ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪০
রিক্তা ইসলাম মায়া
সুফিয়া সুখকে নিয়ে হীরা চৌধুরীর টেইলার্সের দোকানে এসেছে। সঙ্গে রাদিলকেও নিয়ে এসেছে। রাদিল দোকানের একটা চেয়ারে বসে মাথা নুইয়ে ফোন স্ক্রোল করছে। দু’হাত দু’উরুতে ঠেকানো। হীরা চৌধুরী নূরজাহানের ব্লাউজের মাপগুলো টেইলারকে বোঝাচ্ছেন। সুখ ও সুফিয়া দুজনই পাশে দাঁড়িয়ে। পরিচিত দোকান হওয়ায় দোকানদার বেশ আপ্যায়ন করছে, সবাইকে কোকা-কোলা ড্রিংক দেয়। সুখ খেতে খেতে হীরা চৌধুরীর পাশে দাঁড়ায়। রিফাত ও মারিদ দুজনের বিয়েতে অনেক কেনাকাটা করা হয়েছে সুখের। যেসব জামা গুলো আনস্টিচের জামা বানানো হয়নি তখন সেগুলো এখন নিয়ে এসেছে। বাড়িতে আবারও আফিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান হবে, তখন এই জামাগুলো পরবে সুখ। সেই ভেবেই সুখ বেশ কিছু জামা নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে। সবসময় জামার মাপে জামা দিয়ে যায় টেইলার্সকে, এবার সে ভুলে গেছে পুরাতন জামা আনতে। সুফিয়ার ক্ষেত্রেও সেম, নিজের জামার সাথে আরেকটা জামা আনতে ভুলে গেছে সেজন্য টেইলার্সকে নতুন করে নিজের মাপ দেয়। মুশফিক সুফিয়ার মাপ খাতায় লিখে, সুখকে ডাক দেয় সামনে আসতে। মুশফিকের ডাকে রাদিল ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকায়। মুশফিক ছেলেটির বয়স চব্বিশ পঁচিশ বছরের হবে। দেখতে হাল্কা পাতলা গঠনের। সুখ মুশফিকের সামনে এগোতে রাদিল ঠাস করে উঠে যায়। সুখের হাত টেনে মুশফিকের থেকে সরিয়ে বলে…
‘ ননসেন্সের মতো কাজ করছিস কেন?
সুখ বুঝতে পারে না সে কি করেছে। পাল্টা প্রশ্নে সুখ বলে…
‘ কি করেছি আমি? হাত টানছেন কেন?
হীরা চৌধুরী কপাল কুঁচকায়। রাদিল সুখকে বাঁধা দিচ্ছে কেন প্রথমে বুঝতে পারে না। পাশ থেকে সুফিয়া ঝটপট বলে….
‘ কি হয়েছে রাদিল ভাই? সুখ কি করেছে? ওহ শুধু জামার মাপ দিচ্ছে। তুমি বাঁধা দিচ্ছো কেন?
রাদিল বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে রেখেছে। সব কয়েকটা স্টুপিডের দল। ছেলে মানুষ গায়ে হাত দিয়ে জামার মাপ নিবে সেটা বলছে কিছু হয়নি। পাশ থেকে মুশফিক ছেলেটি বলে….
‘ রাদিল ভাই, সুখ আপা জামার মাপ না দিলে তো আমরা জামা বানাতে পারব না।
রাদিল বেশ চেতে গিয়ে বলে…
‘না পারলে নাই। আপনাদের যা বানাতে মন চায় তাই বানিয়ে দিয়েন।
রাদিলের কথার বিরোধ করে সুখ তৎক্ষনাৎ বলে…
‘এই না মুশফিক ভাইয়া। আপনি উনার কথা শুনবেন না। আমি আপনাকে মাপ দিব জামার।
রাদিল চোয়াল শক্ত করে সুখের হাতটা শক্ত মুঠোয় চেপে সুখকে শাসিয়ে বলে…
‘তোরে থাপড়িয়ে গাল ফাটিয়ে দেব বেয়াদব। বলছি না জামার মাপ দেওয়া লাগবে না। কথা শুনিস না কেন?
‘ আরে ভাই কি হয়েছে আপনার? আমার
জামার মাপ না দিলে সব গুলো জামা নষ্ট হয়ে যাবে। আপনার কথা শুনে এখন কাপড় নষ্ট করব আমি? যান তো ভাই আপনি, শুনব না আপনার কথা। যান।
রাদিল ভয়ংকর রেগে যায়। তার একটাই সমস্যা—সহজে সে কারো সাথে রাগে না, ছাড় দেয়; কিন্তু একবার রেগে গেলে তখন আর মাথা ঠিক থাকে না। রাদিল যে বলছে সুখ জামার মাপ দেবে না মানে দেবে না, কথা এখানেই শেষ। সুখের জিদে রাদিল রেগে যাচ্ছে। এই মুহুর্তে রাদিল ইহজীবনেও দেবে না কেউ সুখের গায়ে হাত দিয়ে ওর জামার মাপ নিক। দরকার পড়লে সে এই জামাকাপড় ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে, তাও সে দেবে না। হীরা চৌধুরী, সুফিয়া ও দোকানদার সবাই বোকার মতো তাকিয়ে। রাদিল সামান্য বিষয়ে কেন বাড়াবাড়ি করছে, বুঝতে পারছে না। সুখ জামার মাপ না দিলে টেইলার জামা বানাবে কীভাবে? এত দামি জামা কি আর মাপ ছাড়া বানানো যায়? রাদিল একহাতে সুখের হাত চেপে ধরা অবস্থায় টেবিলের উপর থাকা জামাকাপড়ের ব্যাগ ছিটকে ফেলে ফ্লোরে। মেজাজ খিঁচিয়ে বলে…
‘এসব বাল-ছাল কিছুই বানানো লাগবে না তোর। কথা বললে কথা শুনিস না। বেয়াদব হয়েছিস একটা। অসভ্য মেয়ে।
এতক্ষণ বাদে হীরা চৌধুরী অবশেষে কথা বলেন…
‘রাদিল থাম। কী হয়েছে তোর? সুখ জামার মাপ না দিলে টেইলার বানাবে কীভাবে?
‘ এত সমস্যা হলে ওহ, বাসা থেকে এক্সট্রা জামা আনল না কেন তাহলে?
‘ভুলে গেছে বেচারি।
সুখ তব্দা খেয়ে রাদিলের রাগান্বিত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। সুখ সবসময় ভাবত রিফাত, মারিদ ও রাদিলের মধ্যে ভালো ভদ্র ছেলেটা হচ্ছে রাদিল। সে ভদ্রলোক। হীরা চৌধুরীর শান্ত-শিষ্ট ভালো ছেলে, যে জীবনে রাগ করতে পারে না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সুখের ধারণা ভুল। শুধু ভুল নয়, বাড়াবাড়ি রকমের ভুল ধারণা করে এসেছে এতকাল রাদিলকে নিয়ে। রাদিল মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে তৎক্ষণাৎ দোকানদারের গলা থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কাপড়ের ফিতাটা টেনে হীরা চৌধুরীর হাতে দিয়ে বলে…
‘একটা ননসেন্সের জন্য আমার সময় নষ্ট করার কোনো মানে ছিল না আম্মু। সুখ না হয় স্টুপিড, কিন্তু তোমার কাছে তো আমি ম্যাচিউরিটি আশা করেছিলাম।
সুখকে ধাক্কা দিয়ে হীরা চৌধুরীর কাছে দেয়। সুখ হীরা চৌধুরীর গায়ে পড়তে হীরা দু’হাতে সুখকে ধরেন। হাতের ফিতাটা রাদিলের চলে যাওয়ার দিকে বাড়িয়ে হীরা চৌধুরী বল…
‘আরে, এই ফিতা দিয়ে আমি কী করব বলে যা রাদিল।
‘ওর গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলো।
হতবাক ও বিস্মিত হয়ে সুখ, সুফিয়া ও দোকানদার সকলেই রাদিলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। অকারণে রাদিল কেন সুখের উপর রেগে গেল, বুঝল না। তবে সুখ বেশ অপমানিত বোধ করে। কাল রাতে মারিদ বলেছিল রাদিল ভালো ছেলে, তার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। রাদিল হীরা চৌধুরীকে নিয়ে লন্ডন চলে যেতে চাচ্ছে—সেটাও সে মারিদের কাছে শুনে আজ রাদিলদের বাসায় এসেছিল। হীরা চৌধুরীকে নিজের ছবিটা দেখানোর পিছনের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যেন হীরা চৌধুরী সুখের পছন্দের ব্যাপারটা বোঝেন এবং রাদিলের জন্য অন্য কোথাও মেয়ে না দেখেন। কিন্তু রাদিলের আচরণে সুখ এবার কষ্ট পাচ্ছে। অকারণে এতগুলো মানুষের সামনে রাদিল অপমান না করলেও পারত। সুখের সহজে অপমান গায়ে সয় না। সে খুব অভিমানী মেয়ে।
সুখ চুপ করে যেতেই হীরা চৌধুরী হাতের ফিতাটা একপলক তীক্ষ্ণ চোখে দেখে দৃষ্টি ঘোরান সুখের অপমানে থমথমে মুখটার দিকে। রাদিল কেন উনার হাতে ফিতা তুলে দিয়েছে, বিষয়টা তিনি বুঝেছেন। রাদিল চায় না কোনো ছেলে সুখের গায়ের ফিতা ধরে মাপ নিক।
হয়তো রাদিল সুখের প্রতি পজেসিভনেস থেকেই এমন করেছে। কিছুক্ষণ আগে যখন সুখ নিজের ছবি হীরাকে দেখিয়েছিল পাত্রী হিসেবে, তখন ব্যাপারটা হীরার কাছে সুখের ছেলেমানুষি মনে হয়েছিল। সুখ রাদিলের গার্লফ্রেন্ড এটাও বিশ্বাস করেননি, কারণ তখন রাদিল স্বীকারোক্তি দিচ্ছিল রাদিলের কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই বলে। যদি সুখ রাদিলের গার্লফ্রেন্ড হতো, তাহলে রাদিল কখনোই সুখকে সামনে রেখে অস্বীকার করত না হীরা চৌধুরীর কাছে; বরং সহজে বিষয়টা স্বীকার করত সুখ ওর গার্লফ্রেন্ড হয় বলে। রাদিল অনেক স্পষ্টবাদী মানুষ, সে কখনো কারও সাথে বেইমানি করার মতো মানুষ নয়। আপনজনদের প্রতি তো সে খুবই যত্নশীল। রাদিল হীরার ছেলে বলে নয়, রাদিল আসলেই জেন্টলম্যান।
হীরা চৌধুরী সুখ ও রাদিলের মাঝে কখনো এমন কোনো আচার-আচরণ দেখেনি যার থেকে তিনি সন্দেহ কিংবা মনে করবেন ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে। সুখ চঞ্চল, ছোট মানুষ, বয়স কম। হয়তো রাদিলকে একতরফা পছন্দ করে আবেগের বয়সে সে হীরাকে পাত্রী হিসেবে নিজের ছবি দেখিয়েছে। হীরা মূলত তখন এসব চিন্তা করে চুপ করে ছিলেন। বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা কথা বলেননি। রাদিল যখন বিষয়টা অস্বীকার করছে, তখন তিনি রাদিল আর সুখের বিষয়টা বিশেষ বিবেচনায় রাখেন। কে সত্য কে মিথ্যা বলছে যাচাই করতে চান। হীরা ভেবেছিল সুখ ও রাদিলকে কয়েকদিন নজরে রাখবে, দুজনের মাঝে আসলেই কোনো সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইবে। কারণ তিনি কোনো কিছু শিওর না হয়ে পরিবারের কাছে প্রস্তাব রাখাটা ঠিক হবে না। সুখ ছোট, কিন্তু রাদিলের বিয়ের বয়স হয়েছে, রাদিলকে বিয়ে করানো জরুরি। আবার সুখের পরিবারে প্রস্তাব দেওয়ার পর যদি সুখ বলে সে ছেলেমানুষি করে মজার ছলে হীরাকে রাদিলের পাত্রী হিসেবে নিজের ছবি দেখিয়েছে, তখন বিষয়টা লজ্জাজনক হবে। মূলত সবকিছু চিন্তা করেই তিনি সুখ আর রাদিলকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করবেন বলে বিশেষ বিবেচনা করেন।
কিন্তু ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই তিনি রাদিলের মাঝে সুখের জন্য পজেসিভনেস দেখেছেন। এখানে সুফিয়াও ছিল, টেইলার সুফিয়ার মাপ নিয়েছে—কই, তখন তো রাদিল রিঅ্যাক্ট করেনি! সুখের বেলা আসতেই সে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। এর মানে তখন সুখ মিথ্যা বলেনি। রাদিল আসলেই সুখকে পছন্দ করে? যদি পছন্দ করে তাহলে অস্বীকার করছে কেন? হীরা চৌধুরী তীক্ষ্ণ চোখে সুখকে দেখে নিজের সামনে দাঁড় করান। তিনি সুখের জামার মাপ নিয়ে টেইলারকে দেন। টেইলার খাতায় লিখছে সব। দোকানের একজন কর্মচারী রাদিলের ফেলে দেওয়া সুখের জামাকাপড়গুলো ফ্লোর থেকে তুলে টেবিলের উপর রাখে। হীরা চৌধুরী সুখ আর সুফিয়াকে বলেন…
‘যা তোরা গাড়িতে গিয়ে বোস। আমি আসছি।
সুখকে নিয়ে সুফিয়া চলে যায়। হীরা টেইলারকে সবকিছুর মাপ বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসবেন, তখনই টেইলার মুশফিক পিছন ডেকে বলে…
‘রাদিল ভাই মনে হয় সুখ আপারে পছন্দ করে আন্টি।
মুশফিক হীরাদের পরিচিত টেইলার্স। সৈয়দ বাড়ির ছোট-বড় সবার জামাকাপড় সে-ই বানায়। পূর্বপরিচিত হওয়ায় সে সহজে হীরাকে এই কথাটা বলে ফেলল। এই একই বিষয়টা হীরার মাথাতেও চলছিল। মুশফিকের কথায় যেন মিলে গেল। হীরা বেশ চতুর মানুষ। তিনি পুনরায় শিওর হওয়ার জন্য মুশফিককে প্রশ্ন করেন…
‘তোমার এটা কেন মনে হলো?
উত্তরটা যেন মুশফিক মুখেই নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দেওয়ার জন্য। হীরা প্রশ্ন করার সেকেন্ডের মাথায় মুশফিক হেসে ঝটপট উত্তরে বলে…
‘রাদিল ভাইরে দেখলেই বোঝা যায় আন্টি। দেখলেন না তহন আমি সুখ আপার জামার মাপ নিতে চাইছি দেইখা কেমন চেইতা গেল!
‘এটাতো সামান্য বিষয়। এখানে অন্য রকম কিছু দেখলাম না।
হীরা মুশফিকের সঙ্গে রাদিলের বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মুশফিক পুনরায় হীরাকে বিশ্বাস দেওয়াতে বলে…
‘সামান্য বিষয় না আন্টি। আপনেরা এহানে আসার পর থেইক্কা কম করে হলেও রাদিল ভাই বিশবার সুখ আপার দিকে তাকাইছে। আমি নিজে দেখছি এইডা।
‘আচ্ছা।
হীরা বিষয়টা এড়াতে চেয়ে গম্ভীর মুখে মুশফিককে ছোট করে উত্তর দিয়ে বেরিয়ে আসেন। রাদিল ড্রাইভিং সিটে বসেছে, সুফিয়া ও সুখ পিছনে বসেছে। হীরা রাদিলের পাশের সিটে বসতেই রাদিল গাড়ি টানে। গাড়ি চলছে। হঠাৎ হীরার ফোনে কল আসায় তিনি ব্যাগ থেকে ফোনটা নিয়ে রিসিভ করে লাউডস্পিকারে রাখেন ইচ্ছাকৃতভাবে। হীরা চৌধুরী ব্যাগে কিছু খুঁজছেন, সেজন্য তিনি ফোনটা কানে নিয়ে কথা বলতে পারছেন না বলে ফোনটা লাউডস্পিকারে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর রেখেছেন—তিনি এমনটাই বুঝিয়েছেন সুখ, রাদিল ও সুফিয়াকে। আসলে বিষয়টা ভিন্ন। হীরা চৌধুরী চান সুখ ও রাদিল দুজনেই উনার কথোপকথন গুলো শুনুক। হীরা ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ হতে গমগমে আওয়াজে একজন পুরুষ সালাম দেয়।
‘আসসালামু আলাইকুম আপা। আমি রশিদ ঘটক বলছিলাম।
‘ওয়ালাইকুম সালাম। জি বলুন, শুনছি আমি।
‘আপা, আপনের পোলার ছবি ও বায়োডাটা মাইয়ার পরিবাররে পাঠিয়েছিলাম। হেরা আপনের পোলারে দেইখা মেলা পছন্দ করছে। আপনেরা আগামী শুক্রবার আইবেন কিনা জানবার চাইতাছে। তাগোরে কি কমু আপা?
হীরা চৌধুরীর মনোযোগ যেন ব্যাগের কাগজপত্র হাতড়ানোর দিকে। রশিদ ঘটকের কথায় যেন তিনি তেমন মনোযোগী নন। অথচ পাশ থেকে সুখ, রাদিল ও সুফিয়া তিনজনই হীরা চৌধুরী ও রশিদ ঘটকের কথা শুনছে। হীরা জবাবে বলে…
‘জি আসব বলে দেন। পাত্রীকে আমারও পছন্দ হয়েছে।
‘তাইলে আলহামদুলিল্লাহ আপা। এহন একবার সামনাসামনি পোলা-মাইয়া বইয়া হেগোর নিজেদের পছন্দ হইলে কথা ফাইনাল করমু। আপা আপনের পোলা আইব না লগে?
‘জি আসবে। আমরা সপরিবারে মেয়ে দেখতে আসব।
‘অইল আপা। তাইলে আমি হেগোরে জানাই দেই আপনেগোর কথা। আপনেগো যদি কোনো চাওয়া-পাওয়া থাহে তাইলে আমারে জানাইয়েন আপা।
হীরা চৌধুরী আড়চোখে একবার রাদিলের দিকে তাকান। রাদিল গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। তিনি ভেবেছিলেন ঘটককে বলবেন উনাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। কিন্তু হীরা রাদিলকে বাজিয়ে দেখতে চান রাদিল আসলে সুখকে পছন্দ করে কিনা। স্বাভাবিক ভাবেই রাদিল যদি সুখকে পছন্দ করে তাহলে এই বিয়েতে অমত করবে। হীরা চৌধুরী মত দিয়ে বলে…
‘ঠিক আছে। আমি আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি।
কল কেটে যায়। হীরা চৌধুরী ব্যাগ থেকে অপ্রয়োজনীয় একটা কাগজ বের করে সেটা দেখার ভান করে রাদিলকে বলেন…
‘ তোর কোনো চাওয়া-পাওয়া আছে রাদিল?
হীরা চৌধুরীর কথা শেষ করার আগেই রাদিল সম্মতি দিয়ে বলে…
‘আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই আম্মু। তুমি ওদেরকে বলো আমি শুধু মেয়ে বিয়ে করে আনব।
হীরা চৌধুরীর দৃষ্টি ঘুরে গেল রাদিলের দিকে। উনার মুখখানা গম্ভীর, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। রাদিল যদি সুখকে নিয়ে পজেসিভ হয়, তাহলে এই মুহূর্তে রাদিলের এই বিয়ের প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। রাদিল বিয়ে করবে না—এটা অস্বীকার করলে তখন তিনি বুঝতেন রাদিলের মনে সুখকে নিয়ে কিছু একটা আছে। কিন্তু রাদিল হীরা চৌধুরীকে ভুল প্রমাণ করে সরাসরি বিয়েতে সম্মতি দিয়ে দিল। হীরা চৌধুরী কি তাহলে রাদিলের মনের অবস্থা বুঝতে ব্যর্থ? নাকি শুধু সুখই রাদিলকে পছন্দ করে? হীরা চৌধুরী রাদিলকে ছোট করে সম্মতি দিয়ে বললেন…
‘আচ্ছা, ওদের বলে দেব।
হীরা চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই পিছন থেকে শোনা গেল সুখের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। সুখ উচ্ছ্বাস দেখিয়ে বলল…
‘তাহলে আমরা একটা না, আরও দুটো বিয়ে খাব ফুফি, তাই না? আফিয়া আপুর আগে রাদিল ভাইয়ের বিয়ে। বাপরে কী রাশি আমার! পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই চারটা বিয়ে পেয়ে গেলাম। ফুফি, তুমি কিন্তু আমাকে শুক্রবারে রাদিল ভাইয়ের বউ দেখতে নিয়ে যাবে। আমি কিন্তু যাব তোমাদের সাথে, কেমন?
হীরা চৌধুরী এবার দ্বিধায় পড়ে ফেঁসে গেলেন। কিছুক্ষণ আগে মনে হয়েছিল সুখ একতরফা রাদিলকে পছন্দ করে। তারপর মনে হলো না, রাদিলও সুখকে পছন্দ করে। আর এখন মনে হচ্ছে না, কেউ কাউকে পছন্দ করে না—হীরা চৌধুরীই ভুল ভাবছেন ওদেরকে। এরা আসলে কী চাচ্ছে? নাকি উনাকে শুধু শুধু পাগল বানাচ্ছে ওরা? একে অপরকে পছন্দ করলে তো এতক্ষণে রিঅ্যাক্ট করার কথা, অথচ দুজন এমনভাবে সম্মতি দিচ্ছে যেন দুজনের কারও কিছু যায় আসে না এই বিয়েতে। সত্যি যদি তাই হয়, তাহলে তখন সুখ হীরা চৌধুরীকে নিজের ছবি দেখাল কেন? সুখ কি উনার সাথে মজা করল ব্যাপারটা নিয়ে? কনফিউজড হীরা চৌধুরী মাথা নাড়িয়ে সুখকেও বিষণ্ণ মনে সম্মতি দিয়ে বলেন…
‘আচ্ছা, নিয়ে যাব।
সন্ধ্যায় আফিয়াকে দেখতে আসা ছেলেপক্ষের সামনে নূরজাহানকে যেতে নিষেধ করেছে মারিদ। ফোন করে সালমাকে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাড়িতে লোকজন আসলে যেন নূরজাহান ঘরে থাকে। নূরজাহান নতুন বউ, মাত্র কাল এসেছে; আজ আফিয়াকে দেখতে আসা লোকজনের সামনে যাওয়াটা ভালো দেখাবে না বলে তিনিও নূরজাহানকে ঘরে থাকতে বলেন। বিকেল করে আফিয়াকে দেখতে লোকজন আসবে। মুনিয়া, সুফিয়া দুজন মিলে আফিয়াকে শাড়ি পরাচ্ছে। সুখ ও নূরজাহান বিছানায় বসে দেখছে। নূরজাহান শাড়ি পরতে পারে না। সে মারিদের সঙ্গে বিয়ের পর দুই একদিন ধরে রেগুলার শাড়ি পরছে, এর আগে একবার রাসেলের সঙ্গে বিয়েতে পরেছিল, তারপর আর কখনোই পরা হয়নি। মারিদ আসবে না বলেও পাত্রপক্ষের আগে সে বাড়িতে উপস্থিত হয়। বাড়িতে তখন সবাই উপস্থিত, আফিয়ার বাবা রবিউল শাহ বাদে। মারিদ বাড়িতে এসে রাদিলকে পেল মাহবুব ও মকবুলের সঙ্গে বসার ঘরে পাত্রপক্ষের জন্য অপেক্ষা করতে।
মারিদকে দেখেই মকবুল ডাকে তাদের সাথে বসতে। মারিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে আশেপাশে নূরজাহানকে খোঁজে। কেউ তার কথা অমান্য করে নূরজাহানকে নিচে ডেকেছে কিনা দেখে। মূলত মারিদ কাজ ফেলে এসেছে নূরজাহানকে যেন কেউ পাত্রপক্ষের সামনে না নিয়ে যায় এটা নিশ্চিত করতে। মারিদ এখনো পর্যন্ত তার অপরিচিতাকে মন ভরে দেখার সুযোগ পাইনি মান অভিমানের জন্য, সেখানে অন্য কেউ তার অপরিচিতাকে দেখুক— সেটা তার মোটেও পছন্দ না। মকবুল ডাকছে দেখে মারিদ বলে সে ফ্রেশ হয়ে আসছে। মকবুল বাধা দেয় না।
মারিদ ঘরে গিয়ে নূরজাহানকে না পেয়ে সে বারান্দায় খোঁজে, সেখানেও নেই। ওয়াশরুমের দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ দেখে সে বিরক্ত হয়। এই মেয়ে সবসময় মারিদের সাথে লুকোচুরি খেলে। প্রথমে ফোনে, তারপর হারিয়ে গিয়ে, অবশেষে তার বউ হয়েও গায়েব হয়ে থাকে। মারিদ মানা করেছে বাহিরে মানুষের সামনে যেতে, তাহলে এই মুহূর্তে অপরিচিতা ঘরে নেই কেন? কোথায় যাবে? মারিদ রাগে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে নূরজাহানকে ডাকতে চেয়েও ডাকে না। মারিদের পাশের ঘরটা সুখের। সুখের ঘর থেকে সবার গলার আওয়াজ আসছে। যদিও নূরজাহানের গলা শোনা যাচ্ছে না, তারপরও মারিদ ভাবল নূরজাহান সুখের ঘরেই হবে। মারিদ সুখের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে টোকা দিয়ে বলে…
‘সুখ, তোর ভাবি তোর ঘরে আছে?
মারিদের কণ্ঠ পেয়ে নূরজাহান চমকে ওঠে। অস্বস্তি অস্থিরতা জেঁকে ধরে। সুখ তৎপর হয়ে চিৎকার করে জবাব দেয়…
‘জি ভাই ভাবি আছে, আমার সাথেই।
‘তোর ভাবিকে বল ঘরে আসতে। আমি ডাকছি।
‘ভাবি যাও যাও, ভাইয়া ডাকছে।
নূরজাহানের সবে একদিন হলো সে এই বাড়িতে এসেছে, এখনই মারিদ উতলা হয়ে নূরজাহানকে ডাকছে—ব্যাপারটায় সবাই মুখ টিপে হাসছে। সুখ বেশ স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে, সে সবার মতো করে এতকিছু ভাবেনি। নূরজাহান লজ্জায় ও অস্বস্তিতে উঠে দাঁড়ায়। মুনিয়া হাসছে, কিন্তু কিছু বলছে না। নূরজাহান লজ্জায় পড়ে শাড়ির আঁচলটা মাথায় টেনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মারিদের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে বলে…
‘আসব?
ভিতর থেকে মারিদের উত্তর নেই। নূরজাহান আরও দুই-তিনবার দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকে মারিদকে কোথাও দেখতে পায় না। মারিদ ওয়াশরুমে গেছে, পানির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নূরজাহান অস্বস্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে। মারিদ কেন ডেকেছে, বুঝতে পারছে না। মারিদ নূরজাহানের ব্যবসায়িক সাহেব—এটা জানার পর থেকে নূরজাহানের মারিদের প্রতি যেমন টান জন্মেছে, তেমনি অস্বস্তিকরও লাগে। দুজনের ফোনে কথা বলার সময়ও কখনো এমন কোনো কথা কিংবা সরাসরি ফিলিংস আদান-প্রদান হয়নি যার মাধ্যমে দুজনের মনের কথা প্রকাশ পাবে। দুজনই ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলত। দুজনই বুঝত তারা দুজন দুজনকে পছন্দ করে, কিন্তু কখনো কেউ মুখে প্রকাশ করেনি। লাস্টবার যখন নূরজাহান গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, তখন সে মারিদকে ‘ভালোবাসি’ কথাটা বলেছিল; কিন্তু সেটা মারিদ কীভাবে নিয়েছে নূরজাহানের জানা নেই। মারিদ কাল রাতেও নূরজাহানকে সরাসরি বলেছে সে নূরজাহানকে পছন্দ করে না। হয়তো রেগে মারিদ কথাটা বলেছে, কিন্তু মানুষ রাগের মাথায় নাকি সত্যি কথাই বলে থাকে। নূরজাহান অতীতের সবকিছুর জন্য মারিদের মুখোমুখি হতে চায়। যেদিন মারিদ নূরজাহানকে সবকিছুর জন্য প্রশ্ন করবে, সেদিন নূরজাহান মারিদের সব প্রশ্নের উত্তর দেবে, তার আগে নয়। আপাতত মারিদ কিছুদিন সময় নিক, সেও নূরজাহানের জন্য অনেক কিছু সাফার করেছে, সেজন্য এখন নূরজাহানের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। মারিদের রাগ যখন কমে আসবে, তখন সে এমনিই নূরজাহানকে প্রশ্ন করবে। আপাতত নূরজাহান মারিদকে ডিস্টার্ব করবে না।
নূরজাহান বেশ সময় নিয়ে ড্রেসিংটেবিলের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকে। মারিদ ওয়াশরুম থেকে বেরোতে নূরজাহানকে বেগুনি রঙের শাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে নূরজাহানকে কয়েক সেকেন্ড দেখে জোরপূর্বক চোখ সরিয়ে নেয়। বেশি দেখলে যদি নূরজাহান মারিদের মন বুঝে ফেলে তাহলে সমস্যা। মারিদ নূরজাহানকে অদেখা করে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়ায়। অফিসের ড্রেসআপ খুলে সে সাদা শার্ট-প্যান্ট পরেছে। দুটো হাতা কনুই অবধি গোটাচ্ছে, অথচ নূরজাহান যে পাশে দাঁড়িয়ে আছে— সে কিছুই বলছে না। অবশেষে নীরবতা ভেঙে নূরজাহান জড়তায় বলে…
‘আপনি ডেকেছেন?
‘না।
মারিদের স্পষ্ট জবাবে নূরজাহান থতমত খেয়ে যায়। মারিদ তখন এতগুলো মানুষের সামনে নূরজাহানকে ডেকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে, অথচ এখন অস্বীকার করছে সে নূরজাহানকে ডাকেনি। মারিদ বাঁহাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলে…
‘ এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? কিছু বলবেন আপনি?
‘আমি কী বলব? আপনিই তো আমাকে ডাকলেন। সেজন্যই তো আসলাম।
‘আমার এত ফালতু সময় নেই যে আপনাকে ডাকব। আপনার কিছু বলার থাকলে বলে বের হোন। যান।
মারিদ নিজেও জানে না সে কেন নূরজাহানকে তখন ডেকেছিল। সে ঘরে এসে নূরজাহানকে দেখতে পায়নি বলে মেজাজ খারাপ হয়েছে, সেজন্য নূরজাহানকে ডেকেছে দেখতে—এটাতো আর নূরজাহানকে বলা যাবে না। মারিদের ত্যাড়া কথায় নূরজাহান বলে…
‘আপনি সবসময় এত ত্যাড়া ছিলেন? নাকি আমার সাথেই এমন?
মারিদ ঘড়ি পরতে পরতে তীক্ষ্ণ চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলে…
‘কেন, সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে? আবার পালাবেন ফন্দি করছেন? এবার কিন্তু ছাড় পাবেন না। আপনার চৌদ্দ গুষ্টির জন্মপরিচয় কিন্তু আমার কাছে আছে। আপনি একদিকে পালাবেন আর আমি অন্যদিকে সবাই ধরে ধরে মেরে ফেলব।
মারিদ কথাটা বেশ সিরিয়াস হয়ে বলেছে অথচ নূরজাহান মজার ছলে বলে…
‘এত ভালোবাসেন যে আমার বিরহে তাদের মেরে ফেলবেন?
নূরজাহানের মুখে ভালোবাসি কথাটা শুনে মারিদ বিরক্তি প্রকাশ করে। নূরজাহানকে উপহাস্য করে মারিদ বলে….
‘আপনি এই দুনিয়ার লাস্ট ব্যক্তি হবেন যাকে আমি ভালোবাসতে যাব।
মারিদের উপহাসে নূরজাহান দৃঢ় গলায় জবাব দেয়…
‘আমি মনে হয় লাস্ট না, ফার্স্ট ব্যক্তি আপনার। তাই না?
সত্যিটা ধরা পরে যাবে সেজন্য মারিদ রেগে যায়। আঙুল তুলে নূরজাহানকে শাসিয়ে বলে…
‘নিজের লিমিটে থাকুন।
‘ওকে।
নূরজাহান চুপ করে যায়। সে খুব কষ্টে নিজের হাসি আটকাচ্ছে। মারিদ এতে রেগে যাচ্ছে। নূরজাহান যে মারিদের মনের অবস্থা কিছু হলেও বুঝতে পারছে, সেটা মারিদের সহ্য হচ্ছে না। মারিদ রাগান্বিত ভঙ্গিতে কবাট খুলে নূরজাহানের জন্য কেনা ফোনটা বের করে। এটা মারিদ সেদিনই থানচিতে নিয়ে গেছিল, ভেবেছিল দুজনের বিয়ের পর প্রথম রাতে নূরজাহানকে দেবে; কিন্তু মারিদ রাগ করে চলে আসায় দিতে পারেনি। হাসান নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলতে বেশ কয়েকবার মারিদকে কল দিয়েছে, তখন মারিদের মাথায় এসেছে নূরজাহান তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। মারিদ ফোনে সিম, প্রয়োজনীয় সবার নাম্বার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ সবকিছু সেটআপ করে দেয় যাতে নূরজাহান নিজের পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারে। মারিদ রাগান্বিত ভঙ্গিতে কবাট থেকে ফোন নিয়ে নূরজাহানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
‘এটা আপনার। আপনার বাবা আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। ফোনে সবকিছু সেটআপ করা আছে, আপনি কথা বলে নিবেন।
নূরজাহান অবাক চোখে তাকিয়ে মারিদ থেকে দামি ফোনটি নেয়। নূরজাহানকে কখনো কেউ ফোন চালাতে দিত না। নূরজাহান যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিল এক জেলা থেকে অন্য জেলায়, তখনও নূরজাহান ফোন চালাতে পারত না। নূরজাহান যে ফোনটা দিয়ে মারিদের সঙ্গে কথা বলত, সেই ফোনটা নূরজাহান সিলেটের একটা বাসে কুড়িয়ে পেয়েছিল। ফোনটা উপকারী হবে ভেবে নূরজাহান কখনো ফেলেনি, সেই ফোনেই মূলত নূরজাহান মারিদের সঙ্গে কথা বলত। নূরজাহান ফোনটা হাতে নিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলে…
‘এটা আমার?
‘না, পাশের বাড়ির ভাবির।
‘আপনি কিনেছেন?’
‘না।
‘তাহলে কে কিনেছে?’
‘রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেজন্য আপনার জন্য নিয়ে এসেছি। হয়েছে এবার? আর প্রশ্ন করবেন না। সরুন।
নূরজাহান ফোনটা হাতে নিয়ে ঠোঁট কামড়ায়। ফোনটা পেয়ে বেশ খুশি হয়েছে। মারিদ গায়ে পারফিউম মাখে। নূরজাহান ফোন ওপেন করে বলে…
‘আপনার নাম্বার আছে ফোনে?
‘না।
‘কেন?
নূরজাহান তীক্ষ্ণ গলায় পাল্টা প্রশ্ন করে। মারিদ পারফিউম মাখা শেষে চলে যেতে যেতে বলে…
‘ আপনাকে ব্লক করে রেখেছি তাই।
‘ওহ আচ্ছা, তাহলে আমিও ব্লক করে দিচ্ছি দাঁড়ান।
নূরজাহান ফোনে মারিদের নাম্বার খুঁজছে এমন ভাব করে। মারিদ দরজার কাছে গিয়েও ফিরে আসে নূরজাহানের কথায়। নূরজাহানের হাত থেকে ঠাস করে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে…
‘ আমাকে ব্লক করে কী করতে পারবেন আপনি? বিয়ে করে ঘরে তুলেছি, আর আপনার ফোনে ঢুকতে পারব না মনে করেছেন?
‘আচ্ছা তাই? তাহলে নিন, নাম্বারটা ফোনে ঢুকিয়ে ফেলুন দেখি কেমন পারেন আপনি।
মারিদের কথায় মারিদকেই ফাঁসিয়ে দেয় নূরজাহান। মারিদ বেশ রাগান্বিত চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে ফোনটা ঢিল মেরে ফেলে দেয় বিছানায়। অপরিচিতা তার চিন্তাভাবনার চেয়েও দুর্দান্ত চালাক। প্রতিবার মারিদকে কীভাবে যেন নিজের মাঝে ফাঁসিয়ে নেয়। মারিদ আঙুল তুলে নূরজাহানকে শাসিয়ে বলে…
‘আপনি আমার থেকে দূরে থাকবেন বুঝেছেন?
নূরজাহান বেশ উদাসীনভাবে মারিদের কথার উত্তর দিয়ে বলে…
‘কতক্ষণ দূরে থাকতে হবে?
‘সারাজীবন।
‘সেটা তো আমার মৃত্যুতেই সম্ভব ব্যবসায়িক সাহেব।
মারিদ রেগে বেরিয়ে যায়। নূরজাহান মারিদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় যায়। ফোনটা পেয়ে সে ভীষণ খুশি। মারিদের কথা মতো ইমো ঘেঁটে মাজিদের বউ নদীর ইমো কন্টাক্ট বের করে ভিডিও কল করে। বেশ সময় নিয়ে কথা বলে পরিবারের সঙ্গে। হাসান, আলেহা, তারানূর, আশনূর, নদী সবাই জানতে চায় নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ির মানুষজন কেমন? নূরজাহানের সঙ্গে তাদের আচরণ কেমন? নূরজাহান বরাবরের মতোই শ্বশুরবাড়ির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
তারপর দিনগুলো যাচ্ছে সবার মান-অভিমানেই। কারও সম্পর্কে কোনো উন্নতি নেই। এইতো সেদিন মুনিয়া, সুখ সুফিয়া আফিয়ার সঙ্গে নূরজাহানকেও মার্কেটে নিয়ে যায়। রাদ ও রাতুল বাড়িতে। পাঁচ মেয়ে বাড়ির গাড়িতে করে যায় ড্রাইভারকে নিয়ে। দুপুর বেলার ওয়াক্ত। মারিদকে জানানো হয়নি নূরজাহানকে নিয়ে বেরিয়েছে তাঁরা। যেখানে সালমা পারমিশন দিয়েছেন, সেখানে মারিদকে কেউ জানাতে যায়নি। নূরজাহান নিজেও বলেনি। যেহেতু মারিদ নূরজাহানকে কল দেয় না, তাই নূরজাহানও বলে যায়নি। নূরজাহানের ফোনটা বাড়িতেই রেখে যায়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় সবার কেনাকাটায়। এর মাঝে হঠাৎ সুখের নজরে আসে নূরজাহান মিসিং। মুনিয়া, সুফিয়া, আফিয়া, সুখ সবাই আছে কিন্তু নূরজাহান কোথাও নেই। অপরিচিত শহরে নূরজাহান কোথায় যাবে ভেবে সবাই অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। চারপাশে পাগলের মতো নূরজাহানকে না পেয়ে সুখ ভয়ে কান্নাকাটি করে ফোন দেয় মারিদকে। মারিদ তখন কনস্ট্রাকশন সেক্টরে খোলা লিফটে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনিয়ারের ম্যাপ দেখছে। হঠাৎ সুখের ফোন আসায় প্রথমে কেটে দেয়। দ্বিতীয়বার কল রিসিভ করতেই সুখ হাউমাউ করে কান্না করে বলে…
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৯
‘ভাই, ভাই! ভাবিকে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। সবখানে খুঁজেছি কিন্তু ভাবি কোথাও নেই ভাই। দুই ঘণ্টা ধরে ভাবি মিসিং। আমরা ধানমন্ডি শপিং মলের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি। ভাই প্লিজ কিছু করো। ভাবি বিপদে আছে।
