Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪১

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪১

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪১
রিক্তা ইসলাম মায়া

হৈচৈ বন্ধু মহলের পরিবেশ কখনো নূরজাহান পায়নি। নূরজাহানের ছোট থেকে বড় হওয়ার পরিবেশটাই ছিল অস্বাভাবিক। আর দশটা সাধারণ সৎ মায়ের মতোই ছিল শাহানার ব্যবহার নূরজাহানের প্রতি। সৎ মায়ের সংসারে খুব ছোট বেলায় নূরজাহান শিখে গিয়েছিল সবকিছু মানিয়ে নেওয়া। শাহানা কখনো কারো সামনে প্রকাশ্যে নূরজাহানকে আঘাত করতো না। অগোচরে সবার আড়ালে করতো। নূরজাহান যখন নিজের মা হারিয়ে শাহানার কাছে মায়ের মমতার আঁচল খুঁজতে যেত, তখন শাহানার তিরস্কার ও আঘাতে ফিরে আসতে হতো। নূরজাহান চাপা স্বভাবের। কখনো নিজের ব্যথা কাউকে বলতে পারতো না। নূরজাহানের ব্যথা শোনার মতো ঐ পরিবারের কেউ ছিল না আলেহা আর হাসান বাদে। প্রথম প্রথম নূরজাহানের গায়ে যখন শাহানার মারের চিহ্ন দেখতো, সেই নিয়ে আলেহা হাসান দুজনই পরিবারের ঝামেলা করতো। শাহানা এতে আরও ক্ষিপ্ত হতো। সংসারে অশান্তি হতো।

নূরজাহানকে তিরস্কার করতো। ছোট নূরজাহানের এসব ভালো লাগতো না। সে মায়ের আদর খুঁজতো। যেভাবে শাহানা আশনূর আহাদকে কোলে তুলে ভাত মাখিয়ে খাওয়াত, সেই আদর খুঁজতো। সময়ে অসময়ে আশনূর ব্যথা পেয়ে কান্না করলে যেমন শাহানা আদর করে শান্ত করতো, নূরজাহান সেই ভালোবাসা খুঁজতো। নূরজাহানের ধারণা ছিল সে যদি ঘরের সবচেয়ে লক্ষ্মী মেয়েটা হয়, তাহলে শাহানা নূরজাহানকেও আদর করবে। তিরস্কারে দূরে ঠেলে দেবে না। শাহানার মন জয়ের জন্য নূরজাহান অল্প বয়সেই ঘরের সব কাজ শিখে নেয়। হাতে হাতে শাহানার কাজ করে দিত। ভাবতো শাহানা এই বুঝি খুশি হয়ে নূরজাহানের দিকে মমতার চোখে তাকাবে। কিন্তু সেই সুদিন নূরজাহানের জন্য কখনো আসেনি। বড় হতে হতে নূরজাহান শিখে গেছে এটাই বাস্তবতা। সৎ মায়ের সংসারে মানিয়ে নিতে পারলে তুমি জয়ী, নয়তো দুঃখী। নূরজাহান জয়ী মানুষের মতো বাস্তবতাকে মানিয়ে নিয়েছে। নীরবে সব সয়ে গেছে। আজও তাই। আয়েশার মৃত্যুর পর নূরজাহানের জীবনে কখনো সুদিন আসেনি। একটা অনিশ্চিত জীবন পার করেছে সর্বদা। কখনো স্বাধীনতা জিনিসটা উপলব্ধি করতে পারেনি। চারদিক থেকে নূরজাহানকে ঘিরে রেখেছে বন্দী জীবন। নূরজাহানের অতি রূপ, মানিকের উৎপাত, শাহানার তিরস্কার, সংসারে অশান্তি সবকিছু নূরজাহানকে একটা অসুস্থ পরিবেশ দিয়েছে। নূরজাহান কখনো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমিয়ে ফুসকাও খেতে পারেনি।

এই ঢাকা শহরে এসে নূরজাহান একটা মুক্ত স্বাধীন জীবন পাচ্ছে, যেটাতে নূরজাহান অভ্যস্ত নয়। এই স্বাধীনতার জীবন নূরজাহান ভীষণ অবাক মুগ্ধ চোখে দেখে। কেউ নূরজাহানকে থামাচ্ছে না, বাঁধা দিচ্ছে না, নূরজাহানের প্রাণঘাতের ভয় নেই। সবচেয়ে বড় কথা কেউ নূরজাহানকে দেখতে চাইছে না। সবাই ব্যস্ত যার যার মতো করে। কেউ নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে নেই।
‘ ভাবী? এই ভাবী? কী ভাবছেন? খাচ্ছেন না কেন? আপনার ফুসকা তো নরম হয়ে যাচ্ছে।
তনিমার ডাকে নূরজাহান সংবিতে ফিরে আসে। হাতের তালুতে ফুসকার প্লেট। তনিমা মাহি একের পর এক ফুসকা খাচ্ছে, নূরজাহান ফুসকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। গায়ে কালো বোরকা। মুখ ঢাকা নেকাবে। তনিমা অনেকবার বলেছে নূরজাহানকে নেকাব তুলে ফুসকা খেতে, নূরজাহান নেকাব তোলেনি; সে নেকাবের ভেতর দিয়েই খাবে। তনিমা মাহির গায়ে ডাক্তারি অ্যাপ্রোন। কাঁধে কলেজ ব্যাগ। মাহির নূরজাহানের মুখ এখনো দেখা হয়নি। নূরজাহান রাস্তায় নেকাব তুলতে চাইছে না বলে মাহি নূরজাহানের মুখ দেখার ইচ্ছা দেখায়নি। তবে তনিমার মুখে বেশ কয়েকবার শুনেছে মারিদ আলতাফের বউ নূরজাহান পরীর মতো সুন্দরী। মেয়েটির নেকাবের ভিতরে বড় বড় চোখ দেখে মাহির মনে হচ্ছে মেয়েটি আসলেই সুন্দরী হবে। নূরজাহান হাতের ফুসকা এক পলক দেখে তনিমার দিকে তাকিয়ে বলে..

‘ কাউকে না জানিয়ে এইভাবে বাহিরের থাকাটা ঠিক হচ্ছে না ভাবী। ছোট মামী, সুখ ওরা হয়তো আমাদের খুজছে। ওদের টেনশনে রাখাটা ঠিক হবে না। আমাদের কাউকে ফোন করা উচিত ভাবী। অনেকক্ষণ হয়েছে বেরিয়ে এসেছি আমরা।
তনিমা নূরজাহানকে, নূরজাহান তনিমাকে দুজন দুজনকে ভাবী ডাকছে। দুজনই জানে না কে বড় কে ছোট জা হবে। মারিদ কিংবা রিফাত কেউ নূরজাহান তনিমাকে বলেনি দুজনের কে বড় ভাবী হবে। সম্পর্কের ধারণা না থাকায় তনিমা নূরজাহান দুজন দু’জনকে ভাবী ডাকছে। তনিমা মুখে ফুসকা তুলে বলে….
‘ আমি রিফাত স্যারকে মেসেজ করে জানিয়েছি আমরা কোথায় আছি। আপনি চিন্তা করবেন না ভাবি। কেউ আমাদের খুঁজবে না। আপনি রিলাক্স মুডে ফুসকা খান।
‘ রিফাত স্যার মানে?
‘ আরে আপনার রিফাত ভাই-ই আমার স্যার হয়।
নূরজাহান জানতো না রিফাত তনিমার স্যার হয়। নেকাবের আড়ালে নূরজাহান হাসে। নূরজাহানের অল্প হাসির শব্দ তনিমা পেয়ে অস্বস্তিতে লজ্জায় পড়ে যায়। নূরজাহান স্বস্তির হয়। রিফাতকে বলা হয়েছে মানে রিফাত ঐ বাড়ির সবাইকে নিশ্চয়ই বলেছে নূরজাহান তনিমার সঙ্গে আছে সেটা। নূরজাহান নেকাবের ভেতর দিয়ে একটা ফুসকা মুখে তুলে বলে…

‘ আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ ছিল ভাবি?
‘ লাভ এ্যারেঞ্জ দুটোই।
‘ যদি বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাহলে আমি শুনতে আগ্রহী ভাবি।
তনিমা স্পষ্ট কথা বলা মানুষ। সহজে নিজের কিছু ছেড়ে দেয় না। বিগত দিনে নূরজাহানের সঙ্গে তনিমার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে, কখনো একান্তভাবে দুজনের কথা হয়নি। আজই প্রথম। নূরজাহানের কথাবার্তায় স্পষ্ট সে একটা বুঝদার ম্যাচিউর মেয়ে। তনিমারও বেশ ভালো লাগে নূরজাহানের শান্তশিষ্ট আচরণ। ঐ বাড়িতে তনিমার এখনো তেমন কেউ বন্ধু হয়ে ওঠেনি। নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলতে সমস্যা কোথায়? তনিমা নিজের অস্বস্তিবোধ রোধ করে বলে…
‘ আমাদের প্রেম ছিল চিঠিতে। বলতে পারেন প্রায় চার মাসের মতন আমরা চিঠি আদান-প্রদান করে কথা বলি। তারপর হঠাৎ করে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমাদের বিয়ের রাতেই জানতে পারি আমার চিঠিওয়ালা রিফাত স্যার ছিল।
তনিমার কাহিনিতে নূরজাহান যেন নিজেকে খুঁজে পেল। এমন একটা কাহিনি নূরজাহানের রয়েছে ব্যবসায়ী সাহেবকে ঘিরে। নূরজাহান বেশ আশ্চর্য হয়ে আগ্রহ নিয়ে জানতে চেয়ে বলে…

‘ আপনারা কি না জেনে একে অপরকে চিঠি লিখতেন?
‘ জি অনেকটা তাই। যদিও আমি উনার বিষয়টা এখনো শিওর না যে উনি আদৌও আমাকে চিনে চিঠি লেখতো কিনা। তবে চিঠিতে উনি সবসময় আমাকে অপরিচিতা ডাকতেন। আর আমি চিঠিওয়ালা। তারপর আমাদের বিয়ে আপনার বিয়ের দিন রাতেই হয়েছিল একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে। আপনি হয়তো ঐ বাড়ির মানুষ থেকে শুনেছেন বাকিটা কিভাবে কি হয়েছিল।
নূরজাহান অস্বস্তিতে আশেপাশে তাকাল। রাস্তার পাশ ঘেঁষে ওরা দাঁড়িয়ে ফুসকার ভ্যান গাড়ির সামনে। রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে গাড়ি। রাস্তার পাশে ফুসকা, ঝালমুড়ি, বাদাম, তাল, ডাব, ভিন্ন রকমের ফুটপাতের জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। অদূরে রাস্তার একপাশে ভ্যান করে ছোট বাচ্চাদের জামাকাপড়ও বিক্রি করছে। যাতায়াতকারী মহিলারা ভিড় জমিয়ে দামদর করছে। নূরজাহান ওর শ্বশুরবাড়ির মানুষ থেকে শুনেছিল তনিমা রিফাতের বিয়ে পুলিশ স্টেশনে হয়েছে। কি কারণে হয়েছে এতসব কিছু নূরজাহান জানে না। আপাতত জানতেও চায় না। নূরজাহানের খানিকটা অস্বস্তি লাগছে। তনিমার মুখে অপরিচিতা ডাকটা খুব পরিচিত। নূরজাহান মুখে ফুসকা তুলে বলে।

‘ জটিল প্রেম আপনাদের।
তনিমার ফুসকা খাওয়া শেষ। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে বলল তিনটা ডাব দিতে। লোকটা ডাব কেটে তনিমা মাহি নূরজাহানের হাতে তুলে দেয়। তনিমা ডাবের বিল মিটিয়ে নূরজাহানের মুখোমুখি হয়ে পাইপে চুমুক বসিয়ে পানি পান করে বলে….
‘ আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা প্রশ্ন করি ভাবী?
‘ জি বলুন।
‘ আপনার দৃষ্টিতে ভালোবাসা কি ভাবী?
নেকাবের আড়ালে নূরজাহান পানি পান করছিল। তনিমার প্রশ্নে ডাব হাতে নিয়ে বলে…
‘ ভালোবাসার সঠিক সংজ্ঞা তো বলতে পারব না। তবে আমার দৃষ্টিতে ভালোবাসা হচ্ছে, যেটা শুধু হয়ে যায়। কে কোথা থেকে, তার কাছে কি আছে, তার রঙ, ধর্ম, বর্ণ, প্রতিপত্তি কোনো কিছু আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। শুধু মানুষটার প্রতি আপনার অসীম মায়া থাকবে। দুনিয়ার সবকিছুর ঊর্ধ্বে শুধু আপনার ঐ মানুষকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে, যাঁর জন্য আপনি কোনো কিছু বাজি ধরতে এক মুহূর্তে ভাববেন না। যার উপস্থিতিতে আপনার সবকিছু ঠিক মনে হবে, কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে দুনিয়া রঙহীন বিরান, তখন আপনি বুঝবেন আপনি তাঁকে ভালোবাসেন। আর আমার দৃষ্টিতে সেটাই ভালোবাসা।
নূরজাহানের কথায় তনিমা নিজেকে খুঁজে পেল। তনিমাও তো রিফাতকে না দেখে, না জেনে দিনের পর দিন ভালোবেসেছে। রিফাত কেমন? কি তার পরিচয়, তার ধর্ম বর্ণ কিছুই জানতো না। আসলে ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত। তনিমা নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে….

‘ আপনি খুব চমৎকার মানুষ ভাবি। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হচ্ছে আপনার সাথে আমার অনুভূতিগুলো মিলে যাচ্ছে।
‘ আপ…
নূরজাহানের বাকি কথা শেষ করার আগেই দুটো শক্তপোক্ত হাত নূরজাহানকে জাপটে জড়িয়ে পিছিয়ে যায়। তাল সামলাতে না পেরে নূরজাহানের হাতের ডাব রাস্তায় পড়ে। তনিমা মাহির আতঙ্কে ‘এই! এই!’ আহাজারির মাঝেই নূরজাহানের পা উঠে যায় শূন্যে। মারিদ নূরজাহানকে দু’হাতে জাপটে জড়িয়ে ব্যাকুলতায় বলে…
‘ আমার মনে হয়েছিল এই বুঝি আপনাকে আবারও হারিয়ে ফেললাম অপরিচিতা।
মারিদের দু’হাতের শক্ত বাঁধনে নূরজাহানের শ্বাস আটকে আসে। মারিদ লম্বা হওয়ায় নূরজাহানের পা শূন্যে ঝুলছে। নূরজাহানের পায়ের একটা জুতাও খুলে রাস্তায় পড়ে গেছে। মারিদের বিড়বিড় নূরজাহানের কাছে এসেছে। অনিচ্ছাকৃত হলেও এই প্রথম দুজনের আলিঙ্গন। নূরজাহান খুশি হবে নাকি অস্বস্তিকর? চারপাশের মানুষ ওদের দুজনকেই দেখছে। মারিদ নূরজাহানের কানের কাছেই বিড়বিড় করে কথাটা বলেছে সেটা শুনে নূরজাহান অবাক হয়ে বলে…

‘ আমার অনুপস্থিতি আপনাকে পোড়ায় ব্যবসায়ীক সাহেব?
‘ আপনার অনুপস্থিতি আমাকে পাগল করে দেয়।
কথায় কথায় মারিদ নূরজাহানকে সত্যিটা বলে। নূরজাহান প্রচণ্ড অস্বস্তিতে দু’হাতে ঠেলে মারিদকে দূরে সরিয়ে নিচে নামতে চায়। মারিদ ছাড়ে না। রিফাত তনিমার মেসেজ পেয়ে মারিদকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। দূর থেকে তনিমার সঙ্গে নূরজাহনাকে দেখে মারিদ পাগলের মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে। মারিদ নূরজাহানকে ছাড়ছে না দেখে বিরক্ত হয়ে বলে…
‘ মারিদ ছাড় নূরজাহানরে। তোর মতো বউ মাইনষের নাই হ্যাঁ? সুন্দরী মাইয়া দেখলেই খালি রাস্তায় জড়ায় ধরতে মন চায়?
‘ প্লিজ ছাড়ুন। সবাই দেখছে।
মারিদের হুঁশ ফিরতেই সে নূরজাহানকে ছেড়ে দেয়। নূরজাহান সোজা হয়ে দাঁড়াতে মারিদ শক্ত হাতে নূরজাহানের হাত মুঠোয় চেপে ক্ষিপ্ত মেজাজে বলে….
‘ আপনাকে মানা করেছিলাম বাসা থেকে না বের হতে, কেন বের হয়েছেন? আপনি ঢাকা শহরের কিছু চেনেন? আজ যদি কিছু হতো?
মারিদকে রেগে যেতে দেখে তনিমা নূরজাহানের হয়ে মারিদকে সাফাই দিয়ে বলে…

‘ আসলে ভাইয়া, ভাবীকে ছোট মামী নিয়ে এসেছিলেন শপিংমলে। আপনার আম্মা পাঠিয়েছেন ভাবীকে। কেনাকাটার মাঝে ভাবী সবার থেকে আলাদা হয়ে যান। আমার কলেজ শেষ করে ভাবীদের সঙ্গে জয়েন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য আমার ফ্রেন্ড মাহিকে নিয়ে এখানে আসি। ভাগ্যক্রমে ভাবীকে শপিংমলের বাইরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনাকে আমার সঙ্গে নিয়ে আসি। আপনার ভাইকেও মেসেজ করে জানাই আমাদের লোকেশনের কথা।
মারিদের কিছু বলার আগেই রিফাত তনিমাকে শাসিয়ে দায়িত্বহীনতা নিয়ে প্রশ্ন করে বলে….
‘ আপনার কি জ্ঞানবোধ নেই তনিমা? আপনি শপিংমলের ভিতরে সবাইকে না খুঁজে নূরজাহানকে নিয়ে ফুসকা খেতে চলে এসেছেন? আপনি জানেন সবাই কত টেনশনে ছিল এই নিয়ে?

‘ শপিংমলটা আপনার ছোট মনে হয় যে দুই মিনিট খুঁজলেই পেয়ে যাব? এক ঘণ্টার বেশি সময় হবে মামীদের খুঁজেছি আমরা। অবশেষে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে আপনাকে মেসেজ করি। ছোট মামীর নাম্বার আমার কাছে নেই। সুফিয়া আফিয়া আপু, সুখ কেউ ফোন আনেনি বলে তাদেরকেও ফোন করতে পারিনি। সেজন্য আপনাকে, বড় মামীকে, আপনার আম্মুকে, ইভেন ছোট মামাকেও ফোন করে জানিয়েছি ভাবী আমার সাথে আছে, যাতে ছোট মামা ফোন করে ছোট মামীকে বলে টেনশন না করতে। এখন আপনাদের যদি এতই দায়িত্ববোধ থাকে, তাহলে বউদের জন্য সময় বের করে নিজেরা কেন নিয়ে আসতে পারেন না শপিংয়ে? আপনাদের বউয়ের প্রয়োজনগুলো কেন আপনাদের মা-বাবার দেখতে হয়? বিয়ে করলেই বুঝি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? আজ ভাবীর কিংবা আমার যদি কিছু হতো, তাহলে এজন্য কি আপনারা দায়ী থাকতেন না?
তনিমার কথা বেশ তীক্ষ্ণ কর্কশ। রিফাত রাগে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে। সে অপমানিত বোধ করছে এতগুলো মানুষের সামনে তনিমা এইভাবে বলায়। মারিদ তনিমার কথায় নূরজাহানের দিকে তাকায়। সে অপমান বোধ করেনি, বরং মনে হয়েছে তনিমা মারিদ রিফাতের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলছে, বিয়ে করলেই হয় না, বউয়ের দায়িত্বও পালন করতে হয়।
রাগান্বিত মারিদ নূরজাহানের হাত চেপে গাড়ির দিকে হাঁটে। রিফাত তনিমাকে ইগনোর করে মারিদের পিছনে যেতে চাইলে তনিমা রিফাতের পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলে…

‘ আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
‘ জাহান্নামে যাচ্ছি। যাবেন?
‘ না আপাতত মুড নাই। আপনি যাচ্ছেন, যান। যাওয়ার আগে আমার বিল দিয়ে যান। ভাবীকে নিয়ে ফুসকা ডাব হাবিজাবি খেয়েছি। এসবের বিল কে দিবে?
রিফাত রাগে দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাত পকেটে গুঁজে যা পেল সবকিছু দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে তনিমার দুহাতে তুলে দিয়ে বলে….
‘ শুধু ডাব খেলেন কেন? সঙ্গে আপনার কলিজাটা খেতেন।
‘ যদিও আমি মানুষের কলিজা খাই না। তবে আপনারটা খেতে আমার সমস্যা নেই। কোথায় অ্যাভেইলঅ্যাবল আছে বলুন?
রিফাত রাগে দাঁতে দাঁত পিষে। সে মনে করেছিল সে জাউরা। কিন্তু এখন দেখছে তনিমা তার থেকেও এক কাঠি উপরের জাউরা। রিফাত কথা না বাড়িয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে চলে যায়। তনিমা রিফাতের চলে যাওয়ার দিকে তাকায়। মাহি বলে….
‘ আল্লাহ! দোস্ত তুই রিফাত স্যারের সঙ্গে এইভাবে কথা বলিস? ভয় করে না স্যারকে?
‘ তোর স্যার আমার স্বামী। তাঁকে ভয় পাওয়া ছেড়ে দিয়েছি আরও অনেক আগেই।
তনিমা দু’হাতের দিকে তাকায়। রিফাতের ড্রাইভিং লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড, ওয়ালেট সবকিছু তনিমার হাতে দিয়ে সে রাগে চলে গেছে। অথচ এই কাগজপত্র ছাড়া রিফাত একদিনও চলতে পারবে না। তনিমা রিফাতের জরুরি কাগজপত্রগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। এক হাজার টাকার নোট বেশ অনেকগুলো একত্রে রাখা সেখান হতে একটা নোট নিয়ে তনিমা বাকি টাকা গুলো ব্যাগে রাখে। এই লোক যে আজ রাতে তনিমাকে কল করবে, এটা নিশ্চিত।

একটা অন্ধকার কালো ছায়ায় দাঁড়িয়ে কেউ একজন। নূরজাহান অন্ধকার ছিঁড়ে আলোর সন্ধানে দৌড়াচ্ছে এলোমেলো। কালো ছায়ার মানবীর থেকে বাঁচতে প্রাণপূর্ণ দৌড়াচ্ছে। নূরজাহান যত দৌড়াচ্ছে ততই অন্ধকার ছায়াটা যেন নূরজাহানকে গ্রাস করে নিচ্ছে ক্রমাগত। নূরজাহান ভয়ার্ত দিশেহারা অবস্থায় চিৎকার করে ডাকছে হাসানকে…
‘ আব্বা? আব্বা আপনি কোথায়? আমি নূরজাহান, আপনার মেয়ে। আব্বা আমি অন্ধকারে হারিয়ে গেছি পথ খোঁজে পাচ্ছি না। আব্বা আমাকে বাঁচান। আব্বা?
বিশাল বিস্তৃত অন্ধকার মরুভূমি। আশেপাশে শুনশান নিস্তব্ধতার ছায়া, কোথাও কেউ নেই। নূরজাহান দৌড়াচ্ছে আলোর সন্ধানে। হঠাৎ অন্ধকারের মাঝে একটা শীতল ঠান্ডা হাত নূরজাহানের হাত চেপে ধরে। নূরজাহান ভয়ে চিৎকার করে জোরাজুরি করে নিজেকে ছাড়াতে চায়। কিন্তু কালো ছায়াটা নূরজাহানকে ছাড়ে না। ভয়ার্ত নূরজাহান চিৎকার করে বলে—
“কে? কে আপনি? কী চান আমার কাছে? আমাকে যেতে দিচ্ছেন না কেন? আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আমার স্বামীর কাছে যেতে চাই। ব্যবসায়ী সাহেব, আপনি কোথায়? আমাকে এই অন্ধকার হতে বের করুন। আমি আপনার নূরজাহান। ব্যবসায়ী সাহেব?

“তুই আমার সাথে বেইমানি করছিস নূরজাহান। আমার কথা রাখিসনি। ওয়াদা ভঙ্গ করেছিস।
নূরজাহান ভয়ে তিলমিলিয়ে ওঠে। সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে মায়ের শক্ত গলা শুনে। নূরজাহানের বড্ড পানি পিপাসা পেল। জিব দিয়ে তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ভিজিয়ে কাতর গলায় ডাকে মাকে—
“আম্মা? তুমি আমার আম্মা? আম্মা তুমি কই? আমি তোমাকে ছুঁতে পারছি না কেন? আম্মা দেখো, আমি তোমার নূরজাহান। আমার সামনে আসো।
আয়েশার কালো ছায়াটা ক্রমশ নূরজাহানের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। বেশ রাগী স্বর শোনা গেল আয়েশার—

“আমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তুই ভঙ্গ করছিস। তুই আমার মেয়ে না নূরজাহান। আমার মেয়ে না।
“তাহলে আমি কার মেয়ে আম্মা? আমার আব্বার মেয়ে আমি?
“আমি তোকে কখনো ক্ষমা করব না নূরজাহান।
” আমাকে ক্ষমা করিও না আম্মা। আমি পারব না তোমার কথা রাখতে। আব্বা আমাকে বিয়ে দিয়েছে। আমি সংসার চাই আম্মা, সুখী সংসার। তুমি দেইখো আমি সুখী হব আম্মা। ভীষণ সুখী হব।
আয়েশার কালো ছায়াটা যত দূরে সরে যাচ্ছে, নূরজাহান ততই দিশেহারা পাগল হয়ে মায়ের পেছনে দুহাত মেলে দৌড়াচ্ছে ধরতে। মাকে আরেকটু দেখার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আয়েশা পিঠ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে। নূরজাহান চিৎকার করে ডাকছে আয়েশাকে—
“আম্মা? ও আম্মা? তুমি আমারে ছেড়ে দেও না আম্মা।
“নূরজাহান? এই নূরজাহান? শুনছেন? কী হয়েছে আপনার? কাকে ডাকছেন আপনি? এমনভাবে ঘামছেন কেন? নূরজাহান উঠুন? এই নূরজাহান?

নূরজাহান অনবরত বিড়বিড় করে আয়েশাকে ডাকছে। মারিদ দুহাতে ঠেলে দিতেই নূরজাহানের ঘুম ভেঙে যায়। বারান্দার ছোট সোফায় কুঁজো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল নূরজাহান। মারিদের ডাকে নূরজাহান ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। শরীর কাঁপছে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। অসময়ের ঘুমে আয়েশাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল নূরজাহান। আয়েশা ভীষণ রেগে আছে নূরজাহানের ওপর। মারিদ বারান্দার আলো জ্বালায়। নূরজাহান ঘেমে একাকার। দুঃস্বপ্ন দেখায় বড় বড় শ্বাস ফেলছে সে। মারিদ নূরজাহানকে অস্থির হতে দেখে বলে—
“আপনি ঠিক আছেন নূরজাহান? এইভাবে ঘামছেন কেন? বাজে স্বপ্ন দেখছিলেন?
নূরজাহান শূন্য গভীর চোখে মারিদের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ শান্ত স্বরে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে—

“আপনি কখন এসেছেন?”
“মাত্র আসলাম।
“বাজে কয়টা?
“দেড়টা।
“খেয়েছেন?
‘ জি।
‘ তাহলে আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি ঠিক আছি।
নূরজাহান মারিদকে পাশ কাটাতে চাইলে মারিদ নূরজাহানের বাহু টেনে নিজের মুখোমুখি করে বলে…
‘ কি হয়েছে আপনার এমন করছিলেন কেন?
‘ আমার কিছু হয়নি। আপনার সামনেই তো ঘুম থেকে উঠলাম মাত্র। কি হবে আমার বলুন?
‘ বাজে স্বপ্ন দেখছিলেন? এইভাবে ঘেমে যাচ্ছেন কেন?
নূরজাহান কথা কাটাতে মাথার উপর ছোট ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে বলে…
‘ মাথার উপর ফ্যানটা বন্ধ সেজন্য হয়তো ঘেমে গেছি। আপনি অহেতুক চিন্তা করছেন। আপনার জন্য ব্যস্ত হবেন না যান আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
নূরজাহান চুপচাপ মারিদ থেকে নিজের বাহু ছাড়িয়ে ওয়াশরুমে যায়। ওয়াশরুমের বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে কম্পিত হাতে মুখে বারবার পানি ছিটায়, যেন কোনো কিছুর থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাই। নূরজাহানের অতীত বর্তমানের দরজায় কড়া নাড়ছে। নূরজাহান দরজা খুলতে চায় না বলে ভিতর থেকে তালা মেরেছে। নূরজাহান অতীতের কোনো কিছু আর বর্তমানে চাই না। আয়েশাকে দেওয়া ওয়াদা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হলেও নূরজাহান বর্তমান নিয়ে বাঁচতে চাই। নূরজাহান পরপর মুখে পানি ছিটিয়ে আয়নার দিকে তাকায়, তক্ষুনি নিজের ভিতরকার সত্তাটা আয়নায় প্রতিবিম্ব হয়ে সামনে আসে নূরজাহানের। নূরজাহান কাঁপা স্বরে বলে…

‘ কে তুমি?
‘ তোর সত্তা। কেন আমায় চিনতে কষ্ট হচ্ছে বেইমান?
‘ কেন এসেছ তুমি? কি চাও আমার কাছে?
নূরজাহানের সত্তা তিরস্কার করে জানাল…
‘ তুই কি আমায় দিবি? তুই তো পাপী, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী; যে নিজের মায়ের সাথে সৎ নয় তার কাছে আমি কি চাইব?
নূরজাহান শক্ত গলায় জবাব দিল…
‘ সুখ আমার প্রাপ্য। আমি তোমাদের কারও কথা শুনব না। তোমরা চলে যাও।
আয়নায় নূরজাহানের প্রতিবিম্বটা ব্যঙ্গ করে বলল,
“তুই পাপিষ্ঠ। ভয়ংকর মিথ্যাবাদী!
নূরজাহান ম্লান গলায় জানাল, “আমি পরিপূর্ণ। সুখ আজ আমার খাতায়। আমার তোমাদের কাউকে দরকার নেই।
সে চিৎকার করে বলল, “তুই গান্ধার! গান্ধার! সুখের লোভে বেইমানি করছিস। ধোকা দিচ্ছিস নিজের মায়াকে। বিশ্বাসঘাতক, তোর কোনো ক্ষমা নেই।
নূরজাহান ধীরকণ্ঠে বিড়বিড় করে—

“সব সত্যের জয় হয় না। আমি আমার মায়ের দেখানো পথে আর হাঁটতে চাই না। আমার মা আমাকে একটা অন্ধকার অনিশ্চিত জীবন ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। এবার সুখ আমার প্রাপ্য। আজ আমার কাছে সব আছে। স্বামী, সংসার, নতুন জীবন। কি নেই আমার? আমি আজ পরিপূর্ণ। আমার তোমাদের প্রয়োজন নেই।
‘ স্বার্থপর কোথাকার।
‘ স্বার্থপর হলে হয়েছি, তোমাদের কি? তোমরা কেন বারবার আসো আমার কাছে? চলে যাও। আমি আর তোমাদের কথা শুনব না। আমার জীবনে আমি অনেক সুখী হতে চাই। যেন দুঃখগুলোও আমার সুখের তিরস্কারে মুখ লুকায়। তোমাদের প্রয়োজন আমার নেই। শুনেছ তোমরা? যাও। আর কখনো আমার সামনে আসবে না।’
‘ তোর মাকে করা ওয়াদা, প্রতিশ্রুতি, তার আমানতের কি হবে? সব ভুলে যাবি তুই নূরজাহান?
নূরজাহান বেশ স্বাথপরের মতো করে বলে…
‘ এই মুহূর্তে আমি কাউকে চিনি না। তোমাকে, মাকে কাউকে না। সব ভুলে গেছি আমি। আমার মা মৃত। তার সাথে করা আমার প্রতিশ্রুতিও মৃত।

আয়নার সত্তাটা অদৃশ্য হয়ে যায়। নূরজাহান মুখে পানি ছিটিয়ে বেরিয়ে আসে। ঘরে আলো জ্বলছে। মারিদ কোথাও নেই। নূরজাহানের ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে। জীবনের ছোট-বড় মুহূর্তগুলো ডায়েরিবন্দি করতে পছন্দ করে সে। নূরজাহানের দুটো ডায়েরির একটা ডায়েরি খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। অপরটা আছে। ডায়েরির নাম লেখা #ডাকপ্রিয়। এই ডায়েরিটা নূরজাহানের মা আয়েশার ছিল। এটাতে কখনো আয়েশার কিছু লেখা হয়নি। মায়ের শেষ স্মৃতির মধ্যে এই ডায়েরিখানাও একটা রয়েছে নূরজাহানের কাছে। নূরজাহান যখন এই ডায়েরিতে কিছু লেখে, তখন মনে হয় নূরজাহান আয়েশার কাছে মনের সব কথা নিংড়ে প্রকাশ করছে। আর আয়েশা সেটা যত্ন সহকারে শুনছে। নূরজাহান নিজের ট্রলি ব্যাগ খোলে। ব্যাগের নিচে কাপড়ে মোড়ানো নীল ডায়েরিটা খোলে। ডায়েরির সঙ্গে কলম বাঁধা। নূরজাহান পা ভাঁজ করে ফ্লোরে বসে। কলম হাতে পৃষ্ঠায় লেখে জীবনের কিছু অবজ্ঞার অংশ…
স্বামী, সংসার, নতুন পরিবার পেয়ে আমি ভীষণ লোভী হয়ে গেলাম। লোভ আমাকে এতটাই প্রভাবিত করল যে ভুলে গেলাম মায়ের প্রতিশ্রুতির কথা।

বিবেক ও আমার দ্বৈরথ দ্বন্দ্ব চলিল প্রতি মুহূর্তের পর মুহূর্ত….
আমি অপরাধী, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী;
বিবেক যখন আমায় তিরস্কারে বিঁধালো—
আমি বললাম, “সুখ তো আমারই প্রাপ্য।
সে ব্যঙ্গ করে বলল, “তুই পাপিষ্ঠ।
আমি ম্লান হেসে তাঁকে জানালাম, “আমি পরিপূর্ণ।
সে চিৎকার করে বলল, “ভয়ংকর মিথ্যাবাদী!
আমি ধীরকণ্ঠে বিড়বিড় করিলাম—
“সব সত্যের জয় হয় না,
বিবেক অবজ্ঞায় বলে, “তুই গান্ধার! গান্ধার!
আমি বলিলাম, “আমি কেবল সুখী হতে চাই।
[ ০৩/০৪/২০১৫ ]
‘ আপনি ঐখানে কি করছেন নূরজাহান?
মারিদের কণ্ঠ পেয়ে নূরজাহান তাড়াহুড়োয় হাতের ডায়েরিটা কাপড়ে মুড়িয়ে ব্যাগে রেখে দেয়। মারিদ দেখতে পায়নি নূরজাহানের ডায়েরিটা। নূরজাহান অজুহাত দিয়ে বলে….
‘ ব্যাগের চেইন খোলা ছিল সেজন্য লাগাচ্ছিলাম।

নূরজাহান ব্যাগের চেইন আটকে উঠে দাঁড়াল। মারিদ সেদিকে বেশ একটা মনোযোগী নয়। নূরজাহানের ব্যাগে সে যা কিছু করতে পারে। এতে এতকিছু খতিয়ে দেখার কিছু নেই। মারিদ নূরজাহানের মনোভাব বুঝতে চাচ্ছে। বেশ ডিস্টার্বড লাগছে নূরজাহানকে। বিকালেও ঠিক ছিল নূরজাহান। মারিদ নূরজাহানকে বাসায় রেখে যাওয়ার সময়ও নূরজাহান বেশ হাসিখুশি ছিল, তাহলে এখন কি হয়েছে মেয়েটার? কি নিয়ে এত ডিস্টার্বড? মারিদ নূরজাহানকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রশ্ন করে বলে….
‘ আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে ডিস্টার্বড নূরজাহান?
নূরজাহান চট করে নিজের মনোভাব পরিবর্তন করে বলল…

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪০

‘ কি ব্যাপার বলুন তো ব্যবসায়ী সাহেব? আজ আমাকে এত নোটিস করছেন, আমার প্রেমে পড়লেন নাকি?
মারিদের দু’হাতে দুটো কফির মগ। এই কফি বানাতে সে এত রাতে নিচে গিয়েছিল। মারিদ নূরজাহানের দিকে কফির একটা মগ বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
‘ আজ আপনার গল্প শুনতে চাই অপরিচিতা। শুরু থেকে সবটা বলবেন। কোনো রূপ মিথ্যা কিংবা ছলনার আশ্রয় নেবেন না। আমি শুধু সত্যিটা জানতে চাই।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here