Home ডাক্টার ইশতিহার ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৭

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৭

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৭
অনামিকা আহমেদ

মুখের ওপর মোবাইলের তীক্ষ্ণ আলো পড়তেই আদনান ভ্রু কুচকে চোখ বুজে ফেলে। মুখে অসীম বিরক্তির ছাপ পড়তে এক মুহুর্ত দেরি হয় না তার। কিন্তু পরক্ষণেই ইশতিহার এর কন্ঠ কানে আসতেই আদনান ভূত দেখার মতো চমকে উঠে। এটা যে ইশতিহার এর গলার স্বর এ নিয়ে এক চিলতেও সন্দেহ নেই আদনানের, কিন্তু তবুও শেষ বারের মতো নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভয়ে ভয়ে চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় ইশতিহার এর অগ্নিমূর্তি।

আদনান বেশ নাজেহাল অবস্থায় গাছে ঝুলে ছিল। গাছে উঠার অভ্যাস তার নেই, তার ওপর কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টির কারণে ডাল পালা মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে গেছে। তার ওপর আবার এক হাতে নিজের প্রিয়তমার জন্য এক গোছা ফুল মুঠো করে অন্য হাত আর পা দুটোকে কাজে লাগিয়ে গাছের ডাল জাপটে ধরে একপ্রকার ঝুলে ছিল আদনান। আবেগঘন মুহুর্তের শীর্ষ সময়ে ইশতিহার এর কাছে হাতে নাতে ধরা পড়ে আদনানের পাইল চমকে উঠে। তাল সামলাতে না পেরে সে পরে যেতেই নিবে এমন সময়ে ইশতিহার দ্রুত তাকে টেনে উপরে তুলে নেয়।
এতক্ষণে যেনো আদনানের কলিজায় পানি এসেছে। এখন থেকে সোজা নিচে গিয়ে পড়লে যে হাত পা কিছু না কিছু একটা ভাঙত সেটা তার বুঝতে বাকি নাই। অগত্যা ইশতিহার এর দিকে দাঁত কেলিয়ে লজ্জাসূচক হাসি দেওয়া মাত্র ইশতিহার আদনানের কলার চেপে ধরে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলে,

” এত রাতে গাছে উঠে কাকে প্রেম নিবেদন করছিলি? সত্যি করে বল, পেটে কিছু জমিয়ে রাখলে এক্ষুনি তোকে গাছ থেকে ঠেলে ফেলে দিবো।”
” বলছি বলছি, ভাই রাগিস না,তোর বোন ভাবনা কে।”
ভাবনার নাম শুনতেই ইশতিহার এর রাগান্বিত মুখশ্রী শিথিল হয়ে যায়। ধীরে সুস্থে আদনান কে ছেড়ে বাড়ির দোতলায় নজর গেলে দেখতে পায় ভাবনা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করছে। সেই মুহূর্তে ইশতিহার এর সাথে চোখাচোখি হতেই সে দ্রুত মাথা ভেতরে নিয়ে জানালা বন্ধ করে দেয়।
দৃষ্টি আবারো আদনানের দিকে ফেরালে ইশতিহার এর চোখে বেচারার ক্রন্দন প্রায় মুখটা ভেসে উঠে। যে মেয়ের মন গলানোর জন্য আদনান এত কষ্টে শিষ্টে গাছ বেয়ে উঠল, সে কিনা ভাইয়ের ভয়ে জানালা বন্ধ করে দিল। দুঃখের সাথে সামান্য অপমান বোধে তার মুখ টা নিচু হয়ে আসে।

” এসব কতদিন ধরে চলছে?”
আদনান মুখ তুলে চায়। কিন্তু ইশতিহার এর দিকে তাকানোর সাহস হয় না। তাই সে মুখ নামিয়ে মিনমিনে গলায় বলে উঠে,
” এই তো কয়েকদিন, তোকে তো বলেছিলাম তোর বোনকে আমার পছন্দ।”
” গাছে উঠলি কীভাবে? এতদিন তো জানতাম আমার করিৎকর্মা বন্ধুর এই গুণ নেই।”
” ইউটিউবে ভিডিও দেখে।”
ইশতিহার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ইউটিউবে আজকাল অনেক ধরনের ভিডিও দেওয়া হয়, কিন্তু এসব ভন্ডামীর ভিডিও ও যে দেওয়া হয় সেটা জানা ছিল না তার। অবশ্য দিবেই না কেনো? কিছু ভন্ডের তো ভন্ডামি শেখার জন্য ও গুরুর দরকার হয়।
” তোর তো অস্কার পাওয়া উচিত ভাই। তুই এদেশে কেনো? এক কাজ কর, নিচে নেমে দাড়া, আমি তোর পেছনে এমন এক লাথি মারব যে উড়ে গিয়ে আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টি এর মশালের ওপর গিয়ে পড়বি।”
ইশতিহার এর কথাগুলো ঠাট্টার মত শোনালেও আদনান এর ভেতরটা ভেঙে চুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই কথা গায়ে না লাগিয়ে আদনান নির্দ্ধিধায় বলে,
” নিচে নেমে যা ইচ্ছা তাই করিস। কিন্তু প্লীজ আমাকে ধরে নিচে নামা। উপরে উঠার ভিডিও দেখেছিলাম কিন্তু নিচে নামার টা দেখা হয়নি।”

ইশতিহার আদনান এর কথা শুনে হাসবে নাকি কাদবে বুঝতে পারছিল না। কোন গ*র্ধব যে একে ডাক্তারি পাশের সার্টিফিকেট দিয়েছিল তাকে দেখতে ইশতিহার এর খুব ইচ্ছে করে। ডান হাতে নিজের কপাল নিজে চাপড়ে আদনান কে নিয়ে নিচে নামতেই যাবে ঠিক তখনই এখানে দাদি এসে হাজির।
অনেকক্ষণ যাবত আম গাছটা থেকে দুজন মানুষের কথার আওয়াজ ভেসে আসছিল। দাদির ঘরটা ঠিক এর পাশে থাকায় শব্দ শুনে তিনি ভেবেছেন চোর গাছে উঠেছে আম চুরি করার জন্য। গ্রামের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই তা করে থাকে বলে দাদির মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ পর্যন্ত জাগলো না। হাতের কাছে নিজের লম্বা লাঠিটা নিয়ে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি উচু গলায় বলতে শুরু করেন,
” কে রে হা*রামজাদার দল, কে উঠেছিস আমার গাছে? আমের গুটি ধরলেই দল বেঁধে আম চুরি করতে লেগে পরিস। আজ আয় নিচে এই লাঠিটা তদের পিঠে যদি না ভেঙেছি তাহলে আমি নিজের নাম নিজে বদলে দিবো।”
দাদির এমন অগ্নিমূর্তি দেখে কারোর সাহস হয় না নিচে জাইয়ার। বরঞ্চ তারা দুজনে গাছের পাতার আড়ালে চলে যায় গা ঢাকা দেওয়ার জন্য। আদনান তো অতি ভয়ে ইশতিহার কে জাপটে ধরে রেখেছে।
” শা*লা, তোর জন্য আজ আমার এই অবস্থা। আর সময় পেলি না গাছে চড়ার? এখনি চড়তে হলো তোর? এখন কি করে নিচে নামি? আম পেড়ে নামতে দেখলে নির্ঘাত আজ দাদি কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে।”
” আমি নাহয় তোর বোন কে মানানোর জন্য উঠেছি কিন্তু তুই কেনো উঠেছিস গাছে? আমাদের প্রেম পিরিতি দেখার জন্য ?”

” আদনান, মুখ সামলে কথা বল। আমার রুচি এত খারাপ না যে তোর ওই রস কষ হীন কথা শোনার লাভ সামলাতে পর্ব না। তোর ভাবি আম চেয়ে চেয়েছিল তাই উঠেছি।”
” এসব ছাড়, এখন কি করব সেটা আগে বল।”
” দাড়া দাড়া একটা উপায় মাথায় আসছে। আমি যা করবো তুই সেটা নকল করবি, মনে থাকে যেন।”
এই বলে ইশতিহার গলাটা বিকৃত করে বিড়ালের ডাক ডাকতে শুরু করে। আদনান ও তাতে তাল মেলায়। এত রাতে গাছ থেকে বিড়ালের ডাক শুনে দাদি অবাক হয়। নিজ মনেই আওরাতে থাকে,
” বিড়াল ও গাছে চড়ে। কত কী দেখব কালে কালে? আজকাল বিড়াল গুলো ও বানরের মতো গাছে চড়ছে।”
এই বলে তিনি লাঠি হাতে ঘরে চলে যান। সুযোগ বুঝে ইশতিহার এর আদনান নিচে নেমে আসে। মাটিতে পা রাখতেই আদনান ইশতিহার কে রেখে চম্পট দেয়। কারণ ইশতিহার এর বিশ্বাস নেই, সত্যি সত্যি সে যদি আদনান এর ওপর চড়াও হয়। তাই কোনো রকম রিস্ক না নিয়ে সে এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে যায়।
পেছন থেকে সবটা দেখে ইশতিহার মুচকি হাসে।
” নিজেদের সেটিংস করালাম এখন দেখি বন্ধুর টাও করতে হবে। নয়তো দেখা যাবে কোনদিন আমার বোন কে নিয়ে হওয়া হয়ে যাবে।”

সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই চারিদিকে একটা খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে যেতে থাকে। এলাকার চেয়ারম্যানের একমাত্র মেয়ে আঁখি নাকি কোন এক মাস্টারের ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গেছে। মির্জা বাড়ির কাজের লোকগুলো আজ হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি এসে তাদের কানে খবরটা পৌঁছে দেয়। এতে সবাই অবাক হলেও ইশতিহার ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে নিজের ফোন ঘাঁটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
নিজের স্বামীকে এতটা নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রূপের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তাই সকলের চোখের আড়ালে ইশতিহার কে টেনে নিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয় রূপ। তার পর তার দিকে ফিরে বলে,
” এসব আপনি করেছেন তাই না? আপনার হাত ছিল এসবে?”
ইশতিহার বেশ প্রশস্ত হেসে রূপের দিকে এগিয়ে যায়। তারপর নিজের দুহাত খানা রূপের দুই কাঁধে রেখে মুখটা রূপের কাছে নামিয়ে বলে,

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৬

” বাহ আমার বউ দেখি আমাকে ভালই চিনে গেছে। যেখানেই দেখবি দুই নাম্বারি কাজ হচ্ছে ভাববি সেখানেই এই ইশতিহার মির্জার হাত আছে।”
” হেঁয়ালি না করে সবটা খুলে বলুন আমায়।”
” যে ছেলেটার সাথে আঁখি পালিয়েছে সেই ছেলেটা অনেকদিন ধরেই ওকে পছন্দ করত। আর আমারও আঁখি কে সরানোর ছিল। তাই দুইয়ে দুইয়ে চার করে আঁখি কে অজ্ঞান করে ছেলেটার হাতে তুলে দিলাম। ব্যস, একটা পথের কাটা শেষ।”

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here