Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৭

এই অবেলায় পর্ব ৭

এই অবেলায় পর্ব ৭
সুমনা সাথী

দিব্য নবনীকে কোল থেকে নামিয়ে সাবধানে মেঝের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল। নবনীর পা দুটো তখনো কাঁপছে। হৃদপিণ্ডের ধকধকানি যেন তার কানের কাছে বাজছে। কোনোমতে স্থির হয়ে দাঁড়াতেই দিয়া ছুটে এসে নবনীকে জড়িয়ে ধরল। ছোট ছোট হাত দিয়ে নবনীকে পরখ করতে করতে আদুরে গলায় বলল,
‘তুমি ঠিক আছো তো মাম্মা? তোমার লাগেনি তো?’
নবনী দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। দিব্যর দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

‘আমি ঠিক আছি সোনা। থ্যাংকস… আমি আসলে লাইটটা ঠিক করছিলাম।’
দিব্যর কপালে তখনো বিরক্তির ভাঁজ। গম্ভীর গলায় বলল,
‘যে কাজ পারো না তা করতে যাও কেন? ওইখান থেকে পড়লে নিশ্চিত হাড়গোড়ে চোট পেতে। এতটুকু বুঝতে পারোনা?’
নবনীর মনে মনে বেশ মেজাজ খারাপ হলো। সে কি ইচ্ছা করে পড়েছি নাকি? আর লাইট ঠিক করা তো তার বাম হাতের কাজ। উনার ওই আওয়াজ শুনেই তো ভড়কে গেছে! কিন্তু মুখে টু শব্দটি করার সাহস তার হলো না। লোকটার ব্যক্তিত্বের সামনে নবনী কেমন যেন মিইয়ে যায়। সে দিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘চলো মাম্মা, অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘুমাতে হবে।’
দিয়া এক লাফে খাটে উঠে গিয়ে ঠিক মাঝখানটায় জাঁকিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর দুই হাত দিয়ে দুপাশের বালিশ চাপড়ে উৎসাহের সাথে বলল,

‘মাম্মা-পাপ্পা, তোমরাও এসো। আমি আজ তোমাদের মাঝখানে শুয়ে ঘুমাব। তোমরা আমার দুই পাশে শুয়ে পড়ো।’
দিব্য একবার নবনীর দিকে তাকাল। নবনীও তাকিয়ে ছিলো বিধায় চোখাচোখি হলো। বিব্রত হয়ে চোখ সরালো ও। নবনী আড়চোখে দিব্যকে দেখলো। দিব্যর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। লোকটা এই পরিবেশে যে কতটা হাঁপিয়ে উঠছে তা স্পষ্ট। নবনী আর কথা না বাড়িয়ে দিয়ার একপাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। দিব্য কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে এক সময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইটটা নিভিয়ে দিল। তারপর দিয়ার অপর পাশে গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল। টেবিল ফ্যানটা কোনোমতে দিয়ার ঠিকঠাক হচ্ছে। দিয়া তাদের দুইজনকে দুপাশে পেয়ে শান্তিতে চোখ বুজল।কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়মিত হয়ে এল। কিন্তু বিছানার দুই প্রান্তে থাকা দুজনের চোখের পাতা এক হলো না। দিব্যর কাছে এই ভ্যাপসা গরম আর বদ্ধ ঘরটা যেন এক প্রকার শাস্তি। অন্যদিকে নবনীর মনের ভেতর চলছে আশঙ্কার ভাঙা-গড়া। হঠাৎ করেই দিব্য বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কোনো শব্দ না করে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নবনী অবাক হলো। এত রাতে লোকটা কোথায় যাচ্ছে? কৌতুহল আর কিছুটা উদ্বেগে নবনীও বিছানা ছাড়ল। বাইরের উঠোনটা চাঁদের রুপোলি আলোয় ভিজে আছে। নবনী বারান্দায় এসে দেখল দিব্য উঠোনের এক প্রান্তে ঘাসের ওপর একা বসে আছে। তার চওড়া পিঠটা চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নবনী ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কারো পায়ের মৃদু শব্দ পেয়ে দিব্য মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখেমুখে বিরক্তি না থাকলেও এক ধরণের ক্লান্তি স্পষ্ট। নবনী দ্বিধা জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

‘আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে?”
দিব্য আবারও সামনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। একদম নিস্পৃহ গলায় বলল,
‘তেমন কিছু না। ঘরে অসহ্য গরম লাগছিল তাই একটু খোলা বাতাসে এসে বসলাম।’
নবনী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর সৌজন্যের খাতিরেই জিজ্ঞেস করল,
‘কিছু খাবেন?’
রাতের নিস্তব্ধতা তখন চাদরের মতো জড়িয়ে আছে চারপাশকে। আকাশে রুপোলি চাঁদের মায়াবী আলো। দিব্য নাবোধক মাথা নাড়লো। দিব্যর মৌন সম্মতির পর নবনী তার থেকে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে ঘাসের ওপর বসল। দিব্যর অভিব্যক্তিতে কোনো বিস্ময় নেই। নেই কোনো চাঞ্চল্য। লোকটা কীভাবে সবসময় এমন এক হিমশীতল গাম্ভীর্য বজায় রাখে তা নবনীর বোধগম্যের বাইরে। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। নবনী নিজের মনের গহীনে সাহসের সঞ্চয় করল। এটাই শ্রেষ্ঠ সময়; এই নির্জনতা আর জ্যোৎস্নার আলোয় মনের ওপর চেপে বসা পাথরটা নামিয়ে ফেলার মোক্ষম সুযোগ। যদি আজ সে বলতে না পারে তবে এই অস্থিরতা তাকে তিলে তিলে শেষ করে দেবে।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনের মাঝে এক অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করল। অবশেষে নবনী সেই স্তব্ধতা ভেঙে মৃদু স্বরে বলল,

‘আমার আপনাকে কিছু বলার আছে।’
দিব্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। জ্যোৎস্নার ঝাপসা আলোতেও তার চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নবনী স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। দিব্য গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
‘কী বলতে চাও? বলে ফেলো।’
কণ্ঠস্বরে কোনো উষ্মা নেই আবার কোমলতাও নেই। নবনী কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। লোকটার কি আজ মন খারাপ? নাকি পরিবেশের কারণে সে বিরক্ত? তবে যাই হোক নবনীকে আজ বলতেই হবে। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,
‘আপনি হয়তো জানেন আমি প্রথম দিকে এই বিয়েটা করতে মোটেও রাজি ছিলাম না। আর এর পেছনে আমার একটা বিশেষ কারণ ছিল।’
দিব্য সামনের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘জানি। আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি। তার ওপর এক বাচ্চার বাবা। যেকোনো অবিবাহিত মেয়ের কাছেই এমন প্রস্তাব শুরুতে মেনে নেওয়াটা কঠিন। এটাই তো স্বাভাবিক।’
নবনী মাথা নেড়ে বাধা দিল। বলল, ‘উঁহু, শুধু ওটাই কারণ ছিল না। আরও একটা বড় কারণ ছিল। দয়া করে আমাকে সবটুকু বলতে দিন।’

দিব্যর দৃষ্টি এবার স্থির হলো নবনীর ওপর। দিব্যর শান্ত এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নবনীকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল। নবনী আলতো করে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল; আকাশের ওই বিশাল চাঁদের দিকে চেয়ে কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সে। তারপর খুব নিচু স্বরে বলতে শুরু করল,
‘আসলে আমি একজনকে অনেক বছর যাবত ভালোবাসতাম। খুব নিঃস্বার্থভাবে তাকে চেয়েছিলাম। ভাবতাম সে-ও আমাকে ততটাই ভালোবাসে। আপনাকে বিয়ে না করার পেছনে এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় কারণ। কারণ আমার মনে হয়েছিল, অন্য কাউকে ভালোবাসার পর আপনার হাতে হাত রাখাটা অন্যায় হবে। কিন্তু…!’
কথাটা শেষ করতে পারল না নবনী। গলার কাছে এক দলা কান্না এসে আটকে গেল। চোখের কার্নিশে জমা হওয়া নোনা জলগুলো গাল বেয়ে নামার জন্য ছটফট করছে। বুকের ভেতরটা পুরনো ক্ষতে নতুন করে চাবুকের আঘাত খাওয়ার মতো মুচড়ে উঠল। দিব্য এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নবনীর দিকে; সে ওই ‘কিন্তু’র পরের উত্তরটার জন্য অপেক্ষা করছিল। নবনীকে ওভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তার গাম্ভীর্য কিছুটা টলে উঠল। দিব্য নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
‘কিন্তু কী? বিয়ে করলে না কেন তাকে? সমস্যা কোথায় ছিল?’

নবনীর দীর্ঘদিনের জমানো বাঁধটা আর টিকল না। এতক্ষণের শক্ত আবরণটা ভেঙে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দ রাতের সেই নিস্তব্ধ উঠোনে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। দিব্য কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেল। সে তো এমন কিছু কঠিন কথা বলেনি যে মেয়েটা এভাবে ভেঙে পড়বে! নবনী এবার শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলে দিব্য বিচলিত হয়ে পড়ল। তার মাথায় এল না ঠিক কী করা উচিত। সে একটু ঝুঁকে নবনীর মাথাটা আলতো করে নিজের চওড়া কাঁধে চেপে ধরল। বড় বড় আঙুলগুলো দিয়ে নবনীর এলোমেলো চুলে বিলি কেটে শান্ত গলায় বলল,
‘নবনী, শান্ত হও। এভাবে কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে বকা দিয়েছি? মাঝরাতে তোমার কান্না শুনে যদি বাড়ির কেউ বাইরে চলে আসে; তবে তারা কী ভাববে বলো তো?’
দিব্যর গায়ের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ আর এমন আশ্রয়ের স্পর্শে নবনীর কান্নার বেগ ধীরে ধীরে কমে এল। তার কথার উদ্দেশ্য বোধগম্য হলো ওর। আসলেই কেউ আসলে বিষয়টা জঘন্য হবে। তবে হিক্কা থামল না। সে কম্পিত গলায় ভেজা স্বরে বলতে শুরু করল,

‘সে… সে আমাকে ঠকিয়েছে। আমার এত বছরের ভালোবাসা আর অপেক্ষার কোনো মূল্য ছিল না তার কাছে। শেষ মুহূর্তে সে আমাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছে। আমার মনে হয়েছিল আপনার সাথে নতুন জীবন শুরু করার আগে আমার সবটা বলা উচিত। আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি। আম্মু বলছিলেন আমি যদি আপনাকে এসব বলি তবে আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন। আমাকে হয়তো… দুশ্চরিত্রা ভাববেন… আমি….!’
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে নবনী যেন নিজের অস্তিত্বেই কুঁকড়ে গেল। জ্যোৎস্নার আলোয় তার ফ্যাকাশে মুখটা তখন লজ্জায় আর অপমানে নীল হয়ে উঠেছে। নবনীর দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টগুলো আজ যেন বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো দিব্যর চওড়া বুকের আশ্রয়ে আছড়ে পড়ল। সে ঘনঘন ফুঁপিয়ে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। অন্যদিকে, দিব্য এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে রইল। মেয়েটা এই সামান্য বিষয় নিয়ে এতদিন মনের ভেতরে কতটা তোলপাড় চালিয়েছে। কত শত গ্লানি আর অপমানবোধের পাহাড় জমিয়ে রেখেছে তা ভেবে দিব্যর ঠোঁটের কোণে আপনা-আপনি এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। নবনীর সমস্ত আবেগ যখন চূড়ান্ত সীমায় ঠিক তখনই দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

‘নবনী, বাই এনি চান্স তুমি কি আমার শার্টে সর্দি মোছার চেষ্টা করছো? দেখো, ইটস ভেরি ব্যাড। আমি শার্টটা আজ প্রথমবার পরেছি। একদম নতুন।’
কথাটা শোনামাত্র নবনী চট করে মুখ তুলে চাইল। তার কান্নার বেগ মুহূর্তেই উধাও। সে কি ভুল শুনল? এত বড় একটা স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর এই লোকটা এখন তার শার্টের যত্ন নিয়ে কথা বলছে? তাও আবার সর্দি মোছার মতো একটা অবান্তর আর জঘন্য অভিযোগ! লজ্জায় আর অপমানে নবনীর মনে হলো যেন এখনই মাটির সাথে মিশে যায়। সে দিব্যর থেকে ছিটকে সরে এল। দেখল দিব্যর মুখাবয়ব পাথরের মতো গম্ভীর; মনেই হচ্ছে না সে কোনো রসিকতা করছে। সে সত্যিই যেন তার নতুন শার্টের জন্য উদ্বিগ্ন। নবনী রাগে আর ক্ষোভে ফুঁসে উঠে বলল,
‘কী সব বাজে কথা বলছেন আপনি? আমি আপনাকে একটা সিরিয়াস কথা বলছি আর আপনি…’
দিব্য বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল,

‘আমিও তো সিরিয়াস কথাই বলছি। আমার এই শার্টের দাম জানো তুমি? তাছাড়া আমি অপচয় একদম পছন্দ করি না। শার্ট কেনার টাকা আছে বলেই কি একটা শার্ট একবার পরেই ফেলে দেব?’
নবনীর বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল এই অদ্ভুত মানুষটার দিকে। লোকটা কি আসলেই রক্ত-মাংসের মানুষ? নাকি আবেগহীন কোনো যন্ত্র। সে এতক্ষণ তার জীবনের সবচেয়ে গোপন এবং যন্ত্রণাদায়ক সত্যগুলো উগরে দিল আর এই মানুষটা সব শুনেও শুধু তার শার্টের কথা ভাবছে। নবনীর ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলতে ‘নিকুচি করেছে আপনার শার্টের!’ কিন্তু সে কেবল দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিল। একটু থিতু হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনার কি আসলেই কিছু জানার নেই? আমার অতীত নিয়ে আপনার মনে কি কোনো প্রশ্নই জাগছে না? কিছুই বলতে চাননা?’
দিব্য ঘাসের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে মাথা নাড়ল,

‘আছে তো।’
নবনীর বুকটা একটু ধক করে উঠল। এবার হয়তো সেই কাঙ্ক্ষিত জেরা শুরু হবে। সে কিছুটা শক্ত হয়ে বলল,
‘তো সেটা বলুন। কিছু বলার থাকলে সরাসরি বলুন।’
দিব্য নবনীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাইল। শান্ত গলায় বলল,
‘যাও, রান্নাঘরের ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এসো। যাও।’
দিব্যর এই নির্লিপ্ত ব্যবহার নবনীকে যেমন অবাক করল তেমনি ভেতরে ভেতরে একটা স্বস্তির হাওয়া দিয়ে গেল। সে আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এসে দিব্যর সামনে ধরল। দিব্য পানিটা হাতে না নিয়ে বলল,

‘তুমি খাও।’
নবনী আকাশ থেকে পড়ল, ‘কিহ?’
‘বলেছি পানিটা তুমি খাও। তোমার এটার খুব দরকার আছে।’
নবনী স্তব্ধ হয়ে গ্লাসটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। দিব্যর এই অদ্ভুত আচরণের মানে সে উদ্ধার করতে পারছে না। লোকটা কি তাকে অবজ্ঞা করছে? নাকি এই তুচ্ছ বিষয়ের আড়ালে তাকে মানসিকভাবে শান্ত করার চেষ্টা করছে? তার মনে হলো, সত্যিই তার এক গ্লাস পানির খুব দরকার ছিল। শীতল পানিটা গলার ভেতর দিয়ে নামতেই তার দীর্ঘক্ষণের উত্তেজনা আর কান্নার ক্লান্তিটা যেন একটু থিতু হলো। সে গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রইল। দিব্য তার পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে। নবনী এখনো ইতস্তত করছে। সে ভেবেছিল দিব্য হয়তো এখন তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। অসীমের সাথে তার সম্পর্কের খুঁটিনাটি জানতে চাইবে। কিন্তু দিব্যর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে যেন কোনো সাধারণ গল্প শুনেছে। হঠাৎ দিব্য নিজের হাতটা নবনীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

‘নবনী, চলো ফ্রেন্ডশিপ করি।’
নবনী বোকার মতো দুপাশে মাথা নাড়ল। বোঝালো সে রাজি। তার চোখের পলক যেন পড়ছে না। এই লোকটার মাথায় আসলে কী চলছে তা বোঝার সাধ্য কোনো সাধারণ মানুষের নেই। কিছুক্ষণ আগে যে শার্টের মায়া করছিল এখন সেই গভীর রাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে নিজের বউয়ের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছে! নবনীর কাছে দিব্য তালুকদার এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যের নাম। দিব্য তার হাতটা নামিয়ে নিল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘চলো, এবার ঘুমানো যাক। কাল সকালেই আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।’
নবনী অবাক হয়ে বলল, ‘কালকেই? আরও দুদিন থাকার কথা ছিল?’
‘হ্যাঁ, পরিকল্পনা পালটেছে। আসলে আজ কলরবের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়া হয়েছিল। ও যখন ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছে তখন আর দেরি করে লাভ কী? আগামী শুক্রবারই বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাড়িতে এখন অনেক কাজ তাই আমাদের কালই ফেরাটা জরুরি।’
নবনী আবারও মাথা নাড়ল শুধু। কিছু বলার আগেই দিব্য দীর্ঘ পা ফেলে ঘরের নিকট এগোতে এগোতে বলল,
‘বিশ্বাসঘাতকদের জন্য চোখের পানি অপচয় করে লাভ হয়না। নিজেকে শেষ করাও বোকামি বরং তাদের শেষ করে দেওয়া উচিত৷ অন্তত আমার তো তাই মনেহয়।’

পরদিন বিকেলে যখন ওরা তালুকদার বাড়িতে এসে পৌঁছাল তখন গোধূলির শেষ রক্তিম আভাটুকু মিলিয়ে গিয়ে চারদিকে সন্ধ্যার ধূসর চাদর নামতে শুরু করেছে। দিব্য নবনী আর দিয়াকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়েই আবার গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাল। ফ্যাক্টরির ওষুধের ব্যাচ নিয়ে কয়েকদিন ধরে যে গোলমালটা চলছিল। সেটা নাকি জরুরি ভিত্তিতে মেটানো দরকার। বাড়ির ভেতর পা রাখতেই নবনী দেখল এক এলাহি কাণ্ড! ড্রয়িংরুমের টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিয়ের নমুনা কার্ড। কলরবের বিয়ে বলে কথা। পুরো বাড়ি যেন একটা উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাড়ির সবাই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত। নবনী ও তাদের সাথে যোগ দিলো। কলরব আর কাব্যর খুনসুটি থামার নাম নেই। দুই ভাইয়ের মধ্যে কার্ডের ডিজাইন নিয়ে তুমুল লড়াই চলছে। কলরব একটা সোনালি কাজ করা কার্ড উঁচিয়ে ধরে বলল,
‘বিয়ে কি তুই করবি? বিয়েটা আমার তাই কার্ড আমিই পছন্দ করব। খবরদার ভাই তুই যদি নাক গলাবি তবে আমি আর বিয়ে করতে যাব না বলে দিলাম!’

কাব্য হোহো করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল। কলরবের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বলল,
‘তুই যাবি না বিয়ে করতে? আরে, তুই তো অলরেডি স্বপ্নে বাসর ঘরে গিয়ে বসে আছিস! কতটা নির্লজ্জ হলে মানুষ নিজের বিয়ে নিয়ে এমন হুলস্থূল করতে পারে। তা তোকে না দেখলে কেউ বুঝবে না।’
উপস্থিত সবাই কাব্যর কথায় হেসে উঠল। মৌনিতা পাশ থেকে কাব্যকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘তুমি একদম চুপ করো তো! ভাইয়ার পছন্দ করা কার্ডটা আসলেই ইউনিক। অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। তাই না নবনী?’
মৌনিতা হঠাৎ নবনীকে আলোচনার মাঝখানে টেনে আনায় সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সবার উৎসুক দৃষ্টি এখন নবনীর ওপর। কাব্য বলে উঠল,

‘হ্যাঁ নবনী, তুমিই বলো। আমাদের বিচারক হিসেবে তুমিই আজ ফয়সালা করে দাও। কার পছন্দ বেশি উন্নত?’
নবনী পরলো বিপাকে। তার কি বলা উচিত সে বুঝতে পারছেনা। আমতা আমতা করে বলল,
‘আপনারা একটা কাজ করতে পারেন। দুই ধরনের কার্ডই ছাপানো হোক। কাব্য ভাইয়া, আপনার যেটা পছন্দ সেটা আপনি সবাইকে দিলেন। আর কলরব ভাইয়ার পছন্দের কার্ডটা উনি উনার পরিচিতদের দেবেন। ব্যাস মিটে গেল!’
কাব্য টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, ‘অসাধারণ! একদম মোক্ষম আইডিয়া। এটাই হোক।’
কিন্তু মৌনিতা দমবার পাত্রী নয়। সে চিবুক উঁচিয়ে দৃঢ়স্বরে বলল,
‘উঁহু, কার্ড একটাই হবে। আর আমার আর ভাইয়ার পছন্দের ওই কার্ডটাই ছাপা হবে। ব্যস, এটাই শেষ কথা! তুমি একদম মাঝখানে আসবে না।’
কাব্যর খুব ইচ্ছে ছিল প্রতিবাদ করার কিন্তু পরক্ষণেই নিজের জিভ সামলে নিল সে। মৌনিতার সাথে গত কয়েকদিনের মান-অভিমান আর ‘আলুর বস্তা’ কাণ্ড মিটমাট করতে তার নাভিশ্বাস উঠে গেছে। তাই নতুন করে আর রণক্ষেত্রে নামার ঝুঁকি নিল না সে। কাব্যর এই অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে মৌনিতার মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। কলরব সুযোগ বুঝে খিলখিল করে হেসে উঠল আর কাব্যকে টিটকারি দিয়ে বলল,
‘বেশ হয়েছে। এখন বল কিছু।’

কাব্য বিরস মুখে বিড়বিড় করে বলল, ‘তোকে চুপ করানোর মানুষও আসছে দাঁড়া। নির্লজ্জ, আস্ত একটা বাঁদর! বিয়ে করার জন্য কেমন লাফালাফি করছে দেখো। তোর বিয়েতে তুই একাই যাস। আমি একদম যাব না।’
পুরো ঘরে তখন হাসির রোল। বাড়ির বড়রা পর্যন্ত ঠোঁট টিপে হাসছেন। কলরব মোটেও দমল না। সে আরও রসিয়ে বলল,
‘আসলে কী বল তো তোকে আমি খুব ভালোবাসি। কিন্তু বিষয়টা যখন বিয়ের তখন তো বর ছাড়া চলবে না। তাই খুব কষ্ট হলেও বুকে পাথর রেখে না হয় আমি একাই বিয়ে করতে যাব!’
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ছে। ঠিক তখনই ছোট্ট ইহান সোফায় দাঁড়িয়ে দুহাত কোমরে দিয়ে গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করল,
‘আচ্ছা আব্বু, আমি কবে বিয়ে করব? আমাকে কেন বিয়ে দিচ্ছ না?’
ইহানের এরূপ কথায় হাসির বেগ দ্বিগুণ হয়ে গেল। কাব্য ছেলের কথা শুনে কপালে হাত দিয়ে বসল।অসহায় চোখে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘এই তো বাপ, দেব। তোর চাচ্চু তো অন্তত দুইবার পরীক্ষা দিয়ে কলেজটা কোনোমতে পার করেছে। তোর কেবল মুসলমানিটা হয়ে গেলেই আর দেরি করাব না। সোজা বিয়ে করতে বসিয়ে দেব!’
কাব্যর কথা শুনে সবাই ঠোঁট টিপে হাসলো। কলরব কটমট করে ভাইয়ের দিকে তাকাল কিন্তু প্রতিবাদ করার মুখ নেই। কাব্য ভুল কিছু বলেনি। দিব্যদের পারিবারিক ঐতিহ্য হলো চিকিৎসা শাস্ত্র। আরশাদ তালুকদার নিজে একজন নামকরা ডাক্তার। তাদের একটা ঔষধ কোম্পানি আর একটা হাসপাতাল আছে। তিনি চেয়েছিলেন দিব্য ডাক্তার হোক কিন্তু দিব্যর ঝোঁক ছিল ব্যবসায়। বড় ছেলের সেই জেদের কাছে হার মেনে আরশাদ তালুকদার আশা করেছিলেন অন্তত ছোট ছেলে কলরব ডাক্তার হয়ে হাসপাতালের হাল ধরবে। তাই জোর করে ওকে সাইন্সে দিয়েছিলো। কিন্তু কলরব? সে তো এইচএসসিতেই তিন সাবজেক্টে গোল্লা মেরে বসে ছিল! পরের বার অনেক কষ্টে টেনেটুনে পাশ করেছে। পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা আর বড়লোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে’র তকমা গায়ে মাখতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ। কাব্য হাসতে হাসতেই আবার টিপ্পনী কাটল,

‘খবরদার কলরব, চোখ রাঙাবি না! তোর পাল্লায় পড়ে আমার ছেলেটাও নষ্ট হচ্ছে। নিজের এখনো আক্কেল দাঁত ওঠেনি অথচ বিয়ে করব বলে নেচে বেড়াচ্ছিস! লজ্জা হওয়া উচিত।’
ইহান গাল ফুলিয়ে বলল, ‘বিয়ে করা অনেক মজা। তাই না চাচ্চু?’
কলরব ইহানকে কোলে টেনে নিল। ওর নাকে টোকা দিয়ে বলল,
‘বিয়ে করা আসলেই অনেক মজা রে বাপ! দেখছিস না সবাই কেমন আনন্দ করছে? তুই যখন আমার মতো বড় হবি তখন তোকেও ধুমধাম করে বিয়ে দেব। তোর বাপকে বলার দরকার নেই। ঠিক আছে?’
পাশে বসে থাকা দিয়া গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আচ্ছা চাচ্চু, মানুষ শুধু বড়ই হয় কেন? ছোট হয় না কেন?’
‘ছোট হওয়ার তো নিয়ম নেই।’
‘কেন নিয়ম নেই?’
কলরব আমতা আমতা করে বলল, ‘জানি না।’
‘কেন জানো না?’
কলরব এবার কিছুটা অসহায়ের মতো বলল। ‘বললাম তো জানি না মা!’
দিয়া নাক সিঁটকে গম্ভীর মুখে বলল, ‘কিছুই তো জানো না। ভেরি ব্যাড!’
দিয়ার কথার রেশ কাটতে না কাটতে ইভান বলল,
‘চাচ্চু, তুমি কিছুই জানো না বলেই তো পরীক্ষায় ফেল করো। তোমার উচিত আমার মতো পড়াশোনা করা। তাহলে তুমি আমার মতো একশতে একশ পাবে।’

এই অবেলায় পর্ব ৬

কলরবের অবস্থা এখন অনেকটা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘তুই আর তোর বাপ; তোদের দুজনকে সহ্য করা আসলেই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এই তো তোর বাপ পাশে বসে আছে। ওকে জিজ্ঞেস কর। সে তো মহা পণ্ডিত, সবজান্তা!’
কাব্য তখন শব্দ করে হাসছে। ড্রয়িংরুমের হাসাহাসির মাঝেই কলরব একটা কুশন কাব্যর দিকে ছুড়ে মারল। ঠিক তখনই সদর দরজার থেকে দিব্য ভেতরে ঢুকল। নবনী দেখলো ওর পাশে একটা মেয়ে।

এই অবেলায় পর্ব ৮