Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১২

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১২

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১২
মারিয়াম ফুল

মেহের আয়নার সামনে স্থবির হয়ে বসে ছিল। তার দুচোখে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। মাথার ওড়নাটা গাফিলতিতে সরে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের একপাশে ঝুলে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা বাতাস তার অবিন্যস্ত চুলগুলোকে আলতো করে দোলাচ্ছে, কিন্তু মেহেরের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আয়নার প্রতিবিম্বে সে নিজেকে দেখছে না, বরং দেখছে এক অচেনা ভবিষ্যৎকে। বাবা-মায়ের আদরের ছোট মেয়ে, ভাইদের চোখের মণি যার জীবনে কখনো কোনো অভাব ছিল না, সেই চঞ্চল মেহের আজ এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে কান্নার অধিকারটুকুও যেন এক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের পরিবার থাকে এমন ভাবে নিঃস্ব করে দেবে মেহেরের তা কল্পনায়ও ভাবেনি। রুদ্রর সাথে এই বিয়েটা সে কোনোদিন মেনে নিত না, যদি না তার গর্ভের ওই ছোট্ট প্রাণের নিরাপত্তার প্রশ্ন আসত।

রুদ্র বেশ কিছুক্ষণ আগেই রুমে এসেছে। মেহেরের এই উদাসীনতা তার নজর এড়াল না। সে দেওয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে তাকাল। যেখান থেকে মেহেরের ফ্যাকাসে মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রুদ্র হঠাৎ নীরবতা ভেঙে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমার সাথে যাবে?”
মেহের আয়নায় চোখ তুলে তাকাল। লজ্জা আর অস্বস্তির ভারে নুয়ে পড়ে, তাড়াহুড়ো করে পাশের ওড়নাটা কুড়িয়ে নিয়ে শরীরটা আড়াল করল।তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। “কোথায়?”
“অ্যাপার্টমেন্টে। ঢাকাতে আমার নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট আছে। দেশে থাকলে আমি ওখানেই থাকি। এখানে থাকাটা এখন সেফ না।”
মেহের কিছু না ভেবেই সরাসরি নাকচ করে দিল। “না, আমি যাব না।”
মেহেরের জন্য ব্যাপারটা চিন্তার অতীত। একটা অ্যাপার্টমেন্টে শুধু তারা দুজন থাকবে, আর কেউ না! রুদ্র মেহেরের মনের কথা যেন মুহূর্তেই আঁচ করতে পারল। সে একটা সূক্ষ্ম হাসি দিয়ে বলল

“দেখো আমি কোনো রিস্ক নিতে পারি না। তোমার কন্ডিশন এখন মোটেও ভালো না,তার ওপর তুমি প্রেগন্যান্ট। বাড়ির কেউ যদি এই কথা জানতে পারে তবে কী হবে ভেবেছ? দাদি বা মা কি এটা সহ্য করতে পারবেন? তার চেয়ে আমার সাথে থাকাটাই সেফ।”
মেহের মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। রুদ্রর কথায় যুক্তি আছে। চৌধুরী নিবাসের এই সত্যিটা চাপা রাখা কঠিন হবে। সে খুব মৃদুস্বরে বলল, “যাব।”
কিন্তু বাড়ির বড়রা, বিশেষ করে রুদ্রর দাদি আর মা-বাবা কিছুতেই এই অল্প দিনে তাদের ছাড়তে চাইলেন না। বিয়ের মাত্র দুদিন হয়েছে, এখনই নতুন বউ নিয়ে আলাদা থাকাটা সুলতানা চৌধুরী মানতে পারছিলেন না। রেহানা চৌধুরীও মেহেরের এই ফ্যাকাশে মুখ দেখে চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু রুদ্রর বাবা হামজা চৌধুরী সম্ভবত ছেলের ওপর একটু বেশিই ভরসা করলেন এইবার । তিনি বললেন

“যাক না, মেহের ওর সাথেই থাকুক। নতুন বিয়ে হয়েছে, রুদ্র যদি বউয়ের পরোয়া না করত তবে আমি অবাক হতাম না। আমার মনে হয় ওদের নিজেদের সময় দেওয়া উচিত একে অপরকে। নিয়ে যাক ও মেহেরকে। হয়তো একটু ঘুরলে মেহেরের মনটাও ভালো হবে হঠাৎ করেই তো ওদের বিয়ে হল হয়তো মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে।
সিলেট থেকে ঢাকার ফ্লাইট ছিল রাত ৮টায়। জ্যাম ঠেলে রুদ্রর যখন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে পৌঁছাল, তখন রাত ১১টা বেজে গেছে। মেহের ভেতরে ঢুকে ড্রয়িংরুমের চারদিকে তাকাতেই তার মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। পুরো অ্যাপার্টমেন্টে এক ডার্ক এসথেটিক ভাইব। ফার্নিচার থেকে শুরু করে দেওয়ালের রঙ সবই হয় কালো না হয় কফি কালার। মেহেরের মোটেও পছন্দ হলো না এই অন্ধকার আর গম্ভীর পরিবেশ, কিন্তু তার কাছে কোনো উপায়ও নেই।

রুদ্র অনলাইন থেকে রাতের খাবার আনিয়ে নিজের মতো খাচ্ছিল। সে মেহেরের দিকে একবার তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে চোখের ইশারায় বলল, “হ্যাভ ইট।” ক্ষিদে মেহেরেরও পাচ্ছিল, সারাদিনের ক্লান্তি আর টেনশনে পেটটা গুড়গুড় করছিল। সে নিঃশব্দে কিছুটা খেয়ে উঠে পড়ল।
রুদ্র যখন পেছনের লাগেজগুলো লিভিং এরিয়াতে আনছিল, মেহের তখন তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার গলাটা শুকিয়ে আসছে, কিন্তু এসব বজ্র কন্ঠে বলল “আমরা একই রুমে থাকব না,দিস ইজ নট পসিবল। ”
চৌধুরী বাড়িতে পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল, অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু এখানে এই অচেনা ফ্ল্যাটে সে ভয় পাচ্ছে। রুদ্র মেহেরের ভয় দেখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে লাগেজের হ্যান্ডেলটা ছেড়ে মেহেরের দিকে এক পা এগিয়ে এসে বলল
“তোমার কী মনে হয় মেহের? তোমার সাথে এক রুমে থাকার জন্য আমি মরে যাচ্ছি? ট্রাস্ট মি, আমার চয়েস লিস্টে তুমি এখনো অনেক নিচে আছ।”

রুদ্র মেহেরকে একটু চিরিয়ে যেন এই কথাগুলো বলল। সে এক পা দু’পা করে মেহেরের দিকে এগিয়ে আসতেই মেহেরের রূপ বদলে গেল। সে পার্শবর্তী হ্যান্ডব্যাগ থেকে ঝট করে একটা পিস্তল বের করে রুদ্রর দিকে তাক করল। তার হাত কাঁপছে না, চোখ দুটো পাথরের মতো শক্ত। মেহের আর সেই পরশু রাতের মেয়েটা নেই, যে বাটার নাইফ ধরতে ভয় পাচ্ছিল। মেহেরের চোখের নিখুঁত নিশানা আর এই আকস্মিক রূপ দেখে রুদ্রর মতো ক্যাপ্টেনও প্রথমবার থমত খেয়ে গেল। সে হাত তুলে এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল
“হেয়, ওয়েট… ওয়েট সুইটহার্ট! শান্ত হও। আমি তোমাকে জাস্ট রুমের চাবি দিতে আসছি। আমি অ্যাপার্টমেন্টে কয়েকদিন থাকব না। পরশু আমার ইউএসএ ফ্লাইট আছে।”

মেহের পিস্তলটা নামাল। তার কণ্ঠ পাথরের মতো শক্ত। “ডোন্ট কল মি সুইটহার্ট। আমি আপনার সুইটহার্ট নই।”
রুদ্র বিড়বিড় করে হাসল। “ইয়া, ইউ আর রাইট। ইউ আর মাই বিটারহার্ট ” সে চাবিটা টেবিলের উপর ওপর রেখে নিজের রুমে চলে গেল। যাবার সময় আবার ইশারা করে মেহেরকে পাশের রুম দেখিয়ে দিল।
রাতের নিস্তব্ধতায় দুজন আলাদা দুটি রুমে আশ্রয় নিল। রাত তখন ৩টা। রুদ্রর জল পিপাসা পাওয়ায় সে ঘর থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই থমকে গেল। মেহেরের ঘর থেকে এক করুণ কান্নার সুর ভেসে আসছে। সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মেহের তখন জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে নিজের সবটুকু ব্যথা উজাড় করে দিচ্ছে। এটা সেই সময়, যখন বান্দা তার স্রষ্টার সবচেয়ে কাছে থাকে।মেহের দু’হাত তুলে মোনাজাত করছে। প্রার্থনার আকুলতায় হঠাৎ তার গলার স্বর বুজে এল। ভাঙা কণ্ঠে সে বিড়বিড় করে উঠল—
“আল…আল্লাহ! আমায় কোন মোড়ে এনে দাঁড় করালে? আমার সামনে তো কোনো পথ আর অবশিষ্ট নেই। আমায় সাহায্য করো…”

মেহেরের কান্নার বেগ ক্রমে বাড়তে থাকে। বুকফাটা আর্তনাদে সে বলতে লাগল, “আমার বাচ্চা… আমার বাচ্চাটাকে ভালো রেখো। এই পৃথিবীতে ও ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই!”
দরজার আড়ালে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র। মেহেরের এই বুকভাঙা প্রার্থনা তার কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে কোনো রেখাপাত করল না। সে অন্ধকারের মাঝেই এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ঠোঁট জোড়া অতি সামান্য নেড়ে সে বিড়বিড় করে নিজেকেই যেন বলল—

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১১

“কাকে তুমি তোমার দুঃখ শোনাচ্ছ মেহের? যার কাছে সাহায্যের আর্জি জানাচ্ছ, সেখান থেকে তোমার প্রার্থনার উত্তর কোনোদিনই আসবে না।”
রুদ্রর স্বর এতটাই নিচু যে তা ঘরের বাতাসে মিলিয়ে গেল। মেহের টেরও পেল না যে তার ঠিক পেছনেই কেউ একজন দাঁড়িয়ে তার সমস্ত আর্তনাদকে উপহাস করছে। রুদ্রর সেই নিস্পৃহ চাহনি আর বিষাক্ত হাসি অন্ধকারের গহ্বরে ঢাকা পড়ে রইল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৩