জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৮
তোনিমা খান
অপরাহ্নের প্রথম লহমায় মিঠা আলোর ছড়াছড়ি। পশ্চিম দিকে হেলে পড়া সূর্যটি নিজের তেজ হারাচ্ছে মন্থরগতিতে। শহুরে বুকে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে থাকা কংক্রিটের দালানগুলোর চূড়ায় লালচে আলোর ছড়াছড়ি। সেই আলোয় জ্বলজ্বল করছে ছাদের রেলিং আঁকড়ে ধরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি।
কানে ঠেকিয়ে রাখা ফোন। চোখেমুখে অজস্র উদাসীনতা।
তানিয়া অসন্তোষের সাথে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“বিন্দু, কী হয়েছে? আজ বিশ দিন পর তুই আমায় ফোন করছিস। যেখানে সকাল বিকাল দুইবার তুই আমায় ফোন করতি। কিছু হয়েছে তোদের মাঝে? সব ঠিক আছে?”
বিন্দু ঝাঁপসা নেত্রে সবসময়ের মতো তখনো ভাসছে তালহারের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘের ছবিটি। ভীষণ কষ্টে উচ্চারণ করল,
“সব ঠিক আছে মা।”
“মুখের উপর মিথ্যা বলে দিলি?”
বিন্দু ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে এমন একটা পরিস্থিতি পিছু ছাড়াতে চাইছে যেটা তার আত্মার সাথে জুড়ে আছে। সে ক্লান্ত হয়ে বলল,
“মা, ফোনে একটু সমস্যা হয়েছিল। কিন্তু এখন সবটা ঠিক আছে। আমরা কী প্রশ্ন ছাড়া একটু কথা বলতে পারি?”
তানিয়া নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। বুঝে গেলেন কিছু একটা হয়েছে ছেলে আর ছেলের বউয়ের মধ্যে। কিন্তু এটাও সম্ভব? এই তিন বছরে তালহার আর বিন্দুর মাঝে সামান্য কথা কাটাকাটি ও হয়নি। তালহার ঠিক যতটা চুপচাপ, বিন্দু ঠিক ততটাই বুঝদার। তালহারের নীরব ভাষাগুলো সে খুব দক্ষতার সাথে বুঝে নেয়। বিন্দু ঠিক কতটা যত্নের সাথে তালহার আর তার সংসার আগলে ধরে বাঁচে তা তার থেকে ভালো কেউ জানে না। তেমনি তালহার ও। তার গম্ভীর ছেলেটা গম্ভীরভাবেই স্ত্রীকে পুরো দুনিয়া থেকে আগলে রাখে।
কিন্তু সে লেবু চিপে আর তেতো বানাতে চাইল না। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করল। বাচ্চা নিয়েও আর প্রশ্ন তুললো না।
শাশুড়ির সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে বিন্দু সেভাবেই রেলিং এর উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু কিছুক্ষণ বাদ মনে হলো তার পাশে কেউ দাঁড়িয়েছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল। রুহান তাকিয়ে আছে। সাথে সাথেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
রুহান স্মিত হাসল তার ভ্রু কুঁচকানো দেখে। বলল,
“আপনি আমায় দেখলেই সবসময় এমনভাবে ভ্রু কুঁচকে নেন কেন? আমার কখনোই আপনার প্রতি কোনো খারাপ মনোভাব থাকে না।”
বিন্দু এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে আবার আগের মতো ঝুঁকে বসল। তার পরনে থ্রিপিস। মাথায় কাপড়। কিন্তু তবুও চোখমুখ ঢেকে আছে কিছু অবাধ্য বাড়ন্ত চুলে। রুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“দুনিয়াতে আপনি একাই দুঃখী নন। আপনার মতো আরো অনেকের দুঃখ থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে সবাইকে খারাপ নজরে দেখা উচিত নয়। আপনার মতো আমিও দুঃখী। তাই বলে কী আমি সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করব? বরং হাসিখুশি ভাবে নরমালি কথা বললে দুঃখ কমে, মন হালকা হয়। মানুষের সাথে কথা বলুন, হাসুন, সহজভাবে নিন। দেখবেন জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।”
“আপনাকে কে বলল আমার জীবন কঠিন?”, বিন্দু ছাদের সুদীর্ঘ উচ্চতা থেকে নিচের ব্যস্ত সড়ক দেখতে দেখতে বলল।
রুহান মলিন হেসে বলল,
“কঠিন নয়? যাদের সাথে প্রতারণা হয় তারা তো ওই প্রতারণার সেই বিশ্রী জায়গাটিতেই আঁটকে থাকে। বছরের পর বছর কেটে গেলেও তারা প্রিয়জনকে অন্যের হতে দেখার বিশ্রী মুহুর্তটা ভুলতে পারে না। যেমন আপনি, আমি।”
বিন্দু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো লোকটির মুখপানে। লোকটি কী করে জানলো সে আজো ঘর ছাড়ার ওই মুহুর্তটিতে দাঁড়িয়ে আছে? যেখানে দাঁড়িয়ে সে তার তিন বছরের সংসারের শেষ দেখছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে সে একটা প্রতারকের স্তব্ধ মুখ দেখছিল।
অস্ফুট স্বরে বলল,
“আপনার সাথে কী হয়েছিল?”
প্রেক্ষিতে রুহান মলিন হাসল আর ট্রাউজারের পকেট থেকে এক মুঠো বাদাম এগিয়ে দিল। বিন্দু বাদামগুলোকে দেখল। অতঃপর হাত বাড়িয়ে দিল। রুহান তার হাতে সেগুলো দিয়ে নিজেও রেলিং ধরে ঝুঁকে দাঁড়ালো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
“উঁহু, ওগুলো বলব না। ওইগুলো মুখে আনা মানে জীবনে কয়েক বছর পিছিয়ে যাওয়া। যেটা আমি কখনোই চাই না। কারণ সামনে আগানোটা খুব কঠিন। আমি খুব কষ্টে সামনে এগিয়েছি। জীবনে যত বাজে ঘটনা ঘটে যাক না কেন ওগুলোকে পিছু ফেলে দূর্বার গতিতে সামনে এগিয়ে যাওয়া। তাই ওগুলো না বলাই উত্তম।”
বিন্দুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার ভালো লেগেছে কথাটি। সেও চায়না একজন প্রতারকের কাছে দূর্বল হতে। জীবনে কয়েকপা পিছু চলে যেতে চায় না। পিছনে যে শুধু দুঃখ। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন।”
রুহান চকিতে তার পানে চেয়ে বলল,
“একবার কথা বলায় এই মন্তব্য? আমার জীবনটা ধন্য হয়ে গেল আপনার থেকে এমন মন্তব্য শুনে।”
বিন্দু নীরব রইল। রুহান বুঝে নিলো নারীটি কোনো প্রকার বাড়তি আলাপে অনাগ্রহী। কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আগামী মাসে এন টি আর সি এর পরীক্ষা। আপনার প্রিপারেশন কেমন?”
“ভালো।”
“একবারেই পাশ করে যাবেন?”
“আমি কখনো এক পরীক্ষা দুইবার দেইনা। তাই আশাকরি একবারেই পাশ করে যাব।”
“আপনি অনেক আত্মবিশ্বাসী। যেটা আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি।”
বিন্দু স্মিত হাসল। সে সত্যিই আজ পর্যন্ত কখনো কোনো পরীক্ষা দুইবার দেয়নি। এমনকি জীবনের এই পরীক্ষায় ও সে ততক্ষণ লড়বে যতক্ষণ না সে ফলাফলে সন্তুষ্ট হয়।
চায়ের দোকানের ঠিক এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে কবির। চোখের সামনে ধরে রেখেছে ম্যাগনিফাইং গ্লাস। তার কপালে বড়সড় ভাঁজ পড়ল রেলিং ধরে ঝুঁকে থাকা দুই মানব মানবীকে দেখে। সে গ্লাস সরিয়ে বড় বড় চোখে তাকালো। টাটকা খবর!
সে তড়িঘড়ি করে তালহারকে ফোন করল। তালহার তখন অফিসে মিটিংরত ছিল। ব্যক্তিগত ফোনটি ভাইব্রেট হতেই সে বাঁকা দৃষ্টি ফেলল। কবিরের ফোন দেখেই ভেতরটা বিচলিত হয়ে পড়ল। এই বিচলন ফোন না রিসিভ করা অব্দি থামবে না। সে খিলজি মাহমুদ এর থেকে অনুমতি নিয়ে বাইরে বের হলো।
“হ্যাঁ, কবির বলো।”
সে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল। অপরপ্রান্তে কবির হড়বড়িয়ে বলল,
“স্যার, আপনি তো বলেছিলেন ওই কোচিং মালিকের দফারফা ম্যাডাম নিজেই করবে। কিন্তু এখানে তো ঠিক উল্টো হচ্ছে। ম্যাডাম আর ওই কোচিং মালিক ছাদে পাশাপাশি বসে হেসে হেসে কথা বলছে। ঠিক যেন বন্ধু।”
তালহার কপালে আঙুল ঘষলো। মুখের শিরা উপশিরা কঠিন হয়ে উঠল। তবুও ঠান্ডা স্বরে বলল,
“ছবি দিতে পারো।”
“ইয়েস স্যার। চেক হোয়াটসঅ্যাপ।”
তালহার হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। ঢুকতেই তার সংযমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিল বিন্দুর হাসিমুখ আর তার দিকে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা রুহানের মুখটি। সে ঘাড়ে হাত মর্দন করতে করতে মিটিং রুমের দিকে তাকালো। পাঁচ মিনিটের ব্রেক শেষ। কিন্তু এই কোচিং মালিকের কিসসা শেষ না করে সে মিটিং এ মনোযোগ দেবে কী করে?
কিন্তু করার মতো কিছু ছিল না। সে রুলস ব্রেক করার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করতে পারবে না। সে কবিরকে বলল,
“কবির, পনেরো মিনিট পর আমার মিটিং শেষ হবে। তখন আমায় যেকোনো মূল্যে তোমার ম্যাডামের সাথে কথা বলাবে।”
“ওকে স্যার।”
তালহার ফোন কেটে দ্রুত রুমে ঢুকলো। বিন্দুর সাথে দেখা করার পর থেকে বিন্দু অলটাইম ফোন অফ রাখছে। মাঝেমধ্যে খুলছে তাও পাঁচ দশ মিনিটের জন্য। না সে যেতে পারছে আর না কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছে।
সে নিজের উপর অবিশ্বাস্য কন্ট্রোল রেখে চেয়ারে গিয়ে বসল।
কোচিংয়ের ক্লাস, আর নিজের জব প্রিপারেশন এর পড়া শেষ করে বিন্দু যখন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন ই ছাদে আসে। কিন্তু আজ রুহানের সাথে কথা বলে তার কোনো খারাপ লাগা অনুভব হয়নি। তারা ছাদ থেকে নেমে আসে। রুহান নিজের ঘরে ঢোকার আগে বলল,
“আপনি কী পুরোপুরি সুস্থ? আপনি চাইলে আরো ক’দিন ছুটি নিতে পারতেন। আমি বেতন কাটব না।”
শেষের কথাটা রুহান হেসে বলল। বিন্দু নাকচ করে বলল,
“আমি সুস্থ।”
টাকার কথা ভেবে বিন্দু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গতকাল তালহার তার একাউন্টে তার বেতনের তিনগুণ টাকা পাঠিয়েছে। কিন্তু ওগুলো ব্যবহার করতে তার রুচিতে বাঁধবে ভীষণ।
সে দরজা আঁটকে সবার আগে আছরের নামাজ পড়ল। জায়নামাজ ছেড়ে উঠতেই কলিং বেল বাজল। দরজা খুলতেই দারোয়ানকে দেখে বিন্দু বলল,
“জি বলুন?”
দারোয়ান ভীষণ অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
“নিচে ওই লোকটা আপনার সাথে দেখা করার জন্য আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছে। আমার সাথে রীতিমতো গুণ্ডামি করছে। হয় আপনি ওনার সাথে দেখা করুন নয়তো ওনাকে ভিতরে ডাকুন এটা বলছে। কিছু একটা করুন। এই দালানের কোনো ভাড়াটিয়া আমাদের এত ঝামেলায় ফেলেনা।”
বিন্দুর চাপা রাগে ফেটে পড়ল। কিন্তু সেও ছিল ঠিক তালহারের অবিকল স্বভাবের। যে কি-না কঠিন থেকে কঠিন রাগ ঠান্ডা মাথায় দমন করতে জানে। এর জন্যই হয়তো সৃষ্টিকর্তা তাদের জুটি হিসেবে তৈরি করেছে।
বিন্দু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“উনি আর আপনাকে বিরক্ত করবে না। আমি দেখছি।”
দারোয়ান ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“ধন্যবাদ।”
বিন্দু সোজা রুহানদের দরজায় নক করল। তন্ময় খুললো। তার পাছে তন্ময়ের মাও এসে দাঁড়াল। তার কপালে ভাঁজ। এই মেয়েটাকে সে খুব ভালো নজরে দেখে না।
তন্ময় বলল,
“আপু, কোনো সমস্যা হয়েছে?”
বিন্দু মাথা দোলালো। গম্ভীর গলায় বলল,
“একটা লোক লাগাতার কয়েকদিন যাবত বিরক্ত করছে, তন্ময়। একটু দেখবে?”
সহসা তন্ময়ের মা বিস্ময়ে প্রতিবাদী কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“এই কোন কুলাঙ্গারের কলিজায় এত সাহস যে আমার বাড়ির ভাড়াটিয়াকে বিরক্ত করে? এই রুহান, তন্ময়ের বাপ এদিকে আসো তাড়াতাড়ি।”
তন্ময় ও রাগে ফেটে পড়ল সাথে সাথে। বিন্দু মুখে এক পশলা বিজয়ের হাসি নিয়ে নীরবে ঘরে চলে গেল। ঘরে গিয়ে বারান্দায় রাখা টুলে বসে আরামে তসবিহ টিপতে লাগল।
“আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ!”
তার দৃষ্টি ঠিক চায়ের দোকানে ভবঘুরে হয়ে পায়চারী করতে থাকা কবিরের দিকে। সে কখনোই তালহারের শাস্তি একটা নিরপরাধ কে দিতে চায়নি। কিন্তু কী আর করার! আস্তাগফিরুল্লাহ ফর এভরিথিং! সে আরো মনোযোগ সহকারে ইস্তেগফার করতে শুরু করল।
কবির বিক্ষিপ্ত মেজাজে চায়ের দোকানের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ক্রুব্ধ দৃষ্টি তন্ময়ের বাড়িটির দিকে। অন্যদিকে তালহার স্যার ফোনের উপর ফোন দিয়েই যাচ্ছে। সে কোমরে দুই হাত দিয়ে অতিষ্ট ভঙ্গিতে আওড়ালো,
“কী ত্যাড়া মেয়েমানুষ! স্যার কী করে তার বউকে সামলায়? এর থেকে দুইটা গুণ্ডা সামলানো আরো সহজ। দুই থাপ্পড় দিলেই চুপ! অসহ্য!”
সে বিড়বিড় করতে করতে গেটের দিকে থাকা বিরক্তিকর দারোয়ানের দিকে তাকালো। ওমনি তার ভ্রু কুঁচকে গেল। বাড়িওয়ালা, বাড়ি ওয়ালার বউ দুই ছেলে সহ আরো তিন চারটা লোক ঝাড়ু, জুতা, বেলন, হকিস্টিক হাতে ধেয়ে আসছে তার দিকে। সে চকিতে চোখ রগড়ে আরো ভালো করে দৃষ্টি ফেলল। হ্যাঁ, সবাই তার দিকেই ধেয়ে আসছে। এ কী? চমকে ওঠা কবির কিছু বোঝার আগেই বাড়ি ওয়ালার স্ত্রী চেঁচিয়ে বলল,
“ওরে কুলাঙ্গার আজ তোর একদিন কী আমার একদিন। আমার বাড়ির ভাড়াটিয়াদের বিরক্ত করিস?”
কবির বড়বড় চোখে এদিক ওদিক তাকালো। ভয়ে তার দেহ ঠান্ডা হয়ে আসে। বিপদ যে তার দিকেই ধেয়ে আসছে সেটা বুঝে ভোঁ দৌড় দেয়ার আগেই তার দিকে একটা জুতা ছুটে আসল।
বিপদের সময় জমিনে হাত পা আঁটকে যাওয়া রোগী কবিরের পরবর্তী দৃশ্য ছিল খুবই মর্মান্তিক।
আধা ঘন্টা পরের গল্প। ভাদ্র মাসের পাগলা কুকুরের মতো ছুটতে থাকা কবির হাঁপাতে হাঁপাতে একটা সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পিছু ফিরে তাকালো। নাহ কেউ নেই। আঁধার হয়ে এসেছে তখন। সে সোজা গিয়ে ফুটপাতের পাশে থাকা চায়ের দোকানের বেঞ্চে গিয়ে শুয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে ভয়, উদ্বেগ, বেঁচে ফেরার স্বস্তির হাসি।
দীর্ঘ আধা ঘন্টা পর কবিরের ফোন পেয়ে তালহার রিসিভ করেই রাগে ফেটে পড়ল। কোনোপ্রকার কৈফিয়ত না শুনেই চেঁচিয়ে বলল,
“তুমি ফায়ার কবির! সামান্য একবার কথা বলানোর মুরোদ হচ্ছে না তোমার।”
তালহার কথা শেষ করতে না করতেই কবির ভিডিও কল অন করল। সহসা তালহারের চোখমুখ কুঁচকে গেল। আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“একি! তোমার শার্ট এমন ছেঁড়াফাটা কেন? আর মুখে এই লাল দাগ কিসের? চুলের এই অবস্থা কেন?”
কবির কাঁদো কাঁদো গলায় হনহনিয়ে বলে উঠল,
“আপনি শুধু শার্ট দেখছেন স্যার? আপনি আমার প্যান্ট দেখুন স্যার। ওরা আমার প্যান্ট খুলে রেখে দিয়েছে।”
বলতে বলতেই কবিরের চোখ টলটল করে উঠল। সে পুনরায় ভীষণ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
“ভাগ্যিস আন্ডারওয়্যার এর বদলে আজ লম্বা শর্টস পড়েছিলাম। নয়তো আজ ওরা আমার মানসম্মান আর জান দুটোই খেয়ে দিতো, স্যার। আমি আজ প্রাণে বেঁচেছি।”
কবির ক্যামেরা নিচে নামালো। তার পরনে হাঁটু সমান একটা সাদা সুতির শর্টস আর গায়ে ছেঁড়াফাটা স্কাই ব্লু রঙা শার্ট। তাকে দেখতে ঠিক সদরঘাটে ঘুরে ঘুরে বোতোল টোকানো টোকাইয়ের মতো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল।
তালহার হতভম্ব হয়ে বলল,
“এইসব কে করেছে?”
কবির কাঁদো কাঁদো গলায় বাচ্চাদের মতো নাক মুছতে মুছতে বলল,
“ম্যাডাম।”
“বিন্দু? অসম্ভব!”, তালহার বিস্মিত কণ্ঠে বলল।
কবির হৈ হৈ করে বলল,
“হ্যাঁ স্যার, ম্যাডাম করেছে। আমি মিথ্যা বলছি না স্যার। এই দেখুন কী মার মেরেছে। আপনি তো তাও দয়ালু স্যার। শুধু হুমকি দেন। কিন্তু ম্যাডাম সোজা অ্যাকশন নেয় স্যার। আমার প্যান্ট!”
বলেই সে আহাজারি করে উঠল। তালহার বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
রাত দশটা তখন। বিন্দু এক নাগারে পড়া শেষ করে আড়মোড়া ভেঙে টেবিল ছেঁড়ে উঠল। এক কাপ কফি বানিয়ে গুনগুন করতে করতে বন্ধ ফোনটা হাতে নিলো। মাকে ফোন দেবে। কিন্তু ফোনটা অন করতেই তার মুখে অন্ধকার ছেয়ে গেল। তালহারের ইমেইল এসেছে। যেখানে স্বল্প কিছু বাক্যে দেয়া হুমকি তার সকল আনন্দকে ধূলিসাৎ করে দিল।
“ফোন অন করে আমায় ফোন দেবে। ফোন না পেলে সোজা আমার শাশুড়ি মায়ের কাছে ফোন যাবে। এবং তাকে বলা হবে, তার মেয়ে ডিভোর্স চেয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। যেটা খুব একটা ভালো সংবাদ হবে না তাদের জন্য।”
বিন্দুর ফুরফুরে মেজাজ মুহুর্তেই হারিয়ে গেল। সে চোয়াল শক্ত করে ফোন দিল। রিসিভ হলো সাথে সাথে। ভেসে আসল থমথমে কণ্ঠ।
“কাজটা ঠিক করোনি। কবির এইসব মারে অভ্যস্ত। কিন্তু বিনা অপরাধে কাউকে মার খাওয়ানো কতটা অযৌক্তিক তা তুমি ভালো করে জানো।”
পরপরই বলল,
“যাক সে কথা বাদ। তোমার কাছে আমি দু’টো অপশন দিচ্ছি। অপশন এ—আগামীকাল সকালে সবার আগে বাড়িওয়ালাকে গিয়ে কবিরের পরিচয় বলবে। অপশন বি—আমি আমার শাশুড়ির কাছে তার মেয়ের কর্মকাণ্ড বলব। এখন তুমি বলো, অপশন এ নাকি বি?”
রাগে টলটল করে উঠল বিন্দুর আঁখিদ্বয়। ক্ষীণ স্বরে বলল,
“অপশন এ।”
“গুড। কাল সকাল দশটার মাঝে কাজ হওয়া চাই। নয়তো দশটা পাঁচ মিনিটে আমি আমার শাশুড়িকে ফোন দেব।”
ফোনটা কেটে গেল। বিন্দু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফোনটির দিকে।
মেহমেদ ভয়ে ভয়ে বাবার অফিসে উঁকি দিল। খিলজি মাহমুদ ব্যস্ত দৃষ্টিতে তাকে এক পলক দেখে নিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,
“এই ধরণের চাইল্ডিশ আচরণ অফিসে করবে না, মেহমেদ। এতদিন তালহারের সাথে থেকেও কোনোকিছু শেখোনি তুমি।”
মেহমেদ তৎক্ষণাৎ মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ালো। লজ্জিত কণ্ঠে বলল,
“স্যরি, বাবা…না মানে স্যরি স্যার।”
মেহমেদ জিভে কামড় দিল। আবারো সেই সুন্দর ভুল!
সে বলল,
“স্যার, আমি কী আধা ঘন্টার জন্য বিরতি পেতে পারি?”
“কেন?”
“একটু জরুরী কাজ আছে স্যার।”
“যাও।”
বাবা আজ এক কথাতেই মেনে গিয়েছে? মেহমেদ অবাক হয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসল। অফিসের পাশে থাকা রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই তার চোখ যায় কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে থাকা টেবিলটির দিকে। সে লম্বা লম্বা কদমে সেদিকে এগিয়ে গেল।
মেঘ তিন প্লেট খাবার অর্ডার করেছিল। সেগুলো সামনে নিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে খাচ্ছিল। কিন্তু ওমনি কেউ তার মুখের সামনে থেকে তিন প্লেট খাবার টেনে নিয়ে গেল। এমনকি সদ্য কামড় দেয়া লেগপিসটাকেও তার মুখ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
মেঘ হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকালো মেহমেদের দিকে। যে কি-না তার সদ্য কামড়ানো লেগপিসটাতে ইতিমধ্যেই কামড় বসিয়ে দিয়েছে। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“আপনি বহু বছর ধরে না খাওয়া এক জলহস্তী। এ কী করলেন? ওটা আমার মুখের লেগপিস ছিল।”
মেহমেদ চমৎকার হেসে বলল,
“এখন এটা আমার মুখের লেগপিস। খাবেন?”
মেহমেদ তার আধখাওয়া লেগপিসটা এগিয়ে দিয়ে বলল। সহসা মেঘ ওয়াক ওয়াক করে বলল,
“ওয়াক থু। সবাইকে নিজের মতো খচ্চর পেয়েছেন? আপনি কী জানেন আমি আপনার স্যারের কী? আপনি কোন সাহসে আমার সাথে এগুলো করেন হ্যাঁ?”
মেহমেদ নিরুদ্বেগ খেতে খেতে বলল,
“প্রয়োজন আপনার। খাওয়াবেন আপনি। এতে সাহসের কী আছে?”
মেঘ তেতে উঠে বলল,
“আমি আপনাকে কেন সহ্য করি জানেন?”
“কেন?”
“আপনি তালহারের অনেক প্রিয় মানুষ। শুধুমাত্র এই কারণে।”
“শুনে ভীষণ খুশি হলাম। এখন আসল কথায় আসুন। আপনার কাছে বিশ মিনিট আছে মিস মঞ্জুলিকা। যা বলার তাড়াতাড়ি বলবেন।”
মেঘ ভীষণ বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
“বিশ মিনিট কেন?”
“এর অধিক সময় গেলে বাবা আমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অফিস দিয়ে বের করে দেবে।”
“ওহ্ আচ্ছা। কিন্তু আমি খুশিই হবো এমনটা হলে।”
মেঘ ভীষণ গম্ভীর গলায় বলল। মেহমেদ দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো অসহ্যকর মেয়েটির দিকে। মনে মনে আর্তনাদ করে উঠল স্যার কী এক মেয়েকে ভালোবাসে!
মেঘ ঝগড়ার সমাপ্তি ঘটায়। ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“আপনি তো একজন গোয়েন্দা। আমায় একটা কেস সলভ করে দিন।”
“ফিস এখন দেবেন নাকি পরে?”, মেহমেদ কপাল কুঁচকে বলল। মেঘ কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমি আপনার বসের হবু স্ত্রী। মুখ সামলে কথা বলুন। নো ফিস।”
“ফিস ছাড়া আমি কাজ করি না। আসছি তবে।”
বলেই মেহমেদ খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে উঠতে লাগল। মেঘ তড়িঘড়ি করে তাকে আঁটকে বলল,
“আরে আরে আরো দুই প্লেট খাবার অর্ডার করুন। আপাতত এটাই আমার কাছে আছে।”
মেহমেদ চমৎকার হেসে দুই প্লেটের জায়গায় চার প্লেট খাবার অর্ডার করে খেতে লাগল। সে খেতে খুব ভালোবাসে।
মেঘ মুখ বিকৃত করে জলহস্তীকে দেখছে। অতঃপর বলল,
“কেসটা আমি অনেক দিন ধরে মেলাতে পারছি না বুঝলেন।”
“কী কেস বলুন।”
“তালহারের একটা বিড়াল আছে।”
“হুম তো?”
“আরে পুরো কথা শুনুন।”
“ওকে।”
“তার নাম প্রিশা। কিন্তু তালহার বলল, এই নাম নাকি ওই বিড়ালটির মা রেখেছে।”
“তো?”, মেহমেদ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। মেঘ অস্থিরতা নিয়ে বলল।
“জটিলতাটাই তো এখানে। কারণ তালহার কিছুক্ষণ পর নিজেকে ওই বিড়ালটির পাপা বলে সম্বোধন করছিল। পাপা যদি তালহার হয় তবে প্রিশার মা তালহারের কী হয়?”
“অবশ্যই স্ত্রী।”
কী ফালতু কেস! মেহমেদ ভীষণ আনন্দিত চিত্তে বলেই ওয়েটারকে ডাক দিল। বলল, খাবারগুলো প্যাক করে দিতে। কারণ বিশ মিনিট শেষ। সে প্যাক করা খাবার গুলো নিয়ে বলল,
“আপনার কেস সলভ। আমি তবে আসি হ্যাঁ?”
বলেই সে দ্রুত চলে গেল। কিন্তু মেঘ? সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে মেহমেদের গমনের পথে।
রেস্তোরাঁ প্রায় জনমানবহীন হতে শুরু করেছে। ঝলমলে সোনালী আলোয় আলোকিত আলিশান কক্ষের ঠিক সর্বশেষ প্রান্তের টেবিলটিতে বাবা মেয়ে তখন রাতের খাবার খাচ্ছিল।
তালহার চোখমুখ কুঁচকে খাবার খাচ্ছিল। আর তার পাশেই টেবিলের উপর পা গুটিয়ে বসা প্রিশা আরামে প্লেট ভরতি চিকেন খাচ্ছিল।
তার ধ্যান ভাঙে কেউ তার টেবিলের উপর ফোন মানিব্যাগ রেখে ঠিক সামনে সোফায় বসতেই।
একটা ক্লান্ত নিঃশ্বাসের শব্দে তালহার চোখ তুলে তাকায়। বরফ শীতল মুখে তার তুষারের মতোই শুভ্রতা, দারুচিনি রঙা দুই সরু শিকারী চোখ, ভাঙা চোয়ালে কালো কুচকুচে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, পেটানো সুঠামদেহী অবয়ব ঠিক যেন তালহার মুজাহিদের আরেক প্রতিরূপ।
তালহার চোখ নামিয়ে নিলো। তার পরনে কালো জগার্স আর অলিভ রঙা টিশার্ট। হাফ হাতা ভেদ করে ফুলেফেঁপে ওঠা মাংসল পেশি চমৎকার আকর্ষণীয় লাগছে। সে বাম হাতে মেনু কার্ডটা সামনে বসা মানুষটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“অর্ডার কর।”
সুপ্ত মেনু কার্ডটিকে এক পলক দেখে ছোট্ট করে বলল,
“অনলি ব্লাক কফি।”
তালহার ওয়েটারকে ডেকে সেটি বলে পুনরায় মগ্ন হলো বাজে স্বাদের খাবার খেতে। সুপ্ত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার বিকৃত মুখটির দিকে। খাবারটি যে জোরপূর্বক খাচ্ছে তা স্পষ্ট তালহারের চোখেমুখে।
সে কোনোধরণের কথোপথনের প্রারম্ভ করল না। শুধু তাকিয়ে রইল সামনের মানুষটির বক্তব্য শোনার অপেক্ষায়।
তার অপেক্ষা দীর্ঘ হলো না। তালহার নীরবতা ভেঙে ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল,
“এই প্রথমবার, আমার কাজ আমার ব্যক্তিগত দুনিয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে। আমার সেই দুনিয়া বাইরে বেরিয়ে আসছে যা আমি এই নোংরা দুনিয়া থেকে লুকিয়ে রেখেছি।”
“কী হয়েছে?”
প্রেক্ষিতে সুপ্ত নিরুদ্বেগ ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করল।
“বিন্দু ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে। ডিভোর্স চাইছে।”
“কেন?”
সুপ্তর চোখমুখ আগের মতোই শীতল।
“মেঘ।”
“জেনে গিয়েছে?”
“হুম।”
“ওহ্।”
ততক্ষণে তার কফি এসে গেল। আর সে নীরবে তাতে চুমুক দিতে লাগল। তালহার ভাত খাওয়া বন্ধ করল আর দৃষ্টি রাখল নিজের গোটা বাল্যকাল, কিশোর, যৌবনের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর দিকে। তার বন্ধু, তার শৈশব, তার জীবনের আরেক গভীর অংশ। যেই মানুষটা ব্যতীত তালহার মুজাহিদের গভীরতা কেউ চেনে না।
সে কথোপকথনের গুরুত্ব বোঝাতে পুনরায় বলল,
“সে একটা সিঙ্গেল প্রশ্ন পর্যন্ত করেনি আমি আসলেই এই অপরাধ করেছি নাকি!”
সুপ্ত নামক পুরুষটি এবারেও ছোট্ট করে জবাব দিল।
“ওহ্।”
তালহার এবার বিরক্ত হলো। জিজ্ঞেস করল,
“শুধু ওহ্? আর কিছু বলবি না?”
সুপ্ত কফি রেখে চোখ রাখে তার চোখে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“এখানে বলার মতো তো কিছু নেই। সে মিসেস তালহার মুজাহিদ! আর তার কাছ থেকে আমি এমনকিছুই আশা করেছিলাম। সে যা করেছে তাতে কোনো ভুল নেই।
কিন্তু ভাববার বিষয় হলো, তালহার মুজাহিদ কবে থেকে এত কাঁচা কাজ করতে শুরু করল যে তার গৃহিণীর কাছে সে ধরা পরে?”
তালহারের মুখশ্রী থেকে বিরক্তি মিলিয়ে গেল। আঁছড়ে পড়ে কিছু অব্যক্ত দুশ্চিন্তা। ধিমি কণ্ঠে বলল,
“ভুলটা আমার ছিল। কিছুটা ডিস্টার্ব থাকায় সেই সপ্তাহে আমি অফিশিয়াল ফোন বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
“ওহ্। কিন্তু ডিস্টার্ব থাকার কারণ কী?”
“বিন্দু মা হওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে পড়েছে। বিষয়টা এমন যে, বাচ্চা না হতে পারলে সে মরে যাবে। অবশ্য এতে দোষ আমার পরিবারের।”
“অস্বাভাবিক কিছু তো না। সে একজন মেয়ে। মাতৃত্ব ছাড়া একটা মেয়ে অসম্পূর্ণ।”
তালহারের চোখদুটো ধপ করে জ্বলে উঠল। থমথমে মুখে বলল,
“কোথায় লেখা আছে মাতৃত্ব ছাড়া একটা মেয়ে অসম্পূর্ন? মা না তে পারলে কী একটা মেয়ে মরে যেতে হবে? এটাই বলতে চাইছিস?”
সুপ্ত কফিতে চুমুক বসালো। শীতল কণ্ঠে বলল,
“আমি না, সমাজ বলে।”
“তবে আমি এই সমাজের বাইরে। আমার বাচ্চা চাই না। আমার স্ত্রী সুস্থ সবল আমার সামনে থাকবে এতটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট।”
“এইতো ঝামেলা মিটে গেল। তাহলে সমস্যা কোথায়?”
তালহারের চোখমুখে অসহায়ত্ব ফুটে উঠল।
“সমস্যাটাই এই সমাজ। আমি চাইলেই বিন্দুকে এই সমাজ থেকে আলাদা করতে পারছি না। আমার পরিবার, সমাজ সবার এখন মাথাব্যথা বাচ্চা নিয়ে। যে পারছে এটা নিয়ে একটা খোঁচা মেরে দিচ্ছে। তারা বন্ধ্যা বলে দিতেও দু’বার ভাবছে না। যেটা বিন্দুকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।”
“বাচ্চা না হলে এমনটা বলবেই স্বাভাবিক।”
“বাচ্চা হচ্ছে না কে বলেছে?”
তালহার সরু নেত্রে চেয়ে বলল। সুপ্তর চোখদুটো ও সরু হয়ে আসল।
“মানে?”
তালহার চোয়াল শক্ত করে বলল,
“বাচ্চা আমি হতে দিচ্ছি না।”
সুপ্ত কফি নামালো। তার চোখেমুখে চমৎকার কৌতুহল।
“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট? তুই ইচ্ছা করে বাচ্চা নিতে দিচ্ছিস না বিন্দুকে?”
“হ্যাঁ।”তালহার ঘাড় শক্ত করে বলল। এই একটা কঠিন সত্য নিজের মধ্যে চেপে রাখতে রাখতে তার ভেতরটা ভারী হয়ে পড়েছিল। আজ একটু হালকা লাগছে।
“আর এটা বিন্দু জানে না?”
“নাহ।”
“ওর সাথে এই গেম কেন খেলছিস? সমাজের সামনে ওকে প্রশ্নবিদ্ধ করছিস কেন?”
তালহারের কণ্ঠ বুজে আসে। চাপা আক্রোশের সাথে বলল,
“ও বাচ্চার জন্য পাগলপ্রায়। এতটাই পাগল যে বাচ্চার জন্য নিজের প্রাণ সংকটে ফেলতেও দু’বার ভাববে না। এমন অবস্থায় যদি আমি ওকে বাচ্চা নিতে বারণ করি ও কোনোদিন শুনবে না। এর থেকে ‘বাচ্চা হচ্ছে না’ এটা বেশি শান্তিপূর্ণ পথ।”
“কিন্তু এতকিছু কেন? বাচ্চা হলেই বা কী?”
“আমার বাচ্চা চাই না।”
“এটাই কারণ?”
তালহার নিভে যাওয়া আদলে বলল,
“হ্যাঁ।”
সুপ্ত সহসা সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে বিদ্রুপাত্মক হাসি হাসল। ভীষণ দৃঢ়তার সাথে বলল,
“আমি এটা বিশ্বাস করছি না। কিন্তু আমি তোকে জোর করব না। এটা নিতান্তই তোদের ব্যক্তিগত ব্যপার।”
সে বিরতি নিলো। পুনরায় বলল,
“কিন্তু পেশা আর অনুভুতি যখন একসাথে মিলে যায় তখন সেটা ভীষণ বাজে পরিণতি বয়ে আনে। এটা তোর থেকে ভালো কে জানে! তাহলে তুই কী করে অনুভূতিকে ঢোকালি নিজের পেশার মাঝে।”
তালহার বুঝে যায় সুপ্ত ঠিক কোন অনুভূতির কথা বলছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল মেঘের হাসিমাখা নিষ্পাপ চঞ্চল মুখটি। সে খরগোশের ন্যায় সর্বদা চঞ্চল থাকে। দুঃখ তাকে ছুঁতে পারে না সহজে।
সহসা তালহারের চোখমুখে অপ্রতিরোধ্য পাষণ্ডতা ফুটে উঠল। বলল,
” আমি একজন গোয়েন্দা। আমায় আমার কাজ সম্পন্ন করার জন্য যা করতে হয় তা করা আমার ধর্ম। এখানে কোনো অনুভূতির মূল্য নেই।”
সুপ্ত তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তাহলে তুই কী করে আশা করছিস যে—কেউ তোর অনুভূতিকে মূল্য দেবে?”
“মেঘ আমার খুব ভালো বন্ধু এবং শুধুমাত্র আমার কাজকে সহজ করছে।”
“কিন্তু মেঘের কাছে বিষয়টা তো এমন না। সে প্রকাশ্যে তোর ভালোবাসায় ডুবে আছে।”
“এটা তার ভুল। আমি তাকে শুধু একজন বন্ধু আর একজন নারী হিসেবে সম্মান করি, প্রায়োরিটি দেই। সেটাকে সে ভালোবাসা ভেবে নিলে সেটা তর ভুল, আমার না।”
“আর তুই যে নীরবে তার অনুভূতিকে ব্যবহার করছিস?”
“বললাম তো, দেয়ার ইজ নো সেন্টিমেন্ট ইন জব। গোটা দেশের ভালো করার জন্য একজনের মন ভাঙলে কিছু হয় না। বরং সে ভালোকাজে সহায়তা করছে। করাপশনের কাছে অনুভূতি কিছুই না।”
তালহারের একরোখা কণ্ঠ। সে তার কাজকে সফল করার জন্য যেকোনো কাজ করতে বাধ্য। কিন্তু সে কী জানত, মন ভাঙা সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ? কিন্তু কে বোঝাবে! সে তালহার ছিল। যে নিজের কাজের ক্ষেত্রে একরোখা এক দৃঢ় সত্ত্বা।
সুপ্ত বিরক্ত হলো ভীষণ।
তালহার খাওয়ায় মনোযোগ দিল। সুপ্ত কফিতে চুমুক দিতে গেল। কিন্তু দেখল তার কফির মগ ইতিমধ্যেই শূন্য। সে ত্যাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে আরো একটা কফি আনালো। মুখ ভ্যাটকাতে ভ্যাটকাতে খেতে ব্যস্ত বন্ধুকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,
“ক’দিন হলো বিন্দু ঘর ছেড়েছে?”
তেলে জবুথবু ইলিশ মাছটা ক্রুব্ধ বদনে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে তালহার ক্ষীণ স্বরে জবাব দিল,
“একুশ দিন, চৌদ্দ ঘন্টা, পঁয়ত্রিশ মিনিট, সাতান্ন সেকেন্ড।”
সুপ্তর শীতল মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল স্ত্রীর ভালোবাসায় বাজেভাবে ফেঁসে যাওয়া এক কঠোর মানুষকে দেখে। পা দোলাতে দোলাতে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
“And how were those days?”
“ব্যস্ত দিন, রেস্তোরাঁর বাজে খাবার আর পিসির সামনে বসে নির্ঘুম রাত কাটানো।”, তালহার উদাসীন কণ্ঠে বলল।
সুপ্তর উদাসীন বদনে মৃদু হাসল। কণ্ঠে অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে বিদ্রুপ করে বলল,
“অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ও যে এতটা ভয়ানক হতে পারে তোকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।”
তালহার নির্বাক। সুপ্ত কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“কবে আনবি বিন্দুকে?”
“যতদিন না কেস সফলভাবে সলভ হচ্ছে।”
“কেন?”
“আমাকে চব্বিশ ঘন্টা মনিটর করা হচ্ছে।”
“অতিরিক্ত চিন্তা করছিস। আমার মনে হয়না কেউ বিন্দুর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। আমি আর কবির ছাড়া এই শহরের কেউ জানেনা তুই বিবাহিত আর তোর স্ত্রী তোর সাথেই থাকে।”
তালহার চোখমুখ কুঁচকে তাকালো তার পানে। ভীষণ সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“তুই সত্যিই একজন গোয়েন্দা? এই কথা কী করে বললি? তারা হন্য হয়ে আমার দূর্বলতা খুঁজছে কেসটাকে কোনোরকম ঝামেলা ছাড়া বন্ধ করার জন্য।”
সুপ্ত হেসে উঠল। সেও একজন গোয়েন্দা অফিসার। কিন্তু রাজশাহীর। সে পা দোলাতে দোলাতে কণ্ঠ খাদে এনে বলল,
“তাদের হাতে কোনোভাবে বিন্দু লেগে গেলে কী তালহার মুজাহিদ শেষ হয়ে যাবে?”
তালহার সরব হেসে উঠল গা দুলিয়ে। হাসতে হাসতে বলল,
“তালহার মুজাহিদকে শেষ করা এতটা সহজ হলে পাঁচ বছর আগেই সে শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু সে যখন এখনো বেঁচে আছে তখন আগামী দিনেও তাকে কেউ শেষ করতে পারবে না।”
তার চোখে অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস। যেটা সাধারণ কাউকে চমকে দেবে। কিন্তু সুপ্ত একটুও চমকালো না। বলল,
“কে করছে এসব? মাহির চৌধুরী?”
তলহারের ঠোঁটের কোনা বেঁকে যায়। তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“মাহির চৌধুরী শুধু একজন তত্ত্বাবধায়ক। মেইন খেলা তো অন্য কেউ খেলছে।”
“তুই জানিস সে কে?”
জবাবটি দিতে একটু সময় নিলো তালহার। কিয়ৎকাল বাদ বলল,
“নাহ।”
“আমি কী তোর কথা বিশ্বাস করে নেবো?”
“তোর সিদ্ধান্ত।”
“তবে আমি এবারেও বিশ্বাস করছি না।”, সুপ্তর চোখেমুখে ভরপুর আত্মবিশ্বাস। তালহার স্মিত হাসল। ছোট্ট করে বলল,
“গুড।”
সুপ্ত আর কিছু বলল না। তালহার টপিক ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এক সপ্তাহ কোথায় ছিলি?”
“ডিএক্টিভেট ছিলাম।”
“ডিএক্টিভেট নাকি কমিশনারের মেয়ের সাথে সেন্টমার্টিনে প্রি ওয়েডিং হানিমুনে ছিলি?”
তালহারের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। সুপ্ত বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি তোর ঘরের বউ না যে আমার সব খবরাখবর রাখবি।”
তালহার কাঁধ ঝাঁকালো।
“অফিসার শাহরিয়ার তার স্ত্রীকে নিয়ে সেন্টমার্টিন গিয়েছিল। সেই বলল তোর কথা।”
“তার মধ্যে পাশের বাসার আন্টিদের স্বভাব রয়েছে দেখছি। দেখছে ভালো কথা। তোকে বলার কী প্রয়োজন?”
তালহার মুচকি হেসে বলল,
“আমায় না বললেও বা কী? আমি তো এটাও জানি আগামী মাসে রাজশাহীর ডিসি’র মেয়ের সাথে তুই মালদ্বীপ যাচ্ছিস।”
সদ্য চুমুক দেয়া কফিটা মাথায় উঠে গেল সুপ্তর। সে কাঁশতে কাঁশতে ক্রুব্ধ চোখে তালহারকে দেখল। তালহার তাকে পাত্তা না দিয়ে হাত ধুয়ে আসল। প্রিশাল খাওয়াও শেষ। প্রিশার মুখ মুছিয়ে দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো। বলল,
“কোথাও যাওয়ার প্লান আছে?”
“নাহ।”
“আমার সাথে যাবি?”
সুপ্তর ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল। বিদ্রুপ করে বলল,
“বউ বাড়ি নেই বলে অফার করছিস? বউ থাকলে তো কখনো এক বেলা দাওয়াত করে খাওয়াস না, বাড়িতে নেয়া তো দূরের কথা।”
তালহার বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৭
“যাবি কি-না সেটা বল।”
সুপ্ত সোফা ছেড়ছ উঠে বলল,
“লেটস গো।”
