উন্মাদনা পর্ব ৪০
কায়নাত খান কবিতা
“ এখন বাবা নয়! ড্যাডি বলার সময়! চলো সোনামনি।’
অভীর বাহুর শক্ত বাঁধনে আটকে থাকে আনন্দী। সে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে থাকে।বাবাকে শেষবারের মতো দেখার এক ব্যর্থ মরিয়া চেষ্টায়। কিন্তু যে মানুষটিকে সে সারাজীবন আশ্রয়ের বৃক্ষ ভেবে এসেছে, আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন অসহায়ের মতো। চোখে অসংখ্য না-বলা কথা, অথচ পরিস্থিতির কাছে সম্পূর্ণ পরাজিত। নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিল না তার।
আনন্দীর বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে যেতে থাকে।অন্যদিকে অভী একবার ও থামে না। দৃঢ় পদক্ষেপে সে আনন্দীকে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে বাড়ির বাইরের দিকে। তাদের পেছনে তার সাঙ্গোপাঙ্গরাও নীরবে অনুসরণ করতে থাকে , যেন সবকিছু আগেই ঠিক করা ছিলো।
বাড়ির সীমানা পেরিয়ে গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় চারপাশে রাতের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠেছিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে অভী এক হাতে নিজের পেটের ওপর বাঁধা ব্যান্ডেজের প্রান্ত ধরে। তারপর ধীরেসুস্থে সেটি খুলে ফেলে।এক টুকরো কাপড় মাটিতে পড়ে যায় ।
অভী চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, রহস্যময় এক হাসি ফুটে উঠে।যেন বহুক্ষণ ধরে অভিনয় করা একটি চরিত্রের অবসান ঘটেছে মাত্র।কিন্তু তার ঠিক পাশেই হাঁটতে থাকা আনন্দী কিছুই টের পেলো না।
সে তখনও নিজের ভাঙা পৃথিবীর হিসাব কষতে ব্যস্ত। বুঝতেই পারলো না, যে মানুষটিকে সে আহত ভেবেছিলো, সেই মানুষটিই এতক্ষণ নিখুঁত অভিনয়ে তাকে এবং তার পরিবারকে প্রতারণার জালে আটকে রেখেছে। আর অভী, সমস্ত সত্য বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখে, নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকে নিয়ে এগিয়ে চলতে থাকে নতুনর স্বপ্নের দিকে।
গাড়িতে ওঠার আগে এক মুহূর্তের জন্য অভী পাশ ফিরে আনন্দীর দিকে তাকায়। তারপর ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠে তির্যক এক হাসি। হাসিটা ছিল বিজয়ের, আবার খানিকটা উপহাসেরও। কারণ আনন্দী এখনো জানে না।সে কোনো অপরাধী নয়। যে অপরাধের বোঝা এতক্ষণ ধরে নিজের কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে, তার বেশিরভাগটাই ছিল অভীর সাজানো এক ফাঁদ।
গাড়ির দরজা বন্ধ করতেই অভীর মনে ভেসে উঠে কয়েক ঘণ্টা আগের দৃশ্যগুলো। সে ডেসিন টেবিলের পাশে উল্টো দিকে মুখ করে দাড়িয়ে ছিলো।
ঘরের ভেতর আধো-অন্ধকার, তবে জানালার কাচ ভেদ করে আসা ক্ষীণ আলো ডাইনিং টেবিলের চকচকে পৃষ্ঠে প্রতিফলিত হতে থাকে অন্য কিছু । সেই প্রতিফলনেই অভী স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলো, আনন্দী ধীরে ধীরে একটি ছুরি হাতে তার দিকে এগিয়ে আসছে।
দৃশ্যটা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে অভীর মাথায় অন্য পরিকল্পনা আসে।নিঃশব্দে সে নিজের ফোনটি অন করে এমনভাবে পাশে রেখে দেয়, যাতে পুরো ঘটনাটা রেকর্ড হয়। আনন্দী এতটাই উত্তেজিত আর আবেগে অন্ধ ছিলো যে সামান্যতম সন্দেহও করেনি। সে বুঝতেই পারেনি, তার প্রতিটি পদক্ষেপ অভীর নজরে রয়েছে।
এরপর মুহূর্তটা আসে। আনন্দী ছু’রিটি চালিয়ে দেয় অভীর দিকে।কিন্তু শেষ মুহূর্তে অভী নিজের দুই হাত সামনে এনে আঘাত ঠেকিয়ে দেয়। ধারা’লো ফলাটি তার হাত কে’টে দেয় বটে, তবে পেটে পৌঁছাতে পারে না। ব্যথায় তার হাত রক্তাক্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হয়।
পরের সবটা ছিলো অভিনয়।অভী ইচ্ছে করেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে, এমনভাবে নিস্তেজ হয়ে যায় যেন গুরুতর আঘাত পেয়েছে। আর আনন্দী, নিজের আতঙ্ক আর অপরাধবোধের ভেতর ডুবে গিয়ে বিশ্বাস করে ফেলে যে সে সত্যিই ভয়ঙ্কর কিছু করে ফেলেছে।সেই ভুল বিশ্বাসই পরে অভীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
আর এখন, গাড়ির ভেতরে বসে সেই ঘটনাগুলো মনে করতে করতে অভীর চোখে আবারও সেই রহস্যময় হাসি ফিরে আসে। আনন্দী এখনো সত্যটা জানে না। সে এখনো মনে করতে থাকে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, অথচ পুরো খেলাটার চালক ছিলো অন্য কেউ। আর সেই মানুষটি নিশ্চুপে বসে আছে তার একদম পাশেই।
পুরো পথজুড়ে গাড়ির ভেতর ছিল একেবারে উৎসবমুখর পরিবেশ। অভীর সাঙ্গোপাঙ্গরা কেউ হাসছিলো, কেউ ঠাট্টা করছিলো, আবার কেউ পুরো ঘটনাটা নিয়ে রসিকতা করতে ব্যস্ত ছিলো। মাঝেমধ্যে অভীও তাদের কথায় যোগ দিতে থাকে। যেন তারা কোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিরেছে বিষয়টি এমন নয়, বরং কোনো সফল মিশন শেষ করে এসেছে।কিন্তু সেই একই গাড়ির এক কোণে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে আনন্দী।
তার চোখ দুটো শূন্য। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চারপাশের হাসি-ঠাট্টা যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছিলই না। সে বসেছিলো এক জীবন্ত লা*শের মতো।শরীর এখানে, অথচ মন বহু দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে।একসময় গাড়ি অভীর বাড়ির সামনে এসে থামে।
অভী আগে নেমে দরজা খুলে দেয়। তারপর আনন্দীর দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
‘নামো’
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না।অভী তার কবজি ধরে টেনে নামায়। খুব বেশি রুক্ষভাবে নয়, কিন্তু এতটাও নরম নয় যে সেটাকে অনুরোধ বলা যায়। তার আচরণে ছিল এক ধরনের জোর, যেন সে জানে আনন্দী আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে নামতেই হবে।তবে আনন্দীও সহজে হার মানার মেয়ে নয়।
মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজের হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নেয়। একবারও অভীর দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। আশেপাশে কে কী ভাবছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় সে।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে উপরে উঠে যায়। আর আশ্চর্যের বিষয়, কোনো দ্বিধা ছাড়াই গিয়ে ঢুকে পড়ে অভীর রুমে।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।তারপর অভী দুই হাত কোমরে রেখে সিঁড়ির দিকে তাকায়। পরক্ষণেই মাথা নেড়ে হেসে ওঠে।
‘দেখছোস? না আসতেই বাড়ি দখল শুরু করে দিছে!’
তার কথায় আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন হেসে ফেলে।অভী নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ও বলে,
‘ বেডি মানুষরে বেশি সুবিধা দিলে এইটাই সমস্যা। একবার দরজা খুইলা দে, পরে পুরো রাজ্য নিজের নামে লিখা নিতে চায়!
কথাটা বললেও তার চোখের গভীরে বিরক্তির চেয়ে কৌতুকই বেশি ছিল। কারণ সে জানত, আনন্দী রাগে-ক্ষোভে যতই ফুঁসুক না কেন, আজকের রাতটা তাদের দুজনের জন্যই দীর্ঘ হতে চলেছে।
ঘরে ঢুকেই অভী থমকে দাঁড়ায়।আনন্দী ঘরের ঠিক মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জানালার ফাঁক গলে আসা ম্লান আলো তার মুখে পড়েছে। চোখদুটো লাল, কিন্তু সে কাঁদছে না। বরং এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ভেতরের সব অনুভূতি পাথর হয়ে গেছে।অভী কয়েক সেকেন্ড তাকে পর্যবেক্ষণ করে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে কাছে জড়িয়ে ধরে আনন্দীকে।
‘ কী রে, বোকাচন্দ্র? কাঁদছিস কেন?
আনন্দী কোনো উত্তর দেয় না।তার নীরবতায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না অভী।ঠোঁটের কোণে পরিচিত সেই দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে আবার বলে,
‘তোর তো খুশি হওয়ার কথা। তোর স্বামী তোরে ছুইছে।’
‘ ম্যারেটি’য়াল রে*প বলে এটাকে।’
‘ শাহবাগির মতো কথা বলিস না। বিয়ে করা বউ তুই আমার!’’
প্রচন্ড ক্ষোভে অভীকে ধাক্কা দিয়ে কাঁপতে থাকে আনন্দী।
‘ তো আমি কী জানতাম বিয়ে হয়েছে?আমি জানতাম আপনার মতো জানো*য়ার আমার স্বামী হবে? জানেন যখন একজন লোক যখন কোনো পিছনে পিছনে ঘোরে তখন কেমন লাগে? মনে হয় চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। বার বার পুরো শরীরের কাপড় ঠিক করি আমরা। না জানি কোথায় কোন অংশ বের হয়ে গেলো। আর কার লালসার শিকার হলাম! জানেন উপন্যাস, গল্পে আপনার মতো লোকদের না অনেক দাম।অনেক চাহিদা। মেয়েরা মরিয়া হয়ে ওঠে আপনাদের মতো রেড ফ্লাগ, চরিত্রহীন দের জন্য। অথচ বাস্তব জীবনে যদি আমাদের অপশন দেওয়া হয়, আপনাদের মতো লোককে বিয়ে করা ছাড়া উপায় নেই তাহলে ৯৯% মেয়ে কখনো বিয়েই করতো না!’
প্রচন্ড হাঁপাতে থাকে আনন্দী। অভী ও একদম নিশ্চুপ। তার বলার মতো যেন কিছুই নেই আজ। চোখের পানি মুছে আনন্দী আবার ও বলে,
‘ জানেন যেদিন আপনি আমার সাথে ওমন কাজ করলেন, আমি বাড়ি গিয়ে গলায় ফা*সি দিতে চেয়েছিলাম। হয়তো দিয়ে ও দিতাম। কিন্তু আমার বাবাইয়ের ডাক কানে এলো। আমি মরলাম না। যদি মরে যেতাম তখন? প্রতিটি সেকেন্ড নিজের সাথে লড়েছি। আয়নার সামনে দাড়ালে মনে হতো আরেহ! এতো ধ..ধ ষ তা’
নিজের সমস্ত রাগ বের করে ফ্লোরে বসে কাঁদতে থাকে আনন্দী। একটি মেয়ের কাছে সব থেকে মূল্য বান জিনিস যখন কেড়ে নেওয়া হয়। তখন সেই মেয়ে ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। কী যাচ্ছে তার উপরে। একটু থেমে আনন্দী অভীর দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ আমার কী দোষ ছিলো অভী? আমাকেই কেনো এতো কিছু সহ্য করতে হলো? আপনাকে দেখলেই তো মনে হবে, এই লোকটা! এই লোকটা আমাকে ধ ষ ণ করেছিলো। আমি কীভাবে আপনাকে স্বামী হিসেবে মানবো অভী? কীভাবে আপনার সাথে থাকবো? আপনাকে দেখলে ও তো ঘৃণা হয় আমার। আমি কীভাবে সারাজীবন এই কষ্ট সহ্য করবো?’
অভী কোনো উত্তর দেয় না। ধীরে ধীরে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে এনে আনন্দীর সামনে মেঝেতে বসে পড়ে। গ্লাসটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
‘ ধর, পানি খা। এতক্ষণে গলা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেছে তোর।
আনন্দী গ্লাসের দিকে তাকায় ও না। সে শুধু চোখ বন্ধ করে মাথাটা নিচু করে রাখে। যেন অভীর উপস্থিতিটুকুও সহ্য করতে পারছে না।অভী কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মৃদু হেসে বলে,
‘তুই চাইলে আমার বউ, না চাইলে আমার বউই।
কথাটা শুনে আনন্দী ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার দৃষ্টি ছিল বরফশীতল।
‘ জালিয়াতির বিয়ে কী হয়? মুসলিম ধর্মে এমন বিয়ে জায়েজ নেই। ধরতে গেলে আমি ধ ষ তা।’
পানির গ্লাসটি ফ্লোরে রেখে অভী আনন্দীকে বলে,
উন্মাদনা পর্ব ৩৯
‘ আমি জীবনে কোনো মাইয়ার গায়ে হা’ত তুলি নাই। বিসমিল্লাহ!’
বিসমিল্লাহ বলে খুব জোরে আনন্দীর গালে চ’ড় বসিয়ে দেয় অভী।
‘ বিয়ে কে অস্বীকার করোস জাহা’ন্নামী মহিলা’
আনন্দী ও কম কিসে। হুট করে উঠে সে ও অভীর গালে চ’ড় বসিয়ে দেয়।
‘ কীভাবে বিয়ে হয় সেটা তুই ও জেনে নিস জানো’য়ার
তুই না ডাক্তার ছিলো? কেমন ডাক্তার ছিলি তুই?’
