Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৩

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৩

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৩
রাফিয়া জান্নাত রিফা

রাত ৮ টা নাগাদ,,
আর্দ্র আলবান এখন তাদের বাবা অর্থাৎ নাজিম তালুকদারের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে।সেই পাঁচ মিনিট ধরেই দাঁড়িয়ে,আলবান ফিসফিস করেই বারবার রাগ দেখিয়ে বলছে “আরে যা, তাড়াতাড়ি যা” কিন্তু আর্দ্র অনবরত তার নখ দাঁত দিয়ে কেটেই যাচ্ছে, আর্দ্রের সাহসে কুলাচ্ছে না “যাবে কি যাবে না” এদিকে আর্দ্রের এমন কান্ডে আলবান তো রেগে মেগে আগুন। কিন্তু আর্দ্রের মনের অব্যক্ত ভয় কিছুতেই কাটছে না।আলবানের সহ্যের সীমা অতিক্রম হয়ে গেল এবার তাই আর দেরি না করে, নিজেকে আর্দ্রের পিছনোর সোজাসুজি করে নিয়ে,পা লম্বা করে আর্দ্রের পাশ্চাৎ বরাবর ধাক্কা দিয়ে বিরবির করে বললো,,,

__ যাহ বাল।
বাল! কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল আলবানের।
বলার সঙ্গে সঙ্গেই যেন নিজের ওপরই ক্ষোভ জমে উঠল তার ।এই শব্দটা সে এত ঘৃণা করে, অথচ অজান্তেই কেন বারবার তার মুখে আসে!রাগটা এবার নিজের থেকে সরে গিয়ে গিয়ে স্থির হলো ইতির দিকে।মনে মনে ফুঁসে উঠল
সব দোষ যেন ওই মেয়েটার!ওর জন্যই তো আজকাল আলবানের মুখে এই শব্দটা ঘুরে ফিরে আসে,ওর জন্যই নিজের ভাষা, নিজের ভাব সবকিছু যেন কেমন বিশ্রীভাবে বদলে যাচ্ছে।
আর্দ্র শরীরের ভারসাম্য বেগ হাড়িয়ে দরজা ধপাস করে খুলে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করলো ঘরে। নাজিম তালুকদার তখন বিছানায় হেলান দিয়ে আছেন। আর্দ্রের এভাবে হুটহাট উপস্থিতে ভড়কে গিয়েছেন। আর্দ্র বিছানার একটু পাশেই মাথাটা নিচু করে রেখেছে। আর্দ্রকে ভালো ভাবে পরখ করে নাজিম তালুকদার বলেন,,,

__ কিছু বলবে আর্দ্র বাবা।
আর্দ্র এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকাতে চুলকাতে বলে,,
__ ওই একটু কথা ছিল আরকি?
__ আমার পাশে বসো?
আর্দ্র বিছানায় বসলো। নাজিম তালুকদার আবার বলেন,,
__ নির্দ্বিধায় বলো,কি বলবে?
আর্দ্র আমতা আমতা করে বলে,,
__ ওই আরকি,বি বি….
পরের শব্দ গুলো আর উচ্চারণ করতে পারলো না আর্দ্র গলায় এসে বারবার তা আটকে যাচ্ছে কথাগুলো।
__ কি হলো বলো?
কোনরকমে টানটুন করে উচ্চারণ করলো,,,

__ বিয়ে?
__ কার?
__ না মানে আমার,না না আমার বন্ধুর।
__ তোমার আলবান,দির্শক ছাড়া তো আর কোন বন্ধুই নেই।
আর্দ্র মনে মনে বলল,,
__ আসলে তো?
আবার অসহায় কন্ঠে বলে,,
__ হ্যাঁ আলবানের বিয়ে?
তখনি হুড়মুড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করে আলবান, আর্দ্রের দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বলে,,,
__ আর্দ্রওওওওওও
আর্দ্র আঁতকে উঠলো ,আলবানের মুখ পানে তাকানোর সাহস হলো না আর্দ্রের। নাজিম তালুকদার কিছুটা আবাক হয়ে বলে,,,

__ দুই ভাই কি শুধু করেছো ? বলবে একটু?
আলবান নিরেট হুমকি স্বরুপ বলে,,,
__ আর্দ্র তুই কি বলবি? নাকি..
মুহূর্তেই আর্দ্র চমকে উঠে বলে,,
__ না না, থাম বলছি?
হাঁসফাঁস বদলে স্থির শান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে আর্দ্র ঢোঁক পর ঢোক গিলতে গিলতে বলতে লাগলো,,,
__ বাবা আলবানের বিয়ে দিয়ে আমার বিয়ে দাও।
বলেই চোখ বন্ধ করে নিল।
নাজিম তালুকদার ছেলের এমন কথা শুনে ফেচেল হাসলেন, আর্দ্র পিটপিট করে এক খুলে দেখলো,আলবান রাগে পায়ে জুতো খুলছে,তাকে মারার জন্য আলবান আবার গর্জে বলে,,,
__ নাটক না করে তাড়াতাড়ি বলবি কি?
__ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ বলছি ?
আবার আগের ন্যায় চোখ বন্ধ করে আমতা আমতা করে অসহায় কন্ঠে আর্দ্র বলতে লাগলো,,

__ বাবায়য়য়, মেজো বাবার মেজো মেয়ে টাকে আমার বউ বানাতে চাই,দেখো না তাকে ছাড়া তো চলছেই না,তাই তো নির্লজ্জের মতো নিজের বিয়ের কথা নিজেই বলতে এলাম। কিছু করো?মেজো বাবা,মেজো মায়ের সাথে কথা বলো? প্লিজ বাবায়য়য়য়।
নাজিম তালুকদারের কাছে আর্দ্রের এই কন্ঠস্বর এতো অসহায় শোনালো যে তার মনে হলো তার ছেলে ছোট বেলার মতো তার কাছে কিছু আবদার করলো,মানে এটা তার চাই চাই। আর্দ্রের এই কথা কোন রকমের অবাক প্রতিক্রিয়া দেখালো না বরং মনোযোগ সহকারে শুনলো। এবং বলেন,,
__এটা বলতেই এত সংকোচ?
আর্দ্র তড়াৎ করে চোখ খুলে নিল, এবং গলার খাদ নামিয়ে বলল,,

__ হুম।
__ তোমার মা তো এ বিষয়ে আমাকে আগেই অবগত করেছে?
__ হুম মা তো আগে থেকেই জানে,তাই?
তখনি হাতে চা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আলিফা বেগম এবং বলতে লাগলেন,,
__ ভালোই তো,আমাকে ছাড়াই তো ভালোই শলা পরামর্শ চলছে দেখছি।
আলবান সামনে থাকা কাউচের উপরের বসে বলে,,
__ তুমি তো আগে থেকেই জানো সবটা।
আলিফা বেগম বেড সাইডে চায়ের ট্রে রেখে বলে,,
__ আমার বাবা এক কথা, আর্দ্রের বিয়ে যেদিন হবে তোর বিয়ে ও হবে সেদিনই।
ব্যাস আলবানে বিরক্তি ও ধরে গেল,,
__ উফ মা আমার বিয়ে কথা আসছে কোথা থেকে?
আর্দ্র বেশ ফুরফুরে মেজাজে ইয়ার্কি করে বলে,,
__ মা মনে করো আলবানের বিয়ে হয়ে গেছে?
তখনি আলবানের রাগি দুটো চোখ আর্দ্র পানে স্থির হয়‌। আর্দ্র ভড়কে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে,,
__ না মানে হবে এই আর কি?
নাজিম তালুকদার আর্দ্র কে উদ্দেশ্য করে বলে,,
__ আমি নিধির বাবার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবো।
আর্দ্র হালকা মাথা নাড়িয়ে আচ্ছা বলে। তাদের মা ছেলের বাবা মিলে অনেক কথোপকথন হলো, অনেক হাসি ঠাট্টা হলো।

কিছুক্ষণ পরেই আলবান ও আর্দ্র রুম ত্যাগ করে নিজ রুমের উদ্দেশ্য যায়।
আলবান, আর্দ্র নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। নাজিম তালুকদারের দরজার একটু কাছেই দাঁড়িয়ে সব শুনলো দির্শক। একবার দরজার পানে তো একবার আলবান, আর্দ্রের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ পর মুখ আকাশ পানে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সহিত হাসতে লাগলো,সেই হাসিতে আড়াল হলো শত অজানা কষ্ট। সেভাবেই হাসতে হাসতে নিজ ঘরের দিকে চলতে লাগলো দির্শক।হাসতে হাসতে চোখের কর্নিশে পানি জমে উঠলো দির্শকের।
হাসতে হাসতেই সামনে দেখতে পেল বিথীকে,বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে আছে।হাসি মিলিয়ে গেলো না দির্শকের সেভাবেই রইলো, বরং বিথীই দির্শকের পানে চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো, দির্শকের নিজ হাতেই বৃদ্ধাঙ্গুলি সাহায্য চোখে কর্নিশে জমে থাকা পানি মুছে নিয়ে,তা চোখে সামনে এনে বঙ্গীয় ভাবে ঠোঁট উল্টে নিলো তা দেখে।মনে মনে দির্শক আওড়ালো,,

__ টিয়ার্স আই ক্যান্ট বেয়ার।
পরক্ষণে বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা নাক ঘষে নিল, তারপর বিথীর পানে তাকিয়ে একটা ভ্রু নাচিয়ে “কি চাই” বোঝাল।
বিথী দির্শকের আর একটু কাছে এগিয়ে আসলো,দির্শক বিথী কে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না দির্শক,ঘোলা লাগছে সব, শরীর টা কেমন যেন পিছিয়ে যাচ্ছে, শরীর নেতিয়ে পড়তে চাচ্ছে।তাও নিজেকে সংযত রেখে মুখে বাঁকা হাসি রেখে টেনে অপলক বিথীর দিকে তাকিয়ে রইল। বিথী বলে,,,
__ আপনি বড় বাবার ঘরে আড়ি পাতছিলেন কেন?
বুকে হাত গুজে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তাচ্ছিল্যের সাথে বললো,,
__ আমার প্রাপ্য অধিকার আমাকে দেওয়া হয়নি,তাই আড়ি পাতছি।
__ আমার কথার উত্তর তো এটা না?
__ আমি যদি বলি সেখানেই উওর আছে?

বিথী আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি দির্শকের আঙ্গুলি বিথী ঠোঁট স্পর্শ করে যা দ্বারা বিথী কে চুপ থাকার আহ্বান জানায়, দির্শকের শরীর এবার টলতে লাগলো যে কোনো মুহূর্তেই পড়ে যেতে পারে।সে এই ঘোরে বিথীকে কি থেকে কি বলবে সে নিজেও জানে না,এর থেকে দুজনেরই চুপ থাকা ভালো।দির্শক বিথী কানে ফিসফিস করে বলে উঠলো,,
__ আমি মনে হয় তোমার শরীরেই ঢলে পড়বো,সামলে নিও উজ্জ্বল নারী।এতে আমার কোন হাত নেই কিন্তু।
এই বলে দির্শক নিজের হাত দুখানাকে উপরে তুলে নিয়ে ঢলতে লাগলো, নিজেকে সংযত করে দার করানোর প্রচেষ্টা চালালো কিন্তু বেশি ক্ষন সেভাবে নিজেকে আর রাখতে না পেরে বিথীর গায়েই ঢলে পড়লো।
বিথী কিছুক্ষণের জন্যে হাড়িয়ে গিয়েছিল কল্পনার রাজ্যে, দির্শকের এমন হুটহাট অপ্রত্যাশিত ছোঁয়ায় শিহরিত হলো বারংবার। দির্শকের মুখ বিথীর গলায় ডুবে গেল, বিথী একের পর এক শুকনো ঢোঁক গিলতে লাগলো।হাত পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে।
দির্শক বিথীর পিটে হাত রাখার সাথে সাথে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বিথী ভালো ভাবেই বুঝতে পেল দির্শকের শরীরে ভীষণ পরিমাণে জ্বর এসেছে।দির্শকের শরীর সেভাবেই নেতিয়ে রইল বিথীর শরীরে, বিথী গলার খাদ নামিয়ে শান্ত স্বরে বলে,,

__ স্যার আপনি ঠিক আছেন তো?
দির্শক তা শুনে কি বুঝলো তা বলা বাহুল্য কিন্তু সমানে বিরবির করে বলতে লাগলো,,
__ না আমি ঠিক নেই, ঠিক থাকতে দিচ্ছে না তারা,আমি জ্বলাময় দগ্ধ, কিন্তু তারা শীতলতায় বিরাজের খন্ড।আমি তা নিতে পারছি না,পারছি না।আমার শান্তি চাই বিথী, শান্তি।এনে দিবে?
দির্শকের এই কন্ঠস্বর বিথী কাছে খুবই করুণ ও অসহায় লাগলো, দির্শকের এমন কথায় বিথীর মধ্য এক অজানা পীড়াদায়ক যন্ত্রণা দিতে লাগলো।মন বলছে সব কিছু উজার করে হলেও দির্শকের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিতে, কিন্তু মাথা বলছে অন্য কথা।

বিথী দির্শককে ধরে আস্তে আস্তে তার ঘরে বিছানায় শুয়ে দিলো। গায়ে কম্ফোটার জড়িয়ে দিল, কিন্তু তাও কাপনি থামছে না দির্শকের।কপালে হাত রাখল বিথী,ব্যাস অজান্তেই বিথীর চোখে পানি ভর্তি হলো, কিন্তু কেন?তা বুঝলো না।এই মানুষটা যে খুব অসহায় তা ভালোই বুঝলো সে,তবে এজন্যই বিথীর চোখে পানি এলো কি?
বিথী দির্শকের বেডের পাশেই একটা বক্স পেল,সেখানে ছোট খাটো সব ধরনের ওষুধ,সেবা জনিত আসবাবপত্র পেল, থার্মোমিটার ও পেল।সেটা দ্বারা ঝটপট দির্শকের টেম্পারেচার পরিক্ষা করে নিল।১০২° ডিগ্রি টেম্পারেচার তা দেখে বিথীর চোখ কপালে উঠলো।মুখ অসহায় করে নিজেকেই দোষারোপ করতে লাগলো বিথী, নিশ্চয়ই দিনের বেলা ওমন ঝাল ফুচকা খাওয়ানোর কারণে এমন হয়েছে, বিথী এবার সত্যিই জোরে কান্না করতে ইচ্ছে করলো নিজের এই ফালতু ভুলের জন্য।
দির্শকের মাথার পাশে বসে,বিথী ঝটপট করে একটি বাটিতে পানি নিয়ে,নরম কাপড়ের সাহায্য দির্শকের কপালে পট্টি দিতে লাগলো।দির্শক সমানে কি যেন বিরবির করেই যাচ্ছে।তা শোনার প্রবল আগ্রহ জাগলো বিথীর, সেভাবেই ঝুঁকতে লাগলো দির্শকের দিকে,কান বাড়িয়ে দিল দির্শকের মুখে,দির্শকের মুখের গরম নিঃশ্বাস বিথীর কানে আসতেই সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠলো। তড়িৎ বেগে দির্শকের কাছ থেকে সরে আসলো।জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো, মুহূর্তেই কি হলো তা অজানা।মুখ দিয়ে বিড়বিড় করে বিথী বলল,,

__ আপনি আমার জন্য সম্পূর্ণ রুপে হারাম,দুর থেকেই যতটুকু করার ততটুকুই করবো, হ্যাঁ।
সেখানে ঠাঁয় বসে পট্টি দিয়ে দিল বিথী,এখন একটু একটু জ্বর কমেছে দির্শকের।
রান্নাঘর থেকে চুপিচুপি খাবার এনে দির্শক কে খাওয়ালো, খাওয়া শেষে ওষুধ খাইয়ে দিল।দশ মিনিট পড়ে জ্বর টা বেশ কমে এলো, দির্শক ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো।
বিথীর এখানে এখন থাকাটাও উচিত না আবার এখান থেকে চলে যেতেও মন মানছে না। কিন্তু চলে তো যেতেই হবে।দির্শক সমানে বিরবির করেই যাচ্ছে,তা স্পষ্ট কানে আসছে না বিথীর,,
__ আই ওয়ান্ট রিভেঞ্জ।
বিথীর কানে কথা খানা যেতে পুনরায় আবার স্পষ্ট ভাবে শোনার পাঁয়তারা চালায়।বিথী বেশ আনমনে পাকা গিন্নিদের মতো করে বলতে লাগলো ,,,
__ মানুষটা আসলেই ঝামেলার আপনি,না আপনি ভালো আছেন,আর না আমি থাকতে পাচ্ছি।আমার হয়েছে টা কি?এটাই তো বুঝতে পারছি না।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ফের বলে,,,

__ গেলাম আমি?
এই বলে দুই পা এগিয়ে যায় দরজার দিকে, আবার অসহায় মুখে দির্শকের পানে তাকালো, মানুষ এখনো সমান তালেই কাঁপছে। বিথী আবার সেদিন এগিয়ে গেল। কাঁপুনি বন্ধ করার জন্য কি করা যায় তা ভাবলো কিছুক্ষণ পরক্ষণেই বিছানার অন্য পাশ থেকে কোলবালিশটা নিয়ে দির্শকের পাশে লম্বা লম্বি ভাবে দিলো এবং বলল,,
__ মনে করুন এটা আপনার বউ।
এই কথা খানা দির্শকের কানে পৌঁছালো, পিটপিট করে চোখ খুলে বিথীর দিকে তাকালো এবং গলা টান করে বলল,,
__ বউ নেই বলে খোঁটা দিচ্ছো?
কমড়ে দুহাত গুজে বিথী বলে,,,
__ হু আমার বয়েই গেছে আপনাকে খোটা দেওয়ার?আমি কে যে খোটা দিব?
কম্ফোটারটা আর পুরো শরীরে জড়িয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে দির্শক বলল,,
__ অনেক কিছুই হতে পারো,এখন আপাতত আউট হও রুম থেকে।গেট আউট।
মুখ ভেংচি কেটে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বিথী বলে,,,
__ থাকলাম না আপনার ঘরে?গেলাম আমি?
এই বলে হনহনিয়ে রুম ত্যাগ করে বিথী।

সকাল ছ’টা।
ইতি ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে, গায়ে পাতলা চাদর জড়ানো। হালকা কুয়াশা আর ঠান্ডা হাওয়া শরীরে কাঁপুনি ধরেছে। সারারাত ঘুমাতে পারেনি সে ইনজেকশন পুশ করার পর থেকেই বাহুতে একটানা ব্যথা। তার উপর আবার নতুন এক টেনশন এসে জুটেছে মাথায়।
ছাদের এদিক-ওদিক পায়চারি করছে ইতি, মুখে কী যেন বিড়বিড় করছে নিরন্তর।
সিদ্দিকী বেগম ফরজের দিক থেকে এসে জানালেন, আজ নাকি নিধিকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষ।
ব্যস, খবরটা শোনামাত্রই নিধি ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না শুরু করে দিল।ওদিকে ইতি আর বিথীর মাথায় যেন বাজ পড়ে গেল।

সিদ্দিকী বেগম তিন বোনের কাউকেই মুখ খোলার সুযোগ দিলেন না নিজের মতো করে হুকুম জারি করে চলে গেলেন।আসলে, তিনি নিজেও এই বিয়ের ব্যাপারে পুরোপুরি রাজি নন। কিন্তু স্বামীর মুখের ওপর কিছু বলার সাহস তার নেই।তিনি বলেছিলেন, “এমনটা না করলেই ভালো হয়,” কিন্তু তাতেই উল্টো রাগ ও তাপের শিকার হতে হয়েছে তাঁকেই।
এখন আসল কথাটা হলো নিধিকে নিয়ে।ও তো আর্দ্র ভাইয়ের প্রেমে পাগল একখান মেয়ে।তার থেকেও বড় কথা দুজনেই দুজনকে ভালোবাসে সত্যি সত্যি।কান্না করতে করতে নিধি একটিই কথা বারবার বলছি,“আমি যদি আর্দ্র ভাইকে না পাই ,তবে মরে যাবো!
ইতির মাথা তখন টেনশনে ফেটে যাচ্ছে। ছাদের এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে হাঁটছে সে এমনভাবে হাঁটছে, কেউ দেখলে নিশ্চয়ই বলবে এই মেয়ে পাগলি,

ওদিকে ছাদের কোনার রেলিংয়ে গা ঘেসে এক হাত পকেটে রেখে কপি খাচ্ছে আলবান,আর এক ধেয়ে তাকিয়ে আছে ইতি এমন পাগলের মতো হাঁটার দিকে, মুলত আলবান বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে যে ইতি এমন করে হাঁটছে কেন। কিছু একটা ভেবে চোখ মুখ কুঁচকে নিচ্ছে আলবান আবার শীতল চোখে ইতির কান্ড দেখছে।
সামনেই ছিলো এক শুকনো সিমেন্টের সিঁড়ি। অসতর্ক মুহূর্তে কপাল গিয়ে খপ করে ঠেকে গেল সেখানে। ব্যথায় ককিয়ে উঠল ইতি। কপালে হাত দিয়ে আলতো করে ঘষে শান্ত করতে চাইল সেই জ্বালা। কিন্তু ব্যথার চেয়ে রাগই যেন দ্রুত মাথা চড়ে বসল। মুহূর্তের মধ্যেই রাগ চারগুণ বেড়ে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইতি সিঁড়িটাকে পরপর দু’টো চড় মারল আর তাতেই নিজের হাতেই লাগল ব্যথা! এবার হাতের ব্যথায় আবার “আহ্” করে উঠল সে।
রাগ কমার তো প্রশ্নই নেই, বরং আরও উল্টো এবার পা তুলে সিঁড়িটাকে লাথি মারল ইতি। সঙ্গে সঙ্গেই পায়েও ব্যথা! এবার ব্যথায় এক পায়ে লাফাতে লাফাতে আরও রেগে উঠল সে। যেন পৃথিবীর সমস্ত অন্যায়ের উৎস ওই নিরীহ সিঁড়িটাই।

ওদিক থেকে সবকিছুই দেখছিল আলবান। ইতির কাণ্ড দেখে তার মুখে ফুটে উঠল চাপা এক মুচকি হাসি। রাগে, ব্যথায়, লাফাতে থাকা ইতিকে যেন একেবারেই শিশুসুলভ লাগছিল আলবানের চোখে। একটু এগিয়ে এসে আলবান
ইতির হাত ধরল। কিন্তু অসাবধানতায় সেই হাতটাই ধরে ফেলল, যেটিতে কাল ইনজেকশন পুশ করা হয়েছিল। আলবান টান দিয়ে ইতির শরীর ঘুরিয়ে নিতেই ইতি ব্যথায় মুখ বিকৃত করে নিল। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো ইতি চোখে পানি টলটল হলো,,,

__ হাতটা ছাড়ুন?
আলবান বুঝতে পেরে তড়িৎ বেগে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,,
__ সরি,সরি বুঝতে পারি নি?
ইতি ব্যাথিত জায়গায় হাত দিয়ে বুলিয়ে দিতে লাগলো,আলবান ইতি পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ইতিকে বলল,,
__ এদিকে আয়?
ইতি চোখ মুখ কুঁচকে রেখেছে সে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে কোন ভাবেই এই দাবানলের সাথে কথা বলবে না সে।সে অনুযায়ী মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে ইতি।
আলবান ইতির দিকে সামান্য ঝুকে চোখ কুঁচকে বলল,,

__ কি হলো, এদিকে ফের।
মুখ ফুলিয়ে ইতি বলে,,
__ ফিরে কি হবে?
__ ওত কথা না বলে যেটা বলছি সেটাই কর?
__ পার বো না।
__ ঠিক আছে ব্যাথিত জায়গায় ধরে ফেরাচ্ছি।
ইতি তড়িৎ বেগে আলবানের দিকে ঘুরে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,,,
__ এই না না, ঘুরে দাড়িয়ে ছি।
আলবান আর কিছু না বলে নিজের হাতে থাকা গরম কফির মগটা আলতো করে ইতির ব্যথার জায়গায় ছুঁইয়ে দিল। তাপের ছোঁয়ায় ব্যথাটা যেন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে এলো। শরীরের ক্লান্তি গলে গিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ল ইতির মুখে। সে নিঃশব্দে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল, যেন একটু প্রশান্ত ঘুম নেমে এসেছে তার ভেতরে।
আলবান কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইতির দিকে। তারপর নিঃশব্দে, খুব যত্ন করে, ইতির বাহু থেকে কফির মগটা সরিয়ে নিল।ইতি চোখ খুলল তখনি , এবং বলল,,

__ সড়ালেন যে।
আলবান আলসে ভাব নিয়ে রেলিং এ গা এলিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বলে,,
__ তোর কি চাকর লাগি?
__ তার থেকেও নিচু কিছু লাগেন?
আলবান ইতির কথায় মুখ বাঁকিয়ে , নিরন্তর ভাবে তার কথার কোন পাত্তাই দিল, প্রসঙ্গও পাল্টে বলল,,
__ কালকের লোকটা কে ছিল,যে তোকে মারতে চায়?
__ আপনার লোক ছিল না তো?
__ হেয়ালি করিস না ইতি?
__ জানি না কোন লোক ছিল?
ইতি আবার বলে,,
__ সে লোক কোন বাল হয় হোক তা নিয়ে পড়ে কথা হবে, এখন আমি কি বলি শুনুন।
__ তোর কথা শোনার সময় নেই আমার?
__ এই শুনুন আমারো বেহুদা কোন সময় নেই যে আপনার সাথে কথা বলে তা অপচয় করবো। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা আমি বলি না।
__ মানে তুই বলতে চাচ্ছিস যে তুই সবসময় প্রয়োজনীয় কথা বলিস।
__ অবশ্যই হ্যাঁ।
__ যা ভাগ,সেই কথা শুনবোই না তবে,তোর সব অপ্রয়োজনীয় কথা শুনে এমনিতেই ব্রেইন কন্সারে ভুগছি।
সত্যিই এবার ভিষন রাগ হলো ইতি,রাগে দিকবিদিক শূন্য হয়ে কোন কথা না বলে চলে যেতে লাগলো ইতি,তখনি ওড়নায় টান পড়লো ইতির।ঘুরতেই দেখলো আলবান তার ওড়নার এক কোনা টেনে ধরে আছে ।তা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইতি বলে,,,

__ অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা শুনতে চাচ্ছেন বোধহয়।
__ হ্যাঁ বল।
__ বলবো না, ওড়না ছাড়ুন।
__ অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বল শুনছি?
__ বললাম তো বলবো না।ওড়না ছাড়েন?
__ আগে বল তারপর?
__ অসহ্য লাগছে কিন্তু?
__ আমার ও।
__ বারবার আপনি আমাকে অপমান করেন?
__ হ্যাঁ শতবার, হাজার বার করি, কোন সমস্যা?এখন বেশি কথা না বলে বল কি বলতে চেয়েছিলি।
ইতির বলার তেমন কোন ইচ্ছা নেই তবুও বলতে হবে,এ নিয়ে ঝগড়া করলে চলবে না।ইতি নিজের রাগ কে সংযত করে বলল,,

__ মা বলেছে আজ নিধিকে পাএ পক্ষ দেখতে আসবে?
__ কিইইই?
__ হ্যাঁ।
__ তুই কিছু বলিস নি।
__ মা তো আমাকে কিছু বলার সময় টুকু ও দিলো, বরং আমাদেরই রাগ দেখিয়ে চলে গেল।
__ বাবা তো মেজো বাবার সাথে কথা বলতে চেয়েছে?
আলবান কিছুক্ষণ ভেবে বলে,,,
__ আচ্ছা তুই যা,আমি দেখছি।
ইতি মুখ ভেংচি কেটে গটগট পায়ে চলে গেল।

__ এই তুমিই সেই মেয়ে না,যে রুটি বানাতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের মানচিত্র বানিয়ে ফেলো।
সুন্দর কথাখানা রান্না ঘরে থাকা নিঝুম কে বললো,ব্যাস নিঝুমের মটকা চরকে গেল। নিঝুম এখন রুটিই বেলার কাজে ব্যস্ত ছিল যদিও গোল হচ্ছিল না কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্র হচ্ছিল বটে, সুন্দরের কথা খানা বাস্তব ও ছিল বটে।
নিঝুম রুটি বেলা অবস্থাতেই আড়োচোখে সুন্দরের পানে তাকালো, লুঙ্গি ও শার্ট পড়ে আছে,যাই হোক না কেন লোকটাকে এমন পোশাক দেখতে দারুন লাগে।বেশ কিছুক্ষণ সেভাবে দেখলো নিঝুম। এবং বলল,,,
__ এখানে কি চাই?
নিঝুমের একটু পাশে একটা আপেল নিয়ে উঁচিয়ে সেখানে বসে আপেলের কাপড় দিয়ে খেতে খেতে বলল,,

__ দেখতে এলাম বিশ্বের তৃতীয় যুদ্ধ।
__ দেখতে পারছেন না কি করছি? বিশ্বের তৃতীয় যুদ্ধ হবে কেন?
__ বুঝলে মেয়ে,বিয়ে করে ফেলো? তাহলে আর এসব করতে হবে না?
__ বিয়ে করে এসব করতে হবে বলেই তো এসব শিখছি?
সুন্দরের কথাখানা ভালো লেগেছে, মুচকি হেসে বলল,,
__ যে পুরুষ তোমাকে বিয়ে করবে তার ভাগ্য উজ্জ্বল হবে?বুঝলে তো?
সুন্দর হঠাৎ করেই নিঝুমের শরীরের উপর নিচ পরখ করে নিলো,বেশ পাক্কা গিন্নি লাগছে,ওড়না কমড়ে শক্ত করে বেধেছে চুল গুলো আধখোপা করে রেখেছে। দেখতে বেশ সুন্দর এক অপরূপ রমনি লাগছে। সুন্দরের বুকে দ্রিমদ্রিম শব্দ হতে লাগলো। বুকের বাম পাশটা চেপে ধরে মনে মনে বলল,,,

__ এই অপরূপ রমনিকে চাই চাই।
নিঝুম আটা ঢলতে ঢলতে বলল,,,
__ রান্নাঘরে কোন কাজ না থাকলে আসতে পারেন?
সুন্দর বেশ ভাব নিয়ে বলল,,
__ কাজ করার জন্যেই তো এলাম।
ততক্ষনেই নিঝুম সুন্দরের হাতে বটি দিয়ে বলে,,,
__ তাহলে ওই বড় মাছটা দেখছেন সেটা এই বটি দিয়ে কাটুন ।নিন ধরুন।
সুন্দরের যদিও এতক্ষণ ধরে প্রেম প্রেম পাচ্ছিল কিন্তু এখন আর পাচ্ছে না,এখন নিজেকে খুব অসহায় লাগলো,মনে মনে বলতে লাগলো,,
__ এই মেয়ে যার কপালে আছে তাঁকে খাটাইতে খাটাইতে মাইরা ফালাইবো।
এসব থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় তা ভাবতে লাগলো, পরক্ষণেই বলল,,,
__ আসলে দুই করে হাত স্যানিটারি করা হয় নি,আর ওই হাতেই তুমি বটি খানা তুইলা দিলা টুকটুকির মা।
মুহূর্তেই নাক ছিটকে নিল নিঝুম সুন্দরের থেকে সরে গিয়ে,দাত কটমট করে বলতে লাগলো,,

__ ছি ছি উুয়াক থু,যান চলে যান এখান থেকে।
ব্যাস নাচতে নাচতে চলে যেতে লাগলো সুন্দর,যাইহোক এই মাইয়ার এমন এক জঘন্য কাজ থেকে বেঁচে গেল তো ?আর কি? একটু না হয় ছোট হলো তাতে কি।,যেতে এক খান খান বলতে লাগলো।
🎶না রে না, আর তো পারে না
মন আমার নাস্তানাবুদ এক জনেরই দায়
না রে না, কারো ধার ধরে না
দিন আমার যাচ্ছে ভালোই মিষ্টি যন্ত্রণায়
বাড়িতে, দোকানে, এখানে, ওখানে
যেখানে সেখানে বানভাসি
ওই, গলিতে, পাড়াতে, ডাকেতে, সাড়াতে
দাঁড়াতে-টাড়াতে ভালোবাসি🎶🎶🎶

মুহিন স্বপ্নে বিভোর…
__ মা মা মাথা ঘুরাচ্ছে,বমি বমি পাচ্ছে, শরীর দুর্বল লাগছে।
মিলি বেগম বেশ খুশি হয়ে বলতে লাগলো,,
__ তাই নাকি?আরে এ তো খুশির সংবাদ।
তৎক্ষণাৎ মুহিন কি যেনো বুঝে শার্টটা দিয়ে মুখ ঢেকে নিল। তারপর হেলেদুলে দৌড়ে নিজের রুমে গেল ।
রুমে গিয়ে ঘুমান্ত পিকিকে বিছানা থেকে ডাকতে লাগলো।আধো আধো চোখ খুলল পিকি ঘুমের রেশ টেনে বলল,,
__ হোয়াট হ্যাপেন মুহিন।
মুহিন লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে শার্ট কামড়াতে কামড়াতে একে বেঁকে বলে,,
__ গুড নিউজ?
__ হোয়াট?
লজ্জায় অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মুহিন বলে,,
__ আমি বাবা হতে যাচ্ছি?
__ কিইইই?
মুহিন আবার দাঁত দিয়ে জিহবা কেটে বলে,,
__ ওহহ না না সরি আমি মা হতে যাচ্ছি?
পিকি আবার বলে,,

__ কিইইই
__ আচ্ছা আমি মা হবো নাকি বাবা হবো। ঠিক বুঝতে পারছি না?
পিকির হঠাৎ করেই পেটে ব্যাথা শুরু করলো, এবং চিৎকার করে পিকি বলতে লাগলো,,,
__ আমাকি হসপিটালাইজ করো আমার পেইন উঠেছে?
মুহিন অবাকের চরম পর্যায়ের হা করে বলে ,,,
__ কিইই,পেইন হবে আমার, হসপিটাল যাবো আমি?
ব্যাস পিকির কি হলো কে জানে ? পা দুখানা ছড়াছড়ি করতে লাগলো। ছড়াছড়ি করতে করতে এত জোরে লাথি মারলো যে সেই লাথির বেগে মুহিন খাট থেকে পড়ে গেল।জোরে চিৎকার করতে লাগলো,,,,

__ ও মা গোওওওওওওও আমার কোমর আর বাচ্চা গেল গো।
এত জোরে চিৎকার করতে লাগলোও যে মুহিনের পা লেগে তার মা ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেলেন, অনেক কষ্টে টেনেটুনে মাজায় হাত দিয়ে ওঠেই ঠাস করে মুহিন গালে কষে এক খানা থাপ্পড় মারলো।এবার মুহিন হুসে আসলো চোখ খুলে দেখলো সে মেঝেতে পড়ে আছে,আর তার মা তার দিকে রাগিচন্ডি রুপে তাকিয়ে আছে রাগে ফুঁসছে। দাঁত কটমট করে মিলি বেগম বলেন,,,

__ সে কতক্ষণ ধরে ডাকছি?কানে কথা যায় না,কত বেলা অবধি পড়ে পড়ে ঘুমাবি। আমার কোমর টা গেল গো,তোর ভন্ডামি ছুড়বো দ্বারা,দু মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নিচে আয়।
এই বলে রাগে বিরবির করতে করতে চলে গেলেন মিলি বেগম।
এদিকে মুহিন মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে লাগলো আর বলতে লাগলো,,,
__ আচ্ছা তারপর মা টা হতো কে।আমিই তো প্রেগন্যান্ট ছিলাম তাহলে পিকির পেইন উঠলো কেন ?
কিছু একটা মনে হতেই মেঝেতেই হাত পা ছুড়াছুড়ি করতে লাগলো মুহিন,বেশ কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,
__ আমিই কি দেখলাম ছি?কেন ?কেন? দেখলাম।
ঠোঁট উল্টে কাঁদতে কাঁদতেই মেঝে থেকে উঠল।
স্বপ্নটা ভালোই ছিল কিন্তু একটু এলোমেলো হয়ে গেছে এই আরকি?কে মা হবে?আর কে বাবা হবে?তারা এটাই শিওর ছিল না শুধু।

__ নাঈম তোর মেজো মেয়ে নিধি মামনিকে আমার ছেলে আর্দ্রের বউ বানাতে চাই?তারই প্রস্তাব নিয়ে এলাম।
সোফায় পাশাপাশি বসে আছে তিন ভাই, আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনজনেরই স্ত্রী। আলিফা বেগম সবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিচ্ছেন একে একে। সিদ্দিকী বেগমের শরীর কাঁপছে অনবরত,কোনো অজানা অস্বস্তি গ্রাস করেছে তাকে।
নাঈম তালুকদার আগেই আন্দাজ করেছিলেন—তার বড় ভাই আজ এমন কোনো প্রস্তাবই দেবেন। তবু যখন কথাগুলো সত্যি মুখে এলো, তার ভেতরটা জ্বলে উঠল রাগে। কিন্তু মুখে তার কোনো ছাপ নেই। বরং তিনি হেলান দিয়ে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে চুমুক দিলেন চায়ে, তারপর মৃদু হাসি হেসে বললেন,,

__ প্রস্তাব ভালো কিন্তু আমি রাজি না।
উপস্থিত থাকা সকলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, নাজিম তালুকদার হাত থেকে চায়ের কাপ ট্রি টেবিলে রেখে বলে,,,
__ কেন?
__ আমি আগে থেকেই নিধির বিয়ে অন্য কোথাও ঠিক করে রেখেছি?
__ আমরা তো এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না?
__ মনে ছিল না বলার,এখন বলছি?
নাজিম তালুকদার চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলে বলে,,,
__আচ্ছা ঐসব বাদ,এখন আমি নিধি মাননি কে আমার পুএবধু বানাতে চাচ্ছি?
__ ভাইজান বললাম তো?
__ কি বললি তুই?
__ দেখো ভাইজান কথাটা যদি আর্দ্র না হয়ে আলবান হতো তাহলে ভেবে দেখতাম।
নাজিম তালুকদার বেশ ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে,,,

__ তুই কি কোনভাবে আর্দ্র কে এতিম বোঝাতে চাচ্ছিস?
__ সেটা তুমি মানো বা না মনো এটাই সত্যি।
নাজিম তালুকদার তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়িয়ে রাগি কন্ঠে হাক ছাড়লেন,,
__ মুখ সামলে কথা বল নাঈম, আর্দ্র আমার ছেলে ও এতিম না।
আলিফা বেগম নাজিম তালুকদারের কানে কানে ফিসফিস করে বলেন,,
__ মাথা গরম করবেন না দয়া করে,মনে রাখবেন ছেলে কিন্তু আবদার করেছে।
চোখ বন্ধ করে নিজের রাগকে সংযত করে সোফায় বসে আলিফা বেগমকে বলেন,,,
__ আলমারি থেকে কাগজ গুলো নিয়ে এসো?
আলিফা বেগম নিজের ঘর থেকে কাগজ গুলো এনে দিলেন নাজিম তালুকদারকে।তিনি কাগজগুলোকে নাঈম তালুকদারের সামনে ধরে বললেন,,

__ কাগজ গুলো দেখ,ভালো করে দেখ, আর্দ্র এতিম না আমি ওকে দত্তক নিয়েছি, আমার সব সম্পত্তি দুভাগে ভাগ হবে।যা আলবান আর্দ্র দুজনেই সমান ভাগ পাবে।
নাজিম তালুকদারের কথা গুলো নাঈম তালুকদার শুনলেন কি না তা অজান্তা,,
__ আমি যা বলার বলে দিয়েছি ভাইজান,আমি মেয়ে দিব না, ক্ষমা করো আমায়?
__ নাঈম আমার ছেলেটা আমার কাছে আবদার করেছে?
__ আমি ওতো সব জানি না? মেয়ে আমি দিচ্ছি না?
__ কিন্তু কেন? সমস্যা টা কি সেটা তো বলবি নাকি?
__ সমস্যা অনেক?তুমি বুঝবে না ভাইজান,এ নিয়ে আমাকে জোর করো না।
এবার আলিফা বেগম বলেন,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২২

__ ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসে নাঈম?ছেলে মেয়ে দুটোর ভালোর কথা চিন্তা করে হলেও…
__ ওসব ভালোবাসা টালোবাসা সীমিত,এক সময় সব ঠিক হয়ে যাবে।
__ এসব কি বলছো ভাই।সেই ছোট্ট থেকে…
কথা শেষ হতে না দিয়েই নাঈম তালুকদার চলে যান, পিছোনে ঘুরে আবার বলেন,,
__ আজ নিধিকে দেখতে আসবে,সবার উপস্থিতি কাম্য করছি?

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৪