ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫১
রিক্তা ইসলাম মায়া
রাত বারোটার ঘরে। অসহ্য মাথা ব্যথায় নূরজাহানের চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। শরীর টলমল করছে দুর্বলতায়। তারপরও নূরজাহান রেস্ট নিতে পারছে না। আজ শুক্রবার। আফিয়ার বিয়ে ছিল। বরযাত্রী বিদায় হয়েছে সেই সন্ধ্যায় কিন্তু সৈয়দ বাড়িতে মেহমানের আনাগোনা শেষ করতে করতে এখন রাত বারোটার ঘরে। মেয়ের জন্য ফাতেমা কাঁদতে কাঁদতে এখন ঘুমোচ্ছে। সুফিয়া মায়ের সঙ্গেই আছে।সেদিনের ঘটনার পর আজ পাঁচদিন হয়েছে সালমা নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলে না। নূরজাহানের হাতে খাবার খায় না। ঘর থেকে বেরোয় না। আজ আফিয়ার বিয়ে হওয়ায় সারাদিন সালমা বাড়ির মেয়ের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
বাইরে মানুষদের বুঝতে দেয়নি তিনি ছেলের বউয়ের প্রতি নারাজ। বরযাত্রী বিদায় হতে তিনিও ঘরে চলে যান। সৈয়দ শাহর আত্মীয়স্বজন, বংশধরের অধিকাংশ ঢাকা অধিবাসী হওয়ায় তাঁরা বেশ রাত করেই বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। মারিদকে সেই সন্ধ্যায় বরযাত্রীর সঙ্গে আফিয়াকে বিদায়ের বেলা দেখেছিল নূরজাহান তারপর আর খোঁজ নেই। রাদিল হীরা চৌধুরীকে নিয়ে রাত নয়টার দিকেই বাড়ি ফিরে যায় বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে। রিফাতের বাবা-মা সকলে সৈয়দ বাড়িতেই উপস্থিত। বেশ কয়েকদিন থাকবে ওরা। তনিমা আফিয়ার বিয়েতে এসেছিল নিজের বাবা-মার সঙ্গে। আফিয়ার বরযাত্রী বিদায়ের পর তাঁরাও চলে যায়। তনিমার মেডিকেলের পরীক্ষা এই সপ্তাহ থেকে তাই তনিমাকে বিয়ে বাড়িতে থাকতে নিষেধ করেছিল রিফাত।
রিফাত মারিদ দুজনেই বাড়িতে নেই। আফিয়ার সঙ্গে ওর শশুর বাড়িতে গিয়েছে। আফিয়ার বিয়ের জন্য সৈয়দ বাড়িতে কাজের লোক রাখা হয়েছে তিনজন এক্সট্রা। নূরজাহান তাদের রেস্ট নিতে বলে। রেণু রোজিনা দুজন নূরজাহানের সঙ্গে রান্নাঘরে হাতে হাতে কাজ করছে। রোজিনা ষোলো বছরের মেয়ে হওয়ায় সে সবকিছুতে কথা বলে না, ভয় পায়। রেণুর বয়স পয়তাল্লিশের ঊর্ধ্বে। সে প্রায় দশ বছর ধরে সৈয়দ বাড়িতে কাজ করছে। সালমার বিশ্বস্ত কাজের লোক। রোজিনাকে রেণুই সৈয়দ বাড়িতে কাজে এনেছে। সালমার বিশ্বস্ত লোক হওয়ায় রেণু দাপট দেখায় বেশি। এই যে সালমা নূরজাহানকে দেখতে পারে না, যখন তখন কথা শোনায়, এই সুযোগটা রেণুও নিতে চায় নূরজাহানের সাথে। নূরজাহান একটা কাজ দিলে রেণু করতে চায় না। নূরজাহানের কথা শোনে না, সরাসরি উপেক্ষা করে চলে।
নূরজাহানকে আবার অজুহাত দেয় রেণুকে এই বাড়িতে কাজে রেখেছে সালমা। রেণু কথা শুনলে সালমারই শুনবে। নূরজাহান বোঝে রেণু সালমার নারাজির সুযোগ নিয়ে অসৎ ব্যবহার করছে। নূরজাহান রেণুর সঙ্গে তর্কে যায় না। রোজিনাকে নিয়ে কাজ করে সারাদিন। এই যে এতরাত অবধি নূরজাহান রোজিনাকে নিয়ে কাজ করছে, মাথা ব্যথা আর শরীরে দুর্বলতা নিয়ে এতোসব কাজে রেণুকে খুব কমই পাওয়া যাচ্ছে। রেণু মর্জি মতো একটা কাজ করলে আরেকটা কাজ ফেলে রাখে নূরজাহানের জন্য। করতে চায় না। আবার রোজিনা নূরজাহানের সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করলে রোজিনাকেও অগোচরে খোঁচা দিয়ে বলে এত কাজ না করতে। নূরজাহানের জন্য ফেলে রাখতে।
রোজিনা সহজ সরল মেয়ে, সে রেণুর এত মারপ্যাঁচ বোঝে না। নূরজাহান ভাবিকে তার অনেক ভালো লাগে সেজন্য রোজিনা সবসময় নূরজাহানের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে। রাতে মেহমানদের থালাবাসনের এঁটো প্লেট জমেছে বেশ বেসিনে। নূরজাহান সৈয়দ শাহর জন্য গরম পানি ফ্লাস্কে ভরে রাখছে। রাতে সৈয়দ শাহ কুসুম গরম পানি পান করেন। শান্তার কোমরে ব্যথা সেজন্য রোজিনা তেল মালিশ করতে গেছে। রেণু পান খাওয়ার বাহানা দিয়ে সেই যে মেঝেতে বসে পান চিবোচ্ছে, ঘণ্টা খানিকের বেশি সময় হয়েছে। উঠছে না। নূরজাহান অসুস্থ শরীরে দাঁতে দাঁত পিষে কাজ করছে একের পর এক। মাঝে দুই একবার রেণুকে ডেকেছে বেসিনের থালাবাসনগুলো ধুয়ে দিতে, রেণু না শোনার মতো করে ওঠে নি। নূরজাহান ফ্লাস্কে গরম পানি ভরে সেটা রেণুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
‘এটা দাদাভাইয়ের ঘরে দিয়ে আসুন খালা। আমার শরীরটা অসুস্থ লাগছে, আপনি কষ্ট করে একটু থালাবাসনগুলোও ধুয়ে দিয়ে শুয়ে পড়বেন। এরপর আর কাজ নেই।
‘আমার মাজায় বাতের বিষ করতাছে, আমি এহোন সিঁড়ি বইয়া ফ্লাস্ক লইয়া উপরে উঠবার পারুম না। এই থালাবাসন গুলাও এহোন ধুইবার পারুম না। শরীর মেলা ক্লান্ত, আমি এহোন ঘুমামু।
নূরজাহান কণ্ঠে নমনীয়তা নিয়ে বলে…
‘এঁটো থালাবাসন সারারাত বেসিনে থাকলে তেলাপোকা উঠতে পারে খালা। আপনি তো জানেন আম্মুর এসব পছন্দ না। আম্মার কর্ড়াভাবে নিষেধ করেছেন রাতে কখনো যেন এঁটো থালাবাসন বেসিনে ফেলে না রাখি। আজ ফেলে রাখলে আম্মু রাগ করবে খালা।
‘বড় ম্যাডাম আমার উৎরে কহনো রাগ করব না। আমি হেরে ধোঁকা দিইয়া ছলনা কইরা এই বাইত্তে আইয়া ঠায় লই নাই যে রাগ করব। থালাবাসুন তোমার মন চাইলে নিজে গিয়া ধুইও আমারে কইও না। আমি বড় ম্যাডামের বিশ্বস্ত লোক। তোমার আগে আইছি এই বাইত্তে।
নূরজাহান থমথমে খেয়ে যায় রেণুর কথায়। কাজের মানুষ হয়ে রেণু যে নূরজাহানকে এইভাবে খোঁচা দিয়ে অপমান করে কথা বলবে নূরজাহান বুঝতে পারেনি। এখানে নূরজাহান কিছু বলবে তার আগেই ককর্শ আর তেজি ক্ষুদ্ধ কন্ঠে সালমা প্রতিবাদ করে বলে উঠে….
‘তুই আগে এসেছিস তো কি হয়েছে রেণু? তোর মর্যাদা কি আমার ছেলের বউয়ের থেকে বেশি হয়ে গেছে? তুই এই বাড়ির বান্দির। আর নূরজাহান এই বাড়ির বউ, তোর সাথে আমার বউয়ের সম্মান যায়? তোরে টাকা দিয়ে এই বাড়িতে বান্দি রাখছি আমার বউয়ের উপরে মাতব্বরি করার জন্য?
হঠাৎ সালমার উপস্থিতিতে রেণু নূরজাহান দুজন চমকে ওঠে। রেণু বসা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে বলে…
‘আমি নূরজাহান ভাবিরে কিছু কই নাই বড় ম্যাডাম।
‘তুই আমার বাড়ির বউকে কিছু বলার কে? কাজের মানুষ কাজের মানুষের মতো থাকবি, জমিদারি দেখালে আমার বাড়ির থেকে বেরিয়ে যাবি। আর আমি তোর বড় ম্যাডাম হলে আমার ছেলের বউ তোর ভাবী হয় কিভাবে? আমি বড় ম্যাডাম হলে আমার ছেলের বউ তোর ছোট ম্যাডাম। আর তুমি তুমি নয়, আপনি করে সম্মান দিয়ে তারপর কথা বলবি। আমি আমার ছেলের বউকে মারব, কাটব, শাসন করব, যা মন চায় করব এতে তুই বলার কে?
তুই কাজের বেটি হয়ে কোন সাহসে মালিকের বউকে কথা শোনাস? তোর খায় আমার বউ? ভালো না লাগলে কালই নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে বেতন নিয়ে চলে যাবি। তোর মতো বেয়াদব কাজের মহিলা দরকার পরবে না আমার।
রেণু দৌড়ে গিয়ে সালমার পায়ে পড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এত বছর ধরে সৈয়দ বাড়িতে কাজ করে নিজের সংসার চালাচ্ছে। এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে সে না খেয়ে মরবে। সৈয়দ বাড়ির মতো এত ভালো বেতনের চাকরি সে আর পাবে না। এখানে কাজ কম করলেও চলে। কিন্তু অন্যান্য বাসায় কাজ করার সময় মালিক বেটি সারাদিন রেণুকে দিয়ে কাজ করাতো, বেতনও কম দিতো। আবার কাজে ভুল করলে গালি-গালাজও করে। এখানে এমন কিছুই নেই। সালমার মন মতো চললেই হয় বাকি প্যারা নেই। বেতন বেশি, কাজ কম। সালমা হাতে পানির মগ নিয়ে নিচে এসেছিল ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিতে, কিচেনের মুখোমুখি হতেই শুনতে পায় নূরজাহানের সঙ্গে রেণুর দুর্ব্যবহারের কথাগুলো। সালমা রেণুর থেকে পা ছাড়িয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল নিতে নিতে বলে…
‘যার সাথে বেয়াদবি করেছিস তার কাছে মাফ চ্যা। সে মাফ করলে তোর এই বাড়িতে ঠাঁই হবে নয়তো সকালে ঘুম থেকে উঠে তোকে যেন না দেখি।
সালমার কথা শেষ হতে দেরি, রেণু মুহূর্তে নূরজাহানের পায়ে লুটিয়ে কান্নাকাটি করে মাফ চাইতে দেরি হয়নি। নূরজাহান বারবার রেণুকে পায়ে হাত দিতে নিষেধ করছে আর বলছে, সে রেণুকে মাফ করে দিয়েছে। তারপরও রেণু নূরজাহানের পা ছাড়ছে না। সালমা ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে চলে যাচ্ছে। নূরজাহান শাশুড়ি চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে। নূরজাহানের এই বাড়িতে আসার এতদিনে নূরজাহান একটা জিনিস বেশ বুঝেছে, সালমা নিজে যেমনই হোক না কেন সে কখনো বাইরের মানুষকে প্রশ্রয় দেয় না নিজের ঘরের বউদের সরদারি করতে। সালমা নিজে এটা সেটা বলে কথা শোনায় কিন্তু বাইরে মানুষকে কিন্তু বলতে দেয়না। আজকে বিয়ে বাড়িতেও, আত্মীয়স্বজনরা বেশ কয়েকবার নূরজাহানের বিয়েতে হাসান কি দিয়েছে সেই প্রসঙ্গে কথা তুললে সালমা সেটা প্রশ্রয় দেয়নি কাউকে। বরং কথাটা এড়িয়ে গেছে।
সালমার কথা শুনে রেণু কাঁদছে আর থালাবাসন ধুয়ে রাখছে। নূরজাহানের প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে, ঘরে এসে বেসিনে বমি করতে করতে আরও ক্লান্ত হয়ে যায়। নূরজাহান বুঝতে পারছে না আসলে ওর কি হয়েছে। হঠাৎ করে কেন এতো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় মনে হয় নূরজাহানের মাথা ফেটে যাচ্ছে, সে আর বাঁচবে না। নূরজাহান ক্লান্তি শেষে বিছানায় শুতেই ঘুমিয়ে যায়। মারিদ রাত দুটোর দিকে ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে। নূরজাহান তখন পাশ ফিরে ঘুমিয়ে। নূরজাহানকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে মারিদ ঘরের আলো জ্বালায়নি। ড্রিম লাইটের আলোয় ফ্রেশ হয়। বিয়ের দৌড়াদৌড়িতে সেও ক্লান্ত। আফিয়াকে ওর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে ফিরে আসতে আসতে মারিদ রিফাতের এতটা লেট হয়েছে। মারিদ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে নূরজাহানের পিঠের দিকে তাকায়। নূরজাহান গভীর ঘুমের মাঝেই কি যেন বিড়বিড় করছে। মারিদ মাথা নুইয়ে নূরজাহানের মুখের কাছে কান রাখতে শুনতে পায় অস্পষ্ট কিছু ধ্বনি…
‘আম্মার রক্ত! রক্ত! আম্মা বাঁচাও। লাশ! লাশ!
নূরজাহান ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি দিয়ে ওঠে। মারিদ দুহাতে টেনে নূরজাহানকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। বুঝতে পারে নূরজাহান ঘুমে আবারও বাজে কোনো স্বপ্ন দেখছে তাই এমন করছে। মারিদ নূরজাহানকে জড়িয়ে ব্যস্ত গলায় ডাকে…
‘পরী? এই পরী? কি হয়েছে তোমার? এই মেয়ে? এই! উঠো! পরী?
নূরজাহানের শরীর ঝাঁকিয়ে মারিদের ডাকে ঘুম ভেঙে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে শরীরের দরদর করে ঘাম ছুটে যায় মুহূর্তে। নূরজাহান মারিদকে দুহাতে আঁকড়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে নিজের অবস্থান লক্ষ করে। মারিদ তখনো নূরজাহানকে ডাকছে…
‘এই মেয়ে? এই? কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন? এই পরী?
‘হুম?
‘কি হয়েছে তোমার? দুঃস্বপ্ন দেখছিলে?
আবছা আলোয় নূরজাহান মারিদকে দেখে তৎক্ষনাৎ জড়িয়ে ধরে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে…
‘ আপনি এসেছেন? আমি আম্মাকে স্বপ্নে দেখছি। স্বপ্নে আম্মা আমাকে কতগুলো সাদা কাপড় দিয়েছে, আমি সেই সাদা কাপড়গুলো নিয়ে আমাদের বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের বাড়ির চারদিকে লাশ আর লাশ শুয়ে। অনেক মানুষ কান্নাকাটি করছে, কিন্তু আমি কাউকে চিনি না সবাই অপরিচিত মুখ। আম্মা আমাদের উঠানে লাশের সামনে বসে কাঁদছে। আম্মার গায়ের সাদা শাড়ি থেকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে চারদিকে। আমি ভয়ে চিৎকার করছিলাম কিন্তু আমাদের বাড়ির কাউকে খোঁজে পাচ্ছিলাম না স্বপ্নে।
মারিদ আতঙ্কিত নূরজাহানের কপালে মাথায় চুমু খেয়ে নূরজাহানকে শান্ত করতে চেয়ে বলে…
‘ তুমি দুঃস্বপ্ন দেখছিলে আর স্বপ্নের কোনো বাস্তবতা নেই। ভয় পেও না, সবাই ঠিক আছে। শান্ত হও তুমি।
মারিদ নূরজাহানকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে। ভয়ে নূরজাহানের শরীর তখনো তিরতির করে কাঁপছিল। নূরজাহান স্বপ্নে আয়েশাকে দেখেছে রক্তমাখা শরীরে লাশের সামনে বসে কাঁদছে। আয়েশা কাদের লাশের সামনে বসে ঐভাবে কাঁদছিল নূরজাহান জানে না। কিন্তু স্বপ্নে এতো মানুষের লাশ দেখে ভয় পেয়েছে ভীষণ। মারিদ নূরজাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে…
‘পানি খাবে?
‘না।
‘এখনো ভয় লাগছে?
‘হুম।
‘ভয় পেও না। আমি আছি তোমার পাশে। ঘুমাও।
ভয়ার্ত নূরজাহান মারিদের প্রশ্রয় পেয়ে মারিদের বুকে সাঁটিয়ে গিয়ে বলে…
‘ঘুম আসছে না।’
‘শরীর খারাপ লাগছে?
‘না।
নূরজাহান ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। মারিদ নূরজাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে…
‘তোমার আব্বা ফোন দিয়েছিল, বলল তোমাকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যেতে। তোমার সাজিদ ভাইয়ের বিয়ের ঠিক হয়েছে নাকি সামনের শুক্রবারে?
আজ আফিয়ার বিয়ে ছিল অথচ থানচি থেকে কেউ আসেনি। সালমা নূরজাহানের বাড়িতে ফোন দিয়ে সেদিন যাতা বলেছিল হাসান তারানূরকে মানিক সৈয়দ বাড়িতে হামলা করায়। এই নিয়ে অপমানে নূরজাহানদের বাড়ি থেকে কেউ আসেনি। ব্যাপার মারিদ জানে না। নূরজাহান হাসানকে বলেছে মারিদকে না জানাতে। মারিদ জানলে আবার মায়ের সাথে রাগারাগি করবে সংসারে অশান্তি হবে। নূরজাহান চাই না ওর জন্য সংসারে আর কোনো অশান্তি হোক। মারিদকে হাসান না আসার কারণ হিসাবে হাসান বলেছে, সাজিদের বিয়ের জন্য তিনি দৌড়াদৌড়ি করছে বিদায় আসতে পারেনি। নূরজাহান মারিদের বুক থেকে মাথা তুলে মুখোমুখি বিছানায় বসে বলে…
‘হুম, আব্বা দাদী আমাকে ফোন দিয়েছিল কাল। সাজিদ ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান নাকি তেমন বড় করে হবে না ঘরোয়া বিয়ে হবে আরকি। আশনূর বুবুর বিয়েও এই মাসেই ঠিক হয়েছে। দুটো বিয়ে একই মাসে হবে সেজন্য আব্বা সাজিদ ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করবে না বলল। একেবারে বড় করে আশনূর বুবুর বিয়ের অনুষ্ঠান করবে নাকি।
‘একই মাসে দুটো বিয়ে? তোমার যে সোমবার থেকে এক্সাম। বিয়ে বাড়িতে পড়াশোনা করবে কিভাবে?
‘সমস্যা নেই। আমি ম্যানেজ করে নিব। কিন্তু মানিক ভাই…
নূরজাহানের বাকি কথা শেষ করার আগেই মারিদ বাকিটা বুঝে নিয়ে বলে…
‘ মানিক সওদাগর ও তার পরিবার আর কোনো ঝামেলা করতে পারবে না। মানিক সওদাগকে তার লোকজনসহ সবাইকে গুলশান থানায় রাখা হয়েছে। সামনের সপ্তাহে সবাইকে আদালতে তোলা হবে, আদালতে রায় যাই আসুক মানিক সওদাগরের জেল গুলশান থানাতেই হবে। বাকি মানিক সওদাগরের পরিবারের বিরুদ্ধে আমি থানচি সদর থানায় দুটো মামলা করে রেখেছি তোমার নিরাপত্তার জন্য। তুমি যতদিন থানচিতে থেকে পরীক্ষা দিবে ততদিন থানচির পুলিশ প্রশাসন তোমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিবে। আমি কাল তোমার সাথে থানচিতে যেতে পারব না আমার কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্টের কিছু জরুরি কাজ আছে সেখানে থাকতে হবে। তবে আমি শুক্রবারে সাজিদ ভাইয়ের বিয়েতে অবশ্যই উপস্থিত থাকব ইনশাআল্লাহ। তোমার বাকি পরীক্ষা শেষ না হওয়ায় পযন্ত তোমার সাথে থানচিতে থাকব। পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে তোমাকে নিয়ে ঢাকা ফিরে আসব।
‘আচ্ছা।
নূরজাহান আর দ্বিরুক্তি করলো না। শুধু এগিয়ে এসে মারিদকে জড়িয়ে বুকে মাথা রাখে। মারিদ নূরজাহানের মাথায় হাত রেখে বলে…
‘বেশ কয়েকদিন ধরে দেখছি তোমাকে কেমন অসুস্থ দেখাচ্ছে। সত্যি করে বলো তো কি হয়েছে তোমার?
নূরজাহান মারিদকে জড়িয়ে লজ্জায় বলে…
‘আমি অভাবে অসুস্থ ।
‘তোমার কিসের অভাব?
‘আপনার।
মারিদ দুষ্টু হাসে। নূরজাহানকে শক্ত করে জড়িয়ে বালিশে শুয়ে পড়ে। নূরজাহানের কোমর পেঁচিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়। গলায় নাক ঘষে মোহাচ্ছন্ন গলায় বলে…
‘ এসো তোমার অভাব দূর করি।
নূরজাহান ঢাকায় নেই। থানচিতে পরীক্ষা দিতে গেছে আজ দু’দিন হয়েছে। তনিমারও মেডিকেলে পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা চলাকালীন ঝামেলায় রিফাত তনিমাকে পড়ানোর সময় পাচ্ছে না। রিফাত যখন ফ্রি হয় তখন সময় প্রায়ই বিকেল। মেডিকেলের পরীক্ষায় স্যারদের গাইডলাইন পেলে পড়তে সহজ হয়। তনিমার প্রথম পরীক্ষাটা মোটামুটি ভালোই হয়েছে। আশানুরূপ ভালো হয়নি। রিফাত ফোনে তনিমার কথা শোনে, সে মধ্যরাতেই ঝড়বৃষ্টির মাঝে শ্বশুরবাড়িতে উপস্থিত হয়। তনিমা রিফাতের আসার খবর পেয়ে দৌড়ে বসার ঘরে এসে রিফাতকে দেখে অবাক। তনিমার মা হাফেজা প্রথমবার মেয়ের জামাই আসায় সেকি ব্যস্ততা উনার। দৌড়ে রিফাতকে তোয়ালে এনে দিয়েছেন মাথা মুছতে। রিফাত মাথা মুছতে মুছতে জাবেদ শেখের সঙ্গে সোফায় বসে কথা বলছেন। হাফেজা তনিমাকে এটা-সেটা বলে দোষ দিচ্ছে।
মেয়ের জামাই আসবে সেটা হাফেজাকে আগে কেন জানাল না? তাহলে উনি পছন্দ মতো রান্না করতে পারতেন নতুন জামাইয়ের জন্য। তনিমা হতাশ চোখে মায়ের ব্যস্ততা দেখে। হাফেজার ছেলের বউটাও বাড়িতে নেই। বাপের বাড়ি গেছে বেশ কয়েকদিন হলো। হাফেজা তনিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধমক দেয়। বলে রিফাতকে চা নাস্তা দিতে। রিফাত বেশ মিষ্টি খেতে পছন্দ করে। কিন্তু সে ডাক্তার হওয়ায় স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য মিষ্টি কম খায়। তনিমা রিফাত ও জাবেদ শেখের জন্য কম চিনি দিয়ে দুধ চা বানিয়ে সোফার টেবিলের উপর রাখতে চোখাচোখি হয় রিফাতের সঙ্গে। রিফাত এক পলক তনিমাকে দেখে। তনিমা বাসার কাপড় পরে আছে, পরনে ঢোলা গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরা। চুলগুলো সব উপরে ঝুঁটি বাঁধা। গলায় একটা স্কার্ফ জড়িয়ে। রিফাত তনিমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জাবেদ শেখের সঙ্গে কথায় মগ্ন হয়। হাফেজা ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফলমূল কেটে নিয়ে আসেন রিফাতের জন্য। তনিমা খালি চা নিয়ে আসায় মেয়ের দিকে চোখ লাল করেও তাকালে রিফাত ব্যাপারটা বুঝে বলে…
‘আন্টি অযথা ব্যস্ত হবেন না। আমি রাতে খাবার খেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। তনিমার ফোন পেয়ে সাথে সাথে বের হয়ে গেছিলাম তাই আপনাদের জানাতে পারিনি যে আমি আসব। আপনি অযথা রান্নাবান্নার ঝামেলা করবেন না আন্টি।
‘সেকি বাবা, তুমি খেয়ে আসলে কেন? শ্বশুরবাড়িতে আসলে কি মানুষ খেয়ে আসে? কষ্ট পেলাম তোমার কথায়।
‘আসলে আন্টি আমি যে এখানে আসব তেমন প্ল্যানিং ছিল না। তনিমার পরীক্ষা চলছে সেজন্য হুট করে চলে আসলাম। তনিমার যতদিন পরীক্ষা চলবে ততদিন হুটহাট এইভাবে চলে আসব আপনাদের জ্বালাতে।
‘এইভাবে কথা বলছ কেন বাবা? তুমি কি আমাদের পর? আমার তনিমা যেমন তুমিও আমাদের কাছে তেমনই সন্তানের মতো। এটা তোমারও বাড়ি। তুমি আসলে আমরা বরং খুশিই হবো বাবা।
হাফেজার জোড়াজুড়িতে রিফাতকে আবারও খেতে হলো। রাত তখন একটার ঘরে। এসেছিল তনিমাকে পড়াবে বলে অথচ শ্বশুরবাড়ির জামাই আদরে সে সুযোগই পাচ্ছে না তনিমাকে পড়াশোনার। যদিও কাল পরীক্ষা নেই, দুই দিন গ্যাপে গ্যাপে তনিমার পরীক্ষাগুলো হচ্ছে। তারপরও রিফাত ঠিক করল আজ রাত বেশ অবধি তনিমাকে পড়াবে আর কাল থেকে সে সন্ধ্যার দিকে চলে আসবে এখানে। হাফেজা রিফাতকে তনিমার রুমে থাকতে দেয়। রিফাত তনিমার ছোট রুমটার দিকে চোখ বোলায়। একটা কাঠের খাট, পড়ার টেবিল, ওয়ারড্রব, আর একটা ড্রেসিং টেবিল। ব্যস এটুকুই। ছোট রুমটা বেশ গুছানোই। রিফাতের পিছন পিছন তনিমা ছোট ফ্লাস্কে করে দুধ চা আর দুটো কফির মগ আনে। সেগুলো পড়ার টেবিলের উপর রাখতে রাখতে রিফাতকে বলে…
‘আপনি কি শুয়ে পড়বেন?’
রিফাত ঘুরে তাকায় তনিমার দিকে। তনিমার পরে থাকা গেঞ্জি ট্রাউজারগুলো তার বেশ চোখে লাগছে । রিফাত এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে পড়ার টেবিলে বসে বলে…
‘ মধ্যরাতে বৃষ্টিতে ভিজে এসেছি ঘুমানোর জন্য? পড়তে বসো।
‘এতো রাতে পড়াবেন?
‘মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য রাত দিন নাই। সবসময় পড়তে হয়।
তনিমা কথা না বাড়িয়ে পড়তে বসে। রিফাত প্রয়োজনীয় টপিক দাগিয়ে দেয় পড়তে। তনিমা সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। তনিমার একটা বদঅভ্যাস আছে সে পড়তে বসলে পা নাড়ায়। রিফাত এই কয়েকদিনে বেশ রপ্ত করেছে তনিমাকে। সবসময়ের মতো আজ রিফাত নিজের পা সরিয়ে নিল না। তনিমার পা ঘেঁষাঘেঁষি করেই রাখল। তনিমা পা নাড়াচ্ছে আর সে পা রিফাতের পায়ের সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে। একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা তনিমাকে পড়ায় রিফাত। রিফাত উঠে বিছানার কাছে যায়। তনিমা বই খাতা গুছিয়ে রিফাতকে বলে…
‘আপনি ফ্রেশ হবেন? আব্বার লুঙ্গি আনব?
রিফাত পিছন ঘুরে তনিমার দিকে ভ্রু বাকিয়ে বলে..
‘ তুমি আমাকে কখনো লুঙ্গি পরা দেখেছ? যে আজ পরব?
‘আমি কিভাবে বলব আপনি লুঙ্গি পরেন কিনা, আমি কি কখনো আপনার সাথে থেকেছি যে জানব?
রিফাত যে অনুযায়ী প্রশ্নটা করেছে তনিমা সেই অনুযায়ী রিফাতকে উত্তরটা দেয়। রিফাত তনিমার মাঝে গভীর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও দুজনের মাঝে একটা সুসম্পর্ক আছে। নির্দ্বিধায় কথা বলার মতো সুসম্পর্ক যাকে বলে। রিফাত নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে বলে…
‘আমি লুঙ্গি পরতে পারি না। অসুবিধা লাগে। এসব কাপড়ে আমি অভ্যস্ত নই।
‘কি বলেন লুঙ্গি পরতে পারেন না? ছেলে মানুষ হয়ে লুঙ্গি পরতে না পারলে হবে? আমার আব্বা তো সবসময় লুঙ্গি পরেই থাকে। আজকে আপনি ট্রাই করেন দেখবেন আস্তে আস্তে শিখে যাবেন। আনব লুঙ্গি?
রিফাত খানিক চুপ থেকে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে বলে…
‘রাতে কি তুমি আমার সাথে ঘুমাবে?
তনিমা মজার ছলে উত্তর দিয়ে বলে…
‘আমি আপনার সাথে না আপনি আমার সাথে ঘুমাবেন স্যার। এটা আমার রুম। বিছানা যেহেতু একটাই তাই আপাতত স্যারকে ছাত্রীর সঙ্গেই ঘুমাতে হবে। তবে আপনি চাইলে আমার আব্বার সাথেও ঘুমাতে পারবেন।
জাবেদ শেখের সঙ্গে ঘুমানোর বিষয়টা রিফাত এরিয়ে গিয়ে বলে..
‘লুঙ্গি আমি পরলে তুমি রিস্ক নিতে পারবে?
তনিমা রিফাতের কথাটা অর্থ তৎক্ষণাৎ বুঝতে না পেরে পুনরায় জিজ্ঞেস করে…
‘লুঙ্গির সাথে রিস্ক কিসের?
রিফাত সরাসরি স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে..
‘আমি লুঙ্গি পরে ঘুমালে সকালে খুঁজে পাই না।’
‘কেন? কোথায় যায়?
অবাক হয়ে তনিমা পাল্টা প্রশ্নটা রিফাতকে করে।
রিফাত থমথমে মুখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তনিমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তনিমা প্রথমে রিফাতের কথাটা বুঝতে পারেনি কিন্তু কয়েক সেকেন্ড যেতেই লজ্জায় অস্বস্তিতে মাথা নুইয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রিফাত তনিমাকে লজ্জা পেতে দেখে হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে বিছানার এক পাশে গিয়ে বসে। বিছানায় বসতে রিফাতের হাসি থেমে যায়। বিছানাটা খানিকটা শক্ত টাইপের। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খাটটা বেশ বড় নয়, মাঝারি সাইজের। দুজন মানুষ ঘুমানো যাবে তবে মাঝে জায়গা থাকবে না দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। পাশাপাশি দুটো মানুষকে এই খাটটি খুব কাছে নিয়ে আসবে। রিফাত কয়েক মিনিট তনিমার অপেক্ষা করে তনিমাকে আসতে না দেখে সে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। রাত প্রায় তিনটার ঘরে। কাল যদিও কলেজে পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো ব্যস্ততা নেই তারপরও কাল কলেজে যেতে হবে রিফাতকে। রিফাত শুয়ে পড়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। নতুন জায়গা হওয়ায় তার ঘুম আসছে না। তনিমা অনেকটা সময় দেরি করে ঘরে ঢুকে। রিফাত ঘুমিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। রিফাতের নড়াচড়া কিংবা শব্দ না পেয়ে তনিমা আস্তে ধীরে ঘরে ঢুকে দরজা লাগায়। তখনকার ব্যাপারটা নিয়ে তনিমা লজ্জা পেয়েছে সেজন্য সে ইচ্ছাকৃতভাবেই দেরি করে ঘরে আসে। ঘরের লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইটের আলো জ্বালিয়ে রিফাতের পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে পড়ে। দুজনের মাঝে তেমন দূরত্ব নেই তারপরও তনিমা উঁকি মেরে দেখে রিফাত ঘুমিয়েছে কিনা। তনিমা রিফাতের মুখের সামনে উঁকি মারতে গিয়ে রিফাত চোখ মেলে তাকিয়ে বলে…
‘কি ব্যাপার কি দেখছো?
তনিমা ধড়ফড়িয়ে উঠে বিছানায় নিজের পাশে সরে গিয়ে বুকে থুথু ছিটিয়ে বলে…
‘আল্লাহ আপনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।
রিফাত কথা বলে না। কাত হয়ে তনিমার মুখোমুখি শুয়ে পড়ে। দৃষ্টি তনিমার দিকে তাকিয়ে। অন্ধকারের মাঝে তনিমা রিফাতের ঘোলাটে দৃষ্টির ঠাহর করতে না পেরে বলে…
‘ঘুমাননি কেন?
‘জায়গা পরিবর্তন হলে আমার ঘুম আসে না।
‘আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই? তাহলে দেখবেন ঘুম চলে আসবে।
তনিমার নিঃসংকোচ আবদারে রিফাতের মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সে চুপ করে শুয়ে। রিফাতের নীরবতাকে সম্মতি ধরে তনিমা উঠে বসে। রিফাতের পাশে সরে এসে রিফাতের মাথায় হাত দিয়ে বলে…
‘আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আপনি ঘুমান।
নিস্তব্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যরাতে তনিমা রিফাতের মাথা ঘেঁষে বসাতে তনিমার মেয়েলি ঘ্রাণটা বেশ কড়াভাবে নাকে বাড়ি খাচ্ছে রিফাতের। দুজনেই স্বামী-স্ত্রী। দুজনের মাঝে ঘোষণা করে প্রেম না থাকলেও সুসম্পর্ক আছে। পবিত্র একটা বন্ধন আছে। সেই পবিত্র বন্ধনের টানে রিফাতের মাঝে নিষিদ্ধ চাওয়া মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বারবার। এই প্রথম রিফাত তনিমার সঙ্গে রুম শেয়ার করে একই বিছানায় ঘুমাচ্ছে। তনিমার সঙ্গে থাকা রাতটা এমন কঠিন হবে রিফাতের জন্য সেটা আগে জানলে, রিফাত কখনোই এখানে আসতো না। এখানে আসার আগে রিফাত বুঝতে পারেনি সে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়বে। রিফাত জোরপূর্বক ঘুমানোর চেষ্টা করে কিন্তু ঘুম ধরা দিচ্ছে না। তনিমা রিফাতের কাছাকাছি থাকায় রিফাতের আরও সমস্যা হচ্ছে। ভিতরে অস্থিরতা কাজ করছে। রিফাত তনিমার
হাতটা মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে…
‘মাথায় হাত দিতে হবে না, যাও গিয়ে ঘুমাও।
তনিমা রিফাতের অস্থিরতাটা বুঝতে না পেরে পুনরায় রিফাতের মাথায় হাত দিয়ে বলে…
‘ আরেহ আপনার ভালো লাগবে, আমি আরেকটু হাত বুলিয়ে দিই?
‘নো নিড।
রিফাত ঝাঁড়া দিয়ে তনিমার হাতটা কপাল থেকে সরিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। রিফাতের হঠাৎ আচরণে তনিমার মনে হলো রিফাত হয়তো কোনো কিছু নিয়ে রেগে আছে। তনিমা অবাক হয়। রিফাত আসলেই রেগে আছে কিনা জানতে চেয়ে রিফাতের পাশ ঘেঁষে পুনরায় বসে রিফাতের বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরাতে চেয়ে বলে…
‘ এই যে শুনুন? আপনি কি কোনো কিছু নিয়ে রেগে আছেন আমার উপর?
তনিমা গায়ে হাত দেওয়ায় রিফাত রেগে যায়। ধমক দিয়ে তনিমাকে বলে…
‘ঘুমাতে বলছি না? গায়ে হাত দিচ্ছ কেন স্টুপিড?
রিফাতের ধমকে তনিমা অপমান বোধ করে। থমথমে মুখে রিফাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। মুহূর্তে চোখ টলমল করে ওঠে পানিতে। তনিমা শুধু রিফাতকে কমফোর্টেবল ফিল করাতে চাচ্ছে এই রুমে সেজন্য আগ বাড়িয়ে রিফাতের সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু রিফাত হঠাৎ করে কেন তনিমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে বুঝতে পারছে না। রিফাত তনিমাকে ধমক দিয়ে ফের ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। তনিমা রিফাতকে পিঠ দিয়ে বিছানার নিজের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তনিমা কাঁদছে, সেই নাক টানার শব্দ রিফাত পাচ্ছে। তনিমা কান্নামিশ্রিত ভাঙা গলায় বলে…
‘আপনার আর আমাদের বাসায় আসতে হবে না। আমার পড়া আমি একাই বুঝে নিতে পারব।
রিফাত উত্তর দেয় না। তনিমা কাঁদতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর তনিমা ফের নাক টেনে কেঁদে কেঁদে বলে…
‘আমি সামান্য ছুঁয়েছি বলে আপনার ঘৃণা লেগে গেল? আমার শরীরে কি নোংরা লেগে আছে? যে আমি ছুলে আপনি নোংরা হয়ে যাবেন? একটু ছুঁয়েছি বলে সেজন্য আমার হাতটা ঝাঁকি দিয়ে ফেলে দিলেন, আবার ধমকও দিচ্ছেন! আমাকে এত ঘৃণা লাগে আপনার?
তনিমা কুঁজো হয়ে শুয়ে কাঁদছিল। হঠাৎ কোমরে টান পড়তে তনিমা ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। রিফাত তনিমার কোমর টেনে দুহাতে তনিমাকে জড়িয়ে ওষ্ঠ চেপে ধরে। তনিমার কান্না থেমেছে কিন্তু নিশ্বাসের অভাবে ছটফট করে উঠতে চাইলে রিফাত আরও জোরালোভাবে তনিমাকে চেপে ধরে উপরে উঠে আসে।
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫০
রিফাত কেন এতক্ষণ ধরে তনিমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল সেটা বুঝতে তনিমার খানিকটা দেরি হয়। যখন বুঝতে পারে তখন রিফাতকে থামানো দায়। তনিমা রিফাতকে বাধা দেয় না। শুরু থেকেই তনিমা রিফাতকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিল এই সম্পর্কে তাই বাঁধা দেওয়াটা বেমানান। রিফাতই এই সম্পর্কটা থেকে এতদিন দূরে ছিল, আজ যখন রিফাত এই সম্পর্কটা গ্রহণ করতে চাচ্ছে তাই তনিমা স্বামীর সঙ্গ দেয়। বাইরে ঝড়বৃষ্টি বেশ। ঘরে গুমোট পরিবেশ।
