তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৫
রাফিয়া জান্নাত রিফা
সকালের আলো ধীরে ধীরে ধরনীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। তালুকদার বাড়ির পিছনের আমবাগানে দাঁড়িয়ে মশা মারছে আর্দ্র। এই ক’দিনে মশার উৎপাত এমন বেড়েছে যে রীতিমতো অসহ্য। কালকের ঘটনার পর এমনিতেই মনটা খারাপ, তার ওপর এই মশার উৎপাত সব মিলিয়ে আর্দ্রের মেজাজটা একেবারে বিগড়ে আছে। হাত তুলে একটার পর একটা মশা মারছে আর মনে মনে তাদের গুষ্টি উদ্ধার করছে।
আসলে আমবাগানে আসার কারণটা হলো নিধি তাকে ডেকেছিল। কিন্তু সেই যে ডেকেছে, এরই মধ্যে বিশ মিনিট কেটে গেছে, আর আর্দ্র এখনো একা দাঁড়িয়ে মশার কামড়ে অস্থির।
বারবার মাথা উঁচিয়ে ফটক পানে তাকাচ্ছে কিন্তু বিথীর দেখা নেই।হুট করে পিছোন দিক দিয়ে কারো হাঁটার আওয়াজ আসলো আর্দ্র সেদিকে তাকালো,দেখলো নিধি চোরের মতো পা টিপে টিপে হাঁটছে, গাঁয়ে বিশাল এক শাল জড়ানো তাতে মুখ ঢেকে রেখেছে।
নিধি আর্দ্রের কাছে এসেই চোখ মুখ কুঁচকে বলল,,
__ ভারী কাপড় পড়েন নি কেন?
সত্যি বলতে নিধির আসার আগে পর্যন্ত আর্দ্রের শীত করছিল না কিন্তু এখন নিধির কথায় বেশ ঠান্ডা অনুভব করছে,নিধি দিকে তাকিয়ে পরিতৃপ্তির হাসি দিয়ে বলে,,
__ তোমার আসার অপেক্ষায় ছিলাম বোধহয়?
নিধি আর কিছু না বলে নিজ চাদরের ভিতর থেকে ঢেকে রাখা আর একটি চাদর বের করে আর্দ্র দিকে দিয়ে বলে,,
__ পড়ে নিন। প্রচুর ঠান্ডা নেমেছে আজ?
আর্দ্র মুখটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল,সে বোধহয় আশা করেছিল যে নিধির চাদরে জায়গা পাবে, কিন্তু নিধি সেটা আর হতে দিল কই। আর্দ্রের এমন মুখ দেখে নিধি বলে,,
__ কি হলো?
আর্দ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ গোমড়া করে বলল,,
__ পড়িয়ে দাও।
নিধি কিছুক্ষণ আর্দ্রের পানে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে,চাদর খানা ভালো করে মুড়িয়ে পেঁচিয়ে দিলো আর্দ্রের শরীরে। তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ থাকলো, ইস্তমস্ত বোধ হলো বোধহয়। আর্দ্র বলে,,,
__ পিছনের দরজা দিয়ে এলে যে?
__ ড্রয়িং রুমে মা ছিল?
__ নামাজ পড়েছো?
__ হুম,আপনি?
__ হুম ?
নিধি বেশ আগ্রহী হয়ে বলল,,
__ কাল বাবার কাছে গেলেন যে? কি বলল?
ব্যাস এ কথায় আর্দ্রের মুখখানা শুকিয়ে খাঁঠ হয়ে গেল,চাদরে ভালো করে হাত ডুবিয়ে নিয়ে বলল,,
__ কাল এক বিরাট কান্ড হয়ে গেছে।
মুহূর্তেই নিধি মুখে রাগি ভাব এনে বলল,,
__ কি কান্ড?
আর্দ্র আমতা আমতা করে করে বলতে লাগলো,,
__ পা ধরে কেঁদে কুটে তোমাকে চাইছিলাম,কে জানতো তাতে তোমার বাবার পড়নের লুঙ্গি খুলে যাবে?
রাগ হওয়ার কথা ছিল বোধহয় কিন্তু মোটেও নিধির রাগ হলো না বরং জোরে শব্দ করে হাসতে শুরু করে দিল,নিধি এমন হাসি দেখে একটু রাগ হলো আর্দ্রের তড়িৎ বেগে গিয়ে নিধির মুখ চেপে বলে,,
__ স্টপ নিধি,কেউ শুনলে খুব খারাপ হয়ে যাবে, হাঁসি থামাও।
নিধি তাও থামলো না বরং আর্দ্রের পেটের দিকে নিজের পিট ছেড়ে হাসতেই লাগলো,নিধির শরীর হাঁসির কারণে নেতিয়ে পড়েছে, হাসতে হাসতেই নিধি বলে,,
__ আপনি আমাদের তিন বোনের থেকেও এক খাঁটি উপরে?
কিছু এক চিন্তায় হঠাৎ নিধির হাসি থেমে গেল। চোখে নোনাজলের পরত জমে উঠল ধীরে ধীরে, বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল—এক অজানা ব্যথায় ভরে উঠল সমস্ত সত্তা। আচমকাই সে ঘুরে আর্দ্রকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর পরমুহূর্তেই হু হু করে কেঁদে উঠল। নিধির এমন হঠাৎ কান্নায় আর্দ্র ভয় পেয়ে গেল, তোতলাতে তোতলাতে বলল,,
__ ক কি হলো নিধি, এখুনি তো হাসলে আবার এখুনি কাঁদছো?কি হলো বলো আমায়?
নিধি নাক টেনে টেনে বলতে লাগলো,,
__ আপনি আমার জন্য বাবার পা ধরেছেন?
__ তাতে কি হয়েছে, অন্য কারো পা তো ধরি নি,ধরলে নিজের মেজো বাবার পা টাই ধরেছি। তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমি সব করতে পারি নিধি।
__ তাও আপনি কেন বাবার পা ধরতে গেলেন,আমি তো আপনি ছাড়া কাউকে বিয়েই করবোই না।সে বাবা যতই বলুক? চলুন তো আমরা পালিয়ে যাই?
__ না রে পাগলি, পারিবারিক ভাবেই আমাদের বিয়ে হবে দেখো?
__ যদি না হয়?
__ হবেই? এখন দূরে যাও কেউ দেখে ফেললে ভারী বিপদ হয়ে যাবে চড়ুই পাখি।
নিধি আর্দ্র বক্ষবন্ধনী থেকে ছড়িয়ে নিয়ে একটু দুরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো। তারপর মুখটাকে নিচু করে অসহায় ভাবে নিধি আবার বলে,,
__ হরলিক্সের গুষ্টি আবার আসবে?
__ আসুক?
__ আপনি আসতে বলছেন?
আর্দ্র ঘাড় বাঁকিয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ বিশ্বাস করো আমায়?
__ নিজের থেকেও বেশি?
__ তবে চিন্তা কি?
__ আপনাকে হারানোর?
__ এত সহজ নয়?
__ এত কঠিন ও নয় তবে চলুন পালিয়ে যাই?
__ বাবা মা পরিবারের দোয়া ছাড়া সুখী হতে পাবো না চুড়ুই পাখি?
__ শুধু তো বাবাই মানছে না?
__ তাহলে ভাবো তোমাকে পাওয়া কত সহজ?
নিধি এবার জ্ঞানীদের মতো বলতে লাগলো,,
__ শুনুন, পালিয়ে গেলে পরিবার মানবে না এক বছর,দুই বছর, অথবা হায়েস্ট তিন বছর তারপর ঠিকই মেনে নিবে কিন্তু আপনাকে হারালে ৮০ বছর কেন ১০০ বছরেও ফিরে পাবো না। বুঝলেন কি?
নিধির কথা আর্দ্রের কাছে যথেষ্ট যুক্তিসংগত মনে হলো। কিন্তু নিধি বুঝতে পারছে না যে কিছু বিষয় হাতে ধরে বোঝানো যায় না, তাদের কোনো দৃশ্যমান ভিত্তি থাকে না। বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসা জরুরি, ভালো থাকা জরুরি কিন্তু সেই ভালো থাকা যেন প্রিয় মানুষদের কষ্ট দিয়ে না হয়। হ্যাঁ,না হোক।
হ্যাঁ, আর্দ্রর কাছে নিধির ভালোবাসা প্রয়োজন, খুবই প্রয়োজন। কিন্তু সে কখনও চায় না, সেই ভালোবাসার বিনিময়ে আপনজনদের কষ্ট দিতে। যাঁরা এত ভালোবাসা দিয়ে, মমতা দিয়ে এই অনাথ আর্দ্রকে মানুষ করেছেন তাদের কষ্ট দিয়ে সে কীভাবে বাঁচবে? কিভাবে ভালো থাকবে।
মেজো বাবা সবসময় আর্দ্রকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছেন। কিন্তু এখন তাঁর আচরণ যেন পাল্টে গেছে, যা আর্দ্রের কাছে একেবারেই অজানা। নাইম তালুকদারের মধ্যে সে আর সেই পুরনো মেজো বাবাকে খুঁজে পায় না যিনি একসময় তাঁর আশ্রয়, নির্ভরতা আর সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন।
আর্দ্রের থেকে নিধি বয়সে অনেক ছোট তাই আর্দ্রের মনে প্রশ্ন জাগে, নিধি কি আদৌ এই সম্পর্কের গভীরতা ও মর্যাদা বুঝতে পারে? নিধি এখন সবকিছু ভাবছে কেবল আবেগ দিয়ে এখন বিবেক কাজ করছে না নিধির, আর করবেই বা কীভাবে? আর্দ্রের এই কয়েক দিনের ভালোবাসায় নিধি তো পুরোপুরি ভিজে গেছে সেই অনুভূতির জোয়ারে এখন যুক্তি-বিবেক সবই হারিয়ে ফেলেছে সে। কন্ঠে শীতলতা এনে নিধির দিকে ঝুঁকে বলে,,
__ বয়স কত?
যদিও জানে তবুও প্রশ্ন করলো।
নিধি কিছু টা সংকোচ নিয়ে বলে,,,
__ ১৮ বছর আট মাস?
আর্দ্র ফিচেল হেসে বলে,,
__ ১৮ বছর ধরে যে বাবা,মা বোন পরিবার তোমাকে আগলে রাখলো তাদের এত সহজে ভুলে যাবে।যে মা তোমাকে ১৮ বছর ধরে ভালোবাসলো, খাইয়ে দিল, যত্ন করলো,কথা বলা শিখালো,হাতে হাত ধরে হাঁটা শিখালো। তার কাছে কিভাবে তোমার আট দিনের ভালোবাসা মহান হয়।এটা আশা করি নি তোমার থেকে নিধি? কোথায় আঠারো বছর,আর কোথায় আট দিন, আকাশ পাতাল ফারাক চুরুই, বুঝতে পারছো তা? হ্যাঁ আমি তোমাকে ভালোবাসি অনেক ভালোবাসি।এই ভালোবাসার পূর্ণতা চাই আমি,তবে সেটা আপনজনদের কষ্ট দিয়ে নয়? বুঝতে পারছো তুমি?
ভালো ভাবেই সব বুঝলো ও শুনলো নিধি, কিন্তু তাও নিধির গোবরপরা মাথায় অন্য কথা ঘুরতে লাগলো,,
__ আমি অনেক দেখেছি ভালোবাসা ওসব সম্পর্ক,ও সমাজের ধার ধারে না। আপনি আমাকে ভালোবাসে না,হু।
এমন কথায় আর্দ্রের শরীর তিরতির করে কাঁপতে লাগলো, মুহুর্তেই চোখ লাল হয়ে উঠলো।রাগে নিজেকে সংযত করতে না পেরে ডান হাত তুললো নিধিকে থাপ্পড় মারার জন্য,তা দেখে ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো নিধি।নিধির গাল বরাবর এসেই আর্দ্রের হাত থেমে গেল, নিধি কে পারলো না মারতে আর্দ্র, এদিকে রাগ ও কন্ট্রোলের বাইরে,কি করবে বুঝতে না পেরে নিধিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বক্ষবন্ধনীতে। আর্দ্র চোখ বন্ধ করে নিল,রাগ সংযত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, নিধি আর্দ্রের বুক থেকে মাথা তুলে দেখতে লাগলো আর্দ্রের মুখ,বুঝলো যে মানুষটাকে সে বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলছে।এই পর্যায়ে আর্দ্রের চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো নিধির গালে,তা বুঝতে পেরে নিধি নিজেও কাঁদতে লাগলো, আর্দ্র শক্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,,
__ আমি এতিম নিধি?
কন্ঠটা এত্তো অসহায় শোনালো যে তাতে নিধির বুক কেঁপে উঠল, কান্নারৃ তোড় বেড়ে গেল,সে ও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আদ্রকে। আর্দ্র থেমে ফের বলে।
__ তালুকদার পরিবার ও তোমার দুই ভালোবাসাই চাই আমার। হ্যাঁ তোমার ভালোবাসা দিয়েই একজীবন পার করা সম্ভব, কিন্তু তাতে আপনজন দের ভালোবাসাকে তুচ্ছ করা হবে।সেটা আমি চাই না। কোন ভাবেই না?
আর কি বললে “ভালোবাসা এসব সম্পর্কের ধার ধারে না” ওসব ভালোবাসা আজ থেকে ঘৃণিত ভাবে গ্রহন করলাম। সমাজের কথা বাদই দিলাম সমাজের খাইও না আর পড়ি ও না। কিন্তু এই পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন গুলো,তুমি কিভাবে এসব বলছো নিধি?তবে কি আমি তোমায় চিনতে ভুল করেছি।আজ যদি আমি তোমাকে নিয়ে দুরে কোথাও চলে যাই তবে কি পারবে ইতি, বিথী কে ছাড়া থাকতে।
নিধি মনে মনে ভাবলো “আসলেই তো” ফের হকচকিয়ে আর্দ্রকে বলল,,
__ না আমি ওদের ছাড়া থাকতে পাবো না, আমার ভুল হয়ে গেছে সরি আর্দ্র ভাই।
মুচকি হেসে নিধির মাথা চুমু একে দিল আর্দ্র বলে,,
__ ইটস ওকে চুড়ুই পাখি, চিন্তা করো না তুমি আমারই থাকবে সব সম্পর্ক ও ঠিক থাকবে। এরকম কথা কই থেকে শিখছো চুড়ুই পাখি?
__ রিলস এ দেখছি?
__ ওসব তো কাল্পনিক শুটিং চরিত্র চুড়ুই।বাস্তবে ফিরে এসো, বাস্তবতা ফিল করো,দেখবে কল্পনা তোমাকে বাস্তব রুপে ধরা দিয়েছে।আই অ্যাম উইথ ইউ নিধি,আই লাভ ইউ সো সো মাচ।রিয়েল লাভ নট ফেক।বিকাজ টেন ইয়ার্জ অব লাভ।
নিধি আর্দ্রের বক্ষে মাথা রেখে মুচকি হাসলো, আর্দ্র আবার বলে,,
__ হয়েছে,এখন ঘরে যাও? আমার মীর জাফর হবু শশুর তোমায় এভাবে আমার বুকে লেপ্টে থাকা দেখলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।এমনি কাল এক আকাম করে এসেছি।এখন তো শশুরের সামনে যাওয়ার ও জো নেই।ছিঃ কি লজ্জা, কি লজ্জা।
নিধি আর কিছু না বলে হাসতে হাসতে চলে গেল। আর্দ্র পিছোন থেকে হাক ছাড়লো,,
__ চুড়ুই পাখি শুনো?
নিধি দাঁড়িয়ে যায়, আস্তে ধীরে ঘুরে তাকালো আর্দ্রের পানে, আর্দ্র তার সামনে হাত দুটো পিছমোড়া করে নিধির পানে তাকিয়ে আছে।নিধি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি আর্দ্র বলে,,
__পিছনে ঘুরো।
নিধি কোন কথা না বলে পিছনে আবার ঘুরে দাড়ালো। আর্দ্র আস্তে করে নিধির মাথার কাপড়টা সরালো, খোঁপা করা চুল গুলোকে পিটে ছড়িয়ে দিল তারপর হাতে থাকা প্যানসি ফুল গুলো এক এক করে গুজে দিতে লাগলো নিধির চুলে। হলুদ রঙের ছোট ফুল গুলো চুলে বেশ আকর্ষণ কাড়ছে নিধির,ফোন বের করে সেই চুলের কিছু ছবি ও তুলে নিলো আর্দ্র। পরক্ষণে ফোন পকেটে রেখে একটি প্যানসি ফুল নিধির কানে গুঁজে দিল।নিধির সামনে গিয়ে নিধি কে ভালো করে পরখ করে বলল,,
__ যাও এখন?
কে জানি হঠাৎ নিধি কি ভেবে লজ্জা পেয়ে দৌড়ে চলে যেতে লাগলো। আর্দ্র নিধির যাওয়ার পানে তাকিয়ে হাসলো শুধু।
আলবানের ঘরের কাউচে বসে আছে ইতি, বিথী ও দির্শক। দির্শক হেলান দিয়ে ফোন স্ক্রল করছে। আলবান ওয়াশরুমে আছে।আর্দ্র ও নিধিকে ডাকা হয়নি, কারণ আজকের আলোচনা তাদের নিয়েই হবে।নিধি তো ইতি ও বিথীর সঙ্গে আসার জন্য ঝগড়া করেছিল, এখন মনে হয় সে ঘরে বসে মুখ ফুলিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কাদছে।
ইতির মেজাজ প্রচণ্ড গরম হয়ে আছে আলবান ভাইয়ের জন্য। রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক কারণ আধা ঘণ্টা হলো আলবান ওয়াশরুমে ঢুকেছে, এখনও বেরোনোর নাম নেই। রাগে নাকের পাটা ফুলে উঠছে ইতির।
বিথীর থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে দির্শক। বিথী তার ফোন লক্ষ্য করছে, কিন্তু সরাসরি কিছু করছে না হাতে ফোন নিয়ে শুধু অ্যাপগুলো স্ক্রল করছে। বারবার আড়চোখে দির্শকের দিকে তাকাচ্ছে, যেন দেখার চেষ্টা করছে দির্শক ফোনে কী করছে। যদিও সত্যিই কিছু দেখা যাচ্ছে না।এদিকে দির্শকও চুপচাপ বিথী ফোনে কি স্ক্রল করছে তা আড়চোখে দেখছে, যদিও তেমন কিছু বের করতে পারেনি। তাই হালকা এক ফিচেল হাসি খেললো তার ঠোঁটে। দুজনেই দুজনের দিকে দেখছে কিন্তু একবার ও তাদের দৃষ্টির মিলন ঘটলো না।
আলবান গুনে গুনে ৩৫ মিনিট সাত সেকেন্ডে পর বের হলো ওয়াশরুম থেকে,ইতি নিজে সময় গুনেছে বলে কথা।আলবান মাথা টাওয়েল দিয়ে মুছতে মুছতে ওয়াসরুম থেকে বের হলো ।
মাথা থেকে টাওয়েল টা সরিয়েই ইতি মুখে ছুঁড়ে মারালো।রাগের গতি বেড়ে গেল ইতির রাগের ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিতে লাগলো,মুখ থেকে গামছাটা ছড়িয়ে বড় বড় রাগি চোখে আলবানের দিকে তাকিয়ে রইল,আলবান তা দেখে বলল,,
__ সমস্যা কি?নাগিন রুপ ধারণ করবি বুঝি,ও বাবা ফোঁস ফোঁস করছে,যাহহহ টাওয়েল টা বেলকনিতে মেলে দিয়ে আয়।
ইতি রাগ নিয়েই গটগট পায়ে বেলকনিতে টাওয়েল মেলে দিতে গেল।আলবান একটু অবাকই হলো তার বিশ্বাস হলো না ” ইতি তার কথা মতো টাওয়াল খানা মেলে দিতে গেল”।
ইতি সোফায় এসে আবার বসলো।দির্শক বসার জন্য এগিয়ে এলো ইতির দিকে,এসে গম্ভীর কন্ঠে বলল,,
__ সরে যা?
রাগ দেখিয়ে ইতি বলে,,
__ ওপাশে বসতে পারচ্ছেন না?
__ না সর?
__ পাবো না?
আলবান এবার টেবিল উপর থেকে কাঠের স্কেল খানা এনে বলে,,
__ জায়গা দিবি নাকি দু ঘা খাবি।
ইতি রাগি চোখে আলবানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে ট্যাপট্যাপ করে কিছু বলল, পরক্ষণেই সরে গিয়ে জায়গা দিলো আলবানকে।আলবান বসলো কিছুক্ষণ ইতি নাক মুখ কুঁচকে আলবানের উপর নিচ প্ররখ করলো,কালো ট্রি শার্ট ও ধূসর রঙের টাউজার।তখনি ইতি নাকে আলবানের শরীর থেকে ভেসে আসলো মিষ্টি ঘ্রাণ,চোখ বন্ধ করে গন্ধ টা শুঁকে নিলো। কিছুক্ষণ পর কিছু একটা ভেবে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে নিল,তা দেখে বিথী বলে,,
__ কি রে মুখ ডাকলি যে?
__ কোন এক ব্যক্তির গা থেকে প্রচুর গন্ধ পাচ্ছি?
__ কই আমি তো পাচ্ছি না।
আলবান ভালো করেই বুঝলো যে কথা খানা তাকেই বলল ইতি, গম্ভীর কন্ঠে আলবান ইতি কে উদ্দেশ্য করে বিথী করে বলে,,
__ বিথী এই আবর্জনা ইডিয়ট কে নিয়ে এসেছিস কেন বল তো?
ব্যাস কাচা গাঁয়ে নুনের ছিটা দিলো আলবান রাগে গজগজ করে ইতি বলে,,
__ আমি,আমি আবর্জনা,আমি আবর্জনা হলে আপনি দুর্গন্ধ যুক্ত মানুষ।
__ আমি দুর্গন্ধযুক্ত মানুষ তাই না?
__ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।
এই বলে বিথীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো ইতি। আলবান কাছে থাকা কুশানটা ইতির দিকে ছুড়ে মেরে বলে বলে,,
__ ওই কাল নাগিনী,তোর এই নোংরা ওড়নাটা আমার গায়ে পড়ে আছে দেখছিস না,সরা বলছি,সরা এটা, ইডিয়েট।
ইতি ওড়না তড়িৎ বেগে আলবানের কোল থেকে সরিয়ে নিয়ে বলে,,
__ ওড়নাটায় গন্ধ ধরে গেল, ছ্যাঁ ছিঃ।
ব্যাস আলবান ও ইতির ঝগড়া চলতেই থাকলো তার মাঝেই বিথী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,,
__ দুশমন স্যার চলুন আমরা চলে যাই,এখানে আমাদের কোন কাজ নেই?
দির্শক ও ওঠে দাঁড়িয়ে বলল,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ চলো?
বিথী ও দির্শকের চলে যাওয়ার কথা শুনে ইতি ও আলবানের ঝগড়া থামলো।
এবার চারজনই বেশ সিরিয়াস মুডের হয়ে গেল,আলবান বলে,,
__ কে যেন সলা পরামর্শ করার জন্য এসেছে, তাঁকে আলোচনা শুরু করতে বল।
ইতি মুখ বাঁকিয়ে বলে,,
__ হরলিক্সকের পরিবার আবার আঠসবে বলেছে,তারা অনেক অনুরোধ করেছেন বাবাকে,তাই বাবা তাদের আসতে বলছেন?
তখনি বিথী মাথা একটা আইডিয়া এলো এবং হকচকিয়ে বলতে লাগলো,,
__ আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে?
দির্শক বলে,,
__ গ্রহনযোগ্যকর হবে তো?
__ আগে শুনুন তো?
আলবান, ইতি একসাথে বলে,,
__ হ্যাঁ বল?
একসাথে কথাটা প্রতিধ্বনি হয়েছে বলে দু’জনেই মুখ বাঁকিয়ে নিলো, বিথী বলতে লাগলো,,
__ নিধি আর আমি তো একই রকম দেখতে,তো আজ নিধিকে দেখতে এলে নিধির জায়গায় না হয় আমি গেলাম।মানে কথা হচ্ছে নিধির তো মনে মানুষ আছে তাই সে বিয়ে করতে চাচ্ছে না। কিন্তু আমার তো কোন মনে মানুষ নেই।আমার ও বিয়েটা হয়ে গেল নিধি ও পাদরো ভাইকে পেলো। সুন্দর না ?আর হরলিক্স ছেলেটাও বেশ ভালো।
বিথীর এমন কথায় দির্শকের মুখ নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে ধীরে মাথা নিচু করে নিল। ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে তার বুক জ্বলে উঠছে। রাগের তীব্রতায় কপালের রগগুলো ফুলে উঠেছে, চোখের গভীরে লাল আগুনের রেখা জ্বলে উঠেছে যেন সামান্য উস্কানিতেই সেই দহন ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে।
আলবান কিছুক্ষণ হা হয়ে ভেবে বলে,,
__ আসলেই বিথী,তোরা তিন বোনেই এত বুদ্ধিমতি, এতো বুদ্ধিমতি যে, বুদ্ধিতে বুদ্ধিতে ক্লাস করে বুদ্ধি থেকে বুদ্ধিই বাড়ে,সেই বুদ্ধির থেকে আর উদ্ভট বুদ্ধি বিকাশ ঘটে। কত্তো বুদ্ধি, বাব্বাহ!
বিথী কে হা হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আলবান আবার বলে,,
__ কি কিছু বুঝলি না তো?
বিথী মাথা নাড়িয়ে না বলল। আলবান ফের বলে,,
__ আসলে আমি ও কিছু বুঝিনি।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৪
দির্শকের এখানে আর এক মুহূর্তও থাকাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো, হঠাৎ এমন রাগের কারণটা দির্শকের কাছেও অজানা, কিন্তু বিথীর কথা তার মোটেও প্রছন্দ হয় নি।তাই সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ না করে গটগট পায়ে আলবানের রুম ত্যাগ করলো। আলবান দির্শকে অনেকবার ডাকলো কিন্তু দির্শক তাতে সাঁড়া দিল না। তিন জনেই দির্শকের এমন কান্ডে হা হয়ে চেয়ে রইলো। বিথী কিছু একটা ভেবে সে ও চলে গেল।
ইতি এবার সব দোষ আলবানকে দিতে লাগলো,আলবান ও সব দোষ ইতিকে দিতে।কাজের কাজ তো কিছুই হলো না সব অকাজ হয়ে গেল। ইতি একটু বেশি ঝগড়া করে ফেলেছে তাই রাগ দেখিয়ে আলবান স্কেল নিয়ে তেড়ে যেতে লাগলো ইতির দিকে।ইতিও আলবানকে জিবা দেখিয়ে ভো দৌড় দিলো।
