ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৯
রিক্তা ইসলাম মায়া
একটা পড়ন্ত বিকেল। সূর্যটা হেলে আছে পশ্চিম আকাশে। শরীরে শিরশির করে দোলা দিচ্ছে দখিনা হাওয়া। পিপপিপ শব্দে নূরজাহানের ঘুমের রেশ হালকা হয়ে আসে। কপাল কুঁচকে বিরক্তিতে পাশ ফিরে শুলো। পিপপিপ শব্দটা যেন আরও বেশ কানে লাগছে। বিরক্ত নূরজাহান উঠে বসল। মাত্র কিছুক্ষণ আগে শুয়েছিল সারাদিনের ক্লান্তিতে। অসময়ে নূরজাহান শুতে চায়নি। কিন্তু বসে থাকতে থাকতে কখন জানি ঘুমে চোখ লেগে এসেছে। নূরজাহান ঘুমন্ত রক্তিম চোখে উঠে দাঁড়াল। বিরক্তিকর শব্দের উৎস খুঁজে বারান্দায় দাঁড়াল। গায়ে বয়ে গেল স্নিগ্ধ শীতল হাওয়া। মারিদের ঘরের দক্ষিণ পাশে বারান্দা। নূরজাহান গ্রিল ধরে নিচে তাকাল। দু’টো গাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। পিপপিপ শব্দটা গাড়ির হর্নের। নূরজাহান দরজা-জানালা খোলা রেখে শুয়েছিল সেজন্য বোধহয় এত শব্দ পাচ্ছিল। নূরজাহান মুগ্ধ নয়নে চারপাশে তাকায়। অদূরে বাড়ির আম গাছের পাতা দুলছে দখিনা হাওয়ায়। নূরজাহানের গায়ে একটা লাল জামদানি শাড়ি জড়িয়ে, মাথায় ঘোমটা টেনে বাড়ির পশ্চিমে তাকাল। মারিদদের বাড়ির সঙ্গে রাস্তা। যান্ত্রিক শহরের গাড়িগুলো যাতায়াত করছে বিরতিহীন। নূরজাহানের জীবনে এই নিয়ে তৃতীয়বার সে ঢাকা শহরে এসেছে। আর তৃতীয়বারের যাত্রাটা হয়েছে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর ঘরে।
নূরজাহানকে ওর শ্বশুর-শাশুড়ি ঢাকা নিয়ে এসেছে। এতে হাসান, আলেহা, তারানূর বাধা দেয়নি। সবার সম্মতিতেই নূরজাহান শ্বশুরবাড়িতে এসেছে বেড়াতে। কাল রাতে সবাই থানচি থেকে রওনা হয়। ঢাকা পৌঁছায় সকাল দশটার নাগাদ। শান্তা, তনিমা, রিফাত, খালেদ, তাপসকে নিয়ে সোজা সেদিকেই নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে। সৈয়দ বাড়িতে ফিরা হয়নি তাদের। নতুন বউকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ওঠা শোভা পায় না, সেজন্য শান্তা সৈয়দ বাড়িতে আসেনি তনিমাকে নিয়ে। রাদিলও নিজের মাকে নিয়ে নিজেদের বাড়িতে চলে যায়। সুখের সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ কিংবা কথা হয়নি। রাদিল সেদিনের ঘটনার পর গম্ভীর, নিশ্চুপ হয়ে গেছে আরও। সৈয়দ বাড়িতে নূরজাহানের গৃহপ্রবেশ সালমা করায়। মারিদের অনুপস্থিতিতে নূরজাহানকে ধান-পাতা দিয়ে বরণ করে। নূরজাহান বেশ অবাক চোখে সবটা দেখছিল। ওর জীবনে এত সম্মান, স্বস্তির, শান্তির জায়গা কোথাও পায়নি। এখানে কেউ নূরজাহানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ছোট করে কথা বলে না। সম্মান দেয়, হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করে। নূরজাহানকে মারিদের ঘরে মুনিয়া, ফাতেমা, সুখ দিয়ে গেছে। বলেছে মারিদের ঘরটা আজ থেকে নূরজাহানেরও। স্বামীঘর বউদের স্থায়ী ঠিকানা হয়। সেদিন রাতের পর মারিদের সঙ্গে নূরজাহানের আর দেখা হয়নি আজ দু’দিন। এই বাড়িতে এসে নূরজাহান শুনেছে মারিদ নাকি সকালে বেরিয়ে গেছে অফিসের কাজে, রাতে ফিরবে। নূরজাহানকে যে সবাই ঢাকা নিয়ে এসেছে সেটা মারিদ জানে কিনা নূরজাহানের জানা নেই। কিন্তু নূরজাহান অধীর অপেক্ষায় বসে আছে তার ব্যবসায়িক সাহেবকে একনজর দেখতে।
দুজনের ফোনে কথা বলার সময়ে নূরজাহান জানত না ফোনের ওপাশে কে ছিল। নূরজাহান কার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে এত কথা বলত! নূরজাহান তো এটাও জানত না ব্যবসায়ীক সাহেবের নাম কী? সে দেখতে কেমন? কী কাজ করে? মারিদ সবসময় বলত সে একজন ব্যবসায়িক মানুষ। সেই থেকে নূরজাহান ফোনের মানুষটাকে নাম দিয়েছিল ব্যবসায়িক সাহেব। নয়তো জানা ছিল না মারিদ সম্পর্কে কিছুই। নূরজাহানের মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা হতো ব্যবসায়িক সাহেব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে। সে কে? কী তার নাম-পরিচয়, সবকিছু। কিন্তু কখনো প্রশ্ন করা হয়নি। মারিদ সবসময় জানত ফোনের অপরিচিতা তাকে চিনে কথা বলছে। হয়তো মারিদ মানুষটাকে চেনে না কিন্তু অপরিচিতা ঠিকই তাঁকে চেনে। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল ছিল। নূরজাহানের জন্যও মারিদ ততটাই অপরিচিত ছিল যতটা অপরিচিত নূরজাহান মারিদের জন্য ছিল। তাহলে কীভাবে নূরজাহানকে ব্যবসায়িক সাহেব খুঁজে পেল? নূরজাহানের জন্য তো দুঃস্বপ্নের মতো ছিল ব্যবসায়িক সাহেবের দেখা পাওয়া। অথচ মারিদ নূরজাহানের দুঃস্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তর করে ওর জীবনে চলে আসল? তারপর কীভাবে যেন নূরজাহান ওর ব্যবসায়িক সাহেবের বউও হয়ে গেল? তাহলে কি নূরজাহান আসলেই এতটা ভাগবতী যে ফোনের মানুষটা ওর জীবনে চলে আসল? সত্যি কি তাই নাকি নূরজাহান কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে?
নূরজাহান গুমোট অস্বস্তিতে গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে। নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেব ওর স্বামী—বিষয়টি এখনো অবিশ্বাস্য লাগছে। এই চিন্তায় গোটা দু’দিন নূরজাহান অস্থিরতায় পাগল হয়েছে। কবে মারিদের মুখোমুখি হবে সেই অপেক্ষায় দিন গুনেছে। অথচ আজ ব্যবসায়িক সাহেবের ঘরে বউ হিসেবে ঠাঁই পেয়েও মন সাক্ষ্য দিচ্ছে অপরাধী বলে। মারিদের মুখোমুখি হয়ে নূরজাহান মারিদকে কী বলবে নূরজাহানের জানা নেই। নূরজাহান শুধু দুই নয়ন ভরে ব্যবসায়িক সাহেবকে দেখতে চায়। ফোনের ওপাশের মানুষটার বাস্তব রূপ কেমন সেটা দেখতে চায়। মারিদ এতদিন ধরে নূরজাহানদের বাড়িতে যাওয়া-আসা করছে অথচ নূরজাহান কখনো মারিদকে লক্ষ করেনি। আর না কখনো চোখ তুলে দেখতে চেয়েছে। অথচ আজ মন ভরে সেই মারিদকে দেখার আকাঙ্খা জাগছে মনে। গ্রিল থেকে মাথা উঠিয়ে নূরজাহান ঘরে ঢুকল। তখন ক্লান্তিতে মারিদের ঘরটা দেখতে পারেনি। কিন্তু এখন সবকিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। মারিদের ফোনে বর্ণনা দেওয়ার মতোই ঘরটা সাজানো। নূরজাহান এগিয়ে এসে বেড সাইডের তৃতীয় ড্রয়ার খুলে ছোট একটু বাক্স বের করে। তাতে রাখা সুন্দর দুটো পায়েল। পায়েলগুলো মারিদ বাণিজ্য মেলা থেকে নূরজাহানের জন্য কিনেছিল। সেইবার যখন মারিদ নূরজাহানের সঙ্গে ফোনে কথা বলত তখন রিফাতের সঙ্গে বাণিজ্য মেলায় গিয়েছিল সে। সেখানেই নূরজাহানের জন্য এই দুটো পায়েল পছন্দ করে কিনেছিল। মারিদ নূরজাহাকে কুরিয়ার করে পাঠাতে চেয়েছিল কিন্তু নূরজাহান নেয়নি, বলেছিল দুজনের প্রথম দেখার দিনে নূরজাহান মারিদের থেকে পায়েলগুলো গ্রহণ করবে, এর আগে নয়।
নূরজাহান বক্সের পায়েলগুলো হাতে নিয়ে তাতে চুমু বসায়। বেড সাইডের তৃতীয় ড্রয়ারে নূরজাহানের পায়েলগুলো রাখা আছে সেটা মারিদ নূরজাহানকে বলেছিল। মারিদের ঘরটা দোতলায়। পাশাপাশি সুখের ঘর। নূরজাহান মাথায় ঘোমটা টেনে ঘর ছেড়ে বেরোয়। আশেপাশে তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অসময়ে সবাই কোথায় যাবে? এখন পড়ন্ত বিকেল, হয়তো সবাই সারারাতের জার্নিতে যার যার ঘরে ঘুমাচ্ছে। নূরজাহান সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে সালমার দেখা পেল। তিনি নূরজাহানকে বসার ঘরে দেখেই বললেন…
‘ তুমি ঘুমাওনি?
নূরজাহান অস্বস্তিতে ছোট গলায় বলল…
‘ ঘুম আসছে না আম্মা।
‘ তোমার জায়গা বদল হয়েছে সেজন্য হয়তো নতুন পরিবেশে ঘুম আসছে না। চা খাবে তুমি? করে দিতে বলব?
বেশ ছোটবেলা থেকেই নূরজাহান কাজ করে অভ্যস্ত। রান্নাবান্নাসহ যাবতীয় কাজ সে বেশ ছোটবেলা থেকেই শিখে নিয়েছিল শাহানার মন জয় করতে। ভাগ্যের পরিহাসে নূরজাহান কখনো শাহানার মন জয় করতে না পারলেও রান্নাবান্নার কাজটা সে বেশ ভালোই পারে। নূরজাহান আবদার করে বলে…
‘ আপনার জন্য চা আমি বানাই আম্মা?
‘ তুমি রান্নাবান্না জানো?
‘ জি।
‘ তাহলে পরে একসময় আমাদের সবাইকে রান্না করে খাইয়ো। আজ থাক। আজ প্রথম দিন তুমি স্বামীর ঘরে এসেছ। আজই রান্নাঘরে যাওয়ার দরকার নেই। আমি রোজিনাকে বলে দিচ্ছি ও-ই আমাদের সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়াবে। তুমি এসে আমার পাশে বসো।
নূরজাহান মাথার ঘোমটা টেনে সালমার সামনে এসে দাঁড়াল। ফের আবদার করে বলে….
‘ শুয়ে-বসে থাকতে আমার অস্বস্তি লাগছে। আপনাকে আমি চা-টা করে দিই আম্মা?
সালমা নূরজাহানের আদলের সুন্দর মুখটার দিকে তাকালেন। খুব রূপসী এই মেয়ে। যদিও নূরজাহানের পরিবার উনাদের সমমর্যাদা সঙ্গে যায় না। তবে উনারা যদি মারিদের জন্য সোনার টুকরো মেয়েও খোঁজে আনতো তাহলেও এত সুন্দর মেয়ে মারিদের জন্য কখনো খুঁজে পেতেন না। এই মেয়ে রূপসী, নম্র-ভদ্র তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু নূরজাহান কতটুকু গুণী সেটা সালমা জানেন না। বাড়ির বড় বউ হিসেবে নূরজাহানের কাঁধে কিছু দায়িত্ব থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। সালমা বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলেন…
‘ যদি পারো তাহলে করে আনো। খেয়ে দেখি কেমন চা বানাতে পারো তুমি। রেণু, যা তো তোর ভাবিকে সাহায্য কর গিয়ে।
‘ জে খালাম্মা।
নূরজাহান রেণুর পেছনে রান্নাঘরে যাচ্ছে। সালমা রোজিনাকে বলছেন….
‘ তোর মারিদ ভাই সকালে কখন বেরিয়েছিল জানিস কিছু?
‘ সাড়ে আটটার দিকে হইব খালাম্মা। ভাইজানেরে ফোনে কারে জানি কইতে হুনছিলাম হেই আইজ রাইতে নাকি বিদেশ যাইব কামের লাইগা। বাড়িতে ফিরব না।
রোজিনার কথায় সালমা কপাল কুঁচকালেন। ওইদিন হঠাৎ করে কাজের কথা বলে রাতে ঢাকা চলে আসে মারিদ। উনারা নতুন বউকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে, অথচ মারিদ বাড়িতে না এসে বিদেশ কোথায় যাবে! সালমা রোজিনার কথায় অনিহা প্রকাশ করে বলেন…
‘ নতুন বউ বাড়িতে এসেছে। মেয়েটা একা ঘরে থাকবে কীভাবে? সবকিছুতে খামখেয়ালি চলবে না। নতুন বউ যতদিন এই বাড়িতে থাকবে মারিদের কোথাও যাওয়া চলবে না। যা তো রোজিনা, আমার ফোনটা এনে দে। তোর মারিদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলব যেন দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসে।
‘ জে খালাম্মা। এহোনই আনতাছি খাঁড়ান
নূরজাহান চলে যেতে যেতে সালমা ও রোজিনার কথাগুলো কানে এসেছে। বুক ভারী হয়েছে কষ্টে। মারিদ যে নূরজাহানকে ইগনোর করতে পরদেশী হতে চাচ্ছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে নূরজাহান।
রাত প্রায় বারোটার ঘরে। মারিদ যেখানে সচরাচর রাত নয়টা-দশটার মধ্যে বাসায় ফিরে সেখানে প্রায় মধ্যরাত। বাচ্চাকাচ্চা, বাড়ির বড়রাসহ সবাই খেয়ে শুয়ে পড়েছে। সবাই ক্লান্ত সেজন্য আজ কেউ আড্ডা বসায়নি বসার ঘরে। সালমা বেশ কয়েকবার নূরজাহানকে বলেছে গিয়ে শুয়ে পড়তে কিন্তু নূরজাহান সালমার সঙ্গে বসার ঘরে মারিদের অপেক্ষা করছে দেখে সালমা আস্তে করে উঠে যান। নতুন বর-বউ ওরা, বউ স্বামীর জন্য অপেক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে উনার বাধা দেওয়াটা বেমানান লাগছে। সালমা নূরজাহানকে বলেন….
‘ মারিদ আসলে রেণু কিংবা রোজিনাকে বলবে মারিদের খাবার গরম করে দিতে। মারিদকে বলবে ঘরে খেয়ে নিতে, বুঝেছ?
‘ জি আচ্ছা।
‘ মারিদ আসতে বেশি লেট করলে ঘরে গিয়ে শুয়ে পরবে। বেশি রাত জাগার দরকার নেই।
‘ আচ্ছা।
সালমা চলে যান। মারিদের অপেক্ষায় নূরজাহান বসার ঘরে সোফায় বসে ঝিমাচ্ছে। রেণু, রোজিনা রান্নাঘরের পাশের ঘরটায় শুয়ে। একা বাড়িতে নূরজাহান জেগে। ড্রয়িংরুমে সব লাইট নিভিয়ে শুধু একটা লাইট জ্বালিয়ে রেখেছে। মারিদ বাড়িতে ফিরে ১২:৪৫ মিনিটে। ড্রাইভারকে গাড়ি পার্কিং করতে দিয়ে সে ড্রয়িংরুমে কলিংবেল বাজায়। বাম হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে প্যান্টের পকেটে একটা হাত ঢুকিয়ে অপর হাতে দ্বিতীয়বারের মতো কলিংবেল বাজাতেই নূরজাহান দরজা খুলে দেয়। মারিদের বেখেয়ালি দৃষ্টি নূরজাহানের উপর পড়তেই সে থমকে দাঁড়ায়। হাত কলিংবেলের সুইচবোর্ডে আটকে। লাল শাড়ির ঘোমটায় নতুন বউয়ের রূপে নূরজাহান দাঁড়িয়ে। মারিদের জন্য দরজা সচরাচর সালমা কিংবা কাজের মানুষজন খুলে দেয়। অথচ আজ স্বপ্নের মতো মারিদের দরজা খুলে নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে। মারিদ নূরজাহানের দিকে কয়েক পলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘরে ঢোকে।
মারিদের বিশ্বাস হচ্ছে না নূরজাহান এই মুহূর্তে তার বাড়িতে থাকতে পারে। বিগত দুদিন ধরে মারিদের পরিবারের কারও সাথে যোগাযোগ নেই, সে কারও ফোন রিসিভ করেনি—তারা মারিদকে বিরক্ত করে সে কেন থানচিতে সবাইকে ফেলে, নতুন বউকে ফেলে একা ঢাকা চলে এসেছে। প্রতিবার একই কৈফিয়ত দিতে চায় না বলে মারিদ পরিবারের কারও ফোন রিসিভ করেনি। আজ বাড়ির সবাই তাকে কল দিয়েছিল কিন্তু মারিদ এবারও কারও ফোন রিসিভ করেনি। কল রিসিভ করলে হয়তো জানতে পারত, নূরজাহানের আগমন হয়েছে সৈয়দ বাড়িতে।
কলিংবেলের শব্দে রোজিনা চোখ ডলতে ডলতে ড্রয়িংরুমে নূরজাহান ও মারিদকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করে…
‘ ভাইজান, আপনেরে খাওন দিমু?
মারিদ নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চায়…
‘ বাড়ির সবাই কবে ফিরেছে রোজিনা?
‘ সক্কালে। আপনের যাওনের পরপরই ভাইজান।
মারিদ নূরজাহানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চলে যেতে যেতে রোজিনাকে বলল….
‘ আমাকে একটা কফি করে দে।
‘ তাইলে ভাইজান খাওন দিমু না?
‘ না, বাহির থেকে খেয়ে এসেছি।
নূরজাহানকে রেখে মারিদ রোজিনার থেকে কফি চেয়েছে। তাতে স্পষ্ট মারিদ নূরজাহানকে ইগনোর করছে। নূরজাহান রোজিনাকে ঘুমাতে বলে সে মারিদের জন্য কফি বানিয়ে মারিদের ঘরের দরজায় টোকা দেয়। নূরজাহানের শরীর কাঁপছে অস্থির, উত্তেজনা আর ভয়ের তাড়নায়। নূরজাহান দ্বিতীয়বার ঘরের দরজায় নক করতে মারিদ ভেতর থেকে ডাকে…
‘ আয়।
নূরজাহান কম্পিত শরীরে ভেতরে ঢোকে। অস্থির চঞ্চল দৃষ্টি মেঝেতে আটকে। নূপুরের মৃদু শব্দে মারিদ আয়নার ভেতর দিয়ে নূরজাহানের নত মস্তকের মুখটা দেখে কপাল কুঁচকে বলে…
‘ আপনি এই ঘরে কেন এসেছেন?
‘ তাহলে কোথায় যাব?
‘ যেখানে খুশি যান। এই ঘর থেকে বের হোন।
‘ আপনি এখন আমাকে অপমান করছেন।
‘ ইউ ডিজার্ভ ইট।
নূরজাহান জানে মারিদ ভয়ংকর রেগে আছে নূরজাহানের উপর। রেগে থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে নূরজাহানের মুখোমুখি না হয়ে, কোনো প্রশ্ন না করে, নিজের মনগড়া রায় বানানোটাও অপরাধ। নূরজাহান অপরাধী হতে পারে, তারপরও মারিদের অন্তত নূরজাহানের দিকটা শোনা উচিত।
নূরজাহান সোফার টেবিলের উপর মারিদের কফি মগটা রেখে বলে…
‘ আমাকে এই ঘরে থাকার অনুমতি আপনার পরিবার দিয়েছে। আপনার অসুবিধা হলে আপনি গিয়ে তাদের সাথে কথা বলুন। উনারা আমাকে যেখানে থাকতে বলবেন আমি সেই ঘরেই থাকব।
নূরজাহান কথা শেষ করে বিছানার বাম পাশে গিয়ে বসে পড়ে। মারিদ নূরজাহানকে বিছানায় বসতে দেখে দাঁতে দাঁত পিষে কাবার্ড হতে নিজের টি-শার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার পথে টেবিলের উপর রাখা নূরজাহানের কফির মগটা ছিটকে ফ্লোরে ফেলে। ঠাস শব্দে নূরজাহান ভয়ে চমকে ওঠে। নূরজাহানের মনে হচ্ছে মারিদ কফির মগটা ফ্লোরে নয় বরং অদৃশ্যভাবে নূরজাহানের মুখে মেরেছে। ওয়াশরুমের দরজাটাও মারিদ একই ভাবে ঠাস শব্দে লাগিয়েছে। দরজার শব্দে নূরজাহানের মনে হয়েছে দরজাটা ভেঙে গেছে হয়তো। দেয়াল কয়েক সেকেন্ড পর্যন্ত কম্পিত হয়েছে। অপমানে থমথমে মুখে নূরজাহানের সাহসে কুলাল না মারিদের ঘরে থাকতে। নূরজাহান ঘর ছেড়ে উঠে বারান্দার একক সোফায় গিয়ে পা গুটিয়ে বসল। এই মূহুর্তে হাউমাউ করে কাঁদতে পারলে হয়তো নূরজাহানের ভালো লাগত। কিন্তু নূরজাহান কাঁদবে না। ব্যবসায়িক সাহেবকে নিজের করে পাওয়ার তৃপ্তিতে আজ তার সামান্য অপমানও নূরজাহানের কাছে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। নূরজাহান বড় ঋণী ব্যবসায়িক সরকারের কাছে। নূরজাহান জানে না মারিদের রাগ কীভাবে ভাঙাবে। তবে আজ এই অভিমানের শহরেও নূরজাহানকে তৃপ্তি দিচ্ছে। দুঃখ-কষ্ট আর না পাওয়ার ব্যথাটুকু নূরজাহানকে ছুঁতে পারছে না। আজ নূরজাহান সুখী। ওর ব্যবসায়িক সাহেবকে পেয়ে ভীষণ খুশি। হোক না অভিমানী ব্যবসায়িক সাহেব। তাতে কী?
মারিদ গোসল সেরে ঘরে ঢুকে নূরজাহানকে পেল না। ফ্লোরে ভাঙা মগটা সেভাবেই ছিটকে পড়ে আছে। মারিদ ভেবেছে নূরজাহান চলে গেছে। মারিদের ক্ষিপ্ত মেজাজ এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়। মাথা টনটন করছে ব্যথায়, কফি না খেলেই নয়। নূরজাহান এত রাতে কার ঘরে গিয়ে শুয়েছে কে জানে? এমন মিথ্যাবাদী নারী যেখানে খুশি সেখানে যাক, মারিদ যাবে না এই নারীর পেছনে। ক্ষিপ্ত মেজাজে মারিদ আর কিছুই ভাবল না। ঘরের কফি মেকারে সে নিজের কফি বানিয়ে অন্ধকার বারান্দায় যেতেই চোখে পড়ল সোফায় গুটিয়ে শুয়ে থাকা নূরজাহানকে। গায়ের শাড়িটা শরীরে পেঁচিয়ে শুয়ে আছে। বাইরের শীতল হাওয়ায় ঠান্ডা লাগছে হয়তো। মারিদ গ্রিলে পিঠ ঠেকিয়ে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে কফিতে চুমুক বসাল। এই মেয়ের জন্য মারিদ কী না করেছে? বাংলাদেশের প্রায় এগারোটা জেলায় গিয়েছিল এই মেয়েকে খুঁজতে, অবশেষে এই মেয়ে তার বউ, তার সামনে ঘুমিয়ে। দুজনের এই প্রথম কাছাকাছি, পাশাপাশি একই ঘরে রাত্রিযাপন করা। এই রাতটা সুন্দর হতো যদি নূরজাহান তার সঙ্গে মিথ্যা ছলনা না করত। বেখেয়ালি মারিদের চোখ হঠাৎ নূরজাহানের পায়ে আটকায়। নূরজাহানের কোমল ফর্সা পায়ে মারিদের কিনা পায়েল দুটো দেখে মুহূর্তে রেগেমেগে তেতে ওঠে মারিদ। হাত বাড়িয়ে ঠাস করে নূরজাহানের পা হতে পায়েল দুটো টেনে ছিঁড়ে নিতেই নূরজাহান ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে শরীরের ঘুমের তাড়নায় ঠাস করে খেই হারিয়ে পুনরায় সোফায় বসে পড়ল। মারিদ হাতের মুঠোয় পায়েল দুটো চেপে রেগেমেগে বলে….
‘ বেইমানের সাত রঙ মনে হয় আপনার মতোই হয় অপরিচিতা, তাই না? আমাকে জিজ্ঞাসা না করে আমার পার্সোনাল জিনিসে হাত দিলেন কেন? কাকে জিজ্ঞাসা করে পায়েলগুলো পরেছেন?
কাল সারারাত জার্নি করায় ঘুমাতে পারেনি নূরজাহান। নতুন পরিবেশ হওয়ায় দিনেও ঘুমাতে পারেনি। আর এখন মধ্যরাতে শরীর তাড়াচ্ছে ঘুমের তাড়নায়, অথচ মারিদ এই রাতে জ্বালাতন করছে। নূরজাহান ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে বলল..
‘ আমরা কি কোথাও বসে কথা বলতে পারি?
‘ আমরা কোথাও বসে কথা বললে কি আপনি আমাকে আরেকটা মিথ্যা কাহিনি বানিয়ে শোনাবেন এজন্য? আমি তো পাগল, সেজন্য আবারও আপনার মিথ্যাকে বিশ্বাস করব, রাইট?
নূরজাহান দুই নয়নে শুধু মারিদের দিকে তাকিয়ে রইল। ফোনের ব্যবসায়িক সাহেব নূরজাহানের প্রতি বেশ আন্তরিক ছিল। বাস্তবিক ব্যবসায়িক সাহেব বেশ মেজাজি মানুষ। নূরজাহান ভারী হতাশ গলায় বলে…
‘ কী হয়েছে আপনার? এমন করছেন কেন? আপনার সাথে আমার পরিচিত ব্যবসায়িক সাহেবকে মিলাতে পারছি না। কিছু একটা মিস করছি। হয়তো অনুভূতি ফিলিংস?
‘ অনুভব, অনুভূতি, মানুষের ফিলিংস—এসব আপনি বোঝেন? সেই মন আছে আপনার?
নূরজাহান বেশ চঞ্চলতায় পা উঠিয়ে বসল। মারিদের দিকে তাকিয়ে সেই ফোনের অপরিচিতার মতো করে বলল….
‘ আপনি জানেন? মানুষ যাদের দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাদের কিয়ামতের দিন আবার দেখা হবে।
নূরজাহানের কথায় মারিদ তেতে উঠে বলে…
‘ আপনি এত নাটক কীভাবে করেন? মানুষকে ধোঁকা আর ছেড়ে দেওয়ার জন্য?
নূরজাহান বেশ অদ্ভুত হেসে বলল….
‘ আমার কাউকে ছাড়া লাগে না। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়। এই যেমন আপনি এখন আমাকে নিজের পেছন ছাড়াচ্ছেন। কিন্তু আমি থেকে যাওয়ার বাহানা করছি। এটাই বাস্তব।
মারিদ রাগে ফুসফুস করছে। দু’হাত মুঠোয় পিষছে। মারিদ যদি নূরজাহানের পেছন ছাড়াতে চাইত, তাহলে সে কখনোই এত খোঁজাখুঁজি, এত তল্লাশি করে নূরজাহানকে খুঁজে বের করে এত কাহিনি করে বিয়ে করতে চাইত না। মারিদের ইচ্ছা করছে রাগে জিদে নূরজাহানের মাথা ফাটিয়ে দিতে। মারিদ রাগে তিলমিলিয়ে বলে….
‘ যখন বুঝতে পারছেন তখন কেন থাকতে চাচ্ছেন? চলে যান। এমনিতেও আপনার সাথে আমার কোনো যোজন-বিয়োজন সম্পর্ক ছিল না। শুরু থেকেই আমি আপনার মিথ্যা ছলনার একটা অংশীদার ছিলাম মাত্র। আমি শুধু পরিস্থিতির দায়ে পড়ে আপনাকে বিয়েটা করেছিলাম, নয়তো আমার মনে আপনার ঠাঁই ছিল না কোনো কালেই। আপনি হচ্ছেন পরগাছার মতো—অপ্রয়োজনে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মানুষ। আমাকে ভালোবাসার মতো ভুল করবেন না। আমি আপনার উপর ইন্টারেস্টেড নই।
মারিদের কথা গুলো তীরের মতো নূরজাহানের বুক বিঁধে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে হয়তো। নূরজাহান হঠাৎ ক্লান্ত ভঙ্গিতে গা এলিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে। চোখের উপর হাত বেঁধে বলে…
‘ আপনি যান ব্যবসায়িক সাহেব। আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করব না। গুড নাইট।
মারিদ রাগে আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। নূরজাহান চোখের উপর হাত বেঁধে সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়েছে। মারিদ রাগে ফুসফুস করে ঘরে চলে যায়। মারিদ প্রস্থান করতে নূরজাহান বিরবির করে আওড়ায়…
‘ আপনাকে ভালোবাসার মতো ভয়ংকর দুঃসাহস আমি করেছি ব্যবসায়িক সাহেব। এতটুকু শাস্তি তো আমার প্রাপ্য।
সকালে খাবার টেবিলে সবাই বসেছে। ছোট-বড় সবাই খাচ্ছে। নূরজাহানকে সবার সাথে বসে খেয়ে নিতে বলেছে সবাই কিন্তু সে শাশুড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। রাদ ও রাতুলকে মুনিয়া খাইয়ে দিচ্ছে। ফাতেমা ও সালমা দাঁড়িয়ে সবাইকে খাওয়াচ্ছে। মাহবুব, মকবুল, সৈয়দ শাহ, তামিম, সুফিয়া, আফিয়া, সুখ সকলে খাবার টেবিলে গোল করে বসে খাচ্ছে। সকাল ৮:৩৫ মিনিট। সুখ বাদে বাকিদের স্কুল-কলেজ আছে। সুখের পরীক্ষা শেষ। সে অবসর সময়টায় কোচিং করবে। মারিদ অফিশিয়াল গেটআপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে বেখেয়ালি নূরজাহানের চোখ যায় মারিদের দিকে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মারিদের দিকে। মারিদকে অফিশিয়াল গেটআপে নূরজাহান এই প্রথম দেখেছে। অত্যন্ত সুদর্শন আর বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর পুরুষ নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেব। মারিদ হাসলে বাম গালে টোল পড়ে। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে মারিদের দুটো চোখ। ধূসর রঙের চোখে যখন মারিদ কারও দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তখন নূরজাহানের মন এলোমেলো হয়। কাল রাতেই নূরজাহান মারিদকে লক্ষ করে দেখেছে। এত সুন্দর ছেলে কীভাবে রং নাম্বারে নূরজাহানের সাথে কথা বলত আল্লাহ জানে! নাকি নূরজাহানের ভাগ্য ছিল বলে সে মারিদকে রং নাম্বারে পেয়েছিল? নূরজাহান শাশুড়ির পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মারিদকে দেখছে। সেই দৃষ্টিতে কত আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা, তৃষ্ণা মেশানো। নূরজাহানের কাতর দৃষ্টি মারিদের চোখেও পড়েছে। ব্যাপারটায় সে বুঝেও অজানা সেজেছে। মারিদ চেয়ার টেনে সুখের পাশে বসে। দু’হাতের শার্টের হাতা ভাঁজ করে কনুই পর্যন্ত গোটাচ্ছে। সালমা মারিদের সামনে খালি প্লেট রেখে নূরজাহানের হাতে খাবারের বাটি তুলে দিয়ে বলেন…
‘ যাও, মারিদকে খাবার দাও। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াও। দেখো ওর কী প্রয়োজন হয়।
মারিদ নিশ্চুপ। নূরজাহান বাটি হাতে মারিদের পাশে দাঁড়াতে নাকে কড়া পারফিউমের গন্ধ এসে ধাক্কা খায়। বাটি হাতে নূরজাহান মৃদু কাঁপছে মারিদের পাশে দাঁড়িয়ে। মারিদের খালি প্লেটে মাংস তুলে দিতে গিয়ে অসাবধানতায় অল্প ঝোল পড়তে মারিদ আস্তে করে নিজের প্লেট এগিয়ে দেয়। নূরজাহান মারিদের প্লেটে দ্বিতীয় চামচ মাংস তুলে দিতে চাইলে মারিদ হাতে ইশারা না করে নিজের প্লেট কাছে টেনে নেয়। সালমা বলেন…
‘ মারিদকে রুটি দাও। ও সকালে রুটি খায়।
‘ জি।
নূরজাহান তাড়াহুড়ো করে মারিদের চেয়ার ধরে সামনে ঝুঁকে রুটি নিতে যায়। নূরজাহানের শাড়ির আঁচল মারিদের কাঁধ পেরিয়ে গাল স্পর্শ করতে মারিদের নাকে বাজে নূরজাহানের শরীরে ঘ্রাণ। মারিদ এই প্রথম খুব কাছ থেকে নূরজাহানের ঘ্রাণ পাচ্ছে। খুব মিষ্টি আর মাতাল করা ঘ্রাণ। মারিদ নিজের অজান্তে পরপর দুবার নাক টানে। তৃতীয়বার টানতে গেলে নূরজাহান উঠে যায়। মারিদের প্লেটে রুটি তুলে দেয়। তাড়াহুড়োয় মারিদের শরীর থেকে শাড়ির আঁচল টেনে ছোট করে বলল…
‘ সরি।
নিশ্চুপ মারিদ গম্ভীর মুখে খাচ্ছে। মুনিয়া পাশ থেকে বলে…
‘ তুমি এখন কয়েকদিন ছুটি নাও মারিদ। নতুন বউ বাড়িতে এসেছে, তাকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করো। সারাজীবন তো কাজকাম করতেই পারবে। এখন বউকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে এসো আগে।
মারিদ হুম-হ্যাঁ তেমন কিছুই বলল না৷ সে মাথা নুইয়ে গম্ভীর মুখে খাচ্ছে। সুখ পাশ থেকে চঞ্চলতায় বলে…
‘ সমস্যা নেই কাকী। ভাই না ঘুরলেও আমি ঘুরব ভাবিকে নিয়ে। আমি রিফাত ভাইকে ফোন করে বললে রিফাত ভাই আমাদের নিয়ে যাবে ঘুরতে। আমরা সবাই মিলে ধানমণ্ডি লেকে যাব, কী বলো আফিয়া আপু?
রিফাতের নাম শুনতে মারিদ খাওয়া ছেড়ে বিরক্তিতে সুখের দিকে তাকাল। মকবুল পাশ থেকে সুখকে বাধা দিয়ে বলেন…
‘ না, আজ কারও কোথাও যাওয়া চলবে না। আজ সন্ধ্যায় আফিয়াকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ। বিয়েটা তিন মাস ধরে ঘুরছে। মেজো ভাই বলেছে সবাইকে আজ বাড়িতে থাকতে। মারিদ, তুই আজ একটু থাকিস তো সন্ধ্যায় বাপ।
‘ সন্ধ্যায় আমার মিটিং আছে কাকা। থাকতে পারব না।
আফিয়ার মা ফাতেমা পাশ থেকে বলেন…
‘ তুমি বড় ভাই মারিদ। তুমি না থাকলে হবে বলো? মানুষ কী বলবে?
মারিদ খেতে খেতে বলে….
‘ আমি চেষ্টা করব কাকী।
আফিয়ার বিয়ে নিয়ে খাওয়ার টেবিলে হইচই পড়েছে ছোটদের মাঝে। আফিয়া লজ্জায় নত মস্তকে খাচ্ছে। বড়রা পরামর্শ করছে কীভাবে কী আয়োজন করা যায়। মারিদ চুপচাপ খেয়ে উঠে যেতে নূরজাহানের মুখোমুখি হয়। নূরজাহান চট করে বলে…
‘ কবে ফিরবেন?
‘ যেদিন আপনি বিদায় হবেন সেদিন ফিরব।
নূরজাহানও সেইভাবে জবাব দিয়ে বলে…
‘ এটা আমার স্বামীঘর। আমি এখান থেকে ইহজীবনেও বিদায় হব না। আর না আপনার ইচ্ছা কখনো পূরণ হবে।
মারিদ কপাল কুঁচকে নূরজাহানকে দেখে টেবিলের উপর থেকে নিজের ফোন নিয়ে নূরজাহানকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায়। নূরজাহান মারিদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ব্যবসায়িক সাহেবের মনোমালিন্য কীভাবে দূর করবে আল্লাহ জানে!
সালমা হীরা চৌধুরীকে কল করে দাওয়াত করছেন হীরাকে সন্ধ্যায় সৈয়দ বাড়িতে থাকতে। আজ আফিয়াকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। মারিদ বলেছে সে ব্যস্ততায় সন্ধ্যায় উপস্থিত না ও থাকতে পারে। আফিয়ার বাবা রবিউলও ঢাকায় নেই, কবে ঢাকায় আসে তারও ঠিক নেই। রাদিলকে নিয়ে হীরাকে সন্ধ্যার আগে সৈয়দ বাড়িতে থাকতে বলেছেন সালমা। হীরা আজ কোর্টে যায়নি, কোর্ট থেকে চারদিনের ছুটি নিয়েছিল উনি। এর মাঝে তিনদিন মারিদের শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়ে এসেছে, আজ চতুর্থ দিন। কাল থেকে কোর্টে যাবে। রাদিল সকাল দশটা থেকে দুটো পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করে। সপ্তাহে শুক্র, শনি ও মঙ্গলবার এই তিনদিন চেম্বারে বসে রোগী দেখে। বাকি দিনগুলো নিজেদের হসপিটালে নাইট ডিউটি করে। আজ সোমবার, রাদিল চেম্বারে বসবে না। হয়তো রাতের দিকে হসপিটালের নাইট ডিউটিতে চলে যাবে। এই মুহূর্তে সে বাসায় আছে নিজের ঘরে শুয়ে। হীরা বসার ঘরে সোফায় বসে রাদিলের জন্য আনার ছুলে রাখছেন। রাদিল আনারদানা খুব পছন্দ করে। সময় ৩:১০ মিনিট। সালমা বলেন…
‘ সুখ ও সুফিয়া আপনাদের বাড়িতে গেছে আপা। নূরজাহানের কিছু ব্লাউজ টেইলরকে দেবে, সাথে আফিয়ার জন্য নাকি কী কিনবে। আপনি ওদের সাথে কিন্তু চলে আসবেন আপা। রাদিলকেও নিয়ে আসবেন।
‘ আচ্ছা নিয়ে আসব।
সালমা ফোন কেটে দেন। রাদিল দুপুরে খেয়ে শুয়েছে। হীরাকে বলেছে আনার ছুলে দিতে। হীরা আনার ছুলে সোফার টেবিলের উপর রেখে রান্নাঘরে যান। এতদিন মারিদ ও রিফাত বিয়ে করেনি বলে রাদিলকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া যায়নি। এবার তো মারিদ রিফাত দুজন একত্রেই বিয়ে করে নিয়েছে, এবার তোড়জোড় করে রাদিলকেও বিয়ে করিয়ে দেবেন তিনি। একা বাড়িতে থাকতে আর ভালো লাগে না। ছেলের বউ আসলে উনার ঘরটা একটু ভরবে। রাদিলের বিয়ের জন্য বেশ কয়েক জায়গায় রাদিলের বায়োডাটা জমা দিয়েছেন। দুই-তিন জায়গা থেকে কল এসেছে মেয়ে দেখতে যেতে। হীরা ভাবছেন সামনের শুক্রবার মারিদের মাকে নিয়ে একটা পাত্রী দেখতে যাবেন। মেয়েটিকে বেশ পছন্দ হয়েছে উনার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রাদিলকে পাঠাবেন মেয়েটিকে দেখতে। হীরা চৌধুরী বসার ঘর থেকে রান্নাঘরে যান। এর মাঝে বেশ কয়েকবার কলিংবেলের শব্দে রাদিল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। চোখে মুখে হাল্কা ঘুম জড়ানো। বসার ঘরে মাকে না দেখে রাদিল দরজা খুলে দিতেই সুফিয়া ও সুখকে দেখতে পায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। রাদিল অবাক হয়ে বলে….
‘ তোরা?
সুফিয়া উত্তর দিয়ে বলে…
‘ আম্মু পাঠিয়েছে ফুফুর কাছে। ফুফু কই রাদিল ভাই?
‘ ঘরে আছে। আয়।
রাদিল পাশে সরে দাঁড়ায়। দৃষ্টি সুখের মুখের উপর ঘুরছে। সুখ একবার রাদিলের দিকে তাকাতে গিয়ে দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায় সেজন্য সুখ আর সাহস করে তাকায়নি। সুখ সুফিয়ার পেছন পেছন বসার ঘরে ঢোকে। বসার ঘরে হাত-পা মেলে সোফায় বসে সুফিয়াকে আদেশ করে বলে….
‘ সুফিয়া আপু, এসিটা বাড়িয়ে দাও তো। বড্ড গরম লাগছে, ঘেমে যাচ্ছি আমি।
সুফিয়া সুখের পাশে বসতে বসতে বিরক্তিতে বলে…
‘ এইটুকু রাস্তা আসতে আসতে তোর গরম লেগে গেল? শান্তি মতো একটু বস, দেখবি ঠান্ডা লাগছে। আচ্ছা তুই থাক আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি কেমন?
সুখ সম্মতি দেয়। সুফিয়া উঠে গেস্ট রুমের ওয়াশরুম যায়। রাদিল সুখের গরম লাগছে কথাটা শুনেছে। সে দরজা লাগিয়ে সোফার উপর থেকে রিমোট নিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দেয়। সুখ টেবিলের উপর আনারের দানা খোলা পেয়ে খুশিতে সেগুলো হাতে নিয়ে খেতে খেতে বলল…
‘ উফ, আমার পছন্দের ফল। ফুফু সবচেয়ে বেস্ট
‘ তুই আর রাদিল দুজনেরই আনারের দানা খুব পছন্দ। তোদের দুজনের পছন্দ অপছন্দ অনেক মিলে যায়। সবকিছুতেই এক রকম পছন্দ করিস তোরা।
রাদিল পানি পান করার নাম করে ডাইনিংয়ে দাঁড়িয়েছে। সুখ কখনো আসলে রাদিল আশেপাশে থাকে না, অথচ আজ থাকছে। সে কেন সুখের চোখের সামনে থাকতে চাচ্ছে সে জানে না। রাদিলের মন চাচ্ছে সে সুখের চোখের সামনে থাকুক। হীরা সুখের পাশে বসে ফের বলেন….
‘ বাড়িতে এতবছর কেউ বিয়ে করতে চায়নি, আর এখন এক মাসেই তিন বিয়ের আয়োজন হচ্ছে।
সুখ হীরা চৌধুরীকে উস্কে বলে….
‘ তাহলে রাদিল ভাইকেও বিয়ে করিয়ে দাও ফুফু। মারিদ ভাই, রিফাত ভাইয়ের তো বিয়ে হয়েই গেছে। এই মাসে পারলে রাদিল ভাইকেও বিয়ে করিয়ে দাও। তাহলে আমরা সবাই একই মাসে চারটা বিয়ে উপভোগ করতে পারব। সাথে সবার অ্যানিভার্সারিও একই মান্থে হবে, সুন্দর না ব্যাপারটা?
হীরা হেসে বলেন…
‘ সামনে শুক্রবার যাব রাদিলের জন্য বউ দেখতে। তুই যাবি আমার সাথে?
সুখ উৎফুল্লতা দেখিয়ে বলল…
‘ রাদিল ভাইয়ের তো পছন্দ আছে ফুফু, তুমি জানো না?
মুখের পানি রাদিলের তালুতে চটে যায়। হীরা চৌধুরী অবাক চোখে রাদিলকে একপলক দেখে সুখকে প্রশ্ন করে বলে…
‘ কই না তো। আমাকে তো রাদিল কখনো বলেনি। মেয়েটা কে সুখ? বাড়ি কোথায়? এই ব্যাপারে তুই জানিস কীভাবে? তোকে কে বলেছে এসব?
‘ রাদিল ভাই বলেছে এসব।
হতবাক বাকরুদ্ধ হীরা চৌধুরী ডাইনিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাদিলের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস গলায় বললেন…
‘ সত্যি তোর পছন্দ আছে রাদিল? মেয়েটি কে? আমাকে বলিসনি কেন এতদিন?
হতবাক বাকরুদ্ধ রাদিল নিজেও। সেদিন সে এমনিই সুখকে বলেছিল ওর পাঁচ বছরের একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। সুখ সেটা সত্যি মনে করে রাদিলের মাকে এসে এসব বলবে রাদিল স্বপ্নেও ভাবেনি। হতবাক বাকরুদ্ধ রাদিল সুখকে ধমকে হীরাকে বলল…
‘ সুখ ছোট মানুষ। ওর কথা তুমি বিশ্বাস করছ আম্মু? আমার পছন্দ থাকলে ওকে বলতে যাব আমি? আমার বলার হলে মারিদ, রিফাত কিংবা সরাসরি তোমাকেই বলতাম। তুমি চেনো না আমাকে? কেমন ছেলে আমি?
রাদিলের কথা হীরার যুক্তিসঙ্গত মনে হলো। আসলেই রাদিলের কাউকে পছন্দ হলে সে কখনোই সুখকে বলতে যাবে না। মারিদ বা রিফাতকে বলতে পারে, তারপরও সুখকে বলবে না। বরং সরাসরি এসে হীরা চৌধুরীকে জানাত ব্যাপারটা। হীরা চৌধুরী যখন রাদিলকে বিশ্বাস করতে যাবেন, তক্ষুনি সুখ প্রমাণ দিয়ে বলে….
‘ ফুফু, আমি মিথ্যা বলছি না। দাঁড়াও আমার কাছে প্রমাণ আছে। রাদিল ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ডের ছবি আমার মোবাইলে আছে, তোমাকে আমি এক্ষুনি দেখাচ্ছি।
এখন ব্যাপারটা জটিল হয়ে গেল। হীরা চৌধুরী রাদিলকে বিশ্বাস করতে গিয়েও অবিশ্বাস করে ফেললেন। সুখ নিজের মোবাইলের গ্যালারি ঘেঁটে নিজের একখানা সুন্দর শাড়ি পরা ছবি বের করে হীরা চৌধুরীর হাতে ফোন দিয়ে দেখিয়ে বলল…
‘ এটা রাদিল ভাইয়ের পছন্দের মেয়ে ফুফি। উনি এই মেয়েকে না পেলে জীবনেও বিয়ে করবেন না বলেছেন। দরকার হলে তোমাকে নিয়ে নাকি লন্ডনে চলে যাবেন, তারপরও বিয়ে করবেন না।
হতবাক বাকরুদ্ধ হীরা চৌধুরী ফোনের স্ক্রিনে সুখের ছবি দেখে হতবাক, বিস্মিত হয়ে থমকে বসে রইলেন কয়েক পলক। বাকরুদ্ধ হীরা চৌধুরী একবার ফোনে ছবিটি দেখছেন তো অন্যবার রাদিল ও সুখকে দেখছেন। মূলত উনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। কথা বলার মতো ভাষা নেই। রাদিল কপাল কুঁচকে সুখকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে এগিয়ে আসে। হীরা চৌধুরীকে কার ছবি সুখ দেখাচ্ছে সেটাই দেখতে চায় সে। অথচ রাদিলকে এগিয়ে আসতে দেখে সুখ তৎক্ষণাৎ নিজের ফোনটি নিয়ে নেয়। রাদিল শত বলার পরও ফোন দেখায় না। হীরা চৌধুরী হতবাক বিস্মিত দৃষ্টিতে রাদিলের দিকে তাকিয়ে বলেন….
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৮
‘ এজন্য তুই কাল থেকে আমাকে বলছিলি বাংলাদেশে থাকবি না? লন্ডনে চলে যাবি? এই তোর মনে? তোর পছন্দ থাকলে কি আমি মানা করতাম বাপ? তোর পছন্দের মেয়েকেই তো বিয়ে করাতাম আমি।
রাদিল রেগেমেগে সুখের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে….
‘ আম্মু, তুমি ওর কথা বিশ্বাস করো না। ও কার না কার ছবি তোমাকে দেখিয়েছে। আমি ছবির মেয়েকে পছন্দ করি না। বিয়েও করব না। ওর কথায় তুমি বিশ্বাস করো না।
সুখ মুখ বেঁকে বলে….
‘ বিয়ে না করলে নাই। আমিতো তোমার উপকারই করতে চেয়েছিলাম। তোমার কপালে একটা সুন্দর বউ জুটতো।
‘ শাটআপ ইডিয়ট!
