Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১১

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১১

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১১
নওরিন কবির তিশা

স্নিগ্ধ প্রভাতী রোদ্দুরের আগমনে আড়মোড়া ভেঙ্গে জাগ্রত হয়েছে গোটা ধরিত্রী। প্রায় সমগ্র রাতটাই আরাভ ব্যালকনিতে কাটানোর দরুন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল তিয়াশা। তবে ফজরের আযান প্রতিধ্বনিত হতেই, সহ্য ত্যাগ করেই নামাজ আদায় করে নিয়েছে ও।
কিঞ্চিৎ বেলা চড়তেই চৌত্রের দাবদাহ যেন দ্বিগুণ হয়েছে। তিয়াশা নিজেকে কিছুটা সতেজ করার জন্য গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই ও এক মস্ত বড় বিপাকে পড়ে গেল। গতদিনের সেই নীল জামদানি শাড়িটা ছাড়া এই বিশাল কক্ষে ওর পরিধান করার মতো আর কোনো দ্বিতীয় বস্ত্র নেই। নিজের এই বিব্রতকর ও অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে ও যখন খাটের কোণে কিছুটা সংকুচিত হয়ে বসে ছিল, ঠিক তখনই কক্ষের দরজায় মৃদু টোকা দেওয়ার শব্দ হলো।
তিয়াশা নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জড়সড় গলায় বলল,

— ভেতরে আসুন।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল মাঝবয়সী এক পরিচালিকা। ওনার হাতে চমৎকার করে ভাঁজ করা একটা নতুন জামাকাপড়ের প্যাকেট। মুখভঙ্গি বেশ নরম ও ভদ্র। তিয়াশার দিকে এগিয়ে এসে অত্যন্ত সম্মানসূচক ভঙ্গিতে তিনি বললেন,
— ছোট আপা, এই নিন আপনার কাপড়। ফ্রেশ হওয়ার জন্য এটা পরতে পারেন।
তিয়াশা ওনার হাতের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত ও বিব্রত বোধ করল। ও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— কিন্তু এই ড্রেস… এগুলো এখানে কোত্থেকে এলো?
পরিচালিকা মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর করলেন,
— আরাভ ভাই সকালে বাইরে যাওয়ার আগেই এই প্যাকেটটা দিয়ে গেছেন। উনি কড়া করে বলে গেছেন, আপনি ঘুম থেকে ওঠার আগেই যেন এটা আপনার রুমে পৌঁছে দেওয়া হয়।
আরাভের এমন আগাম সর্তকতা আর নিখুঁত খেয়াল রাখার কথা শুনে তিয়াশা মনে মনে কিঞ্চিৎ অবাক হলো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনের ভেতর এক তীব্র জেদ আর অবজ্ঞা দলা পাকিয়ে উঠল। ও চট করে নিজের মন থেকে সমস্ত রকমের নমনীয়তা ঝেড়ে ফেলল। ও ভালো করেই জানে, আরাভ খানের মতো একটা দুর্ধর্ষ ও উগ্র অপরাধীর প্রতি কোনো রকম মুগ্ধতা আনা নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল। ঘৃণার সেই চক্করে ও নিজেকে শক্ত রাখল।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পরিচালিকার হাত থেকে প্যাকেটটি গ্রহণ করে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।

ওয়াশরুম থেকে বের হতেই তিয়াশার পদক্ষেপ থমকে গেল। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা,অবয়বে ও বেশভূষায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। ভদ্রমহিলাটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তিয়াশার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখছিলেন। ‌ তিয়াশা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের জায়গায় স্থির রইল। আম্বিয়া খান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
— নবাবজাদীর ঘুম ভাঙল এতক্ষণে? তা শিষ্টাচার কিছু শিখেছো? নাকি বাবা-মা শুধু তেজ আর দেমাগ শিখিয়েছে?
তিয়াশা কথার ধাঁচে মুহূর্তে বুঝে গেলে; ভদ্রমহিলা এই বাড়ির-ই কেউ হবে। তবে ওকি দমে যাওয়ার পাত্রী নাকি? যে যেমন তার সাথে ঠিক তেমনটাই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত তিয়াশা বলল,,
— আমি না হয় শিষ্টাচার জানিনা। বাবা-মা শেখায়নি! কিন্তু আপনাদের মতো শিষ্টাচার সম্পন্ন বাড়ির ছেলে কিনা প্রকাশ্য দিবালোকে একটা দিমাগওয়ালী মেয়ে কি তুলে আনলো? আপনাদের শিষ্টাচার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে না,তাহলে?
আম্বিয়া খান ফুঁসে উঠলেন,,

— ভারী বেয়াদব তো তুমি!
— জোর করে আনা বন্দীর কাছে রাজকীয় শিষ্টাচার আশা করাটা বড্ড বেমানান, আন্টি। আর এই বাড়িতে আমি নিজের ইচ্ছায় আসিনি, তাই আপনার নিয়ম মানার কোনো বাধ্যবাধকতাও আমার নেই।
তিয়াশার এমন সটান মোক্ষম জবাবে আম্বিয়া খান মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ওনার অহংকারী মুখে যেন কেউ ঠাঁটিয়ে চড় কষাল। তিনি চোখ বড় বড় করে, মুখটা বাঁকিয়ে অত্যন্ত রাগত স্বরে বললেন,
— তোমার মতো অসভ্য মেয়ের সঙ্গে তর্ক করার সময় আমার নেই। নিচে এসো, অন্তত বাড়ির বউ হিসেবে কিছু নিয়ম তো আমাকে পালন করতেই হবে, লোকলজ্জা বলেও একটা কথা আছে!
কথাটা শেষ করেই আম্বিয়া খান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের শাড়ির আঁচলটা ঝটকা দিয়ে ঘুরিয়ে ওনার চেনা অহংকারী ভঙ্গিতে ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। তিয়াশা ওনার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝতে পারছে, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল আর প্রতিটি মানুষ ওর জন্য কতটা বিষাক্ত। কিন্তু ও নিজেকে দুর্বল হতে দেবে না। এবার রুখে দাঁড়ানোর পালা। সকলকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিবে অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে করতে হয়।

নিস্তব্ধতার চাদর মুড়িয়ে তাহের চৌধুরীর প্রাণোচ্ছ্বল ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা আজ বড্ড বেশি থমথমে। আদরের মেয়ের এমন পরিণতি মেনে না নিতে পেরে শোকার্ত মাতৃহৃদয়ের প্রভাব বাহ্যিকভাবে পড়েছে রেহানা বেগমের উপর। তীব্র জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ।ওনার শয্যাপাশে বসে আদ্র দৃষ্টিতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রুদ্রদ্বীপের মা, রূপকথা বেগম।
এক কোণে জড় পদার্থের ন্যায় দন্ডায়মান তাহের চৌধুরী। ওনার সেই চিরচেনা কর্কশ ও দাপুটে অফিসারসত্তা আজ যেন এক চূর্ণ-বিচূর্ণ পিতৃত্বের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন তিনি। ড্রয়িংরুমের এই ছোটখাটো জটলায় নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বললেন রূপকথা বেগম। তিনি অত্যন্ত ভারী গলায় তাহের চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন,
— তাহের ভাই, নিজেকে একটু শক্ত করুন। ভাবি তো একদম ভেঙে পড়েছে। কিন্তু আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, তিয়াশার মতো একটা শান্ত ও বুঝদার মেয়ে হুট করে ওই অপরাধী ছেলেটার সাথে ওভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিল! ও কি আসলেও নিজের ইচ্ছায়…
— অসম্ভব, মা!
রুদ্রদ্বীপ মাঝপথেই ওনার কথা থামিয়ে দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে এসে তাহের চৌধুরীর ঠিক পাশে এসে দাঁড়াল,,

— নিশ্চিত ওকে মারাত্মক কোনো ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে, স্যার! আমি তিয়াশাকে যতটুকু চিনি, ও স্বেচ্ছায় ওই সাইকোর সাথে থাকার কথা ভাবতেই পারে না। আরাভ খান অত্যন্ত ধূর্ত। ও তিয়াশাকে এমন কোনো ভয় দেখিয়েছে বা আমাদের কোনো ক্ষতি করার থ্রেট দিয়েছে, যার কারণে ও মুখ খুলতে পারেনি। আপনি প্লিজ ভেঙে পড়বেন না, স্যার। ডোন্ট ওয়ারী!
তাহের চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রদ্বীপের দিকে চাইলেন। চক্ষু কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা নোনাজল,অত্যন্ত ভাঙা গলায় উনি বললেন,
— আমি জানি রুদ্রদ্বীপ, ও আমার কলিজার টুকরো। ও কোনোদিন এমন কাজ করতে পারে না। কিন্তু ওই নরপশুটা আমাদের সামনে কাবিননামা দেখাল… আমি আইনের মানুষ হয়েও কাল রাতে বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছিলাম বাবা!
রুদ্রদ্বীপ তাহের চৌধুরীর কাঁধে হাত রেখে পরম ভরসায় বলল,
— আইন নিজের গতিতেই চলবে, স্যার। কিন্তু আরাভ খান যে চালটা খেলেছে, তার পাল্টা চাল আমাদের দিতেই হবে। কাবিননামা লিগ্যাল নাকি ফেক—তা আমি খতিয়ে দেখছি। আপনি শুধু আন্টিকে সামলান। আমি প্রমিস করছি, তিয়াশাকে ওই নরক থেকে আমি বের করে আনবই। জাস্ট হ্যাভ ফেইথ ইন মি!

দুপুরের চড়া রোদ মাড়িয়ে আরাভ ওদের আড্ডার মেইন ঠেকে এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে, ওর বন্ধু মহল চিল-চিৎকার আর আড্ডায় মশগুল। আরাভের কেশরাজ বরাবরের ন্যায় অবিন্যস্ত তবে আজ চোখে-মুখে এক অদ্ভুত নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি স্পষ্ট। ওকে দেখামাত্রই আরিয়ান সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে বাঁকা একখান হাসি দিয়ে শুধাল,,
— কাল রাতে ক্লাবে আসিস নি ক্যান রে মামু? আমরা তো পুরা রেড অ্যালার্টে ছিলাম, ভাবলাম এসপি ব্যাটা বুঝি তোরে জেলের ভাত খাওয়াইয়া দিল!
পাশ থেকে সাইদ হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটা টেবিলে ঠুকে রীতিমতো খিল্লি উড়িয়ে অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল,,
— আরে ধুর ব্যাটা, তুই তো পুরাই বলদ! মামুর বাসর রাত ছিল না কালকে? ওইসব বাদ দিয়া মামু কি ক্লাবে আইসা তোর মুখ দেখব নাকি, কড়া রোমান্স রেখে?
সাইদের এই রসাত্মক কথায় পুরো আড্ডায় হাসির রোল পড়ে গেল। বাকি বন্ধুরাও নানারকম নোংরা আর সস্তা ইঙ্গিত করে তাল মেলাতে লাগল। কিন্তু আরাভের মেজাজ তখন একশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ফুটছে। খেই হারিয়ে ও হাতের দামি চশমাটা এক ঝটকায় টেবিলের ওপর ছুড়ে মেরে সিংহের মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠল,,

— জাস্ট শাট আপ! মুখ বন্ধ কর তোরা! ফালতু পকপক একদম ভালো লাগতাছে না।
আরাভের আকস্মিক এহেন রুদ্রমূর্তি আর হিংস্র চাউনিতে মুহূর্তের মাঝে স্তব্ধ হয়ে গেল কোলহল পূর্ণ কক্ষটা। সবাই বুঝতে পারল ওর মেজাজের পারদ আজকে তুঙ্গে। আরিয়ান পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে এসে আরাভের কাঁধে হাত রাখল, তারপর ওকে টেনে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বলল,,
— আরে চিল মামু! রাগ করস ক্যান? আমরা তো জাস্ট একটু মজা করতেছিলাম। তা ভাবীর কী অবস্থা? আমাদের সাথে পরিচয় করাইয়া দিবি না?
আরাভ সোফায় হেলান দিয়ে বসে পাশ থেকে হুইস্কির বোতলে হালকা চুমুক দিলো,,
— পরিচয় করাইয়া দিমু, সময় আসুক। তিয়াশা চৌধুরী থুরি তিয়াশা খান এত সহজে লাইনে আসার চিজ না রে মামু। বাঘিনীরে খাঁচায় ভরছি ঠিকই, কিন্তু ও এখনো কামড় দেওয়ার ট্রাই করতাছে। কাল রাতে আমারে যা একখান বাঁশ দিছে…
সাইদ এবার কৌতূহলী হয়ে ওর দিকে ঝুঁকে এল,,

— কী করছে রে মামু? তোরেও কাবু কইরা দিছে নাকি?
আরাম গ্লাসের বাকি ড্রিংকসটুকু এক ঢোকে শেষ করে বলল,,
— আরে না, আরাভ খানকে কাবু করার ক্ষমতা ওর বাপেরও নাই। জাস্ট একটু আধটু জেদ দেখাইতাছে। বিষ যত দিতাছে, আমার নেশা তত বাড়তাছে। তোরা ড্রিংকস কর, আমি জাস্ট একটু রিল্যাক্স করি।
পাশ থেকে আরেক গ্লাস তুলে তাতেও চুমুক মারলো ও। আবির পাশ থেকে জ্বলন্ত সিগারেট এগিয়ে দিতেই ঠোঁটের বাঁ পাশে রেখে প্রাণভরে টান দিল ও। পরক্ষণেই ধোয়ার কুন্ডলী ছেড়ে দিল সম্মুখে।

শয়ে শয়ে বাইকের কানফাটানো গর্জনের মাঝ দিয়ে আরাভ তিয়াশাকে রীতিমতো পাঁজকোলা করে তুলে এনে সরাসরি কাজী অফিসে এসে আছাড় মারল। কাজী অফিসের সেই নোংরা, সস্তা টেবিলটার ওপর রাখা ছিল লাল মলাটের একখানা বিয়ের খাতা। আরাভ ওর সামনে কলমটা ছুড়ে মেরে পৈশাচিক হেসে বললো,,
— সাইন কর, তিয়াশা। জলদি সাইন কর! আজ থেকে তুই লিগ্যালি আরাভ খানের সম্পত্তি।
রাগে ক্ষোভে থরথরিয়ে কম্পিত তিয়াশার ক্ষীণ কায়া ও কলমটা এক ঝটকায় দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে বলল,
— ভেবেছেন কী নিজেকে, আরাভ খান? ক্ষমতা আর গুন্ডামি দিয়ে দুনিয়ার সবকিছু কেনা গেলেও তিয়াশা চৌধুরীকে কেনা যায় না। আমি মরব, তাও আপনার মতো একটা নোংরা, নেশাখোর সাইকোকে বিয়ে করব না!
আরাভ ক্ষিপ্ত হয়ে টেবিলটা সশব্দে উল্টে দিয়ে তিয়াশার খুব কাছে এসে দাঁতে দাঁত চেপে হুঙ্কার ছাড়লো,
— এত তেজ ভালো না সুইটহার্ট! সাইন যদি না করস, তোর ওই ডিআইজি বাপের লাশ আজ রাতেই বুড়িগঙ্গায় ভাসায়া দিমু। আরাভ খান যা বলে, তা কইরা দেখায়!

— আমার বাবা ডিআইজি তাহের চৌধুরী, ওনার গায়ে হাত দেওয়ার ক্ষমতা তোর এই আন্ডারগ্রাউন্ডের চামচাদের নেই। দেশের আইন আর পুলিশ প্রশাসনকে আমি চিনি। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আমাকে সই করানো যাবে না, আরাভ খান! তোর এই সস্তা হুমকি আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিই।
তিয়াশার এই চরম অবজ্ঞা আর অকুতোভয় রূপ দেখে আরাভ ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও বুঝতে পেরেছিল, এই মেয়েকে শুধু খুনের ভয় দেখিয়ে লাইনে আনা অসম্ভব। আরাভ এবার শয়তানি হাসিটা প্রসারিত করে স্ক্রিনটা অন করে তিয়াশার চোখের সামনে ধরতেই তিয়াশার পুরো অস্তিত্ব এক লহমায় হিম হলো।
স্ক্রিনে স্পষ্ট দৃশ্যমান তিয়াশার কিছু একান্ত মুহূর্তের ছবি, যা হ্যাক করে সম্পূর্ণ বিকৃত ও এডিট করে রাখা হয়েছে। আরাভ ওর কানের কাছে এসে তপ্ত, বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে অত্যন্ত শীতল গলায় বলেছিল,

— বাপের জানের মায় নাই, বুঝলাম। কিন্তু নিজের এই ইজ্জতটার মায় তো আছে, নাকি? এই যে ছবিগুলা দেখতাছস, তুই এই কলম দিয়া খাতায় সই না করার ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় এইগুলা পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াইয়া যাইব। ‘ডিআইজি তাহের চৌধুরীর মেয়ের স্ক্যান্ডাল’—শিরোনামটা কেমন হইব বল তো? তুই হয়তো খুব সাহসী মা, কিন্তু কাল সকালে যখন তোর বাপে লোকলজ্জায় আর অপমানে নিজের সার্ভিস রিভলভার মাথায় ঠেকাইয়া সুইসাইড করব, তখন কি তোর এই তেজটা থাকবে?
আরাভের সেই চরম উগ্র এবং কুৎসিত চালটার সামনে এসে তিয়াশার ভেতরের সমস্ত সাহস, সমস্ত প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। একজন মেয়ের কাছে তার সম্মানের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না, আর সেই সম্মানের সাথে যখন বাবার আত্মমর্যাদা জড়িয়ে যায়, তখন আর কোনো লড়াই খাটে না। চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়েছিল তিয়াশার। ও কাঁপতে কাঁপতে, চরম ঘৃণায় কলমটা তুলে নিয়ে ওই অভিশপ্ত কাগজে নিজের সইটা বসিয়ে দিয়েছিল।

তোর প্রেমে পিছলে আগে রেকর্ড ভেঙেছি…
হোকনা থানা পুলিশ ফ্লাইং কিস খুলেছি…
মাইক নিয়ে বলছি সবাই শোন শোন….
বেশ করেছি প্রেম করেছি করবই তো….
আকস্মিক এহেন কণ্ঠস্বরে স্মৃতির পাতা থেকে যেন মুখ থুবড়ে পড়লো তিয়াশা। তীব্র বিরক্তিতে চোখমুখ বিশ্রী ভাবে কুঁচকে সম্মুখ পানে চাইতেই দেখল আরাভ এগিয়ে আসছে। পদক্ষেপেই স্পষ্ট প্রচুর নেশাগ্রস্ত ও। তিয়াশা নাক কুঁচকে বিরক্তসূচক শব্দ করে যেই না সরতে যাবে,আরাভ তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে ওর হাতটা খপ করে ধরল,

— সুইটহার্ট!
অ্যালকোহলের উৎকট গন্ধ ভেসে আসছে ওর মুখ দিয়ে। গা গুলিয়ে বমি উঠতে চাইলো তিয়াশার। সর্বশক্তি দিয়ে ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়ানোর প্রয়াসে ও বলল,,
— হাত ছাড়ুন খচ্চর বেডা মানুষ। মদখোর কোথাকার! মা-তাল! জানো-য়ারের মতো হাত ধরেছেন কেন?
ওর এহেন সম্বোধনে ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো আরাভের। নেশাগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি মগ্ন নয় সে। তবে হাঁটার একটু টালমাটাল অবস্থা এই যা! মেজাজের পারদ চড়চড়িয়ে উঠছে! কোথায় ও এমন রোমান্টিক-ফুরফুরে মেজাজে কক্ষে ঢুকলো! সেখানে বউ কি না এসব বলছে!
— বান্দির বাচ্চা! থাপড়াইয়া গাল লাল করে দিবো। নাদানের ঘরের নাদান, হনুমানের ঝি। বর রোমান্টিক মুডে ডাকলে তাকে চুমু দিতে হয় শালী,গালি না!
তিয়াশার মেজাজের পারদও সপ্তমে চড়েছে,

— তোর মত বরের মুখে গু! হাত ছাড় বাঁদরের ছানা কোথাকার!
— কী বললি? আমার মুখে ওইসব? আর আমি বাঁদরের ছা? ওরে আমার রূপের রানী, আমি যদি বাঁদরের ছা হই, তবে তুই তো ওই জংলি বাঁদরটার আস্ত বউ! নিজের জাতটা ভুলে যাস না, সুইটহার্ট!
তিয়াশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের হাতটা আর এক দফায় ছুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,,
— মুখ বন্ধ কর তোর, ড্রেন-এর ইঁদুর কোথাকার! নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছিস? এই ভরদুপুরে গাজাখোরের মতো চোখ লাল করে এসেছিস আমার সাথে রোমান্স করতে? তোর মতো অসভ্যের সাথে এক ঘরে থাকা মানে নিজের জীবনটাকে ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলা!
আরাভ এবার তিয়াশার হাতটা আরও একটু জোর দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। টলমলে পা দুটোকে সামলে নিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মা-তাল মার্কা শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে বলল,,

— আহা রে! ডাস্টবিনের ময়লা রে আমার! এত কথা যখন জানোস, তো একটু পরিষ্কার করে দে না জামাইরে। আর বেশি চিল্লাইস না, মানুষ ভাবব ঘরের জামাই বউরে পিটাইতাছে। আমার ইজ্জতের একটা দাম আছে না?
— জা-নোয়ার মার্কা মানুষ কোথাকার! হাত ছাড় না হলে এক্ষুনি থাপড়িয়ে তোর মাতলামি ছুটাবো!
যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধতে আর এক মুহূর্ত বাকি! ঠিক তখনই গুঁড়ে বালি দিল আরাভের ফুফু আম্বিয়া খান। কোত্থেকে ঝড়ো হওয়ার বেগে এগিয়ে এসে তিনি বললেন,
— আরাভরে দ্রুত বাইরে আয় বাপ। ঝামেলা বাঁধছে।
নিচ থেকেও ভেসে এলো শোরগোলের আওয়াজ। ঝামেলা না বাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ দ্রুত পদক্ষেপে হন্তদন্ত হয়ে প্রস্থান করলো আরাভ। ঘটনার আকস্মিকতায় সবকিছু মাথার চার হাত উপর দিয়ে গেল তিয়াশার। ও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়ল, আরাভ দু’কদম এগোতেই অনুভব করল ওর পিছু পিছু আসছে ওর বাঘিনী বউটা। তৎক্ষণাৎ চলন থমকে কিঞ্চিৎ রাগী দৃষ্টি ফুটিয়ে ও বলল,,

— তুমি এখানে কি করছো? রুমে যাও!
ওর কন্ঠটা অদ্ভুত শোনালো। এতক্ষণের কৌতুকী ভাবটা রীতিমত উবে গিয়ে ইস্পাত কাঠিন্যেরা খুটি গেড়েছে সেথায়। তিয়াশা ভ্রু কুঁচকে বলল,,
— নিচে চেঁচামেচি হচ্ছে তাই।
— তা বলে তুমি বেরিয়ে আসবে?
তিয়াশা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই চূড়ান্ত ধমকে আরাভ বলল,,

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১০

— দেখো তুমি মানো আর না মানো,এই বাড়ির বউ তুমি।আরাভ খানের সহধর্মিনী-অর্ধাঙ্গিনী মিসেস আরাভ খান। নিচে নানা মানুষ রয়েছে।আর আরাভ খান নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে কারো সামনে প্রদর্শন করতে পছন্দ না।
অজানা আবেশে থমকে গেল তিয়াশার পদযুগল। তর্ক করারও সুযোগ পেল না ও আর আগেই সেখান থেকে প্রস্থান করল আরাভ।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here