Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৩২

উন্মাদনা পর্ব ৩২

উন্মাদনা পর্ব ৩২
কায়নাত খান কবিতা

‘ভালোবাসোস না এটা বললেই পারতি! এমনে ময়লা পানি ফেলার কোনো দরকার ছিলো না।”
নোংরা পানিতে পুরো শরীর ভিজে যাওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অভী। চুলের ডগা বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে তার। সাদা পাঞ্জাবিটা গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। রাস্তার হলুদ আলোয় তাকে অদ্ভুত বিধ্বস্ত দেখতে লাগে।উপরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনন্দী ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে।অভী কর্কশ বলায় বলে,

“ তোর ডোজ কম হয়ে গেছে বান্দী। আমার গায়ে ময়লা পানি দেস।”
আনন্দীর ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হয়। চোখেমুখে জমে থাকা ঘৃণাটা এবার স্পষ্ট।
“ময়লা লোকের গায়ে ময়লা পানিই মানায়।”
বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে নিচের দিকে তাকায় সে।
“এখন ফুটেন এখান থেকে।”
কথাগুলো বাতাস চিরে এসে লাগে অভীর মুখে। কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দেয় না সে। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। চোয়ালের পাশটা শক্ত হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে।তারপর নিচু, ভারী স্বরে বলে,
“ তোর সাথে যদি না গোসল কইরা সুদ্ধ হইছি আমি ও অভী না…”
আনন্দী এবারও ভয় পায় না। বরং ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,
“তার আগেই ইন্সপেক্টর রেহমান আপনাকে জেলের ভাত খাওয়াবে।”
কথাটা শুনে হঠাৎ হেসে ওঠে অভী। অদ্ভুত, ধীর একটা হাসি।
“তোর জন্য তো বিষও খাইবার পারি।”
তার চোখ তখনও স্থির আনন্দীর উপর।
“জেলের ভাত আর কী জিনিস, বোকাচন্দ্র?”

আনন্দী বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর একটা কথাও না বলে ভেতরে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বারান্দার আলো নিভে যায়।নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অভী দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই অন্ধকার বারান্দার দিকে।তারপর ধীরে চোখে কালো চশমাটা পরে নেয়।বাইক স্টার্ট দিতেই নিস্তব্ধ রাত কেঁপে ওঠে ইঞ্জিনের গর্জনে।রাস্তায় বের হতেই আবার চেপে বসে বিরক্তি। হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে গালি দিতে থাকে সে।
“বদজ্জাত মাইয়া একটা…”
লাল সিগন্যালে দাঁড়িয়ে সিগারে লম্বা টান দেয় অভী। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছেড়ে আবার বিড়বিড় করে,
“আদরের যোগ্য না একদম।”
পরক্ষণেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেলে_“এইবার আমিই শিক্ষা দিমু।”

রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে শুরু করে। উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা।দীর্ঘ রাস্তা। তার উপর কর্মদিবসের ক্লান্ত শহর তখনও পুরোপুরি থামেনি। কোথাও বাসের হর্ন, কোথাও ফুটপাতের দোকানের চা, কোথাও ধোঁয়া আর মানুষের ভিড়।জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে বিরক্তি আরও বাড়ছিল অভীর। বাইকের হ্যান্ডেলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে চারপাশে তাকায় সে। রাস্তার পাশে ভাজাভুজির দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে। কয়েকটা রিকশা গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। দূরে কোনো এক দোকানে পুরোনো বাংলা গান বাজছে ভাঙা স্পিকারে।
কিন্তু এসবের কিছুই যেন ঠিকমতো দেখছিল না অভী।তার মাথার ভেতর তখন বারবার ভেসে উঠছিল একটাই দৃশ্য।বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আনন্দী।চোখভরা তাচ্ছিল্য।আর সেই একগাল হাসি।
দীর্ঘ জ্যাম, ধোঁয়া আর ক্লান্ত শহর পেরিয়ে শেষমেশ পুরান ঢাকার সরু গলিতে ঢোকে অভী। রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। পুরোনো ভবনগুলোর দেয়ালে ঝুলে থাকা হলুদ বাতিগুলো আধো অন্ধকারে কেমন মলিন লাগছিল। দূরে কোথাও কাবাব পোড়ার গন্ধ, কোথাও শেষ রাতের চায়ের দোকানে আড্ডা।পুরান ঢাকা যেন কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।

বাইকটা বাড়ির সামনে থামিয়েই দোতলায় উঠে যায় সোজা। মেইন দরজায় গিয়েই কপাল কুঁচকে যায় অভীর।দরজার পাশে মেয়ের জুতো। মুহূর্তেই বিরক্তি খানিকটা কমে যায় তার। ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সে।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখে টেবিলভর্তি নানা রকম খাবার, ফল, মিষ্টি। আর সোফার পাশে শান্ত হয়ে বসে আছে সাদিয়া।অভীকে দেখেই মেয়েটা একটু চমকে ওঠে। তারপর দ্রুত মাথার ঘোমটা টেনে ঠিক করে নেয়।
“কীরে বইন! কবে আইলি?”
সাদিয়া সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে নরম গলায় সালাম দেয় তাকে।পুরান ঢাকায় সাদিয়াকে প্রায় সবাই চেনে।তবে নিজের পরিচয়ে নয়।তার পরিচয়ের আগে উচ্চারিত হয় তার বাবার নাম আবুল বাশার।
লোকমুখে শোনা যায়, আবুল বাশার মূলত পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন। বহু বছর আগে কীভাবে যেন বাংলাদেশে চলে আসেন। কেন এসেছিলেন, কীভাবে এসেছিলেন।এসব নিয়ে আজও অসংখ্য গল্প রয়েছে । কিন্তু কোনো গল্পেরই নির্ভরযোগ্য শেষ নেই।তবে একটা বিষয় সবাই জানততিনি ছিলেন উসমান সাহেবের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ।

সেই উসমান সাহেব, যাকে পুরান ঢাকার পুরোনো লোকেরা এখনও “বেতাজ বাদশাহ” বলে মনে রাখে। সিন্ডিকেটের ছায়াজগতে তার নাম একসময় আইন থেকেও শক্তিশালী ছিল।
আবুল বাশার বাংলা আর উর্দু মিশিয়ে কথা বলেন। কণ্ঠে সবসময় একটা কর্কশ ভারী ভাব থাকত। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার মেয়েরা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।শুদ্ধ, নরম বাংলায় কথা বলত তারা।বিশেষ করে সাদিয়া।মেয়েটার ভেতর অদ্ভুত শান্ত স্বভাব লক্ষ্য করা যায়।
অভী এবং জুলফিকারকে সে নিজের ভাইয়ের মতো দেখে। কেন সেটা হয়তো সাদিয়াও জানে না। শুধু এই ছেলে দুটোর প্রতি তার অদ্ভুত এক মায়া কাজ করত সবসময়।
বর্তমানে মহিলা মাদ্রাসায় পড়ে সাদিয়া। মাঝেমধ্যে সময় পেলে বাবার বাড়িতে আসে।আর আজও এসেছে অনেক কিছু নিয়ে।মেয়েটার চোখে তখনও সেই পুরোনো মায়াটাই লেগে ছিল।
“এমন কাকভেজা হয়েছো কীভাবে ভাইয়া?”
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে প্রশ্ন করে সাদিয়া। ভেজা চুল থেকে তখনও টপটপ করে পানি পড়ছতে থাকে অভীর। সাদা পাঞ্জাবিটি গায়ে লেপ্টে আছে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, তবু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা উদ্ধত হাসি।অভী জুতা খুলতে খুলতে বলে,
“এক নাগিন তার বিষ ঢালছে রে বোন।”

কথাটা শুনে সাদিয়া মুখ চেপে হেসে ফেলে। তারপর দ্রুত ভেতর থেকে একটা গামছা এনে তার হাতে ধরিয়ে দেয়।
“আগে ফ্রেশ হও। খাবার ঠান্ডা হলে কিন্তু আর গরম করতে পারব না।”
অভী কিছু না বলে গামছা কাঁধে ফেলে ভেতরে চলে যায়। আর সাদিয়া ধীরে ধীরে টেবিলে খাবার সাজাতে থাকে। ভাত, গরুর মাংস, কাবাব, ডাল, সবকিছু যত্ন করে বাড়ছিল সে। এই ছেলেটাকে নিয়ে তার অদ্ভুত এক মায়া কাজ করে সবসময়।
কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে অভী। সাদা গেঞ্জি আর মুন্ডু পরে এসে সোজা টেবিলে বসে পড়ে। সাদিয়াও পাশে বসে গল্প জুড়ে দেয়। বেশিরভাগ সময় সে-ই কথা বলে, অভী শুধু শুনে।হঠাৎ একসময় মেয়েটা চুপ হয়ে যায়।আঙুল দিয়ে প্লেটের পাশে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতেনিচু গলায় বলে,

“ভাইয়া… একটা কথা বলি?”
অভী খাওয়া থামিয়ে তাকায়।
“হুম?”
“তুমি কী একটু বাবাকে বলবা… আমাকে যেন আর
মাদরাসায় না পাঠায়?”
কথাটা শুনে কপাল কুঁচকে যায় অভীর।
“কিছু হইছে?আমারে ক।”
সাদিয়া দ্রুত মাথা নাড়ে।
“না ভাইয়া। কিছু হয় নি। এমনি… ভালো লাগে না।”
অভী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে।সে জানে, আবুল বাশারকে বুঝানো সহজ না।
কারণ আবুল বাশার শুধু একজন মানুষ না।পুরান ঢাকার ইতিহাসের জীবন্ত একটা অধ্যায়।
দুই হাজার সালের শুরুর দিকে পুরান ঢাকা ছিল আগুনের শহর। সরু গলি, পুরোনো বাড়ি আর নদীর ঘাটের নিচে তখন চলত ভয়ংকর ক্ষমতার খেলা। সেই সময় পুরো এলাকাটা নিয়ন্ত্রণ করতেন একজন মানুষ।উসমান সাহেব।লোকটা সম্পর্কে আজও অদ্ভুত সব গল্প শোনা যায়। কেউ বলে তিনি আগে বন্দরের শ্রমিক ছিলেন, কেউ বলে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আনতেন। কিন্তু একটা বিষয়ে সবাই একমত,উসমান সাহেব বেঁচে থাকতে পুরান ঢাকায় বড় কোনো দাঙ্গা হয়নি।কারণ তিনি ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতেন।
হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, এমনকি দাগী অপরাধীরাও তার কথার বাইরে যেত না। তিনি নিজে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতেন না। তার কাছে ধর্মের চেয়ে ব্যবসা বড় ছিলো না। তিনি নিজেকে গর্বের সাথে মুসলিম দাবি করতেন। কিন্তু তার কর্ম গুলো শুনলে কথার সাথে মিল পাওয়া যেতো না।

ড্রাগ, চোরাচালান, গুদাম নিয়ন্ত্রণ, নদীপথ, ঘাট, পুরোনো মার্কেট, সবকিছুর উপর তার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ছিল।
আর তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ ছিল,আবুল বাশার।রহস্যময় এক লোক।শোনা যায়, পাকিস্তান থেকে এসেছিল। কিন্তু কেন এসেছিল, কেউ জানে না। তার অতীত নিয়ে কথা বলতেও ভয় পায় অনেকে।
২০০২ সালের বর্ষার রাতে সব বদলে যায়।এক সকালে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভেসে ওঠে উসমান সাহেবের গুলিবিদ্ধ লাশ।আর নদীর অন্য পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় আবুল বাশারকে।সেদিনই নিজের একটা পা হারায় সে।উসমানের মৃত্যু যেন পুরো পুরান ঢাকার ভিত কাঁপিয়ে দেয়।তার মৃত্যুর পরপরই শুরু হয় ভয়ংকর দাঙ্গা।শ্যামবাজারে আগুন লাগে।চকবাজারে দোকান ভাঙচুর হয়।ওয়াইজঘাটে একরাতে তিনটা লাশ পড়ে থাকে।ধর্ম তখন শুধু অজুহাত ছিল।আসল যুদ্ধ ছিল এলাকা দখলের।কে কোন ঘাট নিয়ন্ত্রণ করবে।কার ট্রাক আগে ঢুকবে।কার মাল আগে নামবে।পুরান ঢাকার প্রতিটা গলি তখন টাকার রাস্তায় পরিণত হয়েছিল।এই অস্থিরতার মাঝেই উঠে আসে দুই নাম,কৃষ্ণ দাস।চন্দ্র দাস।
দুই ভাই হলে ও ক্ষমতার লোভে তারা হয়ে ওঠে সাপে নেউলে । তারা খুব দ্রুত হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ী আর লোকজনকে নিজেদের ছায়ার নিচে নিয়ে আসে। পুরান ঢাকার একটা বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নেয় আবুল বাশার।

উসমান সাহেবের মৃত্যুর পর তিনি সিন্ডিকেট থেকে সরা দাড়ায়। কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে সিন্ডিকেট থেকে সরে দাঁড়ালেও সবাই জানত।ছায়ার আড়াল থেকে এখনও অনেক কিছু তার হাতেই চলে।কিন্তু পুরান ঢাকার অন্ধকার ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় আগমন ছিল আরেকজনের।খান সাহেব।হঠাৎ করেই যেন আকাশ থেকে নেমে আসে লোকটা।কেউ জানত না সে কোথা থেকে এসেছে।কেউ তার আসল নাম জানত না।শুধু জানা গেল।তার কাছে টাকার শেষ নেই।এক এক করে গুদাম কিনতে শুরু করল।পুরোনো বাড়ি কিনল।ঘাট কিনল।মানুষ কিনল।রাজনীতি কিনল।অনেকেই বলত, পুরান ঢাকার অর্ধেক নেতা তার টাকায় চলে।
খান সাহেব কখনও সামনে আসত না। ছবি তুলত না। মিটিংয়ে বসত না। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ছাড়া বড় কোনো চালান নড়ত না।ধীরে ধীরে পুরান ঢাকার সিন্ডিকেট চারভাগে ভাগ হয়ে যায়।কৃষ্ণ দাস।চন্দ্র দাস।আবুল বাশারের ইসলাম পার্টি।আর পরে উঠে আসে বাতাসি বেগমের তৃতীয় লিঙ্গ পার্টি।

বাতাসি বেগমকে নিয়ে পুরান ঢাকায় অদ্ভুত সব গল্প প্রচলিত। জন্মসূত্রে পুরুষ হলেও নিজেকে নারী পরিচয়েই প্রতিষ্ঠা করেছে সে। শাড়ি, চুড়ি, নাকফুল, ভারী মেকআপ।সবসময় নারীর সাজে থাকেন তিনি। অথচ তার নাম শুনলে অনেক দাগী অপরাধীও রাস্তা বদলে ফেলে।পুরান ঢাকার অন্ধকার জগতটা বাইরে থেকে যত ছোট লাগে, ভেতরে ততটাই ভয়ংকর।
বাইরে বাইরে সবাই শত্রু।কিন্তু প্রয়োজন হলে একই টেবিলে বসে কোটি টাকার ডিল করে।পুরান ঢাকার অন্ধকার দুনিয়াটা এমনই।এখানে ধর্ম দিয়ে দাঙ্গা লাগে।আর রাতের বেলা সেই একই মানুষ একসাথে ব্যবসা করে।এই নোংরা দুনিয়ার নতুন প্রজন্মের দুই ভয়ংকর নাম অভী ব্রো যাকে সবাই কিং এবং চন্দ্র দাস চাঁদ ও বলে। আর জুলফিকার। যাকে আলফা ব্রো এবং ক্যাম্পাসে প্রিন্স ব্রো বলে ডাকা হয়।আবুল বাশারের চোখের বিষ।কারণ আড়ালে কৃষ্ণ দাস আর চন্দ্র দাসের বেশিরভাগ অপারেশন সামলায় এরা দুজন। অথচ দুজনের স্বভাব সম্পূর্ণ। আলাদা।
জুলফিকার গরম মাথার মানুষ! আর অভী একদম ঠান্ডা । তবুও অদ্ভুতভাবে আবুল বাশার মাঝে মাঝে অভীর কথা শুনে। কারণ সিন্ডিকেটের এই নোংরা দুনিয়ায় দাঁড়িয়েও ছেলেটা আজ পর্যন্ত নিজের হাতে কাউকে খু’ন করেনি, কোনো মেয়ের গায়ে হাত তোলেনি। কখনো কাউকে গা’লি দেয়নি।যেটা এখানে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে ধুতে অভী বলে,

“কথা বলমু।”
সাদিয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
“সত্যি?”
“হুম।”
মেয়েটা হেসে উঠে দাঁড়ায়।
“তাহলে আমি যাই ভাইয়া। জুলফি ভাইকে খাবার দিয়ে আসতে হবে।”
অভী ঠোঁট বাঁকািয়ে বলে,
“সাথে একটু বিষও মিশাইয়া দিস।”
“আহ ভাইয়া!”
সাদিয়া বিরক্ত মুখে তাকায়।
“কবে যে তোমরা মিলবা!”
অভী সিগারে আগুন ধরাতে ধরাতে শান্ত গলায় বলে,
“এই জন্মে না।শুধু তোর জন্য চুপ আছি। নাহলে এতদিনে দুইজনের একজন মরতো।”
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে জানে, এই দুই জন মানুষকে বদলানো সম্ভব না।সে বেরিয়ে যায় জুলফিকারের বাড়ির উদ্দেশ্যে।আর ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।

অভী মাঝে মাঝে ভাবতে পারে না।এই ছোট্ট জায়গাকে ঘিরে এত আগ্রহ কেন উপর মহলের?এত নিরাপত্তা কেন?এত ক্ষমতার লড়াই কেন?ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
কিন্তু শহরের অন্যপ্রান্তে তখনও আলো জ্বলছে।ডিবি কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে টেবিলভর্তি ফাইল ছড়িয়ে বসে আছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) ইন্সপেক্টর রেহমান সিদ্দিক।চোখ লাল হয়ে আছে তার। কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি।সামনে বসে আছেন ডিআইজি মাহবুবুর রহমান। অতিরিক্ত কমিশনার তাহসিন কবির।এসপি ফরিদুল হক।আর ক্রাইম অ্যানালিস্ট মেজর (অব.) আদনান রশিদ।ঘরের পরিবেশ ভারী।দেয়ালের স্ক্রিনে একটার পর একটা শিশুর ছবি ভেসে উঠছে।সবাই ছেলে।বয়স বারো থেকে পনেরোর মধ্যে।কেউ মাদরাসার ছাত্র।কেউ পথশিশু।কেউ স্কুল থেকে ফেরার পথে হারিয়েছে।কেউ ঘুম থেকে উঠে নিখোঁজ।কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টা অন্য জায়গায়।সংখ্যা।প্রতি পাঁচ বছর পরপর ঠিক বাহাত্তরজন শিশু হারায়।না একজন বেশি।না কম।

২০০৬সালে__৭২ জন।২০১১ সালে __ ৭২ জন।২০১৬ সালে __ ৭২ জন।২০২১ সালে __৭২ জন।আর এবারও সংখ্যাটা একই জায়গায় গিয়ে থেমেছে।৭২।যেন কেউ হিসাব করে মানুষ গুনছে।ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।
রেহমান ধীরে ধীরে দেয়ালে টাঙানো ম্যাপের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।লাল মার্কার দিয়ে পুরান ঢাকার কয়েকটা জায়গা গোল করা।শ্যামবাজার।ওয়াইজঘাট।চকবাজার।লালবাগ।সে নিচু গলায় বলে,
“স্যার… এইটা কাকতালীয় না।এইটা রিচুয়ালিস্টিক প্যাটার্ন।”
কথাটা শুনে কয়েকজন অফিসার একে অপরের দিকে তাকায়।
রেহমান আবার বলে,
“আমি শতভাগ নিশ্চিত।পুরান ঢাকার অদৃশ্য সিন্ডিকেটের সাথে এই ঘটনার কানেকশন আছে।”
ডিআইজি মাহবুবুর রহমান কপাল কুঁচকে বলেন,
“বেসিস?”

রেহমান টেবিলে একটা পুরোনো ছবি রাখে।২০০১ সালের।ছবিতে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন কিশোর।ছবির পিছনে হাতে লেখা একটা সংখ্যা ৭২।
“এই সংখ্যাটা বারবার আসতেছে স্যার।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
“আমার ইনফরমেশন অনুযায়ী, এই বাচ্চাদের ব্যবহার করা হয় অবৈধ কাজে। কিন্তু… কাজটা কী, সেটা কেউ জানে না।”
অতিরিক্ত কমিশনার তাহসিন কবির ঠান্ডা গলায় বলেন,
“তুমি আবার পুরান ঢাকার পিছনে লাগছো রেহমান?”
কথাটার মধ্যে স্পষ্ট বিদ্রূপ ছিল।কারণ বিভাগে এখন ধীরে ধীরে রেহমানের উপর বিশ্বাস কমে যাচ্ছে।সে বহুবার অভী আর জুলফিকারকে ধরার চেষ্টা করেছে।প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে।প্রতিবারই বলেছে।ওরা ড্রাগ চালায়, মানি লন্ডারিং করে, অস্ত্র আনে।কিন্তু কখনও প্রমাণ করতে পারেনি।অথচ রেহমান জানেসে ভুল না।সমস্যা অন্য জায়গায়।এই শহরে আইন বইয়ে লেখা থাকে।বাস্তবে আইন চলে টাকার ইশারায়।অনেক অফিসার সেই টাকার নিচে মাথা নত করে ফেলেছে বহু আগেই।কিন্তু রেহমান পারেনি।আর এটাই এখন তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।

‘পরের_দিন’
সকাল ঠিক দশটা। ঢাকার রাস্তাগুলো তখনও পুরোপুরি গরমে পুড়ে ওঠেনি, কিন্তু মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। কোথাও ভাপ ওঠা চা, কোথাও পুরোনো দোকানের শাটার উঠছে ধীরে ধীরে। এর মাঝেই একদল মেয়ে একই রঙের শাড়ি পরে গলি পেরিয়ে হেঁটে চলেছে। কারও হাতে ফোন, কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিকের হাসি।
এইচএসসি পরীক্ষা আবারও পিছিয়েছে। স্টুডেন্ট আন্দোলনের কারণে পুরো শহরের শিক্ষাব্যবস্থা এলোমেলো। কিন্তু তাতে কী? কোচিং আছে, বন্ধু আছে, আড্ডা আছে, এই বয়সে জীবন থেমে থাকে না।আজকের প্ল্যান ছিল সোজা।আগে একটু রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা, তারপর রিলস বানানো।
হাঁটতে হাঁটতে মনিকা হঠাৎ কপাল কুঁচকে আনন্দীর দিকে তাকায়।

“কীরে আনন্দী! তোর কানের ফুল কই?”
আনন্দী থমকে যায়,
“কোন ফুল?”
“আরে! আমি এতো সুন্দর করে সেট করে দিলাম! এক কান খালি কেন?”
তড়িঘড়ি করে কানে হাত দেয় আনন্দী। সত্যিই তো একটা নেই।মুহূর্তেই তার মুখ ছোট হয়ে যায়।আজ অনেক যত্ন করে সেজেছে সে। হালকা কাজ করা শাড়ি, খোলা চুল, চোখে পাতলা কাজল। অথচ সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটাই কখন পড়ে গেছে, টেরই পায়নি।
চারপাশে তাকাতেই রাস্তার ধারে একটা ছোট ফুলের দোকান চোখে পড়ে। বাঁশের ঝুড়িতে টাটকা গোলাপ সাজানো। পাশে বসে থাকা বয়স্ক ফুলওয়ালা অলস ভঙ্গিতে পাখা দিয়ে বাতাস করছে।আনন্দীর চোখ চকচক করে ওঠে।

“চল! গোলাপ কিনি।”
“আবার নতুন ফ্যাশন শুরু হলো,” পেছন থেকে হেসে বলে তিথি।
সবাই মিলে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আনন্দী নিচু হয়ে গোলাপগুলো দেখতে থাকে। একটা টকটকে লাল গোলাপ হাতে নিয়ে বেশ মন দিয়ে দেখে সে।
“কত?”
“ত্রিশ টাকা আপা।”
“এইটুকু ফুল ত্রিশ?” আনন্দী চোখ বড় বড় করে তাকায়। “বিশ টাকা দেবো।”
ফুলওয়ালা হেসে মাথা নাড়ে।

উন্মাদনা পর্ব ৩১

“আপনের জন্য পঁচিশ।”
আনন্দী বিজয়ীর হাসি দেয়।
“ঠিক আছে। দিন।”
গোলাপটা নিয়ে খুব যত্ন করে কানের পাশে গুঁজে দেয় সে। খোলা চুলের ফাঁকে লাল ফুলটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। যেন লোকভর্তি ঢাকার ধুলোমাখা রাস্তায় হঠাৎ ফুটে ওঠা টাটকা কোনো সকাল।ফোন বের করে চুল ঠিক করতে করতে সে বান্ধবীদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।একগাল হাসি দিয়ে বলে,
“কেমন লাগছে আমাকে?”
“চুত’মারানি!”

উন্মাদনা পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here