Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৯
মারিয়াম ফুল

বিয়ের আসর সাজানো হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ ভাবে, যেন কোনো উৎসব নয় বরং একটি গুমোট শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে। সায়েদ ভিলার ড্রয়িংরুমের সেই রাজকীয় ঝাড়বাতিগুলো আজ যেন মেহেরকে উপহাস করছিল।”
রুদ্র তার ফ্লাইটের শিডিউল বজায় রেখে ঠিক চারদিন পরেই ফিরে এসেছে। রুদ্রর দেওয়া সেই দশ দিনের সময়সীমা আজই ছিল শেষ দিন। রুদ্রর মধ্যে কোনো উত্তেজনা ছিল না, ছিল না কোনো নতুন বরের উচ্ছ্বাস। সে তার নেভি ব্লু রঙের শেরওয়ানি আর গম্ভীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে সোফায় বসে ছিল। তার চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, যেন সে কোনো বিয়ের পিঁড়িতে নয়, বরং কোনো ব্যবসায়িক চুক্তিতে সই করতে এসেছে। তার হাতের ঘড়িটি যেন টিকটিক শব্দে মেহেরের ধ্বংসের ক্ষণ গুনছিল।

মেহেরকে যখন কনে সাজিয়ে আসরে আনা হলো, তার পরনে ছিল টকটকে লাল বেনারসি। কিন্তু সেই লালের নিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া প্রাণহীন মুখটা। তার ওড়নাটা টেনে দেওয়া হয়েছিল একদম মুখ পর্যন্ত, যেন বাইরের কোনো আলো বা কারো দৃষ্টি তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকে স্পর্শ করতে না পারে। মেহেরের পায়ের নূপুরগুলো আজ কোনো ছন্দ তুলছিল না, বরং মনে হচ্ছিল লোহার শিকল। সে মাথা নিচু করে বসে ছিল…তার দুহাত থরথর করে কাঁপছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই বেনারসি নয়, সে আসলে নিজের কাফন আছে। মেহেরের হাতের মেহেদিগুলো তার কাছে মনে হচ্ছিল জমাট বাঁধা শুকনো রক্ত।
কাজী সাহেব যখন গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, রুদ্র এক মুহূর্ত দেরি না করে অত্যন্ত স্থির গলায় বলল—
“কবুল।” তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না, কিন্তু কোনো মমতাও ছিল না। অপরদিকে, মেহেরের কানে যখন কাজী সাহেবের প্রশ্নগুলো পৌঁছাচ্ছিল, তখন তার চারপাশে সায়েদ ভিলার রাজকীয় দেয়ালগুলো যেন ঘুরছিল। কানে বাজছিল বৃষ্টির পৈশাচিক শব্দ আর অন্তুর শেষ গোঙানি। নূর ভাবি আর মেঘলার জীবনের সুরক্ষার কথা ভেবে, বুকভরা হাহাকার নিয়ে মেহেরের গলা দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল—
“কবুল।” একবারও মেহের চোখ তুলে তার ওপর প্রান্তের মানুষটির দিকে তাকাল না। রুদ্রর চেহারা দেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা সাহস তার ছিল না।
বিদায় বেলায় মেহের যখন সায়েদ ভিলার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল, তখন তার ভেতরটা ঘৃণায় বিষিয়ে উঠেছে। সায়েদ ইমরান সাহেব অপরাধবোধে নুইয়ে পড়া কাঁধে মেয়ের মাথায় হাত রাখতে চাইলেন, কিন্তু মেহের এক পা পিছিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শক্ত হয়ে ড্রয়িং রুমের কোণায় কোণায় আছড়ে পড়ল—

“এই বাড়ির চৌকাঠ আর আমার পায়ের তলার মাটির সাথে আজ থেকে আমার আজন্মের সব চুক্তি খণ্ডন হলো বাবা! আপনাদের সায়েদ ভিলার এই আভিজাত্যের স্তম্ভগুলো মানুষের রক্ত আর কান্নায় গড়া…এখানে আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও নিজের অস্তিত্ব রাখতে চাই না। আজ থেকে আপনারা আমার কাছে মৃত, আপনাদের এই রক্তখেকো ছায়া যেন কোনোদিন আমার ওপর আর না পড়ে।আমি অনেক আগেই মরে গেছি… . মৃত ব্যক্তিরা শ্মশানে বারবার ফিরে আসে না। আমিও আসবো না আপনাদের ছায়া মাড়াতে।” তখন চৌধুরী পরিবারের কেউ পাশে উপস্থিত ছিল না।
গাড়ি চলতে শুরু করলে মেহের একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। সায়েদ ভিলার সেই আলোকোজ্জ্বল রোশনাই তার চোখের আড়ালে চলে গেল। চৌধুরী নিবাসে মেহেরের পা রাখার বয়স এখন মাত্র চার ঘণ্টা। রুদ্রর ঘরের এই বিশাল নিস্তব্ধতায় সে একা বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

নিয়তি একেকজনকে একেকটা উপহার দিল—কাউকে ঘর, , কাউকে পরম প্রাপ্তির মানুষ। আর আমার কপালে জুটল শুধু তোমাকে ভালোবাসার চরম বিপর্যয়। আজ আমি এক অভিশপ্ত জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি, যেখানে নামের পাশে লেগে আছে কেবলই অপবাদের কালি। অথচ এই ধ্বংসের বিনিময়ে যদি তোমাকে একটুখানি পেতাম, তাহলেও হয়তো আমার কোনো ক্ষোভ থাকত না।তোমাকে ভালোবাসার ফলেই শুধু ধ্বংসটাই হলো। আজ আমি শুধু কলঙ্কের দাগ পেলাম, একটা অভিশপ্ত জীবন পেলাম…
শুধু পেলাম না তোমাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। মেহের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ওড়নার নিচে নিজের আঙুলগুলো নখ দিয়ে খাবলে ধরল। ভারী বুটের শব্দ মেঝের কার্পেটে শোষিত হয়ে ধীরলয়ে এগিয়ে এসে ঠিক মেহেরের সামনে থামল।

চৌধুরী নিবাসের বৈদ্যুতিক লাইনটা আদিল আর রুদ্রর বন্ধুরা মিলে ঠিক বাসর রাতের মাহেন্দ্রক্ষণেই গায়েব করে দিল। পুরো ঘরটা এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু কোণায় রাখা একটা মোমবাতি কাঁপতে কাঁপতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরের তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা । তার টানা ওড়নাটা যেন গলার ফাঁস হয়ে তাকে শ্বাসরোধ করতে চাইছে।

দরজা খোলার মৃদু শব্দে মেহের চমকে উঠল। ভেতরে কেউ প্রবেশ করতেই মেহের আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক বুক হাহাকার নিয়ে অন্ধকারেই চিৎকার করে উঠল— এই বিয়ে আমি না। মানি না এই বিয়ে।
আপনাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা, স্বামী হিসেবেও আমি আপনাকে ভাবতে পারি না।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৮

পাশে সাজিয়ে রাখা ডজনখানেক রজনীগন্ধার তোড়াটা এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলল সে। পাপড়িগুলো মেঝের কার্পেটে লুটোপুটি খাচ্ছে। মেহের মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নার তোড়ে ঘর কাঁপিয়ে ঘোষণা করল— “আমি বি… বিবাহিত! আমি প্রেগন্যান্ট ক্যাপ্টেন সাহেব! আমি মা হতে চলেছি!”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১০