Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৬
মেহজাবিন নাদিয়া

মেঘের আবরণ ছিঁড়ে আকাশের কোণে একফালি রোদ উঁকি দিয়েছে অনেক আগেই। চারপাশের প্রকৃতি বৃষ্টির পরশে হয়ে উঠেছে সতেজ। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণার জলের শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে।
বিছানার আরামদায়ক কাতানে শুয়ে গভীর ঘুমে আছে অরি। পরনে সারিমের শার্ট। ঘুমের ঘোরে মেয়েটা বারবার হাঁচি তুলছে, বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে তার।সারিম বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, মুখটা অরির কাছে ঝুঁকে আছে। হাত দিয়ে তাকে ভালোভাবে ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছে, যেন মেয়েটার ঠান্ডা না লাগে।
রিসোর্টে ফিরে এসেছে সারিম অনেক আগেই, তখন অরি জেগে ছিল। সকাল হতেই তারা সেখানকার কিছু পাহাড়ি মানুষদের দেখতে পায়। তাদের থেকে পথ অনুসরণ করে ফাইনালি রিসোর্টে পৌঁছায়। এখানে এসে অরি আর সারিম ফ্রেশ হয়ে একটু শুয়ে ছিল। রাতে তাদের দুজনের কারোরই ঠিকমতো ঘুম হয়নি। এর মধ্যে অরি আবার ঠান্ডা বাঁধিয়ে বসেছে।পাহাড়েই সারিমের ফোনটা অরি হারিয়ে এসেছে, তাই সারিম এখানে সরাসরি কল করে ডাক্তার আনতে পারেনি। সেজন্য বিকালে অরিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান আছে তার। পাশাপাশি অরিকে শহরটা এখনো ঘুরে দেখানো হয়নি। সারিম ভাবলো, অরিকে ভালো কোনো জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবে, এতে যদি মেয়েটার মন হালকা হয়।

কালকের পাহাড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর থেকে অরি ভীষণ ভয় পেয়েছে। মনে মনে অপরাধবোধে মেয়েটা দগ্ধ হচ্ছে। সারিমের সাথে মেয়েটা ঠিকভাবে কথা বলেনি।
হঠাৎ দরজায় বেল বাজতেই সারিমের ভাবনায় ছেদ পড়লো। সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। সামনে একটা রিসোর্টের স্টাফ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে খাবারের ট্রে। সারিম স্টাফের হাত থেকে ট্রেটা নিলো, স্টাফটা সেখান থেকে চলে গেলো। সারিম ভিতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। খাবারটা টেবিলের উপর রেখে, চলে গেলো ওয়াসরুমে ফ্রেশ হতে।সারিম যেতেই এমন সময় পিটপিট করে চোখ খুলে ঘুম ভেঙে গেলো অরির। বিছানা হাতড়ে আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও সারিমকে দেখতে না পেয়ে ধরফর করে উঠে বসলো সে। আশেপাশে সারিমকে খুঁজতে লাগলো। ওয়াসরুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ পেয়ে বুঝলো সারিম ওয়াসরুমে।
অরি ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালো রুমে থাকা বড় আয়নাটার সামনে। দাঁড়াতেই নিজের অবয়বটা নজরে এলো। গায়ে থাকা শার্টটা খামচে ধরলো অরি একবার। গতকাল ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা এখনো দাগ কেটে আছে তার মনে। নিজের উপর ধিক্কার আসছে তার। তার এই জেদের কারণে যদি তার বাচ্চাদের কিছু একটা হয়ে যেতো। ভাবতেই বুকটা হুহু করে উঠলো তার। অজান্তেই দুহাত চলে গেলো অরির পেটের কাছে। দুচোখ তার ছলছল করে উঠলো। তার ভুলের জন্য এরাও মরতে বসতে পারতো।এমন সময় ওয়াসরুম ছেড়ে বের হলো সারিম। অরিকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুচোখ ছলছল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুঝে গেলো মেয়েটা এখনো সেই ব্যাপারে ভেবে দুঃখ পাচ্ছে।সারিম দ্রুত এগিয়ে এলো অরির কাছে, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে। সারিমের উপস্থিতি পেতেই দুহাত সারিমের হাতের উপর রাখলো অরি, চোখ বুজলো সে।

“আম সরি সারিম। আমার জন্য এতো…।””হুশ”
সারিম অরির ঠোঁটে হাত দিয়ে অফ করে দিলো।এরপর বলল। “যা হওয়ার হয়েছে বউ। এসব ভেবে আর মন খারাপ করো না। সব ভুলে যাও। তুমি আর আমার সন্তানরা সেফ আছে, এটাই আমার কাছে সব।”
বলেই সারিম অরির পেটে হাতের সাহায্যে কাতুকুতু দিতে থাকলো। অরি খিলখিল করে হেসে উঠলো। “সারিম কি করছেন? আমার খুব হাসি পাচ্ছে। ছাড়ুন বলছি।”
সারিম অরির ঘাড়ে একটা শব্দ করে চুমু একে দিলো। “ঠিক এভাবেই হাসবে। আমি আমার চন্দ্রিমার মুখে সবসময় হাসি দেখতে চাই।”
অরি হঠাৎ সারিমকে জিজ্ঞেস করে উঠলো, “আচ্ছা সারিম, আপনি এতো ভালো কেন বলুন তো? সবার স্বামী যদি আপনার মতো হতে পারতো।”
সারিম মুচকি হাসলো। “হঠাৎ এতো ভালোবাসা দেখাচ্ছো যে? ব্যাপার কি বউ?”
অরি লজ্জা পেয়ে বলল, “কিছুই না। এমনিই।”

“এমনিই? বিশ্বাস হচ্ছে না।”
“আপনাকে করতে হবে না বিশ্বাস। ছাড়ুন তো আমায়। ফ্রেশ হতে যাবো।”
সারিমকে নিজের কাছ থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল অরি,
সারিম তাকে ছেড়ে দিলো। অরি ফ্রেশ হতে চলে গেলো। ফ্রেশ হয়ে ওয়াসরুমের দরজা খুলে বের হতেই দেখলো সারিম টেবিলে তার জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছে। অরি মুচকি হাসলো। সারিম তাকে হাতের ইশারায় সোফায় বসতে বলল।সারিম অরিকে সোফায় বসালো। তারপর নিজেও পাশে বসে গেলো। অরি কিছু বোঝার আগেই সারিম তাকে আলতো করে কোলে তুলে নিলো।অরি বড় বড় চোখ করে বলল,”একি ! কি করছেন?”সারিম অরির কথায় কান দিলো না। প্লেট থেকে খাবার নিয়ে চামচে করে অরির মুখের সামনে ধরলো। “চুপ করে খাও। কাল তোমার উপর অনেক ধকল গেছে। এখন আর কোনো কথা না।”অরি আর কিছু বললো না। সারিমের চোখে এত মায়া দেখে সে চুপচাপ মুখ খুললো। সারিম একটু একটু করে নিজ হাতে অরিকে খাইয়ে দিলো। প্রতিবার খাবার দেওয়ার সময় তার চোখে ছিল শুধু যত্ন।অরি মুগ্ধ হয়ে সারিমের দিকে তাকিয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো,মানুষটা তাকে কত ভালোবাসে!হয়তো প্রকাশ করেনি। তবুও অরি জানে সারিম তাকে কতো ভালোবাসে।খাওয়া শেষ হলে সারিম অরিকে এক গ্লাস পানি খাইয়ে দিলো। তারপর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,”এবার আমরা একটু বের হবো। রেডি হও।”

অরি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় যাবো?”
সারিম মুচকি হেসে বলল,
“গেলেই দেখবে।”
এক ঘণ্টা পর তারা রিসোর্ট থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠলো। সারিম অরিকে নিয়ে যাচ্ছে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা।মূলত হসপিটালে যাবে সে। কালকের ঘটনার পর অরি আর পেটের বাচ্চারা ঠিক আছে কিনা,সেটা চেকাপ করার জন্যই যাওয়া।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অরি অবাক হয়ে গেল।সে ভেবেছিল উগান্ডা একটা গরিব, পিছিয়ে পড়া দেশ। কিন্তু কাম্পালা দেখে তার সব ধারণা পাল্টে গেল।
চারপাশে সবুজ পাহাড়। রাস্তাগুলো অনেক পরিষ্কার আর চওড়া। উঁচু উঁচু সুন্দর বিল্ডিং। রাস্তায় দামি দামি গাড়ি চলছে। শহরটা দেখতে খুব সুন্দর আর গোছানো।
অরির চোখ আটকে গেল রাস্তার মানুষদের দিকে।বেশির ভাগ মানুষী কৃষ্ণবর্ণের অধিকারী। আফ্রিকান মানুষেরা ব্যস্ত পায়ে এদিক-সেদিক হেঁটে যাচ্ছে। অরি কৌতূহল ভরে ওদের দেখতে লাগলো। উজ্জ্বল আর রঙিন আফ্রিকান পোশাকে এখানকার নারী-পুরুষদের বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। তাদের মুখের হাসি আর অমায়িক চালচলন দেখে বোঝা যায় তারা কতটা আন্তরিক। অচেনা এই দেশ, অচেনা মানুষ আর ভিন্ন এক পরিবেশ অরির কাছে একদম নতুন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা মনে হতে লাগলো। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি এসে পৌঁছালো কাম্পালার এক সুবিশাল প্রাইভেট হাসপাতালের সামনে। হাসপাতালের আধুনিক স্থাপত্য আর ঝকঝকে পরিবেশ দেখে অরি আরও একবার অবাক হলো। এখানে বিশ্বমানের সব চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

সারিম অরির হাত শক্ত করে ধরে গাড়ি থেকে নামলো। অরি সারিমের হাত ধরে হাঁটতে লাগলো,ভাবতে লাগলো মানুষের না জানা কত রূপ ছড়ানো রয়েছে এই পৃথিবীতে! আধুনিক আর সবুজ একটা দেশ আফ্রিকান উগান্ডা।সারিমের সাথে আসার অভিজ্ঞতাটা সত্যিই তার জীবনের সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে।হসপিটালের ভিতরে ঢুকতেই ঠান্ডা এসির বাতাস আর ওষুধের হালকা গন্ধ নাকে লাগলো অরির। চারপাশটা একদম ঝকঝকে। নার্সরা সবাই ছোটাছুটি করছে।
সারিম অরির হাত ধরে সোজা রিসেপশনে চলে গেলো।গলার স্বরটা শান্ত করে বলল।”একজন গাইনোলজিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে।”
রিসেপশনিষ্ট মেয়েটা মুচকি হেসে বললো, “ডক্টর নাকওয়াসির চেম্বার, ৩০৪ নম্বর রুম। ১৫ মিনিট পর ডাকতে পারবো।”সারিম মাথা নাড়লো। অরিকে পাশের বসার জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বললো, “ভয় পেয়ো না। আমি আছি।”কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নাম ধরে ডাকা হলো। সারিম অরিকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকলো। ডাক্তার একজন মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা। হাসিমুখে অরিকে বসতে বললেন। অনেকক্ষণ ধরে কথা শুনলেন, পেট চেক করলেন।তারপর একটা লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দিলেন।

“ব্লাড টেস্ট, আল্ট্রাসাউন্ড আর প্রেসার চেক করাতে হবে।সব নিশ্চিত হওয়া দরকার।”ডাক্তারের রুম থেকে বের হয়েই সারিম সোজা ক্যাশ কাউন্টারে চলে গেলো। পকেট থেকে কার্ড বের করে সব বিল আগেই মিটিয়ে দিলো। অরিকে এক সেকেন্ডের জন্যও লাইনে দাঁড়াতে দিলো না।
এরপর শুরু হলো দৌড়াদৌড়ি। ব্লাড দেওয়া, আল্ট্রাসাউন্ড রুম, ওয়েটিং এরিয়া। এই পুরো সময়টা সারিম অরির ছায়ার মতো পাশে ছিলো।যখন সুঁই ফোটানো হচ্ছিল, সারিম শক্ত করে অরির হাত চেপে ধরেছিলো।”একটু সহ্য করো বউ, হয়ে যাবে।” কানে কানে ফিসফিস করে বলছিলো।
আল্ট্রাসাউন্ডের সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সারিমের চোখে পানি চলে আসছিলো। অরি সেটা দেখে নিজেই সারিমের হাত শক্ত করে ধরলো।ঘণ্টা দুয়েক পর সব টেস্ট শেষ হলো। ডাক্তার বললেন, “রিপোর্ট বিকেল ৪টার দিকে পেয়ে যাবেন। এখন আপনারা বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে পারেন।”
সারিম অরির দিকে তাকিয়ে বললো, “রিসোর্টে গিয়ে বোরিং হয়ে রুমে বসে থাকার দরকার নেই। চলো, ততক্ষণে শহরটা ঘুরে আসি।”
অরি মাথা নাড়লো।

হসপিটাল থেকে বের হয়েই তারা গাড়িতে বসলো।বিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামলো কাম্পালার সবচেয়ে বড় আর নামকরা শপিং মল “অ্যাসেল মল”-এর সামনে।
বিশাল কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই অরির চোখ ধাঁধিয়ে গেলো।
চারতলা মল। উপরে ঝাড়বাতি। নিচে ফোয়ারা। দুই পাশে সারি সারি ব্র্যান্ডের দোকান। জামা-কাপড়, জুতা, ব্যাগ, ইলেকট্রনিক্স, কসমেটিক্স – কি নেই!
মলের মাঝখানে ছোট বাচ্চারা খেলছে, মানুষজন হাসতে হাসতে শপিং করছে। এসির ঠান্ডা আর হালকা মিউজিকের শব্দে জায়গাটা প্রাণবন্ত লাগছে।অরি সারিমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
“সারিম এখানে এসেছেন কেন?
সারিম বলল।”মলে মানুষ কেন আসে?”

“শপিং করতে।”তাহলে জিজ্ঞাসে করছিলে কেন?”এমনিই।”সারিম অরির হাত ধরে মলের আরও ভেতরে প্রবেশ করল। কিছুদূর এগোতেই সে অরিকে নিয়ে একটি মোবাইল ফোনের শোরুমে ঢুকে পড়ল।
সারিমকে শোরুমে ঢুকতে দেখে অরি না ডেকে পারল না। কিছুটা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, “সারিম, আমরা ফোনের শোরুমে কেন আসলাম?”সারিম একপলক অরির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ফোন কিনতে।”
কথাটা শুনতেই অরির তৎক্ষনাত মনে পরে গেলো।ঝড়ের প্রবতনায় অরি পাহাড় থেকে পরে যাওয়ার ফলে, সারিমের ফোনটা তার হাত ফোসকে পরে গেছে। সারিম অরিকে ভেতরে নিয়ে একটি কাস্টমার চেয়ারে বসিয়ে দিল। এরপর সেলস বয়কে ডেকে দ্রুত ফোন দেখাতে বলল।সেলস বয় বেশ কয়েকটি মডেলের ফোন সারিমের সামনে এনে সাজিয়ে রাখল। সারিম ফোন পছন্দ করার পেছনে মোটেও বেশি সময় নষ্ট করল না। ঝটপট দুটি একই মডেলের ফোন পছন্দ করে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করল। তারপর অরির হাত ধরে শোরুম থেকে বেরিয়ে আসলো।শোরুম থেকে বের হওয়ার পর তারা মলের অন্যান্য দোকানে ঘুরতে লাগল। অরি নিজের পছন্দমতো বেশ কিছু জিনিস কেনাকাটা করল। শুধু নিজের জন্যই নয়, নিজের কেনা পোশাক ও অন্যান্য জিনিসের সাথে মিল রেখে জেবার জন্যও একদম একই রকম জিনিস পছন্দ করে রাখল কিনলো সে। পুরোটা সময় অরির ভারী ব্যাগগুলো সারিম নিজের হাতেই বহন করে চলল, একটাবারও বিরক্তি প্রকাশ করল না।

পছন্দমতো কেনাকাটা শেষ করে অরি সারিমকে নিয়ে একটি বড় ঘড়ির শোরুমে গিয়ে ঢুকল। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে একটি চমৎকার
আকর্ষণীয় রূপালী রঙের রোলেক্স ঘড়ি পছন্দ করল অরি।সারিম কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “ঘড়িটা কার জন্য নিচ্ছ?”অরি ঘড়িটি বাক্সে রাখার আগে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। তারপর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল, “বাবার জন্য। আপনি ভুলে গেলেন।সামনেই বাবার জন্মদিন! আর উনি ঘড়ি পরতে ভীষণ ভালোবাসেন।”
সারিম অরির কথা শুনে একটু ভাবনায় পড়ে গেল। সত্যিই তো, আরিশান মৃধার জন্মদিন একদম মাথার ওপর! অথচ নিজের ছেলে হয়ে সে বাবার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিনের কথা এভাবে ভুলে গেল কীভাবে? অবশ্য আরিশান মৃধা নিজে কখনো জন্মদিন পালন করা পছন্দ করেন না, তাই সারিমেরও বিষয়টিতে খুব একটা খেয়াল থাকে না। তবে প্রতি বছর বাবাকে উইশ জানাতে সে কখনোই ভুল করে না। গত পাঁচটা বছর বাবার কাছ থেকে দূরে থাকার কারণেই হয়তো এবার মন থেকে দিনটার কথা একটু বের হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে ঘড়িটি কিনে তার বিল মিটিয়ে সারিম আর অরি মল থেকে বের হয়ে সোজা পার্কিং লটের দিকে হেঁটে গেল। অরি একটু আগেই গিয়ে গাড়ির সামনের সিটে বসে পড়ল। সারিম শপিংয়ের ব্যাগগুলো পেছনের সিটে গুছিয়ে রেখে এসে ড্রাইভিং সিটে বসল।ড্রাইভিং সিটে বসার সময় তার হাতে দুটি ফোনের বাক্স ছিল-কিছুক্ষণ আগে কেনা সেই দুটো ফোন। অরি শোরুমে থাকার সময় খেয়াল না করলেও এবার সারিমের হাতে দুটি একই ব্র্যান্ডের প্যাকেট দেখে বেশ অবাক হলো। একজন মানুষ হঠাৎ দুটো এক রকম ফোন নিয়ে কী করবে, তা জানতে কৌতূহল চাপাতে পারল না সে।অরি জিজ্ঞেস করল, “আপনি দুটো ফোন কেন কিনলেন?”সারিম একটি প্যাকেট আনবক্স করে ভেতর থেকে ফোনটি বের করল। নিজের ওয়ালেটে থাকা সিম কার্ডটি খুলে ফোনে সেট করে প্রয়োজনীয় সেটিংস ঠিক করে নিল। তারপর অন্য অব্যবহৃত ফোনের বাক্সটি অরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এটা তোমার জন্য।”
অরি চোখ বড় বড় করে তাকাল। লোকটা তার জন্য নতুন ফোন কিনেছে! অরি হাত বাড়াল না, বরং বেশ স্পষ্ট সুরেই নাকচ করে দিয়ে বলল, “আমার নতুন ফোনের কোনো দরকার নেই সারিম। আমার অলরেডি বাড়িতে একটা ফোন আছে। ওটাও নতুন, খুব বেশি দিন হয়নি কিনেছি। আপনার ফোন আপনিই রাখুন।”সারিম অরির কোনো কথা কানে নিলো না। একপ্রকার জোর করেই অরির কোলে ফোনটি বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ওই ফোনের আশা একদম বাদ দাও, বউ। ওইটা বর্তমানে কবরে চলে গেছে। এখন বাধ্য মেয়ের মতো এটা নিজের কাছে রাখো।”
অরি ফোনটি হাতে নিতে নিতে অবাক হয়ে বলল, “কবরে গেছে মানে? কী বলছেন আপনি?”

সারিম গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে দিতে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল, “আমি নিজ হাতে আছাড় মেরে ওটা ভেঙে ফেলে এসেছি।”কথাটা শুনে অরি আঁতকে উঠল। তার মনের ভেতরের রাগটা চেপে রাখতে না পেরে ক্ষোভের সাথে বলল, “আপনি আমার ফোন আছাড় মেরে ভেঙে ফেলেছেন! কিন্তু কেন? কী দোষ ছিল আমার ফোনের?”
সারিম আড়চোখে অরির দিকে তাকিয়ে একদম নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “আমাকে না জানিয়ে, পর পুরুষের সাথে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলে কেন? তার শাস্তি।”
“শুধু এই কারণে আপনি আমার এত সাধের ফোনটা ভেঙে ফেলবেন? আপনি কি আদৌ আমাকে একটুও বিশ্বাস করেন না, সারিম?”
সারিম গাড়িটি সচল করে সামনে তাকাতে তাকাতে বলল, “বিশ্বাস করি বলেই তো অন্য একটা কিনে হাতে তুলে দিয়েছি।নয়তো সারাজীবনের জন্য তোমাকে ফোন ছাড়াই রাখতাম।”

অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটির অদ্ভুত যুক্তি আর জেদের সাথে কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই বুঝে সে। চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটি একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামল। দুপুর পেরিয়ে বিকেল গড়িয়ে এসেছে, শপিংয়ের ঝোঁকে সময়ের দিকে দুজনের কারোরই নজর ছিল না। সারিম অরিকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের ভেতরে একটি নিরিবিলি টেবিলে গিয়ে বসল।চেয়ারে বসতেই অরি ক্লান্তিতে গা ঢেলে দিল। সারাদিন ধরে হসপিটাল দৌড়াদৌড়ি আর তারপর মল জুড়ে হেঁটে কেনাকাটা করার ফলে তার শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছিল।সারিম মনোযোগ দিয়ে অরির ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকাল। অরির শরীরের অবস্থা বিবেচনা করে সে ভারী খাবারের বদলে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার অর্ডার করার সিদ্ধান্ত নিল।সেজন্য অরির জন্য আলাদা তরল খাবার অর্ডার করল।কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েটার এসে তাদের টেবিলে গরম ধোঁয়া ওঠা মাশরুম সুপ, সুস্বাদু স্টেক এবং উগান্ডার অত্যন্ত জনপ্রিয় বিফ বল এবং সুগন্ধি রাইস এনে পরিবেশন করল।সারিম অরির দিকে সুপের বাটি এগিয়ে দিয়ে একটু শাসন মিশানো গলায় বলল, “একদম পুরোটা ফিনিশ করবে। একটুও যেন বাকি না থাকে।”অরি লক্ষ্মী মেয়ের মতো ছোট করে মাথা নাড়ালো। কথা না বাড়িয়ে দুজন একসাথে খাওয়া শুরু করল। খেতে খেতেই অরি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমরা রিসোর্টে কখন ফিরছি, সারিম?”
সারিম চামচটা মুখে দিয়ে বলল, “এখান থেকে খেয়ে আগে তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাব। ডাক্তারকে রিপোর্টগুলো দেখিয়ে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে তারপর রিসোর্টে ফিরব।”

“ওহ, আচ্ছা,” অরি মৃদু স্বরে বলল এরপর আবার খাওয়ার দিকে মন দিল।খাবার শেষ হতেই ওয়েটার এসে টেবিল পরিষ্কার করল। সারিম বিল পেমেন্ট করে অরিকে নিয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর তারা হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।হসপিটালে পৌঁছাতেই দেখা গেল, তাদের পরীক্ষার রিপোর্টগুলো আগেই প্যাথলজি থেকে ডেলিভারি হয়ে গেছে। ডাক্তার ততক্ষণে রিপোর্টগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে ফেলেছেন। অরি ও সারিম দরজা নক করে কেবিনে প্রবেশ করতেই লেডি গাইনোলজিস্ট তাদের দেখে হাসিমুখে ইংরেজিতে কথা বলে উঠে। তাদের বসতে বলে।”প্লিজ কাম সিট!”কেবিনের ভেতরটা নিস্তব্ধ। এসির ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ডাক্তারের কাগজ উল্টানোর খসখস শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।ডাক্তার রিপোর্টের ফাইলটা বন্ধ করে চশমার উপর দিয়ে প্রথমে অরির দিকে তাকালেন। তারপর সারিমের দিকে।”আপনার শারীরিক অবস্থা এখন অনেক ভালো মিসেস। কোনো ইনফেকশন নেই। রক্তচাপও স্বাভাবিক। এত বড় ধকলের পর এটা ভালো খবর” ডাক্তার নরম গলায় বললেন।অরি ছোট করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। সারিমের মুখের এতোক্ষন শক্ত ভাবটাও একটু কমল।

ডাক্তার এরপর কম্পিউটারের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে দিলেন। সেখানে চারটে ছোট ছোট বিন্দু পাশাপাশি।
“আর দ্বিতীয় খবরটা… যেটা আপনারা হয়তো আগেই আন্দাজ করেছিলেন।” ডাক্তার একটু থেমে হাসলেন। “আপনি একসাথে চারজনকে কনসিভ করেছেন। কোয়াড্রুপলেটস।”শব্দটা কানে যেতেই অরির বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে তাকাল সারিমের দিকে।
সারিম একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হাসপাতালে সবসময় অরির পেটের দিকে তাকিয়ে তার মনের ভেতর যে সন্দেহটা খাচ্ছিল, সেটাই আজ সত্যি হলো।
“আমার ধারণাই ঠিক ছিল বউ” সারিম ফিসফিস করে অরিকে বলল। অরি ভিশন লজ্জা পেলো বোধয়।এরপর সারিম গলা পরিষ্কার করে ডাক্তারকে বলল, “ডক্টর, আপনি সিওর?”

“একদম সিওর,” ডাক্তার মাথা নাড়লেন। “চারটে আলাদা হার্টবিট আছে। তবে যেহেতু একসাথে চারজন, তাই রিস্ক একটু বেশি। আপনাকে এখন থেকে কঠোরভাবে রেস্টে থাকতে হবে। স্ট্রেস নেওয়া যাবে না। ভারী কোনো কাজ না। ঠিকমতো ঘুম আর পুষ্টিকর খাবার।সবসময় একজন কনসালটেন্ট চেকাপে রাখবেন”অরি মাথা নাড়ল। খুশির সাথে সাথে একটা চাপা ভয়ও কাজ করছিল।
কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে ডাক্তার হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা আপনারা কোন দেশ থেকে এসেছেন? আপনাদের অ্যাকসেন্টটা একটু ভিন্নরকম লাগছে।”
সারিম উত্তর দিল, “আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি ডক্টর।”কথাটা শুনেই ডাক্তারের চোখ চকচক করে উঠল।”বাংলাদেশ! আমি নিজেও বাংলাদেশে গেয়েছিলাম ঢাকাতে প্র্যাকটিসের জন্য।সত্যিই ওখানকার মানুষ খুবিই অথিতিপায়ন।”সারিম অরি দুজনেই ডাক্তার এর কথা শুনে হাসলো।”থ্যাংক ইউ ফর দিস কমপ্লিমেন্ট।”ডাক্তার হেসে জানালো।”আপনার অনাগত সন্তানদের জন্য অনেক প্রার্থনা রইলো।”সারিম অরি দুজনেই এরপর ডাক্তার এর কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে।

কোর্টে চারদেওয়ালের ভেতর বাতাসটা ভারী হয়ে আছে। কাঠের টেবিলটার একপাশে বসে আছে নওমি, অন্যপাশে আলভি। মাঝখানে এক হাত দূরত্ব। আজ যেন যোজন যোজন দূরত্বের মতো মনে হচ্ছে।আলভি মাথা নিচু করে বসে আছে। তার হাতের আঙুলগুলো একটার সাথে আরেকটা শক্ত করে পেঁচানো। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে।মন থেকে ভীষণভাবে চাচ্ছে নওমি যেন আজ এই কাগজটায় সই না করে। সে বলতে চায়-“নওমি,একটা সুযোগ কি আমাকে দেওয়া যায় না?” কিন্তু মুখ ফুটে সেই কথাটুকু বলার সাহস তার নেই।নওমি ভুল কিছু বলেনি
বা এই মূহর্তে ডিভোর্স এর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুল কিছু করছে। আলভি তো একটা সামান্য অ্যাসিস্ট্যান্ট মাত্র। তার মতো মধ্যবিও ঘরের ছেলের পাশে নওমির মতো বড় বাড়ির মেয়ে মানায় না। তাদের দুই পৃথিবীর আকাশ-পাতাল তফাত। আলভি জানে, নওমি এখনো সারিমকে ভালোবাসে। যদিও সে খুব ভালো করেই বোঝে-সারিম কোনোদিনই নওমিকে নিজের করে নেবে না। সারিমের কাছে নওমি শুধুই একজন বন্ধু তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তার চন্দ্রিমার বিচরন। কিন্তু নওমি তা মানতে নারাজ, সে অন্ধের মতো সারিমকেই চেয়ে যাবে।

ভাবতেই আলভির বুকের ভেতর এক নিঃশব্দ হাহাকার জেগে ওঠে। ভালোবাসার মানুষকে চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখার এই যন্ত্রণা সহ্য করা যে কতটা কঠিন, তা আজ সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। উকিল সাহেব চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে নামালেন। ড্রয়ার থেকে খামের ভিতর মোড়ানো ডিভোর্সের কাগজ বের করে টেবিলের ওপর আলতো করে রাখলেন। তারপর খসখসে গলায় বললেন, “দেখুন, শেষবারের মতো ভেবে দেখুন। আমি কি পেপারস দুটো এগিয়ে দেব? আপনাদের দুজনের সম্মতি আছে তো?”আলভি একপলক নওমির দিকে তাকাল। নওমির মুখটা একদম ফ্যাকাশে, নিথর। আলভি ধীরে ধীরে নিজের দৃষ্টি আবার নিচে নামিয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার নীরবতাই জানিয়ে দিল, নওমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেই সে রাজি।উকিল সাহেব পেনটা ডিভোর্স পেপারের ওপর রেখে নওমির দিকে এগিয়ে দিলেন। “ম্যাডাম, সইটা এখানে করুন।”কলমটা হাতে নিল নওমি। কিন্তু ধাতব কলমটার স্পর্শে হঠাৎ তার আঙুলগুলো কেঁপে উঠল।

টেবিলের ওপর পেপারটা রাখা। এতক্ষণ যে সিদ্ধান্তটাকে ভীষণ সঠিক মনে হচ্ছিল, কলমটা কাগজে ছোঁয়ানোর ঠিক আগের মুহূর্তে নওমির বুকের ভেতর একটা অচেনা মোচড় দিয়ে উঠল। সে তাকাল আলভির দিকে।আলভির দিকে এর আগে কখনো এভাবে খেয়াল করে তাকানো হয়নি। ছেলেটার শার্টের কলারটা কিছুটা কুচকে আছে, চোখের নিচে জমে থাকা কালচে দাগগুলো স্পষ্ট বলে দিচ্ছে কয়েক রাত সে ঘুমায়নি। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করেনি বোধহয়। ছেলেটা সবসময় নওমিকে সংসার করার জন্য জ্বালালেও, কোনোদিন কোনো চাওয়া চাপিয়ে দেয়নি। নওমির সব অবহেলা, সব কটু কথা নিঃশব্দে সহ্য করে ভালোবেসে গেছে।হঠাৎ করেই নওমির মাথায় সারিমের চেহারাটা ভেসে উঠল। সারিমের বউ আছে। সে তার বউকে ভিশন ভালোবাসে যা ইতিমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে সারিমের সাথে সাক্ষাত হওয়ার পর নওমি বুঝতে পেরেছে।সারিম কখনো তাকে ভালোবাসেনি। আর ভাসবেও না, ভাবতেই মনটা এক মুহূর্তে কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।মনের ভেতর জমা হওয়া সব ভুল ধারণার মেঘ যেন পলকে কেটে গেল।নওমি বুঝতে পারল, ভালোবাসা আসলে স্টেটাস দেখে নয়। মন দেখে হয়।যেমন নওমির সত্যিকারের ভালোবাসা তো এই নিশব্দে বসে থাকা সাধারণ মানুষটার চোখের ভেতর লুকিয়ে আছে, যা সে এতদিন দেখতেই পায়নি।নওমি হাত থেকে কলমটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।হালকা করে একটা শব্দ হলো।উকিল সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন, “কী হলো ম্যাডাম? সই করবেন না?”

নওমি সোজা হয়ে বসল। আলভির চোখে এতক্ষনে অপার বিস্ময়।নওমি ডিভোর্স পেপার দুটো নিজের হাতে তুলে নিল। তারপর আলভির দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত দৃঢ় গলায় সেগুলো মাঝখান থেকে দু-টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল।”না, আমি ডিভোর্স দেব না। আমি আমার স্বামীর সাথেই বাড়ি ফিরব।” নওমির কণ্ঠটা কাঁপছে, কিন্তু তাতে আর কোনো দ্বিধা নেই।
আলভি চমকে উঠে দাঁড়াল, “ডাইনি.. আই মিন..নওমি… তুমি… তুমি কী বলছ এসব?”
নওমি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। টেবিলটা ঘুরে এসে একপ্রকার আছড়ে পড়ল আলভির বুকের ওপর। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আলভির কোমর। এতদিন ধরে কান্নাটা সে চেপে রেখেছে, তা ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ল আলভির শার্টের কাপড়ে।

“আমি কোথাও যাব না আলভি,” নওমি কেঁদে ফেলে বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি বড্ড ভুল জায়গায় আলো খুঁজছিলাম, অথচ আসল আলোটা তো আমার পাশেই ছিল। আমার কোনো টাকাওয়ালা পুরুষ চাই না, কোনো স্টেটাস চাই না। আমি শুধু তোমার ছোট্ট ঘরটাতে তোমার বউ হয়ে থাকতে চাই। তোমার ওই সামান্য বেতনের ছোট সংসারটাতেই আমি পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ হব। তুমি আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চল।”আলভি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যা শুনছে তা সত্যি। তারপর ধীরে ধীরে, খুব যত্ন করে সে নওমিকে তার নিজের দু-হাতে আগলে নিল। নওমির মাথায় হাত রেখে তার বিষণ্ণ বুকটা আজ পরম শান্তিতে ভরে উঠল।”কেন নয়।অবশ্যই নিয়ে যাবো আমি আমার বউকে। আমাদের একটা সুন্দর সংসার হবে। যেখানে কেবল সুখ আর সুখে পরিপূর্ণ থাকবে। আমার সংসারের রানী তুমি,আমি তোমার রক্ষক।”বাইরে বিকেলের হালকা মিষ্টি রোদ ফুটতে শুরু করেছে। দুটো ভুল ভাঙা মানুষের মন আজ অবশেষে তার সঠিক ঠিকানা খুঁজে পেল।এসব দেখে এতোক্ষন চেয়ারে বসে থাকা উকিল সাহেব মুচকি হেসে। চোখের চশমাটা খুলে নিলেন।যাক অবশেষে দুটি মানুষ তারা তাদের জীবনেও শ্রেষ্ঠ এবং সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছে। সবসময় দোয়া রইলো তাদের দাম্পত্য জীবন যেন সুখের হয়।

সময় সত্যিই বহমান,নদীর স্রোতের মতো তার অবিরাম চলাচল। হয়তো মানুষের চেয়েও তাদের ছুটে যাওয়ার তাড়া বড্ড বেশি। এই তো সেদিন অরি আর সারিম ঘুরতে গেল, অথচ দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল ছয়টা দিন। মন্ত্রালয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব পড়ায় সারিমকে ফিরে আসতে হচ্ছে; মূলত ভোরেরই ফ্লাইট তাদের। বাংলাদেশ পৌঁছাতে হয়তো আবার সেই রাত গড়িয়ে যাবে। সারিম বাবাকে সব জানিয়ে রেখেছে তাদের ফেরার কথা, আরিশান মৃধাও জেবাকে জানিয়েছিল। এখন কোনো এক দরকারি কাজে আরিশান মৃধা বিকেলের দিকে বাইরে গিয়েছিল।
​সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমেছে সেই কখন। দোতলার বারান্দায় বেজায় মুখ ভার করে বসে আছে জেবা। চোখে-মুখে বিষণ্ণতা স্পষ্ট, জীবনের প্রতি তার মোহময় টানটা এখন খুবই উদাসীন। আরিশান মৃধার প্রতিনিয়ত যান্ত্রিক আচরণের মাঝেও ভালোবাসার অভাব তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কী এমন হয় লোকটা তাকে একটু ভালোবেসে দু-চারটা মিষ্টি কথা বললে? তার সাথে আলাদা করে একটু সময় কাটালে? অথচ লোকটা প্রয়োজনের বাইরে কথা বলা তো দূরের কথা, জেবাকে যেন চিনতেই চায় না। শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করেই দায় সারে।​এসব কষ্টে জর্জরিত মেয়েটা আর কত একটা মানুষের এত গাম্ভীর্য সহ্য করবে? যখন জেবা পরিষ্কার বলেই দিয়েছে যে তার কাছে আরিশান মৃধাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্য কিছু নয়, সেখানে লোকটা বয়সের ব্যবধানের কথা ভেবে কখনো তার সাথে সহজ হতে চাইছে না। অথচ অরি আর সারিম দুজনে একে অপরকে ভালোবেসে নির্দ্বিধায় সবকিছু কী সুন্দর শেয়ার করে-বিষয়টা জেবার কাছে ভীষণ ভালো লাগে।

​ঠিক এর মাঝেই জেবা হঠাৎ অনুভব করল তার পিছে কারও উপস্থিতি। বিষয়টি বুঝতে খুব একটা সময় লাগল না জেবার, খুব সহজেই সে চিনে ফেলল এটি আরিশান মৃধা ছাড়া আর কেউ নয়। লোকটার উপস্থিতি জেবার মনে আলাদা এক উত্তাপের সৃষ্টি করল। জেবাকে একই ভঙ্গিমায় বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিশান মৃধা তার পাশে এসে দাঁড়াল। মেয়েটা কী নিয়ে এত ভাবছে, সেই মনের গতিপ্রকৃতি সে একটু বুঝতে চাইল। তবে জেবা আজ একেবারে নিশ্চুপ; আগের মতো কথা বলে কানের পোকা ঝালাপালা করে দিচ্ছে না। বিষয়টি আরিশান মৃধার কাছে খুব একটা ভালো লাগল না। তিনি নিজেই এগিয়ে এসে নিজের এক হাত জেবার কাঁধে রেখে হালকা চাপড় দিয়ে ডেকে উঠলেন, “লুনা।”​আচমকা কেঁপে উঠল জেবা। সহসা তার ধনুকের মতো শরীরটা বেঁকে বসল। ‘লুনা’ নামটা সে আগেও একবার এই লোকটার মুখে শুনেছে, কিন্তু তখন লোকটা তাকে বলেনি যে লুনা আসলে কে। মনে নানা রকমের বাজে জল্পনা-কল্পনা সাজিয়ে বসে থাকা জেবা ফিরে তাকিয়ে আরিশান মৃধার উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “লুনা কে, হানি?”

​আরিশান মৃধা জেবার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে সামান্য হাসলেন। মেয়েটা যে ভেতরে ভেতরে নেতিবাচক চিন্তা পুষে রেখেছে, তা তিনি ভালোই বুঝলেন। তাই নরম সুরে বললেন, “লুনা হচ্ছে আমার চাঁদ। খুবই একান্ত ব্যক্তিগত।”
​জেবা কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তা…হ…লে…তাহলে আমি কে?”আরিশান মৃধা জবাব দিলেন, “আমার সেই চাঁদ।”
অবাক হয়ে জেবা বলল, “আমি আপনার চাঁদ হলে, লুনা আপনার কে?”
​বোকা নারীর কথা শুনে আর না হেসে পারলেন না তিনি। শব্দ করে হেসে বলে উঠলেন, “তুমি একটা ভীষণ বোকা মেয়ে।”​জেবা এবার চটে গেল। একে তো লোকটা অদ্ভুত সব কথার প্যাচে ফেলে তাকে কিচ্ছু পরিষ্কার করছে না, তার ওপর এখন তাকে আবার বোকা বলছে! সে রাগে ফেটে পড়ে বলল, “আপনি জানেন, আপনি আসলে একটা বিটলার!”

​আরিশান মৃধা হঠাৎ হাসি থামিয়ে দিলেন। ভ্রু উচিয়ে তাকালেন জেবার দিকে। ‘হিটলার’ শুনলেও ‘বিটলার’ কখনো শোনেননি তিনি। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বিটলার কী?”
​জেবার সংক্ষিপ্ত জবাব- “হিটলারের বড় ভাই বিটলার! আপনি ঠিক সেরকম; ঘরে বউ থাকতে লুনা না ফুনা কোন চাঁদ-পরী নিয়ে ভাবছেন, আমাকে নিয়ে ভাবার একটুও সময় আপনার নেই। যত সব অবহেলা! শুধু আমার ক্ষেত্রেই যদি এমন হয়, তবে আমাকে ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?”​জেবার কথা শেষ হতে না হতেই আরিশান মৃধা তাকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ততক্ষণে লোকটার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এসেছে জেবার। এই মানুষটার সামান্য পরিমাণ ভালোবাসার ভাগও অন্য কাউকে দিতে সে একটুও ইচ্ছুক না।​আরিশান মৃধা আলতো হাতে জেবার চুলে হাত বুলিয়ে তার কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন। সব গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে জেবার চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে বললেন, “হুশ! কেঁদো না , সরি। আই রিয়েলি সরি। আমার ইনটেনশন তোমাকে হার্ট করা ছিল না, লুনা।”
​আবার সেই ‘লুনা’ নামটা শুনে জেবার মনে রাগ এসে গেলেও হঠাৎ তার খেয়াল হলো-লোকটা কি তবে তাকেই ‘লুনা’ বলল? বিষয়টি নিশ্চিত হতে সে বুক থেকে মাথা তুলল। আরিশান মৃধাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি লুনা কাকে বলছেন?”​আরিশান মৃধার সংক্ষিপ্ত জবাব, “তোমাকে।”

​আশ্চর্য হয়ে জেবা জিজ্ঞেস করল, “আমাকে? কিন্তু আমার নাম তো লুনা নয়!”
“কিন্তু আমার কাছে তুমি লুনাই। আমার ব্যক্তিগত চাঁদ, শুধুই একান্ত।”​জেবা আবারও জানতে চাইল, “কিন্তু কেন? আর লুনার সাথে চাঁদের কী সম্পর্ক?”​মৃদু হেসে আরিশান মৃধা জেবাকে দুইহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে খোলা আকাশের চাঁদের দিকে ইশারা করালেন। লোকটার এমন আচমকা স্পর্শে সামান্য কেঁপে উঠল জেবা, তবে মুহূর্তটা তার ভীষণ ভালো লাগল।​আরিশান মৃধা বলতে শুরু করলেন, “লুনা মানেই চাঁদ। ল্যাটিন ভাষায় একে লুনা বলা হয়। তুমি আমার জীবনের এক আকাশভরা হাজারো তারার ভিড়ে সেই একমাত্র চাঁদ, যাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ থেকে যেতাম। তুমি ভুল সময়ে এলেও আমাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছো। তোমাকে ছাড়া আমি বড্ড ফ্যাকাশে অনুভব করি, মেয়ে! ঠিক যেমন রাতের আকাশে একদিন চাঁদ না থাকলে আকাশটা কেমন বিবর্ণ দেখায়। তেমনি আমার মনকুঠুরিতে অজান্তেই তুমি এতটা জুড়ে বসে আছো। তুমি কি আমার শেষবেলার প্রাপ্তিটুকু হবে? ট্রাস্ট মি, আমি তোমার অনেক যত্ন নেব, তোমাকে আর কখনো অভিযোগ করার সুযোগ দেব না। বাকিটা পথ এভাবেই আমার পাশে থেকে যেয়ো, লুনা।”আরিশান মৃধার কথাগুলো শোনার পর জেবার বুক চিরে অজান্তেই একরাশ আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই মানুষটার মুখে এমন গভীর অনুভূতি শোনার পর তার আর কিছু চাওয়ার নেই।

জেবা আদ্র চোখে ফিসফিস করে বলল, “এবার একবার বলুন না-ভালোবাসেন আমায়, হানি?”​কিন্তু আরিশান মৃধা যেন এই প্রশ্নের উত্তর কী দেবেন, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসার সেই ঝুঁকি নিবেন না তিনি।প্রথমবারের ভালোবাসা এখনো যেন তাকে কিছুটা আড়ষ্ট করে রেখেছিল। একটু থেমে তিনি ধীর গলায় বললেন, “সরি, মেয়ে! তোমাকে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা দিয়ে বাঁধতে পারলাম না। কিন্তু তুমি আমার সেই অংশ, যা ছাড়া একটা মানুষ চলতে পারে না,যেটা না থাকলে নিশ্বাসের গতি থেমে যায়!আমার হার্ট তুমি লুনা। এর চেয়েও দামি বা বড় কিছু আমার থাকলে, সেটাও শুধু তোমার জন্যই বরাদ্দ হতো। কিন্তু আফসোস, আমি তোমাকে ওই ভালোবাসা নামক ছোট মাপের ফ্রেমে বাঁধতে পারব না-যেটা সবার জীবনেই খুব সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে বারবার আসে।”

​জেবা আর কথা বাড়াল না। সে বুঝতে পারল, লোকটার কাছে এই না-বলা কথাগুলোর গভীরতা অনেক বেশি। সে চুপচাপ আবারও নিজের মাথাটা এনে রাখল সেই প্রশস্ত বুকের গভীরে। রাতের নিঝুম আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল অপলক। এইটুকু প্রাপ্তি তার কাছে কল্পনার চেয়েও বেশি কিছু। লোকটার চাঁদ সে-হোক না সেই প্রাপ্তি জীবনের শেষবেলায় এসে, তবুও এইটুকুতেই জেবা অসীম খুশি।​হঠাৎ করেই তাদের ভাবনা ছেদ ঘটল। হাতের আঙুলে কিসের যেন শীতল ছোঁয়া অনুভব করল জেবা। সে লক্ষ করল, আরিশান মৃধার হাতটি এতক্ষণ তার হাতের মুঠোয় ছিল, কিন্তু এইমাত্র তিনি তা ছেড়ে দিয়েছেন। জেবা ধীরেসুস্থে হাতটি চোখের সামনে তুলতেই চমকে উঠল। রাতের অন্ধকারে মৃদু আলোয় জ্বলজ্বল করছে একটি নিলাভ রঙের উজ্জ্বল ডায়মন্ডের রিং।
​ভীষণ অবাক হয়ে সে মুখ ফিরিয়ে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল। বলল, “এটা… এটা তো ভীষণ দামি!”
​আরিশান মৃধা হালকা হেসে জবাব দিলেন, “তোমার সৌন্দর্যের কাছে ওটা নেহাতই ফ্যাকাশে।”​চোখ বড় বড় করে জেবা জিজ্ঞেস করল, “হঠাৎ এটা কেন?”

“বিয়ের পর তোমাকে আমার তরফ থেকে এখনো কিছুই দেওয়া হয়নি। আমার বোধহয় আরও অনেক আগেই এটা দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমি একটু কনফিউজড ছিলাম।”
“কী নিয়ে কনফিউজড ছিলেন?” জেবার কণ্ঠে কিছুটা কৌতূহল।
আরিশান মৃধা শান্ত গলায় বললেন, “তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলো ঠিক কী রূপ নিচ্ছে, তা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল।”
​জেবা ঠোঁট চেপে মৃদু হেসে ঘুরে দাঁড়াল লোকটার মুখোমুখি। এক হাত রাখল তার কাঁধে, তারপর দুষ্টু সুরে বলল, “তাহলে এখন অনুভূতিগুলো এমন কী নিশ্চিত বার্তা দিল যে, আজই এটা দিতেই হবে? আমি তো আপনি না বললেও সারাজীবন এভাবেই আপনার পাশে থেকে যেতাম!”
​আরিশান মৃধা মৃদু হেসে বললেন, “জানতাম। তবুও… এটা আমার দায়িত্ব।”
চোখ টিপে জেবা দুষ্টুমি করে বলে উঠল, “শুধুই দায়িত্ব, নাকি অন্য কিছু?”
“যা ইচ্ছে ভেবে নাও।”

​কথার মাঝেই জেবার মনে হলো এক অদ্ভুত খেয়াল। সে চঞ্চল হয়ে বলে উঠল, “আচ্ছা, আপনার গালে একটা চুমু খাই?”​আরিশান মৃধা পলকের জন্য একটু চুপ রইলেন। পরমুহূর্তেই তিনি নিজেই নিজের মুখখানা সামান্য বাড়িয়ে দিলো জেবার নিকটবর্তী। জেবা বুঝতে পারল, লোকটা তাকে অনুমতি দিয়েছে। আর তাই এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ঝুঁকে পড়ে আরিশান মৃধার গালে একটার জায়গায় পরম আদরে দুটো চুমু এঁকে দিল।এরপর যেইনা মেয়েটা
লজ্জায় মুখটা সরিয়ে নিতে যাবে, ঠিক তখনই আচমকা আরিশান মৃধা তার মাথাটা দুই হাতে শক্ত করে টেনে নিলেন নিজের কাছে। তারপর পলক ফেলার আগেই নিজের অধরের সাথে মিশিয়ে নিলেন জেবার অপেক্ষমাণ ঠোঁট দুটি।
​কী হচ্ছে বা কেন হচ্ছে, তা বুঝতে জেবার মাত্র এক ন্যানোসেকেন্ড সময় লেগেছিল। আর পরক্ষণেই তীব্র লজ্জা, ভালোলাগা আর বাঁধভাঙা ভালোবাসায় সে লোকটার শার্টের কলার খামচে ধরে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে। রাতের খোলা আকাশের নিচে বারান্দায় দাড়িয়ে থাকা, সাক্ষী হলো দুটি মনের পূর্ণতা পাওয়ার এক অপূর্ব মুহূর্তের।

রিসোর্টের আরামদায়ক বিছানায় ঘুম ভাঙতেই অরি ঝটপট উঠে বসে। চোখ কচলে নিয়ে চতুর্পাশে তাকাতেই তার মনটা কেমন যেন ছাঁৎ করে ওঠে-কোথাও সারিমের কোনো চিহ্ন নেই। দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো একসঙ্গে মিলে গিয়ে জানান দিচ্ছে এখন ঠিক রাত বারোটা।আগামীকাল ভোরবেলাতেই তাদের দেশে ফেরার ফ্লাইট। এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে রাত দুটোর দিকে। সারাদিন ধরে শহরের অলিগলি আর সমুদ্রসৈকত চষে বেড়ানোর পর দুজনেই বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আসার সময় দুজনে খালি হাতে ফিরলেও, ফেরার সময় কেনাকাটার বহর দেখে মনে হচ্ছে একটা আস্ত দোকানই বুঝি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে! লাগেজ গুছিয়ে নেওয়ার পর শরীরের চরম ক্লান্তি সইতে না পেরে কখন যে দুজনে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল, অরি নিজেও টের পায়নি।কিন্তু এই মাঝরাতে সারিম কোথায় যেতে পারে?অরি বিছানা ছেড়ে উঠে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে গেল, ব্যালকনির পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল-না, কোথাও কেউ নেই। নিঝুম রাতের আঁধারে রিসোর্টের নিরিবিলি পরিবেশ অরির মনে এক অজানা ভীতি জাগিয়ে তোলে। কোথায় গেল লোকটা? তাকে না জানিয়ে এভাবে হুট করে গায়েব হওয়ার তো কথা নয়! অরির বুকের ভেতর অচেনা এক আশঙ্কার দোলাচল শুরু হয়।

ঠিক তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
অরির মুখে মুহূর্তে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। নিশ্চয়ই সারিম ফিরে এসেছে! কোনো কিছু না ভেবেই সে তাড়াহুড়ো করে দরজার লক খুলে দিল। কিন্তু দরজার ওপাশে সারিম নয়, দাঁড়িয়ে আছে রিসোর্টের এক হাসিমুখ স্টাফ। মুহূর্তেই অরির মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে আশার আলোটা নিভে গেল।অরি কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আমার হাসব্যান্ড দেখেছেন? ওনি কোথায় গিয়েছে বলতে পারেন?”
স্টাফটি সরাসরি উত্তর দিল না। মৃদু হেসে তার হাতে থাকা একটি জমকালো উপহারের ব্যাগ অরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “ম্যাম, স্যার আপনাকে এই পোশাকটা পরে দ্রুত তৈরি হয়ে নিতে বলেছেন। কিছুক্ষণ পরেই স্যার এসে আপনাকে সাথে করে নিয়ে যাবেন।”

কথাটা বলেই লোকটা বিনীতভাবে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল। অরি কৌতূহল আর সংশয় নিয়ে রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিল। ধীরহাতে উপহারের ব্যাগটি খুলতেই তার চোখ ঝলমল করে উঠল। ভেতরে নিখুঁত কারুকাজের সম্পূর্ণ সাদা একটা শাড়ি! সাদা রঙটা অরির বড্ড প্রিয়, আর এই শাড়িটা দেখতে এত দারুণ যে অরি মুহূর্তের জন্য মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল।যেহেতু সারিম নিজে তাকে তৈরি হতে বলেছে, তাই অরিও আজ নিজেকে একটু অন্যভাবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে খুব যত্ন নিয়ে সাজতে শুরু করল। কোনো ঘাটতি রাখল না আজকের রূপটানে। এখন আর আগের মতো চোখে মোটা রিডিং গ্লাস লাগায় না সে, চোখে লেন্স পরার পর মুখশ্রীর আসল সৌন্দর্য যেন ঠিকরে বের হচ্ছে। পিঠের ওপর ঢেলে দিল নিজের রেশমের মতো নরম, বাদামী রাঙা সোজা চুলগুলো।
সাজগোজ শেষ করে অরি যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই হালকা আওয়াজ তুলে রুমের লক খুলে গেল।

ভেতরে প্রবেশ করল সারিম। অরি ঘুরে দাঁড়িয়ে একপলক তাকাল লোকটার দিকে। অরির পরনের ধবধবে সাদা শাড়ির সাথে মিলিয়ে সারিমও পরেছে একটি সাদা শার্ট আর ডার্ক জিন্স। সারিমের এই সুবিন্যস্ত, পরিপাটি রূপ অরির বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিল। তবে অরি নিজের মনের চঞ্চলতা লুকিয়ে রেখে একটু মুখ বেঁকিয়ে, ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাল-এসবের মানে কী জানতে?সারিম অরির কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। কেবল একগাল রহস্যময় হাসি নিয়ে অরির নরম হাতটি নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। অরি কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে একের পর এক প্রশ্ন করে চলল-“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? এই মাঝরাতে এত নাটকীয়তার কারণ কী?কিন্তু সারিম পুরোপুরি নিশ্চুপ। গম্ভীর মুখে হালকা হেসে শুধু বলল, “একটু ধৈর্য ধরো চন্দ্রিমা, সব উত্তর সময়ের সাথেই পেয়ে যাবে।”রিসোর্টের আলো-আঁধারি করিডোর পার হয়ে, অরির হাত শক্ত করে ধরে সারিম তাকে নিয়ে রাতের নির্জন নিস্তব্ধতায় পা বাড়াল।কিছুদূর হাটতেই অরি দেখতে পেলো,সারিম তাকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অরির মনে পড়ে গেলো সেদিন রাতের ভয়াবহতার কথা। সে পিছিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু সারিম যেন সেটা বুঝতে পারলো। অরির দুহাত ধরে সমান তালে হাটতে হাটতে বললো। “ভয় নেই বউ। আজ তোমার সাথে তোমার স্বামী আছে।আমি থাকতে তোমাকে আর বিপদের আঁচ গায়ে লাগতে দিবো না।”পাহাড়ি পথটা যত উপরে উঠছে, অরির বুকের ধুকপুকানি তত বাড়ছে। নির্জন রাত, চারপাশের ঘন গাছপালার ছায়া আর বাতাসে পাতার মর্মর শব্দে অরির স্মৃতির কোণে জমা থাকা সেই পুরনো ভীতিটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। কিন্তু পাশে চলা লোকটার উষ্ণ স্পর্শ তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল-আজ সে একা নয়।
পাহাড়ের একটা নির্দিষ্ট বাঁকে পৌঁছাতেই সারিম আচমকা পেছনে এসে দাঁড়াল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অরির চোখ দুটো ঢেকে গেল সারিমের দুটো হাতের নরম আড়ালে।”সারিম! কী হচ্ছে কি? চোখ বন্ধ করলেন কেন আমি হাঁটব কীভাবে?”

সারিম অরির কানের খুব কাছে মুখ এনে নিচু স্বরে বলল, “আমার ওপর ভরসা রাখো, চন্দ্রিমা। শুধু আমার সাথে পা মিলিয়ে চলো।”
ধীরে ধীরে কয়েক পা এগোনোর পর সারিম তার হাতের বাধন আলগা করে দিল। চোখ মেলতেই অরির মুখ থেকে বিস্ময়ের একটা অনুচ্ছারিত শব্দ বের হয়ে এলো। চোখের সামনে এ কোন স্বর্গীয় দুনিয়া!
পুরো জায়গাটা যেন এক মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে। ছোট ছোট ফেয়ারি লাইটগুলো গাছের ডালে আর পাথরের গায়ে এমনভাবে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে, মনে হচ্ছে একঝাঁক জোনাকি এসে রাতটাকে উদযাপিত করছে। আর ঠিক সামনেই পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে এক উন্মত্ত রূপালী ঝরনা! জলের ঝমঝম শব্দ আর তার কোল ঘেঁষে ওঠা হালকা কুয়াশার মতো জলকণা বাতাসের সাথে এসে অরির গালে শান্ত পরশ দিয়ে যাচ্ছে। ঝরনার ঠিক পাশেই কাঁচের ওপর বসানো টেবিল আর নরম আলোয় সাজানো কাঠের দুটো চেয়ার। পাশে রাখা একটা একুস্টিক গিটার।
অরি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারপাশটা দেখছিল। তার মনে পড়ে গেল, দুদিন আগে রিসোর্টের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ঝরনার দূরন্ত শব্দ শুনে আপনমনে বিড়বিড় করে বলেছিল।এত সুন্দর ঝরনার পাশে যদি একটা রোমাঞ্চকর রাত কাটানো যেত! যদি আলো আর সুরের মাঝে হারিয়ে যাওয়া যেত শেষবার।সারিম পাশেই দাড়ানো ছিলো সেদিন।অরি ভেবেছিল কথাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, সারিম হয়তো শোনেনি। অথচ এই লোকটা তার মুখের প্রতিটা শব্দ, মনের প্রতিটা সুপ্ত ইচ্ছে নিজের হৃদয়ে গেঁথে রেখেছে!

অরি ঘুরে দাঁড়িয়ে সারিমের মুখোমুখি হলো। তার চোখ দুটো জলে ছলছল করছে, তবে সে জল আনন্দের।
“সারিম … আপনি এটা মনে রেখেছেন?” অরির গলায় বিস্ময় আর আবেগ এক হয়ে মিশে গেল।সারিম মৃদু হেসে অরির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। অরির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, “তোমার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি শব্দ আমার কাছে এক একটা হুকুম,চন্দ্রিমা। যাওয়ার আগে তোমার এই ছোট্ট ইচ্ছেটা অপূর্ণ রেখে আমি ফিরে যাই কীভাবে বল?””কিন্তু আপনি এতকিছু কীভাবে করলেন? এত কম সময়ে?”
“ভালোবাসা থাকলে সময়ের হিসাব করতে হয় না, বউ,”

ভালোবাসা!এই প্রথম অরি সারিমের মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শুনলো।কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি বয়ে যাচ্ছে মেয়েটার শরীর বয়ে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে জ্ঞান হারাবে। লোকটার অনুভূতি প্রকাশ কতটা সুন্দর। একদম সঠিক টাইমে এসে অরির কাছে সঠিক অনুভূতির প্রকাশ করতে চাইছে।যার জন্য তার এতো আয়োজন। বিন্দুমাত্র বুঝতে সময় লাগলো না অরির।অরিকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ করে সারিম হাটুগেড়ে মাটিতে পা ঠেকিয়ে বসলো। অরি সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝার চেষ্টায়। সারিম ধীরে ধীরে নিজের ডান হাত অরির দিকে বাড়িয়ে দিলো। কন্ঠে একরাশ আবেগ ঠেলে বলতে লাগলো।

“ভালোবাসি চন্দ্রিমা।আমার জীবনের ইস্কের ফানিয়ার বড্ড বেশি ভালোবাসি তোমায়।তুমি ছাড়া মৃধা আবরার সারিমের আর কোনো বিকল্প নেই বউ। আমার শুরুটা তুমি, শেষটাও তুমি।”ফের একটু থামলো সারিম। অরি একদৃষ্টে উৎসুক চোখে চেয়ে আছে পরবর্তী বাক্য শোনার অপেক্ষায়। সারিম এবার আবার বলতে শুধু করলো।”তোমাকে অনুভূতি বোঝানোর মতো পর্যাপ্ত ভাষা হয়তো আমার জানা নেই, বউ। তবে এটুকু জানি-আমার অস্তিত্বের অপর নাম তুমি। তোমাকে ছাড়া আমি নিছকই এক শূন্যতা, তোমার উপস্থিতি আমাকে করে তোলে পূর্ণতা।
আমার প্রিয় চন্দ্রিমা, শোনো-ভীষণ ভালোবাসি আমি আমার সন্তানের আম্মুকে; ভীষণ ভালোবাসি আমার ভালোবাসার একচ্ছত্র নীলাকাশ, আমার একান্ত চন্দ্রিমাকে। অনেক, বড্ড বেশি ভালোবাসি তোমাকে! আমার রুক্ষ জীবনে তুমি এসেছিলে ইস্কের ফানিয়ার হয়ে।

আগামীর প্রতিটি দিন, প্রতিটি প্রজন্মেও এভাবেই আমার পাশে থেকো।আজ এই নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে, আকাশের কাছাকাছি থেকে আমার মনের সবটুকু আকুলতা উজাড় করে দিলাম। তুমিও যদি আমাকে ঠিক ততটাই ভালোবেসে থাকো, তবে চুপটি করে আমার হাতটা ধরে নাও-তোমার স্পর্শের উষ্ণতায় আমাকে বুঝিয়ে দাও তোমার হৃদয়ের আলোর গভীরতা।”পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাসে অরির চোখে তখন হালকা জলছাপ।সারিমের বাড়ানো হাতটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, সে আলতো করে নিজের দু’হাত বাড়িয়ে সারিমের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।চোখে চোখ রেখে, এক চিলতে হাসি নিয়ে বলল,”আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে ভালোবাসার এই আলোটুকু দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এত কথা গুছিয়ে বলা হয়তো আমার আসে না। তবে এই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে, আপনার হাত ছুঁয়ে শুধু এটুকু বলতে পারি-আপনি যেমন আমাকে ভালোবাসা দিয়ে সম্পূর্ণ করেছেন, আমিও সারাজীবন আপনার এই ‘ইস্কের ফানিয়ার’ হয়েই থেকে যেতে চাই। আপনার আলো হয়ে, আপনার পাশে।ভালোবাসি প্রিয়। আমিও আপনাকে খুব বেশি ভালোবাসি।”

নির্জন পার্কের কাঠের বেঞ্চ। সারাদিনের রোদ সামলে রাতের হিমেল বাতাসে শান্ত হয়ে এসেছে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম ডাক আর দূরে শহরের ক্লান্ত গুঞ্জন ছাড়া কোনো শব্দ নেই। ঠিক সেই বিষণ্ণ খোলা বেঞ্চটায় একদম নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে আয়ুশ। রাতের অন্ধকার তার ভেতরের আলোড়নকে যেন আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলছে। তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, অন্য হাত কপালে চেপে ধরা। আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে-কিছুটা ধোঁয়ার কারণে, আর বাকিটা বুকের ভেতর জমতে থাকা অগাধ কষ্টের ভারে।বেঞ্চের পাশে মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে দুটো খালি সিগারেটের প্যাকেট আর অসংখ্য নিভে যাওয়া ফিল্টার। অলরেডি দুটো প্যাকেট শেষ করে ফেলেছে সে, কিন্তু নিজের এই বিষ সেবনের দিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। আয়ুশের মতো ছেলে, যে কিনা দিনে দু-তিনটির বেশি সিগারেট ছুঁয়েও দেখত না, সে আজ একের পর এক দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে চলেছে। ফুসফুসে ধোঁয়া ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনের কাছে এই ধোঁয়া কিছুই নয়।
আয়ুশের মস্তিষ্ক পুরোপুরি থমকে আছে এক অদ্ভুত মায়াবীর দৃশ্যপটে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে অরির মুখটা। সেই মায়াবী রূপ,স্নিগ্ধ হাসি আর তার আকর্ষণ। আয়ুশ কায়দার-যে ছেলেটা কখনো ভালোবাসার খেলায় নামেনি, যে নিজেকে সবসময় আবেগের ঊর্ধ্বে রাখত-সেও অবশেষে প্রেমে পড়েছিল! নিজের অজান্তেই কখন যেন অরি নামের সেই মেয়েটি তার পুরো হৃদয় দখল করে নিয়েছিল, আয়ুশ নিজেও তা টের পায়নি।
কিন্তু নিয়তির কী চরম নির্মম পরিহাস! সবশেষে এসে আয়ুশ জানতে পারল এই সত্যটা। যে মেয়েটির প্রেমে সে অন্ধের মতো হাবুডুবু খাচ্ছিল, যে মেয়েটি সারাক্ষণ তার ভাবনায় জুড়ে থাকত-সে আর কেউ নয়,তার বেস্টফ্রেন্ড এর বিবাহিত স্ত্রী!

ঘটনাটা মনে পড়তেই আয়ুশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটের ধোঁয়া রাতের বাতাসে মিশে একাকার হয়ে গেল। আনতারা মৃধার সেই কুপ্রস্তাবগুলো এখনো তার কানে বাজছে। সেদিন পরিস্থিতি বা পরিবেশের চাপে পড়ে আয়ুশ হয়তো সরাসরি “না” বলতে পারেনি, স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে মুখ থেকে কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেলেছে অরিকে পাওয়া র আশায়। কিন্তু এখন সময় যত গড়াচ্ছে, সে আর নিজেকে মানাতে পারছে না। তার বন্ধু সারিম-যার সাথে ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা, যে আয়ুশকে নিজের ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করে-তাকে এত বড় ধোঁকা দেওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব? আর সেই ধোঁকার অংশীদার হবে আয়ুশ নিজে? কথাগুলো ভাবতেই আয়ুশের গা গুলিয়ে উঠছে, নিজের ওপর নিজের এক তীব্র ঘৃণার জন্ম হচ্ছে।আয়ুশের বুকটা যেন ভেতরের কোনে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বিষাদের এক অসীম সাগরে সে ডুবছে। রাতে ঘুম আসে না, চোখে কেবলই আনতারা মৃধার সেই অদ্ভুত কুপ্রস্তাবের মায়াজাল। আয়ুশ নিজেকে প্রশ্ন করে, “কেন এমন হলো? কেন আমি আগে জানতে পারলাম না? কেন ওই মেয়েটির প্রতি আমার মন এভাবে দুর্বল হতে গেল?” সারিমের কথা ভাবতেই, আয়ুশের মনে হয় সে বুঝি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে বড় অপরাধী। নিজের মনের সাথে এই যুদ্ধটা তার জন্য বড্ড যন্ত্রণাদায়ক। প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা শাস্তির মতো কাটছে। ভালো লাগার এই অনুভূতির পেছনে যে এত বড় একটা ফাঁদ লুকিয়ে ছিল, তা আয়ুশ স্বপ্নেও ভাবেনি।

অন্ধকার রাতের পানে চেয়ে আয়ুশ নিজের মনের সাথে লড়াই করে এক কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে থাকে। বাতাসে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হলেও আয়ুশের মাথার ভেতর জ্বলছে তপ্ত আগুন। সে সিগারেটটা শেষবারের মতো মাটিতে ফেলে নিজের জুতো দিয়ে পিষে নিভিয়ে দিল।
আয়ুশ নিজের কাছে নিজে এক শক্ত পণ করল-যত যাই হয়ে যাক না কেন, বন্ধুকাজ তার কাছে সবকিছুর ওপরে। কোনো অজুহাতেই সে আনতারা মৃধার লোভ দেখানো ফাঁদে পা দেবে না। এতগুলো মানুষের- শান্তি-সে এভাবে এক নিমেষে নষ্ট হতে দিতে পারে না। স্বার্থপরের মতো নিজের একতরফা অনুভূতিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সে বন্ধুত্বের পবিত্রতায় এক ফোঁটা দাগ লাগতে দেবে না।অরি সে কখনো আয়ুশের হবে না, হতে পারে না। এই নির্মম সত্যটা আয়ুশ আজ রাতের অন্ধকারে মন থেকে মেনে নিল।

হ্যাঁ, কষ্ট তার হবে, বুকটা হয়তো দিনে দিনে তিলে তিলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু অন্যের সুখ কেড়ে নিয়ে, বন্ধুকে পিঠে ছুরি মেরে সে কোনোদিন সুখে থাকতে পারবে না। অন্যের কষ্ট বাড়িয়ে নিজের আনন্দ খোঁজা আয়ুশের রক্তে নেই।তাছাড়া আয়ুশ বাস্তবটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। সে যাকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, সেই মেয়েটি হয়তো বাস্তবে তার স্বামী সারিমকে নিয়েই সুখে আছে, সারিমকেই ভালোবাসে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝখানে সে তো নিছকই এক ‘থার্ড পারসন’। অনাহূত এক অতিথি, যে হঠাৎ এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিতে চাইছিল। আনতারা মৃধা যাই বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত সংসারটা তাদেরই। এই খেলায় আয়ুশ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে কারো জীবনে ঝড় তুলতে চায় না।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৫

রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর হয়ে আসে। আয়ুশ বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে, মনটা ছাইয়ের মতো নিঃস্ব। কিন্তু এই বিষণ্ণ রাতের কোলে বসেই সে তার ভেতরের ঝড়টাকে শান্ত করে ফেলেছে। সে একা কষ্ট পাবে, বুক চেপে কান্না লুকাতে শিখবে, কিন্তু সারিমের বিশ্বাসের আমানত সে রক্ষা করবেই। আনতারা মৃধার কোনো প্রলোভনই তাকে নিজের আদর্শ আর বন্ধুত্ব থেকে এক চুলও সরাতে পারবে না। রাতের অন্ধকারের মাঝে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আয়ুশ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে নিজের গন্তব্যের দিকে হেঁটে চলল।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here