ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৪
নওরিন কবির তিশা
চৈত্রের শেষ প্রহর ও আসন্ন বৈশাখের ক্রান্তিলগ্নে প্রকৃতি যেন এক রুদ্রভৈরবী মূর্তি ধারণ করেছে,এক অদ্ভুত তাম্রাভ আভা গ্রাস করেছে চরাচর। তপ্ত রৌদ্রের প্রখর তীব্রতায় রাজপথের পিচ গলে যাওয়ার উপক্রম, আকাশে এক ফোঁটা মেঘের চিহ্নও নেই। তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছে ব্যস্ত নগর জীবন।
সকাল সকাল আরাভ নিজেই তিয়াশাকে কলেজ অবধি পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে। যাওয়ার সময় কড়া গলায় হুমকি দিতেও ভোলেনি যেন কোনো চালাকি করার চেষ্টা না করা হয়।তবে ওর হুমকি যে শুধু বলা অবধি থেমে নেই সেটা তিয়াশার জ্ঞান সীমানার বহির্ভূত নয়। ও খুব ভালো করেই জানে ওকে সর্বক্ষণ নজরে রাখার জন্য আরাভ অন্তত দশজন প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছে।
ক্লাস শেষ হতেই এক বুক ক্লান্তিতে নিশ্বাস ছাড়ল তিয়াশা। অস্বস্তিকর তপ্ত সে দ্বিপ্রহরে,ও নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধু আদ্রিতার সাথে গল্প করতে করতে করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। আদ্রিতা ওর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া এবং এই অদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুড়ছিল, আর তিয়াশা নিজের ভেতরের ঝড়টুকু আড়াল করে বড্ড সাবধানে উত্তর দিচ্ছিল। ঠিক তখনই ওদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে বিশ-বাইশ বছরের একটা অচেনা ছেলে বিনীত ভঙ্গিতে তিয়াশাকে সালাম দিল,,
— আসসালামু আলাইকুম, ভাবি।
তিয়াশা আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ছেলেটা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে অত্যন্ত যত্ন করে পলিথিনে মোড়ানো একখানা ঠান্ডা কোকের ক্যান আর একটা ম্যাগনোলিয়া আইসক্রিম তিয়াশার দিকে বাড়িয়ে দিল। তিয়াশা মহাবিস্ময়ে কিছুটা কঠোর গলায় শুধালো,,
— এসব কী? আর আপনি কে? আমাকে এসব দিচ্ছেন কেন?
ছেলেটা মৃদু হেসে মাথা নিচু করে নির্দেশনা অনুযায়ী ভদ্র স্বরে বলল,,
— আরাভ ভাইয়ের নির্দেশ, ভাবি। উনি বললেন এই কড়া রোদে আপনার নাকি খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই ক্লাস শেষ হতেই যেন এই ঠান্ডা কোক আর আইসক্রিমটা আপনার হাতে পৌঁছায়া দিই। আপনি প্লিজ এটা নিন, নইলে ভাইয়া আমার চাকরি খায়া দিব!
আরাভ ভাই শব্দটা কান অব্দি পৌঁছাতেই তিয়াশার মেজাজের পারদ এক লাফেই সপ্তমে চড়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে,ডাগর চক্ষুদ্বয় পাকিয়ে ছেলেটার দিকে চেয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,,
— আপনার ভাইকে গিয়ে বলবেন, ওনার এই সস্তা কেয়ারিং দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আর এই আইসক্রিম-কোক ওনার ওই ডাস্টবিন মার্কা মুখে যেন উনি নিজেই ঢেলে দেন! নিয়ে যান এগুলো আমার সামনে থেকে!
এদিকে ওর এমন রূপে ছেলেটার পরান পাখি উড়াল দেওয়ার অবস্থা। তার ওপর আরাভের কড়া নির্দেশ,‘ভাবি জুতার বাড়ি মারলেও হাসতে হাসতে কেলাইতে কেলাইতে তা গ্রহণ করবি!’এখন যদি সত্যি সত্যি এই মেয়ে জুতার বাড়ি মারে! না না বাবা সম্মান নিয়ে বেঁচে পালানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ছেলেটা খাবারগুলো কোনোমতে সম্মুখে রেলিংয়ের ওপর স্থির রেখে উল্টো দিকে ছুটে পালালো। এতক্ষণ যাবৎ প্রস্তরমূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে সমস্ত ঘটনাটা বেশ মনোযোগী হয়ে অবলোকন করল আদ্রিতা। ছেলেটা চলে যেতেই ও তিয়াশাকে হালকা কনুইয়ের গুঁতা দিয়ে বললো,,
— উফ তিয়ু! বুঝলাম জোর করে বিয়ে করেছে, কিন্তু জামাই তো তোর দেখি পুরাই নেক্সট লেভেলের কেয়ারিং রে! এই ভরদুপুরে রোদের মাঝে তোর গলা শুকিয়া যাচ্ছে ভেবে ডিরেক্ট স্পেশাল ফোর্স পাঠিয়ে দিল? সাইকো হলে কী হবে, বান্দা কিন্তু সেই রোমান্টিক!
তিয়াশা আদ্রিতার দিকে একরাশ খুনী চাউনি হেনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,,
— তুই আর একটাও ফালতু কথা বলবি না আদ্রু! ও কোনো কেয়ারিং দেখাচ্ছে না, ও মূলত আমাকে চোখে চোখে রাখার জন্য ওর আন্ডারগ্রাউন্ডের চামচাদের এখানে সেট করে রেখেছে। নিজের খাঁচার বন্দি পাখিটা ডানা ঝাপটাচ্ছে কি না, সেটাই চেক করছে ওই জল্লাদটা। চল এখান থেকে, আমার দম বন্ধ লাগছে!
ক্যাম্পাসের এই অংশটুকুতে সবুজের সমারোহ কিঞ্চিৎ কম হলেও, মহীরুহের নিবিড় ছায়ায় স্থানটি বেশ স্নিগ্ধ ও সুশীতল। তিয়াশা আর আদ্রিতা ক্লান্ত চরণে এসে তেমনই এক ছায়াবৃত কাঠের বেঞ্চিতে আসীন হলো। মধ্যাহ্নের তপ্ত হাওয়া এখানে এসে যেন কিছুটা শান্ত রূপ ধারণ করেছে। তিয়াশা যখন নিজের তপ্ত ললাটের ঘাম মুছছিল, ঠিক তখনই আচমকা পেছন হতে এক অতি পরিচিত গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,,
— সুইটহার্ট?
শব্দটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই তিয়াশার সমগ্র অবয়ব মুহূর্তের মধ্যে আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল। অপমানের তীব্র জ্বালায় ওষ্ঠাধর কাঁপতে লাগল ওর। ও আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে, তীব্র আক্রোশে পেছন ফিরে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল,,
— আপনার কি বিন্দুমাত্র লোকলজ্জা নেই? সবার সামনে এভাবে সম্বোধন করতে আপনার রুচিতে বাঁধে না, মিস্টার আরাভ…!
বলতে বলতেই তিয়াশার কণ্ঠস্বর মাঝপথে অবরুদ্ধ হয়ে গেল। সম্মুখের দৃশ্যে ওর চোখ দুটো ছানাবড়া। সেথায় আরাভ খান নামক কোনো দুর্ধর্ষ মানবের অস্তিত্বই নেই! বরং বিশ-বাইশ বছরের এক চ্যাংড়া যুবক আপন মনে বটবৃক্ষের তলে দাঁড়িয়ে ফোনে তার প্রেমিকাকে ওই নামে সম্বোধন করছে।
তিয়াশার এমন অপ্রস্তুত কাণ্ড অবলোকন করে আদ্রিতা আর নিজের হাসির বেগ সংবরণ করতে পারল না। ও সোফাসদৃশ বেঞ্চিটার ওপর প্রায় ভেঙে পড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। অতঃপর তিয়াশার কাঁধে এক মৃদু ধাক্কা দিয়ে টিপ্পনী কাটল,,
— উফ তিয়ু! তুই মানিস আর না মানিস, ওই সাইকোটার সুইটহার্ট ডাকটা তোর মন মস্তিষ্কে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে এখন বাতাসে ওই শব্দ ভাসলেই তোর মনে হয় তোর পরম প্রিয় স্বামী-ই বুঝি তোকে ডাকছেন! আহা কিতনা পেয়ার!
তিয়াশা লজ্জায় আর অপমানে যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। তবে পরক্ষণেই নিজের সমস্ত লাজুকতা আর আবেগ পা দিয়ে পিষে ও মুখটা ভীষণ রকম কুঁচকে, আদ্রিতাকে একখানা জ্বলন্ত চাউনি উপহার দিয়ে বলল,,
— একদম বাজে বকবক করবি না আদ্রু! ওই জল্লাদের নাম শুনলেও আমার গা গুলিয়ে বমি আসে। আমি তো কেবল ভাবলাম ও আবার কোত্থেকে আমার শান্তি নষ্ট করতে চলে এলো!
আদ্রিতা ভ্রু নাচিয়ে রহস্যময় হাসল,,
— তাই? নাকি মনে মনে চাচ্ছিস বান্দা সত্যিই আসুক? একেই বোধহয় বলে–মুখে নেই, মনে আছে!
— আদ্রু, তুই যদি আর একটাও কথা বলিস, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি তোর সাথে কড়া ঝগড়া করে ফেলব!
— সুইটহার্ট?
ঠিক তখনই, অত্যন্ত নিখুঁত ও গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর পুনরায় ধেয়ে এলো সম্মুখ হতে। তবে এবার আর কোনো ভুল হলো না। তিয়াশা ও আদ্রিতা যুগপৎ সম্মুখ পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখল, ক্যাম্পাসের বহির্গমন দ্বারের ঠিক সম্মুখে, এক কালো ক্রাউন গাড়ির বনেটে দুই হাত গুঁজে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ খান।
চোখে দামি কালো চশমা, ঠোঁটের কোণে চিরচেনা ক্রুর অথচ মারাত্মক মনকাড়া এক বক্র হাসির রেখা। মধ্যাহ্নের প্রখর রৌদ্রালোক ওর তীক্ষ্ণ অবয়বে পড়ে এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ও রোদচশমাটা সামান্য নামিয়ে, চোখ টিপে তিয়াশার উদ্দেশ্যে দূর হতেই হাত নাড়ল। তিয়াশা ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাতেই পাশ থেকে আদ্রিতা ফের টিপ্পনী কেটে বলল,,
— সুইটহার্ট?
আদ্রিতার এহেন কাণ্ডে মেজাজের বারুদ যেমন চড়ছিল তেমনি লজ্জায় লুকানোর কোনো অতল গহ্বর খুঁজে পাচ্ছিল না তিয়াশা, ঠিক তখনই দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে সেই ভারী পুরুষালী কণ্ঠস্বর পুনরায় ভেসে এলো,
— সুইটহার্ট?
আদ্রিতা এবার ফের হেসে উঠলো তিয়াশা দাঁতে দাঁত চেপে আদ্রিতার দিকে এক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সটান কদমে ক্যাম্পাসের বহির্গমন দ্বারের দিকে এগিয়ে গেল। আরাভ তখনো সেই দামি কালো ক্রাউন গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে ঠিক যেন কোনো এক গ্রীক দেবতার মতো নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তিয়াশা ওর ঠিক সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে, নিজের গলার রগ ফুলিয়ে অত্যন্ত তীব্র ক্ষুব্ধ কণ্ঠে শুধাল,,
— হোয়াট ইজ দিস ননসেন্স? আপনি সব সময় পাবলিক প্লেসে এমন সস্তা রসিকতা কেন করেন? ওই বা”লমার্কা সম্বোধনটা বন্ধ না করলে আমি কিন্তু এবার সত্যিই কোনো মস্ত বড় কেলেঙ্কারী করে বসব!
— রিলাক্স, মাই ডিয়ার ওয়াইফি! রোদের তাপে তোমার ওই সুন্দর মস্তিষ্কটা বোধহয় বড্ড বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চলো, গাড়িতে ওঠো। আই ডোন্ট লাইক এনি কাইন্ড অফ সিন হিয়ার।
তিয়াশা আর কোনো বাকবিতণ্ডায় না জড়িয়ে হড়মড় করে গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল এবং জানালা দিয়ে বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে একদম নিশ্চল হয়ে রইল। ওর এই ভয়ানক থমথমে ভাব আর মুখ ফুলিয়ে থাকাটা আরাভের চোখ এড়াল না। ও গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে অত্যন্ত যত্নে তিয়াশার দিকে ঝুঁকে এল। তিয়াশা আতঙ্কে সিটের সাথে লেপ্টে যেতেই আরাভ কোনো জোরাজুরি না করে কেবল ওর সিট বেল্টটা টেনে লক করে দিল।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই তিয়াশা তীব্র ক্ষোভ আর অবজ্ঞা নিয়ে একদম হাপুসহুপুস করে একরাশ বিরক্তি উগড়ে দিল। আরাভ আড়চোখে ওর সেই আরক্তিম ললাট আর ওষ্ঠাধরের কম্পন অবলোকন করে পুনরায় বেশ রসিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,,
— তা সুইটহার্ট? আইসক্রিম আর কোকটা পছন্দ হয়নি?
সুইটহার্ট শব্দটা পুনরায় শ্রবণগোচর হতেই তিয়াশা সদ্য বিস্ফোরিত আগ্নেয়গিরির ন্যায় ফেটে পড়ল। ও আরাভের দিকে সটান ফিরে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও মরিয়া গলায় চিৎকার করে বলল,,
— ইয়্যু জাস্ট শাট আপ! একদম চুপ করে থাকুন আপনি! আর কোনোদিন, আই সে, কোনোদিন এই বিশ্রী নামে আমাকে সম্বোধন করবেন না! আপনি কি বোঝেন না যে আমি আপনাকে কতটা ঘৃণা করি? আপনার এই কুৎসিত সান্নিধ্য আমার প্রতিটা সেকেন্ডে দম বন্ধ করে দেয়!
তিয়াশার এই তীব্র ও নির্মম প্রত্যাখ্যানের জবাবে আরাভ ক্ষণিকের জন্যও গম্ভীর হলো না; বরং ওর ভেতরের সেই চিরন্তন খামখেয়ালি আর উগ্র রোম্যান্টিক সত্তাটা যেন এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠল। ও স্টেয়ারিং হুইলে এক হাত রেখে, অন্য হাত বাতাসে সামান্য দুলিয়ে, অত্যন্ত চমৎকার সুর ভাঁজ করে একদম উচ্চকণ্ঠে গেয়ে উঠল,,
তোর দিলের মিলে স্ট্যাম্প মেরে লিখে দেবো রে…
আমি তোর পেয়ারে লাল রে….
পেয়ারে লাল রে… আমি তোর পেয়ারে লাল রে
আরাভের এমন গানে তিয়াশা মহাবিস্ময়ে পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই মানুষটার রুচি আর আচরণের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই। ও এক বুক নিঃসীম ক্লান্তি আর চরম বিরক্তি নিয়ে পুনরায় জানালার বাইরে চেয়ে রইল, আর গাড়ির ভেতর তখন আরাভের সেই উদাত্ত কণ্ঠের গানের সুর প্রকৃতির সমস্ত রুদ্রতাকে ছাপিয়ে উঠলো মুহুর্তেই।
— মামি রুদ্র ভাইয়ের প্রিয় খাবার কোনটা?
— কেন? তুই রান্না করবি নাকি?
— হ্যাঁ, বলোনা প্লিজ।
নয়নিকার এহেন আবদারে বেঁকে বসলো রূপকথা বেগম,
— একদম না! ছোট মানুষ,হাত-পা পুড়িয়ে ফেলবি।
এই যে শুরু হয়ে গেল! এই ছোট মানুষ শব্দটা বড্ড বেশি বিরক্তিকর নয়নিকার জন্য। সে ছোট নাকি? এসএসসি পরীক্ষা তো দিয়েই ফেলেছে। কিছুদিনের মধ্যেই কলেজে ভর্তি হবে। তাহলে সে ছোট রইলো কই? ও ঘোর আপত্তি জানালো,,
— উফ মামি! ছোট বলবা না একদম! আমার এসএসসি শেষ হয়ে গিয়েছে দুইদিন পর কলেজে ভর্তি হব। আর বাড়িতে রান্নাবান্নার কাজ আম্মুর পাশাপাশি টুকিটাকি আমিও করি।
রূপকথা বেগম মৃদু হাসলেন,,
— তাই নাকি? তাহলে তো শাহানারাকে(নয়নিকার মা) বলতে হচ্ছে তোর বিয়ের ব্যাপারে!
নয়নিকা মুখ খানিক বাঁকিয়ে বলল,,– বলো গে; যদি তোমার সাধের ননদিনী শুনে।
রূপকথা বেগম এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না কিংবা সামলাতে চাইলেন না। বেশ শব্দ করে হেসে তিনি বললেন,,
— ওরে পাকনি! বিয়ে করার এত সাধ?
নয়নিকা মনে মনে বলল,,–অবশ্যই মামী! আর পাত্র যদি তোমার ছেলে হয়, তাহলে তো কথাই নেই! তবে মুখে বলল,,
— কি যে বলোনা!
রূপকথা বেগম হাসলেন নয়নিকার লাজুকতায়। পরপর বললেন,,
— আচ্ছা চল, দেখি কেমন রান্না করতে পারিস।
— চলো!
দুজনে মিলে রওনা হলো রান্না ঘরের উদ্দেশ্যে।
জমাটবদ্ধ কুহেলির আস্তরণ গ্রাস করেছে তাহের চৌধুরীর খাস কামরা। তাহের চৌধুরীর ঠিক উল্টো দিকে কাঠের চেয়ারটায় মেরুদণ্ড সোজা করে বসে আছে রুদ্রদ্বীপ। মুখের গম্ভীর রেখাগুলোয় স্পষ্ট প্রতীয়মান মস্তিষ্কের ভেতর কোনো এক জটিল সমীকরণের জাল বোনা হচ্ছে। নীরবতা ভেঙে রুদ্রদ্বীপ অত্যন্ত ধীর তবে ইস্পাতকঠিন গলায় বলল,,
— স্যার, আরাভের বিরুদ্ধে কোনো ফাইনাল লিগ্যাল অ্যাকশন নেওয়ার পূর্বে আমাদের সবার আগে তিয়াশার সাথে ওয়ান-টু-ওয়ান কথা বলা প্রয়োজন। উই নিড টু টক টু হার ফার্স্ট।
তাহের চৌধুরী রুদ্রর দিকে চাইলেন। ওনার চোখের কার্নিশের সংশয় টুকু মুহূর্তেই বুঝে ফেলে রুদ্রদ্বীপ পুনরায় বলতে শুরু করল,,
— আইন নিজের গতিতে চলে ঠিকই স্যার, কিন্তু তিয়াশা যদি কোর্টে দাঁড়িয়ে একবারও অসম্মতি জানায়, তবে আইনের কোনো ক্ষমতা নেই ওকে ওই বা-স্টার্ডের খাঁচা থেকে ফিরিয়ে আনার। দ্য হোল কেস ডিপেন্ডস অন হার স্টেটমেন্ট। আমাদের আগে জানতে হবে, ঠিক কী বলে ওই ক্রিমিনালটা ওকে ব্ল্যাকমেইল করছে। হোয়াট ইজ দ্য রুট অফ দিস থ্রেট?
তাহের চৌধুরী টেবিলের ওপর রাখা পেপারওয়েটটা হাত দিয়ে সামান্য ঘোরাতে ঘোরাতে ভারী গলায় বললেন,,
— তুমিও তো আগেরদিন দেখলে বাবা, তিয়াশা নিজের মুখে বলল ও স্বেচ্ছায় গিয়েছে। ওই হারামজাদাটা এমন কোনো জাল বুনেছে, যার বাইরে বের হওয়ার পথ আমার মেয়েটা খুঁজে পাচ্ছে না।
রুদ্রদ্বীপ এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো,,
— স্যার, তিয়াশার চোখের ওই আতঙ্ক আমি খুব ভালো করে রিড করেছি। দ্যাট ওয়াজ পিওর হেল্পলেসনেস! আরাভ খান অত্যন্ত সাইকোপ্যাথিক একটা চাল চেলেছে। মে বি কোনো পার্সোনাল ডেটা, কোনো ডক বা ফ্যামিলির কোনো সিকিউরিটি থ্রেট। যতক্ষণ না তিয়াশা নিজে আমাদের কাছে মুখ খুলছে, ততক্ষণ আমাদের অফিশিয়াল রেইড সম্পূর্ণ ইল-লজিক্যাল হয়ে দাঁড়াবে। ও যদি সেখানে সেফ জোনে থাকার ভান করে, তবে মিডিয়া আর অপোজিশন আমাদের ডিপার্টমেন্টকে ধুয়ে দেবে। সো, উই হ্যাভ টু বি ভেরি কশাস।
তাহের চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। ওনার ক্লান্ত চোখের কোণে আবার সেই চূর্ণপিতৃত্বের স্পষ্ট হলো। রুদ্রদ্বীপ ওনার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে পরম আশ্বাসের সুরে বলল,,
— আপনি একদম ভেঙে পড়বেন না, স্যার। আমি অলরেডি একটা ইনফরমাল সোর্স রেডি করেছি। আগামীকালই হোক বা পরশুই হোক, আরাভের চোখের আড়ালে তিয়াশার সাথে একটা সিক্রেট কোঅর্ডিনেশন তৈরি করব। জাস্ট আ ফিউ মিনিটস অফ কনভারসেশন। তিয়াশা যদি একবার গ্রিন সিগন্যাল দেয়, তবে ওই আরাভ খানের পুরো সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে আমার চব্বিশ ঘণ্টাও সময় লাগবে না। দ্যাট ইজ মাই ওয়ার্ড, স্যার।
ঘরের ভেতরের গুমোট আবহাওয়াটা একটু হালকা হয়ে এলো। তাহের চৌধুরী ওনার ডান হাতটা রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শুধু বললেন,
— সাবধানে পা ফেলো বাবা, মেয়েটা আমার বড্ড একা হয়ে পড়েছে।
মধ্যাহ্নের সে উত্তপ্ত প্রহরাবসান ঘটিয়ে অপরাহ্নের ম্লান আলো তখন কক্ষের জানালায় এসে আছড়ে পড়ছে। দীর্ঘ দুই দিন যাবৎ তিয়াশার সাথে সমস্ত সংযোগ ছিন্ন প্রায় সবার। আজ যাও কলেজে যাওয়ার দরুন একটু দেখা মিলেছে দু-একজনের। সেই ঝড়ের রাতে আকস্মিক এই নরকে আসার প্রাক্কালে নিজের সেলফোনটি সঙ্গে আনার অবকাশটুকুও মেলেনি। বুকের ভেতরটা প্রতিটা মুহূর্তে পিতা-মাতার কুশলাদি জানার তীব্র ব্যাকুলতায় ছটফট করে, অথচ এক অবর্ণনীয় অসহায়ত্বের বেড়াজালে ও আজ আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি।
এমনই এক ভাবাকুল মুহূর্তে, কক্ষের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সুদৃঢ় পদক্ষেপে প্রবেশ করল আরাভ। ওর এক হাতে চকচকে মোড়কে আবৃত একটি চতুষ্কোণ বস্তু। তিয়াশা জানালার ধার থেকে সরে এসে সন্দিহান নেত্রে ওর পানে চাইল। আরাভ কোনো ভূমিকা না করে বস্তুটিকে তিয়াশার সম্মুখে প্রসারিত করে দিল।তিয়াশা ভ্রু যুগল কুঞ্চিত করে অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে শুধালো,,
— হোয়াট ইজ দিস?
আরাভ ঠোঁটের কোণে সেই চেনা অবাধ্য হাসির রেখা ফুটিয়ে বেশ মার্জিত স্বরে বলল,,
— খুলেই দেখো না, সুইটহার্ট।
তিয়াশা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোড়কটি আলতো হাতে গ্রহণ করল। উপরের ওই রেশমি রঙিন কাগজটি উন্মোচন করতেই ভেতরে একখানা সর্বাধুনিক দামি স্মার্টফোন দৃশ্যমান হলো। ও চকিতে আরাভের চোখের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,,
— কার জন্য আনা হয়েছে?
আরাভ খাটের কিনারায় পরম আয়েশে বসে ওর দিকে স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। অতঃপর চোখের মণি নাচিয়ে বলল,,
— আমার এই ঘরে সাপের মতো কিউট, আর তেজি একখান বউ আছে, এটা শুধু তার জন্যই।
তিয়াশা আরাভের বিচ্ছিরি রূপকে নাক কুঁচকে ফোনের বাক্সটিকে পাশের কাঁচের টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে তীব্র অবজ্ঞার সাথে বলল,,
— আই ডোন্ট নিড দিস। আমি এটা কোনো অবস্থাতেই নিব না।
আরাভের কপাল ভেদ করে সূক্ষ্ম এক কুঞ্চন রেখা জেগে উঠল। ও কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,,
— বাট হোয়াই? কেন নেবে না?
তিয়াশা দুই হাত বুকের ওপর শক্ত করে বেঁধে, তেজস্বী গলায় বলল,,
— কারণ আপনার এই অবৈধ উপার্জনের কোনো সামগ্রী তিয়াশা চৌধুরী জীবনেও স্পর্শ করবে না। ওসব নোংরা টাকার বিলাসিতা আমার আত্মসম্মানে বাঁধে।
‘অবৈধ’ শব্দটা শোনামাত্রই আরাভের ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেন মুহূর্তেই সজাগ হলো। ওর এতক্ষণের শান্ত ও ভদ্র অবয়বটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। ও আসন ছেড়ে এক লাফে তিয়াশার সম্মুখে এসে দাঁড়াল এবং চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় তিয়াশার দুই বাহু আঁকড়ে ধরে এক তীব্র ঝাঁকুনি দিল। ওর চোখের তারা তখন ক্রোধে আরক্তিম। ও দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসে উঠে বলল,,
— হোয়াট ডিড ইয়্যু জাস্ট সে? আমার টাকা অবৈধ? তোমার কী ধারণা, আরাভ খান কি রাস্তায় রাস্তায় চুরি-বাটপারি কিংবা ফুটপাতে চাঁদাবাজি করে বেড়ায়, হ্যাঁ? হাউ ডেয়ার ইয়্যু কোশ্চেন মাই আর্নিং!
বাহুর ওপর ওমন দানবীয় শক্তির চাপে তিয়াশা যন্ত্রণায় কিঞ্চিৎ কুঁকড়ে গেল ঠিকই, কিন্তু ওর চোখের ভেতরের অকুতোভয় দীপ্তি বিন্দুমাত্র ম্লান হলো না। ও নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আরাভের সেই লোহার মতো শক্ত হাত দুটোকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় বলল,,
— ওগুলো না করলেও আপনি নিজে তো এক পয়সাও উপার্জন করেন না, মিস্টার আরাভ খান! এটা তো আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির টাকা! যেদিন নিজের সৎ উপার্জনের টাকায় একটা সামান্য কিছুও কিনে এনে দিতে পারবেন, সেদিন অন্তত পুরুষালি অহংকার নিয়ে বলবেন যে নিজের বউকে কিছু গিফট করেছেন! এর আগে নয়!
তিয়াশার এই চরম বাস্তবধর্মী এবং তীক্ষ্ণ বাক্যবাণটি সরাসরি গিয়ে আঘাত করল আরাভের পুরুষত্ব ও আত্মমর্যাদার গহীনতম কেন্দ্রে। ওর হাতের মুষ্টি আলগা হয়ে এলো। ও ধীর চরণে এক কদম পিছিয়ে গেল। কক্ষের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক থমথমে নীরবতা বিরাজমান হলো। আরাভ নিজের অবিন্যস্ত চুলগুলো এক হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিল। তারপর তিয়াশার দিকে এক গভীর, তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চোয়াল শক্ত করে বলল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৩
— ওকে, ফাইন! ওটা ওখানেই থাক, ওটা ছোঁয়ার দরকার নেই তোমার। তবে একটা কথা মনে রেখো তিয়াশা— এর পরের বার যখন তোমার সামনে কিছু এনে দাঁড় করাব, ওটা এই আরাভ খানের নিজের গায়ের রক্ত পানি করা টাকায় কেনা থাকবে।
কথাটা শেষ করেই আরাভ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
