Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮ (২)
মারিয়াম ফুল

“কী হলো? মুখে মিসাইল পড়েছে নাকি?”
“জি! আপনি যদি ইসরাইল হন, আমি না হয় ইরান হয়ে আপনার ওপর মিসাইল ফেলব….”
রুদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আর আমি বুঝি চুপচাপ বসে বসে দেখব?”
মেহের এই ফালতু তর্কে আর মাথা ঘামাল না। মূল কথায় এসে বলল,
“আমাকে একটু সঙ্গে নিয়ে যাবেন?”
“কোথায়?” রুদ্র ভান করা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল।
“হুহ! ওই যে বললেন, বউ খুঁজতে যাচ্ছেন ”
রুদ্র মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ, তোমার সতীন আনতে যাচ্ছি। যাবে?”

মেহের বিরক্ত গলায় বলল,”সবসময় আপনার এই ইয়ার্কি ভালো লাগে না। প্লিজ, নিয়ে যান না…..”
দরজার নব ধরে রুদ্র ঘুরে দাঁড়াল।পকেটে দুই হাত গুঁজে, একটা ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে মেহেরকে আপাদমস্তক দেখে নিল রুদ্র। তার এই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার মধ্যে এমন একটা গভীরতা ছিল, যা মেহেরকে মুহূর্তে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে অস্বস্তি লুকাতেই যেন চোখ জোড়া নামিয়ে নিল।
“আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি, তবে অবশ্যই তার বদলে আমি কিছু চাইব…” রুদ্র একটু ঝুঁকে মেহেরের একদম কাছাকাছি চলে এলো। তার গলার স্বর হঠাৎ করেই কেমন যেন ভারী শুনালো।
মেহেরের বুকের ভেতরটা আচমকা ধক করে উঠল। মেহের কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল, “কী… কী চান?”
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল, সে প্রায় ফিসফিস করে বলল….
“শর্তটা আজ তোলা থাক, কথা দাও তবে—
যেদিন আমি হাত বাড়াব, ফিরিয়ে না দেওয়া হবে।”
মেহের কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটু সামলে নিয়ে, নিজের ভেতরের জড়তা কাটাতে সে হালকা হেসে বলল, “বাব্বা! কবি হয়েছেন দেখছি। আপনার মধ্যে তো দারুণ প্রতিভা….”

“হুম, খুব!”
রুদ্র সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে কপালের চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিল। তারপর বলে উঠলো “জিজ্ঞেস করলে না তো কি শর্ত —পরে যদি শর্ত মানতে অস্বীকার করো তো ?”
মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার নিজের জীবনের সমীকরণগুলো এমনিতেও এত জটিল যে, নতুন কোনো শর্ত তাকে আর ভয় দেখায় না। সে মেঝেতে দৃষ্টি রেখে নিচু স্বরে বলল, “না মানার কিছু নেই। আমার সাধ্যে থাকলে ফিরিয়ে দেব না…”
” ওকে ইউ হ্যাভ অনলি টু মিনিটস। এর মধ্যে যদি রেডি হতে পারো তবে নেব, আর না পারলে…”
রুদ্রকে কথা শেষ করার সুযোগই দিল না মেহের। সে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল। আলমারি ঘেঁটে ম্যাচিং করে জামাকাপড় বদলানোর মতো সময় বা মানসিকতা—কোনোটাই এখন তার নেই। বিছানার ওপর একটা কালো রঙের কাশ্মীরি শাল রাখা ছিল, সে দ্রুত শালটা তার শরীরের ওপর জড়িয়ে নিল।
ঘরের ভেতর এসি চলার কারণে শালটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে ছিল, ত্বকে লাগতেই মেহেরের একটু কাঁপুনি ধরল। সাদা রঙের সুতির কুর্তির ওপর কালো শালটা বেশ মানিয়েছে। কোনো মেকআপ কিংবা বাড়তি কোনো প্রসাধনী এমনিতেই সে ব্যবহার করে না। তার উপর হাতের সময়ও কম, সে একবার আয়না- ও দেখলো না তবুও ফ্যাকাশে মুখে এক ধরণের স্নিগ্ধ শান্ত ভাব ফুটে উঠল তার।
ঠিক এক মিনিটের মাথায় মেহের হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। রুদ্র ততক্ষণে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে স্টার্ট দিয়েছে। মেহের এসে পাশের সিটটায় বসল। রুদ্র একবারও মেহেরের দিকে তাকাল না, স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনের দিকে চেয়ে রইল—

যেন খুবই সাধারণ একটা নিত্যদিনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে।
নভেম্বরের প্রথম দিক। ঢাকা শহরে সবেমাত্র হালকা ঠাণ্ডার আমেজ পড়তে শুরু করেছে। জানালার কাচ গলে বিকেলের মিষ্টি হিমেল বাতাস ভেতরে আসছিল। লকডাউন সবেমাত্র শিথিল হয়েছে, তাই রাস্তায় কিছু মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, তবে সংখ্যায় তা খুবই কম। মানুষের অবয়বে, হাঁটাচলায় করোনা মহামারীর আতঙ্কটা এখনো স্পষ্ট।
যে ঢাকা শহর মানেই তীব্র জ্যাম, গাড়ির হর্ন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকা, অথচ
আজ কোনো জ্যাম নেই। রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা, নিঝুম। কিছুক্ষণ পরপর দু-একটি সিএনজি বা রিকশা চাকার শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে, ব্যস ওইটুকুই।
কিছুক্ষণ চলার পর রুদ্রর গাড়িটি মেইন রোড ছেড়ে একটা বেশ সরু গলির রাস্তায় ঢুকে পড়ল। দুপাশের পুরনো দালান আর ছায়াঘেরা পরিবেশটা মেইন রোডের চেয়ে একদম আলাদা, কেমন যেন থমথমে। মেহের চারপাশটা দেখে কিছুটা সন্দিহান হয়ে উঠল। সে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আমরা কোথায় যাচ্ছি ক্যাপ্টেন সাহেব?”

রুদ্র যেন গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে আছে, তার এক হাত স্টিয়ারিংয়ে আর অন্য হাতটা গিয়ারে। সে মেহেরের কথা শুনতেই পেল না বা শোনার প্রয়োজন বোধ করল না। মেহের আগের থেকে আরেকটু জোরে সামান্য গলাখাঁকারি দিয়ে আবার প্রশ্ন করল , “ক্যাপ্টেন সাহেব, আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
“ক্লাবে যাচ্ছি।”
শুনে মেহের থমকে গেল। এমনভাবে তাকাল, যেন কথাগুলো ঠিকমতো বিশ্বাসই করতে পারছে না।
“ক্লাবে? কিসের ক্লাবে? ছেলেমেয়েরা যেখানে পার্টি করতে যায়? ড্রিংক করতে? আপনি কি পাগল হয়েছেন? আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না, নামিয়ে দিন আমাকে….গাড়ি থামান বলছি ”
মেহেরের চিৎকার আর সিটে ছটফটানিতে পুরো গাড়ির ভেতরটা যেন মুহূর্তেই অশান্ত হয়ে উঠল।
রুদ্র বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে আচমকা কষে ব্রেক চাপল। চাকা দুটো রাস্তায় ঘষটানোর একটা তীব্র শব্দ তুলে গাড়িটা একপাশে এসে থামল। মেহের ঝাঁকুনি খেয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

“ফর গড সেক, স্টপ ইট” রুদ্র মেহেরের দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসে বলল । তার চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করছে। “আমি কি তোমাকে জোর করে নিয়ে এসেছি? তুমি নিজে থেকে এসেছ। আমি কি একবারও বলেছি তোমাকে আসতে? নেমে যাবে তো? ওকে, ডান ”
রুদ্র মেহেরের দিকে ঝুকে, গাড়ির দরজাটা খুলে দিল। মেহের রুদ্রর চোখের দিকে তাকাল। চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু ভীষণ কঠিন।এই লোকটা কি সত্যিই তাকে এই নির্জন, অপরিচিত মাঝরাস্তায় নামিয়ে চলে যাবে?
মেহের -ও আর কথা বাড়ালো না সে জেদের বশে এক পা গাড়ির বাইরে বাড়াল, তার পা মাটিতে লাগতেই রুদ্রর চোয়াল আরও শক্ত হলো।
রুদ্র হিস-হিস করে বলে উঠলো….
“সমস্যা হলো, মেয়েদের গায়ে হাত তুলা পছন্দ করিনা। চুপচাপ যে রকম পা বাড়িয়েছ, একইভাবে চুপচাপ ভেতরে ঢোকাও।”

রুদ্ররের ধমক আর চোখের দৃষ্টির তীব্রতা টের পেয়ে মেহের মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। কিন্তু সে কি তা রুদ্রর সামনে প্রকাশ করবে? মোটেই না। সে নিজের ভেঙে পড়া
আত্মসম্মানটুকু জোড়াতালি দিয়ে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করল…. “চলে যেতে বললেন, তাই তো চলে যাচ্ছি”
“কোথায় যাবে?” রুদ্রর প্রশ্নটা তীরের মতো ধেয়ে এলো যেন,তার গলায় স্পষ্ট তাচ্ছিল্য প্রকাশ পাচ্ছিল ।
“দুই চোখ যেদিকে যায়… অভাব হবে না এত বড় দুনিয়াতে। কোথাও না কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চয়ই হবেই। দিনশেষে আল্লাহ আছেন তো…”
“শুরু হয়ে গেছে আবার জ্ঞানের কথা! চুপচাপ পা ভেতরে ঢোকাও। আমি আমার পাওনা পঁয়ষট্টি পার্সেন্ট এখনো তোমার থেকে পাইনি, আগে আমার পাওনা আমাকে দাও… তারপর না হয় যেদিকে খুশি যেও। তাছাড়া, তোমাকে আটকে রাখার শখ আমার উতলে উতলে পড়ছে না।”

মেহের আর কোনো কথা বাড়াল না। সময়, সুযোগ কিংবা অবস্থা এখন তার পক্ষে নেই। তা না হলে রুদ্রকে এভাবে ছেড়ে দিত? মোটেও না। সে মনে মনে রুদ্রকে ভেঙচি কাটলো। তারপর দরজার হাতলটা ধরে সজোরে টেনে ওটা বন্ধ করে দিল মেহের। গাড়িটা আবার পিচঢালা রাস্তায় চলতে শুরু করেছে। মেহের খুব ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে, এই শহরের বুকে তার যাওয়ার মতো আসলেও কোনো জায়গা নেই,রুদ্রের সাথে তর্ক করেও পারবেনা সে।
আরও প্রায় ৪৫ মিনিটের মতো গাড়ি চলল। শহর থেকে বেশ দূরে, কিন্তু জায়গাটা এতটাই নিরিবিলি যে মনেই হয় না এটা ঢাকার কোনো অংশ।
একটা বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে গাড়িটা থামল। রুদ্র নিজের সিটবেল্ট খুলে কোনো কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। মেহের তখনও ভেতরে জড়সড় হয়ে বসে আছে। রুদ্র বাইরে থেকে জানালার কাচে টোকা দিয়ে বলল,

“আলাদা করে ইনভিটেশন পাঠাব, নাকি নামবে?”
মেহের মনে মনে আবার একটা ভেঙচি কেটে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। আলাদা করে ইনভাইটেশন পাঠাব নাকি নামবে….. তালপাতার সেপাই একটা।
গেটের ওপরে পাথরের খোদাই করা অক্ষরে সুন্দর করে লেখা—”ছায়ানীড়”। গেটের দুপাশে সাদা আর লাল রঙের বাগানবিলাসের গাছ, বাতাসে ফুলগুলো দুলছে। বিকেল পাঁচটা বাজে এখন। সূর্যের তীব্রতা একদম নেই, তবে শীতের আমেজটা বেশ ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে।
মেহের তার গায়ের শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে গেটের ভেতরে পা বাড়াল। রুদ্র পেছনে গাড়ি লক করে গার্ডকে ডাকল, “আলী চাচা, এদিকে আসুন।”
রুদ্রকে দেখামাত্রই বৃদ্ধ গার্ডের মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। “আরে! পাইলট সাহেব! আপনি? কতদিন পর এলেন।”

মেহের দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল একটু দূর থেকে । সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না—এখানে হচ্ছেটা কী? আর কোথায় -ইবা এলো তারা।
রুদ্র সেই বৃদ্ধ গার্ডের সাথে কথা বলছে, “বাচ্চাদের জন্য কিছু গিফট আছে গাড়ির ডিকিতে। প্লিজ, ওগুলো একটু ভেতরে নিয়ে আসুন।”
রুদ্রর কথা শুনে তিনি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর ডিকি খুলে একে একে কয়েকটা খেলনা আর কার্টুন ক্যারেক্টারের টয় বের করতে লাগলেন।মেহের কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কাদের জন্য?”
“ভেতরে এসো, দেখতে পাবে, ফর মাই স্পেশাল গেস্ট।” রুদ্র খুব সংক্ষেপে উত্তর দিল। অথচ মেহেতার কাঙ্খিত উত্তর পেল না, মেহের মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘ক্যাপ্টেন সাহেব খেলনা এনেছেন? তাও আবার এতগুলো, কাদের জন্য ?’

তারা দুজনে মেইন গেট পেরিয়ে ভেতরের চত্বরে প্রবেশ করল। জায়গাটা বিশাল। ভেতরে চার-পাঁচটা তিনতলা বিশিষ্ট পুরনো দালান, যার স্থাপত্যশৈলীতে ব্রিটিশ আমলের ছোঁয়া রয়েছে। প্রত্যেকটা দালানের পাশে নানা রঙের ফুলের আর ফলের গাছ। বাতাসে বাগানবিলাসের শুকনো পাতাগুলো ঝরে ঝরে মাটিতে পড়ছে। একটা বড় বিল্ডিংয়ের পাশ ঘেঁষে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে,আকাশটা হালকা লাল আর হলদেটে বর্ণ ধারণ করেছে।এই মনোরম পরিবেশ দেখে মেহের আলতো করে একটা গভীর শ্বাস নিল। ফুরফুরে ঠাণ্ডা বাতাসে তার মনটাও এক নিমেষে যেন ফুরফুরে হয়ে উঠলো ।
ঠিক তখনই ভেতরের একটা অফিস ঘর থেকে মাঝবয়সী এক নারী বেরিয়ে এলেন। তাকে দেখেই বোঝা যায় তিনি অত্যন্ত মার্জিত। তিনি হলেন মিসেস ডি’সুজা, যাকে এখানকার সবাই ‘মাদার’ বলে ডাকে।
“হ্যালো মিস্টার রাইহাম চৌধুরী রুদ্র” মাদার হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।
রুদ্র অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে ফেলল।”মিসেস ডি’সুজা, প্লিজ কল মি রুদ্র। এক বছর আসিনি বলে কি পর হয়ে গেলাম?”

মাদার ডি’সুজা হেসে উঠলেন। “কতদিন পর তোমাকে দেখলাম, বাচ্চারা তো তোমাকে দেখলে খুশিতে পাগল হয়ে যাবে।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আরেকজন বৃদ্ধ ধীর পায়ে এসে পাশে দাঁড়ালেন। এই জায়গাটার দেখাশোনার দায়িত্ব মূলত তার হাতেই।উনার নাম হাসিম খন্দকার। রুদ্রকে দেখেই তিনি উচ্ছ্বাসে হেসে উঠলেন। “বাবা, অবশেষে তোমার মনে পড়ল আমাদের কথা?এই এতিমখানার খোঁজ কেউ রাখে না। একমাত্র তুমিই নিয়মিত আসতে, কিন্তু তুমিও আর আসো না।”
—— “লজ্জা দেবেন না চাচা। ফ্লাইটের এত ব্যস্ততা ছিল যে সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আজ একটু ছুটি পেলাম, তাই চলে এলাম।”
কথা বলার মাঝেই মিসেস ডি’সুজার চোখ গেল মেহেরের ওপর। তিনি মেহেরের স্নিগ্ধ রূপ দেখে মুগ্ধ হলেন, তারপর রুদ্রর দিকে ইশারায় তাকালেন। “হু ইজ শি, মাই বয়?”
মেহের অস্বস্তিতে পড়ে নিজের আঙুল মচকাতে লাগল। রুদ্র মেহেরের দিকে একবার তাকাল, তারপর শান্ত গলায় বলল—

“ওয়াইফ। শি ইজ মাই ওয়াইফ, মিসেস মেহের চৌধুরী।”
“ওহ, কংগ্রাচুলেশনস মাই বয়!” মাদার অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে মেহেরের কাছে এগিয়ে এলেন। তিনি পরম স্নেহে মেহেরের থুতনিটা ধরে সামান্য উঁচু করে বললেন,”ইউ টু লুক সো বিউটিফুল টুগেদার!”
মেহের চমকে রুদ্রর দিকে তাকাল। রুদ্রও তখন মেহেরের দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেহেরের চোখের ভেতরের অপ্রস্তুত ভাবটা রুদ্র ধরতে পারল। সে পরিস্থিতি সামাল দিতে মাদারকে বলল, “মাদার, আপনি মেহেরকে নিয়ে ভেতরে বসুন। আমি বাচ্চাদের সাথে একটু দেখা করে আসি।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই। নতুন অতিথি এসেছে, তাকে তো আর খালি মুখে ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমি ওকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি,” মাদার ডি’সুজা মেহেরের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
যাওয়ার পথে একটা ছোট বাচ্চা মাদারকে একটা লাল ফুল এনে দিল। মাদার হাসিমুখে ফুলটা নিয়ে মেহেরের হাতে গুঁজে দিলেন। “প্রিটি ফ্লাওয়ার ফর আ প্রিটি লেডি!” মেহের ফুলটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল। এখানে এসে মন্দ লাগছে না তার, বরং ভালই লাগছে।

মাদার মেহেরকে তাদের অফিসের একটা সোফায় বসিয়ে বললেন, “তুমি এখানে দু-মিনিট বসো মেহের, আমি তোমার জন্য হালকা কিছু খাবার আর চা নিয়ে আসছি।”
মেহের উনাকে না করল যে সে কিছু খাবে না, অথচ মাদার শুনলেন না। তিনি মেহের কে রেখে চলে গেলেন । মাদার চলে যাওয়ার পর মেহের একাই বসে রইল। অফিস ঘরের বড় জানালাটি দিয়ে বাইরের পুরো মাঠ দেখা যায়। মেহেরের চোখ চলে গেল জানালার বাইরে।
সেখানে রুদ্র বাচ্চাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। সে একেকজনকে একেকটা খেলনা দিচ্ছে, আবার কখনো বাচ্চাদের সাথে নানা ভঙ্গিমায় সেলফি তুলছে। মেহের অপলক দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
এ কি সেই রুদ্র, যে বিয়ের রাতে তাকে নির্মমভাবে অপমান করেছিল? এ কি সেই রুদ্র, যাকে দেখলে মেহেরের মনে হতো লোকটা অত্যন্ত অসহ্য, অহংকারী আর অসভ্য ? যাকে সে ভাবত পাথরের মতো নির্দয়, যে কখনো হাসতে জানে না? অথচ আজ সেই রুদ্র বাচ্চাদের সাথে কত অনায়াসে, কত সহজভাবে মিশে গিয়ে শিশুর মতো হাসছে।তার এই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো অহংকার নেই। মেহের মগ্ন হয়ে রুদ্রর সেই অচেনা রূপ দেখতে লাগল। কতক্ষণ সে এভাবে তাকিয়ে ছিল, নিজেরও খেয়াল নেই।
“তুমি কি তাকে ভালোবাসো?”

আচমকা পেছন থেকে মাদার ডি’সুজার কণ্ঠস্বর শুনে মেহের চমকে উঠল। তার কপাল কুঁচকে গেল। এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে সে নিজের অজান্তেই আবার জানালার বাইরে রুদ্ররের দিকে তাকালো। পরমুহূর্তেই দ্রুত চোখ সরিয়ে সে মাদারের দিকে তাকাল।
“না… না! মানে, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। এমন কিছু নয়।”
মাদার ডি’সুজা চায়ের ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে এক ভ্রু উঁচু করলেন। “হুম? ভুল? না মাই গার্ল, আমার এই বুড়ো চোখ তো ভুল বলছে না।”
মেহের অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। সে মনে মনে নিজেকে বোঝাতে লাগল—আমি যদি পানি হই, সে তবে আগুন। আমাদের মাঝে কোনো মিল নেই। এটা কী করে সম্ভব? না, অসম্ভব!
আর আমি… আমি কেনই বা তাকে ভালোবাসতে যাব।
মাদার মেহেরের চোখের সামনে, হাত দিয়ে আঙুলে তুড়ি মেরে মৃদু হেসে উঠলেন।
“কোথায় ডুব দিয়েছ? মুখের ভাষা আড়াল করা যায় মেহের, কিন্তু চোখের ভাষা কখনো মিথ্যে বলে না। হয় তুমি নিজের কাছে মিথ্যে বলছ, নয়তো সত্যিটা স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছ।”
মেহের কিছু বলল না। সে নিজের কোলের ওপর রাখা হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইল।
মাদার ডি’সুজা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মেহেরের নীরবতা পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “প্রেগন্যান্ট তুমি?”

—— “জি।”
“অথচ বলছ বাচ্চার বাবাকে ভালোবাসো না?” মাদারের প্রশ্নটা এবার মেহেরের বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করল। মেহের পুরো থমকে গেল, তার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ সরল না। মাদার তো জানেন না যে এই বাচ্চার বাবা আসলে রুদ্র নয়। অন্তু… অন্ত এই বাচ্চার বাবা।
মাদার এবার মেহেরের পাশে এসে বসলেন। মেহেরের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “জানো মেহের, মানুষের মন বড় অদ্ভুত। অনেক সময় সে নিজেই বুঝতে পারে না কখন, কীভাবে কার জন্য তার ভেতরে একটা আলাদা জায়গা তৈরি হয়ে যায়।”
তিনি একটু ঝুঁকে মেহেরের নত মুখের দিকে তাকালেন…
“আমি যখন রুদ্রর কথা বলছিলাম, তখন তোমার চোখের ভাষা পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। একজন সাধারণ মানুষের নাম শুনলে বা তাকে দেখলে আরেকজনের চোখ এভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না মা, যদি না তার জন্য মনে বিশেষ কিছু লুকিয়ে থাকে।”

মেহেরের গলা শুকিয়ে এলো। সে ঢোক গিলল, কিন্তু মাদারের কথার কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না।
মাদার আদর করে মেহেরের গালে হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন,”তুমি ওর প্রেমে পড়েছ, মাই গার্ল। হয়তো এখনও নিজের অহংকার বা ভয়ের কারণে নিজেকে সেটা বলতে পারছ না, কিন্তু তোমার হৃদয় অনেক আগেই ওর নামটা লিখে ফেলেছে।ভালোবাসা লুকিয়ে রাখার জিনিস না। আবার জোর করে স্বীকার করারও জিনিস না।তাকে শুধু অনুভব করতে হয়, একটু সময় দিতে হয়। তাই নিজেকে আর এত প্রশ্ন করে কষ্ট দিও না। নিজের মনের কথাটা শোনার চেষ্টা করো।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৮

একটু থামলেন মাদার, তারপর মেহেরের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে মুচকি হাসলেন।
“কখনো কখনো হৃদয় যে উত্তরটা অনেক আগেই জেনে বসে থাকে, আমাদের এই জটিল মাথাটা সেটাকে মেনে নিতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলে।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩৯