আষাঢ় রাতের সন্ধ্যা পর্ব ২০
Raiha Zubair Ripti
পুরো ছাঁদ টা মরিচবাতির আলোয় ঝলমল করছে। অনুষ্ঠান হবে না হবে না বলেও মোটামুটি আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যাকে হলুদ কালারের শাড়ি পড়ানো হয়েছে। শরীরে রয়েছে তাজা ফুলের গহনা। এই তাজা ফুল থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ বের হচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে কনা সাজছে। হলুদ কালারের একটা লেহেঙ্গা পড়েছে সে। বান্ধবীর বিয়ে বলে কথা না সাজলে হয় নাকি? শরিফা এসেছে। সন্ধ্যা কে ছাঁদে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আজ এই নিয়ে দুবার দেখলো কনা শরিফা কে। শরিফা সন্ধ্যা কে ধরে নিয়ে গেলো। কনা মেক-আপ বক্স টা বন্ধ করে ওদের পেছন পেছন গেলো। ছাঁদে আসতেই দেখলো আষাঢ় অলরেডি বসে অপেক্ষা করছে সন্ধ্যা। একই বাড়িতে তারা সেজন্য এক সাথেই গায়ে হলুদ হচ্ছে। সন্ধ্যা কে স্টেজের কাছে নিয়ে যেতেই আষাঢ় এগিয়ে আসলো। হাত বাড়ির সন্ধ্যা কে উঠিয়ে নিলো। সন্ধ্যা বসতেই আষাঢ় ফিসফিস করে বলল-
-“ এক মালির বাগানের ফুলকন্যা ভীষণ সুন্দর লাগছে তোমায়।
সন্ধ্যা প্রতিত্তোরে মুচকি হেঁসে বলল-
-“ ধন্যবাদ মালি সাহেব।
আরাফাত পাঞ্জাবির কলার ঠিক করতে করতে শরিফা কে ফোন লাগালো। শরিফা স্টেজের সামনে চেয়ারে বসে ছিলো। আরাফাতের ফোন পেয়ে সাইডে গিয়ে রিসিভ করলো।
-“ হ্যালো,,বলুন।
আরাফাত জিজ্ঞেস করলো-
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-“ কোথায় তুমি?
-“ ছাঁদে। আপনি কোথায়?
-“ এই তো আসতেছি।
-“ কি পড়েছো আজ?
-“ হলুদ শাড়ি।
-“ কিহ! একে তো সরিষা ..তার উপর সরিষার কালারের শাড়ি পড়েছো!
-“ সরিষা কালার হবে কেনো। হলুদ কালার পড়েছি। আপনি কি পড়েছেন?
-“ লুঙ্গি আর সেন্টু গেঞ্জি।
শরিফার চোখ গুলো বড়বড় হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য নিয়ে বলল-
-“ কি! লুঙ্গি পড়ছেন আপনি? একটা পিক দিন প্লিজ। আমি দেখবো। কখনও আপনায় এমন বেশে দেখিনি প্লিজ একটা পিক পাঠান।
-“ নো। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে?
-“ না। আপনি আসেন তাড়াতাড়ি,, আই কান্ট ওয়েট।
-“ আচ্ছা আসতেছি।
আরাফাত ফোনটা কেটে ভেতরে ঢুকতে নিতেই দেখে রাত হন্তদন্ত হয়ে বের হচ্ছে। আরাফাত দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল-
-“ কই যাস?
আকস্মিক আরাফাতের কন্ঠ শুনে মাথা উঁচু করে বলল-
-“ ওহ্ আরাফাত ভাই।
-“ হু। কই যাস?
-“ এই তো বাহিরেই।
-“ কেনো?
-“ এক ফ্রেন্ড এসেছে। তার সাথে দেখা করতে।
আরাফাত সন্দিহান হয়ে বলল-
-“ ফ্রেন্ড টা ছেলে না মেয়ে রে সেটা।
-“ আরে ভাই ছেলে ফ্রেন্ড। ঐ দেখেন আপনার পেছনে।
আরাফাত পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রাতের বয়সী এক ছেলে। এগিয়ে আসলো ছেলেটা। রাতের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
-“ কেমন আছো রাত?
রাত গম্ভীর মুখে বলল-
-“ ভালো আছি। কি বলবে বলো।
-“ আজ কোনো ওকেশন নাকি বাসায়?
-„ হ্যাঁ ভাইয়ার বিয়ে। কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো।
-“ কনা কে আনলে না যে?
-“ কনাকে কেনো আনবো?
-“ আমি যে বললাম।
-“ তুমি বললেই আমার শুনতে হবে? ওর নম্বর নেই?
-“ হু আছে।
-“ তুমিই তো বলতে পারো আসার জন্য।
-“ আচ্ছা বলছি কি..ওর বাবা মায়ের নম্বর টা দিবে?
-“ কেনো?
-“ আশা করি একটু হলেও বুঝতে পেরেছো কেনো চেয়েছি।
-“ বাই এনি চান্স বিয়ে বিষয়ক কোনো কিছু?
-“ হ্যাঁ।
-“ ওহ্ আচ্ছা আমার কাছে নেই। কনাকে বলে দিব নি। সে নম্বর টা দিয়ে দিবে।
-“ আচ্ছা এখন দেখা করা যাবে একটু?
-“ না ও তো ব্যস্ত হয়তো।
রাহুল কিছু বলার জন্য উদ্যত হলে তার ফোনে ফোন কল আসে। তার মা দিয়েছে ফোন।
-“ এক মিনিট একটু আসছি।
রাহুল একটু সাইডে সরে গেলো। রাত আর না দাঁড়িয়ে চলে আসলো। আরাফাত ভ্রু কুঁচকে বলল-
-“ আশ্চর্য ছেলেটাকে ভেতরে আসতে বললি না কেনো?
-“ আমি কেনো ভেতরে আসতে বলবো?
-“ তোর না ফ্রেন্ড বললি।
-“ কোচিং এর ফ্রেন্ড। কোনো খাস ফ্রেন্ড না।
-“ ও কি কনা কে বিয়ে করতে চায় নাকি?
-“ কথার ধরন দেখে তাই তো মনে হলো।
-“ কনা কে না বলে তোকে বলছে কেনো?
-“ সেটাই তো। আমাকে কেনো বলছে এই ছেলে। যাকে বিয়ে করবে সরাসরি তাকে বললেই হয়।
ছাঁদের এক কোনে দাঁড়িয়ে আছে কনা। স্টেজে বসে আছে সন্ধ্যা আর আষাঢ় । ফ্ল্যাটের সবাই একএক করে হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছে। কনার পাশে শরিফা দাঁড়িয়ে আছে। রাত এখনও আসে নি। কনা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো রাত আসতেছে। পড়নে সাদা পাঞ্জাবি। রাতের সাথে আরাফাত ও আছে। শরিফা আরাফাত কে ডাক দিলো। আরাফাত রাত কে নিয়েই এগিয়ে আসলো। শরিফা আরাফাতের দিকে তাকিয়ে বলল-
-“ কই ছিলেন আপনি? কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি
আরাফাত জবাব দিলো-
-“ নিচেই ছিলাম।
-“ কই আপনি না বলে লুঙ্গি পড়েছেন? এখন না দেখি পাঞ্জাবি পড়েছেন।
-“ পড়েছিলাম.. ভাবলাম তুমি..
-“ কি আমি?
-“ নাহ্ কিছু না।
-“ আচ্ছা দেখুন আমি সেজেছি আজ। কেমন লাগছে আমাদের?
আরাফাত পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলল-
-“ ও মাই গড বলিউডের নায়েকারা দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
কনা রাত হেসে দিলো। শরিফা দাঁত চেপে বলল-
-“ মজা নিচ্ছেন?
-“ নো। রাত তুইই বল।
-“ হ্যাঁ সত্যি বলিউডের নায়েকার মতো লাগছে তোদের। সো বিউটিফুল, সো এলিগেন্ট জাস্ট লাইক অ্যা ওয়াও।
-“ ওয়াও রাত প্রশংসা করলো আমাদের বাহ্! কেয়া বাত হ্যা? চলুন মিস্টার আরাফাত ওদের হলুদ লাগিয়ে দিয়ে আসি।
শরিফা আরাফাত চলে গেলো। রাত এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কনার মুখে এখনও হাসি লেগে আছে। ইনিয়ে বিনিয়ে জিজ্ঞেস করলো রাত কে-
-“ মিস্টার নাইট সত্যি বলিউডের নায়েকার মতো লাগতেছে?
রাত তাকালো। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই দেখলো রাহুল এগিয়ে আসতেছে। আপনাআপনি চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। বেয়াদব টা ছাঁদে চলে আসলো! কনা এখনও খেয়াল করে নি রাহুল কে। রাত কনা কে ধমক দিয়ে বলল-
-“ হাসছো কেনো এখনও? তোমার কি মনে হয় তোমাকে বলিউডের নায়েকার মতো লাগছে? আমি বললাম আর খুশিতে আকাশে উড়া শুরু করে দিলে? এতো ভারি মেক-আপ ও মাই গড। মিথ্যা প্রশংসা ছিলো ওটা তোমার জন্য। বিশ্রী রকমের লাগছে তোমাকে বুঝলে?
কনা কিছুটা থমকে গিয়ে রাতের মুখের দিকে তাকালো। রাহুল ছাঁদে এগিয়ে আসছে দেখে রাতের মুখে কপট কঠোরতা ফুটে উঠেছে, কিন্তু কনার সেটা খেয়াল করার সুযোগ নেই। হঠাৎ কনা হাসি চাপিয়ে মাথা নিচু করে বলল—
-“ ধন্যবাদ আপনার দেওয়া আমাকে নিয়ে কমপ্লিমেন্ট। সারাজীবন মনে রাখবো।
কনা ওখান থেকে সরে আসার পথে রাহুলের সাথে দেখা হয়। রাহুল কে দেখে ভারী চমকায়। অবাক হয়ে বলল-
-“ আপনি এখানে?
রাহুল হাসিমুখে জবাব দিলো-
-“ হ্যাঁ আসলে একটা কাজে এসেছিলাম। ভাবলাম তোমায় দেখে যাই।
-“ আমাকে দেখে যাবেন মানে?
-“ মানে ইজ নাথিং। আপনাকে দেখা শেষ এবার আসি।
রাহুল চলে গেলো। কনা স্টেজে এগিয়ে এসে সন্ধ্যা আর আষাঢ়ের গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে আর রইলো না। রুমে চলে আসলো। আরাফাত থেকে শরিফার ছবি তুলে দিচ্ছে। ম্যাডাম তার স্টেজে সন্ধ্যা আর আষাঢ়ের পাশে দাঁড়িয়েছে। হুকুম দিয়েছে ছবি গুলো যেনো সুন্দর উঠে।
বেশ কয়েক টা ছবি তুলা হলে শরিফা আরাফাতের থেকে ফোন টা নিয়ে ছবি গুলো দেখে। আশেপাশে কনা কে না দেখে ফোন করে।
কনা নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে রইলো। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে, রাতের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে। কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কনা নিজের চোখের পানি মুছে নিলো। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে লেহেঙ্গা সাজ সব পাল্টে সিম্পল থ্রিপিস পড়ে নিলো।
একটু পরে কনার ফোনে শরিফার কল আসলো। -” হ্যালো কনা আপু, কোথায় গেলে হঠাৎ?” শরিফা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল।
কনা নিজেকে সামলে হালকা স্বরে বলল,
– ” একটু মাথা ব্যথা করছে, তাই বিশ্রাম নিচ্ছি রুমে। কোনো দরকার আমাকে?
-“ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি আসো।
কনা মৃদু হেসে বলল, “ঠিক আছে, আসছি।”
নিজেকে শক্ত করে সে আবার ছাঁদে চলে গেলো। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই দেখলো শরিফা আর আরাফাত ডুয়েট নাচছে। কনা গিয়ে একটা চেয়ারে বসলো। রাত ফোন স্ক্রোল করছে দূরে বসে। কনাকে খেয়ালই করে নি।
নাচের শেষে আরাফাত রাত কে গান গাইতে বলল। রাত প্রথমে না করলেও আষাঢ় বলাতে রাজি হলো। কাউকে গিটার আনতে বলল। একটা বাচ্চা ছেলে গিটার এনে রাতের হাতে দিলো। রাতের এবার চোখ গেলো কনার দিকে। মুখে কোনো সাজসজ্জা নেই। শরীরে লেহেঙ্গা নেই।আছে পেয়াজ কালারের থ্রিপিস।
রাত গিটারে সুর তুলে গাইলো-
❝ কখনো কি রাত কেটে ভোরের আলো এসে আমাকে জড়াবে,
কখনো কি মোনেতে লুকানো কথা গুলো সে শুনতে পাবে।
যতো বার কল করি তুমি ব্যস্ত থাকো বন্ধুদের সাথে,
আবার আমি বের হলে বলো কি করো তুমি অন্যদের কাছে।
চাই ছুটে যাই দূরে কোথাও পালাই
তোমার ছায়া থেকে সরে যেতে চাই।
আর আমার কারণে যদি পেয়ে থাকো ব্যাথা
মনে রেখো তুমিও দিয়ে ছিলে কথা।
মনে কি পরে আমার তোমার গল্প গুলো
কতো কথা হতো লুকিয়ে মাঝ রাতে।
বাহানা বানিয়ে থাকতাম তোমার সাথে
বলতে আমার নিঃস্বাস তোমার ভালো লাগে।
অযথা লাগে এখন এতোটা সময় গেলো
আমার তোমার বৃথা অনুরাগে।
চাই ছুটে যাই দূরে কোথাও পালাই
তোমার ছায়া থেকে সরে যেতে চাই।
আর আমার কারণে যদি পেয়ে থাকো ব্যাথা
মনে রেখো তুমিও দিয়ে ছিলে কথা।
চাই ছুটে যাই দূরে কোথাও পালাই
তোমার ছায়া থেকে সরে যেতে চাই।
আর আমার কারণে যদি পেয়ে থাকো ব্যাথা
মনে রেখো তুমিও দিয়ে ছিলে কথা।❞
সবাই করতালি দিলো। সন্ধ্যার খুব চেনা লাগলো কন্ঠ টা। কোথাও শুনেছিলো এই কন্ঠ। একটু ভাবতেই মনে পড়লো সেদিন রাতে শুনেছিলো। যেদিন সে এসেছিল এই বাসায়। তারমানে কন্ঠ টা রাতের! বাহ্ সুন্দর কন্ঠ তো ছেলেটার।
রাত ১২ টার দিকে যার যার বাসায় চলে গেলো সবাই। কনা রুমে এসেই শুয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা ছাঁদে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল হঠাৎ সাজ মুছে কেনো ফেলেছে। কিন্তু আর করতে পারে নি জিজ্ঞেস। এখন যেই না জিজ্ঞেস করবে দেখে কনা ঘুমিয়ে গেছে।
সন্ধ্যা আর ডাকলো না। শুয়ে পড়লো।
সকাল হতেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কনা সন্ধ্যা কে সাজিয়ে দিলো বিয়ের সাজে। সকাল থেকে মুখটা ভারী কনার। সন্ধ্যা খেয়াল করছে।
-“ কিছু হয়েছে?
সন্ধ্যা জিজ্ঞেস করলো। কনা উত্তরে বলল-
-“ নাহ্ কিছু হয় নি।
-“ মুখটা ভারী কেনো?
-“ কই মুখ ভারী। আসলে মাথা ব্যথা সেজন্য এমন দেখাচ্ছে হয়তো।
-“ তুই তো নিজে সাজলি না।
-“ বিয়ে আমার নাকি তোর?
-“ আমার।
-“ তাহলে আমি কেনো সাজবো? ঐ দেখ তোকে কি সুন্দর লাগছে। আষাঢ় ভাই চোখই সরাতে পারবে না দেখিস।
আষাঢ় রাতের সন্ধ্যা পর্ব ১৯
সন্ধ্যা তাকলো আয়নার দিকে। সবাই লাল বেনারসি পড়ে বিয়েতে। আর সন্ধ্যা অফ হোয়াইট বেনারসি পড়েছে। ফর্সা শরীরে সুন্দর লাগছে। কনা ঘোমটা টা এনে পড়িয়ে দিলো। পেছন থেকে সন্ধ্যার কাঁধে থুঁতনি রেখে বলল-
-“ তুই ভীষণ সুখী হবি দেখিস সন্ধ্যা। এতো সুখী হবি যে কেউ দহনে পু’ড়ে ছারখার হবে ক্রমাগত তোর সামনে। অথচ তুই জানবি না।
