ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৯
অনামিকা আহমেদ
ফোনটা রেখেই রুপম এক বিদ্রূপ পূর্ণ হাসি হেসে তাকায় তার পাশের সিটে। রূপের মুখে কালো রঙের কোস্টেপ পেঁচানো, হাত পা জোড় করে বাঁধা রয়েছে মোটা দড়ির সাহায্যে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেকে ছাড়ানোর, কিন্তু অতিরিক্ত টানাটানির কারণে তার হাতে ক্ষত ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। রুপম এক হাতে স্টিয়ারিং চেপে ধরে অন্য হাতে রূপের জোড় করা হাত নিজের কুক্ষিগত করে নেয়। অন্য পুরুষের ছোঁয়া লাগা মাত্র রূপের ভ্রু কুঁচকে যায় ঘৃ*ণায় যেনো মাত্র এক গাদা নোংরা তার গায়ে এসে লেগেছে। রূপ রুপমের থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, কিন্তু লাভ হয়না। রুপম এবার তাকে এক প্রকার নিজের কোলে বসিয়ে ফেলে। তারপর রূপের ঘাড়ের কাছে মুখ ঘষতে ঘষতে তার বড় বড় নিঃশ্বাস পড়তে থাকে রূপের সেই সংবেদনশীল চামড়ার ওপর।
” তোকে পাওয়ার জন্য আমি কি না করেছি? কতটা ভালোবেসেছি তার হিসেব নেই। কিন্তু আমাকে না ভালবেসে ভালোবাসলি ওই ইশতিহার কে। যে কিনা উঠতে বসতে তোর ওপর জোর খাটাতো। ঠিক আছে, তোর যখন এমনই ছেলে পছন্দ তাহলে আজ থেকে আমিও তোর ওপর জোর খাটাবো। আমিও দেখব তুই আমাকে ছেড়ে ওই ইশতিহার এর কাছে কি করে যাস? বাঁচলে একসাথে বাঁচবো আর মরলেও একসাথে মরবো।”
কথাটা বলেই রুপম এক ঝটকায় রূপ কে পাশের সিটে ছুঁড়ে ফেলে ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। তার চোখ মুখ অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করেছে, জেদের বশে মানুষ কতটা প্রতিশোধ পরায়ন হতে পারে রুপম কে না দেখলে রূপ সেটা জানতেই পারত না। রূপের মনে অজানা ভয় কাজ করতে শুরু করে, কারণ তারা শহরের রাস্তা ছেড়ে অন্য কোনো অজানা রাস্তায় এসে গেছে। রুপম তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটা সে ছাড়া কেও জানে না। হয়তো মৃত্যু তার খুব কাছে চলে এসেছে, এই ভেবে রূপ ডুকরে কাদতে থাকে। শেষ বারের মতো ইশতিহার এর মুখখানা দেখতে তার খুব ইচ্ছা করে।
রুপমের মুখের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। গাড়ির কাচের দিকে চোখ গেলে সে দেখতে পায় পেছন থেকে এক কালো বাইক তাদের ফলো করছে। আরেকটু খেয়াল করলে রুপম বুঝতে পারে এ ইশতিহার ছাড়া আর কেও না। পরনে তার কালো কস্টিউম, কালো হেলমেট দিয়ে মুখ ঢাকা কেবল বাজপাখির মত চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে তার। মুহূর্তেই রুপম মুখে বেগ্রতা চেয়ে যায়। ডান হাত দিয়ে স্টিয়ারিং এ বার বার ঘুষি মারতে থাকে। সে বুঝেও পাচ্ছে না ইশতিহার এত তাড়াতাড়ি তার নাগাল পেলো কি করে।
” গড ডেম, এ এখানে এলো কি করে?”
বলতে বলতেই রুপম গাড়ির স্পিড আর বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাতে কাজ হয়না, ইশতিহার পাক্কা খেলোয়াড়। ডাক্তারির এপ্রোন ছেড়ে যখন সে আজ বাইক রাইডারের পোশাক পরেছে তখন সে জিতেই ছাড়বে। কার সাধ্য আছে ইশতিহার কে হারানোর, সেই কলেজ জীবন থেকে বাইক রাইডিং এ তাকে কেও আজ পর্যন্ত হারাতে পারেনি।
ইশতিহার রুপমের গাড়ির কাছে আসতেই হঠাৎ করে কোমর থেকে রিভলবা*রটা বের করে গাড়ির চাকা বরাবর গু*লি চালায়। অব্যর্থ নিশানা, গাড়ির চাকা পাংচার হতে দ্বিতীয় বার গু*লি চালানোর দরকার হয়না। রুপম কি করবে বুঝতে না পেরে তড়িঘড়ি করে রূপ কে টেনে নিজের সাথে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেয়। কারণ এখন গাড়ির চাকা বদলানোর সময় নেই, ইশতিহার এক্ষুনি তাদের ধরে ফেলবে।
রুপম কোথাও যাওয়ার আগেই ইশতিহার তাদের সামনে এসে নিজের বাইকটা দাড়া করায়। তারপর ঢিলেমিশি করে সন্তর্পণে হেলমেটটা খুলে তাচ্ছিল্য চোখে তাকায় রুপমের দিকে।
” কি ভেবেছিলি আমার চোখ এড়িয়ে আমারই প্রাণভোমরা কে নিয়ে পালাতে পারবি? ভুলে যাবি না আমি ইশতিহার মির্জা, আমার স্ত্রী কে তুই যে দুটো হাত দিয়ে স্পর্শ করেছিস সে হাত আমি এসিডে চুবিয়ে ঝলসে দিতে এক বিন্দুও দ্বিধা করবো না।”
ইশতিহার এর কথা শুনে রুপম হঠাৎ করেই পাগলের মতো হাসতে শুরু করে। হাসির এক পর্যায়ে পেন্টের পকেট থেকে বন্দুক টা বের করে রুপম সোজা ঠেকিয়ে দেয় রূপের কপালে।
” আমাকে মারবি না তুই? মার, কিন্তু তার আগে যে আমি তোর প্রাণভোমরা কে শেষ করব। রূপ যদি আমার না হতে পারে তাহলে আর কারোর হবে না।”
এই পর্যায়ে ইশতিহার ও কিছুটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজের হাতের বন্দুক টা মাটিতে রেখে ভয়ার্ত গলায় রুপম কে বলতে থাকে,
” ওকে ছেড়ে দে, ওর কিছু করবি না। তোর শত্রুতা আমার সাথে, দরকার হলে আমাকে মেরে ফেল কিন্তু আমার স্ত্রী সন্তানের গায়ে একটা টোকা দিবি না।”
” এইতো বাবা লাইনে এসেছো। চলে যা এখান থেকে, রূপ আমার। রূপ কে তোর চেয়েও বেশি আমি ভালোবাসি। তুই ওকে আমার থেকে এভাবে কেড়ে নিতে পারবি না।”
” ভালোবাসার মানুষকে কিভাবে আঘাত করতে পারবি তুই? কষ্ট হবে না, বুক জ্বলবে না? ”
রুপম ইশতিহার এর কথায় খেই হারিয়ে ফেলে। তার চোখে জ্বলতে থাকা প্রতিশোধের আগুন নিভে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে।
” তোর চেয়েও বেশি আমার কষ্ট হবে কিন্তু আমার পক্ষে ওকে তোর পাশে দেখাটা আরো বেশি কষ্টকর। তার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। পরপারে না হয় ওকে নিজের করে নিবো।”
” এত পা*প করার পরও ভাবছিস ওকে তুই পাবি? রূপ আমার অর্ধাঙ্গিনী, তোর শরীরে লেপ্টে আছে আমার অস্তিত্ব। ও এ দুনিয়ায় ও আমার, পরপারেও আমারই থাকবে।”
কথাটা বলা শেষ হতে না হতেই একটু দুর থেকে এক ধারালো ছুরি ছুটে আসে রুপমের দিকে। যে হাত দিয়ে রুপম রূপের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছিল ধারালো ছু*রির আ*ঘাতে সেটা তার দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এতে রুপম চরম যন্ত্র*ণায় আ*র্তনাদ করতে করতে নিচে পড়ে যায়। ইশতিহার সুযোগ বুঝে মাটি থেকে নিজের বন্দুকটা হতে নিয়ে পরপর দুটো গু*লি করে রুপম কে সেখানেই শেষ করে দেয়।
রূপ দূরে আদনান কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারে সেই এই ছুরিটা ছুড়েছিল। ইশতিহার রুপমের কে কথার জালে ফাঁসিয়ে তার দৃষ্টি থেকে আদনান কে আড়াল করে রাখে যেনো সে ঠিক সময়ে আসল কোপ তে দিতে পারে।
ইশতিহার পরম যত্নে রূপের বাঁধন খুলে দিলে রূপ ইশতিহার কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে দেয়। ইশতিহার ও রূপ কে নিজের বুকে পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। তবে পরমুহুর্তেই আদনানের দিকে চেয়ে ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় কিছু একটা জিজ্ঞাসা করলে আদনান তার মোবাইলে থাকা একটা ছবি উঁচিয়ে ধরলে দেখা যায় আমরিন আর অরুণাকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। ক্ষত বিক্ষত তাদের শরীর। প্রাণটুকুই আছে শুধু, সেটাও ধুকে ধুকে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১৮
এটা দেখে ইশতিহার এর মুখে এক পৈ*শাচিক হাসি ফুটে উঠে। নিম্ন কন্ঠে সে নিজের মনে বলে উঠে,
” একটাকে শেষ করেছি এখন বাকি দুটোকে আজ রাতেই সরাতে হবে।”
