Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৭

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৭

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৭
সাবিলা সাবি

এল্ড্র রাজ্যের আকাশে লাল আগুনের রেখা টেনে ঝড়ের মতো নেমে এলো এক বিশাল ড্রাগন— লাল-সোনালি আঁশে মোড়া,আগুনের শিখার মতো জ্বলজ্বলে ডানা,চোখে দপদপে শিখার প্রতিচ্ছবি।
লিউ ঝান!সে এখন লাল সোনালী ড্রাগনে পরিনত হয়েছে।
তার অবতরণে পুরো প্রাসাদপ্রাঙ্গন কেঁপে উঠল।বাতাসে আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল,পাথরের মেঝে ফাটতে শুরু করল তার থাবার আঘা*তে। পাহারায় থাকা ড্রাগন গার্ডরা মুহূর্তেই অ*স্ত্র ধরে নিল। এল্ড্র রাজ্যে অনধিকার প্রবেশ? অসম্ভব!

“কে সেখানে?” বিশাল এক ড্রাগনগার্ড গর্জন করল।
কিন্তু উত্তর দেবার প্রয়োজন ছিল না। লিউ ঝানের শরীর থেকে প্রচণ্ড শক্তির তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল,তার লাল-সোনালি আঁশে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে যেন আগুনের ঝলকানি তুলল।এক সেকেন্ড অপেক্ষা করল সে,তারপর তীব্র গতিতে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মহাকাব্যিক লড়াই শুরু হলো!
গার্ডরা লম্বা বর্শা আর শক্তিশালী শিকল দিয়ে তাকে থামাতে চেষ্টা করল। কিন্তু লিউ ঝান?সে তো আগুনের রাজা! এক ঝটকায় শিকল ভেঙে ফেলে সে আগুনের নিঃশ্বাস ছাড়ল, মুহূর্তেই গার্ডদের অ*স্ত্র আগুনে গলে যেতে লাগল।
একজন গার্ড তার ডানার ওপর লাফ দিল,কিন্তু লিউ ঝান ধৈর্য হারালো না।এক তীব্র মোচড়ে গার্ডটিকে আকাশে ছুড়ে ফেলল,আরেকজনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার লম্বা লেজের আঘাতে দূরে ছিটকে দিল।
এক মুহূর্তের মধ্যেই সব ড্রাগনগার্ড নিস্তেজ হয়ে পড়ল।
শ্বাস নিল লিউ ঝান।চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গার্ডদের দেখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
“এখন,” সে গম্ভীর স্বরে ফিসফিস করল, “রাজপ্রাসাদের দরজা খুলবে।”
সে একধাপ এগিয়ে গেল।বিশাল সোনালি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
তখনই!
একটি শীতল স্পর্শ পড়ল তার কাঁধে।
তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল লিউ ঝান—
এথিরিয়ন!
এল্ড্র রাজ্যের রাজপরিবারের রক্ত বইছে যার শরীরে, নীল ড্রাগন, রহস্যময় ও অপ্রতিরোধ্য।
সে দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে,চোখে গভীরতা আর ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি।

“অনধিকার প্রবেশ, মিস্টার লিউ ঝান?” এথিরিয়নের স্বর ছিল শান্ত, অথচ তাতে বিদ্যুৎ খেলা করছিল।
লিউ ঝান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, তার আগুনের চোখ এথিরিয়নের ঠান্ডা দৃষ্টির সঙ্গে মিলল।
এই মুহূর্তে, যুদ্ধ শুরু হতে পারে। অথবা— কিছু আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে সামনের দিকে।
লিউ ঝান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে প্রস্তুত ছিল না এই মুহূর্তে এথিরিয়নের সামনে পড়তে।
এথিরিয়ন!
আকাশের রঙ মেখে আসা চোখের মনির অধিকারী ড্রাগন, যার চোখের গভীরতা রাতের তারার মতো,যার উপস্থিতি সবসময়ই এক ধরণের শীতল অথচ চঞ্চল শক্তির ইঙ্গিত বহন করে। জ্যাসপারের ছোট ভাই, তবে স্বভাব পুরোপুরি আলাদা।
এথিরিয়নের পোশাক থেকে এখনো পৃথিবীর গন্ধ আসছিল— হয়তো কয়েক ঘণ্টা আগেই সে পৃথিবী থেকে ফিরেছে।
“এখানে কি করতে এসেছো লিউ ঝান?”
এথিরিয়নের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি খেলল, কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তাতে বিদ্রূপ লুকানো ছিল না।
লিউ ঝান এক পা পেছনে সরলো না। তার গায়ের আগুনে আঁশ চকচক করছিল, চোখ জ্বলছিল আগ্রহে।

“সরে দাঁড়াও, এথিরিয়ন,” গর্জে উঠল সে, “আমার কাজ শেষ করেই ফিরব।”
এথিরিয়ন তার ডানা মেলে দিল, যেন পুরো দরজাটা ঢেকে দিল নিজের অস্তিত্ব দিয়ে।
“যু*দ্ধের জন্য এসেছো?” তার কণ্ঠস্বরে একটা খেলো ভাব, কিন্তু চোখে তীক্ষ্ণ চাহনি। “আমার ভাইকে আটকাতে পারো নি,আর এখন এল্ড্র প্রাসাদে তাণ্ডব চালাতে এসেছো? বাহ, বেশ মজার দিন যাচ্ছে, তাই না?”
লিউ ঝানের গর্জন বেরিয়ে আসছিল প্রায়, কিন্তু সে নিজেকে সংযত করল।
“আমি এখানে তাণ্ডব চালাতে আসিনি।”
“তাহলে?”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর লিউ ঝান এগিয়ে এল, চোখে দুর্নিবার সংকল্প।
“আমি ফিওনাকে খুঁজতে এসেছি।”
লিউ ঝান এবার সত্যিই ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। তার লাল-সোনালি আঁশ রোদের আলোয় চকচক করছিল, আর চোখ দুটো যেন খাঁটি আগুনের শিখা হয়ে জ্বলছিল।
“ফিওনা কোথায়?” লিউ ঝান সরাসরি প্রশ্ন করলো।
এথিরিয়ন ঠোঁটের কোণে হাসল,যেন পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে মজার কোনো খেলা।
“তুমি কী মনে করো, লিউ ঝান?” তার কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপের ছোঁয়া, “জ্যাসু ভাইয়া কি এতই বোকা যে ফিওনাকে এখানে এনে রাখবে?”
লিউ ঝানের মুষ্টি শক্ত হয়ে উঠল। তার ড্রাগন রূপের শক্তি যেন রক্তের মধ্যে আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছিল।
“তাহলে কোথায়?”
এথিরিয়ন এবার সত্যিই হেসে ফেলল।

“নিজেই খুঁজে বের করো, সেনাপতি,” সে এক পা পেছনে সরল, তার নীল রঙের ডানা ছড়িয়ে দিল বাতাসে। “কিন্তু সাবধান,ভাইয়া যা করছে, সেটা তুমি হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না।”
লিউ ঝানের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। এই ছেলেটা সব জানে, কিন্তু ইচ্ছা করেই কিছু বলছে না।
“তাহলে আমাকে বাধা দিতে এসেছো?”
এথিরিয়নের চোখ এবার কঠিন হলো।
“আমি তোমাকে সতর্ক করছি, লিউ ঝান। যা করতে চাচ্ছো, সেটা ভেবেচিন্তে করো। নাহলে শেষ পর্যন্ত আফসোস করবে।”
লিউ ঝান আর অপেক্ষা করল না মানব রুপ ধরে‌,সে এক ঝটকায় এথিরিয়নের পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই, এথিরিয়নের হাত বাড়িয়ে দিল, বাতাস কাঁপিয়ে এক বিশাল শক্তির ঢেউ সৃষ্টি করল, যা লিউ ঝানকে এক ধাক্কায় কয়েক পা পিছিয়ে দিল!
“হুম,” এথিরিয়ন ধীর কণ্ঠে বলল, “তুমি হয়তো প্রবেশ করতে পারবে… যদি পারো।”
এবার লিউ ঝানের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
“তাহলে দেখা যাক, কে কাকে আটকাতে পারে!”
প্রাসাদের দরজার সামনে, দুই ড্রাগনের শক্তি মুখোমুখি হলো। বাতাসে টান টান উত্তেজনা। এক ভয়ংকর যুদ্ধ আসন্ন…

চারপাশে ধূলোর ঝড় উঠেছিল। লিউ ঝান আর এথিরিয়ন পরস্পরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে মারল। দুজনই মানবরূপে, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান, যেন এক মুহূর্ত পরই বিস্ফোরণ ঘটবে।
লিউ ঝান প্রথমে আঘাত হানল। বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে এক তীব্র ঘুষি ছুড়ল এথিরিয়নের মুখের দিকে। এথিরিয়ন সাথে সাথে নড়ল, তার নীল রঙের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে ঝটকা মেরে লিউ ঝানের হাত ধরে ফেলল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই লিউ ঝান শরীর ঘুরিয়ে এথিরিয়নের বুকে হাঁটু তুলে দিল!
ধড়াম!
এথিরিয়ন কিছুটা পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা চ্যালেঞ্জিং হাসি ফুটে উঠল।
“হাহ! এত সহজে ভেবেছিলে ফেলে দেবে?”
লিউ ঝান দাঁত কামড়ে বলল, “তোমার সঙ্গে মজা করার সময় নেই, এথিরিয়ন। ফিওনাকে খুঁজে বের করতেই এসেছি!”
এথিরিয়ন এবার সত্যিই রেগে গেল। এক মুহূর্তে তার শরীর থেকে নীলাভ শক্তি বেরিয়ে এল, বাতাস কাঁপিয়ে দিল। “তাহলে আমাকে ফেলে এগিয়ে যাও!”
এবার সত্যিকারের যুদ্ধ শুরু হলো। দুজনের আঘাত আর প্রতিআঘাতে বাতাস ফেটে যাচ্ছিল। চারপাশের মাটি ধ্বংস হতে লাগল। এথিরিয়নের গতি ছিল দ্রুত, সে একের পর এক লিউ ঝানের আক্রমণ এড়িয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু লিউ ঝান ছিল তীব্র, তার একেকটি ঘুষি শিলা ভেঙে ফেলতে সক্ষম।
ঠিক তখনই আকাশ থেকে তীব্র গর্জন শোনা গেল।

কিছুক্ষণ পর,আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো থারিনিয়াস, আলবিরা, আর অ্যাকুয়ারা।
লিউ ঝান একা দাঁড়িয়ে ছিল, তার লাল সোনালী ড্রাগনের গাঢ় উপস্থিতি চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলছিল। এই শক্তিশালী রূপের সঙ্গে তার চোখের আগুন যেন পরিবেশের প্রতিটি কণাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। এথিরিয়ন, আলবিরা, থারিনিয়াস, এবং অ্যাকুয়ারা একত্রে ছিল, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আর সহানুভূতির শক্তিশালী বন্ধন। তারা জানত, লিউ ঝান কতোটা বিপজ্জনক ড্রাগনে পরিনত হয়েছে ,কিন্তু তাদের ঐক্যই তাদের শক্তি।
লিউ ঝান গভীরভাবে নিশ্বাস নিয়ে বললো, “তোমাদের সাথে লড়াই করে আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি জানি ফিওনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।” তার কণ্ঠস্বর ছিল তীব্র ও সংকটময়, যেন প্রত্যেক শব্দের পেছনে ভয়ের ছায়া খেলা করছিল।
এক মুহূর্তে, সে মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালো, যেন নিজের শক্তি আর গৌরবের স্মৃতি তার হৃদয়ে উদয় হচ্ছিল। তারপর সে তার ড্রাগন পাখা মেলে উড়াল দিলো, বাতাসে শক্তির ঝড় তুলে।
এথিরিয়ন ও তার সঙ্গীরা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, তাদের মনে প্রশ্ন উদয় হলো—ফিওনা জ্যাসপারের জন্য কি তারা যথেষ্ট শক্তিশালী? লিউ ঝানের চলে যাওয়ার পর, তাদের মধ্যে এক চাপা উদ্বেগ তৈরি হলো। তারা জানতো, লড়াই এখনও শুরু হয়নি।

হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে নামল এক বিশাল মহাসমুদ্রের পাশের নির্জন এক পাহাড়ে। বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ, ঢেউয়ের গর্জন আর আকাশের নীলাভ ছায়া মিলেমিশে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছিল। ফিওনা বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখল—শুধু পাহাড় আর পাহাড়, যেন সভ্যতার ছোঁয়া নেই কোথাও।
এখানে কেনো থামল জ্যাসপার? তার কোনো পরিকল্পনা কি আছে?
তার ভাবনার মাঝেই জ্যাসপার হেলিকপ্টার থেকে নেমে এল, পাহাড়ের শক্ত জমিতে পা রেখে এক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকাল। তারপর সে ফিওনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
ফিওনা দ্বিধা করল, কিন্তু হাতটা ধরলো না।তার ভারী গাউন সামলাতে সামলাতে নিজেই এক লাফে নামতে গেল—ওমনি হোঁচট খেলো! ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাবার আগেই জ্যাসপার বিদ্যুৎগতিতে তাকে আঁকড়ে ধরল।
ফিওনার নিঃশ্বাস আটকে গেল। তার হাত শক্তভাবে চেপে আছে জ্যাসপারের উষ্ণ হাতে, আর চোখ তুলে দেখল সেই তীক্ষ্ণ, গভীর চোখ—যেখানে এক ভয়ংকর অথচ অদ্ভুত টান লুকিয়ে ছিল।
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে একটুকরো বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “এখনো বোঝোনি, হামিংবার্ড? আমার হাত ধরে থাকলে কখনোই পড়বে না।”
ফিওনা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ বাদে নিজকে ধীরে ধীরে সামলে নিলো।পাহাড়ি বাতাস তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল,আর তার সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল জ্যাসপার।চোখেমুখে ছিল সেই চিরচেনা ঠান্ডা অভিব্যক্তি, যেন সবকিছু আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল।

“বাকিটা পথ ড্রাগন রূপে যেতে হবে,” বলল জ্যাসপার শান্ত কণ্ঠে। “আমি ড্রাগন রূপ নিচ্ছি, তুমি আমার পিঠে উঠো।”
ফিওনা অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল। “কেন? আমি নিজেই তো ড্রাগন! আমার কেন আপনার পিঠে চড়তে হবে? দরকার হলে আমি নিজেই ড্রাগন রূপ নেব!”
তার কণ্ঠে ছিল অদৃশ্য এক জেদ।সে এত সহজে কারও ওপর নির্ভরশীল হবে না,বিশেষ করে জ্যাসপারের মতো এক কর্তৃত্ববাদী ড্রাগনের ওপর তো নয়ই!
সে গভীর শ্বাস নিল,নিজের ভেতরের শক্তি আহ্বান করল, তারপর ড্রাগন রূপ নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু…
কিছুই হলো না।
তার শরীর আগের মতোই রয়ে গেল।কোনো পরিবর্তন নেই, কোনো সাড়া নেই।যেন তার ড্রাগন রূপটাই হারিয়ে গেছে!
ফিওনার কপালে ভাঁজ পড়ল।তার ভিতরটা শঙ্কায় কেঁপে উঠল।
“এটা… এটা কী হচ্ছে?”
জ্যাসপার ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একপাশে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। “তুমি ড্রাগন রূপ নিতে পারবে না,যতদিন আমরা ভেনাসে না ফিরছি।”
ফিওনার বুক ধক করে উঠল। “আপনি… আপনি আমার সাথে কী করেছেন?”
জ্যাসপার ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো, তার চোখ দুটো রহস্যে মোড়া, গভীর, অথচ ভয়ংকর।

“তোমাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছি, হামিংবার্ড,” সে ফিসফিস করে বলল, “এখন তুমি আমার হাতে ব*ন্দী।”
ফিওনা হতবাক হয়ে জ্যাসপারের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“আপনি আমার সাথে কী করেছেন?” পুনরায় চেঁচিয়ে বললোতার কণ্ঠ কাঁপছিল,যেন ভয় আর রাগ একসাথে গলায় দলা পাকিয়ে আটকে গেছে।
জ্যাসপার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললো, “আমি তোমার শরীরে D-Serum 17X ইনজেকশন দিয়েছি, হামিংবার্ড।”
ফিওনার চোখ বিস্ফারিত হলো। “ডি-সিরাম? এটা কী?”
“এটা এমন এক রাসায়নিক যা তোমার ড্রাগন রূপ নেওয়ার ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দমন করে দেবে।” জ্যাসপার হালকা শ্বাস ফেললো, যেন বিষয়টা তার কাছে তুচ্ছ, কিন্তু ফিওনার কাছে—এ যেন তার অস্তিত্বের এক অংশ কেড়ে নেওয়া হলো।
“কিন্তু কেন?” ফিওনা ব্যাকুল হয়ে বললো, তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট।
“কারণ আমি চাই না তুমি আমার হাত থেকে পালানোর সুযোগ পাও কোনোভাবেই।”
ফিওনা বুঝতে পারছিলো, তার শরীর ভেতর থেকে শীতল হয়ে আসছে। সে কিছুক্ষণ আগেও অনুভব করেছিলো, তার ভেতরে একপ্রকার শক্তি ছিল, যেন সে যেকোনো মুহূর্তে ড্রাগন রূপ ধারণ করতে পারতো। কিন্তু এখন? কিছুই নেই।

“আপনি এটা করতে পারেন না!”
জ্যাসপার এবার সামান্য হেসে বললো, “যদি তুমি জন্মগতভাবে সম্পূর্ণ শুদ্ধ রক্তের ড্রাগন হতে,তাহলে এই সিরাম তোমার শরীরে কাজ করতো না। কিন্তু তুমি তো অর্ধেক মানবী।তোমার রক্তের একটা অংশ এখনো দুর্বল,মানবীয়।এজন্যই এটা তোমার কোষীয় স্তরে প্রবেশ করতে পেরেছে।”
(D-Serum 17X মূলত এমন একটি রাসায়নিক যৌগ, যা একটি বিশেষ নিউরোটক্সিন এবং কোষ-পরিবর্তনকারী উপাদান নিয়ে তৈরি। এটি শরীরে প্রবেশ করলে ড্রাগনদের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শক্তি-চ্যানেলগুলো সাময়িকভাবে ব্লক করে দেয়।
যেহেতু ফিওনার শরীরে মানবীয় কোষও আছে, তার শরীর এই সিরামের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই, তার কোষীয় স্তরে থাকা ড্রাগন রূপান্তর জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
এটি বিশেষভাবে নিউরোট্রান্সমিশন ব্লক করে, যার ফলে তার মস্তিষ্ক ড্রাগন রূপ নেওয়ার সংকেত পাঠাতে পারে না।

এই প্রভাব স্থায়ী নয়, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিরোধক ওষুধ (Antidote) না নেওয়া হবে, ততক্ষণ সে ড্রাগন রূপ নিতে পারবে না।)
ফিওনা মনে মনে উপলব্ধি করলো,তার শরীর যেন সত্যিই ভারী হয়ে গেছে।শক্তির স্রোত,যা তার রক্তে প্রবাহিত হচ্ছিল, সেটাই থমকে গেছে। যেন তার ভেতরের ড্রাগন অংশটা ঘুমিয়ে পড়েছে,অথবা খাঁচাবন্দী হয়ে গেছে।
জ্যাসপার এক ধাপ এগিয়ে এলো। “এটার প্রতিষেধক একমাত্র ভেনাসে আছে। যদি তুমি আবার ড্রাগন রূপ নিতে চাও, তাহলে ভেনাসে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”
ফিওনা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হলো। “আপনি আমাকে ব*ন্দী করতে চাইছেন?”
জ্যাসপার এবার একদম ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললো, “আমি কেবল নিশ্চিত করছি যে তুমি যেখানে থাকা উচিত, সেখানেই থাকবে।”

ফিওনার বিস্ময়ের সীমানা যেন লঙ্ঘন করছিলো। অবশেষে জ্যাসপার ড্রাগন রুপ ধরলো আর ফিওনা পিঠে চড়ে বসতে বাধ্য হলো।
জ্যাসপারের পিঠে চড়ে মহাসমুদ্রের ওপরে উড়ে আসার অভিজ্ঞতা তাকে শিহরিত করেছিল,আবার একই সাথে এক ধরনের অজানা শঙ্কায় আচ্ছন্ন করেছিল।বাতাসের স্রোত তাদের চারপাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে বয়ে যাচ্ছিল,নিচে কেবল অসীম নীল জলরাশি,তার ওপরে কালো মেঘের ছায়া। ফিওনার মনে হলো,তারা যেন এক নতুন জগতের দিকে এগিয়ে চলেছে—একটি অজানা, রহস্যময় জগতে।
হঠাৎ জ্যাসপার নিচের দিকে ঝাঁপ দিলো।
ফিওনা চমকে উঠলো। “আপনি কি করছেন?”
কিন্তু জ্যাসপার কোনো উত্তর দিলো না। এক মুহূর্তের মধ্যেই তারা মাটি স্পর্শ করলো।
ফিওনা ধীরে ধীরে নামলো, চারপাশের দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। আশেপাশে পাহাড়ের মতো কিছুই নেই, শুধু বিশাল ফাঁকা ভূমি, চারদিকে নীরবতা।
“এটা কোথায়?” ফিওনা সন্দিহান কণ্ঠে বললো। “এখানে তো কোনো পাহাড় নেই, আশেপাশে কিছুই নেই! তাহলে কেনো এনেছেন আমাকে?”

জ্যাসপার কিছু বললো না। হঠাৎ সে এগিয়ে এলো এবং তার হাত দিয়ে ফিওনার চোখ ঢেকে দিলো।
“আপনি এটা কেনো করছেন?”
“শান্ত থাকো, হামিংবার্ড। আর বিশ্বাস রাখো,” জ্যাসপার ঠাণ্ডা গলায় বললো।
ফিওনা বাধ্য হলো চোখ বন্ধ রাখতে। জ্যাসপার তার হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো, অনেকটা পথ পেরিয়ে নিয়ে গেলো। ফিওনা অনুভব করলো, তারা যেনো মাটির নিচে প্রবেশ করছে, হালকা বাতাসের পরিবর্তে আশেপাশে অদ্ভুত শীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে।
অবশেষে, জ্যাসপার তার হাত সরিয়ে নিলো।
ফিওনা ধীরে ধীরে চোখ খুললো—এবং হতভম্ব হয়ে গেলো।
তার সামনে ভেসে উঠলো এক বিশাল প্রাসাদ।

কিন্তু এটি কোনো সাধারণ প্রাসাদ ছিল না। এর দেয়াল স্বচ্ছ, যেনো কাঁচের মতো, কিন্তু কাচ নয়। এর প্রতিটি স্তম্ভ নীলাভ আভা ছড়াচ্ছে, আর দরজাগুলো কালো পাথরে খোদাই করা, যেখানে অদ্ভুত সব নকশা খচিত। উপরে আকাশের দিকে তাকাতেই ফিওনার মনে হলো, এই জায়গাটা কোনো সাধারণ স্থানের অংশ নয়—এটা যেন এক পরাবাস্তব জগত, যেখানে সময়ের হিসেব নেই, বাস্তবতা মিশে গেছে অলৌকিকতার সাথে।
“এটা… এটা কোথায়?” ফিওনার কণ্ঠে বিস্ময়ের সাথে ভয় মিশে গেলো।
জ্যাসপার তার পাশ দিয়ে এগিয়ে এসে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো, “এটা তোমার জন্য, হামিংবার্ড।আমাদের বিয়ে উপলক্ষে তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে উপহার।”
ফিওনা থমকে দাঁড়ালো। তার হৃদয় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো। “আমার জন্য?” সে ফিসফিস করে বললো।

জ্যাসপার মাথা ঝাঁকালো। “যখন আমি ভেনাসে ছিলাম, তখন থেকেই আমি এই জায়গাটার পরিকল্পনা করছিলাম। আমি জানতাম, একদিন তুমি আমার হবে, আর আমাদের একটা জায়গা দরকার হবে যেখানে কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না, কেউ আমাদের সম্পর্কে জানবেও না। শুধু তুমি আর আমি।”
ফিওনার দৃষ্টি ধীরে ধীরে প্রাসাদের দিকে গেলো। এই অদ্ভুত, রহস্যময়, অথচ অভিজাত স্থাপত্যকীর্তি… কেবল তার জন্য তৈরি করা হয়েছে?
“আপনি এতদিন ধরে এটা তৈরি করেছেন?” ফিওনার গলা কাঁপলো।
জ্যাসপার হাসলো, সেই গা ছমছমে অথচ গভীর হাসি। “আমার ভেনাস রাজ্য থেকে দূরে,পৃথিবীর এই নির্জন কোণে, আমাদের একান্ত জায়গা।যেখানে কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
ফিওনার মনে হলো, সে যেন এক স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এত ভয়ংকর এক ড্রাগন… এত নিষ্ঠুর… অথচ এত যত্ন নিয়ে, এতটা পরিকল্পনা করে, তার জন্য এই স্থান তৈরি করেছে?
সে কিছু বলতে পারলো না, শুধু দাঁড়িয়ে রইলো, বিস্মিত, হতবাক।
ফিওনা স্থির দাঁড়িয়ে রইলো,তার দৃষ্টি সেই বিশাল প্রাসাদের ওপর আটকে গেলেও হৃদয়ের গভীরে কোনো প্রশান্তি আসলো না।এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো,সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে—একটা রাজকীয় উপহার,একান্তে থাকার এক আশ্রয়।কিন্তু পরক্ষণেই তার বুকের মধ্যে একধরনের বিদ্রোহী আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো।

“এটা তোমার জন্য,” জ্যাসপার বলেছিলো। “আমাদের বিয়েতে আমার পক্ষ থেকে উপহার।”
কিন্তু ফিওনার মনে হলো,এই উপহার ভালোবাসার কোনো প্রতীক নয়—বরং শেকলের আরেকটা রূপ।এই বাড়ির প্রতিটা ইট যেন তাকে বন্দি করার জন্য গাঁথা হয়েছে।
তার কণ্ঠ হিমশীতল হয়ে উঠলো। “আপনি কি সত্যিই ভাবছেন,একটা রাজপ্রাসাদ আমাকে খুশি করবে?”
জ্যাসপার একটু চমকালো, তারপর ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো। “তোমার পছন্দ হবে জানতাম,তবে তুমি এতটা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে ভাবিনি।”
ফিওনার চোখে আগুন। “আপনি আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছেন, প্রিন্স!আমি আপনার কোনো পুতুল নই, যে আপনি যেখানে খুশি নিয়ে যাবেন, আপনার ইচ্ছেমতো আটকে রাখবেন!”
জ্যাসপারের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো, কিন্তু চোখে একধরনের শীতলতা খেলে গেলো। “তোমার স্বাধীনতা?” সে আস্তে আস্তে বললো। “তুমি কি সত্যিই স্বাধীন ছিলে, হামিংবার্ড? তোমার গ্ৰান্ডপা তোমাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতো,তোমার জীবন কীভাবে চলবে সেটা তিনিই ঠিক করতেন।আর এখন,তুমি আমার। আমি তোমাকে রক্ষা করছি,কারণ এই মহাবিশ্ব তোমার জন্য নিরাপদ নয়।”
ফিওনার দৃষ্টি কুঁচকে গেলো। সে জ্যাসপারের চোখে গভীরভাবে তাকালো। “আপনি রক্ষা করার নামে আমার ইচ্ছেকে ধ্বংস করছেন।ভালোবাসা কি এমন হয়,যেখানে শুধু একজনের ইচ্ছাই চলবে?”
জ্যাসপার চুপ করে গেলো।

ফিওনার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো। এই বিশাল প্রাসাদ, এই পাহাড়ের মাঝে নির্জন আশ্রয়—সবকিছুই আসলে তার জন্য একটা কারাগার।চকচকে সোনার খাঁচা,যেখানে তাকে বন্দি করে রাখা হবে,যতদিন না সে জ্যাসপারকে স্বীকার করে নেয়।
কিন্তু সে জানতো,সে সহজে হার মানবে না।
জ্যাসপার ফিওনাকে নিয়ে যে জায়গায় এসেছে, সেটি পৃথিবীর মানচিত্রে নেই। অরুণশিখর, একটি রহস্যময় দ্বীপ-পাহাড়, যা সুনিরব মহাসমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত। এটি এমন এক স্থান, যেখানে সাধারণ মানুষ পৌঁছাতে পারে না। প্রকৃতির এক অকল্পনীয় বিস্ময়, চারদিক ঘন কুয়াশায় ঘেরা, দিনের আলো এখানে সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়, আর রাতের বেলা আকাশে নক্ষত্রেরা এত কাছাকাছি ঝলসে ওঠে যে মনে হয়, হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে।

প্রাসাদের নাম: অরুণমণি প্রাসাদ (Arunmoni Palace)
বিশাল পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক আশ্চর্য প্রাসাদ—অরুণমণি প্রাসাদ। আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রাচীন শিল্পকলা মিলে এক স্বর্গীয় সৃষ্টি তৈরি করেছে।
এটি এক বিশাল, আধুনিক এবং রহস্যময় স্থাপনা। এর পুরো গঠন কাঁচের মতো স্বচ্ছ,কিন্তু তা আবার মজবুত ড্রাগনীয় ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি, যা ভেনাসের বিশেষ খনিজ থেকে গড়া। দিনভর সূর্যালোক যখন এটির ওপর পড়ে, তখন তা স্বর্ণাভ আভা ছড়ায়, আর রাতের বেলা এটি চাঁদের আলো শোষণ করে এক স্বপ্নিল নীল আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
প্রাসাদের প্রবেশপথ এক বিশাল গ্লাস ব্রিজ, যা পাহাড়ের শীর্ষ থেকে নেমে এসেছে। দুই পাশে ছোট ছোট ঝর্ণা, যেখান থেকে ক্রিস্টাল স্বচ্ছ পানি নেমে আসছে, আর আলোয় তা রঙিন রূপ ধারণ করছে। বিশাল দরজা, যা একবার খুললেই যেন এক নতুন জগতে প্রবেশ করা যায়।
ভেতরে ঢুকতেই এক বিস্ময় অপেক্ষা করছে—একটা বিশাল হলরুম, যার ছাদ পুরোপুরি স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি। উপরে তাকালে মনে হয়, পুরো আকাশটাই যেন প্রাসাদের অংশ হয়ে গেছে। নক্ষত্রেরা এখানে আরও উজ্জ্বল হয়ে ঝলসে উঠছে।

বিশাল বিশাল জানালা, যেখানে কাচের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে স্বচ্ছ এনার্জি শিল্ড, যা বাইরে থেকে হীরকের মতো ঝলমল করে।
প্রাসাদের একপাশে রয়েছে ভাসমান বাগান, যেখানে অদ্ভুত সব ফুল ফুটে আছে—যেগুলো পৃথিবীতে দেখা যায় না। তারা নিজেই আলো ছড়ায়, বাতাসে ভাসে, যেন তারা জীবন্ত কোনো তারা।
বিশেষ স্পর্শ সেন্সর দেওয়ালে লাগানো, যেখানে হাত রাখলেই দরজা খুলে যাবে, বা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে টেলিপোর্ট করা সম্ভব।
প্রাসাদের নিচে রয়েছে এক গোপন গবেষণাগার, যেখানে ভেনাসের উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে।এটি কেবল থাকার জন্য নয়, এটি এমন এক আশ্রয়স্থল, যা পৃথিবীর সকল ঝামেলা থেকে দূরে, যেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না, যেখানে কেউ জানবেও না যে এখানে কেউ বাস করছে। জ্যাসপার এই প্রাসাদটি তৈরি করেছে একমাত্র ফিওনার জন্য, যেন তারা এখানে একান্তে থাকতে পারে, পৃথিবীর সকল কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।

কিন্তু…
ফিওনার জন্য এটি যেন একটি সোনার খাঁচা। এক নিঃশ্বাসে সে চারপাশ দেখলো, চোখের সামনে স্বপ্নের মতো এক সৌন্দর্য, অথচ তার হৃদয়ের ভেতরটা এক অসম্ভব ভারে চেপে বসেছে। এই প্রাসাদ তার জন্য স্বাধীনতার প্রতীক নয়, বরং বন্দিত্বের আরেক রূপ।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে ফিওনার চোখ কপালে উঠে গেল। বাইরের নান্দনিকতা যেমন মন্ত্রমুগ্ধকর ছিল, ভেতরের সৌন্দর্য তার থেকেও অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। প্রতিটি কোণে ছিল অসাধারণ শিল্পকর্ম এবং রঙিন আলোকসজ্জা, যা ঘরকে যেন এক মহামায়ার মতো রূপায়িত করেছে। ফিওনা অবাক হয়ে সেখানকার অপার দৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করছিল, কিন্তু সে তার আবেগ মুখে প্রকাশ করতে চাইল না।
জ্যাসপার তাকে একটি বিশেষ কক্ষে নিয়ে গেল, যেখানে তারা একসাথে থাকবে। কক্ষটির ভেতরে ঢুকতেই ফিওনার মনে এক নতুন বিস্ময়ের আবির্ভাব হলো। দেয়াল জুড়ে ছিল বড় বড় ফ্রেমে বাঁধা তার কিছু ছবি, যা একবারে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

কিন্তু ছবিগুলো দেখে ফিওনা কিছুতেই চিনতে পারছিল না। এই মুহূর্তগুলো সে কি করে ধারণ করল, তা স্মরণে আনতে পারছিল না। ছবিগুলো অদ্ভুতভাবে পরিচিত, অথচ স্মৃতির গভীরে কোথাও লুকিয়ে থাকা, অপরিচিত এক জীবনের দৃষ্টি। সে চিন্তায় ডুব দিলো—এগুলো কবে তোলা হয়েছে?
প্রতিটা ছবির মাঝে লুকিয়ে আছে তার এমন মুহূর্ত, যা তার নিজেরও মনে নেই। এগুলো কবে তোলা হলো? কীভাবে? তার চোখ ছুঁয়ে গেল এক ফ্রেমে বাঁধানো ছবি—গ্লাস হাউজের ছাদে পানির টেপ ভুলে ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া এক মুহূর্ত,আরেকটায় দোলনায় বসে অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা,কোথাও বা ঘুমন্ত অবস্থায় চাদরের নিচে মুখ লুকিয়ে রাখা এক শান্ত ছবি। কিচেনে কফি তৈরির করার সময় ছবি।
ফিওনা ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—এসব ছবি সে তোলেনি, এগুলো তুলেছে জ্যাসপার!
জ্যাসপার মুচকি হেসে বলল, “এটা আমার বিশেষ ক্যামেরার কাজ, ফিওনা। তুমি জানো না, কিন্তু আমি তোমার প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রেখেছি।”

ফিওনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। “কোন ক্যামেরা? আমি তো কখনো দেখিনি!”
জ্যাসপার ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে পাশের ছোট টেবিল থেকে এক যন্ত্র তুলে ধরল। এটি দেখতে আধুনিক কোনো ক্যামেরার মতো, তবে অনেক বেশি অদ্ভুত এবং জটিল। ক্যামেরার গায়ে জ্বলজ্বল করছে নীলচে-রূপালী শক্তির তরঙ্গ।
জ্যাসপার এই বিশেষ ক্যামেরাটি নিজেই তৈরি করেছে, যা ভেনাসের উন্নত প্রযুক্তির সংমিশ্রণে বানানো। এটি শুধুমাত্র সাধারণ ছবি তোলে না, বরং মুহূর্তের স্মৃতি ধরে রাখে, অনুভূতি বোঝে, এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবিগুলো প্রিন্ট করতে পারে।
ফিওনা ধীরে ধীরে ক্যামেরাটি হাতে নিলো। তার মনে হচ্ছিল, জ্যাসপার যেন তার আত্মার প্রতিটি কোণায় ঢুকে গেছে, তার প্রতিটি হাসি, তার প্রতিটি নিঃশ্বাস, এমনকি তার ঘুমন্ত অবস্থার নিষ্পাপ মুহূর্তও সে ধরে রেখেছে।
কিন্তু ফিওনার কাছে এটি কেবল বিস্ময়কর প্রযুক্তি নয়, বরং স্বাধীনতার আরেকটা হারানোর প্রতীক। এই ক্যামেরা তার স্মৃতিগুলো চুরি করেছে, তাকে না জানিয়েই। তার সমস্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত এখন জ্যাসপারের চোখে বন্দী।

সে ধীরে ধীরে ক্যামেরাটা টেবিলে রেখে দিলো, চোখের ভাষা কঠিন হয়ে উঠলো।ফিওনার কণ্ঠে একটি চরম তিক্ততা ছিল, যা তার ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ করছিল। সে জ্যাসপারের দিকে রুক্ষ চোখে তাকিয়ে বললো, “এসব করে কি প্রমাণ করছেন? আপনি কি মনে করেন, এই সব ছবি দেখে আমি আপনার ভালোবাসা অনুভব করবো? আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না। আপনার এই সব কিছুর মাঝেও আমার মন গলবে না।”
তার কথাগুলো যেন কাঁপন তুলে দিল ঘরজুড়ে। ফিওনার দৃষ্টি ছিল স্থির, কিন্তু তার অন্তরে এক ঝড়ের আবহাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। জ্যাসপার তাকে কীভাবে ব/ন্দী করেছে, সে বুঝতে পারছিল।
জ্যাসপার তখন কিছু বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, কিন্তু ফিওনা তার আগে বলে উঠলো, “আপনার ভালোবাসা কি এত সহজে কেনা যায়? আমি যেন আপনার পুতুল। ছবি, বাড়ি—এগুলো তো আমার অনুভূতির কোনো মূল্য দেয় না। ভালোবাসা তো কিছু অনুভূতি, কিছু বিশ্বাসের ব্যাপার, যা আপনি আমার ওপর জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন।”

ফিওনার চোখে দৃঢ়তা ছিল, আর জ্যাসপারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল যেন। “আমি চাই না এসব আধুনিক জিনিসে আমার জীবন কাটুক। আমি আমার স্বাধীনতা চাই, আমার মনকে উড়তে দিতে চাই। আর আপনার ভালোবাসা যদি সত্যিই থাকে, তবে সেটা অবশ্যই সম্মানের সঙ্গে আসবে, না যে আমাকে বন্দী করে।”
ফিওনার এই তীব্র কথাগুলো যেন একটি তীরের মতো জ্যাসপারের হৃদয়ে আঘাত হানল। সে বুঝতে পারছিল, ফিওনার মন জয় করতে হলে তাকে আরও অনেক কঠোর কিছু করতে হবে—যা তাকে এক নতুন পথে নিয়ে যাবে।
জ্যাসপার হঠাৎ করে পেছন থেকে ফিওনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল,যেন তাকে থামাতে চাইছে।কিন্তু ফিওনার শরীরের ওপর তার চাপ যেন অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছিল,আর সে অস্বস্তিতে কাঁপছিল। জ্যাসপার চিবিয়ে চিবিয়ে আবেগ নিয়ে বললো, “তুমি জানো? আগের জন্মেও আমি এভাবে তোমার প্রত্যেকটা মুহূর্ত ধরে রেখেছিলাম। তুমি যদি কখনো আমার প্রাসাদে যেতে, তাহলে বুঝতে পারতে। তখন তো ক্যামেরা ছিল না, কিন্তু আমি তোমার ছবি নিজের হাতে অঙ্কন করে আমার কক্ষের প্রতিটা দেয়ালে রেখেছিলাম হামিংবার্ড।”
ফিওনার হৃদয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগ্রত হলো। জ্যাসপারের কথাগুলো তার ভেতরের চোরাবালির মতো। সে একদিকে যেমন ঘৃণা অনুভব করছে, অন্যদিকে আবার এই আবেগময় কথাগুলো তার মনে কিছু প্রশ্ন তুলছে।

“কিন্তু কেন?” ফিওনা অল্পস্বরে প্রশ্ন করলো, “আপনার সেই অঙ্কনগুলো কি সত্যিই আমার জন্য ছিল? নাকি শুধু নিজের জন্য?”
জ্যাসপার তখন একটু ধীর হয়ে গেল, যেন তার আবেগের গতি কিছুটা থেমে গেল। “এটা শুধুই ভালোবাসার জন্য, হামিংবার্ড। আমি তোমাকে কখনো হারাতে চাই না। তাই আমি তোমার সবকিছু ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কি বুঝতে পারো, এটা কতোটা কঠিন?”
ফিওনার মনে হচ্ছিল, জ্যাসপারের কথাগুলো তার গায়ে আগুন ধরাচ্ছে, কিন্তু সে হার মানবে না। “আপনি আমাকে নিজের হাতে আঁকা ছবি হিসেবে দেখেন। কিন্তু আমি জীবন্ত,ছবি নয়।আমার স্বাধীনতা, আমার ইচ্ছা—এগুলোও মূল্যবান।”
জ্যাসপার তীব্র কণ্ঠে বলল, “এসব ছাড়ো, এখন শাওয়ার নিবে আর ড্রেস চেঞ্জ করবে।” তার কথায় কিছুটা আধিপত্য ছিল, যেন আদেশ দেওয়ার মতো।
ফিওনা মাথা নিচু করে রইল। “আমাকে একা থাকতে দিন,” সে স্পষ্টভাবে বলল। “আমি এখন একটু একা থাকতে চাই।”

জ্যাসপার তাকে নিবিড় দৃষ্টিতে দেখে বলল, “ফিওনা, আমি বলেছি, তুমি এখন শাওয়ার নিবে, মানে নিবে।” তার কণ্ঠে একটি নিষ্ঠুরতা ছিল, যেন সে কোন প্রতিবাদের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
ফিওনার চোখে আগুন জ্বলছিল। “আমি বাধ্য নই,” সে জবাব দিল। “এখন আর আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারবেন না। আমি আপনার হুকুমে চলব না।”
ফিওনা জ্যাসপারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আপনার আর নিউ ঝানের মধ্যে পার্থক্য কি জানেন? ও আগের জন্মেও আমাকে জোর করে নেয়নি,এই জন্মেও নেয়নি।ও কখনোই আমার উপর জোর করেনি, জোর করে কিছু আদায় করতে চায়নি।”
জ্যাসপারের চোখে রাগের এক ঝলক দেখা দিল। “আমি তোমাকে ওর নাম নিতে নিষেধ করেছিলাম,” সে কঠোর কণ্ঠে বলল। “তুমি কি বোধহয় ভুলে গেছো? তাহলে কি তোমার কাছে ও আমার থেকে বেশি ভালো?”
ফিওনা মুহূর্তটিতে কিছুটা থমকে গেল না, বরং আরও দৃঢ়ভাবে বলল,”হি ইজ আ থাউজ্যান্ড টাইমস বেটার দ্যান ইউ”
জ্যাসপার যেন রাগের আগুনে জ্বলতে লাগল। তার মাথায় অসন্তোষ বিরক্তি মিশ্রিত হতে লাগল।তার জন্য এটি সহ্য করা কঠিন ছিল,কারণ ফিওনার মুখ থেকে নিউ ঝানের নাম শুনে তার অন্তরে এক ধরনের ঈর্ষা জেগে উঠছিল।

“সে তোমার জন্য কি করেছে?” জ্যাসপারের গলা গভীর হলো, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।আমি তোমার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত,আর তুমি বলতে পারবে? আমার দেয়া চিঠি আর ফুল তোমার অন্তরে নাড়া দেয়নি কখনো?তুমি কিভাবে ওই সেনাপতিটাকে ভালোবাসলে তখন।”
ফিওনার চোখে প্রতিবাদের চেহারা স্পষ্ট ছিল,
“আমি তাকেই ভালোবাসবো যে আমার ভালোবাসাকে সম্মান করবে।আপনি তো আগের জন্মেও আমাকে জোর করে পেতে চেয়েছেন?জাইরনকে মারার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন তাহলে?,” সে বলল। “নিউ জ়ান আমায় স্বাধীনতা দিয়েছে,যেখানে আপনি শুধু চাপ সৃষ্টি করে গেছেন।”
জ্যাসপারের মাথায় রাগ দপদপ করে উঠল। মুহূর্তেই তার সবুজ চোখের চারপাশে রক্ত জমাট বাঁধলো, যেন ভেতরের উত্তেজনা বাইরের প্রতিফলন। ফিওনা অনুভব করল তার সংকট, হাত শক্ত করে চেপে ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেলো ওয়াশ রুমের দিকে।ঔগাউন সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল সে, হঠাৎ করা এই টানাটানির কারণে।
জ্যাসপার ফিওনাকে ওয়াশ রুমে নিয়ে গিয়ে বলল, “তুমি যে কথাটা মাত্র বললে, তার জন্য তোমাকে এবার আফসোস করতে হবে।” তার কণ্ঠে এক ধরনের বিপদসংকেত ছিল, যেন সে তার পরিকল্পনার কষ্টিপাথর বুঝিয়ে দিতে চায়।
জ্যাসপার ফিওনাকে একটি লোহার শৃঙ্খলা দিয়ে তার হাত বেঁধে দিল।এরপর সে শাওয়ার ঝর্নার মাথায় একটি বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করল,যাতে পানি বেরিয়ে আসার সময় চাপ বাড়িয়ে দেয়।ঝর্নার পানি শুরু হল,প্রথমে ধীরে ধীরে,তারপর দ্রুত গতি বাড়িয়ে দিতে লাগল।
ফিওনা আতঙ্কিত হয়ে সুরক্ষার জন্য চেষ্টা করলো,কিন্তু শৃঙ্খলার মধ্যে আটকা পড়ে গিয়েছিল।ঝর্ণার পানি ফিওনার মুখের ওপর পড়তে লাগল,নিঃশ্বাস আটকে যাওয়ার ভয় তার মনে কাব্য সৃষ্টি করছিল।জ্যাসপার তার অভিব্যক্তিতে একটি চরম নিষ্ঠুরতা নিয়ে সামনে এলো।

“না!” ফিওনা চিৎকার করে উঠল, কিন্তু শব্দটি যেন ঝর্ণার পানির বেগের কাছে ম্লান হয়ে গেল।
জ্যাসপার তখন ফিওনার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কিছুক্ষন একা থাকতে চেয়েছিলে না? আমি তোমাকে এভাবেই কিছু সময়ের জন্য একা রাখতে চাই।” এরপর,জ্যাসপার জোরালো পা ফেলে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে গেলো,ফিওনার করুণ অবস্থার দিকে একবারও তাকায়নি।
ফিওনা তখন অনুভব করছিল,ঝর্ণার পানি তার সমস্ত শ্বাসরোধ করছে,যেন সে কোনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে বন্দী। সে বোঝে,এখন তার মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার সময় এসেছে—কিন্তু সেই মুহূর্তে,শুধুমাত্র পানির প্রবাহই তাকে গ্রাস করতে প্রস্তুত।
আধাঘণ্টা পর,জ্যাসপার কালো প্লেন টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নতুন রূপে ওয়াশরুমে ফিরে এল।তার চোখের কোণে এক ধরনের কঠোরতা ছিল,যেন সে তার উদ্দেশ্য পূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।এ যেন প্রতিশোধের আগুন,যার শিখা জ্বলছিল তার অন্তরে।
ফিওনা এখনও হাপরহুপ পদ্ধতিতে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল।তার চোখে ভয়ের ছায়া ছিল,কিন্তু সেই সঙ্গে একটি যুদ্ধ করার চেতনা।ঝর্ণার তীব্র জল তার শরীরকে পুরোপুরি ভিজিয়ে ফেলেছে,আর জলের নিচে নিঃশ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছিল।

জ্যাসপার ঝর্ণার পানি বন্ধ করে দিল,আর সঙ্গে সঙ্গে ফিওনার হাত দুটো খুলে দিলো।মুক্তির অনুভূতি মিলিত হলেও,ফিওনার চোখে ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল।সে একটুও লুকাতে পারছিল না তার বিরাগ,যেন সে তাকে স্বাভাবিকতার থেকে নির্বাসিত করে দিয়েছে।হয়তো,আজ যদি সে শুধুমাত্র মানবী হতো,তবে এতোক্ষণে মৃ*ত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।
জ্যাসপার কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো, “এখন তোমার ড্রেস চেঞ্জ করার পালা।” তার কণ্ঠে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা ছিল, যা ফিওনাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুললো। সে ফাঁকায় থাকা ড্রেসটি হাতে নিয়ে সেটাকে অবজ্ঞার সঙ্গে ছুড়ে মারল।
জ্যাসপার এর প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা রাগ হয়ে বললো, “তুমি যদি এটা গ্রহণ না করো,তাহলে অন্য পথ অবলম্বন করবো।” বলেই সে ফিওনার গাউনের বুকের কাছের গাউন খানিকটা কেচি দিয়ে কেটে ফেললো।
জ্যাসপার পুরো গাউনটাই পা পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেললো এক টানে,তারপর সেটি খুলে দূরে ফেলে দিলো।ফিওনা নিজের হাত আড়াআড়ি করে বুক ঢাকার চেষ্টা করলো,কিন্তু তার এই চেষ্টা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল।জ্যাসপারের চোখে এক ধরনের অদ্ভুত উন্মাদনা ছিল,যা ফিওনাকে আরও ভীতির মধ্যে ফেলছিল।
সে তখন জোর করে ফিওনাকে বাথরোব পরালো,যেটি তার শরীরের কিছুটা আবরণ দিল।কিন্তু এই আবরণেও ফিওনার মনে হয়েছিল,তার স্বাধীনতা সম্পুর্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

অতপর,জ্যাসপার তাকে কোলে তুলে নিয়ে গেলো কক্ষে।ফিওনার হৃদয়ে প্রচণ্ড অনুভূতি তৈরি হলো—সে তার সংগ্রামী জীবনের সব কষ্ট এক মুহূর্তে অনুভব করলো।তার আত্মমর্যাদার বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ চলছিল।কিন্তু জ্যাসপারের শক্তিশালী বাহুর কাছে সে অসহায় ছিল,যার দিকে তার চোখে প্রবল বিরোধীতা ছিল।
জ্যাসপার ফিওনাকে ড্রেসিং টেবিলে বসিয়ে দিলো,আর ফিওনার ভেজা চুলের লকগুলো একপাশে সরিয়ে ঘাড়ের কাছে মুখ গুজে দিলো।ফিওনার দুই কাঁধে শক্ত করে ধরে,সে গলার কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে দিতে কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, “আমি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি হামিংবার্ড।”
এই উচ্চারণে ফিওনার হৃদয় গভীর একটি দ্বন্দ্ব অনুভব করলো—তার মনে ঘৃণা আর মৃদু শিহরণের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।কিন্তু তবুও,জ্যাসপার নিজেকে সামলে নিয়ে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে ফিওনার চুল শুকাতে লাগলো,পরম যত্নে।
জ্যাসপার ফিওনার হাতে একটা পার্পল কালার সিল্কের ড্রেস ধরিয়ে দিয়ে বললো, “আমি তোমাকে দশ মিনিট সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে তুমি ড্রেস পড়ে তৈরি হয়ে বাইরে আসবে।আমি ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে যাচ্ছি।”

ফিওনা চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো, যেন বোঝার চেষ্টা করছে এই সময়ে তার বিরুদ্ধে কোন গভীর উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে।
জ্যাসপারের কথায় শাসনের ঔদ্ধত্য ছিল,কিন্তু তার কণ্ঠে সেই পূর্বের আবেগের চাপও ছিল।সে দ্রুত কক্ষ থেকে বের হয়ে গেল,ফিওনার মনের অন্ধকার কোণগুলোতে প্রশ্ন জাগিয়ে রেখে।
ড্রেসটি হাতে নিয়ে ফিওনা স্থির হয়ে রইলো।অনুভূতির পক্ষে যুদ্ধ চলছে তার ভিতরে—একদিকে তার আক্রমণাত্মক চাহিদা,অন্যদিকে তার স্বাধীনতা।এ মুহূর্তে,সে কি করতে চায়,সেটি স্পষ্ট নয়।

ডাইনিং টেবিলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর,জ্যাসপার মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো কেন ফিওনা আসছে না।তার মনে এক অস্বস্তিকর অনুভূতি জেগে উঠল।অবশেষে সে নিজেই কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলো,ফিওনাকে আনতে।
দরজায় এসে সে লক্ষ্য করলো,ফিওনা দরজা লাগিয়ে রেখেছে,অজানা উদ্বেগ তার মনে এলো।সে রিমোট হাতে নিয়ে দরজার দিকে তাকালো।রিমোটের বোতামে চাপ দিয়ে দরজাটি খুলে দিলো।দরজা খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি অদ্ভুত নীরবতা কক্ষটিকে ঘিরে ফেলল।
ফিওনা সেখানে ছিল,জানালার পাশে দাঁড়িয়ে,রাতের চাঁদের আলোতে তার সিল্কের ড্রেসে এক অপরূপ আভা ছড়াচ্ছিল।জ্যাসপারের হৃদয়ে একটি নতুন অনুভূতি উদ্রেক হলো,ফিওনার উপস্থিতি যেন রাতের অন্ধকারে একটি উজ্জ্বল তারা।
ফিওনা পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল,রাতের গভীর অন্ধকার তাকে আলিঙ্গন করে রেখেছে।তার সিল্কের ড্রেসের চিকন দড়ির মতো হাতাগুলো কোমলভাবে তার কাঁধে বসে ছিল,আর ড্রেসটি শরীরের বডি গঠনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছিল।পায়ের দিকে এটি স্রোতের মতো পড়েছিল,এক উজ্জ্বলতার আভা ছড়িয়ে।
রাতের নীরবতায়,যখন সে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল,তখন তার সৌন্দর্য যেন তার চারপাশের অন্ধকারকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল।চাঁদের আলো তার ড্রেসে রূপালী ছোঁয়া দিয়েছিল,আর রাতের হাওয়া তার লম্বা চুলকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

ফিওনার অনুভূতিতে ছিল এক ধরনের রহস্যময়তা।তার পেছনে,আকাশে ঝলমল করা তারাগুলি যেন তার দিকে তাকিয়ে ছিল,যেন তাদের আলো তার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের জন্য সম্মান জানাচ্ছে।
জ্যাসপার,দূর থেকে ফিওনার এই দৃশ্যটি দেখে,তার হৃদয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি অনুভব করছিল।ফিওনার পেছনের রূপ,চাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠা,তাকে আরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করছিল।
হঠাৎ জ্যাসপার ফিওনাকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।তার স্পর্শে ফিওনার শরীরে এক অবর্ণনীয় শিহরণ বয়ে গেল।ফিওনার পেটের কাছে হাত দিয়ে স্লাইড করতে করতে,জ্যাসপার তার গালের কাছে ঠোঁটের হালকা ছোঁয়া দিয়ে ফিসফিস করে বললো, “আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিলাম,তুমি আসছিলে না কেনো? চলো, ডিনার করবো একসাথে।আগে রাতের খাবার খাবো,তারপর তোমাকে।”
এই কথাগুলি শুনে ফিওনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো। তার মনে এলোমেলো অনুভূতি আর আতঙ্কের মিশ্রণ তৈরি হলো।সে নিজেকে ছাড়াতে চাইলো,কিন্তু জ্যাসপার যেন আরও শক্ত করে তাকে আঁকড়ে ধরলো।
অবাক হয়ে ফিওনা কিছু বলতে গেল,কিন্তু তার কথাগুলি গলায় আটকে গেল।এর আগেই জ্যাসপার উল্টো ফিওনার গলায় জোরে কামড় বসালো,যেন সে তার দাবিটা স্পষ্ট করে দিতে চাচ্ছে।ফিওনার শরীরে এক শীতল শিহরণ ছড়িয়ে পড়লো, কিন্তু সাথে সাথেই তীব্র বিক্ষোভও অনুভব করলো।
ফিওনা কিছুটা হতাশ হয়ে বললো, “আমি খাবো না, আমার খিদে নেই। আপনি একাই খেয়ে নিন।”
কিন্তু জ্যাসপার তার কথায় কান দিলো না।কিছু বলার আগেই,সে ফিওনাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগোতে লাগলো।ফিওনার শরীর কাঁপছিল ভয়ে,কিন্তু জ্যাসপার যেন এতে কোনো ভ্রূক্ষেপই করলো না।
সে ফিওনাকে কাঁধ থেকে চেয়ারে ধপ করে বসিয়ে দিলো,যেন তার মতামত বা ইচ্ছার কোনো দাম নেই।ফিওনা বসে থাকলো,কিছুটা অসহায় ভাবে নিজেকে প্রতিরোধহীন মনে হচ্ছিল।
“তোমার পছন্দের সব খাবার রেখেছি, আর তুমি বলছো খাবে না?” জ্যাসপার বললো, তার কণ্ঠে অল্প ক্ষোভের ছোঁয়া।

ফিওনা নিরুত্তর থেকে গেল, এক মুহূর্তের জন্য ভেবে। “আমার পছন্দের কোনো দাম আছে? আমার ইচ্ছা কি আপনার কাছে কোনো মূল্যবান?”
জ্যাসপার তখন দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, “খাবারটা খাও, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।” বলেই সে কিছু চাউমিন ফিওনার মুখের সামনে ধরলো।
ফিওনা ক্ষণিকের জন্য মুখ ফিরিয়ে নিলো, যেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু জ্যাসপার তা সহ্য করলো না।সে ফিওনার গাল শক্ত করে চেপে ধরলো আর চামচের সাহায্যে চাউমিনটি মুখের ভেতরে পুরে দিয়ে ফিওনার নাক মুখ চেপে ধরল এক হাত দিয়ে।
“খাও,” তিনি বললেন,“নইলে তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারবে না।”
ফিওনার চোখে পানি চলে এলো,তার মধ্যে আতঙ্কের ছায়া ফুটে উঠলো।সে অগত্যা চাউমিন চিবাতে লাগলো,একদিকে জ্যাসপারের কর্তৃত্বের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো।সে অনুভব করলো,
তার অশ্রুগুলি গাল বেয়ে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে কিছুই করার ছিল না।
খাবার শেষ করার পর,জ্যাসপার ফিওনাকে সোফায় বসিয়ে রেখে কিছু একটা আনতে গেল।কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো হাতে দুটি বক্স নিয়ে।ফিওনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো,তার মনে কিছুটা উদ্বেগ আর অস্বস্তি ছিল।
জ্যাসপার ফিওনার বরাবর সোফায় বসলো তাদের সামনে একটা কাচের ছোট টেবিল রাখা।জ্যাসপার বক্স দুটি খুলে দেখালো,সেখানে দুটো আঙটি ছিল। “বিয়ের সময় আংটি বদল করা হয়নি, তাই এটা সম্পূর্ণ করতে হবে,” সে বললো, তার কণ্ঠে এক ধরনের কঠোরতা ছিল।

জ্যাসপার একটি আঙটি তুলে ফিওনার আঙুলে পরাতে যাবে,কিন্তু হঠাৎ দেখলো,ফিওনার আঙুলে ইতিমধ্যে একটি আঙটি রয়েছে।এই মুহূর্তে,জ্যাসপারের চোখে এক ধরনের ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়লো।
সে বুঝতে পারলো,এটি নিশ্চিত সেই আঙটি,যা পৃথিবীতে থাকতে ফিওনার লিউ ঝানের সাথে এনগেজমেন্ট হয়েছিল।তার হৃদয়ে এক অসহায়তা আর ক্ষোভ অনুভূত হলো।কেননা,ফিওনার এই আগের সম্পর্কের স্মৃতি তার কাছে আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছিল না।
“এটা…” তিনি বলতে গেলেন,কিন্তু কথা থেমে গেলো। তার মনে যেন কষ্টের এক ঝড় বয়ে গেল,যা তাকে একবারে অবশ করে দিল।ফিওনার দিকে তাকিয়ে সে যেন বুঝতে পারলো,তাদের সম্পর্কের মধ্যে কতটা জটিলতা রয়েছে।
জ্যাসপার ফিওনাকে প্রশ্ন করলো, “এই আঙটি কি তোমাকে লিউ ঝান পরিয়েছিল?”
ফিওনা ধীরে ধীরে বললো, “হ্যাঁ, ওর সাথে আমার আগেই এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। বুঝতে পেরেছেন, নিয়তিও চেয়েছিলো,আমি ওর সাথেই থাকি।”
জ্যাসপার তখন এক বাঁকা হাসি মুখে ফুটিয়ে তুললো। সে ডাইনিং থেকে একটি ছুরি এনে বসলো,তার চোখে এক ধরনের উন্মাদনা ছিল। “এই আঙটি আমি খুলবো না,তুমি নিজেই খুলবে,” সে বললো।
ফিওনা ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলো, “আমি নিজে কখনোই খুলবো না।হয়তো আপনি জোর করে খুলতে পারবেন, এছাড়া না।”

জ্যাসপার তখন অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো।সে ফিওনার হাত টেবিলের ওপর রাখলো,আর ফিওনা কিছুটা ভয় পেলো।সে হাত সরাতে চাইলো,কিন্তু পারলো না।জ্যাসপার শক্ত করে এক হাত দিয়ে ফিওনার হাত টেবিলে চেপে ধরে রেখে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ছুরি দিয়ে ঠকঠক করে স্পিডে চালাতে লাগলো।
প্রত্যেকটা আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে একবার করে ছুরি গেঁথে যাচ্ছিলো।ফিওনা ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছিল,মনে মনে সে বুঝতে পারছিল,এই মুহূর্তটি কতটা বিপজ্জনক।জ্যাসপারের দৃষ্টি যেন আগুনের মতো জ্বলছিল,আর সে অনুভব করছিলো যে জ্যাসপার তার প্রতি এক অসীম রাগ ও ক্ষোভ অনুভব করছে,যা তার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।ফিওনার হৃদয় দুরু দুরু করছিল।
জ্যাসপার ধমক দিয়ে বললো, “লুক এট মি।”
ফিওনা তখন কিছুটা ভীত হয়ে তার দিকে তাকালো। তার চোখে আতঙ্কের ছায়া ফুটে উঠলো,কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিলো।
জ্যাসপার তার কণ্ঠস্বরকে আরও কঠোর করে বললো, “রিংটা কি খুলবে নিজে থেকে,নাকি আমি এই ছুরি এবার তোমার আঙুলে চালাবো?”
ফিওনার হৃদয় দ্রুত স্পন্দন শুরু করলো।সে গভীর নিশ্বাস নিলো আর বললো, “আমি কখনোই এটা খুলবো না।”
জ্যাসপারের মুখে ক্ষিপ্ত হাসি ফুটে উঠলো,কিন্তু ফিওনা তার প্রতিরোধ দেখে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লো।
“ঠিক আছে,” জ্যাসপার বললো, “তুমি নিজেই বাধ্য করছো। কিন্তু মনে রেখো,আমি যা চাই,তা আমি পাবো।”

এই কথা বলার পর,সে ছুরিটি ফিওনার আঙুলের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল।ফিওনার হৃদয়ে যেন রক্ত জমাট বাঁধল, সে জানতো, তর সিদ্ধান্তই তার জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
ফিওনা চোখে ভয়ের ছায়া নিয়ে বললো, “আপনি আমাকে একেবারে এই ছুরির মাধ্যমে মেরে ফেলুন।”
জ্যাসপার ঠাণ্ডা কণ্ঠে উত্তর দিলো, “তোমাকে মারবো কেন, হামিংবার্ড? মরবে তো ওই লিউ ঝান।”
ফিওনার চোখ বড় হয়ে গেলো। এই নিষ্ঠুর কথায় তার মনে এক ভীতি তৈরি হলো।
জ্যাসপার তখন বললো, “তোমার কি ভয়ের অনুভূতি চলে গেছে ?এতটুকু সময়েই অভ্যস্ত হয়ে গেছো?”
বলা শেষ করে, জ্যাসপার নিজের হাত টেবিলে রাখলো।জ্যাসপার তখন ছুরিটি শক্ত করে ধরলো আর সেটির ধারালো প্রান্ত তার নিজের আঙুলের মধ্যেই একবারে প্রবেশ করাল।ছুরির ধারালো কোণা যেন তার চামড়ার সঙ্গে এক হয়ে গেল।তার পাঁচ আঙুলেই ছুরিটি স্পিডে চালাতে লাগলো,জ্যাসপারের হাতের আঙুলগুলো থেকে রক্ত বের হয়ে টেবিলের ওপর হাত সহ পুরো টেবিল মেখে গেছে রক্তের স্রোতে,আর কিছু রক্তের ফোঁটা ফিওনার মুখে ছিটকে পড়ছিলো।
ফিওনা এই ভয়াবহ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলো না; তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
“প্লিজ,স্টপ!” সে জোরে চিৎকার করে বললো। কিন্তু জ্যাসপার কোনো কর্ণপাত করলো না। ততক্ষণে তার আঙুল থেকে রক্ত বের হতে শুরু করেছে।
ফিওনা আর সহ্য করতে না পেরে,নিজের হাতের সেই আঙটি খুলে দূরে ছুড়ে মারলো।জ্যাসপার তখন শুধুই হাসলো।হাসি ছিল তার চোখে বিদ্রূপ ও অসহিষ্ণুতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ, যেন সে এটাই চেয়েছিল—ফিওনার আতঙ্ক।

জ্যাসপার তার র*ক্তমাখা হাত নিয়ে ফিওনার আঙুলে আঙটি পরালো,আর হাতে চুমু খেয়ে বললো,”এখন তোমার পালা হামিংবার্ড।”
ফিওনা কাঁপতে কাঁপতে বললো, “আপনার হাত তো র*ক্তাক্ত।”
জ্যাসপার ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলো, “কিছু হবেনা। এই র*ক্তমাখা আঙুলেই পরিয়ে দাও আমাকে।”
ফিওনার ভয়ে কাঁপতে লাগলো। সে অনুভব করছিল যে জ্যাসপারের আবেগগুলো কতটা অস্থির। সেই মুহূর্তে, জ্যাসপার কিছু একটা বের করে আনলো—একটি বিশেষ ক্যামিকেল মেডিসিন।সে তা নিজের হাতের ওপর ঢেলে দিলো। মুহূর্তেই, রক্ত পরিষ্কার হয়ে গেল, কিন্তু আঙুলের কাটা গুলি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো, যেন তার যন্ত্রণার চিহ্ন।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৬

ফিওনা তাকাতে পারছিল না হাতের দিকে এতোটা বিধ্বস্ত ভাবে ছি*ন্নভিন্ন ভাবে কেটেছে আঙুল।তবুও কাঁপা হাতে জ্যাসপারকে আঙটি পরিয়ে দিলো।সে অনুভব করছিল, জ্যাসপারকে যতোটা ভয়ংকর ভেবেছিলো,এই ড্রাগন প্রিন্স তার থেকেও বেশি ভয়ংকর।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৭ (২)