Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১
নওরিন কবির তিশা

-‘ আরে ওই যে তিয়াশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলেকে না চিনে থাপ্পড় মারায় মন্ত্রীর ছেলে ওকে কিস করেছে না! জানিস না এটা তো এখন কলেজের মোস্ট গসিপ টপিকে পরিণত হয়েছে।
তনুর কথায় নেহাল ধপ করে বসে পড়লো সবুজ আবৃত বিস্তীর্ণ মাঠটিতে। বিস্ফোরক নেত্রে চেয়ে আছে ও, নিজের কৌতুহল মেটাতে ও শুধালো,
-‘ তিয়াশা মানে?
তনু কপালে কয়েকস্তরের এক বিশাল ভাঁজ ফেলে অবাক হওয়ার ভান করল। যেন তিয়াশাকে না চেনাটা এই ক্যাম্পাসে কোনো বড়সড় অপরাধ। ও হাত নেড়ে বলল,
-‘ আরে, তুই তিয়াশাকে চিনিস না? ওই যে ডিআইজি তাহের চৌধুরীর একমাত্র আদরের মেয়ে! যাকে নিয়ে কলেজের অর্ধেক ছেলের রাতের ঘুম হারাম হয়।
নেহলের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এতদিন যাবত একপাক্ষিক ভালোবেসে যাওয়া তীব্র অনুরাগ মিশ্রিত মেয়েটার নামটা কর্ণগোচর হতেই হৃদয় দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো ওর। পাশ থেকে অরোরা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,,

-‘ তারপর? তারপর কী হলো? ডিআইজির মেয়ে বলে কথা, ওর বাবা কি ছেড়ে দিয়েছে?
তনু চিবুক উঁচিয়ে বলল,
-‘ ছাড়বে কেন? ওই রাতেই পুরো শহর তোলপাড় হয়ে গেছে। মন্ত্রীর ছেলে অর্থাৎ আরাভ তো ওই রাতেই লাল দালানের দেখা পেয়েছে। ডিআইজি চৌধুরী নিজের ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করেছেন।
অরোরা চোখ বড় বড় করে বলল,,
-‘ বলিস কী! আমার ক্রাশকে জেলে ঢুকিয়ে দিল? বাই দ্যা ওয়ে রে মন্ত্রী ছেলেকে জেলে পোরা এত ইজি?
-‘ আরে বললেই হলো? মন্ত্রী হতে পারে, কিন্তু অপরপক্ষ তো ডিআইজি! পাওয়ার কি উনারও কম নাকি? নিজের মেয়ের সাথে এমন বিহেভিয়ারে ডিআইজি সাহেব হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন? ইমপসিবল! উনি উনার পুরো ফোর্স আর কন্ট্যাক্ট ইউজ করে ফেলেছেন ওই এক রাতেই।
অরোরা এখনো যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ও কপাল কুঁচকে শুধালো,
-‘ তা বুঝলাম। কিন্তু মন্ত্রীর রিঅ্যাকশন কী? আনোয়ার খান কি নিজের ছেলেকে জেলে পচে মরতে দেবেন? উনি কিছু করেননি?
তনু দুই হাত ওল্টালো,
-‘ আরে ভাই, আমি কি সিআইডিতে চাকরি করি? ভাইয়া রাতে বাসায় ফিরে জাস্ট এইটুকু বলল যে মন্ত্রীর ছেলে অ্যারেস্ট হয়েছে। ব্যস, ওটুকুই জানি। এরপর ভেতরে ভেতরে কী ডিল হয়েছে বা মন্ত্রী কী চাল চালছেন, সেটা তো আর আমার জানার কথা না!

বেলা চড়েছে; ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁই ছুঁই। ডিআইজি অফিসের বিশাল কামরায় এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই; কক্ষের চারপাশ নিস্তব্ধ হলেও বাইরে পুলিশি পাহাড়ার কড়াকড়ি আর ‌দরজার ওপাশে দর্শনার্থীদের ভিড়ে কোলাহল স্পষ্ট।তাহের চৌধুরী বসে একাগ্র চিত্তে একটা ফাইল দেখছিলেন। চোখে রিডিং গ্লাস, কপালে পেশাদারিত্বের ভাঁজ। এমন সময় তার ব্যক্তিগত কার্যনির্বাহক দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। খানিকটা ইতস্তত করে সে ডিআইজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ স্যার, আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন। উনাকে কি ভেতরে আসতে বলব?
ডিআইজি চৌধুরী ফাইল থেকে চোখ না তুলেই কিছুটা গম্ভীর গলায় বললেন,
-‘ এখন? অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে উনার?
পিএস নিচু স্বরে জানাল,

-‘ না স্যার, তবে উনি বললেন আপনার সাথে দেখা করাটা উনার জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি।
তাহের চৌধুরী এবার চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর কলমটা ডেস্কে রেখে সংক্ষিপ্ত স্বরে বললেন,
-‘ আসতে বলো।
কার্যনির্বাহক মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরেই দরজার ভারী পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন একজন দীর্ঘদেহী মানুষ। পরনে ধবধবে শুভ্র পাঞ্জাবি, চেহারায় বেশ গাম্ভীর্য তবে চোখেমুখে এক প্রচ্ছন্ন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট,
‌ -‘ আসসালামু আলাইকুম, ডিআইজি সাহেব।
ডিআইজি তাহের চৌধুরী ধীরস্থিরভাবে চোখ তুলে তাকালেন। আনোয়ার খান উত্তরের অপেক্ষা না করেই সামনের খালি চেয়ারটা টেনে জাঁকিয়ে বসলেন। সালামের উত্তর দিয়েই ডিআইজি তাহের চৌধুরী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবার ফাইলে মনোনিবেশ করে শীতল কন্ঠে শুধালেন,
-‘ কিছু বলতে চান?
আনোয়ার খান পাঞ্জাবির হাতাটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

-‘ কী বলতে চাই সেটা তো আপনি ভালো করেই জানেন। আমার ছেলেকে আপনি মাঝরাতে তুলে এনেছেন, কোনো ওয়ারেন্ট বা শক্ত এভিডেন্স ছাড়াই। কাজটা কি ঠিক হলো?
তাহের চৌধুরী এবার ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করলেন। রিডিং গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মন্ত্রীর দিকে,,
-‘ এভিডেন্সের কথা বলছেন? ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজ আর ‌শত শত প্রত্যক্ষদর্শী আছে। একজন গেজেটেড অফিসারের মেয়ের শ্লীলতাহানি করাটা কি আপনার ছেলের কাছে নিছক মজা ছিল? আমি কেবল একজন ডিআইজি হিসেবে নয়, একজন বাবা হিসেবেও আমার দায়িত্ব পালন করেছি।
আনোয়ার খান একটু নড়েচড়ে বসলেন,,
‌-‘ দেখুন তাহের সাহেব, ওরা অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে। আবেগ বা ঝোঁকের মাথায় কিছু করে ফেলতে পারে। তিয়াশাও তো ওকে চড় মেরেছিল, তাই না? একটা চড় আর একটা কিস—দুটোকেই ইকুয়াল ধরে নিয়ে বিষয়টা মিটমাট করা যায় না? আমি এসেছি একটা সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে।
তাহের চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
-‘ সমঝোতা? আপনার ছেলে যেটা করেছে সেটা ক্রিমিনাল অফেন্স। আইনের ভাষায় একে অ্যাসল্ট বলা হয়। আর আমার মেয়ে তো ওকে এমনি এমনি থাপ্পড় মারেনি। ও এর আগেও একটা মেয়েকে ইভটিজিং করছিল আমার জানামতে। সো,আমি আমার মেয়েকে ফুল সাপোর্ট করি।আপনার পদের ক্ষমতা ব্যবহার করে আপনি হয়তো অনেক কিছু ধামাচাপা দিয়েছেন, কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ ভুল বেছেছেন।
আনোয়ার খান দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি নিচু স্বরে বললেন,

‌ -‘ ভেবে দেখুন তাহের চৌধুরী। সামনে ইলেকশন। আপনার প্রমোশনটাও আটকে আছে। আমি চাইলে আধঘণ্টার মধ্যে আপনার ট্রান্সফার অর্ডার করিয়ে দিতে পারি। আরাভকে ছেড়ে দিন, আমি কথা দিচ্ছি তিয়াশার কাছে ও ক্ষমা চেয়ে নেবে।
তাহের চৌধুরী মন্ত্রীর সরাসরি এরূপ প্রস্তাবে বজ্রকন্ঠে বললেন,,
-‘ আপনার এই নোংরা প্রস্তাবটা আমার দপ্তরের বাইরে গিয়ে অন্য কোথাও দেবেন আনোয়ার সাহেব। ভুল করবেন না, আমি এখানে ডিআইজি হিসেবে বসে আছি, কোনো নিলামের টেবিলে নয়। আপনার ছেলেকে আমি আইনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের নীতি বিক্রি করব না।
আনোয়ার খান এবার উঠে দাঁড়ালেন। শুভ্র বসনের আড়ালে লুকায়িত মানুষটার আসল রূপ এবার বেরিয়ে এল। তার চেহারার সেই কৃত্রিম বিনয় মূহুর্তেই উবে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল চরম আক্রোশ। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
-‘খুব বেশি আদর্শ দেখাচ্ছেন তো? মনে রাখবেন, ক্ষমতার চাকা সব সময় একদিকে ঘোরে না। আমি ভদ্রভাবে বলতে এসেছিলাম, আপনি মানলেন না। এর পরিণাম কী হতে পারে সেটা দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
বলেই তিনি কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে গটগট পদক্ষেপে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। পর্দার ওপাশে তার চলে যাওয়ার শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরও তাহের চৌধুরী স্থির হয়ে বসে রইলেন। এটা নতুন কিছু নয় তার জন্য। প্রায়শ হয়ে এমন হুমকি-ধামকির শিকার হন তিনি বড় বড় ব্যক্তিবর্গ হতে। তাই এটা স্বাভাবিক বিষয়েই পরিণত হয়েছে তার কাছে।

ডিআইজি অফিস থেকে বেরিয়েই আনোয়ার খান সরাসরি থানায় আসলেন; সেন্ট্রি পুলিশরা থতমত খেয়ে স্যালুট দিলেও তিনি কারো দিকে ফিরে চাইলেন না। লক-আপের সামনে যেতেই দেখলেন, লোহার গরাদের ভেতরে মেঝেতে বসে আছে আরাভ। উশকোখুশকো চুল, দামি শার্টটা কুঁচকানো। বাবাকে দেখেই ও এক লাফে উঠে দাঁড়াল। দুহাতে গরাদ ধরে আশাবাদী কণ্ঠে বললো,,
-‘ বাবা! তুমি এসেছ? নিয়ে চলো আমাকে এখান থেকে। ওই ডিআইজি আর ওর মেয়েকে আমি দেখে নেব। তুমি জাস্ট আমাকে বের করো!
আনোয়ার খান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ছেলের এই অবস্থা দেখে তার বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়লে গেলেও মুখে কাঠিন্য ধরে রাখলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,
-‘ তোমার এই পাগলামির জন্য আজ আমাকে ডিআইজির দরজায় গিয়ে কথা শুনতে হয়েছে আরাভ। সে কোনোভাবেই তোমাকে ছাড়তে রাজি নয়।
আরাভ বিস্ফোরক নেত্রে চাইল। দাঁতে দাঁত চেপে বাবার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলল,,
-‘ হ্যোয়্যাট? তুমি না এই দেশের মন্ত্রী? তোমার এক কথায় না পুরো শহর কাঁপে? আর সামান্য একজন ডিআইজি তোমাকে না করে দিল? শেইম অন ইয়্যুর পাওয়ার বাবা ! নিজের ছেলেকে মুক্ত করার ক্ষমতা যদি না থাকে, তবে এই চেয়ারে বসে থেকে লাভ কী?
ছেলের মুখে এমন তিক্ত কথা শুনে আনোয়ার খানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তবে তিনি তাকে কিছু না বলে পাশের টেবিলে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওসির দিকে ফিরলেন। এই থানার ওসি, রফিকুল ইসলাম, লোকটা স্বভাবতই একটু সুবিধাবাদী আর ক্ষমতার অনুরাগী। মন্ত্রীকে নিজের চোখের সামনে এভাবে অপদস্থ হতে দেখে সে ইতিমধ্যেই ঘামতে শুরু করেছে। ওসির দিকে আঙুল উঁচিয়ে আনোয়ার খান গর্জে উঠলেন,,

-‘ রফিকুল সাহেব! এটা কী হচ্ছে? আমার ছেলে ২৪ ঘণ্টা ধরে এই নরকের ভেতর পড়ে আছে, আর আপনি হাত গুটিয়ে বসে আছেন?
ওসি রফিকুল তোতলাতে তোতলাতে বললেন,,
-‘ স্যার… স্যার ভুল বুঝবেন না। আমি তো আপনার লোকই। কিন্তু ওপর থেকে ডিরেক্ট ডিআইজি সাহেবের অর্ডার। উনি প্রতি ঘণ্টায় আপডেট নিচ্ছেন। সিসিটিভি ফুটেজগুলোও উনার কন্ট্রোলে। আমি যদি এখন ডিসিশন পাল্টাই, আমার চাকরি তো যাবেই, সাথে বিভাগীয় মামলাও হবে।
আনোয়ার খান টেবিলের ওপর সশব্দে চাপড় দিলেন,,
-‘ চাকরি যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন? মনে রাখবেন, ডিআইজি বদলি হয়, কিন্তু সরকার থাকে। আমার ছেলের গায়ে যদি একটা আঁচড়ও পড়ে, তবে এই থানার প্রতিটি পুলিশ অফিসারের উর্দি আমি নিজ হাতে খুলব। আমি আজ চললাম, তবে কাল ভোরের আগে যদি আরাভ আমার ড্রয়িংরুমে না পৌঁছায়, তবে এর পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আপনার কল্পনার বাইরে।
ওসি রফিকুল শুকনো ঢোক গিললেন। তিনি চাটুকারিতার সুরে বলতে চাইলেন,,
-‘ স্যার, আমি চেষ্টা করছি। ভেতরে ভেতরে একটা লুপহোল খোঁজার চেষ্টা করছি যদি ডিআইজি সাহেবকে না জানিয়ে কিছু করা যায়…
-‘ চেষ্টা নয়, রেজাল্ট চাই!
আনোয়ার খান আর এক মুহূর্ত দণ্ডায়মান রইলেন না। দাম্ভিকতার সহিত প্রস্থান করলেন সেখান থেকে।

থমথমে নীরবতা প্রকট সমগ্র ড্রয়িংরুম জুড়ে। তিয়াশা সোফায় বসে আনমনে নখ খুঁটছে, আর ওর মা রেহানা বেগম কপালে হাত দিয়ে পায়চারি করছেন। তিয়াশার সাহসী পদক্ষেপে গর্ব থাকলেও একজন মা হিসেবে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তাকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে।রেহানা বেগম তিয়াশার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কিছুটা অনুযোগের সুরে বললেন,
-‘ টিয়া, তুই কাজটা না করলেই পারতিস রে মা। মন্ত্রীর ছেলে বলে কথা! চড়টা না মারলে হয়তো ঘটনাটা এতদূর গড়াতো না।
তিয়াশা মাথা তুলে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-‘ মা, তুমি আমায় সব সময় কী শিখিয়েছ? অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সয়, দুজনেই সমান অপরাধী। ও সবার সামনে একটা মেয়েকে হ্যারাস করছিল, আমি জাস্ট রুখে দাঁড়িয়েছি। সেখানে ও আমাকে অপমান করার সাহস পায় কী করে? আমি ডিআইজি তাহের চৌধুরীর মেয়ে, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা আমার র’ক্তে নেই।
রেহানা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের পাশে বসলেন। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-‘ আমি জানি তুই ঠিক করেছিস। কিন্তু ক্ষমতার লড়াই বড় নোংরা হয় রে মা। তোর বাবার ওপর দিয়ে এখন কত ঝড় বয়ে যাচ্ছে তুই জানিস না।

-‘ জানি মা।
তিয়াশা মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরল,, -‘ কিন্তু বাবাও তো অন্যায়ের সাথে আপস করেন না। আজ যদি আমি চুপ থাকতাম, তবে কাল ও আরও দশটা মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ করে দিত। মা, তুমি অন্তত আমার ওপর ভরসা রাখো।
মেয়ের দৃঢ়তা দেখে রেহানা বেগমের দুশ্চিন্তা যেন কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো। তিনি মৃদু হেসে তিয়াশাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন,,
-‘ বাদ দে। যা হওয়ার দেখা যাবে। আর আমি আমার মেয়েকে সাপোর্ট করি। সে কোনো ভুল করতে পারে না।
তিয়াশা হেসে মাকে জড়িয়ে ধরলো; আদুরে গলায় বলল,,
-‘ আম্মু;!

রাত তখন পৌনে নয় টা। শ্রান্ত শরীরে বাসায় প্রবেশ করলেন তাহের চৌধুরী। ওনাকে ভেতরে প্রবেশ করতেই রেহানা বেগম ব্যস্ত হয়ে উঠলেন; দ্রুত রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস শরবত নিয়ে এগিয়ে এলেন। তাহের চৌধুরী সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘাড়টা সামান্য এলিয়ে রেখেছেন, চোখ দুটো বোঁজা। রেহানা বেগম আলতো করে ডাকলেন,
-‘ এই যে, ধরো। আগে একটু শরবতটা খেয়ে নাও, শরীরটা ঠাণ্ডা হবে।
তাহের চৌধুরী চোখ মেলে চাইলেন। স্ত্রীর হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকে অর্ধেকটা শেষ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস হাতঘড়িটা খুলে পাশে রাখতে রাখতে শুধালেন,
-‘ টিয়া কই? রুমে?
রেহানা বেগম মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
-‘ হ্যাঁ, ওর ঘরেই আছে। অনেকক্ষণ ধরেই স্টাডি করছে।

তাহের চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হালকা স্বরে বললেন,
-‘ মন্ত্রীর সাথে আজ অফিসে বেশ কিছু কথা হয়েছে। লোকটা দমবার পাত্র নয়। রেহানা, সামনে সময়টা হয়তো আমাদের জন্য একটু কঠিন হতে পারে। টিয়াকে চোখে চোখে রেখো।
রেহানা বেগম স্বামীর কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন,,
-‘ তুমি ভেবো না। আমাদের মেয়ে অতটা কাঁচা নয়। তুমি আগে ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি খাবার বাড়ছি।
তাহের চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রেশ হয়ে এসে তিনি ধীরপায়ে তিয়াশার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজায় আলতো টোকা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন। দেখলেন তিয়াশা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বইয়ে মুখ গুঁজে আছে। বাবার উপস্থিতি টের পেয়ে তিয়াশা ঘুরে তাকাতেই তাহের চৌধুরীর ক্লান্ত মুখটাতে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
তিনি ঘরে ঢুকে তিয়াশার মাথায় হাত রেখে বললেন,,
-‘ আমার মা জননী কি খুব ব্যস্ত? বাবার সাথে একটু কথা বলার সময় হবে কি?
তিয়াশা বই বন্ধ করে বাবার হাতটা জড়িয়ে ধরল। এই এক স্পর্শেই যেন তাহের চৌধুরীর সারা দিনের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। বাবার দিকে তাকিয়ে তিয়াশা দুষ্টুমি করে বলল,

-‘ ডিআইজি সাহেবের সাথে কথা বলার জন্য তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে বাবা, তবে আমার জন্য সেটা সব সময় ফ্রি!
তাহের চৌধুরী মেয়ের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। তিয়াশার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে তিনি মৃদু হেসে বললেন,
-‘ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই যখন সুযোগ পেলাম, তখন সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তা কী পড়ছিলে শুনি? এই বয়সে কি শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকলেই চলে? জীবনটা তো শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য নয়।
তিয়াশা বাবার কাঁধে মাথা রেখে চটপটে গলায় উত্তর দিল,
-‘ জানি তো বাবা! জীবনটা সাহসের সাথে বাঁচার জন্য। যেমনটা তুমি সব সময় বলো। কিন্তু বাবা, আজকের পর তুমি কি আমার ওপর খুব রেগে আছো? মানে, আরাভ খানের মতো একজনের সাথে ওইভাবে পাঙ্গা নেওয়াটা কি আমার ভুল ছিল?
তাহের চৌধুরীর চোখে এবার এক গর্বিত পিতার ন্যায় তিয়াশার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
-‘ ভুল? আমার মামনি যেটা করেছে সেটা করতে অনেক সাহস লাগে। এই সমাজ বা আইন হয়তো অনেক সময় আপসের কথা বলে, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো কিছু জেতা যায় না। আরাভ যে অন্যায়টা করেছে, তার উপযুক্ত জবাব তুমিই দিয়েছ।
তিয়াশা বাবার দিকে সোজা হয়ে তাকিয়ে বলল,

-‘ সবাই বলছে মন্ত্রীর ছেলে বলে ও পার পেয়ে যাবে। কিন্তু আমি জানি, আমার বাবা যতক্ষণ এই চেয়ারে আছেন, ততক্ষণ অন্যায়টা অত সহজে ধামাচাপা পড়বে না।
তাহের চৌধুরী পরম নির্ভরতার সুরে বললেন,

-‘ একদম ঠিক। ও কার ছেলে সেটা বড় কথা নয়, ও একজন অপরাধী—এটাই ওর আসল পরিচয়। তুই নিশ্চিন্তে থাক টিয়া, তোর বাবা কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করবে না। তুই আজ শুধু নিজেকে নয়, ওই ক্যাম্পাসের প্রতিটি মেয়ের সম্মানের জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিস। আমি তোকে নিয়ে গর্ব করি, মা।
তিয়াশা এবার মনের সমস্ত কালোমেঘ কাটিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। এক কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও বাবার এই মানসিক সাপোর্ট যেন তাকে এক নিমিষেই অনেক বেশি শক্তিশালী করে দিয়েছে। তিয়াশা হাসিমুখে বলল,
-‘ থ্যাঙ্ক ইউ বাবা! তুমিই আমার সুপার হিরো।

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here