ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২
মারিয়াম ফুল
মেহের চোখ-মুখ কুঁচকে রুদ্রের দিকে তাকাল। ” জাস্ট আইসক্রিম খাওয়ার কথা বলতেই অমনি ফ্লার্ট করা শুরু করে দিয়েছে “একটু আগে বললেন আমি হাতি, হাতি কে ধরলে আপনি উল্টে পড়ে যাবেন।”
তুমি পাঁচ মিনিট আগের কথা এখনো ধরে বসে আছ? বাহ! হাতির শুধু শরীর না, স্মৃতিশক্তিও আছে দেখছি।
কথাটা বলেই রুদ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে মেহেরের দিকে তাকাল।মেহের রাগে ফুঁসছে। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো রীতিমতো আগুন ঝরাচ্ছে। দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “শয়তান একটা… তালপাতার সেপাই কোথাকার
এমনি এমনি কি তালপাতার সেপাই বলি….আমি নাকি হাতি ?”
মেহেরের রাগী মুখটা দেখে রুদ্রের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল। এক পা এগিয়ে এসে হঠাৎই ওর মুখের সামনে আলতো করে ফুঁ দিল।অপ্রস্তুত হয়ে মেহের এক পা পিছিয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রুদ্র ধীরে ধীরে ঝুঁকে এল মেহেরের দিকে । চোখে-মুখে খেলা করছে দুষ্টুমি।
“এই… সুইটহার্ট…”শব্দটা ইচ্ছে করেই টেনে বলল সে।তোমাকে ক্ষ্যাপাতে যে আমার কী খুশি লাগে, জানো? সেই খুশির সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো খুশির তুলনাই হয় না।”
মেহের ঠোঁট উল্টে দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল।”খুশি লাগবেই তো। অন্যকে জ্বালিয়ে শান্তি পাওয়া মানুষদের আবার খুশির অভাব হয় নাকি?”
রুদ্র হালকা হেসে মাথা দোলাল।”ভুল বললে, সুইটহার্ট। সবাইকে জ্বালিয়ে আমার ভালো লাগে না।”
রুদ্র আরো এক পা এগিয়ে এল। মেহের ভেবেছিল আবার বুঝি ফ্লার্ট করবে। তাই সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে চোখ দুটো ছোট করে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল রুদ্রের দিকে। রুদ্র মেহের অবস্থা দেখে মেহের এর কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠলো, “শুধু তোমাকেই ক্ষ্যাপাতে ভালো লাগে।”
মেহের অবাক দৃষ্টিতে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে।রুদ্রের কথা বলার ধরন, মেহেরের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে, মেহের অজান্তেই এক পা পেছাতে চাইল, কিন্তু পা যেন নড়লই না। শুধু ভ্রু কুঁচকে রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, বোঝার চেষ্টা করল—লোকটার মাথায় আবার কী চলছে!
রুদ্র একটু থেমে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে আবার বলল,”কারণ… কারণ রাগলে তোমাকে একদম বনের বদরের মতো লাগে। মনে হয় এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁচড়ে-কামড়ে দিবে।”
রুদ্রের মুখে কথাটা শুনে মেহের দাঁত কটমট করে উঠল। চোখ দুটো বড় বড় করে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী বললেন আপনি? আমি… বাঁদরের মতো লাগে? আমাকে বাঁদর বললেন?”
রুদ্র দুই হাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুলে হেসে ফেলল। এক চোখ টিপে দুষ্টু গলায় বলল,
“আরে, আরে! রাগলে তো সত্যিই আরও বেশি বাঁদরের মতো লাগছে। এত সত্যি সত্যি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো মজা করছিলাম ”
মেহের আশপাশে চোখ বুলিয়ে কী দিয়ে লোকটার মাথায় একটা বসানো যায় সেটা খুঁজতে লাগল। সেটা দেখে রুদ্র আরেক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে হেসে বলল,”আচ্ছা আচ্ছা… যুদ্ধটা পরে হবে।”
বাইরের দিকে একবার তাকিয়ে জানালার কাঁচে গড়িয়ে পড়া শেষ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির দিকে ইশারা করে বলল,”বাইরে বৃষ্টিটা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। চলো, বের হওয়া যাক, আবার এসে না হয় ঝগড়া করবে। এমনিতেও দোকানপাট খোলা আছে কিনা কে জানে? ”
মেহের আর মুখে কিছু বলল না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব ভালো করেই জানে, রুদ্রর সাথে তর্কে জড়ানো মানেই হেরে যাওয়া, ওর কথার পিঠে কথা বলে পেরে ওঠা অসম্ভব। তা ছাড়া এই মাঝরাতে ওর নিজেরও আইসক্রিম খাওয়ার একটা তীব্র ক্রেভিং হচ্ছে।
তবে এত রাতে রুদ্রকে যে বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছে, সেটার পেছনে আইসক্রিম খাওয়ার চেয়েও বড় আরেকটা কারণ ছিল—মেহের চাচ্ছিল রুদ্রর মনটা যদি এই উসিলায় কিছুটা হলেও হালকা হয়। কদিন ধরে রুদ্রর ওপর দিয়ে অনেক ধকল যাচ্ছে। নিজের আইসক্রিম খাওয়াও হবে, আবার রুদ্রর মুডটাও একটু চাঙ্গা হবে— এক ঢিলে দুই পাখি।
বেশ কিছুক্ষণ পর মেহের আর রুদ্র অ্যাপার্টমেন্টের লিফট দিয়ে নেমে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে এলো। গেটের সিকিউরিটি গার্ডরা আড়চোখে তটস্থ ভঙ্গিতে ওদের দিকে তাকাল, কিন্তু একটা শব্দও মুখ ফুটে বলার সাহস পেল না। কিছুক্ষণ আগে মেহেরকে না পেয়ে রুদ্র যেভাবে পুরো লবি মাথায় তুলে চিৎকার -চেঁচামেচি করেছিল, এখন গার্ডরা ভয়ে একেবারে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে পা রাখতেই একটা হিমেল হাওয়া ওদের ছুঁয়ে গেল। বৃষ্টি এখন টিপটিপ করে পড়ছে, তবে বাতাস বইছে প্রচণ্ড বেগে। নভেম্বরের মাঝামাঝি হওয়ায় গভীর রাতে পুরো বারিধারা এলাকা ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে। স্ট্রিটলাইটের আলো কুয়াশা ভেদ করে আবছাভাবে ভেজা রাস্তায় পড়ছে। চারপাশে কোনো মানুষজনের দেখা নেই। দূরে কোথাও মাঝে মাঝে শুধু বাতাসে দুলতে থাকা গাছের পাতার শব্দ আর টুপটাপ বৃষ্টির আওয়াজ ভেসে আসছে।
দুজনে গিয়ে রুদ্রর রেঞ্জ রোভারে উঠে বসল। রুদ্র ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িটা বের করল। কয়েক মিনিট পর গাড়িটি বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের প্রধান সড়কে উঠে এল। ঘন কুয়াশার কারণে সামনের রাস্তা প্রায় দেখা যাচ্ছে না। দু’পাশের দোকানপাট আর ক্যাফেগুলো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশে একটা মানুষও চোখে পড়ছে না। রুদ্র একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে পাশ ফিরে মেহেরের দিকে তাকাল। মেহের জানালার বাইরে তাকিয়েই আছে। মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আইসক্রিম খাওয়ার জেদটা এখনও একটুও কমেনি।
রুদ্র হালকা গলাখাঁকারি দিয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,”এখন তো কোনো দোকানপাটই খোলা নেই। বলো, এবার কী করা যায়?”
মেহের রুদ্রর চাউনি দেখে মাথা নাড়ল। তারপর বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে মুখ ফুলিয়ে বলল—
“হুম, আমি ওসব জানি না। আপনি কীভাবে খুঁজে বের করবেন, কোন গলি থেকে আনবেন—সেটা আপনার ব্যাপার। আমি যখন একবার বলেছি খাব, আইসক্রিম আমাকে এখন এনে দিতেই হবে।”
রুদ্র হালকা গিয়ার বদলে গাড়িটা আবার একটু স্পিড বাড়িয়ে দিল। মুখে একটা চরম ব্যঙ্গাত্মক আর তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে বলল, “হুম, ম্যাম যখন হুকুম করেছেন, এনে দিতেই হবে! স্বৈরাচার একটা…. উনি হলেন রাজার বাকি সবাই প্রজা। ”
রাস্তার দোকানদাররা বুঝি আমার আপন শ্বশুর যে আমি মাঝরাতে আইসক্রিম চাইবো আর আমাকে দিয়ে দিবে ?”
মেহের রুদ্রের কথা শুনেও না শোনার ভান করে সিটে হেলান দিয়ে রইল। ঠিক তখনই কিছুটা সামনে একটা ছোট মোড়ের মাথায় একটা কনফেকশনারি দোকান চোখে পড়ল। দোকানটা প্রায় বন্ধ, সাটার অর্ধেক নামানো, ভেতরে অল্প একটু আলো জ্বলছে। দোকানদার ছেলেটি দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গাড়িটা একদম দোকানের সামনে এনে থামাল রুদ্র। “গাড়িতে চুপচাপ বসে থাকো। এক পা-ও নিচে নামবে না। আমি দেখি, কিছু পাওয়া যায় কি না।” কথাটা বলেই গাড়ি থেকে নেমে গেল রুদ্র।
গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পায়ে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। দোকানদারের বয়স খুব বেশি না, বড়জোর ১৬-১৭ বছর হবে। রুদ্র দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল “এই ভাই, আইসক্রিম আছে?”
ছেলেটি একবার রুদ্রর দিকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ভদ্র গলায় বলল,”জি, স্যার… আইসক্রিম তো আছে। কিন্তু দোকান বন্ধ করে দিয়েছি। ফ্রিজও অফ করে রেখেছি, তাই এখন আর বিক্রি করছি না।”
“বিক্রি করবে না বললেই হলো নাকি?জানো কতক্ষণ ধরে এই কুয়াশার মধ্যে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি? দোকানে যা আছে বের করো, ডাবল টাকা দেব, তাও দাও…গাড়িতে এক স্বঘোষিত স্বৈরাচার বসে আছে।তুমি যদি না দাও, তাহলে আমাকে আবার পুরো শহর খুঁজে বেড়াতে হবে।”
ছেলেটি রুদ্রর এই মরিয়া ভাব আর ব্যাকুলতা দেখে কিছুটা নরম হলো। সে একটু হেসে বলল,
“স্যার, ডাবল টাকা দেওয়া লাগবে না, আপনি দাঁড়ান, আমি দিচ্ছি।” ফ্রিজ খুলে বক্স বের করতে করতে সে একটু দূরে গাড়ির ভেতরে বসা মেহেরের দিকে তাকাল। মেহের তখন অধীর আগ্রহে গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি রুদ্রকে ফিসফিস করে বলল, “ম্যামের জন্য বুঝি স্যার?আমার গার্লফ্রেন্ড রাগ করলে আমিও ওকে এমন আইসক্রিম দিই… ব্যাস, অমনি রাগটা পানি পানি হয়ে যায়।”
রুদ্র ভুরু কুঁচকে ছেলেটাকে ওপর-নিচ আরেকবার দেখে নিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল, “তোমার গার্লফ্রেন্ডও আছে এটুকু বয়সে ?”
“জি স্যার, পাশের গলিতেই থাকে।” ছেলেটি লাজুক হাসল।
“ওহ! গ্রেট! আমার অবশ্য গার্লফ্রেন্ড না ভাই,
মুখ-বলি একটা বউ। তাও আবার ঘোর যুক্তিবাদী বউ। নেড়া মাথায় বেল পড়ার মতো অবস্থা, একটু উনিশ-বিশ হলে মাথায় চিরুনি ধরে চলে যাবে ”
ছেলেটি কথা শুনে হোহো করে হেসে ফেলে জানতে চাইল, কোনটা দেবে আর কয়টা দেবে। রুদ্র বাইরে থেকেই মেহেরের দিকে ইশারা করল। মেহের রুদ্রর ইশারা দেখে জানালার গ্লাসটা পুরোটা নামাল।গ্লাস নামাতেই বাহিরের বাতাস এসে ওর হিজাবের সামনের ছোট ছোট ভাঁজগুলো আলতো করে দুলিয়ে দিল। কপালের পাশে বেরিয়ে থাকা একগুচ্ছ ছোট্ট চুল বাতাসে উড়ে গাল ছুঁয়ে গেল। সে অবচেতনেই আঙুল দিয়ে ওগুলো কানের পাশে গুঁজে দিল।তারপর একেবারে বাধ্য মেয়ের মতো ঠোঁট গোল করে মুচকি হেসে তর্জনী তুলে একটা দেখাল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই যেন মত বদলে গেল। চোখ দুটো দুষ্টুমিতে চিকচিক করে উঠল। এবার দুই হাত তুলে দুইটা আঙুল দেখিয়ে মাথাটা কাত করল। মুখের ফুটে উঠল নিষ্পাপ হাসি।
রুদ্র পকেটে হাত ঢুকিয়ে অবিশ্বাসের চোখে ওর দিকে তাকাতেই মেহেরের মুখে দুষ্টু হাসিটা আরও চওড়া হয়ে গেল। খিলখিল করে হেসে এক লহমায় দুহাতের দশটা আঙুলই মেলে ধরল। তারপর ভুরু দুটো নাচিয়ে এমন একটা ভাব করল, যেন বলছে—
“যেহেতু কিনেই দিচ্ছেন, তাহলে দশটাই দিন না!”
ওর বাচ্চা সুলভ কান্ড দেখে দোকানদার ছেলেটাও হেসে উঠল। আর রুদ্র শুধু মাথা নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। এই ঠান্ডায় আইসক্রিম খাবে? তাও আবার দশটা
কিছুক্ষণ পর রুদ্র দোকান থেকে একপ্রকার যুদ্ধ জয় করার মতো ভঙ্গিতে পুরো ৩টা বড় বড় ফ্যামিলি সাইজের আইসক্রিমের বক্স নিয়ে গাড়ির দিকে ফিরে এলো।
মেহের গাড়ি থেকে তড়িঘড়ি করে নেমে চোখ কপালে তুলল, “আপনি কি আস্ত পাগল নাকি! একেকটা বক্সে কম করে ৩০টা করে আইসক্রিম হবে। এতগুলো বক্স নিয়ে কেন এসেছেন? আমি তো মাত্র দশটার কথা বললাম…. ”
রুদ্র মেহেরের ঠিক সামনে দুটো আইসক্রিম উঁচিয়ে ধরে খোঁচা মেরে বলল, “এগুলো এখন তুমি শান্ত হয়ে খাও, বাকি বক্সগুলো আমি গাড়ির ব্যাকসিটে রাখছি। দোকানে যা ছিল সব সোয়াইপ করে নিয়ে এসেছি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দিন ঝগড়ার সময় বলতে না পারো যে আমি কিপটেমি করেছি।”
“তাই বলে এতগুলো? আমি না হয় বড়জোর দুটো খেলাম, বাকি গুলো তো কিছুক্ষণের মধ্যে গলে যাবে,আর তখন আমি তো মজা করে বলেছি ।”
রুদ্র মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মতো বলল, “নাহ, বাইরে যে কনকনে ঠান্ডা আর বাতাস, এত তাড়াতাড়ি কিচ্ছু হবে না। ফ্রিজের চেয়ে বাইরে বেশি ঠান্ডা।” এই বলে রুদ্র গাড়ির দরজা খুলে ঢুকতে যাবে, মেহের হঠাৎ রুদ্রর জ্যাকেটের হাতা টেনে ধরে বলল,
“আচ্ছা শুনুন না, রাস্তায় তো এখন একটা মানুষও নেই। চারপাশটা কী সুন্দর নিঝুম লাগছে! চলুন না গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াই? এই কুয়াশা আর ঠান্ডার মাঝে আইসক্রিম খাওয়ার যে কী আলাদা মজা, আপনি বুঝবেন না! আপনি একটা খাবেন আমার সাথে?”
রুদ্র মুখটা বাঁকিয়ে বলল, “ওসব আজেবাজে ছাইপাশ আমি খাই না। মেয়েমানুষদের খাবারের টেস্ট সবসময় খুব বাজে আর অদ্ভুত হয়।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ! আপনার টেস্ট তো খুব ভালো ” মেহের ভেঙচি কেটে বলল, “কফির সাথে পটেটো চিপস চুবিয়ে খান যিনি, তার মুখে এই খাবারের টেস্ট নিয়ে কথা মানায় না।”
রুদ্র পকেট থেকেফোনটা বের করতে করতে হালকা হেসে বলল, “হুম, যুক্তিবাদীর আম্মা একটা খাঁটি কথা বলেছেন।”
মেহের আইসক্রিমের চামচ মুখে পুরে দিয়ে বলল, “আমি যুক্তিবাদীর আম্মা হলে, আপনি হলেন যুক্তিহীনের আব্বা… ।”
মেহের আইসক্রিমে ছোট ছোট কামড় দিয়ে খেতে খেতে হুট করেই রুদ্রর মুখের দিকে তাকাল।”সত্যি করে বলুন তো, জীবনে প্রেম করেছেন কোনো দিন? মানে সিরিয়াসলি কারও প্রেমে পড়েছেন?”
রুদ্র ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে মেহেরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, “উফ! দিলে তো পুরনো ক্ষততে নুন ছিটিয়ে মনে করিয়ে”
“কার সাথে করেছিলেন? নাম কী তার?” মেহেরের চোখে কৌতূহল চকচক করে উঠল।
রুদ্র গাড়ির বডিতে হেলান দিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে অতীত মনে করতে লাগল। তারপর ওর ডান হাতটা না চাইতেও নিজের বাম গালে চলে গেল, যেন সেই আঘাতটা সে এখনও টের পাচ্ছে। মেহের রুদ্রর এই অদ্ভুত আর ভয়ার্ত ভঙ্গি দেখেই কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে খিলখিল করে হেসে উঠল, “চড় মেরেছিল মেয়েটা? আপনাকে? সত্যি? ও মাই গড, রাইহান চৌধুরী রুদ্রকে কেউ চড় মেরেছে?”
রুদ্রর গলাটা হুট করেই বেশ গম্ভীর আর ভারি শোনাল, “ঠাট্টা কোরো না মেহের। ক্লাস টু-তে পড়ার সময় আমার জীবনে সে এসেছিল।”
মেহের পিটপিট করে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করল, “ক্লাস টু-তে? কে? কার সাথে?”
“আমাদের ইংলিশ মিস। ছেলেদের প্রথম ভালোবাসা সাধারণত তাদের ক্লাস টিচারই হয়।”
মেহের এবার মুখ কুঁচকে বলল, “ছিঃ! তাই বলে নিজের টিচার? আচ্ছা বলেন, তারপর কী হলো?”
“আর কী হবে, ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেই কানের নিচে এমন এক চড় মেরে গাল লাল করে দিয়েছিল যে তিন দিন ভাত চিবিয়ে খেতে পারিনি। বুঝবে না তুমি ওসব পবিত্র অনুভূতি। আমি আজও মিসকে খুব মিস করি।”
“প্লেবয় ছিলেন তাহলে ছোটবেলা থেকেই? এই লাইনে এক্সপেরিয়েন্স পুরোনো”
“আজেবাজে কথা বোলো না তো! পুরুষ মানুষ তার জীবনের প্রথম প্রেমিকাকে কোনো দিন ভুলতে পারে না।” রুদ্র বুক ফুলিয়ে বলল।
“আচ্ছা বুঝলাম। কোনো সিরিয়াস প্রেম একটাও করেননি?”
“নেড়া কি বারবার বেলতলায় যায়? ওই ক্লাস টু-তেই একবার চড় খেয়ে এমন শিক্ষা হয়ে গেছে যে প্রেমের নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে।”
মেহের রুদ্রের কথা শুনে না চাইতেও জোরে হেসে উঠল। হাসির ফাঁকেই কখন যে ওর আইসক্রিম খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, খেয়ালই করেনি। মেহেরের হাসি দেখে রুদ্রও ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর দুজনে আবার গাড়ির ভেতরে এসে বসল। মেহের সিটবেল্টটা টেনে বাঁধতে বাঁধতে একটু ইতস্তত করে বলল,
“আপনাকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?”
রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আস্তে আস্তে মেইন রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে বলল, “হুম, করো।”
ম “ওই দিন মা আমাকে বলছিলেন যে আপনি আগে নাকি এমন ছিলেন না। উনি আপনার অতীত নিয়ে কী একটা… আমাকে বলতে চাচ্ছিলেন। অথচ আপনি কিছুক্ষণ আগে অ্যাপার্টমেন্টে বললেন যে মা এসবের কিছুই জানেন না। তাহলে মা কী বলতে চাচ্ছিলেন?”
রুদ্র রাস্তার কুয়াশাভেজা পিচের দিকে চোখ রেখেই শান্ত গলায় বলল, “মা কী বলেছে তোমাকে?”
মেহের মাথা নাড়ল, “নাহ, মা পুরোটা বলতে পারেননি। তার আগেই বাবা ডাক দিলেন আর গাড়িও চলে আসায় মা কিছু বলতে গিয়েও আর সময় পেলেন না। বলুন না প্লিজ, কী হয়েছিল ?”
মেহেরের এই তীব্র আর ব্যাকুল আগ্রহ দেখে রুদ্র হুট করেই বেশ জোরে হেসে উঠল। মেহের ভীষণ অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকলো, এই সিরিয়াস কথার মধ্যে হঠাৎ এভাবে পাগলের মতো হাসার কী কারণ থাকতে পারে?
“বিয়ের দিনে হবু বউ পালিয়ে গিয়েছিল।” বলে রুদ্র আরো জোরে জোরে হাসতে শুরু করল।
মেহেরের কপাল কুঁচকে গেল, “কার বউ? কে পালিয়েছিল?”
“পাঁচ বছর আগে আমার ছোট ফুফু—সালমা চৌধুরী ইউকে থেকে দেশে এসেছিলেন। দাদি উনার বড় মেয়ের সাথে আমার বিয়ে একদম পাকা করে ফেলেছিলেন। বেচারি রূপসা… বিয়ের দিন সকালেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেল।”
মেহেরের চোখ কপালে উঠে গেল। অবাক হয়ে রুদ্রের দিকে তাকালো। “নিজের বউ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা মানুষ লজ্জায় কাউকে বলতে চায় না, আর আপনি কিনা সেটা নিয়ে বসে বসে হাসছেন! আপনার কি মান-ইজ্জতের ভয় নেই?”
“উঁহু, ওসবের আমি কোনো দিন তোয়াক্কা করি না। ইজ্জত দিয়ে কী হয়?”
“আচ্ছা বুঝলাম, তা ইজ্জত না-ই বা থাকল, কিন্তু এই ট্রাজিক ঘটনাটায় আপনার হাসার কারণটা কী? এখানে হাসির কী আছে?”
রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল, “কারণ, রূপসাকে ওই বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যেতে আমিই হেল্প করেছিলাম।”
মেহেরের অবাক হওয়ার আর কোনো সীমা রইল না, সে প্রায় সিট থেকে লাফিয়ে উঠল, “আপনি সাহায্য করেছিলেন? নিজের বিয়ে নিজে ভেঙেছেন? কিন্তু কেন?”
“আমি ওই স্টুপিড বিয়েটা করতে চাইনি। তাই রূপসাকে নিজের চালের একটা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছি।”
“কীভাবে? একটু ভেঙ্গে বলেন ?”
রুদ্র গাড়িটা মেইন রাস্তা থেকে ঘুরিয়ে এবার ওদের অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের গলিটার দিকে ঢোকাল। “বিয়ের আগের রাতে আমি খুব গোপনে ওকে ঘরে গেলাম। গিয়ে একদম গম্ভীর মুখে বললাম—রূপসা, তোমাকে বিয়ে করতে আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ভেতরের খবর জানো? বাবা মূলত তোমার মায়ের সম্পত্তিগুলো হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই এই বিয়েটা করতে আমাকে বাধ্য করছে। আর রূপসা… আমাদের বাড়িতে তো কাজের লোক টেকে না। যাদেরকে দেখতে পাচ্ছ, বিয়ে উপলক্ষে তাদেরকে আনা হয়েছে। বিয়ে হলে আবার তারা চলে যাবে তোমাকে বিয়ে করে ঘরে আনলে মা তোমাকে দিয়ে প্রতিদিন পুরো বাড়ি ঝাড়ু দেওয়াবে, তিন বেলা রান্না করাবে, আর দাদির? তোমাকে দিয়ে পা মালিশ করাবে। ইউকে থেকে এসে তুমি এই চাকরানি হবে? ছিঃ রূপসা, ছিঃ! তোমার লাইফটাই বরবাদ। আমি তোমার না হওয়া জামাই হিসাবে বলছি, আমি তোমার ভালো চাই। ”
মেহের স্তব্ধ, নির্বাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্র বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছাড়া বলতে থাকল, “রূপসা মেয়েটা একটু বেশিই বোকা ছিল। লন্ডনে জন্ম হয়েছে তো, দেশের কূটনামি বুঝত না। আমার বানোয়াট কথা খুব সহজে বিশ্বাস করে নিল। আর বিশ্বাস করবে না কেন? এমনভাবে বলেছি…
তারপর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কীভাবে পালাবে সেই উপায় খুঁজতে লাগল। শেষমেশ বিয়ের দিন সকালবেলা আমিই বরের শেরওয়ানি পরে ওকে লুকিয়ে নিজের গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসি। ফুফু আর বাবা তো ভেবেছে মেয়ে নিজে থেকে পালিয়েছে..উল্টো সবাই আমাকে সমবেদনা জানাচ্ছিল। মা ভেবেছিল, আমি রূপশাকে পছন্দ করি… তাই ওর চলে যাওয়ায় কষ্ট পেয়ে একেবারে আশিক হয়ে গেছি।”
মেহের এবার রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বিস্ময় মেশানো গলায় বলল, “নিজের মা আর বাবাকে নিয়ে অন্য একটা মেয়ের সামনে এত বড় মিথ্যা কথা বলতে আপনার একটুও কষ্ট হলো না? আপনার বিবেক বাঁধল না?”
রুদ্র কাঁধ নাচিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “কষ্ট কিসের? ওটা তো একটা আস্ত গাধা ছিল। ওই হাদারামকে বিয়ে করলে ভবিষ্যতে আমাদের যে বাচ্চা কাচ্চা হতো, সেগুলো সব একেকটা আস্ত বলদ হতো। ”
মেহের আর নিজের ভেতরের চেপে রাখা হাসি আটকে রাখতে পারল না। রুদ্রর এই অদ্ভুত, অদ্ভুতুড়ে যুক্তির কাছে হেরে গিয়ে সে মুখ চেপে শব্দ করে হেসে ফেলল। তবে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে আবার বলল, “সবই বুঝলাম, কিন্তু আপনি যে বললেন, আপনি কোনো দিন সংসার করবেন না, একা থাকবেন? তাহলে এখন বাচ্চাদের কথা বলছেন?”
রুদ্র নাক-মুখ কুঁচকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “ঘরে আনলে কি শোপিস হিসেবে সাজিয়ে রাখতাম নাকি? আশ্চর্য ”
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪১
মেহের কি বলবে রুদ্রের কথায় ভেবে পেল না। সে খুব ভালো করে জানে রুদ্রর এই বাঁকা কথার পেছনের আসল অর্থটা কী। মেহের ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিল যে এই লোকটার নাম রাইহাম চৌধুরী রুদ্র । তার কাছ থেকে কোনো দিন সোজা, স্বাভাবিক কোনো কথা শোনার আশা করাটাই একটা চরম বোকামি। এই মানুষের মুখে কোনো কিছু আটকায় না; যেখানে যা ইচ্ছা, যেমন খুশি, যার সামনে খুশি বলে দিতে পারে—
