Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৮

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৮
মারিয়াম ফুল

মেহের রুদ্রর দিকে একবার তাকাল। তারপর মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, ‘এই লোকটা… এখন নির্ঘাত আমাকে কথা শোনাবে! এমনিতেই তো আমাকে কথা শোনানোর একটা সুযোগও হাতছাড়া করে না।’
তবে মেহের মুখে রুদ্রকে কিছুই বলল না। কিচেন টেবিলের উঁচু চেয়ারটা থেকে সে নেমে যেতে চাইল। কিন্তু বিপদ হলো অন্য জায়গায়। মেঝে থেকে চেয়ারের উচ্চতা বেশ খানিকটা ওপরে। এখন যদি সে হুট করে নামতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তবে নিচে পড়ে যাওয়ার ষোলো আনা সম্ভাবনা। আর যদি নামতে গিয়ে সোজা রুদ্রর গায়ের ওপর গিয়ে পড়ে? না না, এই বিদঘুটে কাণ্ডটা রুদ্রর সামনে ঘটার কথা মেহের ভাবতেও পারে না! সে ভেতরে ভেতরে ভীষণ উসখুস করতে লাগল। পাজামার খুঁট দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করল। এদিকে রুদ্র এমনিতেই তার এত কাছে দাঁড়িয়ে আছে, তার ওপর মেহেরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
রুদ্র নিজের চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে শরীরটা একটু হালকা করে পিছিয়ে নিল। মেহেরকে চেয়ার থেকে নামার জন্য এমন নানাবিধ কসরত করতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে হালকা, বাঁকা এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে মুখে কোনো কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে নামল। তারপর মেহেরের সামনে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত , ধীর গলায় বলল, “হাত ধরো।”

মেহের মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিজের জেদ বজায় রেখে বলল, “আমি নিজেই পারব।”
“হুঁ, আমি তো দেখছি কেমন পারছ” রুদ্রর কণ্ঠে খেলা করল মৃদু কৌতুক, সঙ্গে মিশে রইল চাপা পরিহাস।
মেহের চোখ-মুখ কুঁচকে অভিমানের সুরে বলল, “সব দোষ আপনার! দেখুন তো কত ওপরে চেয়ারটা… আমি আপনাকে বলেছিলাম আমাকে এত উঁচুতে তুলতে?”
রুদ্র মেহেরের চোখের দিকে আরেকটু নিবিড় , গভীর দৃষ্টি স্থাপন করল। তার চোখজোড়ায় যেন থমথমে ভাব আর এক অদ্ভুত মায়াবী আলো খেলা করে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল, “দোষ যখন করেছি, সেটা শুধরে নেওয়ার জন্যই তো হাত বাড়িয়েছি। হাতটা দাও।”
মেহের আর তর্ক বাড়াল না। একটু ইতস্তত করে নিজের ডান হাতটি বাড়িয়ে রুদ্রর চওড়া, উষ্ণ হাতের তালুর ওপর রাখল। রুদ্র আলতো কিন্তু শক্ত বাঁধানোতে মেহেরের হাতটি আঁকড়ে ধরে তাকে চেয়ার থেকে সাবধানে নিচে নামিয়ে আনল। মেঝেতে পা ছোঁয়াতেই রুদ্র মেহেরের বেশ কাছাকাছি এসে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “এমনি এমনি তোমাকে চুনোপুটি বলি না!”

রুদ্রর কথায় মেহেরের মনে হলো, তার পিত্তি যেন জ্বলে উঠছে। সে মোটেও ততটা খাটো নয়, যতটা রুদ্র ইচ্ছে করে তাকে বোঝাতে চাইছে। কথার আড়ালে স্পষ্ট অপমানের সুর, যেন সুযোগ পেলেই তাকে খাটো করে দেখানোই রুদ্রর একমাত্র উদ্দেশ্য।
মেহের সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। পাল্টা জবাব দিয়ে বলল, “আমিও তো আর আপনাকে এমনি এমনি তালপাতার সেপাই বলি না!”
“আমি মোটেও খাটো নই। বরং আপনি একটু বেশিই লম্বা। আমি নিশ্চিত, আপনাদের বংশের লোকজন রাজাকার ছিল, পাকিস্তানের লোক ছিল। তা না হলে এত লম্বা হন নাকি?”
মেহের একটুও থামল না। রুদ্রর দিকে তাকিয়ে আরও গম্ভীর মুখে বলল,
“আপনি দেশদ্রোহী। দেশের স্বার্থে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করে দেওয়াই উচিত আমার।”

রুদ্রের মেহের কথা সহ্য হলো না, সে নাকি রাজাকার…? না… তার দাদার বাবার চাচাতো ভাই নাকি মামাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিল, সে তো শুনেছে। সেই জন্য সে মুক্তিযোদ্ধার বংশধর… রুদ্র মেহেরকে কিছু বলতে যাবে….
ঠিক তখনই দোতলা থেকে এক ফোঁটা নিষ্পাপ প্রাণের করুণ কান্নার শব্দ ভেসে এল। রাত গভীর, সেই রাতের জমাট নীরবতা চিরে অবুজ শিশুটির বিলাপ যেন একটু বেশিই স্পষ্ট হয়ে ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ল। মেহের চকিতে রুদ্রর দিকে তাকাল। খেয়াল করল, রুদ্র আগে থেকেই তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। মেহের কিছুটা মিনমিন করে বলল, “মনে হয় ঘুম ভেঙে গেছে… ছেলেকে একা রেখে এসেছি তো।”
কথাটা শেষ করে আবারও রুদ্রর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই মেহের খেয়াল করল,পাশে রুদ্র নেই….. আরে! লোকটা গেল কই? মেহের চোখের পলকে চারপাশ ঘুরিয়ে রুদ্রকে খুঁজতে লাগল—
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ক্যাপ্টেন সাহেব এভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন কীভাবে? খুঁজতে খুঁজতেই মেহেরের চোখ গিয়ে পড়ল সিঁড়ির দিকে। রুদ্র ততক্ষণে দ্রুত ও দীর্ঘ পদক্ষেপে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ওপরের দিকে উঠে গেছে।
মেহের একটুও সময় নষ্ট না করে রুদ্রর পেছন পেছন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। মিনিট খানেকের মধ্যে সে রুদ্রর পিছু পিছু ঘরে গিয়ে দাঁড়াল। ততক্ষণে ঘরে ঢুকে রুদ্র বিছানা থেকে সেই ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটিকে নিজের প্রশস্ত কোলজুড়ে তুলে নিয়েছে।

মেহের দরজায় দাঁড়িয়ে থমকে গেল। সে নিশব্দে খেয়াল করল, রুদ্র বাচ্চাটিকে ভীষণ নিবিড় মায়ায় বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেছে। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে বাচ্চাটাকে কে হালকা দুলিয়ে দুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
এক মুহূর্তের জন্য মেহেরের বুকের ভেতরে অচেনা এক মোচড় দিয়ে উঠল। দৃশ্যটার দিকে তাকালে যে কেউ বলবে—এক বাবা তার কলিজার টুকরোকে আগলে রাখছে! তাদের দুজনের চেহারার গড়নে আর অবয়বে যেন বাবা-ছেলের এক অদ্ভুত, অলৌকিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। মেহের হঠাৎ ভীষণ ঘাবড়ে গেল। ঝড়ের গতিতে তার মাথায় একটা অনুভূতি খেলে গেল।
অন্তুর শূন্য স্থানটা রুদ্র যেন অলক্ষে দখল করে নিচ্ছে… বহু আগেই হয়তো ……. না চাইতেও এই এতিম বাচ্চাটার সাথে রুদ্রর এক অদৃশ্য ভালোবাসার সুতো জড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি ক্ষণে।
মেহেরের নারীমন আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চিঁচিঁ করে বলে উঠল—এখানে কোনো কিছুই আর আগের মতো স্বাভাবিক নেই। কিংবা এতদিন যা কিছু অস্বাভাবিক বলে মনে হতো, আজ সেটাই নির্মম স্বাভাবিকতা হয়ে তার সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে।

মেহেরের হঠাৎ মনে হলো, রুদ্রর এই অপরিসীম যত্ন, সুরক্ষা আর অকৃত্রিম ভালোবাসা তার বা তার সন্তানের প্রাপ্য নয়। রুদ্র কেন এত কিছু করবে? একজন ডিভোর্সি, বিধবা নারীর সন্তানের জন্য সে কেন নিজেকে এভাবে উজাড় করে দেবে?
মেহের নিজের দ্বিধাদ্বন্দ্ব সামলে নিয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেল বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নেওয়ার জন্য। ভাবখানা এমন, যেন রুদ্রর কোলে আর এক সেকেন্ডও তার ছেলে থাকলে পৃথিবীর সব আনবিক স্থিতি এক মুহূর্তে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে!
সে দুই হাত বাড়িয়ে রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “আমাকে দিন… আমাকে দিন, আমি পারব ওর কান্না থামাতে। হয়তো ঘরে একা রেখে নিচে গিয়েছিলাম বলে ভয় পেয়ে গেছে।”
রুদ্র শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে।”
বাচ্চাটিকে মেহেরের কোলে তুলে দিতে গিয়ে রুদ্র হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তার হাতের তালুতে যেন এক অদ্ভুত উষ্ণ তরল পদার্থের স্পর্শ লাগল! রুদ্র ভুরু কুঁচকে বাচ্চার পরনের জামা ও ডায়াপারের অংশটুকু একটু তুলে দেখতেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
মেহের ততক্ষণে রুদ্রর হাতের অবস্থা আর বাচ্চার ভাবগতিক দেখে বুঝে ফেলেছে তার গুণধর পুত্র কোলজুড়ে ঠিক কী অপকর্মটি ঘটিয়েছে!

রুদ্র চোখ দুটি ছোট ছোট করে মেহেরের দিকে তাকাল। নিজের গলার স্বরে কৃত্রিম ক্ষোভ আর বিরক্তি এনে বলল, “ওর কি সব অটো-সিস্টেম হয়ে গেছে নাকি? না মানে, আমি কোলে নেবই না আর! আমার কোল কি সরকারি জমি পেয়েছে নাকি যে যখন ইচ্ছা এসে সরকারি সিল বসিয়ে দেবে?”
নিষ্পাপ প্রাণটি বাবার কথাটা কতটুকু বুঝল কে জানে! তবে সে হঠাৎ নিজের ছোট্ট গোলাপি ঠোঁট দুটো উল্টে ‘আম্মমম…’ করে একটা মিষ্টি শব্দ করল। আর তার নিষ্পাপ ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি।
মেহের একবার রুদ্রর মুখের দিকে তাকাল, আর একবার ছেলের সেই হাসিমুখের দিকে। তার তীব্র হাসি চেপে রাখা দায় হয়ে পড়ল। সে নিজের হাসি কোনোমতে চেপে রেখে বলল, “প্যাম্পার্স চেঞ্জ করে দিতে হবে। ওকেই জিজ্ঞেস করুন তো, বারবার আপনার কোলেই কেন এসব কাজ সারে?”
ছোট্ট শিশুটি যেন মায়ের উত্তরের সমর্থনে আবার হাত-পা নেড়ে ‘হুমমম…’ করে একটা সায় দিল।
রুদ্র গম্ভীর মুখে বলল, “ওই যে একটু আগে কোলে নিতে চাইলে নিলে না! এখন নাও, সামলাও! সব হাওয়া হয়ে গেল তো?”

মেহের গায়ে পড়ে একটু তোপ দেগে বলল, “কেন? সব হাওয়া হবে কেন? দিন তো আমাকে! পুরুষ মানুষ দিয়ে তো এসব কাজ হয় না। খুব হিরো হতে এসেছিলেন না? দিন আমাকে দিন!” বলে মেহের আবার হাত বাড়াল।
মেহেরের এই তাচ্ছিল্য ভরা কথা সরাসরি রুদ্রর পুরুষালি অহংকারে গিয়ে লাগল। সে সোজা দুই পা পিছিয়ে গেল। “পুরুষ মানুষ পারে না মানে? কী পারুক আর না পারুক, বাচ্চা সামলাতে পুরুষ মানুষও পিছপা হয় না…”
“ঠিক আছে, আমি দেখাচ্ছি তোমাকে কীভাবে পুরুষ মানুষও বাচ্চাদের প্যাম্পার্স পরাতে পারে!” বলেই রুদ্র ছেলেকে বিছানার ঠিক মাঝখানে শুইয়ে দিল।
উষ্ণ কোলের মায়া ছেড়ে নরম বিছানায় শুতেই বাচ্চাটি হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে নিজের মতো খেলতে লাগল। মেহের দুই হাত বুকের ওপর বাঁধ বেঁধে একপাশে দাঁড়িয়ে গভীর কৌতুহলের সাথে দেখতে লাগল রুদ্র এখন কী কাণ্ড করে। মন্দ হয় না, তার কাজটা যদি অন্য কেউ ফ্রিতে করে দেয়!
রুদ্র ওয়্যারড্রোবের পাশের ঝুড়ি থেকে একটা ডায়াপার বের করল। মেহের বেশ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসল।

রুদ্র ডায়াপারের দুই দিকের প্যাকেটজাত স্ট্র্যাপ ধরে বাচ্চার মাথার ওপর দিয়ে পরানোর চেষ্টা করতেই বাঁধল আসল বিপত্তি! জামা পরানোর মতো করে প্যাম্পার্স মাথায় ঢোকাতে গিয়ে রুদ্র রীতিমতো হাবুডুবু খেতে লাগল। ডায়াপারে পা গলানোর দুই পাশে দুটো গোল ফুটো আছে ঠিকই, কিন্তু মাথার ফুটোটা কোথায়? সে বাচ্চার মাথার কাছে প্যাম্পার্স ধরে এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগল।
তারপর মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “এটার মাথার ফুটোটা কোথায়?”
মেহের বিছানায় আরও একটু আরাম করে শুয়ে পড়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল, “আমি কী জানি? পুরুষ মানুষ তো সব পারে! আপনিই বের করুন…”
রুদ্র মুখ ভেংচে মেহেরের স্বর অনুকরণ করে বলল, “হুঁ! আপনিই বের করুন! ঢং কত!”
মেহের চোখ বুজে দীর্ঘ আড়মোড়া ভেঙে বলল, “করুন করুন, একদম নিশ্চিন্তে ট্রাই করতে থাকুন!”
রুদ্র মেহেরের কথায় আর কান না দিয়ে বাচ্চার দিকে তাকাল। কপাল কুঁচকে, নাক-মুখ বাঁকিয়ে স্বগত ফিসফিস করে বলল, “এফএম রেডিও রে এফএম রেডিও! সারাদিন যেমন মাইক ছাড়া ভাষণ দিস, এখন তোর জন্য পুরুষজাতির মান-সম্মান একদম ধুলায় মিশে যাবে…”

মেহের দূর থেকে শুয়ে শুয়েই আলতো হেসে বলল, “কিছু বললেন ক্যাপ্টেন সাহেব?”
রুদ্র ডায়াপারটা উঁচু করে ধরে কাচুমাচু অসহায় মুখে বলল, “ইয়ে মানে… একবারে ব্যান্ডেজ করে দিলে হয় না? এসব আলতু-ফালতু জিনিস পরাতেই হবে?”
রুদ্রর এই অসহায় চেহারা দেখে মেহের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে খিলখিল করে হেসে উঠল সে। ঘরে যেন এক পশলা মিষ্টি হাসির ফোয়ারা ছুটে গেল। মেহের কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলল, “আপনার এই কমেডি সারারাত ধরে দেখার ধৈর্য আমার নেই। যান, হাত-মুখ ধুয়ে আসুন!”
মেহের ডায়াপারটা রুদ্রর হাত থেকে টেনে নিয়ে নিতেই রুদ্র যেন এক প্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে ওড়ন্ত পদক্ষেপে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল।
মেহের হাসতে হাসতে দক্ষ হাতে ছেলের প্যাম্পার্স বদলে তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে খাওয়াতে বসল।
ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর রুদ্র ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে তার চোখ সোজা গিয়ে পড়ল বিছানার দিকে। মেহের সারা দিনের ক্লান্তিতে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে। তার পাশে ছোট প্রাণটিও মায়ের বুকে মাথা রেখে এক অদ্ভুত শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।

সাধারণত রুদ্র শাওয়ার নেওয়ার পর বেশ সময় নিয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকায়। কিন্তু এখন ড্রায়ার অন করলে তার তীক্ষ্ণ শব্দের বাতাসে মা-ছেলের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যেতে পারে। রুদ্র তোয়ালেটা একপাশে রেখে কোনো শব্দ না করে ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এল।
মেহেরের ঘুমন্ত মুখের ওপর ঘরের আবছা আলো এসে পড়েছে। নিষ্পাপ, মায়াবী সেই মুখের দিকে তাকাতেই রুদ্রর বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
ঠিক তখনই তাদের মাঝে শুয়ে থাকা ছোট নিষ্পাপ প্রাণটি হঠাৎ মিটমিট করে চোখ খুলল। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য, সে মোটেও কান্নাকাটি করল না প্রতিবারের মতো। রুদ্র একটু ঝুঁকতেই দেখল—
বাচ্চাটা নিজের ছোট্ট আঙুল চুষছে আর গোলগোল ডাগর চোখে সোজা রুদ্রর দিকেই তাকিয়ে আছে।দৃশ্যটা দেখামাত্রই রুদ্রর বুকের ভেতর দ্বিগুণ মাত্রায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। সে একবার চোখের পাতা দুটো শক্ত করে বন্ধ করল। কিছু সময়ের জন্য ভাবনায় ডুব দিল…
চোখের সামনে ভেসে উঠল এয়ারপোর্টের বাইরের দৃশ্য। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র, আর মেহের এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে বুকে চেপে তাকে ছেড়ে চিরতরে বহু দূরে চলে যাচ্ছে! ছেলেটা বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, যেন বাবার কাছেই যেতে চায়। বারবার রুদ্রকে কাছে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছে সে। অথচ মেহের রুদ্রের কোনো কথাই শুনছে না। বুকের সঙ্গে ছেলেটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না…..

সারা দিনের জমানো ক্লান্তিটুকু এক নিমেষে এক অজানা আশঙ্কার রূপ নিয়ে রুদ্রকে ঘিরে ধরল। রুদ্রর মনে হতে লাগল, তার বুক চিরে বাতাস বের হচ্ছে না, শ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। রুদ্র কি তবে ভয় পাচ্ছে? চৌধুরী বাড়ির জাঁদরেল সন্তান রাইহাম চৌধুরী রুদ্র ভয় পাচ্ছে? যার অভিধানে প্রেম কিংবা ভালোবাসার মতো দুর্বল শব্দের কোনো স্থান ছিল না, সে আজ চোখের সামনে শুয়ে থাকা এই অসহায় নারী আর তার বাচ্চার জন্য এমন ছটফট করছে কেন? তার বুক এমন অনবরত পুড়ছে কেন?
সে কি আদৌ কাউকে ভালোবাসতে পারে?
রুদ্র হালকা হাতে নিষ্পাপ প্রাণটাকে নিজের বুকের আরেকটু কাছে টেনে নিল। এসব অর্থহীন চিন্তা সে মাথায় প্রশ্রয় দিতে চায় না। তার মুখ থেকে বিড়বিড় করে বেরিয়ে এল, “এটা লাভ নাকি অ্যাট্রাকশন—আমি জানি না। ইউ আর বিকামিং মাই অবসেসশন, সওয়াজ সায়েদ মেহের! আই জাস্ট ওয়ান্ট ইউ… তোমাকে পেতে যদি আমার সব নিঃশেষ করে দিতে হয়, আমি তা-ই করব। তুমি বাধ্য… তুমি আমার সঙ্গে সংসার করতে বাধ্য!
আর , যদি সংসার না-ও করো, তা-ও তোমাকে এখানেই থাকতে হবে। বিষয়টা এমন না যে আমি তোমাকে দয়া করছি… বিষয়টা এমন যে আমার খুশিতে তুমি থাকতে বাধ্য। তোমাকে থামতেই হবে… এখানে, আমার কাছে।”
তারপর সে বাচ্চার নিষ্পাপ মুখখানা বুকের একেবারে গভীরে এনে জড়িয়ে ধরল। স্বগত বলে উঠল, “আমার এই খুশির কারণ তোমরা দুজন। আমি কোনো মায়া-দয়া করছি না, আমি দয়ার ঊর্ধ্বে!” বলেই সে বাচ্চার কপালে নিজের শক্ত ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল।

মেহের কাছে এলেই রুদ্রর এভাবে বিচলিত হয়ে পড়া, ভেতরটা তছনছ হয়ে যাওয়া—
আজ যেন রুদ্রর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। নিজের এই আকস্মিক, অদ্ভুত পরিবর্তন সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। রুদ্র প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে নিজেকে, নিজের কঠোর সত্ত্বাকে।
দেয়ালঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা।
নিস্তেজ হয়ে এলোমেলোভাবে একই বিছানায় শুয়ে আছে তিনটে মানুষ। শান্ত, নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর দেয়ালঘড়ির ‘টিক টিক’ শব্দটা যেন একটু বেশিই স্পষ্ট হয়ে কানে বাজছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই রুদ্রর অলস চোখ দুটো ধীরে ধীরে খুলে গেল। ঘুমের আবেশে আচ্ছন্ন চোখ মেলে সে খেয়াল করল….খোলা জানালা গলে সকালের তেজহীন, মিষ্টি রোদের এক চিলতে আলো এসে মেহেরের মুখের ওপর পড়েছে। সিলিং ফ্যানের বাতাসে মেহেরের এলোমেলো চুলের দু-একটি গোছা বারবার তার মুখের ওপর এসে ভাসছে, আবার আলতো করে সরে যাচ্ছে।
রুদ্র এবার মেহেরের কোনো অনুমতি তোয়াক্কা করল না। ঘুমের ঘোরেই হেলেদুলে একটুখানি এগিয়ে এল। আলতো হাতে মেহেরের মুখের ওপর পড়ে থাকা সেই অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিল কানের পেছনে। তারপর ধীরপায়ে আবার নিজের আগের জায়গায় ফিরে এল।

চোখের ঘুম পুরোপুরি কেটে যেতেই রুদ্র উপলব্ধি করল, তার ঠিক চোখের সামনে দুটি জ্যান্ত পুতুল নিঝুম ঘুমে তলিয়ে আছে। ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটা নিজের একটি হাত মেহেরের পেটের ওপর রেখে, আর একটি হাত ও পা ছোট্ট কোল-বালিশের ওপর তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।
দৃশ্যটি দেখে রুদ্রর কাছে মনে হলো, এটি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম নিদর্শন। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল,
“রুদ্র ব্রো, তোর কপাল এতটাও খারাপ না! চোখের সামনে দুটো জ্যান্ত পুতুল ঘুমিয়ে আছে… উফ, জিতছিস ভাই, জিতছিস!”
তারপর ঘুমের ঘোরে তলিয়ে থাকা মেহেরের কপালে রুদ্র প্রথম বারের মতো নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। পরম মমতা, গভীর অধিকার আর একরাশ ব্যাকুলতায় ভরা সেই স্পর্শ মেহেরের সুপ্ত অস্তিত্বেও যেন আলতো এক দোলা দিয়ে গেল।
তারপরেই রুদ্র নিজেকে একটু নামিয়ে এনে ছেলের কপালেও ভালোবাসা ছোঁয়া এঁকে দিল।বিরবির করে বলল,
You two have become the kind of obsession I never want to let go of. I don’t know when you became so precious to me, but now, having you both by my side feels like home. You are the two people my heart keeps choosing, every single time.

এর ঠিক এক ঘণ্টা পর মেহেরের ঘুম ভাঙল। বিগত কয়েকটা দিন ধরে তার ওপর দিয়ে যেন এক প্রলয়ংকারী ঝড় বয়ে গেছে। মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির যে কী প্রচণ্ড ভার সে বহন করছিল, তা ঘুম ভাঙার পর কিছুটা হলেও হালকা মনে হলো।
আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় হাত বোলাতেই মেহের খেয়াল করল, তার পাশের জায়গাটা ফাঁকা…ছোট্ট পাখিটা পাশে নেই! চকিতে চোখ মেলে চারপাশে তাকাল সে। দেখল রুদ্রও ঘরে নেই। মেহেরের বুঝতে এক সেকেন্ডও বাকি রইল না যে ক্যাপ্টেন সাহেব তার লিটল চ্যাম্পকে নিয়ে নিচে চলে গেছেন।
মেহের সোজা হয়ে বসে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল, “ক্যাপ্টেন সাহেব কি লিটল চ্যাম্পকে নিয়ে নিচে গেলেন নাকি? দুজন ঘুম থেকেই বা উঠল কখন? আর আমাকেও কেউ একটা ডাক দিল না!”
সে আর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে নিজের কাপড় ঠিক করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দৃশ্যটি দেখে তার পা দুটি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
সোফায় বসে আছেন রেহানা চৌধুরী, আর তাঁর কোলে শোভা পাচ্ছে ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটি। তাঁর ঠিক পাশে আগলে বসে আছেন হামজা চৌধুরী, আর একটু দূরে মৃদু হেসে দাঁড়িয়ে আছেন পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য সুলতানা চৌধুরী। তিনজনে মিলে বাচ্চাটাকে নিয়ে যেন আদরের মহোৎসব বসিয়েছেন! সে এখন পুরো পরিবারের চোখের মণি, চৌধুরী বাড়ির নতুন স্পন্দন।

হামজা চৌধুরী বাচ্চার ছোট্ট থুতনিতে হাত বুলিয়ে আনন্দের সাগরে ভেসে বলে উঠলেন, “দেখেছ মা? একদম আমার মতো হয়েছে আমার দাদুভাই…”
সুলতানা চৌধুরী ছেলের কথা শুনে বলে উঠলেন, “কীরে হামজা, বুড়ো বয়সে তোর চোখ দুটো কি ছানি পড়ল নাকি? ও তোর মতো হতে যাবে কোন দুঃখে?”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে হামজা চৌধুরী যেন এক মুহূর্তের জন্য আহত হওয়ার ভান করে বললেন, “মা! তুমি আমাকে সবার সামনে বুড়ো বললে? আমি কোথায় বুড়ো হলাম?”
রেহানা চৌধুরী পাশে বসে খিলখিল করে হেসে উঠে বললেন, “না না, তুমি মোটেও বুড়ো হওনি! তুমি তো এখনো সুইট সিক্সটি-ওয়ান! দুই দিন পর নাতির বিয়ে দেবে, অথচ নিজের যে বয়স হয়েছে সেটা মানতেই চায় না…”
স্ত্রীর টিপ্পনিতে হামজা চৌধুরী একটু মুখ বাঁকালেন। তবে সেদিকে পাত্তা না দিয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে বললেন, “আহা রেহানা, কাজের কথায় এসো তো! আমার দাদুভাইয়ের নামটা কী রাখা হবে বলো? আকিকাও তো দ্রুত করতে হবে, নাকি?”

রেহানা চৌধুরী একটু ভেবে বললেন, “হাঁ, নাম নিয়ে তো এখনো ভেবে দেখা হয়নি”হামজা চৌধুরী একগাল হেসে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন,
“হাসিম! কেমন মিল আছে দেখেছ? হামজা চৌধুরীর নাতি হাসিম চৌধুরী!”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৭

সুলতানা চৌধুরী এবার দাঁত কিটমিট করে চটে উঠে বললেন, “আমি তোকে এমনি এমনি বুড়ো বলি না হামজা! কী সব হাসিম-ফাসিম নাম বলছিস? তোর দাদাদের আমলের সেকেলে নাম বাদ দে! নাম ভেবে রেখেছি—
রাঈদ চৌধুরী মাহাদ! বাপের নাম রাইহাম থেকে ‘রাঈদ’, আর মায়ের নাম মেহের থেকে ‘মাহাদ’। ব্যস, নাম হবে রাঈদ চৌধুরী মাহাদ!”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here