল না নাওফিল। মাথা নুইয়ে হেসে নিলো এক চোট৷ তারপর আর কোনো কথা বাড়াল না। জোর করে দীধিতিকে দুধ আর কয়েক টুকরো ফল খায়িয়ে চলে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকা তাকে দুহাতে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে কিডন্যাপ করতে গিয়ে যখন গুণ্ডাপাণ্ডাদের হাতে আহত হতে হলো, তখনের ছবিগুলো উপভোগ্য লেগেছিল তোমার?’
সেইদিনের কথা স্মরণে আসতেই দীধিতির মনে পড়ল– ইয়াসিফের থেকে খবরটা শুনে যখন ফেসবুকে ঢুকল সে, তখন নাওফিলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ছবিগুলো সারা নেট দুনিয়াতে, পত্রিকা আর খবর চ্যানেলে সয়লাব। ঘরের মধ্যে বসে চুপচাপ চোখের পানি ফেলেছিল শুধু৷ তবু অহংবোধ থেকে একবারও জানতে চায়নি ইয়াসিফের কাছে, ও কেমন আছে! তারপরই আবার ওদের দুজনের দিয়াবাড়িতে কোয়ালিটি টাইম উপভোগ করার ছবিগুলো আচমকা ফাঁস হয় সোশ্যাল সাইটে। কিন্তু সেদিন ওই রাতে কেবল ওদের দুজনের সঙ্গে গার্ড ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাদেরকেই ছবিগুলো চুপিচুপি তুলে রাখতে আদেশ করেছিল নাওফিল৷ তাই বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি, সেই ছবিগুলো স্বয়ং নাওফিলই ফাঁস করেছিল। এবং নিজে থেকেই দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সে। শুধু তাকে ছুটে আসতে বাধ্য করার জন্য। এই পুরো পরিকল্পনা সে বোঝামাত্রই যতখানি কষ্ট পেয়েছিল ওর দুর্ঘটনায়, ততখানিই তা রাগে পরিণত হয়৷ তাই তো সে নিশ্চুপ ছিল পুরোপুরি। ফাঁদে পা দেয়নি নাওফিলের।
-‘ছাড়ো, নাওফিল! আমি তো কথা দিয়েছি, তোমার সমস্ত শর্ত মানব। তাহলে জোরাজোরির দরকার পড়ছে কেন?’
-‘কারণ, আমার শর্তই এটা– তোমাকে আমার ঘরে আমার সঙ্গেই লিভ করতে হবে। এবং সেটা এই মুহূর্ত থেকেই।’
-‘ধরো তোমার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করলাম’, কথাটা বলে তির্যক চোখে তাকাল দীধিতি নাওফিলের চোখে। ‘তাহলে কি সাহায্য করবে না আমাকে?’
মুচকি হাসল আবারও নাওফিল। ‘উত্তরটাও তোমার জানা।’
রাগে, ক্ষোভে দীধিতির মুখভর্তি গালি জমা হলো৷ শুধু তা বেরিয়ে পড়ার সুযোগ দিলো না। নাওফিল তার মুখভঙ্গি দেখে হাসি থামিয়ে সহসা গম্ভীরতা ফিরিয়ে আনল চেহারায়। ‘দেখো, স্মরণ। আমি আমার ক্ষমতার ব্যবহার তখন করি, যখন আমার একান্ত বুদ্ধি বা শক্তি অপারগ হয়ে যায় সবখানে। চার বছর আগে আমার আজকের এই ক্ষমতাটুকু ছিল না। যা ছিল তা হলো বাপ-দাদার দাপটের বড়াই। চার বছর আগে আমি প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম, অর্থ আর ক্ষমতা যতই বাপ-দাদার থাক, তার ওপর পূর্ণ অধিকার বা নিজের মতো ব্যবহারের সুযোগটা আমি নির্দিষ্ট একটা সময়তে গিয়ে পাবো৷ যখন তখন নয়৷ সেই উপলব্ধিটা হয়েছিল তখনই, যখন তুমি আমাকে না জানিয়ে ভুল পদক্ষেপ নিলে দাদার ফাঁদে পড়ে। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন দাদা নিখুঁত কৌশলে। তোমার ভুলে তুমি সেদিন একাই তার জালে আটকাওনি, আমাকে সঙ্গে নিয়েই আটকেছিলে তুমি। তোমাকে দূরছাই করার পর যখন নিহাদের দায়িত্বে একেবারেই আমার থেকে দূরে পাঠিয়ে দিলাম, আমার তারপরের সময়গুলোর কথা তোমাকে জানতে দেওয়া হয়নি। এখনো জানানোর ইচ্ছে নেই৷ আচ্ছা ধরো, সেদিন আমার জায়গাতে তুমি আর তোমার জায়গাতে আমি’ , বাহুডোর থেকে দীধিতিকে ছেড়ে দিয়ে বসল নাওফিল। তারপর যোগ করল, ‘মাহতাব শেখের অসংখ্য মিথ্যে মামলায় আমাকে জেলে পাঠানোর বন্দোবস্ত শেষ। আমার বাকি জীবন ওই জেলেই কাটাতে হবে। সেই মুহূর্তে তুমি আমাকে বাঁচাতে সবদিক থেকে অপারগ৷ তোমার সব থেকে কাছের মানুষগুলোও তোমাকে সহযোগিতা করতে পারছে না হাজারবার চাইলেও। আর ঠিক তখনই মাহতাব শেখ তোমাকে আলটিমেটাম দিলেন, আমাকে তোমার চিরতরের জন্যই ত্যাগ করতে হবে৷ বিনিময়ে আমি জেল জীবন থেকে মুক্তি পাবো। আসামির খাতাতে আমার নামটাও মুছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কী ডিসিশন নিতে তুমি তখন?’
-‘তাই বলে কি চারটা বছরে একবারও আমার কাছে আসতে পারতে না তুমি?’ দীধিতির কান্নাস্বরে প্রশ্নটা শোনালো ফিসফিসানির মতো। স্বগতোক্তির মতো তারপর যোগ করল সে, ‘জিজ্ঞেস করলে না, তোমার জায়গায় আমাকে ভাবতে? আমি হলে চারটা বছর তোমার কাছ থেকে এভাবে দূরে থাকতে পারতাম না। কিন্তু তুমি পেরেছ। আর তাতে কী প্রমাণ করেছ জানো?’
-‘তোমাকে চিরকালের জন্যই ছেড়ে দিয়েছি? তাতে এটা প্রমাণ হয় না, বেগমজান’, সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল নাওফিল। ‘এই কথাটা তুমি বিশ্বাস করো বা না করো কিন্তু মনে রেখো, আমার আমৃত্যু তুমি কোনোদিনই আমার নজর সীমার বাইরে যেতে পারবে না৷ এই চার বছরেও পারোনি।’
-‘তাতে কী?’ ক্ষিপ্ততা একটুও কমল না দীধিতির। ‘আমি তোমার নজর সীমার মধ্যেই থাকি বা তোমার ঘরের মধ্যেই থাকি। অসংখ্য দিন তুমি দূরে সরিয়ে রেখেছ আমাকে। আর এটাই একমাত্র ফ্যাক্ট। আসলে ভালোবাসাকে তুমি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করো, নাওফিল? আজকে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব।’
-‘তা তো আমিও জানাতে চাই, সোনা।’ দীপ্ত স্বরে বলে উঠল নাওফিল। চোখে-মুখেও সেই দীপ্ততা ফুটে উঠল ওর।
দীধিতির কোনো কথাকেই যে এখন আর গুরুত্বের সঙ্গে নেবে না সে, তা বুঝতে পেরে দীধিতির মেজাজ তড়তড়িয়ে বাড়ল আরও। কিন্তু কিচ্ছুটি বলল না ওকে। চোখের পানি মুছে বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতেই আচমকা ঘর আঁধারে ডুবে গেল। ‘কী হলো?’ অবাক হয়ে বলা মাত্রই তাকে এক ঝটকায় টেনে নিজের ওপর ফেলল নাওফিল। আলো নিভে যাওয়ার ব্যাপারটা তখন বোধগম্য হলো দীধিতির। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে৷ আর ছুটে যাবার পথ নেই৷
নাওফিলের বুকের তল থেকে কতকক্ষণ মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে সে হয়রান হয়ে পড়লে নিমিষেই সংবেদনশীল স্থানে নাওফিলের গাঢ় চুমুর স্পর্শে আন্দোলিত হয়ে উঠল তার উপোসি দেহটা।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৪
দীর্ঘকাল পিপাসিত থাকা শরীরদুটো একে অপরের উষ্ণতা অনুভব করতেই রাগ, অভিমান, মনস্তাপ আজ পরাজিত হতে বাধ্য হলো জৈবিক তাড়নার কাছে। সে মুহূর্তে দীধিতি দ্বিতীয়বারের মতো আবিষ্কার করল চার বছর আগের সেই ধৈর্যশীল নাওফিলকেই। যে এতগুলো দিন পর তাকে কাছে পেতেই উন্মত্ত হয়ে ওঠার বদলে বিপরীতে সেই প্রথম রাতের মতোই ওকে নিজের কামনার চেয়েও বেশি তার প্রতি যত্নবান হতে দেখা গেল। যেন ওর দ্বারা সে কোনোভাবে যন্ত্রণাগ্রস্ত না হয়। আবার এই পুরুষকেই তার সান্নিধ্যে কখনো কখনো বন্য হয়েও উঠতে দেখেছে দীধিতি। এই মানুষটি সব সময়ই এক বহুরূপী পুরুষ যেন।
