Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৮
মারিয়াম ফুল

রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটায় একটা বাজে। পুরো বাড়ি যখন এক নিঝুম নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে, মেঘলা তখন জায়নামাজে বসে চোখের জল ফেলছিল। সে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়েছিল একমাত্র মেহেরের জন্য। সে জায়নামাজের কোণটা শক্ত করে চেপে ধরল, কিন্তু তার চোখের জল থামছিল না। মোনাজাতে হাত দুটো তুলে সে শূন্যে চেয়ে রইল। অবরুদ্ধ গলায় বিড়বিড় করল, “ইয়া আল্লাহ… দুনিয়ার সবাই যদি বলে, আমি বিশ্বাস করব না। আমাদের মেহু কাউকে খুন করতে পারে না। ওর জীবনটা বড্ড অগোছালো আল্লাহ। আমাদের এই পরিবার নামক জেলখানাটা কি কম ছিল ওর জন্য?কেন ওকে বারবার এত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে আল্লাহ? কেন এত নির্মমতা ওর সাথে? তুমি ওকে রক্ষা করো।”

মেঘলা যখন মোনাজাতের মাঝে এভাবে কাঁদছিল, ঠিক তখনই তার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘মাশফি’ নামটা। গতকাল থেকে সায়েদ বাড়ির এই চরম বিপর্যয় আর ঝামেলার পর থেকে মাশফির কোনো কল বাড়ির কেউ ধরেনি। মেঘলাও অনবরত এড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই নিঝুম রাতে স্ক্রিনের আলোটার দিকে তাকিয়ে সে আর পারল না। মেঘলা উঠে দাঁড়াল। জায়নামাজটা আলতো করে ভাজ করে একপাশে রাখল। কাঁপতে থাকা হাতে ফোনটা কানে ঠেকালো, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। ওপাশে শুধু তার ভারী, তপ্ত শ্বাসের শব্দ আছড়ে পড়ল।
কয়েক সেকেন্ড ওপাশেও চরম নীরবতা প্রকাশ পাচ্ছিল ।
নীরবতা ভেঙে ওপাশে মাশফি ব্যাকুল, অস্থির আর গলায় বলে উঠল, “আমি কি যা শুনেছি… সব সত্যি, মেঘ? গতকাল থেকে তোমরা কেউ আমার কল ধরছ না কেন? মেহু… মেহুর কী হয়েছে?”
মেঘলা উত্তর দিল না। ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে রইল। ওপাশে থেকে মাশফির কণ্ঠস্বর আরও ভেঙে এলো, “কীভাবে মেঘ? হাউ? মেহু এটা করতে পারে?”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এলো না। শুধু মেঘলার চাপা কান্নার শব্দটুকু ফোনের স্পিকারে এসে আছড়ে পড়ছিল। এই নীরবতা যেন মাশফির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। মাশফি আবার বলল, “মেঘ, তুমি কাঁদছ? প্লিজ কথা বলো আমার সাথে। আমি এখানে প্রতিটা মুহূর্ত নরকযন্ত্রণা ভোগ করছি। মেহুর নামে মিডিয়া এসব কী কথা ছড়াচ্ছে? তুমি জানো ও কতটা ইনোসেন্ট….”
মেঘলা ফোনটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে চোখ মুছল,
“আমি কিছু জানি না… আমি সত্যি জানি না কী হয়ে যাচ্ছে এসব। তুমি কি জানো? মেহেরকে না… জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল?”
ওপাশে কোনো শব্দ এলো না। মাশফি স্তব্ধ।

“ও এই বিয়েতে বিন্দুমাত্র খুশি ছিল না। ও তো এই সংসারটা করতেই চায়নি” মেঘলার চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল। সে স্বামীকে নিজের সবটুকু কষ্ট উজার করে দিতে চাইল।
“মানে কী? মা তো বলল মেহের নিজে রাজি…! সবাই বলল ও খুশি ”
“মিথ্যে! সব মিথ্যে কথা” মেঘলার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, “মেহের রাজি ছিল না একেবারেই। ও তো অন…” হুট করেই মেঘলা নিজেকে থামিয়ে নিল আবেগের বসে সব কিছু এভাবে বলতে পারে না সে। তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। না। অন্তু আর মেহেরের সত্যটা মেহেরের নিজের মুখে মাশফিকে বলা উচিত। মেঘলা বাকি অংশটুকু যেন একপ্রকার গিলে নিল।
মাশফি ওপাশ থেকে তাড়া দিল, “অন? অন কী মেঘ? মেহুর সাথে কী হয়েছিল? তুমি কিছু লুকাচ্ছ আমার কাছে? আমাকে বলো।”
মেঘলা ঠোঁট কামড়ে চোখ মুছল।
“বলব… সব বলব। কিন্তু এখন না। তুমি শুধু দেশে আসো… প্লিজ… আমাদের এখান থেকে নিয়ে যাও। আমি আর এই বাড়িতে দম নিতে পারছি না।”
মাশফি ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার কণ্ঠস্বর একাধারে মেঘলার জন্য নরম এবং পরিস্থিতির জন্য ভীষণ শক্ত ও দৃঢ় শোনাল,

“রিল্যাক্স মেঘ, আমি আসছি। খুব দ্রুত টিকিট কেটে আমি দেশে পৌঁছাচ্ছি। এবার কেউ মেহুর গায়ে হাত দিতে পারবে না, আর তোমাকেও এই অশান্তির মধ্যে থাকতে দেব না। আমি তোমাদের দুজনকে এখান থেকে নিয়ে যাব। কিন্তু তার জন্য এই প্যান্ডেমিক আর মেহুর জেল থেকে বের হওয়াটা সবার আগে প্রয়োজন। আমি সব ব্যবস্থা করছি।”
মেঘলা যখন ওপাশে আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই লিভিং রুম থেকে একটা বিকট চিৎকারের আওয়াজ তার কানের পর্দা কাঁপিয়ে দিল। কাচের কিছু একটা ভেঙে পড়ার তীব্র শব্দ। মেঘলা চমকে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আম….আমি রাখছি”
সে আর কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে দিল। পরে মাশফিকে টেক্সট পাঠিয়ে সংক্ষেপে জানাল—‘পরে কথা বলব’।
ওদিকে যুক্তরাজ্যের নিজের ফ্ল্যাটে বসে মাশফি নিজের বোনের চিন্তায় অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল। তার বারবার মনে হতে লাগল, মেঘলা নিশ্চয়ই বড় কোনো সত্য লুকাচ্ছে। আর মেহেরও তো সেদিন তাকে বলেছিল। সে ভালো নেই। মাশফি সাধারণত সহজে রাগে না, সে বড্ড শান্ত স্বভাবের। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে বোনের এই চরম কষ্টের কথা ভেবে তার মাথার রগ ফুলে উঠল।
তীব্র রাগ আর ক্ষোভে সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। বিশেষ করে রুদ্রকে এই পুরো ঘটনায় কোথাও না দেখে, তার সম্পর্কে কোনো কিছু না শুনে রুদ্রর প্রতি তার মনে এক চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম নিল। মাশফি ডেস্কে একটা জোরে ঘুষি মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “হি ইজ আ বাস্টার্ড! আমার বোনের সাথে এত বড় অন্যায় ও কীভাবে হতে দিল? কেমন স্বামী ও? আমি মেহুকে ওর হাত থেকে বের করে আনবই। ”

লিভিং এরিয়াতে পা রাখতেই মেঘলার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
সে দেখতে পেল, সায়েদ ইমরান সাহেব উন্মাদ বাঘের মতো চিল্লিয়ে কাঁপছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সায়েদ কামিনী এবং সায়েদ মির্জা। মধ্যরাতের এই হট্টগোলে পরিবারের বাকি সদস্যরাও ঘরের কোণে এসে ভয়ে জবুথবু হয়ে জড়ো হয়েছে। সবার চোখেমুখে চরম অস্বস্তি।
সায়েদ ইমরান নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সায়েদ কামিনীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরলেন,
“সব তোমার জন্য হয়েছে কামিনী! সব তোমার এই নোংরা জেদ আর অহংকারের জন্য হয়েছে। আজ আমার নিজের মেয়েটা… আমার মেহু… আদালতে দাঁড়িয়ে আমার সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলল না! তোমার ওই টাকার লোভ, বড় ঘরের ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার লোভ তোমাকে এত অন্ধ করে দিয়েছে যে আজ তোমার নিজের মেয়ে তোমাকে তো চিনতেই পারছে না, সাথে আমাকেও চেনে না। আমরা ওর বাবা-মা, অথচ আমাদের ও ঘৃণার চোখে দেখল।”
সায়েদ কামিনী হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, কিন্তু ভেতরের একটা সূক্ষ্ম কাঁপন তিনি লুকাতে পারছিলেন না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টায় তিনি গলা উঁচিয়ে বললেন,
“তুমি সব দোষ আমার ওপর চাপাচ্ছ ইমরান? আমি কি ডাইনি? মা হয়ে যা করেছি, নিজের মেয়ের ভালোর জন্যই করেছি।একজন মা কোনোদিন সন্তানের খারাপ চায় না। আমি যদি ওই ছোটলোকের হাত থেকে ওকে বাঁচিয়ে এই রাজপ্রাসাদে না দিতাম, তবে কি আজ ও এই সম্মানের জায়গায় পৌঁছাত? ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না… বংশ আর অবস্থান লাগে। আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমি শুধু মেহেরের ভালো চেয়েছি।”

মায়ের এই আত্মপক্ষ সমর্থন দেখে পাশ থেকে মির্জা তক্ষুনি মায়ের পক্ষে কথা বলে উঠল। মির্জা বরাবরই তার মায়ের কথার পুতুল, মায়ের অন্ধ অনুসারী। নিজের কোনো সিদ্ধান্ত বা মেরুদণ্ড তার নেই। সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে মায়ের সুর মিলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বাবা! মা তো ভুল কিছু বলেনি। মা যা করেছে মেহেরের ভালোর জন্যই করেছে। এখানে মায়ের দোষ কোথায়?”
কিন্তু সায়েদ ইমরান এবার আর দমে গেলেন না। তিনি নিজের বুক চাপড়ে কেঁদে উঠলেন। তাঁর কণ্ঠ অপরাধবোধে ভারী হয়ে গেছে,
“আমি বাবা হয়েও মেয়েটার পাশে দাঁড়াইনি… সবচেয়ে বড় ভুল করেছি সেদিন, যখন আমি চুপ ছিলাম! আমার মেয়েটা ওখানে জেলের ওসব নোংরা কয়েদিদের মাঝে কী করছে এখন, তোমরা জানো? আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার বুকে বিষ ঢেলে দিচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে আমার, আমি কত বড় ভুল করে ফেলেছি তোমাদের মা-ছেলের কথায় অন্ধ হয়ে।আমার কলিজার টুকরা মেয়েটা…”
বলতে বলতে সায়েদ ইমরান আর নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি নিস্তেজ হয়ে ধপাস করে পাশের সোফাটার ওপর ঢলে পড়লেন। তাঁর চোখ দুটো উল্টে আসছিল।
ইমরান সাহেবের এই অবস্থা দেখে মেঘলা আর মেঘলার বাবা দৌড়ে আসলেন।মেঘলার বাবা ভাইয়ের হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগলেন,

“ বড় ভাইজান। কথা বলুন,কী হয়েছে আপনার?”
মেঘলা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। সে ইমরান সাহেবের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কেঁদে ফেলে বলল,
“বড় বাবা, বড় বাবা ও বড় বাবা… চোখ খুলুন।বড় মা, তোমরা দয়া করে পরে ঝগড়া কোরো, এখন বড় বাবাকে তোলো প্লিজ।”
সায়েদ কামিনী এই পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিজের ছেলে মির্জার দিকে চোখের ইশারা করলেন। মায়ের সেই ইশারা পেতেই মির্জা কোনো কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে এলো এবং সায়েদ ইমরানকে ধরে লিভিং রুম থেকে নিয়ে গিয়ে বেডে শুইয়ে দিল।
মেঘলা এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে টেবিল থেকে ব্লাড প্রেসার মাপার মেশিনটা নিয়ে দৌড়ে ঘরে ঢুকল। সে ইমরান সাহেবের হাতে কাফটা বেঁধে প্রেশার মাপতে লাগল। ডিজিটাল স্ক্রিনে রিডিং ভেসে উঠতেই মেঘলার চোখ স্থির হয়ে গেল। সায়েদ ইমরানের ব্লাড প্রেসার ভয়ঙ্কর রকমের হাই।
মেঘলা প্রেশার মেপে ইমরান সাহেবের ফ্যাকাশে, নিস্তেজ মুখের দিকে তাকাল। তার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। সে মনে মনে বলল,

“এখন বুঝলে বড় বাবা? যদি এই সত্যিটা আরও আগে বুঝতে, তবে আজ মেহেরের জীবনে এত বড় ঝড় আসত না। তুমিও তো বড় মার সাথে সমান অপরাধে অপরাধী ছিলে।”
ঠিক তখনই সায়েদ কামিনীকে রুমে ঢুকতে দেখে মেঘলার ভেতরের সমস্ত ভয় এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সায়েদ কামিনীর প্রতি তার মনে আজ আর আগের মতো কোনো ভয় বা সমীহ কাজ করল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সায়েদ কামিনীর চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো কাঁপন ছিল না এবার।
সে অত্যন্ত শান্ত, ধীর গলায় বলল, “সময় চলে এসেছে বড় মা। মানুষ একদিন না একদিন নিজের পাপের নিচেই চাপা পড়ে মরে।”
সায়েদ কামিনী মেঘলার মুখে এত বড় বড় কথা আর ভয়ঙ্কর হুমকি শুনে রাগে গেলেন।তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“এই মেয়ে,তুই মুখে মুখে তর্ক করছিস আমার সাথে? তোর খুব কথা বলতে শেখা হয়ে গেছে, না?”
বলতে বলতেই সায়েদ কামিনী হিংস্র বাঘিনীর মতো এগিয়ে এসে এক হাত দিয়ে মেঘলার বাহু জোরে চেপে ধরলেন এবং অন্য হাত দিয়ে তার চুল মুচড়ে ধরলেন।
চুলে তীব্র টান লাগতেই মেঘলা ব্যথাতুর স্বরে শব্দ করে উঠল… কিন্তু মাথা নোয়াল না।সে সায়েদ কামিনীর চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত দৃঢ়তায় হাসল।
মেঘলা তীক্ষ্ণ কিন্তু ঠান্ডা কণ্ঠে বলে উঠল,
“শক্তি খাটাচ্ছেন? খাটান বড় মা। সময় ঘনিয়ে এসেছে। আপনার পাপের খাতা এবার উল্টানোর পালা, কী ভেবেছেন আপনি? সেদিন মেহেরের গর্ভের বাচ্চাকে যে আপনি মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, আমি কিচ্ছু জানি না ভেবেছেন?”

মেঘলার মুখ থেকে এই ‘বাচ্চা মেরে ফেলার’ কথা শুনতেই সায়েদ কামিনীর মুখের সমস্ত রঙ এক নিমেষে উবে গেল। তাঁর চোখে এক ঝলক তীব্র আতঙ্ক ফুটে উঠল। তিনি তোতলে উঠলেন, তাঁর হাত দুটো নিস্তেজ হয়ে মেঘলার বাহু আর চুল ধরা আলগা হয়ে গেল। তিনি এক পা পিছিয়ে গেলেন।
মেঘলা নিজের জটলা পাকানো চুলগুলো ঠিক করে নিয়ে বলল, “আজ কোর্টে শুনলাম মেহের নাকি আবারও প্রেগন্যান্ট।আপনি তো ভেবেছিলেন সেদিন ঔষধ খাইয়ে সব শেষ করে দিয়েছেন, তাই না? জেনো রাখুন বড় মা, যদি কোনোভাবে মেহেরের গর্ভের এই বাচ্চাটা ওই অন্তুর বাচ্চা হয়ে থাকে এবং ও জীবিত থাকে, তবে আপনি নিজের কবর নিজে খুঁড়ে নিয়েন।”
সায়েদ কামিনী তীব্র আতঙ্কে কেশে উঠলেন। তাঁর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। হ্যাঁ, সত্যি তো… আজ কোর্টে তো উকিল স্পষ্ট বলল যে মেহের প্রেগন্যান্ট! এত এত ঝামেলা আর পুলিশের দৌড়ঝাঁপের মাঝে সায়েদ কামিনীর মাথায় এই বিষয়টা একেবারেই আসেনি। তিনি চরম অস্থিরতায় মেঘলাকে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলেন।
কামিনী বেগম নিজের মনেই বিড়বিড় করে পাগলের মতো বলতে লাগলেন,

“না! এরকম হতেই পারে না। আমি নিজের হাতে ওদিন ওকে ওই অ্যাবরশনের মেডিসিন খাইয়েছি।জোর করে ওর মুখে ওষুধটা ঢেলে দিয়েছিলাম। ওই নর্দমার ছোটলোক অন্তুর বাচ্চা এই পৃথিবীতে আসবে? না, না… আমি হয়তো বেশি ভাবছি। এটা রুদ্রর বাচ্চাও তো হতে পারে।”
মেঘলা সায়েদ কামিনীর এই ছটফটানি দেখে কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তার দিকে এক অদ্ভুত অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল।
তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “দোয়া করুন বড় মা… আপনি এখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন এমন কিছু না। মেহের যদি একবার এই নরক থেকে ফিরে আসতে পারে না, তবে ও আপনাদের কাউকেই রক্ষা করবে না। হয়তো পরিস্থিতির চাপে পড়ে এতদিন ও শান্ত ছিল, আপনাদের সাথে কিছু করেনি।
কিন্তু আপনিই তো সবসময় বলতেন—মেহের বাইরে থেকে যতোই নরম হোক না কেন, মানসিকভাবে ও সায়েদ বাড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী মেয়ে। ওর দিকে কেউ হাত বাড়ালে ও সেই হাত কেটে ফেলতে পারে। দোয়া করুন বড় মা, মেহেরের ব্যাপারে আপনার ওই পুরনো কথাটাই যেন সত্যি না হয়ে দাঁড়ায়। মেঘলা… কথা বলে হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দেখতে দেখতে আরও তিনটি সপ্তাহ কেটে গেল। আদালতের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, ঠিক দুই সপ্তাহ পরেই মেহেরকে আবারও এজলাসে তোলার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চলমান কোভিডের ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং ঠিক একই সময়ে কোরবানির ঈদ চলে আসার কারণে আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হয়। ফলস্বরূপ, মূল মামলার শুনানির তারিখ আরও এক সপ্তাহ পিছিয়ে যায়।
জীবনের দীর্ঘ ২১টি দিন মেহেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই চার দেয়ালের অন্ধকূপেই কাটাতে হলো। এই সময়ে মেহেরের জীবনের ওপর দিয়ে সবচেয়ে বড় যে মানসিক আঘাতটি গেছে, তা হলো ঈদ। জীবনের প্রথমবার পরিবারের কোনো সদস্য ছাড়া, আপনজনদের একটুখানি স্পর্শ ছাড়া সম্পূর্ণ একা, এই বন্দিশালার নিঃসঙ্গ কক্ষে বসে তাকে পবিত্র কোরবানির ঈদ কাটাতে হয়েছে।

ঈদের আগের দিন, অর্থাৎ আরাফাতের পবিত্র দিনে মেহের রোজা রেখেছিল। সে আর কাঁদতে পারছিল না, তার ভেতরের কান্নাগুলো যেন পাথর হয়ে বুকের ভেতর জমে গিয়েছিল। এতদিনের মানসিক ঝড়, সামাজিক অপবাদ আর একাকীত্বের তীব্র যন্ত্রণায় মেহেরের চোখের জল যেন এখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সেজদায় গিয়ে সে নিথর হয়ে পড়ে রইল। শুধু তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে নিজের গর্ভের অনাগত সন্তানের সুরক্ষার জন্য সে প্রার্থনা করেছে। নিজের এই নির্মম ভাগ্যকে সে অনেক আগেই আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছে।
এরই মাঝে ঈদের দিন সায়েদ কামিনী আর সায়েদ ইমরান এসেছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মেহেরের সাথে দেখা করতে। কিন্তু মেহেরের ভেতরের সেই তীব্র বিতৃষ্ণা, জেদ আর ঘৃণা এতটাই প্রকট ছিল যে সে কারাকর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে দেয়….

সে এই দুই জনের সাথে কোনো অবস্থাতেই দেখা করবে না। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের সেই জোর করে অ্যাবরশন পিল খাওয়ানোর নির্মম চেষ্টা আর বাবার কাপুরুষোচিত নীরবতা মেহের আজো ভুলতে পারেনি। অগত্যা মেহেরের মুখ না দেখেই, এক বুক চরম অপমান, হতাশা নিয়ে সায়েদ কামিনী ও সায়েদ ইমরানকে কারাগারের ফটক থেকে ফিরে যেতে হয়েছিল।
তবে ঈদের দিন বিকেলে হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁরা মেহেরের শারীরিক খোঁজখবর নেন, খুব শীঘ্রই সমস্ত আইনি লড়াই শেষ করে তাকে এই নরক থেকে মুক্ত করার দৃঢ় আশ্বাস দিয়ে যান হামজা চৌধুরি ।
এই দীর্ঘ ২১ দিনে মেহেরের মনে একটা তীব্র ভয় অনবরত কাজ করছিল—যদি আদালতের মেডিকেল রিপোর্টে বা অন্য কোনোভাবে সবাই জেনে যায় যে সে চার মাসের প্রেগন্যান্ট, তখন কী হবে? তবে মেহের মনে মনে নিজেকে শক্ত করল। সে নিজেকে বোঝাল—সে আর কোনো মিথ্যার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখবে না। যদি সবাই জেনেও যায়, তবে সে সত্যটা সবাইকে জানিয়ে দেবে।
অবশেষে আজ সেই প্রতীক্ষিত দিন। মামলার চূড়ান্ত শুনানির জন্য মেহেরকে আবারও কড়া পুলিশি পাহারায় আদালতে নিয়ে যাওয়া হলো।
এজলাসে বিচারক এসে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নিজের আসন গ্রহণ করলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মেহেরের ফ্যাকাশে, নিস্পৃহ মুখের দিকে তাকিয়ে বিচারক প্রথমে পরিবেশটা কিছুটা স্বাভাবিক করতে চাইলেন। তিনি অত্যন্ত নরম ও দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “সাওয়াজ সায়েদ মেহের… আপনি কেমন আছেন?”

মেহের পাথরের মতো নিস্পৃহ ও শীতল গলায় জবাব দিল, “ভালো।”
বিচারক তার মুখের এক্সপ্রেশন খেয়াল করে আবার প্রশ্ন করলেন, “আপনার শারীরিক অবস্থা এখন কেমন? আদালতের শুনানির মুখোমুখি হওয়ার মতো মেন্টাল ও ফিজিক্যাল কন্ডিশন কি আপনার আছে?”
মেহের চোখের পলক না ফেলে একদম সোজা তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “আমার শারীরিক অবস্থা এখন ভালো।”
বিচারক এবার টেবিলের ওপর থাকা নথিপত্র থেকে চোখ তুলে সরাসরি মেহেরের দিকে তাকালেন,
“মিসেস চৌধুরী, মামলার নথিতে আপনার পারিবারিক ও বৈবাহিক জীবনের কিছু তথ্য আমাদের প্রয়োজন। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থেই আমার জানা প্রয়োজন আপনার স্বামীর সাথে আপনার সম্পর্ক কি স্বাভাবিক ছিল? আপনি কি আপনার বৈবাহিক জীবনে সন্তুষ্ট ছিলেন?”
প্রশ্নটা শোনা মাত্রই মেহেরের মনে পড়ে গেল, হামজা চৌধুরীর দেওয়া সতর্কবার্তা। হামজা চৌধুরী তাকে আলাদা করে আড়ালে ডেকে বলে দিয়েছিলেন—

‘মা, আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারক তোমাকে যা-ই জিজ্ঞেস করুক না কেন, বড্ড ভেবেচিন্তে আদেশ মেনে ঠান্ডা রেখে উত্তর দেবে। মনে রেখো, ওখানে তোমার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা কথা কিন্তু রেকর্ড হচ্ছে।’
মেহের বিচারকের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এক শব্দের উত্তর দিল, “জি…।”
বিচারক তখন নথির একটা পাতা উল্টে চশমাটা ঠিক করে বললেন,
“তাহলে মিসেস চৌধুরী, এই মামলার পারিপার্শ্বিক প্রমাণ অনুযায়ী আপনাকে এই হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন ধরা হচ্ছে। আপনি যদি খুন না-ই করে থাকেন, তাহলে কেন ওইদিন ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত কাঁটাচামচটা ধরে ওভাবে টান দিলেন? এর কারণ কী ছিল?”
আদালতের সেই থমথমে গুমোট পরিবেশে মেহেরের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল। অতীতের সেই রক্তমাখা ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে বলল,

“আমি… আমি রিনি আপুর ছটফটানি দেখে কষ্ট হচ্ছে ভেবে ওটা গলা থেকে বের করে ফেলেছিলাম। আমি তখন আসলে ভাবিনি এত কিছু।” কথা বলতে বলতে মেহেরের পুরো শরীরটা এক অজানা আতঙ্কে শিউরে কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী চতুর এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বিচারককে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ইউর অনার, আসামির এই মনগড়া গল্পে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পেনাল কোডের ৩০০ ধারা অনুযায়ী এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমি এই ঘটনার একজন চাক্ষুষ সরকারি প্রমাণ এনেছি। আই প্রে টু দ্য কোর্ট—এই মামলার প্রধান তদন্তকারী পুলিশ অফিসার তাবিশকে সাক্ষী দেওয়ার জন্য কাঠগড়ায় ডাকা হোক।”
বিচারক মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন,
“ পারমিশন গ্র্যান্টেড।”
পুলিশ অফিসার তাবিশ অত্যন্ত গম্ভীর ও দৃঢ় মুখে এসে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “অফিসার তাবিশ… সেদিনের ঘটনার ঠিক পরপরই আপনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন, তখন নিজের চোখে ঠিক কী দেখতে পেয়েছিলেন? আদালতকে বিস্তারিত বলুন।”

তাবিশ আদালতের সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সোজা গলায় বলে উঠল, “আমি যখন ১০৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ফোর্স নিয়ে ঢুকলাম, তখন দেখলাম মিসেস চৌধুরীর হাতে একটা স্টিলের ফর্ক। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় ভিকটিম রিমি শেখের গলা থেকে ওটা টেনে বের করছেন।”
তাবিশের এই বিস্ফোরক ও সরাসরি বয়ান শোনামাত্রই পুরো কোর্টরুমে উপস্থিত সাধারণ মানুষ, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের মাঝে এক তীব্র ফিসফিসানি আর হইচই শুরু হয়ে গেল। সবাই মেহেরের দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আঙুল তুলতে লাগল।
বিচারক অসন্তুষ্ট হয়ে হাতুড়ি পিটিয়ে কড়া গলায় বললেন,

“সাইলেন্স! সাইলেন্স প্লিজ!” এজলাস সম্পূর্ণ শান্ত হলে তিনি তাবিশকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “অফিসার তাবিশ, আপনি কি সেখানে আর কিছু বা অন্য কাউকে দেখেছিলেন?”
তাবিশ মাথা নেড়ে বলল, “নো ইউর অনার। আমি ঠিক এতটুকুই দেখেছি।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবার ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললেন,
“কিন্তু ইউর অনার, অফিসার তাবিশ একা নন, ওইদিন রিমি শেখের নিজের দুই নিষ্পাপ সন্তান এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিজের চোখে দেখেছে। তার সন্তান তামিম এবং তিন্নি স্বচক্ষে মিসেস চৌধুরীকে তাদের মাকে হত্যা করতে দেখেছে। ইউর অনার, আমি রিনি শেখের ছেলে-মেয়েকে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করার অনুমতি চাচ্ছি।”

ভিজিটর গ্যালারিতে বসা হামজা চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, হাড়ের রগগুলো রাগে আর ক্ষোভে ফুলে উঠল। তাঁর মনে হচ্ছিল যদি সম্ভব হতো, তবে এই আদালতেই তিনি অফিসার তাবিশ এবং এই আইনজীবীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতেন। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে তিনি আজ বড্ড অসহায়।
বিচারকের আদেশে —তিন্নি আর তামিমকে আদালতের ভেতরে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা তামিম… ভয় পেয়ো না। তুমি সেইদিন ঘরের ভেতর কী দেখেছিলেন, আঙ্কেলকে একটু বলো তো?”
আইনজীবীর এই প্রশ্নটা শোনামাত্রই তামিম আর তিন্নি দুজন আতঙ্কে নিজেদের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। তাদের অবুঝ ও নিষ্পাপ মনে এক নিমেষে নিজেদের মায়ের নিথর, নিস্তেজ ও রক্তাক্ত দেহের সেই বীভৎস স্মৃতিটা মনে পড়ে গেল।

তামিম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিন্নির হাত শক্ত করে ধরে ভাঙা গলায় বলল, “আমি… আমি তখন জাস্ট ঘুম থেকে উঠেছিলাম আঙ্কেল। রুম থেকে বের হয়ে দেখলাম মাম্মা শুয়ে আছে ফ্লোরে, চারদিকে রক্ত… এবং মেহের আন্টি সেখানে দাঁড়িয়ে মাম্মার গলা থেকে ফর্কটা বের করার ট্রাই করছে।”
পুরো কোর্টরুমে যেন এক নিশ্চিত অপরাধীর রায় পাওয়ার মতো এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিজয়ী হাসিতে ফুটিয়ে জজের দিকে তাকালেন।
কিন্তু মেহেরের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যারিস্টার শাকিল হোসেন এবার বাঘের মতো গর্জে উঠলেন। তিনি অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে, পূর্ণ প্রফেশনালিজমের সাথে তামিম আর তিন্নীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজের সমস্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও কোমল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“তামিম, তিন্নী… তোমরা কি কিংবা এই ঘরে থাকা আর কেউ কোনোদিন নিজের চোখে মেহের আন্টিকে ওই ফর্কটা তোমাদের মায়ের গলার মাঝে ঢুকিয়ে দিতে দেখেছ? খুন করার সেই আসল মুহূর্তটা কি তোমরা কেউ দেখেছ?”

বাচ্চা দুটো কিছুক্ষণ বোকার মতো একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর ভয় জড়ানো মুখে মাথা নাড়িয়ে একযোগে পরিষ্কার ভাষায় না করল।
ব্যারিস্টার শাকিল হোসেন এবার এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে কড়া চোখে পুলিশ অফিসারের দিকে তাকালেন,
“ইন্সপেক্টর তাবিশ! আপনি এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দিন—আপনি কি মিসেস চৌধুরীকে নিজ হাতে ওই ফর্ক ভিকটিমের গলায় গেঁথে দিতে দেখেছেন?”
তাবিশ আদালতের এই চাপের মুখে অস্বস্তি নিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে মাথা নেড়ে না করল।
মেহেরের উকিল এবার অত্যন্ত নাটকীয় ও পেশাদার ভঙ্গিতে বিচারকের টেবিলের সামনে গিয়ে নথিপত্র উঁচিয়ে ধরে উচ্চকণ্ঠে বললেন,
“ইউর অনার,সার্কামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণের নামে স্রেফ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একজন সম্মানিত এবং গর্ভবতী নারীর ওপর এই জঘন্য মিথ্যা মামলা চাপানো হয়েছে। মেডিকেল গ্রাউন্ড এবং হিউম্যানিটারিয়ান গ্রাউন্ডে আমি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি
—আমার মক্কেল মেহের চৌধুরী বর্তমানে আড়াই মাসের প্রেগন্যান্ট এই শারীরিক অবস্থায় একজন নারীর পক্ষে এমন নৃশংস খুন করা চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ীও অসম্ভব।”

আইনজীবীর মুখ থেকে এই ‘আড়াই মাসের প্রেগন্যান্ট’ শব্দটা শোনামাত্রই মেহেরে চরম বিস্ময় আর তীব্র ধাক্কা খেয়ে ঘুরে তার নিজের উকিলের দিকে তাকাল। মেহেরের মাথায় যেন একের পর এক বজ্রপাত হতে লাগল। কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই মেহেরের বুকের ভেতর থমকে যাওয়া হৃৎস্পন্দনটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। তার অবশ হয়ে আসা আঙুলগুলোর ডগা আলগা হলো। সে একটা দীর্ঘ, তপ্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার অবরুদ্ধ বুকের ভেতর থেকে এক অদৃশ্য পাথরের ভার যেন নেমে গেল।
সে মনে মনে ভাবল, “৪ মাস… আমি তো চার মাসের প্রেগন্যান্ট । যদি আজ এই ভরা আদালতে চার মাসের কথাটা প্রকাশ পেয়ে যেত, তবে এই সমাজ, আমাকে এভাবে ছেড়ে দিত? সায়েদ কামিনী আর এই পৃথিবীর মানুষগুলো কি তক্ষুনি হিসাব কষতে বসে যেত না যে—রুদ্রর সাথে বিয়ের ঠিক কতদিন আগে আমি মা হতে চলেছিলাম?

“তাহলে ক্যাপ্টেন সাহেব কী…? ক্যাপ্টেন সাহেব কি কিছু করেছেন? মেহেরের বুকের ঠিক মাঝখানটায় একটা তীব্র, ধারালো মোচড় দিয়ে উঠল। এক অজানা অস্বস্তি আর অভিমান এসে তার পুরো অস্তিত্বকে গ্রাস করতে চাইল। মেহের তার চোখ দুটো চারদিকে ঘোরাল। ভিজিটর গ্যালারি, আইনজীবীদের সারি, আদালতের পেছনের দরজা— প্রতিটা কোণ সে খুব নিখুঁতভাবে চাতক পাখির মতো খুঁজল।
কিন্তু কোথাও রুদ্র নেই। একটা বারের জন্যও ক্যাপ্টেন রুদ্ররের সেই চওড়া পিঠ, সেই গম্ভীর ও চেনা অবয়ব মেহেরের চোখে পড়ল না। সে তাকে একবারের জন্যও দেখতে পেল না।
মেহের যখন নিজের ভেতরের এই তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে আর ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, ঠিক তখনই এজলাসে তার উকিলের ধারালো কণ্ঠস্বর আবার প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। তিনি তামিমের দিকে তাকিয়ে জেরা করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “তিন্নি , তামিম… তোমাদের বাবা কোথায়? তোমাদের বাবা তুষার শেখ সেদিন ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন?”

তামিম তার ছোট ছোট চোখ দুটো তুলে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “পাপা তো দেশে থাকেন না আঙ্কেল… সেদিন তখন উনি ইউকে তে ছিলেন।”
মেহেরের উকিল তক্ষুনি বিচারকের দিকে ঘুরে চড়া গলায় বললেন, “ইউর অনার, এখানে নোটেবল পয়েন্ট হলো
—ভিকটিম রিনি শেখের মৃত্যুর পর থেকে এই দুটো বাচ্চা তাদের নিজস্ব কোনো অভিভাবক ছাড়া সম্পূর্ণ একা। তারা বর্তমানে তাদের নানা-নানির কাছে আশ্রয় নিয়েছে এবং ওনাদের কাছেই থাকছে। অর্থাৎ তাদের ওপর এক প্রকার মানসিক চাপ সৃষ্টি করে জবানবন্দি নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।”
মাননীয় জজ সাহেব তখন তামিমের দিকে ঝুঁকে নরম গলায় প্রশ্ন করলেন, “তামিম… তোমার বাবা তুষার শেখ কি দেশে আসবেন?”
তামিম মাথা নেড়ে বলল, “জি আঙ্কেল, বাবা নেক্সট উইকে দেশে আসবেন।”
এই মোক্ষম সুযোগে মেহেরের উকিল তাঁর চালটি চাললেন। তিনি নিজের চশমাটা ঠিক করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং পেশাদার ভঙ্গিতে জজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর প্রতিটি শব্দে খেলা করছিল সূক্ষ্ম ও অকাট্য আইনি যুক্তি।
তিনি বললেন,

“মাই লর্ড! তদন্তকারী দল দাবি করছে যে তারা ঘটনাস্থলে পাওয়া জিনিসপত্রে আমার মক্কেল মেহেরের হাতের ছাপ পেয়েছে। হ্যাঁ, আমরা হাতের ছাপ পেয়েছি মেহেরের, সেটা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু ফরেনসিক ব্যালেস্টিক রিপোর্ট বলছে—সেদিন ওই অ্যাপার্টমেন্টে মোট ৩টি গুলি করা হয়েছিল! এখন আমার প্রশ্ন হলো, ওই ৩টি গুলি কার লাইসেন্সকৃত বা আনলাইসেন্সড বন্দুক থেকে বের হয়েছিল? সেই বন্দুকের ব্যালেস্টিক ম্যাচিং কার সাথে হয়েছে? সেই রহস্য কিন্তু পুলিশ আজ পর্যন্ত আদালতের সামনে সাবমিট করতে পারেনি, মাই লর্ড।”
কোর্টে উপস্থিত সবার মাঝে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ও ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। উকিল শাকিল হোসেন থামলেন না, তিনি আরও ধারালো গলায় বলতে লাগলেন, “

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—মিসেস চৌধুরীর কাছ থেকে বা ওই পুরো অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি… যে বহুতল ভবনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেখান থেকে ঘটনার ঠিক ওই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজও সম্পূর্ণ ডিলিট করা হয়েছে।
ইউর অনার, আমার মক্কেলকে পুলিশে সোপর্দ করার জন্য যখন জরুরি কল দেওয়া হয়, তার ঠিক ১০ মিনিটের ভেতর পুরো ভবনের মেন সার্ভার থেকে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে দেওয়া হয়। আমার মক্কেলের মতো একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর পক্ষে, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০ মিনিটে এত বড় একটা ভবনের হাই-সিকিউরিটি আইটি সিস্টেম হ্যাক করা বা সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়! এর পেছনে অন্য কোনো ক্ষমতাশালী ও পেশাদার অপরাধীর হাত আছে। পুরো মামলাটি বড্ড সাজানো এবং দুর্বল।”

মেহেরের উকিলের এই অকাট্য যুক্তির সামনে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সম্পূর্ণ নিরুত্তর ও ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। পুরো কোর্টরুম তখন পিনপতন নীরবতায় ডুবে গেছে।
বিচারক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উকিলের যুক্তিগুলো শুনলেন এবং নিজের ডায়েরিতে তা টুকে নিলেন। তিনি গম্ভীর গলায় হাতুড়ি তুলে তাঁর চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করলেন:

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৭

“এই আদালতের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে আগামী শুনানির আগে ওই ভবনের নিখোঁজ সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের জন্য সিআইডি এবং সাইবার ক্রাইম বিভাগকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। সেই সাথে ভিকটিম রিনি শেখের বিগত তিন মাসের কল ডিটেইলস রেকর্ড এবং তাঁর কর্মক্ষেত্রের সমস্ত তথ্য ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে আদালতে জমা দিতে হবে। পরবর্তী নির্দেশ ও তুষার শেখের সশরীরে উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আজকের মতো আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হলো। ”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৯