উন্মাদনা পর্ব ২৯
কায়নাত খান কবিতা
“ মনের অলি-গলি হয়ে কেন পালালি.. রাতে ও মরিচিকায়য়য়…এই তো শেখের বেটি। গট ইউ্য সোনামনি।”
কোচিংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে বেশ হাসিমুখে ফুচকা খেতে থাকে আনন্দী। মুখে অনেকদিন পর একটু স্বাভাবিক হাসি দেখা যায় তার। পাশে দাঁড়িয়ে বান্ধবীরা গল্প করতে থাকে। কেউ ঝাল বেশি হয়েছে বলে পানি খুঁজতে থাকে, কেউ আবার হাসতে হাসতে আনন্দীর গায়ে ধাক্কা দেয়। বিকেলের নরম আলোয় সবকিছু খুব সাধারণ, খুব স্বাভাবিক লাগে।
কিন্তু এই স্বাভাবিক হতে আনন্দীর পনেরোটা দিন লেগে যায়।পুরো পনেরো দিন।এই কয়েকদিনে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাতে থাকে সে। যদিও রাত হলেই এখনও অনেক কিছু মনে পড়ে যায়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বুক ধড়ফড় করতে থাকে। তবুও বাইরে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে আনন্দী।আর এই পুরো সময়টা জুড়ে রেহমান তাকে ফুল প্রোটেকশন দিয়ে রাখে।
কোনো প্রমাণ না থাকায় অভীকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। আইনেরও সীমাবদ্ধতা আছে। শুধু সন্দেহের উপর কাউকে ধরা যায় না।কিন্তু নিরাপত্তা দেওয়া যায়।আর সেটাই করে রেহমান।আনন্দীদের বাসার সামনে সারাক্ষণ পুলিশ পাহারা বসিয়ে দেয় সে। এমনকি কোচিংয়ে যাওয়া-আসার সময়ও দু-জন কনস্টেবল সবসময় আশেপাশে থাকতে বলে। দূর থেকে নজর রাখতে থাকে তারা।
ফলে গত পনেরো দিনে একবারের জন্যও আনন্দীর ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না অভী।এমনকি তার ছায়াও দেখতে পায় না সে।আর সেটাই ধীরে ধীরে অভীর ভেতরের রাগ বাড়াতে থাকে।বিশেষ করে ব্লক করার ঘটনাটা।সব জায়গা থেকে তাকে ব্লক করে দেয় আনন্দী।হোয়াটসঅ্যাপ, কল, সোশ্যাল মিডিয়া—সব।অভীর মতো মানুষের জন্য এটা শুধু রাগের বিষয় না, ইগোতে আঘাত।
কারণ সে অভ্যস্ত না কেউ তাকে কেটে দেবে।সেদিন রাতেও ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় অভী। মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা ঘুরতে থাকে,আনন্দীকে শিক্ষা দিতে হবে।রাত গভীর হতেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। শহরের ফাঁকা রাস্তা কেটে দ্রুত এগোতে থাকে আনন্দীদের এলাকার দিকে।কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি যেতেই বাইকের গতি ধীরে হয়ে আসে।দূর থেকেই চোখে পড়ে পুলিশ পাহারা।
সামনের গলিতে দু-জন কনস্টেবল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে। আরেকটু ঘুরে পিছনের রাস্তার দিকে তাকাতেই আরও দু-জনকে দেখতে পায়।অভীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে ওঠে।
“আকামের সময় প্রোটেকশন নিলাম না। এখন বাঙ্গুর নাতি হেতি রে প্রোটেকশন দিতাছে…”
বাইক থামিয়ে কিছুক্ষণ দূর থেকে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক স্থিরতা। যেন মাথার ভেতর আবার নতুন কোনো পরিকল্পনা জন্ম নিতে থাকে।
সেদিন রাতে শেষ পর্যন্ত ফিরে যায় অভী। আনন্দীদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ দেখে আর ঝুঁকি নেয় না সে। তারপর কেটে যায় আরও কয়েকটা দিন। এই সময়ের মধ্যে আনন্দীর সাথে দেখা হওয়ার কোনো সুযোগই পায় না অভী।
কিন্তু নিজের ভেতরের কামনা কি এত সহজে থেমে থাকে?
হয়তো কিছু পুরুষ আছে, যারা নিজের সীমা জানে। নিজের লালসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু বাকি অনেকের ভেতরেই অন্ধকার বাস করে। আর অভী সেই অন্ধকারেরই মানুষ।
গত পনেরো দিন নিজের ভেতরের কামনাকে জোর করে চেপে রাখে সে। কিন্তু যত সময় যেতে থাকে, আনন্দীকে পাওয়ার নেশাটা আরও বাড়তে থাকে তার ভেতরে। ধীরে ধীরে আবার নতুন ছক কষতে শুরু করে অভী।
আজ ঠিক পনেরো দিন পর আবার আনন্দীকে দেখতে পায় সে।কোচিংয়ের সামনে।বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে আনন্দী। হাতে ফুচকার প্লেট। মুখে অনেকদিন পর একটু স্বাভাবিকতা।দূর থেকে বাইকের উপর বসে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে অভী। বিরবির করে বলে,
” জীবনের আমার লগে হাসতে দেখলাম না বা’ন্দীরে।’
অভীর মন বলছিলো এখনই চলে যাবে আনন্দীর কাছে,
কিন্তু সমস্যা একটাই।কিছু দূরেই পুলিশ দাঁড়িয়ে।রেহমানের দেওয়া প্রোটেকশন এখনও আছে।
অভী সিগারে টান দিতে দিতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের দিকে তাকায়। তারপর নিচু গলায় ডাকে,
“ঘাতক সুমন?”
পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব আসে,
“জ্বী ভাই?”
অভীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হাসি ফুটে ওঠে।
“একটা ঘাতকের মতো কাজ কর!”
সুমন চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।অভী এবার চোখ সরায় না আনন্দীর দিক থেকে। ভারী গলায় বলে,
“বান্দীরে আমার চাই। এক ঘন্টার জন্য হইলেও চাই।”
একটু থামে সে।তারপর সিগারের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে,
“ওরে কাছে লাগবো আমার। কেমনে আনবি, ওইটা তোর ব্যাপার।”
কথাটা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাতক সুমন আর অস্ত্র মামুন একে অপরের দিকে তাকায়।পরক্ষণেই দুজনের ঠোঁটে একইরকম শেয়ালের হাসি ফুটে ওঠে।একজন আরেকজনকে চোখ টিপ মারে।তারপর কোনো কথা না বলে দুটো বাইকে উঠে বসে।
মুহূর্তের মধ্যেই বাইক স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে তারা।আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগার হাতে পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করতে থাকে অভী। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক স্থিরতা।যেন সে আগেই জানে,শিকার কোথাও পালাতে পারবে না।
বিকেলের ব্যস্ত রাস্তাটা আচমকা বদলে যায় কয়েক সেকেন্ডে।প্রথম টিয়ারশেলটা পড়তেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। তারপর আরেকটা। মুহূর্তের মধ্যে কোচিংয়ের সামনের পুরো এলাকা সাদা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। চোখ জ্বালা করা তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।মানুষ প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না।তারপর শুরু হয় ছুটোছুটি।
কেউ চোখ চেপে ধরে দৌড়াতে থাকে, কেউ কাশি দিতে দিতে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। মেয়েদের চিৎকার, গাড়ির হর্ন, আতঙ্কিত মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে পুরো জায়গাটা অগোছালো হয়ে ওঠে।আনন্দী হঠাৎই চোখ চেপে ধরে। মনে হয় চোখের ভেতর আগুন ঢুকে গেছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হতে থাকে তার। পাশে থাকা বান্ধবীদের হাত খুঁজতে গিয়ে আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে সে।
“নিশি! এইদিকে আয়!”
কিন্তু ধোঁয়ার ভেতর কার কণ্ঠ কোথা থেকে আসছে বোঝার উপায় থাকে না।চারপাশ ঝাপসা।শব্দগুলোও কেমন বিকৃত লাগছিল।
ঠিক তখনই ধোঁয়ার চাদর ভেদ করে একটা কালো বাইক এসে থামে তার সামনে।আনন্দী দেখতে পায় না কে এসেছে। চোখ থেকে অনবরত পানি পড়তে থাকে। সামনে শুধু অস্পষ্ট একটা ছায়া দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।পরক্ষণেই শক্ত একটা হাত তার কবজি চেপে ধরে।আনন্দী চমকে ওঠে।
“কে?!”
কথাটা শেষ করার আগেই সাদা একটা রুমাল চেপে ধরা হয় তার মুখে।তীব্র কেমিক্যালের গন্ধে মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। সে হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ভিড়ের বিশৃঙ্খলার মাঝে তার লড়াইটা হারিয়ে যায়।
ঠিক তখনই খুব কাছে ঝুঁকে আসে অভী।
ধোঁয়ার ভেতরেও তার গলার স্বর অদ্ভুত পরিষ্কার শোনায়।
“তোরে আমার লাগবো! সারাজীবনের জন্য হইলেও… তোরেই লাগবো।”
আনন্দী ঠিকমতো কথাগুলো শুনতে পারে না। শব্দগুলো কানে এসে ভাঙা ভাঙা লাগে। তার চোখ ভারী হয়ে আসছিল ধীরে ধীরে।চারপাশের ধোঁয়া, চিৎকার, আতঙ্ক
সবকিছু যেন দূরে সরে যেতে থাকে।পরক্ষণেই অভী তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়।খুব সহজে।যেন বহুদিনের চেনা কোনো জিনিস তুলে নিচ্ছে।তারপর আনন্দীকে নিজের সামনে বসিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ার ভেতর মিলিয়ে যায় সে।পেছনে পড়ে থাকে শুধু বিশৃঙ্খলা। জ্ঞানহীন আনন্দীকে সামনে বসিয়ে নিজের সাথে চেপে রাখে অভী। এমন অবস্থায় বাইক চালানো ভিষণ কষ্ট দায়ক।
অভী কোনো রকমে বাইক চালিয়ে জায়গাটা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়া আনন্দীকে সামলে বাইক চালানো তার জন্য ভীষণ ঝামেলার হয়ে উঠেছিল। এক হাতে হ্যান্ডেল, আরেক হাতে বারবার আনন্দীর শরীর সামলাতে হচ্ছিল তাকে। কয়েকবার তো প্রায় বাইকের ব্যালেন্সই হারিয়ে ফেলছিল অভী।
শেষমেশ শহরের একটু নির্জন জায়গায় এসে বাইক থামায় সে। চারপাশ ফাঁকা। দূরে কয়েকটা স্ট্রিটলাইট ছাড়া আর কিছু নেই। রাতের বাতাসেও বিরক্তি কমে না তার।
উন্মাদনা পর্ব ২৮
অচেতন আনন্দী তখন পুরো শরীরের ভর ছেড়ে অভীর উপর হেলে পড়ে আছে। মাথাটা বারবার একদিকে কাত হয়ে যাচ্ছিল।অভী হাঁপাতে হাঁপাতে বিরক্ত চোখে তাকায় তার দিকে।সিনেমায় কত সহজ লাগে এসব।
হিরোরা দিব্যি এক হাতে হিরোইন নিয়ে বাইক চালায়, উড়তে উড়তে ঘুরে বেড়ায়।কিন্তু বাস্তব এত সহজ না।
অভীর নিজেরই কোমর ধরে যাওয়ার অবস্থা।বিরক্তিতে দাঁত চেপে নিচু গলায় বলে ওঠে,
“খাইয়া খাসির মতো শরীর বানাইছে কয়দিনে। ব্যাপার না আবার নিয়মিত ব্যায়াম করাইয়া ফিট বানাবো”
