Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৩

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৩

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৩
রাফিয়া জান্নাত রিফা

ভরপুর বিয়ে বাড়ি, যদিও সংখ্যালঘু। এদিকে সুন্দর এক প্লান এঁটেছে নিঝুমের ভাই নিখিলকে শালা হিসাবে পটাতে হবে। কিন্তু সুন্দরের এমন খাতিরপনা মোটেও পছন্দের না নিখিলের।ছাদে সব বাচ্চাদের সাথে খেলছিল নিখিল। হঠাৎ সুন্দরের এন্ট্রি ঘটলো হিরোদের মতো। লুঙ্গি থেকে ঘুচে রাখা চিরুনিটা বের করে স্টাইলিশ আকারে মাথাটা চিরুনি করে নিলো সুন্দর এবং বলল,,

__ হোয়াটসঅ্যাপ শালা বাবু।
ব্যাস সব বাচ্চারা একসাথে শালাবাবু শালাবাবু বলে চেঁচাতে লাগলো, তখন সুন্দর চলে গেল তাজ্জব বনে, অনেক কষ্টে সবাইকে চুপ করালো,বেশ তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে নিখিল বলে,,
__ খেলার মাঝে ডিস্টার্ব করলে কেন,আর কে তোমার শালা বাবু?
চোখ কুচকিতো করলো সুন্দর,গলা ঝেরে কেশে সুন্দর ফের বলে,,,
__ তোর বোন..
কথা শেষ হতে না দিয়েই নিখিল বলে,,
__ বিয়ে হয়ে গেছে।
সুন্দর আবাক হয়ে মনে মনে বলে,,,
__ ওরে বাসসস কি চালাক রেয়।
সুন্দর সে কথাকে আর গাঁয়ে না মেখে শার্টের পকেটে থেকে একটা চকলেট বের করে নিখিলকে দিলো, সুন্দর দেওয়ার আগেই নিখিল সেটা ছো মেরে নিয়ে মিশকাত সহ খেয়ে ফেলল, নিখিল খেতে খেতে বলে,,

__ বিয়ে হয়নি।
__ তোর বোনের বিয়ে হয়নি তো আমি কি করবো? এক মিনিট কোনভাবে তোর বোনকে কি আমার সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছিস নাকি?
__ তোমার ধান্দা কেমন তা আমি ভালো করেই জানি?
সুন্দরের চান্দি মান্দি গরম হয়ে গেল,তাকে যে নিখিল ধান্দাবাজ বলেছে তা বুঝতে বাকি রইল না সুন্দরের,,
__ তুই শালা নামে কলঙ্ক, যাহহ কথাই কইতাম না তোর লগে,মাদারির পো।
এই বলে গটগদ পায়ে প্রস্থান ত্যাগ করলো সুন্দর।

নিধি তখন থেকে মিশকাত ও নিখিলকে ভাবি বলার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু তারা কিছুতেই ভাবি বলবে না নিধিকে।একটু পর বিয়ে আর এখন ও এদের ভাবি বলাতে পারছে না নিধি।নিধির ভাষ্যমতে আলবান ভাই,ও সুন্দর ভাই তো তাকে ভাবি বলবে না,তাহলে বিয়ের পর কে নিধিকে ভাবি বলবেটা কে।কেউ যদি ভাবি না বলে তাহলে নিধি যে আদ্রের বউ এই ফিলটা আসবে কোথ থেকে,তাই তো অনেক ভেবে চিন্তে নিখিল, মিশকাত কে বলছে ভাবি বলার জন্য ওদিকে মুহিন কেও নিধি বলেছে “তাকে যাতে ভাবি বলে সে” এদিকে মুহিনের নাকি ভাবি বলতে লজ্জা করে,সে ও কিছুতেই ভাবি বলতে পারবে না।নিধির মেজাজ সপ্তম আসমানে, কান্না পাচ্ছে খুব। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে আর্দ্রকে ফোন করলো দুইবার রিং হতেই আর্দ্র ফোনটা ধরলো, আর্দ্রকে হ্যালো বলার ও ফুসরত টুকু না দিয়ে নিধি জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো,এমন কান্নায় ব্যাতিব্যস্ত হয়ে আর্দ্র বলল,,

__ কি হয়েছে, কাঁদছো কেন?এই চূড়ুই কাঁদো কেন?
নিধি কান্না করতে করতে অভিমান সুরে বলে,,
__ আমাকে কেউ ভাবি বলছে না পাদরো ভাই।
আর্দ্র হাসতে চেয়েও হাসলো না,,
__ সেই তো তুমিও আমায় ভাই বলছো?
নিধি ভাবলো আসলেতো সে এখনো কেন আর্দ্র কে ভাই বলছে,তাহলে কি বলে ডাকবে,সে তো কিছুতেই আর্দ্র নামটাও বলতে পারবে না।নিধি ফের কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,
__ বর গো আমায় ,ইতি, বিথী, নিখিল,মিশকাত, মুহিন, নিঝুম কেউ এ ভাবি বলছে না
আর্দ্র নিঃশব্দে হাসলো,ফোন নিয়ে ব্যঙ্গ হুমকির স্বরুপ বলল,,

__ কার এত বড় সাহস যে আমার বউ কে ভাবি বলছে না,তাদের কাউকে ছাড়বো,আমি দেখছি ব্যাপারটা।
এবার স্বর নরম করে নিধি কে বলে,,
__ ফোন রাখো সোনা, ব্যপারটা আমি দেখছি।
হাঁসি খুশি মনোভাব নিয়ে নিধি বলে,,
__ ওকে বরসোনা।
তখনি আর্দ্রের ঘরে প্রবেশ করেন আলিফা বেগম, আদ্রকে হাসতে দেখে তিনি বলেন,,
__ হাসছিস যে।
হাঁসি থামিয়ে আলিফা বেগমকে বলে,,
__ তোমার বউমাকে ইতি, বিথী, নিঝুম, মুহিন, নিখিল, মিশকাত কেউ ভাবী বলে ডাকছে না,এ নিয়েই বড্ডো চিন্তায় ডুবে আছে সে।
আলিফা বেগম বলেন,,

__ এ তো ভারী খারাপ কথা,ভাবী বলছে না কেন তারা?
__ বলে দিবো তাদের।
আলিফা বেগম ছেলেকে বিছানায় বসিয়ে বলে,,
__ শোন বাবা বিয়ের পর কিন্তু অনেক দায়িত্ব,নিধির বাচ্চামো স্বভাবটা তোর কাছেই লোপ পায় বেশি।নিধি কে কোনভাবেই কষ্ট দিবি না।ঠিক আছে।
মায়ের কথায় আর্দ্র মুচকি হেসে মাথা চুলকাতে লাগলো আলিফা বেগম আবার বলে,,
__ কি রে।
__ ঠিক আছে মা,তুমি চিন্তা করো না।
এই বলে আলিফা বেগম চলে যান। একটু আগে একই কথা আলবানকেও বুঝিয়ে আসলো যদি ও সে বুঝতে নারাজ তার মতে ” ইতি বেশী বাড়াবাড়ি করলে ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দিব”।
আলিফা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ঘর থেকে চলে গেলেন।

ছাদের ওপরে আজ হবে সুরের যুদ্ধ। একদিকে ইতি, বিথী, নিঝুম আর পিকি স্বভাবতই প্রাণচঞ্চল সেই দলটি অপরদিকে আলবান, দির্শক, সুন্দর আর মুহিন।ফুল দিয়ে সাজানো স্টেজে নিধি,ও সুহানা মুচকি হেসে হেসে উপভোগ করছে সবটা।
আলবান ও ইতির চোখাচোখি হতেই মুহূর্তে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল উত্তাপ। রাগে দু’জনেই ফুঁসছে,মুখ ভেংচি কাটছে যেন এরা নিজেদের নিচেই না।অথচ বৈপরীত্য আজই তাদেরও বিয়ে!
দির্শকের মন আজ ভারে নত। আচরণে তা স্পষ্ট কোনো প্রবল দুশ্চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার লালচে চোখ, কপালের ভাঁজ সবই বলে দিচ্ছে রাগ, অভিমান কিংবা অশান্তি কিছু একটা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। বিথীর চোখে তা ধরা পড়তে দেরি হলো না। অথচ বিথীর নিজের মনও আজ অস্থির, অদৃশ্য কোনো বিষাদ তাকে পুরোটা দিন জুড়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, কারণ একটাই তার তিন তিনটে বোনের বিয়ে হবে, অথচ তার হবে না। এদিকে বিথীর কোন ছেলেকেই ভালো লাগে না কারণটা হলো যে ছেলের দিকে তাকায় বিথী সেখানে দির্শকের নীল চোখ গুলো ভেসে ওঠে।আসতে করে ইতি,নিধির কাছ থেকে নিজেকে সরে চেয়ারে বসা দির্শকের কাছে যায়,,

__ দুষ্শমন স্যার।
ঘার কাত করে বিথীর পানে তাকালো ,,
__ হুম।
__ কাল আমায় বাড়িতে রেখে কোথায় গেছিলেন।
__ কাজে।
__ ওহহ
বিথী অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে ফের বলে,,,
__ আপনার কি মন খারাপ?
__ মন থাকলে না মন খারাপ করবো।
__ আমার ও মন খারাপ কেন জানেন?
__ তিন তিনটে বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তোমার হচ্ছে না তাই।
ফট করে বিথী বলে,,
__ আপনি জানলেন কি করে।
দির্শকে কথায় উওর করে না,এক হাত কুনূই এ ভর করে আঙ্গুলের সহিত কপালে স্লাইস করতে করতে বলতে লাগলো।,,,

__ চোখ সব দেখে,কান সব শুনে, ব্রেন সব গুছিয়ে রাখে।
__ একটা কথা বলি।
__ একটা কথা বললে তা শুনে কি হবে?
__ …. শুনবেন কি?
__ বলো।
__ আপনাকেই প্রশ্ন করবো স্যার।
__ করো।
__ ডু ইউ লাইক মি স্যার।আই থিংক ইয়েস,এটা আমার ভাবনা থেকে বলছি।
দির্শকের দৃষ্টি এতক্ষণ যাবৎ মেঝেতে নিবব্দ ছিলো, কিন্তু এখন দির্শকের চোখ বিথীর চোখে দিকে তাকিয়ে।চোখ কিছুটা কুঁচকানো হলো দির্শকের, কিছুক্ষণ ভেবে বলে,,
__ ইয়েস আই লাইক ইউ সো হোয়াট।
বিথী হা হয়ে চেয়ে রইলো দির্শকের পানে,ফের হেসে বলতে লাগলো,

__ মানে আপনি একজন শিক্ষক হয়ে ছাএীকে পছন্দ করেন,সি সি স্যার সি।
এই বলে বিথী মুখে হাত চেপে হাসতে হাসতে চলে গেল।দির্শক কিছুক্ষণ বিথী যাওয়ার পানে তাকিয়ে,কপাল ভাঁজ করে কি যেনো ভাবতে লাগলো।
পিকি ও মুহিন বহুক্ষণ ধরেই আলবানকে একটা গান ধরানোর জন্য অনুরোধ করছে। শুরুর দিকে আলবান একেবারেই রাজি হচ্ছিল না। গান নয়, যেন কোনো পাহাড় টলাবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তাকে। অবশেষে তাদের লাগাতার জেদ আর অনুনয়ে নতি স্বীকার করে আলবান গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের মতো করে প্রস্তুত হলো।
গানের দির্শকের মতো সে ওতটা কৃতিমান নয়,তবে গানের সুরে তার অদক্ষতা নেই, এটুকু ইতি-উত্সুক সবাই জানে।
গাইবার আগে আলবান চোখ কুঁচকে ইতির দিকে তাকিয়ে রইল।ইতি ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। সেই প্রতিক্রিয়ায় আলবানের মুখে ক্ষীণ এক বিদ্রূপী হাসি ঝলকে উঠল। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আলবান সুরে ভাসতে শুরু করল,,,

__ সংসার সুখী হও রমনীর গুনে
আজকের মেয়েরা কি সেই কথা মানে
ফুটোটা নাড়ে না যে, শরীরে মেদ বাড়ে
সকালে যায় জিমে, দুপুরে পার্লারে
রাতে মেগা সিরিয়ালে ডুব দিতে জানে…
ওরে পাগলীরে,ছেলেরা নয় বিয়ে পাগলারে
ওরে পাগলীরে,ছেলেরা নয় বিয়ে পাগলারে
মুহিন আর সুন্দর গানের তালে তালে হাত নেড়ে মেয়েদের দিকে ইশারা করে রসিকতা করতে লাগল যেন সুরের সঙ্গে ব্যঙ্গেরও আলাদা এক তাল মিলেছে। তাদের এই কৌতুকভরা আচরণে মেয়েরা ক্রমেই অস্বস্তি ও ক্ষোভে তেতে উঠল।
এদিকে আলবানের গাওয়া থামতেই ইতি অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামান্য সুর মিলিয়ে পরের লাইনটা ধরে ফেলেছিল।ইতির গানের কন্ঠ সুন্দর তাই বিথী ইতিকেই পরের লাইন গুলো বলতে বলল,,,

__ সংসারে সুখ আসে মোটা ইনকামে
মেয়েরা যে তাই ছোটে অফিসের কামে
সংসারে সুখ আসে মোটা ইনকামে
মেয়েরা যে তাই ছোটে অফিসের কামে
ছেলেরা বড় খোড়ে,মুখে পাপেলা ঝরে
ঘুমিয়ে খেলা দেখে,অকালে ভূড়ি বাড়ে
মিছে দোষ দেয় শুধু মেয়েদের নামে…
ওরে পাগলারে,মেয়েরা নয় বিয়ে পাগলীরে
ওরে পাগলারে,মেয়েরা নয় বিয়ে পাগলীরে।
ইতির গানে তেড়ে বসা থেকে উঠলো আলবান,মেজাজ দেখিয়ে পরের লাইন গুলো বলতে লাগলো।চারদিকে তখন গানের আসর একেবারে জমে গেছে। সুর, তান আর ছন্দ মিলেমিশে হাসি-ঠাট্টার সঙ্গে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে।কোথাও সামান্য রাগ, কোথাও দুষ্টুমিভরা টিপ্পনী, আবার কোথাও খিলখিল করে ওঠা হাসির শব্দ সব মিলিয়ে যেন মুহূর্তটি একটি জীবন্ত, রঙিন উৎসব।গান থামছে না আর সেই সঙ্গেই থামছে না আসরের প্রাণচাঞ্চল্য।
আলবান ও ইতির গান শেষ হলে সুন্দর গান ধরে,,,

__ দিন দুপুরে মনের ঘরে ডাকাত পড়েছে
তোর সিল্কি চুলের বিউটি ফুল এক নেশা ধরেছে
মাশাআল্লাহ, ও মাশাআল্লাহ
মাশাআল্লাহ তোর জেল্লা আমায় ঘায়েল করেছে
মাশাআল্লাহ তোর জেল্লা আমায় ঘায়েল করেছে
মাশাআল্লাহ তোর জেল্লা আমায় ঘায়েল করেছে
দিন দুপুরে মনের ঘরে ডাকাত পড়েছে।
গান খানা নিঝুমকে শুনিয়েই বললো সুন্দর। সুন্দরের চোখে নিঝুম কে আজ তার স্বপ্নের দেখা পরীর মতো লাগছে।গান বলার পর সুন্দরের চোখে চোখ রেখে উচ্চারিত সেই কথাগুলো তাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলল হৃদস্পন্দন যেন কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেল নিঝুমে্য। কিন্তু অস্বস্তির আড়ালেও লজ্জার মৃদু রঙ গাল দুটোতে ছায়া ফেলল।সে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল, তবু হাসিটা লুকিয়ে রাখতে পারল না।চোখ নামিয়ে নিয়ে নিঝুম চুপিচুপি মুচকি হেসে গেল। নিজের অজান্তেই আজ হৃদয়ের গোপন কোনো দরজা খুলে গেছে নিঝুমের।
এক এক করে পিকি, মুহিন,নিখিল , মিশকাত, নিখিল গান গাইলো। সর্বশেষ গান গাওয়ার জন্য জোর দেওয়া হলো দির্শককে। এদিকে গান করার মতো কোন মত নেই দির্শকের, কিন্তু বিথী তাকে একপ্রকার চোখের ইশারায় অনুনয় বিনয় করলো,তাই এখন দির্শকের মন না চাইলেও গান গাইতেই হবে, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে মুহিনের কাছ থেকে তার গিটার খানা নিয়ে টুং টাং করে গান ধরলো,,,

__ কতবার বোঝাবো বল..
কতবার জানাবো বল…
নিঃস্ব এ জীবনে শুধু তুই আমার সম্বল….
কতবার বোঝাবো বল..
কতবার জানাবো বল…
নিঃস্ব এ জীবনে শুধু তুই আমার সম্বল…
যতনে রেখেছি তোকে মনের গভীরে..
তোর দেখা না পেলে হয় মন বড়ই চঞ্চল..
দির্শকের গানের সুর যেন মুহূর্তেই ছাদভর্তি হাওয়ার দিশা বদলে দিল। তার কণ্ঠের মাদকতায় সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল এক নিঃশব্দ বিস্ময় আর মুগ্ধতার পরতের ওপর দাঁড়িয়ে। সুরের প্রতিটি ঢেউ উপস্থিত শ্রোতাদের মনকে আলতো করে স্পর্শ করছিল, আর সেই স্পর্শে কেউ না চাইতেও ডুবে যাচ্ছিল নিজের নিজের গোপন কল্পনার জগতে।
কারও চোখে ভেসে উঠেছিল তাদের প্রিয় মানুষের মুখ। কেউ স্মৃতির ভিড়ে হাঁটছিল নীরবে। এমনকি ইতি যে নিজেকে দৃঢ় রাখার চেষ্টা করে,সেও গানটির স্নিগ্ধ গভীরতায় অজান্তেই তলিয়ে যাচ্ছিল কল্পনায় আলবানকে নিয়ে নরম স্বপ্নের পথ ধরে হাঁটছিল সে।

এদিকে সুন্দর মহারাজও ছাড়লেন না তার স্বভাবসুলভ কৌতুকমিশ্রিত রোম্যান্টিক মনোভাব। গানের সুর তার মনে যেন অদ্ভুত এক নাচের আমেজ জাগিয়ে তুলল। কল্পনায় সে সালসা ডান্স শুরু করেছে হাতের মোচড়, পায়ের ছন্দ, সুরের কোমল দোলা সব মিলিয়ে পুরোপুরি তালেই ছিল সুন্দর।
কিন্তু তার কল্পনার মঞ্চও বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল না। হঠাৎই নিঝুমের ভুলভুলাইয়া পায়ের ধাক্কায় তার লুঙ্গি আলগা হয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম! তবু সুন্দর মহারাজ একটুও লজ্জা পেল না কল্পনাতেই তো সব, আর সেও তখন রোমান্টিক মুডে ভাসছে। তাই ঘটনাটা তাকে বিব্রত না করে বরং আরও মজার, আরও প্রাণবন্ত করে তুলল তার কল্পনায় সাজানো সেই নৃত্যমঞ্চকে।

বিথীর দির্শকের এমন মন মতানো সুরে গর্ব বোধ করলো বিথী, কিন্তু কেন?এটাই মাথায় ঢুকলো না। বিথীর মাঝে মাঝে দির্শকের সব গুনের কাছে নিজেকে খুব ফিকে লাগে,আজকেও তেমটাই হলো। মাঝে মাঝে যখন দির্শক কে নিয়ে বিথী অতিরিক্ত ভেবে ফেলতো তখন নিজেই নিজেকে কটাক্ষ করে বলতো,,
__ ছি বিথী ছি, কোথায় দির্শক প্রধান আর কোথায় তুই।
দির্শকই একমাত্র জানলো এই গানটা কাকে উদ্দেশ্য করে ছিলো, বিথীর জন্যই ছিলো। বিথী জানলে হয়তো তার মনটা থৈ থৈ করে নেচে উঠতো।

বার ১০ টা
সুহানার হবু বর হরলিক্স তার সপরিবার ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে এসে পৌঁছেছে। অনুষ্ঠানস্থলের স্টেজে তাজা ফুলে সাজানো সোফায় তারা গম্ভীর অথচ উৎসবমুখর ভাবেই বসে আছে। চারদিকে গুঞ্জন, আলো, মানুষের নড়াচড়া সব মিলিয়ে যেন এক ব্যস্ত অথচ আনন্দঘন পরিবেশ।
আলবানেরও সেখানে বসার কথা ছিল কমপক্ষে সামাজিকভাবে উপস্থিত থাকার নিয়মটুকু হলেও। কিন্তু সে বসেনি। তার মনে আজও একই আপত্তি এভাবে বিয়ে করতে সে চায় না। রীতি অনুযায়ী, নিজের সম্মতি ও নিজের সিদ্ধান্ত ছাড়া যে সম্পর্কে প্রবেশ করা যায় না, সেই দৃঢ় বিশ্বাস জেদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ভেতরে।
তবু আয়োজনে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত কাজি সাহেব আজ ইতি ও আলবানের বিয়েও পড়াবেন। এই বিয়ে হয়তো পুরোপুরি ভালোবাসার স্বীকৃতিতে নয়, বরং সামাজিক প্রকাশে বাঁধা এক আনুষ্ঠানিকতা। মানুষ দু’টো কথা বলবেই কেউ বিরূপ মন্তব্য করবে, কেউ ভ্রু কুঁচকাবে। কিন্তু তা নিয়ে কেউই খুব একটা ভাবছে না। কারণ যাই হোক, কিছু সত্যকে সমাজের সামনে দাঁড় করানোই কখনো কখনো প্রয়োজন হয়ে ওঠে।
তালুকদার বাড়ির পুরুষরা সবাই সবুজ পাঞ্জাবি পরিধান করেছেন,মেয়েরা নীল শাড়ি ও লেহেঙ্গা।
সুহানা,ও নিধি কে একদম সুন্দর বধু রুপে সাজিয়ে দিয়েছে পিকি। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাদের।নিধির বিয়ের লেহেঙ্গা খয়েরী রঙের ও সুহানার হেলেঙ্গা লাল রঙ্গের।পিকি দুজনকেই সাজিয়ে দিয়ে তাদের আয়নার সামনে দ্বার করিয়ে,নজর কাটালো পিকি,,

__নজর লাগতে পারে এই নাও, দু’জনের নজর কাটা হয়ে গেল।
তারপরই দরজা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়ল ইতি, বিথী, নিঝুম আর মিশকাত চারজনের মুখে একইরকম বিস্ময়।
বিথী কিছুক্ষণ নিধি ও সুহানাকে স্তব্ধ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ পিকিকে বলল,,
__ পিকি ভাই আমার বিয়েতেও আমায় এভাবে সাজিয়ে দিবে,বলো দিলাম।
পিকি হাসতে হাসতে বলে,,
__ ওকে বাবা দিবো।
ইতি নিধির কাছে গিয়ে বলে,,,
__ বলদি কান্না না করলে তোর বারোটা বাজাবো।
নিধি নিজেকে ঘুরে ফিরে আয়নায় দেখে বলে,,
__ মনের মানুষকেই তো বিয়ে করছি এতে কান্নার করার কি আছে।
এদিকে সুহানা হা হয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে আছে, সুহানার আফসোস হলো,,
__ ইসসস আমিও যদি এভাবে বলতে পারতাম।
পিকি ইতিকে বলে,,

__ তুমি সাজবে না ইতি।
__ নো নেভার।
__ তোমার ও তো বিয়ে।
__ ওটাই তো টেনশন।কি করে যে বিয়েটা আটকাই, বিথী টাকে ছাড়া কেমনে যে বিয়ে করি।
বিথী গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
__ তুই কি আমাকে খোঁটা দিলি।
ইতি খিলখিল করে হাসলো, সুহানার মন ভার দেখে বিথী বলে,,
__ আজ তোর বিয়ে আর মন খারাপ করে আসিছ?
__ আমার ভালো লাগছে না কিছু?তোরা সবাই আমাকে ভুলে যাবি তাই না।
সুহানার কাছে মিশকাত এসে বলে,,
__ সুহা আপু তুমি আজ দুলাভাইয়ের বাড়ি যাবে,আর আমরা কাল সকালে আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে তোমার কাছে চলে যাবো,এখানেই তো।
সুহানা মুচকি হাসি উপহার দিলো, সুহানার চোখে পানি চিকচিক করছিল তা দেখে পিকি,,,
__ একদম কান্না না সুহা,একদম বাজে দেখাবে।
ইতি বলে,,
__ মেকআপ নষ্ট করে বিয়ে আগেই কি দুলাভাইকে অঙ্গান করাতে চাস।
এই বলে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো,তারা ভেবেছিল এমন হাঁসিতে হয়তো সুহানা হাসবে কিন্তু তা আর কই হলো, হাঁসি মাঝেও সুহানার বুকটা বারবার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে।

বিথীর সাথে হঠাৎ করেই দির্শককে দেখতে পেলো দির্শক তখন ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল, বিথী পিছোন দিক থেকে দির্শক কে ডাকলো,,,
__ দু্ষ্শমন স্যার।
দির্শক ঘুরে তাকালো,ব্যাস থমকে দির্শকের সময় তার সামনে নির্ঘাত যেন নীল পরী দাঁড়িয়ে আছে,নীল লেহেঙ্গায় বিথীকে লাবন্যময়ী অভনীয় সুন্দর লাগছে,
দির্শকের মনে হঠাৎ শীতল বাতাসের মতো এক অনুভূতি বইতে লাগল। প্রতিটি শ্বাস যেন স্ফুরণ জাগাচ্ছে, হৃদয়টা অস্থির হয়ে উঠল। কিন্তু সেই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না তার সমুদ্র নীল চোখগুলো বিথীর দিকে আরও গভীরভাবে তাকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে, অজান্তে নিজের মনকে বিরত রাখল দির্শক। এখন বিথীকে দেখা তার জন্য এক ধরনের ঘোর অমঙ্গলজনক, অদূরে এক ধরনের ক্ষতিকর।
এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মাঝে, বিথী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। চোখে ভর করে সাহস, মুখে কোমল হাসি। হালকা কণ্ঠে বলল,

__ আমাকে কেমন লাগছে দুষ্শমন স্যার।
দির্শক বিথীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,,
__ বিউটিফুল।
__ আপনাকেও সবুজ পাঞ্জাবিতে খুব সুন্দর লাগছে একদম হিরোদের মতো।
বিথীর কথায় দির্শক ফেচেল হেসে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,,
__ শীত পড়েছে খুব,চাদর নেও নি যে।
বিথী হেসে বলে,,
__ আজ পর্যন্ত এমন কোন শীতকাল আসে নি যে শীতকালে বিয়েতে মেয়েদের সোয়েটার বা চাদর পড়াতে পারবে।
__ কথা বাস্তব।
__ তা আপনি এখানে কেন।
__ একটা ফোন এসেছিল তাই।
__ ওহহ , চলুন বিয়ের অনুষ্ঠানে।
__ চলো
___
হরলিক্স মহা জ্বালায় পড়ে গেছে। বেচারার এমন জোরে মূএ চাপ দেওয়ায় সে এক মুহূর্তের জন্যও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছে না। বলতে পারছে না কারও কাছে কেউ জানবে, তাহলে তো লজ্জার সীমা অতিক্রম হবে। আসলেও, বাড়িতে বিয়ের আগ মুহূর্তে তাকে এত তাড়াহুড়ো করে সাজিয়ে আনা হয়েছে যে তার নিজস্ব স্বাভাবিক কাজটুকু সেরে ওঠার সুযোগই হয়নি।তার উপর সে একজন বর মানে আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান সে আত্নীয় স্বজন সবাই তাকেই দেখছে।
হরলিক্সের মুখে অসহায়তার ছায়া নেমে এসেছে। এমন অসময়ে, এমন জোরে মূএ চাপ দিলে কার ভালো লাগবে!
মুএর চাপে হরলিক্সের শরীর ঝিমঝিম করছে, যেন প্রতিটি অঙ্গ আলাদা ভাবে বিদ্যুতের ধাক্কা খাচ্ছে। নিজের লজ্জা, অস্বস্তি আর অক্ষমতার মধ্যে সে কেঁপে উঠছে। কাউকে কিছু বলার সাহসও পাচ্ছে না বেচারা কি করবে, কীভাবে সামলাবে, সেটা অনুমানও করতে পারছে না। আবার, এদিকে না গেলেও নয় সামাজিক নিয়ম আর প্রত্যাশার বোঝা তাকে বাধ্য করছে পরিস্থিতি সহ্য করতে।
হরলিক্স চোখ ইশার করে নিখিল কে ডাকলো সে আসলো হরলিক্স তাকে বলল,,

__ আমার একটা কাজ করে দিতে পাবে।
নিখিল খিলখিল করে হেসে বলে,,
__ টাকা ছাড়া আমি কাজ করি না দুলাভাই।
__ টাকা দিবো তোমায়।
__ তাহলে কাজ বলুন।
ফিসফিস করে হরলিক্স বলে,,
__ আমাকে ওয়াসরুম নিয়ে যেতে হবে, এমনভাবে যেনো কেউ না বুঝে যে আমি ওয়াসরুমে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি এ নিয়ে কেউ কিছু বললে বলবে ” দুলাভাইয়ের সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে”।
নিখিল হাসতে চেয়েও হাসলো না,,,
__ আচ্ছা ।
লোকজনের অনেকের কথাকে কাটাকাটি ও জবাব দিয়ে হরলিক্সকে নিয়ে এলো ওয়াস রুমে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া শেষ হলে হরলিক্স আবার নিজের জায়গায় ফিরে যায় ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।নিখিলকে ১০০ টাকার কচকচে নোট ছিলো হরলিক্স তা পেয়ে নেচে কুদে সবার সামনে চিৎকার করে বলতে লাগলো,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩২

__ শুনুন , শুনুন শুনুন,এখন থেকে যার হিসু চাপ দিবে সে আমাকে চুপি সাড়ে এসে বলবে আমি তাদের ওয়াসরুম নিয়ে যাবো,আমার পারিশ্রমিক হিসাবে ১০০ টাকা দিলেই হবে,ওকে,কারো হিসু চাপ দিলে নিখিল বলে ডাক দিবেন,সাথে সাথে নিখিল হাজির হবে,বাই।
উপস্থিত থাকা সকলেই হো হো করে হাসতে লাগলো নিখিলের এমন কথা শুনে, এদিকে বেচারা হরলিক্সের হার্ট অ্যাটাক হতে ধরেও হলো না, হরলিক্স বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো।এত বাজে পরিস্থিতিতে আবার দ্বিতীয়বার পরলো সে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৪