ডেসটেনি পর্ব ৩৩
সুহাসিনি মিমি
”নজর রাখছেন আমার উপর?”
লজ্জার রেশটুকুর লাঘব টেনে চটপট কি-বোর্ডে আঙুল চালাল প্রিয়ন্তী। মেসেজটা সেন্ড করে এবারেও অপেক্ষায় থাকল। টাইপিং লেখা উঠছে। চাতক পাখির মতো চেয়ে রইল সে। পরক্ষণেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ছোট্ট বাক্যটা,
“উহুম!নজর নয়। খেয়াল রাখছি।”
পরবর্তী মেসেজটা এলো পরপরই,
“কিপিং অ্যান আই অন সামওয়ান অ্যান্ড লুকিং আফটার সামওয়ান! দুটো কিন্তু এক জিনিস না, মিসেস।”
খেয়াল রাখছে! মানুষটা তার খেয়াল রাখছে? নজর তো শত্রুর ওপরও রাখা যায়, কিন্তু খেয়াল? খেয়াল তো কেবল নিজের খুব কাছের মানুষেরই রাখা হয়।তাহলে তিনি কি তাকে নিজের কাছের মানুষ হিসাবেই ভেবে নিতে শুরু করেছেন?
মেয়েটার ফর্সা কপাল জুড়ে ঘামের বিন্দু জমে উঠল। লোকটা কথার জালে এভাবে মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পারে কীভাবে? এত ধারালো এত মায়াবী কথা একটা রাশভারী নেভি কমান্ডারের মুখে শোভা পায়? ওনার এই এক লাইনের উত্তর প্রিয়ন্তীর সমস্ত রাগ,ক্ষোভের দেয়ালে এক নিমেষে ফাটল ধরিয়ে দিল। খানিকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রিয়ন্তী আবার লিখল,
“পার্থক্যটা কী?”
“একটায় কৌতূহল থাকে। অন্যটায় গুরুত্ব।”
”আমার কাছে তো দুই বিষয়ের মানে একই লাগছে।”
”তাহলে আপনার শিক্ষকের বিরুদ্ধে আমার কিছু গুরুতর অভিযোগ আছে।”
চরম বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে দ্রুত লিখল প্রিয়ন্তী,
”এখানে আমার শিক্ষককে টানছেন কেন ?”
”কারণ উনি ওনার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেননি।”
”কী দায়িত্ব?”
”আপনাকে শব্দের গভীরতা আর পার্থক্য শেখানো।”
প্রিয়ন্তী এবার সত্যি সত্যিই চোখ উল্টাল। লোকটা অসম্ভব বিরক্তিকর। একটা কথার ঠিকঠাক উত্তর দিলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে। আবার অদ্ভুতভাবে ওনার এই বিরক্ত করার ভঙ্গিটা ভীষণ রকম সহ্যও হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে ও চটপট লিখল,
”আচ্ছা ঠিক আছে। মস্ত বড় পন্ডিত আপনি! তাহলে পার্থক্যটা একটু বুঝিয়ে বলুন দেখি।”
“প্রথমটা টা আসে সন্দেহ থেকে। আর দ্বিতীয়টায় স্রেফ আগলে রাখার গভীর অধিকার।”
”তা আমি ঠিক কোন ক্যাটাগরিতে পড়ি?”
”আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। সমীকরণটা নিজেই হিসাব করে ফেলুন।”
প্রিয়ন্তী সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। এই লোকটার এটাই একটা মস্ত বড় সমস্যা। সোজা করে কোনো কথাই বলে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এমন মোহনীয়ভাবে মনের কথাগুলো বলে যে, উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ নিজেই ওনার জালে ফেঁসে যায়। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য লিখল,
”তাহলে আপনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করছেন যে আমার খোঁজ নিয়েছেন?”
”স্বীকার করার মতো কোনো অপরাধ কি করেছি?”
”আমি তো সেটা বলিনি।”
”কিন্তু আপনার জেরা করার ভঙ্গিটা ঠিক সেটাই দাবি করছে।”
প্রিয়ন্তী ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। লোকটার সাথে তর্কে জেতা ওর সাধ্যের বাইরে। ও লিখল,
”আপনি সবসময়ই এমন?”
”কেমন?”
”এই যে বারবার প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন ছুড়ে দেন।”
”না, সবার সাথে এমনটা করি না।”
”তাহলে?”
”শুধু আপনার সাথেই করি।”
”কেন?”
”কারণ বাচ্চার মাকে বিরক্ত করার এই অদ্ভুত আনন্দটুকু আমি হাতছাড়া করতে চাই না।”
চোয়াল ঝুলে গেল প্রিয়ন্তীর। মুখ হা করে বিড়বিড় করতে করতে লিখল,
“অসহ্য!”
তৎক্ষণাৎ উত্তর এল,
”ধন্যবাদ।”
”আমি কোনো কমপ্লিমেন্ট দিইনি আপনাকে!”
”কিন্তু আমি ওটাকে কমপ্লিমেন্ট হিসেবেই গ্রহণ করেছি।”
প্রিয়ন্তী এবার হতাশ হয়ে কপালে হাত দিল। এই লোকের সাথে কথা বলা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো একই কথা!
“আচ্ছা, সত্যি করে বলুন। আপনি কীভাবে জানলেন আমি সেখানে গিয়েছিলাম?”
“জানার প্রয়োজন ছিল। তাই জেনেছি।”
“এটা কোনো উত্তর হলো? এভাবে হঠাৎ হুটহাট সব জেনে ফেলাটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের লক্ষণ না।”
“আমাদের সাধারণ মানুষ ভাবাটা তো আপনার প্রথম ভুল, মিসেস। আমাদের কাজই তথ্যের গভীরে যাওয়া। তবে আপনার ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি ইনভেস্টিগেশন লাগেনি। সূত্র খুবই বিশ্বস্ত।”
প্রিয়ন্তী চোখ ছোট ছোট করে ভাবল। বিশ্বস্ত সূত্রটা আবার কে? কাকে ইঙ্গিত করে কথাটা বলল? ওর ভাই ভাবি ছাড়া তো এ বিষয়ে আর কেউ কিছু জানেনা। ওর মাথা কাজ কড়া বন্ধ করে দিল।ঠিক করল এই লোকের সাথে আর একটাও অহেতুক কথা বলবে না সে। তবুও মনে মনে কোথাও পরবর্তী মেসেজের অপেক্ষায় থাকল। মিনিট খানেক পার হলো এভাবেই। ওকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যি স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করে উঠল নোটিফিকেশনে।
“গুড নাইট!”
প্রিয়ন্তীর মেসেজটা দেখে নিজের অজান্তেই রাগ উঠল। লোকটা কি ওকে ব্যস্ততা দেখাচ্ছে?প্রিয়ন্তীর আত্মসম্মানে লাগল। ঠিক করল মেসেজই সিন্ করবে না। উপর থেকে দেখেই রেখে দিলো। সেও দেখাবে ভাব। তাকে সস্তা ভাবা? প্রিয়ন্তী চ্যাটবক্স থেকে ব্যাক করে উপর থেকেই প্রোফাইলের দিকে তাকাল। সেই ফাঁকা, ধবধবে সাদা ব্ল্যাঙ্ক প্রোফাইল পিকচার। কোনো ছবি নেই। আস্ত একটা নিরামিষ লোক!
ফোনটা বন্ধ করে বিছানায় রাখল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে জামা পাল্টে এলো। লাইট অফ করে ফোনটা হাতে নিয়ে পুনরায় কি মনে করে যেন হোয়াটস্যাপে ঢুকল। চ্যাটলিস্টের দিকে চোখ পড়তেই প্রিয়ন্তীর চোখ দুটো আটকে গেল সেখানে।
লোকটার প্রোফাইলের সেই শূন্য সাদা বৃত্তটা আর খালি নেই! সেখানে এখন একটা ছবি জ্বলজ্বল করছে। প্রিয়ন্তী দ্রুত প্রোফাইল পিকচারটার ওপর ক্লিক করে ছবিটা ফুল স্ক্রিন করল। একটা দুর্দান্ত ছবি! যত দূর চোখ যায় শুধু অথৈ, নীল সমুদ্র। সেই উত্তাল সমুদ্রের মাঝে একটা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন উনি। পরনে নেভির সেই চেনা সাদা ধবধবে অফিশিয়াল ইউনিফর্ম। কাঁধের ওপর কমান্ডারের স্ট্র্যাপটা স্পষ্ট জ্বলছে। ছবিটায় পুরো মুখ দেখা যাচ্ছে না। সমুদ্রের দিকে মুখ করে একপাশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই তীক্ষ্ণ চিবুক, চওড়া পুরুষালি পিঠের একপাশ টা দেখা যাচ্ছ শুধু। কেউ হয়তোবা ওনার অগোচরেই চুলেছিল ছবিটা।
লোকটা দেখতে এতটা আকর্ষণীয় কেন? বিয়েটা যেভাবেই হউক এই লোকটা তো এখন ওর স্বামী। সত্যিই স্বামী? দুদিন আগেও যাকে ভালোবাসার ফলস্বরূপ ওরকম ভাবে রিজেক্ট হতে হয়েছে সে ব্যক্তিটিই এখন ওর এভাবে খেয়াল রাখছে?
সকালের নাস্তা শেষ করেই ভার্সিটিরে উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল প্রিয়ন্তী।আজ ক্যাম্পাসে ব্যস্ত সকলে।সামনের ফাইনাল পরীক্ষা। করিডোর, লন, লাইব্রেরি সবখানেই শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি। কারও হাতে নোট। কেউ শেষ মুহূর্তের সাজেশন মিলিয়ে নিতে ব্যস্ত।কেউ আবার দল বেঁধে সম্ভাব্য প্রশ্ন নিয়ে তর্কে ব্যস্ত।ডিপার্টমেন্টের সামনেই পেছন থেকে চেনা কণ্ঠ ভেসে এলো তখন,
“এই প্রিয়!”
প্রিয়ন্তী পিছন ঘুরতেই শ্রেয়া এসে ওর কাঁধে হাত রাখল।বলল,
”কী রে প্রিয়! তোকে এমন জ্যান্ত লাশের মতো দেখাচ্ছে কেন?”
”কি যাতা বলছিস।রাতে একটু ঘুম কম হয়েছে। তাই এমন লাগছে।”
শ্রেয়া চোখ সরু করে বান্ধবীর মুখের দিকে তাকাল।ভ্রু উঁচিয়ে সন্দীগ্ন হয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কি ব্যাপার রে? আজকাল রাতে ঘুম এতো কম হওয়ার কারণ টারণ কি? হুম? জামাই তো নাই যে সাড়া রাত জাগিয়ে রাখবে। তবুও ঘুমাতে পারছিস না কেন? ব্যাটা কি উহুম উহুম ভিডিও কলে জ্বালায় নাকি?”
প্রিয়ন্তীর হাতে নোটস ছিল। ওটা দিয়েই শ্রেয়ার মাথায় সজোরে একটা বারি মারল। তেরেমেরে বলল,
“অসভ্য মাইয়া। চুপ। আস্তে। কেউ শুনে ফেলবে।”
দুই হাত কোমরে গুঁজে অনেকটা নরম গলায় বলল শ্রেয়া,
“তো কি হয়েছে বলবি?”
“সামনে পরীক্ষা। একটু টেনশন লাগছে।”
“ধুর!পরীক্ষার টেনশনে তোর মুখ এমন হয় না। অন্য কিছু হয়েছে নিশ্চই।”
প্রিয়ন্তী এবার সত্যিই চুপ করে গেল।মন চাইলো সবটা খুলে বলতে। তবে ইচ্ছে করল না। আপাতত পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাচ্ছে। পড়ার প্রেসারটাও খুব বেশি। অগত্যা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“নোটস গুলো এনেছিস?”
“হুম।
“এখন দ্রুত ক্লাসে চল। ম্যামের পরে ঢুকলে টার্গেট করে রাখবে পুরো ক্লাস!”
ক্লাস চলাকালীন পুরোটা সময় প্রিয়ন্তী শুধু খাতার পাতায় কলম দিয়ে হিজিবিজি কাটল। প্রফেসর কী পড়ালেন তার এক বিন্দুও ওর মাথায় ঢুকল না।
ক্লাস শেষ হতেই শ্রেয়া ওকে টেনে নিয়ে গেল ভার্সিটির ঠিক পেছনের রাস্তার ধারের পরিচিত ক্যাফেটায়। ওখানকার কোল্ড কফিটা বেশ ভালো। একটা কর্নারের টেবিলে বসে দুজনে খাতা আর ল্যাপটপ খুলে বসল। সামনে এক্সাম। তাই ফাঁকি দেওয়ার আর কোনো উপায় নেই।
”এই চ্যাপ্টারটা দেখ। এখান থেকে কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন আসবেই।”
শ্রেয়া নোটসটা এগিয়ে দিয়ে বলল।প্রিয়ন্তী জোর করে নিজের পুরো মনোযোগ খাতার ওপর দেওয়ার চেষ্টা করল। দুজন মিলে প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে সাজেশন আর নোটস নিয়ে টুকটাক ডিসকাশন করল। পড়াশোনার মাঝে ডুবে থাকায় প্রিয়ন্তীর মনের মেঘটা সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও কেটে গিয়েছিল তখন।
আলোচনা শেষ করে যখন ওরা ক্যাফে থেকে বেরোল, তখন ঘড়িতে দুপুর একটা বেজে পনেরো মিনিট। কড়া রোদ উঠেছে চারদিকে।
ক্যাফে থেকে মেইন রোডের দিকে যাওয়ার গলির মুখটায় আসতেই থতমত খেয়ে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী।
রাস্তার ওপারে একটা চকচকে কালো মার্সিডিজ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আর তার ঠিক পেছনেই সিকিউরিটির আরও দুটো কালো রঙের গাড়ি থামানো। মার্সিডিজের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। ও দূর থেকে দেখেই চিনে ফেলল অভিরাজ! পরনে একদম নিখুঁত, দামী ব্র্যান্ডের একটা গাঢ় নীল রঙের থ্রি-পিস স্যুট। ফর্সা মুখে রোদ চশমা গোঁজা। কারও সাথে ফোনে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কথা বলে চলেছেন। পেছনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে দুজন ব্যক্তিগত বডিগার্ড।
প্রিয়ন্তীর ইচ্ছা হলো ওখান থেকেই উল্টো পায়ে হেঁটে পালিয়ে যায়। সে শ্রেয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে নিচু গলায় বলল,
“শ্রেয়া, চল ওই পাশ দিয়ে ঘুরে যাই। জলদি চল!”
”কেন রে? কী হলো?”
শ্রেয়া কৌতূহল নিয়ে ওপাশে তাকাতেই নিজেও অভিরাজকে দেখে চিনে ফেলল।বলল,
“আরে উনাকে চেনা চেনা লাগছে না?”
”কথা বলিস না, জাস্ট চল!”
প্রিয়ন্তী নিজের ওড়নাটা একটু টেনে মুখটা সামান্য আড়াল করে অভিরাজকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত গতিতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল। চাইল না অভিরাজের তীক্ষ্ণ নজর ওর ওপর পড়ুক। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আজ ওর সহায় ছিল না। গাড়ির সমান্তরাল দূরত্বটুকু পার হতে যাবেই কি অমনি ডাক পড়ল,
”প্রিয়ন্তী!”
অভিরাজের ভারী গলার ডাকটা কানে আসতেই অগত্যা থেমে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী। তীব্র অস্বস্তি সত্ত্বেও থামতে বাধ্য হলো। এই লোকটার মুখোমুখি হওয়া তো দূর, ওনার নামটা শুনলেও এখন ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। আর এক কদমও না বাড়িয়ে ঠিক ওখানেই থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়া কপালে ভাঁজ ফেলে ওপাশে তাকাল। তারপর প্রিয়ন্তীর হাতটা আলতো চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“লোকটা তোর নাম জানল কিভাবে? তোকে চিনে? চিনিস নাকি উনাকে?”
প্রিয়ন্তী ঢোক গিলে মিনমিন করে জবাব দিল,
“উনিই… উনিই অভিরাজ।”
”কী!”
ততক্ষণে অভিরাজ রোদ চশমাটা খুলে পকেটে ভরে রাখল। কয়েক কদম এগিয়ে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। নিরুপায় প্রিয়ন্তী সৌজন্যেতায় মুচকি হাসল।
“এখানে কী করছেন আপনি?”
প্রশ্নটা করেই পরোক্ষনে আশেপাশে তাকালো অভিরাজ। নিজের ভুল সংশোধনের ভঙ্গিতে আশেপাশে একটু চোখ বুলিয়ে আলতো হেসে বলল,
“ওহ, আই অ্যাম সরি! এটা তো আপনার ভার্সিটি। তাই না? আমিই আসলে ভুল জায়গায় ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছি।”
লোকটার প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ পেলেও জোড় করেই হাসল প্রিয়ন্তী। সৌজন্যতামূলক হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। আপনি এখানে?”
”আমার একটা পলিটিক্যাল মিটিং ছিল এই এরিয়াতেই। জাস্ট শেষ করে বেরোচ্ছিলাম।”
অভিরাজ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলে থামল।
“যাক, বেশ ভালোই হলো। যখন দেখা হয়েই গেল, তখন চলুন কোথাও বসা যাক। ওই সামনের ক্যাফেটা বেশ ভালো শুনলাম। ওখানেই বসি?”
প্রিয়ন্তী মনে মনে শিউরে উঠল। এই লোকটার সাথে এক সেকেন্ডও কাটাতে চায় না। চট করে নিজের নারাজভাবটা লুকিয়ে একটা সুন্দর মিষ্টি হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ। কিন্তু আমরা মাত্রই ওই ক্যাফেটা থেকেই কফি খেয়ে বেরোলাম। এখন আর একদম ইচ্ছে নেই।”
অভিরাজ এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন। চিবুক উঁচিয়ে বলল,
“তাতে কী হয়েছে? জাস্ট একটা কোল্ড ড্রিংকস বা আইসক্রিম নিলেন। চলুন।”
”না, প্লিজ। আজ আসলে একটু তাড়া আছে।”
”আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে চলুন, আপনাকে বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে যাই। আমি তো আপনাদের বাড়ির ওখান দিয়েই যাচ্ছি।”
বলতে বলতেই সোজা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চকচকে মার্সিডিজটার দিকে। প্রিয়ন্তী ঘাবড়ে গিয়ে শ্রেয়ার হাত চেপে ধরল।ও কোনোভাবেই এই লোকের গাড়িতে উঠবে না। দ্রুত মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল,
“না না, আমি আপাতত বাড়িতে যাচ্ছি না। আমার লাইব্রেরিতে যেতে হবে।কিছু দরকারি বই কালেক্ট করতে হবে আজ।”
অভিরাজের পেছনে থাকা বডিগার্ড এর ফোনটা বেজে উঠল তখুনি।পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের নম্বরটার দিকে তাকাতেই ফ্যাকাসে হয়ে এলো মুখের রং। লোকটা ঢোক গিলে আড়চোখে অভিরাজের দিকে তাকাল।অভিরাজ তখন প্রিয়ন্তীর সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। গার্ডটি সাহস সঞ্চয় করে একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল,
“স্যার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল এসেছে।”
অভিরাজ শীতল চোখের ইশারা করতেই ভয়ার্ত ঢুক গিলল যুবক। কিন্তু ফোনটা একনাগাড়ে বেজেই চলেছে।ওপাশে থাকা মানুষটা অনবরত কল দিয়ে যাচ্ছে। ওপাশ ফিরে ফোনটা রিসিভ করল যুবক। ওপাশ থেকে কিছু একটা শুনে কপাল জুড়ে ঠান্ডা ঘাম জমে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ভয়ার্ত মুখে বসের একদম কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
”স্যার, ম্যাডামকে কোনোভাবেই কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না।”
কথার বহর থামল অভিরাজের। থেমে তাকালো গার্ডসটির দিকে। ছেলেটা মাথা নেড়ে কিছু একটা বুঝাতেই ঠোঁট কামড়ে অনড় দাঁড়িয়ে থাকা অভিরাজ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আসলে আমার হঠাৎ করেই একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ পড়ে গেছে। এখনই চলে যেতে হবে। আপনি এক কাজ করুন। এই গাড়িতে করে চলে যান। ম্যাডাম যেখানে যেতে চান। ওনাকে ওনার গন্তব্যে ড্রপ করে দিয়ে আসো।”
শেষের বাক্যটা গার্ডসদের উদ্দেশ্য বলেই চলে গেল সে। লোকটা যেতেই মনে মনে স্বস্তির শাস ফেলল প্রিয়ন্তী।
“আসুন ম্যাডাম। গাড়িতে উঠুন। কোথায় যাবেন বলুন। স্যার আমাদের আদেশ দিয়েছেন আপনাকে ড্রপ করে দিতে।”
প্রিয়ন্তী এক পা পিছিয়ে গিয়ে হাত নেড়ে বলল,
“না না, ঠিক আছে। আপনারা যান। আমি রিকশা করে চলে যেতে পারব।”
গার্ডরা এবার একটু জোরাজোরি করতে শুরু করল।
“ম্যাডাম প্লিজ এমন করবেন না। স্যারের আদেশ অমান্য করলে স্যার আমাদের চাকরি রাখবেন না। বকাঝকা করবেন। প্লিজ গাড়িতে উঠুন।”
“আমি বললাম তো আমি যাব না! আসলে লাইব্রেরিটা একদম কাছেই। এই গলির ভেতরেই।ওখানে গাড়ি ঢোকার মতো রাস্তা নেই। আপনারা প্লিজ আসুন।”
প্রিয়ন্তীর দৃঢ় কণ্ঠস্বর দেখে গার্ডরা আর বেশি জোরাজোরি করার সাহস পেল না। অগত্যা সালাম দিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেল।গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই প্রিয়ন্তী আর শ্রেয়া মেইন রাস্তার একপাশে সরে এল। প্রিয়ন্তী এতক্ষণে বুক ভরে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কপালটা ঘামে ভিজে গেছে।শ্রেয়া এতক্ষণ পুরো নাটকটা হাঁ করে দেখছিল। প্রিয়ন্তীকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মিথ্যা বললি কেন? ফ্রিতে এমন লাক্সারিয়াস গাড়িতে যাওয়ার সুযোগটা ছাড়লিই বা কেন? গেলেই তো পারতিস। সমস্যা কোথায় ছিল?”
প্রিয়ন্তী ওড়না দিয়ে কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছতে মুছতে শ্রেয়ার দিকে তাকাল।বান্ধবীর হাতটা শক্ত করে টেনে ধরে বলল,
“গাড়ির এসি হাওয়া খাওয়ার চেয়ে আমার আজকে তোর সঙ্গে হুড খোলা রিকশায় করে চলতে বেশি মন চাচ্ছে রে। অনেকদিন রিকশায় ঘুরি না। চল, জলদি একটা রিকশা ডাক!”
তপ্ত দুপুরের রোদ চড়ে মাথাটা ভনভন করছে প্রিয়ন্তীর।রিকশা ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল সে। ড্রয়ইং রুমে যেতেই চোখ পরল সেজেগুঁজে রেডি হয়ে বসে থাকা ভাবির উপর।প্রিয়ন্তী থেমে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কোথাও যাচ্ছ নাকি ভাবি?”
প্রিয়ন্তীকে দেখেই মিতালীর মুখে চওড়া এক হাসি ফুটে উঠল। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“হুম। যাবো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।ফ্রেশ হয়ে একটু নিচে আসো তো। তোমায় নিয়ে একটু বাইরে যাব।”
প্রিয়ন্তী ক্লান্তিভরা মুখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাবে এই অসময়ে?”
”আরে এই তো সামনে আমাদের এলাকার ওই পার্লারটায় যাব। কতদিন হয়ে গেল নিজের কোনো যত্ন নেওয়া হয় না। রূপচর্চার তো নামগন্ধই নেই।তোমার ভাই আগের মতো প্রশংসাও করেনা। শরীরের একটু যত্ন-আত্তি করা দরকার। ভাবছি আজকে গিয়ে একটু ভালো করে ম্যানিকিউর করাব।
“এখন?”
“তোমার ভাই এলে তো যেতে দিবেনা। একাও যেতে মন চাচ্ছিলোনা। ভাবলাম তোমাকেই সঙ্গে করে নিয়ে যাই।”
প্রিয়ন্তী নিজের কাঁধের ব্যাগটা সোফার একপাশে নামিয়ে রাখল। একটু ভাবল। ওপরে গিয়ে যদি এখন ও জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়, তবে শরীরের অলসতা আরও দ্বিগুণ হয়ে চেপে বসবে। বিছানায় পিঠ ঠেকালে আর এই রোদের মধ্যে দ্বিতীয়বার বাইরে বেরোনোর এনার্জি কিছুতেই খুঁজে পাবে না। তার চেয়ে এই পোশাকেই একবারে ঘুরে আসা ভালো।
“তাহলে এখনই চলো। ওপরে গিয়ে ফ্রেশ হলে শরীরটা আরও বেশি টায়ার্ড লাগবে। অলসতা এসে ঘিরে ধরলে তখন আর এক পা-ও নড়তে ইচ্ছে করবে না। একবারে কাজ সেরে এসে তারপর ফ্রেশ হয়ে আরাম করে ঘুমাব।”
মেইন রোডের ঠিক আগের গলির মোড়েই একটা বেশ বড়সড় এবং ছিমছাম লেডিস পার্লার আছে।বাড়ি থেকে দূরত্ব টাও খুব বেশি নয়। এলাকার নারীদের আনাগোনা এখানেই বেশি। মিনিট দশেকের মাথায় পার্লারের ভেতরে এসে পৌছালো ওরা। পার্লারের একটা আরামদায়ক সোফায় গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল প্রিয়ন্তী। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে শুরু করল। ভাবল, ভাবী ম্যানিকিউর করাবে,অন্তত ঘণ্টাখানেকের মামলা। চুপচাপ ফোন গুঁতিয়েই সময় পার করে দেবে।
মিতালী গিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল। সেখানে পার্লারের চেনা এক কর্মী দাঁড়িয়ে ছিল। এলাকার পার্লার হওয়ায় মিতালী ওদের আগে থেকেই চেনে। কাউন্টারের মেয়েটি মিতালীকে দেখে বিনয়ী হেসে বলল,
“কেমন আছেন ভাবি?”
“এইতো আলহামদুলিল্লাহ। তোমার কি অবস্থা?”
তানিয়া মেয়েটি হেসে জবাব দিলো। টুকটাক কিছুক্ষন কথাবার্তা চলল দুজনের মধ্যে। কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করল,
“কতদিন পর এলেন । কী কী করাবেন আজকে?”
“আমি তো ম্যানিকিউর করাবই।তবে তার আগে একটা জরুরি কাজ আছে। এই যে আমার ননদ, ওর নাকটা আজকে একটু ফুঁড়িয়ে দিতে হবে।”
প্রিয়ন্তী ফেইসবুকের একটা রীলস দেখছিল তখন। কথাটা কানে যেতেই অমনি ধুম করে আকাশ থেকে পড়ল যেমন। ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে স্থির করল ভাবির উপর। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“কী! ভাবী তুমি এসব কী বলছ? কার নাক ফুঁড়বে? আমার?”
মিতালী একগাল হেসে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“আরে বাবা এত চমকে ওঠার কী আছে? সামনে তো তোমার বিয়ের অনুষ্ঠান।দুদিন পর শ্বশুরবাড়িতে যাবে। নাক না ফুরালে চলবে? আজ হোক বা কাল করতেই হতো। বিয়ের ঠিক আগে আগে এসব করতে গেলে তখন ব্যথার চোটে অস্থির হতে হবে। তার চেয়ে ঝামেলাটা যদি আগেভাগেই শেষ হয়ে যায়, তবে কষ্টটা কম হবে। যেহেতু আজ দুজনে একসাথে পার্লারে এসেই পড়েছি একবারে শুভ কাজটা সেরেই ফেলি না কেন!”
ভাবীর এমন অদ্ভুত যুক্তিতে প্রিয়ন্তীর মাথাটা গরম হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে বলল,
“তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ভাবী? আমি কেন এখন নাক ফোঁড়াতে যাব? তুমি তো আমাকে বাড়ি থেকে বের করার সময় এ ধরনের কোনো কথাই বলোনি! স্রেফ ম্যানিকিউরের কথা বলে আমাকে এখানে ধরে এনেছ। আর আমি এসবের জন্য মানসিকভাবে একদমই প্রিপেয়ার্ড না! আমি পারব না।”
“নাক ফুরাতে আবার মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকা লাগে বুঝি?”
“অবশ্যই লাগে। আমি এখন ওসব করাবো না প্লিজ!”
”তোমায় নাকফুল পড়ালে যে কী অসম্ভব সুন্দর লাগবে। তুমি নিজে কল্পনাও করতে পারবে না।”
“লাগবেনা আমার সুন্দর লাগা। তুমি যেটা করতে এসেছো সেটা করো!”
তানিয়া মুচকি হেসে এগিয়ে এল।বলল,
“প্রিয় ভয় পাচ্ছ কেন?”
“তো ভয় পাবো না?”
“একটুও ব্যথা লাগে না।”
“তোমার না লাগলেও আমার লাগবে।”
“দশ সেকেন্ডের কাজ।”
“দশ সেকেন্ডও অনেক।”
পার্লারের আরও দুইজন কর্মী ওদের কথোপকথন শুনে হেসে এগিয়ে এল।একজন বলল,
“আপু এখন তো ছোট ছোট বাচ্চারাও নাক ফুঁড়ায়।
এখন এটা একরকম ফ্যাশন।”
”ওসব ফ্যাশন আমার লাগবেনা। ”
”আরে প্রিয়! তুমি মিছেমিছি এত ভয় পাচ্ছ কেন? এখনকার দিনে নাক ফোঁড়ানো তো কোনো ব্যাপারই না। আমরা ওই গান-মেশিন দিয়ে জাস্ট এক সেকেন্ডে টুক করে ফুটিয়ে দেব।তুমি বিন্দুমাত্র ব্যথা পাবেন না। পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো একটুখানি লাগবে শুধু। আমাদের ওপর ভরসা রাখো।”
প্রিয়ন্তীকে তবুও মানতে নারাজ। ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে দেখে পার্লারের অন্য মেয়েগুলোও কাজ ফেলে এগিয়ে এল। তানিয়া পাশে থাকা ছোট মেয়েকে দেখিয়ে বলল,
“এই রিমি। এদিকে আয় তো।”
চৌদ্দ-পনেরো বছরের মেয়েটা দৌড়ে এল।
“জি আপু?”
“তোর নাকটা কবে ফুঁড়িয়েছিলি?”
“গত মাসে।”
“ব্যথা পেয়েছিলি?”
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল,
“একটুও না আপু। আমি তো হাসতেইছিলাম।”
প্রিয়ন্তী সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
“মিথ্যা বলছ।”
“সত্যি বলছি।”
“কাঁদোনি?”
“না।”
“একটুও?”
“না।”
”দেখেছো প্রিয়? ছোট একটা বাচ্চাও ভয় পায় না। আর তুমি শুধু শুধু এত ভয় পাচ্ছ !”
মিতালী এবার আর কোনো অজুহাত শুনল না। তানিয়া আর মিতালী মিলে জোড় করেই এনে বসালো রিভলভিং চেয়ারটায়।
”ছাড়ো আমাকে! ভাবী, প্লিজ বলছি ছাড়ো! আমার ভালো লাগছে না কিন্তু! আমি চিৎকার করব!”
প্রিয়ন্তী চেয়ারে বসে ছটফট করচে।পার্লারের মেয়েগুলো প্রিয়ন্তী কে সাহস জুগিয়েই যাচ্ছেন। প্রিয়ন্তী তবুও নারাজ। একপর্যায়ে আশাহত হয়ে চোখ মুখ খিচিয়ে নিলো। তানিয়া চট করে ড্রয়ার থেকে সেই স্টিলের গান-মেশিনটা বের করল। ওটার মাথায় একটা ধারালো স্টাড লাগানো। প্রিয়ন্তী ওটা দেখেই আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে সমানে। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম নেমে এসেছে।
”ভাবী, প্লিজ! আমি মরে যাব! ওটা সরিয়ে নাও!”
“কিচ্ছু হবে না সোনা।চোখটা বন্ধ কর।”
তানিয়া অত্যন্ত অভিজ্ঞ হাতে প্রিয়ন্তীর নাকের ডান পাশের নরম চামড়াটায় একটু স্পিরিট লাগিয়ে জায়গাটা ঠাণ্ডা করে নিল। তারপর নিখুঁত নিশানায় মেশিনের মুখটা নাকের ওপর চেপে ধরল। প্রিয়ন্তী তখনো হাত-পা ছটফট করানোর চেষ্টা করছে।
”রেডি? ওয়ান, টু, থ্রি…”
কাউন্ট ডাউন শেষ করেই মেশিনের ট্রিগারে চাপ দিল।খটাশ!একটা তীব্র ধাতব শব্দ হলো। আর সেই সাথে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো একটা জ্বলন্ত কয়লার টুকরো সরাসরি প্রিয়ন্তীর নাকের চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেছে।
”আআআআহহহহহ!”
চোখ মুখ খিচে চিৎকার করে উঠল প্রিয়ন্তী। দু এক ফোটা নোনা জল গড়ালো গাল বেয়ে। মিতালী আগে থেকেই একটা নাকফুল দিয়ে রেখেছিলো তানিয়ার হাতে। সেটাই খুব সুক্ষ ভাবে পড়িয়ে দিলো প্রিয়ন্তী নাকে। নাকটা টকটকে লাল টমেটোর মতো রূপ ধারণ করেছে।মেয়েটার চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে গেছে তখন।
”ব্যস ব্যস, হয়ে গেছে আমার লক্ষ্মী বোনটা! আর কোনো ব্যথা নেই, দেখ!”
প্রিয়ন্তী চেয়ারে বসে হাপাচ্ছে। কাঁপাকাঁপা হাত দিয়ে নিজের নাকের পাশে আলতো করে ছোঁয়া দিল। একটা শক্ত, ছোট্ট ধাতব কিছু ওখানে বসে গেছে। ও চোখের পানি মুছতে মুছতে সামনের বড় আয়নাটার দিকে তাকাল।আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ফর্সা, কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া নাকের ঠিক একপাশে একটা বিন্দুর মতো ছোট্ট ডায়মন্ডের নাকফুল পার্লারের লাইটের আলোয় হিরের মতো জ্বলজ্বল করছে। নাকটা লাল হয়ে থাকায় ওই ছোট্ট হিরের টুকরোটা আরো বেশি ফুটে উঠেছে যেন।
ব্যথাটা তখনো দপদপ করছে। কিন্তু আয়নারে সামনে নিজের এই সদ্য নতুন প্রতিবিম্ব দেখে ও নিজেই মুগ্ধ। খারাপ লাগছেনা।তবুও অভিমানী গলায় ভাবীকে বকল সে,
“তুমি একটা আস্ত চিটিংবাজ ভাবি। আমার সাথে এভাবে কেউ চিটিং করলে এনে ? আমার নাকটা এখনো জ্বলছে!”
মিতালী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ননদের দিকে। মুগ্ধতা নিয়েই বলল,
“বিশ্বাস কর প্রিয় তোমাকে নাকফুলে সুন্দর লাগবে ভেবেছি। তবে এতটা সুন্দর লাগবে যে ভাবতে পারিনি।”
“হয়েছে। সুন্দর করে এখানে নিয়ে এসে আমার সঙ্গে এমন করলে তো। বাড়ি যাই আজকে। ভাইয়ার কাছে বিচার দিবো তারপর।”
মিতালী সেসবে পাত্তা দিলোনা। কাজ শেষ হতেই পার্স থেকে ফোনটা বের করে কাউকে একটা মেসেজ পাঠালো গটাগট,
“ডান!”
সেন্ড করে দিলো মেসেজটা। এরপর ক্যামেরা অন করে ননদের সঙ্গে দুটো সেলফি তুলে নিলো। বলল,
“স্মৃতি হিসেবে রেখে দেই ছবি দুটো কেমন?”
কাজ শেষে ওরা বাড়ি ফিরল। পুরোটা পথ প্রিয়ন্তী আহাজারী করেই গেল। মিতালী ননদ কে এনে আইসক্রিম খাওয়ালো।এটা সেটা সাধলো। বাড়িতে পৌঁছানো মাত্রই রুমে ছুঁটে গেল প্রিয়ন্তী।
রুমে এসে আয়নায় নিজের লাল নাকটা দেখে প্রিয়ন্তীর আবার কান্না পেলো। ব্যথার তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। একদম দপদপ করছে ভেতরটা। আর দেরি না করে ড্রয়ার থেকে একটা প্যারাসিটামল বের করে খেয়ে নিলো। সামনে যেহেতু ফাইনাল এক্সামের প্রচণ্ড প্রেসার। তাই ও আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। চট করে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। ডাইনিং টেবিল থেকে হালকা পাতলা কিছু খেয়ে এসে বসল পড়ার টেবিলে।
ইংলিশ লিটারেচার বইটার একটা পয়েম এর সারাংশ মুখস্ত করছিলো বসে বসে। অমনি পাশে থাকা ফোনটা ফট করেই জ্বলজ্বল করে উঠল নোটিফিকেশনের শব্দে। হোয়াটস্যাপ থেকে এসেছে মেসেজটা। এই সময়ে কে মেসেজ দিল? কৌতূহল বশতই ফোনটা হাতে নিয়ে লক স্ক্রিনটা খুলল। প্রবেশ করল ভিতরে। নিরামিষ কমান্ডার এর চ্যাটবক্স থেকেই মেসেজ এসেছে!
ও দ্রুত চ্যাটটা ওপেন করল। স্ক্রিনে পাঠানো অদ্ভুত মেসেজটা দেখেই হা হয়ে গেল প্রিয়ন্তী,
”হুম, খারাপ লাগছে না। বরং জিনিসটা তার নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে পেয়েছে!”
প্রিয়ন্তী আকাশ থেকে পড়ল বুঝি। লোকটা কী বলছে এসব? কাকে বলছে? কিছু না বুঝেই দ্রুত টাইপ করল,
”মানে?”
”ব্যথা কি একটু বেশিই পেয়েছিলেন?”
”কিসব উল্টোপাল্টা বলছেন! কেন ব্যথা পাবো?কোথায় ব্যথা পাবো? ”
পরের মেসেজটা আসতে দুই সেকেন্ড সময় নিল,
”কাছে থাকলে স্পর্শ করে দেখিয়ে দিতাম কোথায় ব্যথা পেয়েছেন।”
কথাটা পড়া মাত্রই প্রিয়ন্তীর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চমকে উঠে নিজের সদ্য ফুঁড়ানো নাকটায় হাত দিল। এই লোক বেইজে বসে কীভাবে জানল ও নাক ফুঁড়িয়েছে? আর ব্যথা পাওয়ার কথাটাই বা ওনাকে কে বলল? ওনার মাথা কি পুরো আউলে গেছে?
”যাইহোক, একটা কথা মনে রেখেন—এভাবে সাজার ছবি সবার জন্য না। কিছু জিনিসের উপর একটু স্বার্থপর হওয়ার অধিকার আমার আছে।”
”আপনি কি একটু বুঝিয়ে বলবেন আপনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন? আমি আপনার কোনো কথার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না।”
ওপাশে এবার টাইপিং দেখা গেল। পরবর্তী মেসেজটা এলো কিছুটা সময় নিয়েই,
”বেশি ভাবার দরকার নেই মিসেস। শুধু অন্যের স্টোরিতে দেখার চেয়ে, মাঝে মাঝে নিজের স্টোরি থেকে আপনার ছবি দেখার সৌভাগ্য এই অধমকে দান করলে কৃতজ্ঞ থাকব। দূরে থেকে অদ্ভুতভাবে আপনার বাচ্চার বাবার মেজাজটাও ভালো হয়ে যাবে তখন।”
এতক্ষণে সমীকরণটা মেলাতে পেরেছে প্রিয়ন্তী। হুট্ করেই ওর ভাবির এভাবে ওকে সেখানে নিয়ে যাওয়া। জোড় করে নাক ফুরানো। আর এই মেসেজের মানে। সবটাই এখন পানির মতো পরিষ্কার। ও ফোনটা ছুড়ে মেরে দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এক দৌড়ে এসে থামল মিতালীর ঘরের দরজার সামনে। দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল, মিতালী বিছানায় বেশ আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে এক হাতে কাঁটাচামচ দিয়ে বাটি থেকে ফ্রুটস খাচ্ছে আর অন্য হাতে পরম শান্তিতে ফোন টিপছে।
ডেসটেনি পর্ব ৩২
”ভাবী, এই নোজ পিনটা আসলে কে দিয়েছিল বলতো? সত্যি করে বলবে আমাকে। একদম লুকাবে না!”
মিতালী বাটিটে অবশিষ্ট শেষ আপেলের টুকরো কাঁটাচামচে গেঁথে মুখে পুরল। প্রিয়ন্তীর দিকে তাকাল ও না অব্দি। নিজের মোবাইল স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতেই বড্ড স্বাভাবিক,নির্বিকার কণ্ঠে জবাব ছুড়ে দিলো,
”কেন? তোমার বর!”
