Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৩৮

উন্মাদনা পর্ব ৩৮

উন্মাদনা পর্ব ৩৮
কায়নাত খান কবিতা

‘আরেক বে’ডার লগে কফি খাইতে গেছিলা! কয়*ডা লাগে তোমার সোনামনি?’
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু কিছুক্ষণ স্থির চোখে অভীর দিকে তাকিয়ে থাকে । সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিলো না, ছিলো না দ্বিধাও। বরং জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা রাগ একসাথে মিশে ছিলো সেখানে।অভীও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ । তার শেষ কথাগুলো যেন এখনও ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দুজনের মাঝখানে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে। ভারী, অস্বস্তিকর, শ্বাসরুদ্ধকর।
হঠাৎই আনন্দী এক পা এগিয়ে আসে।অভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার শার্টের কলার মুঠো করে ধরে সজোরে একটা চ’ড় বসিয়ে দেয় গালে।শব্দটা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।কিন্তু আনন্দীর রাগ যেন এতটুকুতেও কমে না।পরপর কয়েকটা চ*ড় বসতে থাকে অভীর গালে। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে যেন বেরিয়ে আসে তার বুকের ভেতরে জমে থাকা অসহায়ত্ব, অপমা’ন আর তীব্র ক্ষো*ভ। এতদিন যে কথাগুলো বলতে পারেনি, যে প্রতিবাদগুলো গিলে ফেলেছে, সেগুলো যেন হাতের ঝাপটাতেই প্রকাশ পাচ্ছে আজ।

রাগে আনন্দীর বুক ওঠানামা করতে থাকে । শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে বহু আগেই । চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।তবু অভী নড়ে না।এক ইঞ্চিও না।চোয়াল শক্ত করে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। গালের পাশে লালচে দাগ ফুটে উঠলেও মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেন ব্যথা অনুভবই করছে না সে।অথবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু।সে ইচ্ছে করেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না।
‘ জানো’য়ার! আস্তো একটা প’শু। আমার পুরো জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছেন আপনিহহহহ!’
অভীর শার্টের কলার দু-হাতে শক্ত করে ধরে বারবার ঝাঁকাতে থাকে আনন্দী। তার ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়ত্ব যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়েছে আজ। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে, শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করতে থাকে । চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, অথচ সে থামে না। যেকোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা অসম্ভব। কিন্তু অভী আশ্চর্য রকম স্থির। চোয়াল শক্ত করে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। আনন্দীর প্রতিটি ঝাঁকুনি নীরবে সহ্য করে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। আর সেই অস্বাভাবিক নীরবতাই ঘরের উত্তেজনাকে আরও ভারী করে তোলে।

‘ এতো মানুষ মরে আপনি কেন মরেন না?’
আনন্দীর হাত দুটো ধীরে নিজের কলার থেকে সরিয়ে দেয় অভী। তার আঙুলের চাপ দৃঢ় হলেও মুখের অভিব্যক্তি বদলায় না। কয়েক মুহূর্ত সে চুপচাপ আনন্দীর দিকে তাকিয়ে থাকে। রাগে, ক্লান্তিতে আর তীব্র আবেগে আনন্দীর চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়েছিল। অভী একবার তাকিয়ে থেকে সেগুলো কানের পাশে সরিয়ে দেয়।আনন্দী সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
‘ একটু পানি খেয়ে নে।তাহলে আরো কয়টস চড় জো’রে মারতে পারবি।’
অভীর কথা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারে না আনন্দী। সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। চোখের পানি থামানোর কোনো চেষ্টাও করে না সে।অভীকে আ*ঘাত করে, রাগ দেখিয়ে বা অপমান করে কোনো লাভ নেই।এই সত্যিটা সে অনেক আগেই বুঝেছে। অভী এমন একজন মানুষ, যার সামনে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলেও মনে হয় শেষ পর্যন্ত আঘাতটা নিজের কাছেই ফিরে আসে।
একসময় কা:ন্নার চাপে হাঁটু ভেঙে আসে আনন্দীর। ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ে সে।অভী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে। শক্ত হাতে তার বাহু ধরে নিচ থেকে তুলে দাঁড় করায়। আনন্দী বাধা দেয় না। হয়তো দেওয়ার মতো শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই তার।ঘরের ভেতর তখন শুধু তার চাপা কান্নার শব্দ।

‘আপনার তো ক্ষমতার অভাব নেই, অভী। তাহলে শুরু থেকেই সত্যিটা জানার চেষ্টা করলেন না কেন? আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। আপনার ক্যারিয়ার নষ্ট করিনি। ভিডিওটাও আমি ও আমি আপলোড করিনি। তাহলে আমাকেই কেন এত কষ্ট দিলেন? আমার অপরাধটা কী ছিল?’
কথাগুলো বলতে বলতেই আবার তার চোখ ভিজে ওঠে।অভী কোনো উত্তর দেয় না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।আনন্দী তিক্ত হেসে মাথা নাড়ে।
‘এক দিক দিয়ে দেখলে আপনার সঙ্গে যা হয়েছে, সেটাই হয়তো আপনার প্রাপ্য ছিলো। আপনি তো স্নেহার জীবনও নষ্ট করেছিলেন। সে তখন প্রেগন্যান্ট ছিলো। কত অপমান, কত বদনাম সহ্য করতে হয়েছে তাকে। আপনি কেন সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করেননি? কেন শুধু আমার পেছনেই পড়ে রইলেন?’
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।আনন্দী চোখের পানি মুছতে মুছতে আবার বলে,
‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু করেছে স্নেহা। কিন্তু শা*স্তিগুলো পেলাম আমি। কেন? আপনি যদি এত কিছু জানতেন, তাহলে প্রথম দিনই সত্যিটা খুঁজে বের করেননি কেনো? কেন একবারও জানতে চাননি আসলে দোষটা কার ছিল?’

অভী ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আনন্দীর গাল বেয়ে নেমে আসা পানি মুছে দেয়। তার চোখে তখন আগের সেই কঠোরতা নেই, বরং অদ্ভুত এক স্থিরতা।নিচু স্বরে সে বলে,
‘আমি শুরু থেকেই সব জানি।’
কথাটা শুনে আনন্দীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে শূন্য হয়ে যায়।মুহূর্তের জন্য মনে হয়, তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে।সে অবিশ্বাসে অভীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘ আপনি সব জানতেন?’
অভীর কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আনন্দী। যেন তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। পরের মুহূর্তেই জোরে হেসে ওঠে অভী। সেই হাসির শব্দ আনন্দীর কানে বিষের মতো বিঁধতে থাকে। অবিশ্বাসে অভীর দিকে তাকিয়ে থাকে সে। যদি অভী শুরু থেকেই সব জেনে থাকে, তাহলে এতদিনের এই অন্যায়, অপমান আর কষ্টের মানে কী? এতগুলো বছর ধরে কেন তাকে দোষীর মতো শাস্তি পেতে হলো? মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে তার। অভী নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগা’রেট জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে,

‘ তোর কী মনে হয়? আমি তোর ফাঁদে পা দিয়েছিলাম?’
অভীর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে।
‘ তুই আমার ফাঁদে পা দিয়েছিস!’
আনন্দীর চোখে তখন শুধু হতাশা আর ভাঙা বিশ্বাসের ছাপ। মনে হতে থাকে , এতদিন ধরে যে সত্যটাকে আঁকড়ে বেঁচে ছিল, সেটাও বুঝি মিথ্যে। আর অভীর চোখে সেই অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে ।
‘ এতো গুলো দিন ধরে, এতো অন্যায়। এতো অবিচার সব ইচ্ছা কৃত ছিলো?”
‘ ইয়েস!’
জল’ন্ত সিগা:রের ধোঁয়ায় পুরো ঘর তখন পরিপূর্ণ। মোটামুটি একটি দমবন্ধ কর পরিবেশ বলা চলে।কিন্তু এর থেকে দম বন্ধকর বিষয় হলো অভীর এই সরল স্বীকারোক্তি। অভী সব জানতো। শুরু থেকেই সব জানতো। তাহলে এতো গুলো দিন কেন এ দহনে পড়া’নো হলো আনন্দীকে? একটি মেয়ের সব থেকে পবিত্র জিনিস কেন কেড়ে নেওয়া হলো?
সিগা’রটি পা দিয়ে পিষে আনন্দীর মুখোমুখি দাঁড়ায় অভী।তার গালে হালকা স্লাইড করতে করতে বলে,
‘ আমার সাথে তাই হইছে যা আমি চাইছি!’

‘ কেন করলেন এটা?’
‘ দিন দুনিয়া অনেক খারা:প সোনামনি। ভালো মেয়ের অভাব পড়ছে। তাই তোরে নিজের হাতে পাইলা, চোখে চোখে রাইখা বড়ো করছি।কিন্তু মাঝে সমস্যা হইতো তোরে দেখলে মাথা ঠিক থাকতো না!’
কপাল কুঁচকে অভীর বলা সমস্ত কথা গুলো শুনতে থাকে আনন্দী। এক প’শু তার অপ’রাধ স্বীকার করছে।এর থেকে বড়ো বিষয় আর কী হতে পারে?
‘ চোখের সামনে তুই বড় হইতাছিলি আর আমার ধৈর্যের বাধ ছুটতাছিলো। আর কত ধৈর্য ধরা যায়?চোখ দিয়ে আর মাপা যায়? তাই…!’
খুব উচ্চস্বরে হাসতে থাকে অভী।আনন্দী তখন ও নিশ্চুপ। যেন বিবেক আর প্রতিবাদ দুইয়ের মাঝে কোথাও একটি ছক কষতে থাকে সে। অভী হাসতে হাসতে এক পাশে চলে যায়। গায়ে আড়মোড়া দিয়ে আবার ও বলে,

‘ তুই আসলেই একটা কাড়াক মা…!’
সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই দোতলার ঘরে প্রতিধ্বনিত হয় একটি আর্তনাদ। প্রতিটি দেয়ালে বাড়ি খেতে থাকে সেই চিৎকার। অভী দু-হাত দিয়ে পেট ধরে মাটিতে শুয়ে পড়ে। আনন্দীর চোখে তখন ও ঘৃণা। সে আহত অভীর বুক বরাবর কয়টা লা’থি ও মা*রে।
‘ বা”ন্দী এইডা কী করলি তুই!’

উন্মাদনা পর্ব ৩৭

‘ একজন ধ র্ষ ণ কারিকে শা’স্তি দিলাম। পুলিশ কিছু করলো না তো কী হয়েছে? আমি নিজে করলাম!’
মুখ থেকে থুথু নিক্ষেপ করে আনন্দী অভীর দিকে ছুড়ি মা’রে। র*ক্ত মাথা হাত নিয়ে অভী আনন্দীর দিকে হাত বাড়াতেই সে হাতে ও আনন্দী লা’থি দেয়।
‘ এরপরের বার কাউকে ধ ষ ণ করার আগে মনে রাখিস।তুই ও কোনো মেয়ের পেট থেকেই জন্ম নিয়েছিস জা:নোয়ার।’

উন্মাদনা পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here