Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২৫

এই অবেলায় পর্ব ২৫

এই অবেলায় পর্ব ২৫
সুমনা সাথী

বিশাল এক কনফারেন্স রুম। উপস্থিত সবাই দিব্যর দিকেই তাকিয়ে আছে। সে-ই এখন সবার মধ্যমণি। লম্বা ও চকচকে টেবিলের দুপাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। ঠিক সেই মুহূর্তে অসীম অতি সন্তর্পণে দিব্যর ফোনটা ওর চোখের সামনে ধরতেই সে বিরক্তি আর বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকালো। এই সময়ে কে ফোন করতে পারে! অসীম নিরুপায় ভঙ্গিতে ফোনটা আরও একটু এগিয়ে দিতেই দিব্য স্ক্রিনের ওপর একবার নজর বুলাল এবং পরক্ষণেই স্তব্ধ হয়ে গেল। নবনী তাকে এই অসময়ে ফোন করেছে। বিষয়টি কোনোভাবেই তার বোধগম্য হলো না। দিব্যকে মিটিং ছেড়ে উঠে যেতে দেখে আফতাব তালুকদার অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন,
‘কোথায় যাচ্ছ দিব্য? একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে কিন্তু!’

দিব্য একবার সবার চোখের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। অত্যন্ত ধীরস্থির গলায় বলল,
‘পাঁচ মিনিটের একটি বিরতি নিচ্ছি চাচ্চু। আমি ফিরে এলেই আলোচনা পুনরায় শুরু হবে।’
বলেই সে তড়িৎ পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে নবনীর কলটা কেটে গেছে। এদিকে নবনীর মনের অস্থিরতা যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। অনেক দ্বিধা আর সংঘাত কাটিয়ে সে অবশেষে ফোনটা করেছিল কিন্তু দিব্য ধরল না। মনে একরাশ কু ডাকতে শুরু করল। দিব্য ঠিক আছে তো? ঠিক সেই মুহূর্তে হাতের ফোনটা সজোরে কেঁপে উঠতেই নবনী চমকে উঠল। স্ক্রিনের ওপর দিব্যর নামটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। অবশ্য দিব্যর নম্বরটা নবনী দিয়া’র নামে সেভ করে রেখেছে। নবনীর মনটা যেন এক নিমিষেই অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে গেল। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
‘নবনী? এটা কি সত্যিই তুমি?’
দিব্যর কণ্ঠে একরাশ অবিশ্বাস। সে কল্পনাও করেনি নবনী নিজে থেকে তাকে ফোন করবে। নবনী যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। অস্ফুট স্বরে কেবল বলল,

‘হুম।’
দিব্য কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ল। নবনীর কণ্ঠস্বরে কেমন যেন একটা জড়তা। সে শুধাল,
‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? তোমার কি বিশেষ কিছু দরকার?’
নবনী এখন কোন প্রয়োজনের কথা বলবে! সে তো কেবল তার মনের ওই অজানা ভয় আর খারাপ লাগা থেকে মুক্তির আশায় ফোনটা করেছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
‘আপনি… আপনি আজ কখন ফিরবেন?’
‘আজ একটু দ্রুতই ফেরার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু কেন বলো তো?’
‘তাড়াতাড়ি কেনো ফিরবেন?’
দিব্য বুঝতে পারল না মেয়েটার আসলে হয়েছেটা কী। মজা করে বলল,
‘কেন? তুমি কি চাও না আমি দ্রুত বাড়ি ফিরি?’
নবনী তড়িৎ বেগে বলে উঠল, ‘মোটেও না! আমি কেন এমনটা চাইব? আসলে দিয়া বলছিল আজ যেন আপনিই ওকে স্কুল থেকে আনতে যান। আর বাড়ির গাড়িটা তো কায়েফ ভাই নিয়ে গেছেন।’
দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে শান্ত গলায় বলল,
‘আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বাসায় ফিরছি। তুমি তৈরি থেকো নবনী। আজ আমরা শপিংয়ে যাব।’
নবনী বিরক্ত হলো। এই লোকটা কি সবসময় কথার উল্টো মানে বের না করলে শান্তি পায় না? সে তো একবারও শপিংয়ের কথা তোলেনি। ছোট করে বলল,

‘আচমকা শপিং কেন? আপনি সবসময় সব কথার এমন অদ্ভুত মানে কেন বের করেন বলুন তো?’
দিব্য কিছুটা অবাক হলো। একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল,
‘নবনী, আমার হাতে একদম সময় নেই। একটা জরুরি মিটিংয়ের মাঝপথে উঠে এসেছি। তুমি কি জানো কাল দিয়ার জন্মদিন? ও স্কুলে থাকা অবস্থাতেই আমাদের কেনাকাটা সারতে হবে। নয়তো সারপ্রাইজটা তো আর সারপ্রাইজ থাকবে না।’
নাবনী অপ্রস্তুত হয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। একরাশ আড়ষ্টতা ওকে গ্রাস করল। ইশ! কী ভাবতে গিয়ে সে কী ভেবে বসে আছে। লজ্জিত ভঙ্গিতে নিচু গলায় বলল,
‘ঠিক আছে। আপনি সাবধানে আসবেন।’

দিব্য ফোনটা রেখে দিয়ে মৃদু হাসল। নবনীর মনের অস্থিরতা সে কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে। বাকি মিটিংটুকু শেষ করতে আরও আধঘণ্টা সময় পার হয়ে গেল। এরপর দিব্য নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল কিন্তু আচমকা একটা ট্রাক প্রচণ্ড গতিতে ওর গাড়ির দিকে ধেঁয়ে আসতে লাগল। ট্রাকটির গতি যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি তার অবস্থানও ছিল ভুল পথে। চমকে উঠে দিব্য লুকিং গ্লাসে চোখ রাখতেই ওর হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। পেছনের দিক থেকেও হুবহু একই কায়দায় আর একটি ট্রাক উন্মত্তের মতো তেড়ে আসছে। দিব্যর মস্তিষ্ক যেন অসাড় হয়ে পড়ল। আর কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা, তারপরই দুই দিক থেকে আসা ঘাতক ট্রাক দুটোর মাঝে পিষ্ট হয়ে যাবে ওর গাড়িটা। দিব্য মরিয়া হয়ে চারপাশটা দেখে নিল। পালানোর পথ বলতে গেলে রুদ্ধ। ঠিক তখনই ডান দিকে একটা সরু গলি ওর নজরে এল। সময় নষ্ট না করে তীব্র গতিতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটা সেই ছোট গলির ভেতর ঢুকিয়ে দিল। তীব্র শব্দে একটা ডাব বিক্রেতার দোকান দুমড়েমুচড়ে গুঁড়িয়ে গেল। আরও কিছু ক্ষয়ক্ষতির আওয়াজ কানে এল দিব্যর। কেউ আহত হলো কি না সেই হিতাহিত জ্ঞানটুকুও তখন ওর ছিল না। গাড়িটা স্থির হতেই দিব্য চোখ দুটো বুজল। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে পেছনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ওর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এসব কী হচ্ছে ওর সাথে? কেন হচ্ছে? কেউ কি তবে পরিকল্পনা করে ওকে প্রাণে মা রতে চাইছে? কিন্তু কেন? অজস্র অমীমাংসিত প্রশ্ন ওর মাথায় ভিড় করতে লাগল।

লাল আর কালোর মিশেলের শাড়ি পরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল নবনী। শাড়িটা অপূর্ব সুন্দর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দিব্য তালুকদারের রুচি বরাবরই সুন্দর। তবে নবনীর মনে এক সূক্ষ্ম দ্বিধা দানা বাঁধে; লোকটা কি তবে ইচ্ছে করেই তার জন্য এতগুলো লাল শাড়ি নিয়ে এসেছে? সে নিজেই তো লাল রং খুব একটা পছন্দ করে না? নাকি এটা নবনীকে অবজ্ঞা করার কোনো মাধ্যম? কিন্তু পরক্ষণেই নবনী সেই ভাবনা ঝেঁড়ে ফেলল। দিব্যর চোখে সে কেবল গভীর মুগ্ধতাই দেখেছে। মেয়েদের সহজাত প্রবৃত্তি আর প্রখর অনুমান ক্ষমতা বলে দেয় সামনের মানুষটার দৃষ্টিতে ঠিক কী মিশে আছে। লালসা, ঘৃণা নাকি অপার মুগ্ধতা। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ হতে নবনী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দিব্য ঘরে ঢুকেছিল থমথমে মুখ নিয়ে কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর স্নিগ্ধ রূপ দেখে সে যেন পাথর হয়ে গেল। নবনী সম্ভবত সদ্যই গোসল সেরে বের হয়েছে; ওর উন্মুক্ত ভেজা চুল থেকে তখনো টপটপ করে পানি ঝরছে। শাড়িটা কেনার সময় দিব্য মনে মনে নবনীকে যতটা সুন্দর কল্পনা করেছিল, বাস্তবে সে যেন তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি মোহময়ী হয়ে ধরা দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে দিব্যর বুকের ভেতরের অস্থিরতা কোথায় যেন উবে গেল। নবনী বরাবরের মতোই ওর ওই প্রখর আর তীক্ষ্ণ চাউনির সামনে নিজেকে বড্ড অসহায় বোধ করল। দিব্য জোর করে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,

‘এখনো তৈরি হওনি তুমি? আমি কখন বলেছিলাম মনে নেই?’
দিব্য দ্রুতপায়ে ওর কাছে এগিয়ে এল। বাইরে সে নিজেকে শান্ত দেখালেও ওর ভেতরে তখনো এক প্রলয়ংকরী তাণ্ডব চলছে। সে ভয় পেয়েছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে। মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার সেই আতঙ্কটুকু সে স্রেফ নবনীর কাছে লুকিয়ে রাখতে চাইল। নবনী কী বা উত্তর দেবে? দিব্য তো আর অন্দরের খবরাখবর জানে না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী দুপুরের রান্না নবনীকেই সামলাতে হয়েছে। রান্নায় সে আনাড়ি হলেও কোনোমতে সব সামলে নিয়ে তৈরি হতে দেরি হয়ে গেছে। আচমকাই দিব্য হেয়ার ড্রয়ারটা হাতে তুলে নিল। নবনী চমকে উঠল যখন দেখল দিব্য নিজ হাতে ওর ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিতে শুরু করেছে। নবনী যেন এক জীবন্ত পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। লজ্জায় আর সংকোচে ওর দুগালে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল। দিব্যর এই হুটহাট অদ্ভুত আচরণগুলো ওর মাথায় ঢোকে না। আজ লোকটাকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। নবনী আয়নার প্রতিবিম্বে কিছু না বলে নিবিড়ভাবে দিব্যকে পরখ করতে লাগল। আয়নায় কয়েকবার চার চোখের মিলন হলো কিন্তু প্রতিবারই দিব্য সন্তর্পণে চোখ সরিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়ার ভান করল। নবনী মৃদুস্বরে বলল,

‘দেরি তো আপনারও হয়েছে ফিরতে।’
দিব্য চকিতে একবার নবনীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
‘হ্যাঁ, একটু দেরি হয়ে গেছে। শোনো, তুমি বরং জলদি তৈরি হয়ে নাও। আমি একটা গোসল দিয়ে আসছি।’
নবনী মাথা নেড়ে সায় দিল। তার আর কিছু বলার সুযোগ হলো না। তার আগেই দিব্য ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।

পুরোটা সময় এক অসহ্য বিষণ্ণতা নিযানার পিছু ছাড়েনি। গায়ের তপ্ত জ্বরটা যেন আবারও অবাধ্য হয়ে জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি। রগ চিরে আসা প্রচণ্ড মাথাব্যথায় মনে হচ্ছে মাথাটা এখনই দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। তবুও সবটুকু শক্তি নিংড়ে নিয়ে সে ক্লাসে বসে ছিল। গত কটা দিন বইখাতা থেকে যোজন যোজন দূরে কাটলেও সামনেই পরীক্ষা। এই একটা দুশ্চিন্তা তাকে টেনে হিঁচড়ে কলেজে নিয়ে এসেছে। কলেজ গেট দিয়ে বের হলো ধীর পায়ে। নিজের জীবনের এই জটিল গোলকধাঁধার প্রতি চরম এক বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছে তার। মস্তিষ্কের কোষগুলো যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে; কী করা উচিত, কোথায় যাওয়া উচিত কিছুই মাথায় আসছে না। না সে আনতাসের কাছে ফিরতে চায় আর না কলরবের সাথে এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে সংসার থাকতে চায়। এখন কেবল পরীক্ষাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রহর গোণা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।
‘নিযানা?’
পরিচিত কণ্ঠের আচমকা ডাকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সে। সামনে সাহিল দাঁড়িয়ে। একই ক্লাসে পড়লেও তাদের সম্পর্কটা কেবল সৌজন্যের। বিবর্ণ মুখে নিযানা জোর করে এক চিলতে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করল। সাহিল কয়েক কদম এগিয়ে এসে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে শুধাল,

‘এতদিন কোথায় ছিলে? তোমাকে তো এভাবে কলেজ মিস দিতে আগে কখনো দেখিনি।’
নিযানা বরাবরই একটু অন্তর্মুখী; পড়াশোনার বাইরে তার জগতের পরিধিটা খুব একটা বড় নয়। ‘বইপোকা’ বলে সহপাঠীদের খোটা শুনলেও সাহিলের সাথে তার রসায়নটা ছিল ভিন্ন। মূলত বিতর্কের মঞ্চ থেকেই তাদের পরিচয়। পড়াশোনার প্রতি দুজনেরই একনিষ্ঠ সিরিয়াসনেস তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম বন্ধুত্বের সেতু তৈরি করেছিল। নিযানা উত্তরের জন্য মুখ খোলার আগেই যেন তপ্ত ঝড়ের গতিতে একটা বাইক এসে ঠিক তাদের গা ঘেঁষে থামল। টায়ারের ঘর্ষণে ওঠা কর্কশ আওয়াজে নিযানা চোখমুখ কুঁচকে তাকাল। বাইক চালানোর এই উগ্র ভঙ্গি দেখেই সে চিনে ফেলেছে এটা কে। এমন রুক্ষ আর বেপরোয়া কেবল ওই মানুষটাই হতে পারে। কলরব মাথার হেলমেটটা খুলল। তার দুচোখে স্পষ্ট বিরক্তি। নিযানা যেন ওকে দেখেও দেখলো না। কলরবের মেজাজ খারাপ হলো। এখন কি তবে এই মেয়েটাকে সাধাসাধি করে নিয়ে যেতে হবে? দুইজনেই নিরব। মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাহিল পরিস্থিতিটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। কলরবকে সে চেনে। এই কলেজের এমন কোনো জুনিয়র নেই যে কলরব নামক এই মূর্তিমান আতঙ্ককে চেনে না। কলরবের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন সাহিলের ঠিক পছন্দ নয়। তবুও বয়সে বড় এবং কলেজের পরিচিত মুখ হিসেবে সৌজন্য বজায় রাখাটাই শ্রেয় মনে করল সে। মৃদু হেসে বলল,

‘আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।’
কলরব অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সালামের উত্তর দিল। তার চোখের মনিতে কোনো ভাবান্তর নেই। নিযানার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
‘আব্বু তোকে নিয়ে যেতে বলেছে। চল, বাইকে ওঠ।’
নিযানা কিছু বলার আগেই সাহিল বলল, ‘ও হ্যাঁ নিযানা, কয়েকদিন পরেই তো জেলাভিত্তিক চেস প্রতিযোগিতা। ক্লাবে স্যার সেদিন তোমার খোঁজ করছিলেন। গতবার তো কলেজের হয়ে তুমিই জিতেছিলে। এবার কি অংশ নিচ্ছ না?’
নিযানা ধীরস্বরে বলল, ‘ভেবে জানাব। সামনেই পরীক্ষা। এই মুহূর্তে অন্য কিছুতে মন দেওয়াটা বেশ চাপের হয়ে যাবে আমার জন্য।’
‘তা অবশ্য ঠিক। বাই দ্য ওয়ে, উনি তোমার কাজিন হন তো? মামাতো ভাই?’

নিযানা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। গলার কাছে এক দলা অস্বস্তি দানা পাকিয়ে উঠল তার। অথচ পাশে বসে থাকা কলরব নির্বকার। সে তখন সাহিলকে মনে মনে ব্যবচ্ছেদ করছে। চোখে চশমা আঁটা, অদ্ভুত চুলের কাটিং, দেখতে ঠিক ওই নিযানার মতোই নির্বোধ গোছের কেউ হবে হয়তো। নিযানা কোনোমতে মাথা নেড়ে সাহিলের কথায় সায় দিল। কলরব মনে মনে কিছুটা বিস্মিত হলো। যে মেয়ে সারাক্ষণ ‘বউ’ হওয়ার দাবিতে সোচ্চার থাকে। সে আজ সবার সামনে তাকে অনায়াসে ‘ভাই’ হিসেবে মেনে নিচ্ছে! গিরগিটির মতো রং বদলানোয় এই মেয়েটির জুড়ি মেলা ভার। সাহিল প্রস্থান করতেই নিযানা উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল। কলরবের ভেতরে সুপ্ত থাকা মেজাজটা এবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। চোখের পলকে বাইকটা ঘুরিয়ে সে নিযানার পথ আগলে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘সমস্যাটা কী তোর? রাস্তার মধ্যে এমন নাটক করছিস কেন?’
নিযানা শান্ত স্বরে জবাব দিল, ‘আমি তোমার সাথে যাব না। মাঝরাস্তায় অপদস্থ হয়ে পড়ে থাকার চেয়ে শুরু থেকেই নিজের ব্যবস্থা করে নেওয়া অনেক ভালো।’
কলরবের ধৈর্য এবার সীমা ছাড়াল। চোখ দুটো রক্তবর্ণ করলো। বলল,
‘তুই কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস নিযানা। আরশাদ তালুকদার হুকুম করেছে বলে এখানে এসেছি। নয়তো তোকে নিয়ে যাওয়ার কোনো শখ নেই আমার।’

নিযানা তের্যক হেঁসে বলল, ‘তাহলে যাও না। এখানে সময় নষ্ট না করে তোমার এক্স’কে কোলে নিয়ে বসে থাকো!’
কলরবের জিবের ডগায় কুৎসিত একটা গালি চলে এলেও শেষ মুহূর্তে সে নিজেকে সংযত করল। নিযানা তখন গটগট করে কিছুটা পথ পেরিয়ে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। তপ্ত দুপুরে কলেজের এই মোড়ে যানবাহনের বড় আকাল। এভাবে একা চলাচলের অভ্যাস তার কোনোকালেই নেই। তার ওপর জ্বরে শরীরটা যেন ভেঙে আসতে চাইছে। কলরব একচুলও নড়ল না। সে বাইকে হেলান দিয়ে নিযানার এই নিরুপায় অবস্থা বেশ উপভোগ করতে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা তাচ্ছিল্যের হাসিটুকু নিযানার নজর এড়ালো না। রাগে-ঘৃণায় ওর পিত্তি জ্বলে গেল। একটু সময় যেতেই নিযানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেতে শুরু করল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। পা দুটো অবশ হয়ে আসছে; তবুও কলরবকে সহ্য করা তার সাধ্যের অতীত। মরে গেলেও ওই লোকের বাইকে সে উঠবে না। সে আবারও হাঁটা শুরু করল। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েটার মাথায় নির্ঘাত কোনো বড়সড় গণ্ডগোল আছে। কিছুটা পথ পেরোতেই নিযানার মনে হলো, এই মাঝরাস্তায় সে এখনই হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়বে। শরীর আর সায় দিচ্ছে না। ঠিক তখনই একটা বাইক এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। বাইকে অনন্ত আর অভিক। নিযানা ওদের দেখামাত্রই চিনতে পারল। অভিক অবাক হয়ে শুধাল,
‘আরে নিযানা! আপনি ভরদুপুরে এভাবে হেঁটে যাচ্ছেন কেন? কলরবের সাথে কি ঝগড়া হয়েছে নাকি?’
নিযানা থমকে দাঁড়াল। ওরা জানল কীভাবে? নিযানার বিস্ময়ভরা চোখের ভাষা বুঝতে পেরে অনন্ত হাসিমুখে বলল,
‘আরে, ওই তো কলরব তোমার পেছনেই আসছে। ওর বাইক থাকতেও তুমি এভাবে হেঁটে যাচ্ছো দেখে ভাবলাম জিজ্ঞেস করি।’

পেছনে কলরব আসছে শুনে নিযানা তড়িৎবেগে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দেখল খানিকটা দূরে বাইকে বসে কলরব অপলক তাকিয়ে আছে। নিযানা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কলরবের ইচ্ছে করছিল মাঝরাস্তায় এই তিনটেকেই ধরে কষে একটা করে আছাড় মারতে। বন্ধু নয়, এরা যেন তার চরম শত্রু! অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে বাইক চালিয়ে তাদের একদম কাছে এসে থামল কলরব। দাঁতে দাঁত চেপে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল,
‘তা তোরা যাচ্ছিস কোথায়? রাস্তায় কোনো মেয়ে দেখলেই বাইক থামিয়ে বিরক্ত করার এই জঘন্য স্বভাবটা তোদের কবে যাবে, বলবি কি?’

অনন্ত বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলে কলরবের দিকে তাকালো। কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল,
‘তুই আসলে কী বোঝাতে চাইলি? আমরা কি এতটাই নিচু রুচির? নিজের স্ত্রীকে সামলাতে পারিস না; তাকে এভাবে রোদের মধ্যে রাস্তায় একলা ছেড়ে রেখেছিস কেন?’
কলরব বিদ্রূপের সুরে বলল, ‘ও কি দুধের শিশু যে সারাক্ষণ কোলে বসিয়ে রাখবো? তোরা নিজেদের চরকায় তেল দে তো। ভাগ এখান থেকে।’
অভিক কেবল শব্দহীন হাসল। অনন্ত তাকে শাসাতে ছাড়ল না। যাওয়ার আগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘স্বার্থপর আর শয়তান শব্দদুটোও তোর জন্য কম হয়ে যায়। তোকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম গালিটা দিতে মন চাইছে। নেহাত নিযানা সামনে আছে বলে মুখটা খুলতে পারলাম না।’
অভিক বাইকের এক্সেলেটর ঘোরালো। মুহূর্তেই ধুলো উড়িয়ে তারা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। নিযানা আবারও কাঠফাটা রোদের মধ্যে হাঁটা শুরু করলে কলরবের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সামনেই একটা ক্লাব ঘর আছে। যেখানে কিছু বখাটে ছেলের আড্ডা জমে সবসময়। মেয়ে দেখলেই যাদের জিহ্বা থেকে বিষ ঝরে। ডিস্টার্ব করে। এই জেদি মেয়েটাকে সেটা বোঝাবে কে? ও আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। সজোরে চিৎকার করে উঠল,
‘এই! একদম ওখানেই দাঁড়া। আর এক কদম নড়লে পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব তোর!’
নিযানা থমকে দাঁড়াল। উল্টো ঘুরে ধীর পায়ে কলরবের সামনে এসে দাঁড়ালো। আগুনের মতো চাউনি নিয়ে বলল,

‘আমাকে এভাবে ফলো করছো কেন শুনি?’
‘এভাবে রোদের মধ্যে হেঁটে কোথায় যাচ্ছিস তুই?’
‘সে আমি জাহান্নামে যাই কি পাতালে; তোমার তাতে কী?’
‘তুই যেখানেই মরবি মর। আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু রাস্তায় কোনো বাল ঘটলে তো সব দোষ ওই কলরবের ওপরই এসে পড়বে।’
কলরবের মুখ থেকে বের হওয়া অসংলগ্ন শব্দটা শুনে নিযানা তীব্র ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে বলল,
‘ছিহ্! কী জঘন্য ভাষা তোমার!’
‘এই যে, অনেক আদিখ্যেতা হয়েছে। এবার চুপচাপ বাইকে ওঠ। মেজাজটা আর বিগড়াস না। অনেক সহ্য করেছি আজ।’
নিযানা দেখল শরীর আর সায় দিচ্ছে না। পায়ের তলার রাস্তাটা যেন দুলছে। মাথার ওপর গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নসূর্য অগ্নিবৃষ্টি করছে। চারপাশ খাঁ খাঁ মরুভূমির মতো হয়ে উঠেছে। এত অনুরোধের পর বাইকে ওঠাই হয়তো এখন যুক্তিসঙ্গত। কলরব বিরক্ত গলায় বলল,

‘আচ্ছা বাবা ঠিক আছে৷ একদম আস্তে চালাব। মরবি না তুই। তোর যদি এতই কষ্ট হয়, তবে বাপকে বলছিস না কেন একটা ব্যক্তিগত প্লেন কিনে দিতে? তোর বাপের এত টাকা দিয়ে কী হবে? টাকার হিসাব করতে করতে তো ওনার মাথায় ইয়া বড় টাক পড়ে গেছে। এবার মনে হয় চামড়াটাও উঠে যাবে!’
নিযানা বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘যত্তসব বাজে কথা! মানুষের সম্পর্কে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শেখোনি কোনোদিন?’
নিযানা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাইকের দিকে এগুলো। কলরব তখন নিজের মনেই নিচু স্বরে গুনগুন করে একটা গান গাইছে। এই গানটা সে প্রায় গায়; হয়তো তার খুব প্রিয়, কিংবা অভ্যাসের বশে আসা কোনো সুর। নিযানা সাবধানে বাইকের পেছনে বসতেই কলরব বাইক ছুটালো। কিন্তু এর ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই নিযানা হাড়হাড়ে টের পেল একটু আগে আস্তে চালানো’র যে প্রতিশ্রুতি কলরব দিয়েছিল, তা ছিল এক মস্ত বড় প্রতারণা। কলরব বাইকের গতি বিন্দুমাত্র কমালো না। বরং বাতাসের বুক চিরে ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে চলল। নিযানার মনে হলো তার কলিজাটা বুঝি কণ্ঠনালীতে উঠে আসবে। ভয়ে সে আড়ষ্ট হয়ে গেল। তীব্র বাতাসের ঝাপটায় নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে তার। আর কোনো উপায় না পেয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। ভয়ে আর আতঙ্কে সে অবচেতনভাবেই কলরবকে জাপটে ধরল। মনে মনে ভাবলো আজকের মতো শুধু জীবিত নামতে পারলেই হয়। জীবনে আর কোনোদিন এই শয়তানটার বাইকে সে পা ছোঁয়াবে না। কলরব যেন এক আস্ত মূর্তিমান আপদ!

শপিংমলে দিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে ব্যাগগুলো গুছিয়ে নিল ওরা। দিব্য হঠাৎ নবনীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
‘নবনী, নিজের জন্য কিছু একটা পছন্দ করো। শাড়ি নেবে?’
নবনী খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। নিজের জন্য কিছু কেনা তার ভাবনায় ছিল না। তবুও মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। সেলসম্যান যখন একে একে শাড়িগুলো মেলে ধরছিল, নবনী মুগ্ধ নয়নে সেগুলোর কারুকাজ দেখছিল। প্রতিটি শাড়িই তার মনে ধরছিল কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিল না। দিব্যর ভাবলেশহীন মুখচ্ছবি দেখে সে দ্বিধায় পড়ে গেল। হঠাৎ দিব্য সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল,
‘নাহ, এগুলো ঠিক হচ্ছে না। অন্য কোথাও দেখি চলো। এখানে যা হলো সেগুলো প্যাক করে দিন।’
নবনী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইল। দিব্য দ্রুত বিল মিটিয়ে অন্য একটি বড় শোরুমে ঢুকল। এভাবে একে একে তিনটি নামী দোকান ঘোরা শেষ হলেও দিব্যর একই চেনা উক্তি ‘ভালো লাগছে না’। নবনীর ধৈর্যের বাঁধ এবার আলগা হতে শুরু করল। এটা কেমন স্বভাব? এত চমৎকার সব শাড়ি অথচ মানুষটার চোখে যেন কিছুই ধরছে না! চতুর্থ একটি শোরুমের প্রবেশদ্বারে পা দিতেই নবনী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠে চাপা অভিমান নিয়ে বলল,
‘আমার আর কোনো শাড়ি লাগবে না। আপনি দয়া করে এবার বাড়ি চলুন।’

দিব্যর কপালে এবার চিন্তার ভাঁজ পড়ল। গম্ভীর মুখে সে প্রশ্ন করল,
‘তোমার সমস্যাটা ঠিক কোথায় নবনী? এত এত শাড়ি দেখলে অথচ একটাও তোমার পছন্দ হলো না? তবুও আমি কি একবারও বিরক্তি প্রকাশ করেছি? তবে হুট করে শাড়ি নেবে না বলে বেঁকে বসছ কেন?’
নবনীর যেন আকাশ থেকে পড়ার দশা! সে থমথমে গলায় পালটা প্রশ্ন করল,
‘আমি কখন বললাম যে আমার পছন্দ হয়নি?’
দিব্যর চোখে বিস্ময়ের রেখা স্পষ্ট হলো। সে খানিকটা অবাক হয়ে বলল,
‘তুমি তো কিছুই বলছিলে না। হ্যাঁ কি না কিছু একটা তো বলা উচিত। শাড়িটা তো আর আমি পরব না। তোমার নীরবতা দেখে আমি ভেবে নিয়েছিলাম তোমার পছন্দ হচ্ছে না। তাই নিজ থেকেই তোমাকে অন্য দোকানে নিয়ে যাচ্ছিলাম।’
নবনীর ইচ্ছে করছে নিজের কপালটা নিজেই ঠুকতে। এতক্ষণ তবে লোকটা তাকে নিয়ে এই সব ভেবেছে!প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝাটা কি খুব দরকার? নবনী মনে মনে গজগজ করলেও মুখে কিছু বলল না। দিব্য পুনরায় কোমল স্বরে শুধাল,

‘আগের দোকানগুলোতে কোনগুলো পছন্দ হয়েছিল তোমার? নেবে? চলো, ওগুলোই নিয়ে আসি।’
নবনী দ্রুত বাধা দিয়ে বলল, ‘না না, ওসবের আর দরকার নেই। সামনের এই দোকানটায় চলুন। কয়েকটা লাগবে না। আমার একটাই যথেষ্ট।’
তড়িঘড়ি করে নবনী সাধারণ একটি শাড়ি পছন্দ করল। দিব্য শাড়িটি একবার পরখ করে দেখল তারপর সেলসম্যানের দিকে ইশারা করে অন্য একটি শাড়ি দেখিয়ে বলল,
‘এই দুটোই প্যাক করে দিন।’
নবনী মনে মনে মুখ বাঁকালো। তার এতক্ষণের রুচি আর পছন্দকে এভাবে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হলো! কী ভীষণ অহংকারী আর একরোখা লোক একটা! শপিংমল থেকে বেরিয়ে আসার পর নবনী আড়চোখে দিব্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি নিজের জন্য কিছুই কিনলেন না?’
দিব্যর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। নবনী অবাক হয়ে চেয়ে রইল সেই হাসির দিকে। দিব্য বলল,
‘আসলে কী বলো তো, তোমার স্বামীর কোম্পানির ইদানীং খুব ক্ষতি হয়েছে। লোকসানটা তো আগে পোষাতে হবে। তাই এখন একটু হিসাব মেপে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।’
নবনী থমকায়। কত হিসাবি লোক রে বাবা! অথচ লোকটার আলমারি খুললে এত এত নামী ব্র্যান্ডের শার্ট আর কোট বেরিয়ে পড়বে যে অনায়াসে একটা আস্ত দোকান খুলে বসা যাবে। নবনীর থমথমে মুখের দিকে চেয়ে দিব্য বলল,
‘তবে আপনার স্বামী এতটা দেউলিয়া হয়ে যায়নি যে আপনাকে এখন কিছু খাওয়াতে পারবে না। বলুন ম্যাডাম, আপনার কী খেতে ইচ্ছে করছে?’

নবনীর চট করে চেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। দিব্য তাকিয়ে রইলো। নবনী হাসি থামিয়ে বলল,
‘এক প্লেট ফুচকা খাওয়াবেন? কতদিন যে খাইনি। মনে হচ্ছে এক যুগ কেটে গেছে! বেশি ভালো লাগলে কিন্তু দুই প্লেটও খেতে পারি। এতে যদি আপনি ফকির হয়ে যান। তবে আমার কিন্তু কোনো দায় নেই!’
দিব্যর চোখেমুখে বিস্ময়। যেন নবনীর কথা বিশ্বাসই করতে পারছে না। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
‘ফুচকা? এতসব খাবার ছেড়ে ওই রাস্তার ধারের খাবার খাবে? তুমি কি জানো না এটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর? কতটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এগুলো তৈরি হয়!’
নবনী খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ‘তাতে কী? পৃথিবীতে কি আমরা চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য এসেছি? এক প্লেট ফুচকা খাওয়ায় যদি আয়ু একদিন কমও হয়; তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।’
দিব্য নাকমুখ কুঁচকে বলল, ‘সিরিয়াসলি নবনী?’

নবনী কোনো কথা না বলে কেবল দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল। অগত্যা দিব্য গাড়ি থামাল রাস্তার ধারের এক ফুচকার দোকানের সামনে। দোকানের সামনে তখন মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দিব্য অবাক হয়ে দেখল। সামান্য এক টক-ঝাল খাবারের জন্য মানুষের কী অবিশ্বাস্য উন্মাদনা! ছোট ছোট চেয়ার-টেবিল দেওয়া। এক কোণে নবনী দিব্যকে নিয়ে বসল। দিব্যর চোখেমুখে ফুটে ওঠা চরম অস্বস্তি নবনীর নজর এড়াল না কিন্তু ভদ্রলোক মুখে কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। নবনী মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটার ধৈর্যের প্রশংসা করতেই হয়! দোকানিকে সাহায্য করছিল বছর দশেকের এক কিশোর। সে দ্রুত হাতে দুই প্লেট ফুচকা এনে সামনে রাখল। লালচে তেঁতুলের টক আর ঝাল মশলার ঘ্রাণে নবনীর মনটা মুহূর্তেই প্রশান্তিতে ভরে উঠল। জিভে জল আনা সেই দৃশ্যে সে নিমেষেই বিভোর হয়ে গেল। পরপর দুটো ফুচকা মুখে পুরে নবনী হঠাৎ খেয়াল করল দিব্য স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নবনী কুণ্ঠিত স্বরে বলল,

‘কী হলো? আপনি আমাকে ওভাবে কী দেখছেন? নিজের প্লেট থেকে খাওয়া শুরু করুন।’
দিব্য যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘এটা আমার প্লেট? তুমি আমার জন্য ফুচকা নিয়েছো?’
নবনী হেসে উত্তর দিল, ‘অবশ্যই! আমার সঙ্গে কি অন্য কেউ আছে নাকি?’
দিব্য তড়িৎবেগে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আমি এসব খাবার একদমই খাই না নবনী। আমি ভেবেছিলাম ওটা তোমার দ্বিতীয় প্লেট।’
নবনী বিরক্ত হলো। দিব্য এমন ভঙ্গিতে ‘খাই না’ বলছে যেন ফুচকা কোনো খাবারই নয়। ভিনগ্রহের কোনো বস্তু। নবনী চট করে একটা ফুচকা হাতে তুলে টকে ডুবিয়ে দিব্যর ঠোঁটের সামনে ধরল। ওর চোখেমুখে দুষ্টুমি। আকুল গলায় বলল,

‘একটিবার অন্তত খেয়ে দেখুন? জাস্ট টেস্ট করুন। কথা দিচ্ছি খারাপ লাগবে না।’
নবনীর সেই উজ্জ্বল আর উৎসুক চোখের দিকে তাকিয়ে দিব্য আর ‘না’ বলতে পারল না। যেন এক প্রকার বাধ্য হয়েই মুখ খুলে ফুচকাটা গ্রহণ করল। কিন্তু মুখে পুরে চিবানো মাত্রই তার অবয়বে এক বিচিত্র পরিবর্তনের ছটা দেখা দিল। পরক্ষণেই নাক-মুখ কুঁচকে গলার রগ ফুলিয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল,
‘উহ্‌, ঝাল! অসম্ভব ঝাল নবনী! তুমি খাচ্ছ কীভাবে?’
নবনী তড়িঘড়ি করে টেবিলের ওপর থাকা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘কই, ঝাল তো হওয়ার কথা নয়! নিন, এই তো পানি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।’
দিব্য হাত দিয়ে গ্লাসটা সরিয়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তপ্ত গলায় বলল,
‘এই পানি খাব? কখনোই না। আর খবরদার তুমিও এই পানি ছুঁবে না। ফুচকা খেতে ইচ্ছে করেছে খাও। আমি ভালো পানি নিয়ে আসছি।’
কথাটা শেষ করেই দিব্য হনহন করে এগিয়ে গেল। নবনী পেছনে তাকিয়ে একটা মুখভঙ্গি করল। বিড়বিড় করে বলল ‘ভীষণ আদিখ্যেতা!’ তারপর তৃপ্তির সাথে আরও একটি ফুচকা মুখে পুরল। খানিক বাদে দিব্য এক হাতে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার আর অন্য হাতে দুটো আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এল।

কায়েফের সাথে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই মন খারাপ হলো দিয়ার। দিব্য ফোন করে কায়েফকে বলেছিল দিয়াকে নিয়ে আসতে কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন সে দিব্য-নবনীকে দেখতে পেল না তখন থেকেই তার কান্না শুরু হয়েছে। বসার ঘরের সোফায় বসে ছোট ছোট দুহাতে চোখ রগড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে সে। ইহান, ইভান, কায়েফ আর কুহু সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরলেও কারও কোনো সান্ত্বনাই তার কানে যাচ্ছে না। ইভান গম্ভীর মুখে দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
‘দিয়া, তুই কেন শুধু শুধু কাঁদছিস? দেখ তোর পুরো মুখটা লাল হয়ে গেছে। ছোট চাচ্চু তো বললই যে বড় চাচ্চু আর চাচি এখনই চলে আসবে।’
ইহান পাশে বসে বলল, ‘দিয়া, তুই আমার সাথে চল না! আমরা দুজনে মিলে গেম খেলব। তোকে আমার কার-এ বসিয়ে আমি ধাক্কা দেব, চল।’
কায়েফ দিয়াকে কোলে নিয়ে বসে আছে। হাজারবার বুঝিয়েও সে অবুঝ মেয়েটিকে শান্ত করতে পারছে না। ঠিক তখনই নিযানা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। দিয়ার এই শোচনীয় অবস্থা দেখে সে থমকে দাঁড়াল। তারপর দিয়ার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে কোমল স্বরে শুধাল,

‘সোনা, আমার দিকে তাকাও তো! কী হয়েছে? কেন এত কাঁদছো তুমি?’
দিয়া কোনো উত্তর না দিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ভাইয়া আর ভাবি একটু দরকারে বাইরে গেছে। দিয়া স্কুল থেকে ফিরে ওদের না পেয়ে সেই যে শুরু করেছে। থামার নামই নেই।’
নিযানা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, ‘সেকী! তুমি এখনো স্কুল ড্রেস বদলাওনি? মাম্মা-পাপ্পা ফিরে এসে যদি দেখে তুমি এভাবে আছো। তারা তো খুব রাগ করবে।’
দিয়া ভাঙা গলায় উত্তর দিল, ‘আমি কিচ্ছু খাব না। ড্রেসও বদলাব না! আমি কোনো কিছু করব না।’
কায়েফ হতাশ হয়ে বলল, ‘তখন থেকে ঠিক এই এক জেদ ধরে বসে আছে। কোনো কথাই শুনছে না। ভাবিও অনেক চেষ্টা করলেন বোঝানোর কিন্তু সব বিফলে গেল।’
নিযানা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে কী যেন ভাবল। তারপর দিয়ার চোখের পানিটুকু নিজের আঙুলে মুছে দিয়ে বলল,
‘আচ্ছা সোনা, তুমি কি মাম্মা-পাপ্পার কাছে যেতে চাও?’
প্রশ্নটা শোনামাত্রই দিয়া অস্থির হয়ে মাথা নাড়াল। নিযানা হাসিমুখে বলল,
‘তাহলে চলো আমার সাথে। চটপট স্কুল ড্রেসটা বদলে একটা সুন্দর জামা পরে নাও। তারপর আমরা দুজনে মিলে তোমার মাম্মা-পাপ্পার কাছে যাব। কেমন?’
দিয়া হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। চোখের পাতায় জমা পানি নিয়ে পিটপিট করে চাইল। তারপর আদুরে গলায় শুধাল,
‘সত্যি নিয়ে যাবে তো?’

নিযানা আলতো করে মাথা নাড়ল। দিয়া দুই হাত বাড়িয়ে দিতেই নিযানা তাকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজার কাছে আসতেই মুখোমুখি হলো কলরবের। সম্ভবত সে নিযানাকেই খুঁজছিল। কলরব হাতের ফোনটা নিযানার দিকে এগিয়ে দিয়ে দিয়ার দিকে চাইল। কৃত্রিম বিস্ময় ফুটিয়ে বলল,
‘ফুপি! আমার বার্বি ডলটার কী হয়েছে? কমলার মতো মিষ্টি গালগুলো তো দেখছি টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে!’
দিয়া অভিমানী কণ্ঠে জানাল, ‘দিয়া রাগ করেছে চাচ্চু। খুব, খুব, খুব বেশি রাগ করেছে!’
কলরব হাসিমুখে দিয়াকে নিজের কোলে টেনে নিলো। তাকে ভোলাতে নানা কথা শুরু করলো। নিযানা ফোনটা কানে ঠেকিয়ে ধীরস্বরে বলল,
‘হ্যাঁ মাম্মি।’

ওপাশ থেকে আনতাসার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
‘বেবি, তোমাকে কখন থেকে ফোন করার চেষ্টা করছি! ফোন ধরছো না কেন? বাধ্য হয়ে শেষমেশ কলরবকে কল করতে হলো।’
‘বাইরে ছিলাম। কিছু বলবে?’
আনতাসা ওপাশ থেকে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। মেয়ের মনের আকাশে যে এখনো ঘন মেঘ জমে আছে। তা বুঝতে তাঁর বাকি রইল না। কোমল কণ্ঠে শুধালেন,
‘শুনলাম তোমার নাকি জ্বর এসেছিল? এখনো কি শরীরটা খারাপ?’
সংক্ষিপ্ত উত্তর নিযানার। ‘হ্যাঁ।’
‘সেকী! ওষুধ খেয়েছো তো? আচ্ছা একটা কাজ করো তুমি নাহয় কয়েকদিনের জন্য আমার কাছে চলে এসো। আমি কলরবকে বলে দিচ্ছি। ও তোমাকে নিয়ে আসবে।’
নিযানা কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আমি এই মুহূর্তে কোথাও যেতে চাই না। আর কিছু বলবে?’
দিয়ার সাথে কথা বলার ফাঁকে কলরব একবার মুখ তুলে নিযানার দিকে তাকাল। আনতাসা ওপাশ থেকে অনুনয়ের সুরে বললেন,
‘দেখো বেবি, আমি জানি তুমি আমার ওপর ভীষণ রেগে আছো। কিন্তু আমি তো তোমাকে বুঝিয়ে বলেছি। মাম্মি স্যরি বলেছে না। আর কতদিন এভাবে আড়ি করে থাকবে?’
নিযানা বিষণ্ণ হাসল। ‘স্যরি? একটা দুঃখপ্রকাশেই কি সবকিছু আগের মতো হয়ে যায় মাম্মি? একটা কাঁচের পাত্র ভেঙে গুঁড়ো করে ফেলার পর কি ‘স্যরি’ বললে তা আর কখনো জোড়া লাগে?’
‘বেবি…!’

আনতাসা কিছু বলতে চাইলেন। নিযানা মাঝপথেই থামিয়ে দিল,
‘আমি ঠিক আছি মাম্মি। আমাকে এখন দিয়াকে গোসল করাতে হবে, রাখছি। আর কলরবকে ফোন করো না। আমার দরকার হলে আমিই তোমাকে কল করবো।’
আনতাসার কথা শেষ হওয়ার আগেই নিযানা কলটা কেটে দিলো। নিযানা তাকাতেই কলরব দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। নিযানা এগিয়ে গিয়ে ফোনটা কলরবের পাশে রেখে শান্ত গলায় বলল,

এই অবেলায় পর্ব ২৪

‘দিয়া সোনা, তুমি চাচ্চুর সাথে একটু গল্প করো। আমি তোমার জন্য সুন্দর একটা ড্রেস নিয়ে আসছি, কেমন?’
দিয়া লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। নিযানা মনে মনে স্বস্তি পেল এই ভেবে যে অন্তত দিয়ার কান্নাটা থেমেছে। কলরবের চপল আর অসংলগ্ন কথাবার্তা আজ প্রথমবার কোনো উপকারে এল। দিয়াকে এখন হাসিমুখে কথা বলতে দেখে নিযানার বিষণ্ণ মনে এক চিলতে প্রশান্তি নেমে এল।

এই অবেলায় পর্ব ২৬