Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬
মারিয়াম ফুল

১ ডিসেম্বর….
সারাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের টানা তিন দিনের রাজপথ অবরোধের প্রথম দিন। ইট-পাথরের এই ব্যস্ত শহর যেন আচমকাই নিস্তব্ধতায় জমে গেছে। রাস্তাঘাট পুরো জনমানবহীন, দূর থেকে দু-একটা অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ির সাঁ সাঁ শব্দ ছাড়া চারপাশে শুধু এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা।
ঘরের ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা বেজে গেছে। মেহেরের ঘুম ভাঙল আজ বেশ দেরিতে। পুরো শরীর ভারী হয়ে আছে আলসেমিতে। চোখ মেলে পাশ ফিরতেই দেখে, বিছানায় ছোট্ট ছেলেটা উপুড়-কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেহের আলতো হাতে বিছানা ছেড়ে জানালার পর্দাটা একপাশে সরিয়ে দিল। রোদের নরম একচিলতে রেখা জানালার কাঁচ ভেদ করে সোজা এসে পড়ল ঘুমন্ত বাচ্চার তুলতুলে হাত আর পায়ের নরম পাতার ওপর। উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই শিশুটি নিজের অজান্তেই একটু কুঁকড়ে নড়েচড়ে উঠল।
মেহের দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে উপচে পড়া মৃদু হাসি নিয়ে ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে বসল সে। আলতো করে বাচ্চার গাল ছুঁয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করল, “হাই সোনা…”

মায়ের পরিচিত গলার আওয়াজ কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই ছেলে আবার একটু নড়ে উঠল। ঘন, পাপড়ি ঢাকা ছোট ছোট চোখ দুটো আধো-আলোয় আস্তে করে মেলল সে। মেহের বিছানায় ছেলের আরেকটু ঘেঁষে শুয়ে একদম মুখোমুখি হয়ে আদর মাখা গলায় শুধাল, “ঘুম শেষ আমার পাপাটার?”
বাচ্চাটা হাত-পা শূন্যে ছড়িয়ে অদ্ভুত সব ভঙ্গিতে মেহেরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহের আর দেরি না করে সাবধানে দু-হাতে তাকে তুলে বুকে জড়িয়ে নিল। আলতো হাতে গায়ের কাঁথা-কাপড় বদলে দিতে দিতে বাচ্চাটার নরম গালে মুখ ছুঁইয়ে আদুরে গলায় বলল,
“পেট খালি হয়েছে পাপাটার? উম্মম…”
মায়ের আদুরে কথা শুনেই ছেলে ঠোঁট দুটো গোলাকার বানিয়ে আধো-আমতা শব্দে সুর তুলল “নামম্মম… নামম্মম…”। যেন মায়ের প্রতিটা প্রশ্নের জবাব সে নিজের এই অবুঝ ভাষাতেই হুবহু ফেরত দিচ্ছে।
মেহের ছেলের জামাটা বদলে দিয়ে তাকে বিছানার একপাশে বালিশের মাঝে সাবধানে শুইয়ে রাখল। টানা ঘুমের পর এবার নিজের পেটের ভেতর ক্ষুধার একটা সূক্ষ্ম কামড় অনুভব করল সে। সত্যিই কিছু খাওয়া দরকার।

ছেলেকে কোলে নিয়েই লিভিং এরিয়ার দিকে যাওয়ার কথা ভাবল মেহের। কেয়ারটেকার রান্নাঘরেই আছে। সকালে একবার থালাবাসনের টুংটাং শব্দ শুনেছিল সে। আর রুদ্র? হয়তো আজ অ্যাপার্টমেন্টেই আছে। বাইরে যে পরিস্থিতি, তাতে আজ আর বের হওয়ার কোনো উপায় নেই।
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মেহের বিছানা ছেড়ে পায়ে জুতো পরতে যাবে, ঠিক তখনই সাইড টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিনটা তীব্র আলোয় জ্বলে উঠল। ফোনের সুরে ঘরের থমথমে নীরবতাটাও কেটে গেল।
মেহের হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনে মেঘলার নাম ভেসে উঠতেই কলটা রিসিভ করল সে। ওপাশ থেকে সালাম কিংবা কুশল বিনিময়ের ধারেকাছেও না গিয়ে মেঘলা তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“আগে বেবিকে দেখাও তো আমাকে! তাড়াতাড়ি ক্যামেরা ঘোরাও!”
মেহের নাকের ডগা খানিকটা কুঁচকে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, “অ্যাঁ! এখন আর আমার কোনো দাম নেই, না? ও তোর কাছে বেশি জরুরি হয়ে গেল?”

“আরে হ্যাঁ, একশো বার! আগে আমার পাখিটাকে দেখ তো। উফফ, কী যে মিষ্টি!”
মেঘলা ফোনের ওপাশ থেকে একরাশ উচ্ছ্বাস ঢেলে দিয়ে বলল, “জানিস, আজকে আমি আর ভাই তোর ওখানে যাওয়ার সব প্ল্যান করে ফেলেছিলাম। কিন্তু বাইরের অবস্থা দেখিসনি? আজকে লকডাউন, কালকে আবার অবরোধ… এই ঝামেলাগুলো একটু মিটুক, তারপর আর কাউকে মানব না। সোজা চলে আসব। ছোট পাখিটাকে কোলে নিয়ে বসে থাকব….”
মেহের হালকা হেসে ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে বিছানায় পা দোলানো ছেলের মুখের সামনে উঁচিয়ে ধরল।
ভিডিও স্ক্রিনে তুলতুলে শিশুটিকে দেখে মেঘলা যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, চিৎকার করে উঠল—”মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ! মেহু, এতো পুরো একটা জীবন্ত পুতুল রে! কী নাম রাখলি ওর? কিছু ভেবেছিস?”

মেহের সঙ্গে সঙ্গে জিভে হালকা কামড় দিল। কথাটা বলেই কেমন যেন অপরাধী লাগল তার। ছেলেটার নামটাই তো এখনও রাখা হয়নি!
“আরে! নাম নিয়ে তো এখনও ভাবাই হয়নি। না রে, এখনও কোনো নাম রাখা হয়নি…”
“কী নাম রাখবি বল তো? ওর বাবার নামের সাথে মিলিয়ে রাখলে কেমন হয়? যেমন ধর—রাইদ, রেহান, রুহান… এই টাইপ কিছু একদম পারফেক্ট মানাবে কিন্তু ”
কথাটা শেষ হতেই মেঘলার চোখ গেল স্ক্রিনের দিকে। মেহেরের মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেছে। একটু আগের হালকা হাসিটাও আর নেই। মুখজুড়ে কেমন একটা বিষণ্ণতা নেমে এসেছে। চোখ দুটোও ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এসেছে।

মেঘলা ঘুণাক্ষরেও জানত না, এই নিষ্পাপ শিশুটাকেই সায়েদ কামিনী একসময় দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। শুরুর দিকে মেঘলার মনেও একটা সংশয় ছিল। বাচ্চাটা আদৌ অন্তুর কি না, সেটা নিয়েও সে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু সেদিন কোর্ট থেকে ফেরার পর থেকেই মেঘলা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, বাচ্চাটা রুদ্রের। এরপর অন্তুর কথা আর একবারও তার মাথায় আসেনি।
মেহেরের মুখের হঠাৎ বদলে যাওয়া ভাবটা মেঘলার চোখ এড়াল না। সে বুঝল, রুদ্রের নাম শুনেই হয়তো মেহেরের মনটা খারাপ হয়ে গেছে। আগেও তো মেহের বলেছে, রুদ্রের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না। তাই হয়তো রুদ্রের প্রসঙ্গ উঠতেই মুহূর্তের মধ্যে মুখটা এমন হয়ে গেল।
পরিস্থিতি সামলাতে মেঘলা কথা ঘোরাতে যাবে, ঠিক তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা বাচ্চাটা হঠাৎ মুখ লাল করে উচ্চশব্দে কান্নার আওয়াজ তুলে উঠল।
মেহের ফোনের দিকে তাকিয়ে একটু তোতলাতে তোতলাতে হাঁপ ছেড়ে বলল,

“মেঘলা, আমার ছেলেটা কেমন যেন করছে… কেঁদে উঠল। আমি পরে তোকে কল দিচ্ছি, হ্যাঁ?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, । আগে ওকে সামলা…” মেঘলা আর কথা বাড়াল না। চট করে কলটা কেটে দিল।
ছেলেটার খিদে পেয়েছে ভেবে মেহের তাকে কোলে তুলে খাওয়াতে বসল। খাওয়ানো শেষে আলতো করে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিল সে। হালকা দোল দিতে দিতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডাইনিং আর লিভিংয়ের মাঝের খোলা জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেল।
যাওয়ার পথে হঠাৎ রুদ্রর বন্ধ রুমটার দিকে চোখ পড়তেই থেমে গেল মেহেরের পা। দরজাটার লকটা শক্ত করে আটকানো।
তাদের কেয়ারটেকার সুহানা রান্না শেষ করে দুপুরের খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে একে একে সাজিয়ে রাখছিলেন। সাধারণত তিনি প্রতিদিন সকালে চলে আসেন এবং বিকালের আগেই কিচেন পরিষ্কার করে পুরো অ্যাপার্টমেন্টের যাবতীয় টুকটাক কাজ গুছিয়ে বিদায় নেন। মেহেরকে ওদিক থেকে আসতে দেখে সুহানা হাতের কাজ থামিয়ে এপ্রোনটা খুলতে খুলতে বললেন, “ম্যাম, সব রান্না শেষ করে ঢেকে রেখেছি। আজকের মতো আমাকে যেতে হবে…”

মেহের ধীরস্বরে মাথা নেড়ে সায় দিল। তখন খেয়াল করল, তার কোলে থাকা ছেলেটা টানা কাঁদার পর এবার একদম শান্ত হয়ে গেছে। মেহের নিচু স্বরে বলল, “আচ্ছা, আপনি আসুন,” বলে সুহানাকে দরজার দিকে বিদায় জানাল।
কোলে থাকা ছেলেটা ততক্ষণে নিজের ছোট্ট নরম আঙুলগুলো মুখের ভেতর পুরে দিয়েছে। মেহেরের চোখ পড়তেই সে সঙ্গে সঙ্গে আলতো হাতে ছেলের ছোট্ট হাতটা ধরে মুখ থেকে আঙুলগুলো বের করে দিল। তারপর হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে রেখে একটু ঝুঁকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি ধমকের সুরে বলল,
“এই দুষ্টু! পেটে ব্যথা করবে, মুখে আঙুল দিচ্ছ কেন… হুম? একদম মুখে দেবে না…”
ছেলে অমনি একটু আঁকুপাঁকু করে ককিয়ে উঠল, যেন মেহেরের এভাবে মুখের কাছ থেকে হাত সরিয়ে দেওয়াটা সে মোটেই মেনে নিতে পারছে না। মেহেরকে পাত্তা না দিয়ে সে আবারও আঙুল মুখে পুরতে গেলে মেহের দ্বিতীয়বার তা সরিয়ে দিল। “একদম না! একদম না…” বলে আলতো করে ছেলের নাকের ডগাটা আঙুল দিয়ে টেনে দিল সে।

ঠিক এমন সময় রুদ্রর বন্ধ ঘরের দরজায় একটা ধাতব খটকা শব্দ হলো। লক খোলার সাথে সাথেই দরজা ঠেলে রুদ্র বাইরে বেরিয়ে এলো। তার পরনে ঢিলেঢালা ধূসর রঙের একটা ব্যাগি প্যান্টস আর ওপরে একদম পাতলা একটা সাদা টি-শার্ট। চোখ দুটি কিছুটা ফোলানো আর লালচে, দীর্ঘ ঘুমের স্পষ্ট ছাপ ছড়িয়ে আছে চোখে-মুখে। সে দু-হাত পেছনের দিকে টেনে শরীরটা ভেঙে একটা আলস্য ভরা ভারী আরমোড়া ভাঙল।
সামনে মেহেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও রুদ্র ধীর পায়ে, গম্ভীর মুখে সোজা তার দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল। পায়ের প্রতিটা শব্দ যেন মেহেরের কানে আরও স্পষ্ট হয়ে বাজতে লাগল।
রুদ্র যত কাছে আসছিল, মেহেরের অস্বস্তিটাও তত বাড়ছিল। অজান্তেই ছেলেটাকে বুকের সঙ্গে আরও একটু চেপে ধরল সে। চোখ তুলে একবার রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়েই আবার চোখ নামিয়ে নিল মেহের।
রুদ্র একেবারে সামনে এসে দাঁড়াতেই মেহের গলার স্বরটা একটু নিচু করে জিজ্ঞেস করল,

“আপনার… আপনার কি কিছু প্রয়োজন?”
রুদ্র নিজের এক হাত দিয়ে মুখটা ধীরে ধীরে ঘষে নিল। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও মেহেরের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটা একটুও নরম হলো না। বরং হাতটা নামিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মেহের কিছু বলার আগেই রুদ্র এক পা এগিয়ে এলো মেহেরের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হুম, প্রয়োজন তো অনেক কিছুই…তবে এখন প্রয়োজন ৬৫ পার্সেন্ট প্রপার্টি।”
কথাটা বলেই রুদ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে মেহেরের চোখের সামনে একটা ভাঁজ করা পেপার উঁচিয়ে ধরল।
মেহের থমকে গিয়ে প্রথমে কাগজটার দিকে তাকাল, তারপর তাকাল রুদ্রর নিষ্প্রাণ চোখের দিকে। রুদ্র একবার মেহেরের কোলে ধড়ফড় করতে থাকা ছোট ছেলেটার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল, তারপর সোজা মেহেরের চোখের দিকে চোখ রেখে শক্ত গলায় বলল,

“সাইন ইট।”
মেহেরের মুখে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। রুদ্রের কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এটা কী?”
“ইটস আ প্রপার্টি পেপার। আমি ইউএসএ-তে ব্যাক করছি… বাবার ইলেকশনের পর। আমাদের মধ্যে যত চুক্তি ছিল, সবকিছুর ইতি এখানেই টানা হোক।”
রুদ্রর গলায় কোনো দ্বিধা ছিল না। কথাগুলো বলার সময় একবারের জন্যও তার চোখে আক্ষেপের ছায়া পড়ল না। যেন মেহেরকে নয়, খুব সাধারণ কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কথাই জানাচ্ছে সে।
মেহের বড় বড় চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা যেন মাথায় ঢুকতে একটু সময় লাগল তার। কয়েক মুহূর্ত পরও কোনো কথা বের হলো না মুখ দিয়ে।
রুদ্র কাগজটা আরেকটু সামনে এগিয়ে দিয়ে আবার বলল,

“এখানে লেখা আছে, তোমার প্রপার্টির ৬৫ পার্সেন্ট এখন থেকে আমার।”
মেহের এক সেকেন্ডের জন্যও ইতস্তত করল না। নিজের সিদ্ধান্তটা নিয়েও একবার ভাবল না। মুখে রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, এমনকি কষ্টের সামান্য ছাপও নেই।
ডান হাতটা দিয়ে ছেলেটাকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখল সে। তারপর বাঁ হাতটা বাড়িয়ে রুদ্রর হাতে থাকা কাগজটা এক টানে নিজের হাতে নিয়ে নিল।
ডাইনিং টেবিলের পাশে একটু ঝুঁকে, টেবিলে থাকা পেনের ঢাকনাটা টেনে খুলে একদম ঠাণ্ডা মাথায় পেপারের নিচের নির্দিষ্ট জায়গায় এক এক করে নিজের সই বসাতে লাগল।
রুদ্র থমকে মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহের কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো আপত্তিও জানাল না। ব্যাপারটা রুদ্রকে বেশ অবাক করল।
মেহেরকে থামানোর মতো করে একটু বিস্মিত গলায় রুদ্র বলল,
“দেখবে না? এখানে কী লেখা?”
মেহের কলমের খসখস শব্দ তুলে সই করতে করতেই কোনোদিকে না তাকিয়ে জবাব দিল, “প্রয়োজন নেই…”

রুদ্র ভ্রূ কুঁচকে আবার বলল, “যদি সব কিছু নিয়ে নিই তোমার থেকে? তোমাকে নিঃস্ব করে দিই?”
মেহেরের শুষ্ক ঠোঁটের কোণে মুহূর্তের জন্য খুব হালকা, অতি ধূর্ত এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেই বাতাসে মিলিয়ে গেল। সই শেষ করে সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রুদ্রর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাগজটা আবার তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“শূন্যকে বিয়োগ করার চেষ্টা করছেন…?”
রুদ্র চরম অবাক হয়ে মেহেরের হাত থেকে কাগজটা এক প্রকার টেনে নিল।
মেহের ছেলেকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমার কাছে আমার ছেলে আছে, ক্যাপ্টেন সাহেব। দুনিয়ার কোনোকিছুই আর চাই না আমি। আপনি যদি এখানে আমার সব প্রপার্টিও লিখে নিতেন, তাহলেও আমি একটা কথাও বলতাম না।”

রুদ্র পরের মুহূর্তেই নিজের মুখের অবাক হওয়া ভাবটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মেহেরের এই উদাসীনতা যেন তার ভেতরের সুপ্ত জেদটাকে উল্টো হিংস্রভাবে উসকে দিল। তার চাউনিতে, চোখ-মুখে আর কন্ঠে এক অদ্ভুত মাদকতা আর তীব্র অধিকারবোধের জেদ খেলে গেল।
সে ধীরপায়ে মেহেরের একদম মুখের কাছাকাছি ঝুঁকে এলো। তার শরীরের উষ্ণ আঁচ মেহেরের গা ছুঁয়ে গেল। রুদ্র নিজের চোখ দিয়ে একবার হাতে থাকা সই করা কাগজটার দিকে ইশারা করল, তারপর মেহেরের কানের একদম কাছে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,

“কনগ্র্যাচুলেশনস, মিস অ্যারোফোবিয়া… কনগ্র্যাচুলেশনস। তুমি অনেক কিছু হারালে… আর আমি আজকের পর থেকে অনেক কিছু পেলাম। থ্যাংকস, মিস অ্যারোফোবিয়া।”
রুদ্রর কণ্ঠে কেমন যেন অদ্ভুত এক বিজয়ের সুর ছিল। কথার আড়ালে যেন অন্য কোনো হিসাব লুকিয়ে আছে, যা মেহের তখনও বুঝতে পারল না।
সে এত কাছে চলে আসায় মেহের ভেতরে ভেতরে হাঁসফাঁস করে উঠল, তার পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য যেন অবশ হয়ে এলো। বুকটা গভীর এক ঝটকায় ছ্যাঁৎ করে উঠল তার। সে পা ফেলে ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও রুদ্রর চোখের ওপর রাখা নিজের চোখ সরাল না।
রুদ্র ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে আবার বলল, “ইটস ইয়োর লস, মিস অ্যারোফোবিয়া। সারাজীবন আজকের এই দিনটার কথা তোমার মনে থাকবে…”
ঠিক এমন সময় রুদ্রর ট্রাউজারের পকেটে থাকা ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। হঠাৎ বেজে ওঠা সেই শব্দে থমথমে ড্রয়িংরুমের নীরবতা এক মুহূর্তেই ভেঙে গেল।
কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই রুদ্র পকেট থেকে ফোনটা বের করল। হাত বাড়িয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল, তারপর আর মেহেরের দিকে ফিরেও না তাকিয়ে ফোনটা কানে চেপে ধরে সোজা নিজের রুমের দিকে হেঁটে চলে গেল।

রুদ্র সেখান থেকে চলে গেলেও তার বলা কথাগুলো ঘরের বাতাসে ঘুরেফিরে বারবার মেহেরের কানের কাছে গমগম করে বাজতে লাগল। ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় আর এক অদৃশ্য আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। মেহের নিজের নিচের ঠোঁটে দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড় বসাল। পর পর কয়েকটা লম্বা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
তারপর নিজের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে স্বগতকণ্ঠে বলল, “নিয়ে নিন আপনার যা নেবার… আর কয়েকটা দিন ….. মাসও না, আমি চলে যাব আমার ছেলেকে নিয়ে এখান থেকে… দূরে, অনেক দূরে… ক্যাপ্টেন সাহেব।”
সায়েদ বাড়ি…..
মেহেরের সাথে ফোনে কথা শেষ করে মেঘলা মাত্রই নিজের ঘর থেকে বের হয়েছে, ঠিক এমন সময় নিচ থেকে মেহেক হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এলো। তার বুকটা ভয়ে দড়ফড় করছিল, হাত-পা কাঁপছিল। সে মেঘলাকে দেখেই বেশ আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল,

“আপু! বড় বাবা সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছেন! তাড়াতাড়ি আসো….”
কথাটা শোনামাত্রই মেঘলার মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল, বুকের ভেতর রক্ত হিম হয়ে এলো। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে মেহেকের সাথে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো।
আজ সায়েদের বাড়িটা বেশ ফাঁকা। বাড়ির চারপাশে কেমন একটা সুনসান নীরবতা নেমে আছে। মাশফি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে বের হয়েছে। দেশে আসার পর থেকে সেভাবে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বের হওয়া বা বসে আড্ডা দেওয়া হয়ে ওঠেনি তার। তাই আজ সুযোগ পেয়ে তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে গেছে। তাড়ার মধ্যে নিজের ফোনটাও ঘরেই ফেলে গেছে সে।
অন্যদিকে মির্জা ,নূর আর তার ছেলে ওবায়দাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গেছে। অনেকদিন পর সেখানে যাওয়া হয়েছে, তাই আজ আর তাড়াহুড়ো করে ফেরার সম্ভাবনাও নেই। সম্ভবত রাতের খাবার খেয়ে সেখানেই থাকবে তারা।

সব মিলিয়ে বাড়িটা আজ অন্যদিনের তুলনায় বেশ শান্ত। লোকজনের আনাগোনা নেই, কারও কথাবার্তার শব্দ নেই।
মেঘলা নিচে নেমে দেখাল সায়েদ ইমরান সাহেবকে নিচতলার বসার ঘরের সোফায় কোনোমতে ঢলে পড়া অবস্থায় শুইয়ে-বসিয়ে রাখা হয়েছে। উনার গায়ের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কপালে আর গালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। মেঘলা সামনে এগিয়ে গিয়ে ভয়ে ধরা গলায় শুধাল, “বড় বাবা! বড় বাবা, কী হয়েছে তোমার? ঠিক আছ তুমি?”
ইমরান সাহেব ততক্ষণে চোখ-মুখ উল্টে ফেলেছেন, শরীরের পুরো শক্তি যেন এক লহমায় ছেড়ে দিচ্ছে। এক হাত দিয়ে বুকের বাঁ পাশটা খামচে ধরে তিনি তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছেন আর অস্পষ্ট শব্দে গোঙাচ্ছেন।
উনার এমন দশা দেখে মেঘলা পাশ থেকে মেহেককে তাড়া দিল, “মেহেক, পানি দে!”

মেহেক হাতের কাছে থাকা কাঁচের জগ থেকে কাঁপাকাঁপা হাতে এক গ্লাস পানি ঢেলে সায়েদ ইমরান সাহেবের ঠোঁটের কাছে বাড়িয়ে দিল। পাশে সোফায় বসে থাকা সায়েদ কামিনী হাত-পা ছুড়ে ডুকরে কেঁদে উঠে হায়-হুতাশ করতে লাগলেন। “মাশফি কোথায় ? ওকে কল দে! এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে…..”
মেঘলা এক মুহূর্ত থমকে গেল। মাশফির ফোনে রেখেই বাইরে বের হয়ে গেছে, ফলে এই মুহূর্তে তাকে ফোনে পাওয়া পুরোপুরি অসম্ভব। মেঘলা নিজের মনের ভয় চেপে একটু শক্ত গলায় বলল, “বড় মা, এখন আর কারও জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। বাবাও তো বাড়িতে নেই, বাজারে গেছেন। আমি এখনই অ্যাম্বুলেন্সে কল দিচ্ছি।”

বলেই মেঘলা সময় নষ্ট না করে নিজের ফোন বের করে সিলেট আল-হারামাইন হাসপাতালের ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন নম্বরে সরাসরি ডায়াল করল। ওপাশ থেকে অপারেটর রিসিভ করতেই দ্রুত বাড়ির ঠিকানা আর ইমরান সাহেবের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানিয়ে একটা আইসিইউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বলল।
রাজনৈতিক গোলযোগ আর অবরোধের কারণে রাস্তায় যান চলাচল বেশ কম ছিল, তাই মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাইরেন বাজিয়ে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স এসে বাড়ির প্রধান ফটকে দাঁড়াল। ড্রাইভার আর হাসপাতালের অ্যাটেন্ডেন্ট ভেতরে এসে ইমরান সাহেবকে সাবধানে স্ট্র্যাচারে তুলে গাড়ির ভেতরে নিল। বাড়ির পুরুষ মানুষ কেউ না থাকায় শুধু মহিলারা—মেঘলা, মেহেক আর সায়েদ কামিনীই তাড়াহুড়ো করে উনার সাথে অ্যাম্বুলেন্সে উঠলেন।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ট্রলির চাকা দ্রুত ঘুরিয়ে ইমরান সাহেবকে সোজাসুজি ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নেওয়া হলো। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা দ্রুত অক্সিজেন সাপোর্ট দিলেন, হাতে ক্যানুলা বসালেন এবং বেশ কয়েকটি প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ইসিজি করলেন।
কয়েক ঘণ্টা পর ইমার্জেন্সির ভারী পর্দা সরিয়ে ডাক্তার বাইরে এলেন।
ডাক্তার মেঘলার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“আপনাদের রোগীর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। উনার প্রেশার আর পালস অনেকটাই কমে গেছে। এখন উনাকে দ্রুত সিসিইউতে নিতে হবে। আগামী ৭২ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে আবারও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি আছে।”

সারাদিন হাসপাতালে ইমার্জেন্সি থেকে সিসিইউ ছোটাছুটি আর হাজারটা পেপারওয়ার্কের ঝামেলায় মেঘলা মেহেরকে ফোন দেওয়ার মতো সুযোগই পায়নি। সে নিজেও ছিল প্রচণ্ড মানসিক চাপে, ফলে সায়দ ইমরান সাহেবের এমন সংকটাপন্ন অবস্থার খবরটা মেহেরের কাছে আর পৌঁছায়নি।
রাত তখন প্রায় তিনটা। পুরো অ্যাপার্টমেন্ট নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে।
মেহের তখন নিজের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বিকেলের দিকে প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে শরীরজুড়ে তীব্র ব্যথা উঠেছিল বলে ডাক্তার দেওয়া স্ট্রং পেইনকিলার খেয়ে শুয়েছিল সে। ওষুধের প্রভাবে আজ তার ঘুমটা স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশি গভীর। বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে মেহের—চারপাশের কোনো শব্দই যেন তার ঘুমের দেয়াল ভেদ করে তার কাছে পৌঁছাতে পারছে না।

হঠাৎ মেহেরের পাশেই শুয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটা উচ্চশব্দে কেঁদে উঠল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘরে কান্নার আওয়াজ প্রতিধ্বনি তৈরি করছে, অথচ মেহেরের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে নিশ্চুপ হয়ে ঘুমাচ্ছে। টানা কাঁদতে কাঁদতে ছোট বাচ্চাটার শ্বাস যেন আটকে আটকে আসছে। “ওয়াঁ… ওয়াঁ…” শব্দে তার বুক-পিঠ দ্রুত ওঠানামা করছে, আর নিশ্বাস আটকানোর উপক্রম হচ্ছে। দুটো ছোট্ট হাত আর পা শূন্যে ছুড়ছে অনবরত। কান্নার নোনা পানি দু-চোখের কোণ বেয়ে গাল গড়িয়ে একদম কানের লতিতে গিয়ে জমা হচ্ছে।
রুদ্রর ঘুম আবার খুব পাতলা। সামান্যতম শব্দেও তার ঘুম ভেঙে যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস, আজও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা এই ছোট্ট প্রাণটার টানা কান্না শুনে সে চোখ খুলে সোজা বিছানায় উঠে বসল। চরম বিরক্তি নিয়ে চোখ জোড়া রগড়ে নিয়ে সে হেঁটে হেঁটে মেহেরের রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রাতের এই নিস্তব্ধতায় বাচ্চার অনবরত কান্না শুনে তার কপালের রগ ফুলে উঠল। ভুরু জোড়া কুঁচকে সে বিরবিড়িয়ে বলে উঠল, “যখন দেখো তখন কাঁদে! এফএম রেডিও নাকি যে একবার শুরু হলে বন্ধ হওয়ার নামই নেয় না…. ”
দরজার চৌকাঠে এক পা রাখতেই হঠাৎ নিজেকে থামিয়ে নিল রুদ্র। আবার পা পিছিয়ে এনে নিজের মনেই যুক্তি দাঁড় করাল,

“আমার কী? কাঁদুক যত ইচ্ছা কাঁদুক…. ওর মা কী করছে? হুম? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নাক ডাকছে? আর আমি গিয়েই বা কী করব? সারাক্ষণ ‘আমার ছেলে, আমার ছেলে’ করে মাথায় তুলে রাখে, এখন সামলাক না নিজের ছেলেকে….”
কথাটা ভেবে রুদ্র নিজের রুমের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু ঠিক তখনই পেছন থেকে বাচ্চাটির কান্নার তোড় আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এবার দম আটকে যাবে। রুদ্রর অবচেতন মনটা আর মানল না। চরম বিরক্তি নিয়ে কপালে কয়েকটা ভাঁজ ফেলে সে আবার মেহেরের ঘরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। মাঝরাতে একটা একা মেয়ের ঘরে হুট করে ঢুকতে তার মনের ভেতরের পুরুষসুলভ সংকোচ আর দ্বিধা কাজ করছিল। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে ঘরের দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে পা দিল সে।
ভেতরে এগিয়ে গিয়ে দৃশ্যটা দেখে রুদ্রর চোখ আটকে গেল। বিছানায় ছোট্ট প্রাণটা কোনো থামাথামি ছাড়াই একটানা কেঁদে হাত-পা আছড়াচ্ছে, ফর্সা গাল দুটো অতিরিক্ত কাঁদাতে একদম টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। আর তার ঠিক কয়েক ইঞ্চি পাশেই মেহের গায়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে নিঝুম হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে—বাচ্চার এই গগনবিদারি কান্নায় তার ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ তো দূর, সামান্য নড়াচড়াও করছে না সে।

“মিস অ্যারোফোবিয়া… মিস অ্যারোফোবিয়া… এই মিস অ্যারোফোবিয়া, ওঠো….”
রুদ্রর কয়েকবারের ডাকাডাকিতেও মেহের সাড়া দিল না, একটু নড়েচড়েও বসল না। বাচ্চার অনবরত কান্না দেখে রুদ্র কিছুটা অসহায় চোখে এক মুহূর্ত তাকাল, তারপর বাচ্চার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই! অ্যারোফোবিয়ার ছেলে, একদম কান্না করবি না…”
কথাটা যেন সেই ছোট্ট প্রাণটার কান পর্যন্ত পৌঁছাল। সে সত্যি বুঝতে পারল কি না কে জানে, তবে হঠাৎই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে শান্ত হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দ্বিগুণ শক্তিতে নিজের হাত-পা ছড়াছড়ি শুরু করে দিল।
রুদ্র কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল….কোলে তুলবে কি তুলবে না। শেষমেশ দ্বিধা কাটিয়ে হাত দুটো বাড়িয়ে পুতুল সদৃশ শরীরটাকে কোলে তুলে নিল। এই ছোট্ট শরীরটা তার হাতের চেয়েও ছোট । কোনোমতে নিজের বুকের কাছে এনে ঠেকাল তাকে।
ঠিক তখনই কারও বুকের উষ্ণতা আর শরীরের স্পর্শ পেয়ে ছোট্ট প্রাণটার কান্না থেমে গেল। একটু আগেও কাঁদতে কাঁদতে যে ছোট্ট শরীরটা কেঁপে উঠছিল, সেটাও ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এল। শিশুটি চুপচাপ গা ঘেঁষে রইল।

টানা কাঁদাতে বাচ্চার দুই গাল একদম লাল হয়ে আছে। সে থমকে গিয়ে বড় বড় ড্যাবড্যাব চোখে রুদ্রর মুখের দিকে তাকাল। রুদ্র নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে তার চোখের নোনা পানিটুকু মুছে দিল। তারপর আরও একবার বিছানায় নিঝুম হয়ে পড়ে থাকা মেহেরের দিকে তাকাল। রুদ্র বুঝতে পারল মেহের গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।
সে স্বগতকণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল, “একে যদি কেউ… এখন পাচারও করে দেয়, তাও টেরও পাবে না।”
সে আর মেহেরকে না ডেকে ধীরে ধীরে বাচ্চাটিকে নিজের বুকের সাথে ধরে মেহেরের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের ঘরে নিয়ে এলো।
রুদ্র হালকা হেসে বাচ্চার গালের কাছে মুখ এনে বলল, “এইই কুদ্দুস বয়রাতি! সারাদিন শুধু বিড়ালের বাচ্চার মতো ম্যাঁও ম্যাঁও করিস কেন? তুই কি বিড়ালের বাচ্চা? হুম?”
বাচ্চাটা ঠোঁট উল্টে আওয়াজ তুলল—”অ্যম্মম…”
“কী? অ্যম্মম…অ্যম্মম শুরু করছিস? কথা বলতে পারিস না, তাও এত জোরে কান্না করিস… কেন, হুম?” রুদ্র আদুরে ভঙ্গিতে ছোট্ট প্রাণটাকে একটু ওপরে উঁচিয়ে ধরল। তারপর নিজের গালের সাথে বাচ্চার নরম গালটা ঘষে দিল।
রুদ্রর মুখটা একদম ক্লিন শেভ করা, তাই সেখানে ছোট বাচ্চার দাড়ি ফোটানোর বা ব্যথা পাওয়ার কোনো কারণই নেই। তাও রুদ্র নিজের হাত দিয়ে বাচ্চার গালটা পরখ করে নিল—ব্যথা পেল কি না।

” না, ব্যথা পায়নি”
রুদ্র বাচ্চাটাকে নিয়ে রুমের সাথে লাগোয়া ব্যালকনির দিকে এগোতে লাগল। যাওয়ার পথে চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলের ওপর— পড়ে আছে মেহেরের সই করা সেই পেপারটা। রুদ্র খানিকটা সময় কাগজটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি হাসল। তারপর কোলজুড়ে থাকা ছেলেকে ইশারা করে বলল, “আপনার মাকে জব্দ করার অস্ত্র ওইটা …”
বাচ্চাটি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নিজের মুখ দিয়ে ‘চুপ চুপ’ করে চোষার মতো শব্দ করে উঠল।
রুদ্র মুখটা আরেকটু নামিয়ে বলল, “তোমার মা বলেছিল না… তার কিছু হারানোর নেই? দ্যাখো, সে হেরে গেছে। আজকে আমার কাছে হেরে গেছে। তোমার মা ভীষণ বোকা, বুঝলে? ভীষণ! অন্তত পেপারটায় একবার চোখ বোলানো উচিত ছিল তার।”
ছেলের গালের সাথে নিজের নাক ঘষে গভীর এক প্রশ্বাসের সাথে রুদ্র বলল, “উম্মম… আমার… আমার কিছু হারাতে দিই না। আর যদি তা প্রিয় হয়, তখন তো একদমই না? দেখি সে কী করে… আমার কাছ থেকে আমার সুখ কীভাবে কেড়ে নেয়….”
কথাটা শেষ করে সে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ব্যালকনিতে বেরিয়ে এলো। রাতের আকাশে থালার মতো গোল চাঁদ উঠে বসে আছে। তার চারপাশের অসংখ্য উজ্জ্বল ও অনুজ্জ্বল তারার মাঝে চাঁদের আলো চারপাশটা ভাসিয়ে দিচ্ছে।
বাচ্চাটি আবার নিজের আঙুলটা চুষতে মুখে পুরতে গেলে রুদ্র আলতো হাতে সরিয়ে দিল,

“ছিঃ! এসব কী? আঙুল কেন খাবি? তুই বাপের মতো তোর মায়ের সব সুখ-শক্তি খাবি, বুঝলি?”
—– “আআআআহহহম… ববববাাাা… ”
——-“তোকে শিখিয়ে দিচ্ছি, ও খাবার খেতে গেলে কান্না করবি। বসলে কান্না করবি। কোলে নিলে কান্না করবি। শাওয়ার নিতে গেলে কান্না করবি! শুধু কান্না করবি না আমি কোলে নিলে… বুঝলি?”
—- “উম্মম্ম”
—–“এইতো, হয়েছে! মায়ের পক্ষ নিবি না, একদম নিবি না, ওকে? ওওওওও…”
রুদ্র নিষ্পাপ প্রাণটার দিকে এবার আরেকটু গভীর নজর ফেলে তাকাল। বুকের ভেতরে অজানা এক তোলপাড় সৃষ্টি হলো তার। এত মায়াবী চেহারা? এত মায়াবী? রুদ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, নিজের ঠোঁট দুটি এনে ছেলের থুতনিতে ছোঁয়াল।
আবারও আদুরে গলায় বলল, “একদম অ্যারোফোবিয়ার মতো হবি না…”
ছেলে কোলজুড়ে হাত-পা ছড়াছড়ি করে উঠল।
—–“হুম, নো দুষ্টুমি! আমরা সবাইকে মিলে জ্বালাব। আপনি আমাকে জ্বালাবেন না, বুঝলেন?”
—–” উম্মম্মম…”

রুদ্র ছেলেকে বুকের সাথে আরেকটু শক্ত করে চেপে টেনে নিল। বুকে চেপে ধরে সে অনুভব করল বাচ্চাটার ছোট্ট হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন, যা ঠিক তার নিজের হৃদস্পন্দনের তালে তাল মিলিয়ে স্পন্দিত হচ্ছে।
রুদ্র নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলল, ” বাবা একটু স্বার্থপর… বাবা তোমাকে দেখার পর বাবার বুকটা একদম পূর্ণ হয়ে গেছে। বাবা তোমাকে কথা দিচ্ছে, তোমার কিচ্ছু হতে দেবে না। মিস অ্যারোফোবিয়া যদি চলে যেতে চায়, তাহলে তাকে দুজন মিলে আটকে রাখব, ওকে?”
“ওউউউ…।” এইতো”
ছেলের কপালে রুদ্র আবারও নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। পরম মমতায় তার কপাল স্পর্শ করতেই বুকজুড়ে নেমে এলো এক অদ্ভুত শান্তি। হঠাৎই রুদ্রর নিজের দুই চোখ আবেগে ভিজে উঠল। তবে সাথে সাথেই নিজেকে সামলে নিয়ে নিজেকে বলল, ‘নো রুদ্র, নো! ইউ আর ফুলফিল নাউ… একদম না’
নিজেকে সামলে নিয়ে সে আবার হালকা গলায় ছেলেকে বলল, “বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে, পাখি? পাখি, তুমি বাবার ছোট পাখি….”
ছেলের ভার নিয়ে ধীরপায়ে ব্যালকনিতে পায়চারি করতে লাগল রুদ্র। সে খেয়াল করল, তার বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ছোট শরীরটা একদম নিশ্চিন্তে তার ওপর ভর দিয়ে আছে, ঠিক যেন নিজের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা চিনে নিয়েছে। ঠিক তখনই বাচ্চার পেটের ভেতর থেকে হালকা একটা গুরগুর শব্দ ভেসে এলো, খিদে পেয়েছে তার।

“একটু শান্ত হও, বাবা… তোমার মা ঘুমাচ্ছে,” বলে সে আবার পায়চারি শুরু করল।
রুদ্রর মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা মস্ত বড় এক খালি জায়গা যেন হঠাৎ করেই কেউ পূর্ণ করে দিল। পিতৃত্বের এই অমোঘ অনুভব আগে কখনো এভাবে তাকে গ্রাস করেনি। সে জানে না কেন এমন করছে বা কী করছে; সে শুধু জানে, তার এই রক্তজ প্রাণটাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে খুব করে চায়। আর এই ছোট্ট বাচ্চাটার সাথে সাথে তার সেই অ্যারোফোবিয়া গার্লকেও সে ততটাই নিজের করে চায়, কোনো মূল্যে তাদের হাতছাড়া হতে দেবে না।
তারপর হঠাৎ রুদ্র থমকে দাঁড়াল। ব্যালকনির রেলিংয়ে শরীরটা হালকা হেলান দিয়ে দাঁড়াল সে। ছেলেকে আলতো করে একটু উঁচুতে তুলে ধরে চাঁদের দিকে ইশারা করে বলল, “ওই দেখ, চাঁদ… ওই যে… মাই বিল্লি…”

অস্পষ্ট স্বরে আধো আধো বুলি ঝরাতেই রুদ্রর কোলের ছোট্ট মানুষটার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। একবার চাঁদের দিকে তাকাল, পরক্ষণেই আবার রুদ্রর মুখের দিকে। তাকিয়েই ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা ছুড়তে লাগল সে। বোঝাই যাচ্ছে, চাঁদটা দেখে বেশ খুশি হয়েছে। এতটুকু একটা প্রাণ, অথচ আনন্দটা যেন পুরো শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
রুদ্র থমকে গেল, এতদিনে এই প্রথম সে ছেলেকে এভাবে হাসতে দেখছে। মুহূর্তের জন্য যেন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেল। বিস্ময়মাখা চোখে নিজের এই ছোট্ট রক্তপিণ্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে, বুকের ভেতর ভালোবাসা যেন এক বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো উপচে পড়ল।
যে মানুষটা কয়েক মিনিট আগেও ভাবছিল, ছেলে হয়তো তার কোলে স্বস্তি পায় না… তাকে কোনদিন বাবা বলে ডাকবে না। সেই মানুষটাই পরের মুহূর্তে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। টুপটাপ করে ছেলের দুই গালে একের পর এক চুমু এঁকে দিল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৫

“আহাম্ম…”
বাবার আদর পেয়ে ছোট্ট ছেলেটা হাত-পা ছুড়তে লাগল। ছোট্ট ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। হাসতে হাসতেই বাবার নাকটা মুঠো করে ধরল।
রুদ্র আলতো করে নিজের নাকটা ছেলের নাকের সঙ্গে ঘষে দিয়ে পরম ভালোবাসায় ফিসফিস করে বলল, “ঘুম নেই, জনাব আপনার? হুম? আপনার মা তো নাক ডেকে আরামে ঘুমাচ্ছে… আর আপনি ঠিক রাত তিনটায় কোল দখল করে হাজির! বাবাকে ডিউটিতে বসিয়ে নিজে চাঁদ দেখবেন, তাই না?”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৬ (২)