Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৩০

এই অবেলায় পর্ব ৩০

এই অবেলায় পর্ব ৩০
সুমনা সাথী

​বাইরে ঝড়ের দাপটে প্রকৃতি যেন দিশেহারা। অঝোর ধারায় বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে মাঝে মাঝেই শব্দ করে বজ্রপাত হচ্ছে। কালো মেঘের বুক চিরে আলোর রেখাগুলো নকশা এঁকে দিয়ে পরক্ষণেই মিলিয়ে যাচ্ছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মৌনিতা অপলক তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। একসময় এই মেঘের গর্জন শুনলে সে ভয়ে সিঁটিয়ে যেত অথচ সময়ের সাথে সাথে সেই ভয়টা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন এই উত্তাল পরিবেশটাই তার কাছে ভীষণ ভালো লাগছে। ​ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো হাত তাকে খুব যত্ন করে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ এই ছোঁয়ায় মৌনিতা একটু চমকে উঠলেও পরমুহূর্তে তার চেনা সেই পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে আসতেই সে নিশ্চিত হলো মানুষটা কে। কাব্য মৃদু হেসে ওর কাঁধে চিবুক রাখল। ​হালকা স্বরে বলল,

‘বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেল অথচ আমার ছোঁয়ায় তোমার চমকে যাওয়াটা এখনো গেল না। এই অভ্যাস কবে বদলাবে? কদিন পরেই তো আমরা দাদু-দাদি হয়ে যাব।’
​মৌনিতা শান্ত গলায় জবাব দিল, ‘তখনো তোমার কাজ শেষ হবে না কাব্য। আমার জন্য সময় তোমার তখনো হবে না।’
​কথাটা কাব্যের মনে গিয়ে বিঁধল। ডাক্তারদের জীবনটা এমনই হয়। চাইলেই নিজের আপন মানুষদের জন্য কিছুটা সময় বের করা যায় না। সে একটু অসহায় কণ্ঠে বলল,
‘তুমি তো সবই বোঝো মৌনিতা।’
​মৌনিতা আলতো করে মাথা নাড়ল। সে সত্যিই বোঝে। তাই তো তেমন একটা অভিযোগও সে করে না। কিন্তু মাঝে মাঝে একাকিত্বের মেঘগুলো মনের ভেতর জমে গিয়ে বড্ড বিষণ্ণ লাগে। এখন ইহান আর ইভানকে নিয়েই তার সারাটা দিন কেটে যায়। তবুও কাব্যের একটু সঙ্গের অভাব সে অনুভব করে। ​কাব্য আবারও প্রশ্ন করল,
‘তোমার কি মন খারাপ? কোনো কিছু হয়েছে কি?’
​মৌনিতা সহজভাবে বলল, ‘না তো, কিছু হয়নি।’

‘আমিও কিন্তু তোমাকে খুব ভালো বুঝি মৌনিতা।’
​’জানি।’
​’জেনে-বুঝে তবে কেন এভাবে আমায় কষ্ট দিচ্ছ?’
​মৌনিতা একটু চুপ থেকে ম্লান হাসল। কাব্যের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
‘আমি বড়জোর নিজেকেই কষ্ট দিতে পারি কাব্য, কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেওয়ার মতো শক্তি বা ইচ্ছে; কোনোটাই আমার নেই।’
​কাব্য কিছু সময় অপলক দৃষ্টিতে মৌনিতার বিষণ্ণ মুখটা দেখল। এই মুখটা তার খুব চেনা। তবুও আজ যেন সেখানে কোনো এক অজানা অভিমান লুকিয়ে আছে। প্রতিদিন মৌনিতা কত বায়না করে যেন কাব্য একটু দ্রুত বাড়ি ফেরে। কাব্য আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু তার এই মহান পেশা মাঝেমধ্যেই সবটুকু সময় কেড়ে নেয়। আজ সে অনেক কাজ ফেলে তাড়াতাড়ি ফিরেছে শুধু মৌনিতার জন্য অথচ মেয়েটার মন তবুও ভালো হচ্ছে না। ​একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাব্য অপরাধী গলায় বলল,

‘তুমি বোধহয় আমাকে বিয়ে না করে অন্য কাউকে বেছে নিলে বেশি সুখী হতে। আমার আজকাল খুব আফসোস হয় মৌনিতা। আমাকে বিয়ে না করলে হয়তো তোমার জীবনটা অন্যরকম হতো। অনেক বেশি হাসিখুশি হতো।’
​কথাটা শুনে মৌনিতা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের কোণে অশ্রু টলমল করছে। মুখে মৃদু হাসি। কাব্যের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
‘কিন্তু আমার একদমই আফসোস হয় না কাব্য। এমনকি আমার সামনে যদি দ্বিতীয়বার কোনো সুযোগ আসে, তবে আমি আবারও তোমাকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেব।’
​কাব্যর বুকটা ধক করে ওঠে। একটু ঝুৃঁকে মৌনিতার গালে আলতো করে চুমু খাই। চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি মৌনিতা। বিশ্বাস করো। তোমার থেকেও হয়তো অনেকটা বেশি। কখনো যদি সুযোগ আসে, তবে কথা দিচ্ছি আমি তা প্রমাণ করে দেখাব।’

রাতের নিস্তব্ধতায় ঘেরা নির্জন পথ। ঝড়ের দাপট কমে এলেও বৃষ্টির তোড় কমেনি একটুও বরং অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ছে। দু-একটি গাড়ি ছাড়া পুরো রাস্তা একদম ফাঁকা। পেছনের সিটে নবনীর কোল ঘেঁষে কুঁকড়ে বসে আছে ছোট্ট দিয়া। বাইরের আকাশটা এখনো মেঘে ঢাকা। নবনীর ফোনটা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একটানা বেজে চলেছে। ওপাশ থেকে দিব্য কল করে যাচ্ছে বারবার কিন্তু নবনী ইচ্ছা করেই রিসিভ করছে না। ​মায়ের নীরবতা দেখে দিয়া কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
‘মাম্মা, আমরা এই মাঝরাতে নানু বাড়ি কেন যাচ্ছি? পাপ্পা কেন আমাদের সাথে যাচ্ছে না?’
​মেয়ের হঠাৎ এমন প্রশ্নে নবনী একটু থমকে গেল। সামলে নিয়ে আলতো হেসে বলল,
‘পাপ্পার সাথে মাম্মার আড়ি হয়ে গেছে তো, তাই মাম্মা নানুর কাছে কদিন বেড়াতে যাচ্ছে। পাপ্পা যখন ‘স্যরি’ বলবে, তখন আমরা আবার ফিরে আসব।’

​দিয়া বড় বড় চোখ করে শুধাল, ‘পাপ্পা কি তোমাকে বকেছে?’
​নবনী না-সূচক মাথা নাড়তেই দিয়ার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে যেন গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে গেল। খানিক বাদে কৌতূহলী গলায় মতো বলল,
‘পাপ্পা তো গুড বয়। কাউকে বকে না। তুমি কি কোনো দুষ্টুমি করেছিলে মাম্মা? সত্যি করে বলো তো!’
​নবনী হেসেই ফেলল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিরীহ মুখে বলল,
‘একদম না সোনা! মাম্মাও তো খুব লক্ষ্মী মেয়ে। তোমার পাপ্পাই ইদানিং দুষ্টু হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায় না। ঠিক কি না বলো?’
​দিয়া এবার আরও দ্বিধায় পড়ে গেল। তার ছোট্ট মাথায় বাবা-মায়ের এই মান-অভিমানের হিসেব মিলছে না। এদিকে ফোনের ওপাশে দিব্যর ব্যাকুলতা নবনী অনুভব করতে পারছে। রাগ থাকলেও মনে হলো অন্তত তারা যে ঠিক আছে সেটা জানিয়ে দেওয়া দরকার। নয়তো লোকটা দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়বে। ফোনটা রিসিভ করে সে দিয়ার হাতে ধরিয়ে দিল। ​ফিসফিস করে বলল,
‘পাপ্পাকে বলে দাও তো আমরা কোথায় যাচ্ছি।’
​নবনী ফোনটা লাউড স্পিকারে দিয়ে দিতেই দিয়া আদুরে গলায় বলল,
‘হ্যালো পাপ্পা! ই‘টস মি, দিয়া।’

​মেয়ের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই দিব্যর বুক থেকে যেন একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। দীর্ঘ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। কিন্তু মনের অস্থিরতা তাতে বিন্দুমাত্র কমল না। ব্যাকুল হয়ে দ্রুত প্রশ্ন করল,
‘সোনা, তোমার মাম্মা কোথায়?’
​দিয়া তার ছোট্ট হাতের মুঠোয় ফোনটা জানাল, ‘মাম্মা আমার পাশেই বসে আছে। জানো পাপ্পা, আমরা গাড়িতে করে নানু বাড়ি চলে যাচ্ছি।’
​মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে দিব্য যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে নবনী এত রাতে দিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সে অত্যন্ত অবাক হয়ে বলল,
‘নানু বাড়ি যাচ্ছো? কিন্তু কেন? মাম্মাকে ফোনটা দাও তো সোনা, আমি কথা বলব।’
​দিয়া খুব সহজ স্বরে উত্তর দিল, ‘মাম্মা এংরি। তোমার ওপর ভীষণ রাগ করে আছে। তোমার সাথে মাম্মার কাট্টি হয়ে গেছে না? তাই মাম্মা কথা বলবে না।’

​দিব্যর বুকটা এবার সত্যি সত্যিই ধক করে উঠল। সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে নবনী যে এতটা রাগ করবে আর এই দুর্যোগের রাতে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে তা সে ভাবতেও পারেনি। বাইরের যে আবহাওয়া, তাতে যে কোনো সময় বড় কোনো বিপদ হতে পারে। দিব্য ব্যাকুল হয়ে অধৈর্য গলায় বলল,
‘পাপ্পা সবকিছুর জন্য ‘স্যরি’ বলে দেবে মা। তুমি প্লিজ মাম্মাকে ফোনটা দাও।’
​দিয়া ফোনটা কান থেকে সরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। নবনী শক্ত করে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল সে কোনোভাবেই কথা বলবে না। মনের ভেতর জমে থাকা অভিমান থেকে সে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল ‘ডুবে মরুক উনি, তাও আমি কথা বলব না।’ ​দুর্ভাগ্যবশত দিয়া বিড়বিড় করা কথাগুলোকেও পাপ্পার জন্য পাঠানো বার্তা ভেবে বসল। পুনরায় ফোনটা কানে ধরে বলে দিল,
‘পাপ্পা, মাম্মা বলল যে ডুবে মরুক উনি। তাও কথা বলবে না।’
​মেয়ের মুখে এমন অভাবনীয় কথা শুনে ওপাশে দিব্য চমকে উঠে বলল,

‘হোয়াট?’
​নবনী আতঙ্কে শিউরে উঠল। তার নিজের মনে বলা কথা যে দিয়া এভাবে হুবহু বলে দেবে সেটা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। সে তড়িঘড়ি করে দিয়ার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে লাইনটা কেটে দিল। ​ওদিকে দিব্য একটা দীর্ঘ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানায় রাখল। সে আবারও কয়েকবার চেষ্টা করল কল করার কিন্তু নবনী আর ফোন ধরল না। অস্থিরতার মাঝেই দেখল আরশাদ তালুকদার ঘরে ঢুকলেন। দিব্য নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ধীরস্বরে প্রশ্ন করল,
‘কিছু বলবে আব্বু?’
আরশাদ তালুকদার ধীর পায়ে এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বললেন,

‘শুনলাম বউমা নাকি দাদুকে নিয়ে কোথাও চলে গেছে? তোমার মা তো এই নিয়ে সারা বাড়ি মাথায় তুলছেন। কিছু জানতে পারলে ওরা কোথায়? মেয়েটা কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে বেশ নির্বোধের মতো কাজ করল।’
​দিব্য নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল, ‘নবনীর বাপের বাড়ি গেছে আব্বু। এইমাত্র কথা হলো। ওরা ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই।’
​আরশাদ তালুকদার ছেলের দিকে কিছুটা সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকালেন। দিব্যর চেহারার অস্থিরতা তার অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ল। তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
‘কিন্তু এভাবে হঠাৎ গেল কেন? তোমাদের মাঝে কি কোনো বড়সড় ঝগড়া হয়েছে?’
​দিব্য একটু বিব্রত বোধ করল। বাবার সরাসরি প্রশ্নে উত্তর দেওয়ার মতো কোনো যুতসই ভাষা সে খুঁজে পেল না। আরশাদ তালুকদার ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তিনি সামান্য হেসে কৌশলে প্রসঙ্গ বদলে দিলেন। বললেন,

‘ঔষধের নতুন যে ফ্যাক্টরিটা খোলার কথা ছিল। সেখানে কিছু ঝামেলা চলছে। তুমি কাল বা পরশুর মধ্যে সময় করে একবার দেখে এসো। আর শোনো থানায় গিয়েছিলে তো? নতুন কিছু জানতে পেরেছ?’
​এক মুহূর্তের জন্য দিব্যর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে মাথা নেড়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘লোকটা সাধারণ কোনো অপহরণকারী নয় আব্বু। ওর মূল লক্ষ্যই ছিল আমার মেয়েকে তুলে নেওয়া। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এসব কে করছে বা কেন করছে। তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি হয়তো।’
​ছেলের কথা শুনে আরশাদ তালুকদার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরক্ষণেই তার মনে কোনো এক পুরনো আশঙ্কার ছায়া ভেসে উঠল। তিনি বেশ কৌতূহলী এবং কিছুটা শাসানোর সুরে বললেন,
‘কারা তারা? দিব্য, আমি তোমাকে যা করতে বারণ করেছিলাম তুমি কি শেষ পর্যন্ত সেটাই করেছ?’
​বাবার সোজাসুজি প্রশ্নে দিব্য কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। আমতা-আমতা করে শুধু বলল,
‘আব্বু আমি…!’

আরশাদ তালুকদারের গলার স্বর সপ্তমে চড়ল। তিনি ধমকে উঠে বললেন,
‘একদম চুপ! আর ইউ ক্রেজি? তুমি কি নিজের বাবার চেয়েও বেশি বুঝতে শিখেছ? আমি বারবার বারণ করা সত্ত্বেও এই কাজটা তুমি করলে কী করে? কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে গিয়ে তুমি নিজের আর পরিবারের সবার জীবন বিপদে ফেলে দিলে? এখন এর পরিণাম কী হবে ভেবে দেখেছ?’
​আরশাদ তালুকদারের চেহারায় প্রচণ্ড রাগের ছাপ স্পষ্ট। দিব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে শান্ত স্বরে বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করল,
‘আব্বু, শোনো… বিষয়টা এখনো পর্যন্ত গোপন আছে। এটা অন্য কারো জানার কথা নয়। তুমি শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করছ। আমি তোমাকেই জানাইনি। তাহলে বাইরের কেউ কীভাবে জানবে? হয়তো অপহরণের চেষ্টাটা অন্য কোনো কারণে ছিল। তবুও তুমি চিন্তা কোরো না। আমি সব খোঁজ নিচ্ছি। যদি দেখি সত্যিই কোনো ঝুঁকি আছে তবে আমি প্রজেক্টটা ছেড়ে দেব। ঠিক আছে?’
​ছেলের কথায় আরশাদ তালুকদার শান্ত হলেন না। তিনি আরও কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড রাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার প্রস্থানের পর দিব্য দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। যন্ত্রণায় তার মাথাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। অস্থিরতা সইতে না পেরে অভ্যাসবশত সে নবনীকে ডাকতে গেল কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল নবনী বাড়িতে নেই। ​এক মুহূর্তের জন্য দিব্য নিজেকে খুব অসহায় বোধ করল। মনের ভেতরের এই চরম অস্থিরতা কমানোর জন্য এই মুহূর্তে ওর আর দিয়ার সঙ্গ খুব দরকার ছিল।

ঝড়ের সেই উন্মাতাল তান্ডব এখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। বাইরের উত্তাল প্রকৃতি শান্ত হওয়ায় চারপাশের পরিবেশ এখন বেশ শীতল। নিযানার ঘুমটা ভাঙল কার যেন চড়া গলার ধমকের শব্দে। বিকেলে বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকেই শরীরটা কেমন জানি ম্যাজম্যাজে লাগছিল। তাই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল। কখন যে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল তা নিজেরই খেয়াল নেই। ​নিযানা বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। চোখ কচলে নিয়ে পাশে রাখা চশমাটা পুনরায় চোখে পরল সে। ব্যালকনি থেকে কলরবের গলার আওয়াজ আসছে। সে কারও সাথে কথা বলছে ফোনে। হঠাৎ কলরবের মুখ থেকে একটা অশ্রাব্য গালি বেরিয়ে আসতেই নিযানা অস্বস্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। সে খাট থেকে নেমে ধীর পায়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যেতেই দেখল, কলরব রাগের মাথায় নিজের ফোনটা মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। ​আচমকা শব্দে নিযানা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। কলরব ঝট করে পেছনে ফিরল। দেখল, নিযানা নিজের মুখের সামনে দুহাত আড়াআড়ি দিয়ে কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে; ওকে দেখে যে কেউ বুঝবে ও কতটা ভয় পেয়েছে। কলরব প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে রুক্ষ গলায় বলল,

‘কী সমস্যা তোর? যখন-তখন এভাবে ভূতের মতো চলে আসিস কেন? মোবাইলটা তোর থোতমায় লাগলে কি হতো?’
​নিযানা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। কলরব যে ভীষণ রেগে আছে তা ওর চেহারা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? তা নিযানা জানে না। পরিস্থিতির চাপে সে মুহূর্তে কোনো কথা খুঁজে পেল না। শেষমেশ আমতা-আমতা করে নিচু স্বরে বলল,
‘খিদে!’
​কলরব যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না। সে ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলল,
‘কীহ?’
​নিযানা এবার নিজের মুখ থেকে হাত নামিয়ে নিল। কলরবের মেজাজ খারাপ জেনেও সে সাহস করে ওর একটু কাছে এগিয়ে এল। তারপর সরাসরি বলল,
‘আমার খিদে পেয়েছে। আমি খাব।’
​কলরবের মেজাজ আগে থেকেই চড়ে ছিল। নিযানার এই অহেতুক কথা শুনে তা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। এখন এই কথা বলার মানে তার মাথায় ঢুকছে না। তবুও নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলল,
‘খাবি তো আমি কী করব?’
নিযানা খুব সহজভাবে উত্তর দিল, ‘রান্না করবে।’
​কলরব থমকে গেল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ভ্রু কুঁচকে অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল,

‘কী বললি তুই?’
‘সেদিনের মতো নুডলস রান্না করে দাও না, প্লিজ!’
​কলরবের কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘পারব না! আমি কি তোর বাবার চাকর? এত বড় মেয়ে হয়েছিস সামান্য এই কাজটুকু নিজে করতে পারিস না?’
​নিযানা ঠোঁট উল্টে নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘সামান্য নুডলসই তো! এটা নিয়ে এত ভাব দেখানোর কী আছে?’
​কলরব আর কথা বাড়াল না। সে মেঝের ওপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজের আছাড় মারা ফোনটা খোঁজার চেষ্টা করল। ইরা মেয়েটা তাকে প্রচণ্ড বিরক্ত করছে; এমনকি মাঝরাতেও অন্য নম্বর থেকে কল দিয়ে যাচ্ছে অনবরত। ফোনটা একটু দূরে ছিটকে পড়েছে। তিন ক্যামেরার আইফোনটার অবস্থা বেশ বেহাল। খুব জোরেই আছাড় পড়েছে স্ক্রিনের দশা দেখলেই বোঝা যায়। কলরব ফোনটা কুড়িয়ে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
​’তুই তো সেই সামান্য কাজটুকুও পারিস না। সকালের রান্নাটা যে তোর ছিলনা তা খেয়েই বুঝে গিয়েছিলাম। কিন্তু কথা হচ্ছে তোকে আমি কেন রান্না করে খাওয়াব?’

​নিযানা গম্ভীর মুখে বলল, ‘মাঝরাতে রান্না করে দিলে পাঁচশ টাকা দেব। এবার হবে তো?’
​কলরব তাজ্জব বনে গেল। তার পুরোনো কথা আজ তাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে মেয়েটা! নিযানা তখন ঠোঁট টিপে হাসছে। কলরব নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
‘কিন্তু ওটা তো জঘন্য ছিল, তাই না?’
​’সমস্যা নেই। কষ্ট করে খেয়ে নেব।’
​কলরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে খাটের এক কোণে বসল। হাতের ফোনটার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে বলল,
‘নিজে গিয়ে রান্না কর। মেয়ে মানুষ হয়ে এতটুকু কাজও জানিস না? শ্বশুরবাড়িতে গেলে তো এক দরজা দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য দরজা দিয়ে বের করে দেবে। কাজের বেলা নেই। শুধু আছে বড় বড় কথা!’
​নিযানা এগিয়ে গিয়ে কলরবের সামনে দাঁড়াল। কলরব একবার মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে আবারও চোখ নামিয়ে নিল। নিযানা বলল,

‘সত্যিই খুব খিদে পেয়েছে। তুমি তো জানো আমি রাতে কিছু খাইনি। এমনকি দুপুরেও না খেয়ে ছিলাম।’
​কলরব এবার বিরক্তিতে কপালে হাত দিয়ে অসহিষ্ণু গলায় বলল,
‘তো আমার মাথা কেন খাচ্ছিস মা? আমি কি তোকে না খেয়ে থাকতে বলেছিলাম? আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিবি?’
নিযানা আর কোনো তর্কের করলো না। মনে একটু আঘাত ও পেল। কলরবের কথার পিঠে কথা বলার মতো শক্তিটুকুও যেন তার শরীরে নেই। পেটের ভেতর খিদের জ্বালাটা এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। তবুও খাওয়ার ইচ্ছা আর হচ্ছে না৷ কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরপায়ে গিয়ে আবারও খাটে গা এলিয়ে দিল। ​নিযানাকে পুনরায় শুয়ে পড়তে দেখে কলরব যেন আরও বিরক্ত হলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলে উঠল,
‘সমস্যা কী তোর? আবার শুয়ে পড়ছিস যে! কী ভেবেছিস? আমি রান্না করে এনে তোর মুখের সামনে ধরব আর তুই গিলবি? অত বিলাসিতার সুযোগ নেই। চুপচাপ নিচে চল আমার সাথে।’
​কলরবের ধমক শুনে নিযানা বিছানা থেকে নেমে আসলো। কলরব তার ভাঙা ফোনটা খাটের ওপর অযত্নে ফেলে রেখে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিযানা নিজের মনেই একটু হাসল। কলরবের এই খিটখিটে স্বভাবের আড়ালে যে একটু প্রশ্রয়ও লুকিয়ে আছে সেটা সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে।

নবনীর চোখে ঘুম নেই। বিছানায় হেলান দিয়ে সে আধো-অন্ধকারে বসে আছে। মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভয়ের সাথে তীব্র অভিমান মিশিয়ে হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে তো এসেছে কিন্তু এখন কেমন যেন পস্তাচ্ছে সে। অন্তত অলেখাকে একটা খবর দিয়ে আসা উচিত ছিল। আসার পর থেকেই আনিকা কেমন জানি সন্দেহের চোখে দেখছেন। বারবার কারণ জানতে চেয়েছেন কিন্তু নবনী প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। ​হঠাৎ কোনো এক অস্ফুট শব্দে নবনী পাশে শোয়া দিয়ার দিকে তাকাল। মেয়েটা তার কোল ঘেঁষে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। ঘুমের ঘোরেই অবুঝ মনে হয়তো কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে সে। নবনী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। দিয়াকে এভাবে আগলে রাখার মধ্যে এক গভীর প্রশান্তি আছে যা নবনীর তপ্ত মনটাকে মুহূর্তেই জুড়িয়ে দিল। অথচ বিকেলের মুহূর্তটির কথা মনে পড়তেই নবনীর বুকটা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। আর একটু এদিক-সেদিক হলেই হয়তো দিয়া আজ তার কাছে থাকত না। ভাবতেই নবনীর চোখের পাতা ভিজে উঠল। সেই সাথে দিব্যর ওপর জমানো অভিমানটা যেন আরও গাঢ় হয়ে এল। ​ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শোনা গেল। বাইরে থেকে আনিকার কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

‘নবনী? নবনী! ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি? একটু দরজাটা খোল। দরকার আছে।’
​মাঝরাতে মায়ের এমন ডাক শুনে নবনী কিছুটা অবাক হলো। অতি সাবধানে দিয়ার হাতের বাঁধন আলগা করে সে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই দেখল আনিকা বেশ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়ের দিকে একবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজের হাতের ফোনটা নবনীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। নবনী কিছুই বুঝতে না পেরে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। ​আনিকা চাপা স্বরে বললেন,
‘জামাই ফোন করেছে। নিজের ফোন কোথায় রেখেছিস যে সে শেষমেশ আমাকে ফোন দিল?’
​মায়ের কথায় নবনী যেন আকাশ থেকে পড়ল। দিব্য তালুকদার শেষ পর্যন্ত সোজাসুজি শাশুড়িকে ফোন করে বসল! যে মানুষটা সারাক্ষণ ভদ্রতা আর সৌজন্যবোধের বুলি আউড়ায় সে? সে এই মাঝরাতে এমন কাজ করতে পারল? নবনী বাধ্য হয়ে ফোনটা কানে ধরল। খুব ছোট করে শুধু বলল,
‘জি!’

​আনিকা লক্ষ্য করলেন মেয়ের গলার স্বরে বিন্দুমাত্র কোমলতা নেই। অদ্ভুত নির্লিপ্ততা৷ তবে কিছু বললেন না। ওপাশ থেকে দিব্যর গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
​’এখনই নিজের ফোন থেকে আমাকে একটা কল দাও। নয়তো আমি এই মুহূর্তেই রওনা দেব। আর নয়তো এখনি সোজা ওখানে চলে আসব।’
নবনীর মনটা বিরক্তিতে ভরে উঠল। তবে দিব্যর গলার স্বরটা কেমন যেন অন্যরকম শোনাল আজ। একটু ক্লান্ত, কিছুটা ধরা। নবনী কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোনটা আনিকার হাতে ফিরিয়ে দিল। আনিকা কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,
‘তোর ফোনে হয়েছেটা কী? জামাই বলল, জরুরি কী একটা নাকি খুঁজে পাচ্ছে না সে। অফিসের দরকারি কাগজ নাকি কী সব! বড্ড অস্থির হয়ে ফোন করেছে। ছেলেটার কত সংকোচবোধ হয়েছে কে জানে? খুব দরকারি না হলে কি আমাকে কল করতো।’

নবনী মনে মনে অবাক হলো। বাহ! দিব্য তালুকদার তো বেশ গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারেন। কী চমৎকার বাহানা তৈরি করেছেন মাঝরাতে শাশুড়িকে ফোন দেওয়ার জন্য! লোকটা যেমন অহংকারী তেমনি নিজেকে বড্ড বেশি জ্ঞানী ভাবেন। নবনী আমতা-আমতা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল,
‘বোধহয় ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল আম্মু। খেয়াল করিনি। আমি দেখছি। তুমি গিয়ে ঘুমাও।’
‘কী যে করিস না!’
আনিকা গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মা যেতেই নবনী বিছানা থেকে দূরে একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো। ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল। একান্নটা মিসড কল! বিরক্তির চোটে কখন যে ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল তার নিজেরই মনে নেই। এতগুলো কল লোকটা তাকে করেছে? নবনী দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। না, কিছুতেই দুর্বল হওয়া চলবে না। নিজের জেদ আর আত্মসম্মান ধরে রাখতে হবে। ফোন অবশ্য তাকে করতে হলো না তার আগেই দিব্য আবার কল দিল। নবনী ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল তপ্ত কণ্ঠ,

‘গভীর ঘুমটা কি নষ্ট হয়ে গেল?’
নবনী নিজেকে সংযত রাখল না। ঝাঁঝালো গলায় বলল,
‘আপনি কি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন? মাঝরাতে নিজের শাশুড়িকে কল দিয়ে ঘুম থেকে জাগালেন কেন? সারাক্ষণ তো আমায় বলেন, নবনী তোমার কমনসেন্স কোথায়? তা আপনার কমনসেন্স এখন কোথায় গিয়ে লুকিয়ে আছে শুনি?’
দিব্য ওপাশ থেকে মৃদু হাসল। বিছানায় বসে ছিল। এখন আধশোয়া হয়ে একটু আরাম করে বসল সে। ধীরস্বরে বলল,
‘আস্তে কথা বলো। একটু দম নিয়ে নাও। বাহ তুমি তো রাগ করতেও জানো। আজ প্রথম দেখলাম।’
‘মাঝরাতে কি শুধু ফাজলামি করার জন্যই ফোন করেছেন?’
‘আমার ঘুমের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে তুমি শান্তিতে ঘুমাবে, সেটা কী করে হয়? মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। এক কাপ কফি করে দেওয়ার মতো কেউ নেই পাশে। ঘর ফাঁকা৷ বিছানা ফাঁকা। ভাবতে পারছ আমার অবস্থাটা?’

নবনীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। দিব্যর ভাঙা কণ্ঠস্বর শুনে মনের অজান্তেই এক চিলতে দুশ্চিন্তা উঁকি দিল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করল। কাঠখোট্টা গলায় বলল,
‘সেসব আমাকে কেন বলছেন? আমি কাছে থাকা বা না থাকাতে আপনার কী-ই বা যায় আসে? আর এই ফোন করার উদ্দেশ্যটা কী? শুধু আমার ঘুম নষ্ট করা?’
দিব্য একটু চমকাল। মেয়েটা যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও অনেক বেশি রেগে আছে। কিন্তু এই রাগের উৎসটা ঠিক কোথায়, তা সে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না। নিজেকে শান্ত রেখে বলল,
‘আচ্ছা, আমি কি সত্যিই খুব বড় কোনো ভুল করেছি? দেখো নবনী, আমার মনে হয় না আমি এমন কিছু করেছি যার জন্য তোমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এটা বড্ড ছেলেমানুষি হয়ে গেল না? সবাই কী ভাবছে বলোতো?’
নবনী তিক্ত কণ্ঠে বলল, ‘লোকে কী ভাববে তাতে আমার বয়েই গেছে! আর আপনার তো কোনোদিন ভুল হতেই পারে না, আপনি তো ভুলের ঊর্ধ্বে। আপনি আপনার মতো থাকুন না। আমাকে ছেড়ে আসা নিয়ে এত কথা বলছেন কেন? আপনি কি আমায় কোনোদিন ধরে রেখেছিলেন? যে আমার ছেড়ে আসাতে আপনার কষ্ট হবে?’
​দিব্য মৃদু হেঁসে বলল, ‘আমি তো ছোট মানুষ। তাই হয়তো বুঝিনি কীভাবে মানুষকে ধরে রাখতে হয়। আপনি বলে দিলে না হয় পরের বার একদম কোলে বসিয়ে রাখবো। কিন্তু দয়া করে কি একবার বলবে আমার অপরাধটা ঠিক কোথায়? চলেই যদি যেতে চাইলে তবে একা গেলে না কেন? আমার মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে গেলে! ওকে ছাড়া যে আমি…!’

​বাকি কথাগুলো দিব্যর কণ্ঠেই আটকে রইল। পূর্ণতা পেল না। ‘আমার মেয়ে’ শব্দটা শোনা মাত্রই নবনী চিৎকার উঠল,
‘খবরদার! দিয়াকে যদি শুধু আপনার মেয়ে বলেছেন তো একদম ভালো হবে না!’
​দিব্য নরম গলায় বলল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা ঠিক আছে। রিলাক্স! তোমার মেয়ে। মানে আমাদের মেয়েকে কেন এভাবে নিয়ে গেলে? তুমি তো খুব ভালো করেই জানো ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারিনা। নিজেও থাকলে না ওকে ও নিয়ে গেছো।’
​নবনীর চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করে উঠল। গলার কাছে এক দলা কান্না এসে দলা পাকিয়েছে। এই মুহূর্তে কথা বলতে গেলেই দিব্য বুঝে ফেলবে যে সে কাঁদছে। তার মানে দিব্য তাকে ফেরানোর জন্য নয় বরং শুধু দিয়ার জন্যই এতক্ষণ ব্যাকুল হয়ে ছিল! নবনী তার এই অবহেলার যন্ত্রনা সহ্য করতে পারল না। সে কোনোমতে নিজেকে শক্ত করে বলল,

​’শুনে রাখুন, দিয়াকে আমি আপনার কাছে আর কখনোই দেব না। ও আমার কাছেই থাকবে। আপনি নিজের জীবন নিয়ে কী করবেন বা না করবেন; সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু দিয়ার জীবন নিয়ে আমি আর আপনাকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। শুধুমাত্র আপনার ওই নির্লিপ্ত থাকার জন্য আজ আমি ওকে প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম! দিয়া আর ওই বাড়িতে ফিরবে না। ও আমার সাথেই থাকবে। নয়তো কে জানে, আবার কখন কার নজর পড়বে ওর ওপর আর আপনি সব নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াবেন।’

এই অবেলায় পর্ব ২৯

​দিব্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘নবনী, আমার কথাটা তো একবার শোনো…!’
​’খবরদার! আর একটা ফোনও আমাকে করবেন না। যদি করেন, তবে এই মুহূর্তেই আমি….আমি এই বাড়ি ছেড়েও অন্য কোথাও চলে যাব। মনে রাখবেন জেদ শুধু আপনার একার নেই। আমারও আছে।’
​বলেই নবনী আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা করল না। প্রচণ্ড ক্ষোভে আর অভিমানে ফোনটা মুখের ওপর কেটে দিল সে।

এই অবেলায় পর্ব ৩১