Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৫

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৫

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৫
রাফিয়া জান্নাত রিফা

পাঁচ মাস পর…
সময় যেন ধীরে ধীরে সবকিছুকে স্বাভাবিক করে দিয়েছে।
বিথী এখন আগের মতোই হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, সবার সঙ্গে খোলামেলা। তবে তার জীবনের একটি অভ্যাস বদলায়নি প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে সে দির্শকের জন্য চিঠি লেখে, আর দির্শকের পাঠানো চিঠিগুলো বুকের কাছে আগলে রাখে।
জেলখানার নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একদিন পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। সেই দিনটিই যেন বিথীর জন্য সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ফোনের ওপাশে দির্শকের কণ্ঠ শুনলেই তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসে।
ইতি, বিথী আর নিধি তিন বোন এখনো আগের মতোই একসাথে, একে অপরের হাসির কারণ হয়ে বেঁচে আছে। তাদের বন্ধনে কোনো ফাটল পড়েনি বরং সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে।

এদিকে মুহিন আজ আবার এক নতুন কাণ্ড ঘটিয়েছে।
পিকিকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ার এক মেয়েকে প্রপোজ করতে গিয়েছিল সে।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু নাটকীয়তা শুরু হলো ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন সে হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করতে গেল…
হঠাৎ করেই তার প্যান্ট সোজা নিচে নেমে গেল!
মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ। এরপর হাসি, লজ্জা আর অপমান মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।
এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ব্যর্থ হলো মুহিন। মেয়েটি রাগে-অপমানে সেখান থেকেই চলে গেল।
মুহিন হতাশ হয়ে কোনোমতে প্যান্ট ঠিক করে পিকিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
“পিকি ভাপু… ওই মেয়েটাকে ছাড়া আমি বাঁচব না!”
পিকি বিরক্ত-হাসি মিশ্রিত গলায় বলল,,

“এই একটি কথাটা তুমি বারবার বলেছো মনে আছে?”
মুহিন নাক টেনে বলল,,
“এইবারটা সত্যি! তুমি আমার কষ্ট বুঝবে না…”
পিকি ভ্রু কুঁচকে বলল,,
“প্যান্ট পরে বেল্ট পড়তে হয় এটা জানা ছিল না?”
মুহিন মাথা নিচু করে বলল,,
“মনে ছিল না”
কিছুক্ষণ ভেবে পিকি বলল,,
“শোন, ব্যাপারটা ইতি, বিথী আর নিধিকে বলো। দেখো, ওরা কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারবে।”
মুহিনের চোখে সঙ্গে সঙ্গে আশার ঝিলিক দেখা দিল।
“আসলেই তো!”
এই মেয়েটিকে সে অনেক দিন ধরেই পছন্দ করে,পাশের বাড়ির মেয়ে। কিন্তু মায়ের ভয়ে কখনো সাহস করে বলতে পারেনি।
আজ এত কাণ্ডের পরও তার মন হাল ছাড়েনি।
পিকির হাত ধরে সে দ্রুত এগিয়ে চলল ইতি, বিথী আর নিধির কাছে।
হয়তো…
এবার সত্যিই কিছু একটা হতে চলেছে।

এই পাঁচ মাসেও ইতি আর আলবানের এমন একটি দিনও যায়নি, যেদিন তারা ঝগড়া করেনি।
কিছুক্ষণ আগেই তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়েছে। তবে একটা বিষয় আলাদা আলবান কখনোই ইতির ওপর হাত তুলে রাগ দেখায় না। কিন্তু ইতি যদি বামে যেতে বলে, সে ঠিক ডান দিকেই যাবে এই অবাধ্য স্বভাবটাই আলবানের একদম পছন্দ নয়।
আজ সকালের ঝগড়াটাও তেমন বড় কিছু ছিল না। তবুও এখন দু’জনের কেউ কারো সঙ্গে একটি কথাও বলছে না।
তবে অভিমান থাকলেও দায়িত্বে কোনো ঘাটতি রাখে না ইতি।
গোমড়া মুখেই সে আলবানের জুতো পরিয়ে দিল, ঘড়ি হাতে তুলে দিল, এমনকি শার্টের তিনটি বোতাম পর্যন্ত লাগিয়ে দিল।
আলবানের মুখও কম গম্ভীর নয় যেন কালো মেঘ জমে আছে।ইতির মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে রান্নাঘরের সব কালো কালি এনে আলবানের মুখে মেখে দেয়!
অফিসে যাওয়ার জন্য আলবান পুরো প্রস্তুত। সে খুব ভালো করেই জানে ইতি কখনো নিজে থেকে কথা বলবে না। দোষ যারই হোক, ‘সরি’টা তাকেই বলতে হবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে বলল,,

“সরি।”
ইতি সঙ্গে সঙ্গে রাগী কণ্ঠে উত্তর দিল,,
“সরি দিয়ে কী করব আমি?”
আলবান একটু এগিয়ে এসে বলল,,
“কাছে আয়, বুঝাচ্ছি।”
“যাবো না।”
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলবান এগিয়ে এসে ইতির হাত ধরে টেনে নিল নিজের বুকে। তার মুখের এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে কপাল আর দু’গালে আলতো চুমু দিল।নরম স্বরে বলল,,
“আজকাল তোর সঙ্গে কোনো কিছুতেই পারি না আমি। একটু রাগ দেখালেই ব্ল্যাকমেইল ‘ঘর থেকে বের হয়ে যাবো।’ তুই বুঝিস না তোকে ছাড়া একটা রাত কাটানো মানে আমার কাছে একটা যুগ পার করা। তাই দোষ তোর হলেও, সবসময় নিজের ঘাড়েই নিই।”
ইতির রাগ যেন আরও বেড়ে গেল,,

“আবার আমার দোষ দিচ্ছেন?”
আলবান হালকা হেসে শ্বাস ফেলে বলল,,
“আচ্ছা, এটাও আমার দোষ। এখন একটা চুমু দে, তাড়াতাড়ি।”
“পারব না।”
“ইডিয়ট, চুমু দিতে বলছি।”
ইতি এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,,
“আপনার সাথে আমার কথা নেই… ছাড়ুন।”
আলবান হেসে বলল,,
“চুমু দিতে বলেছি, কথা বলতে না।”
“পারব না।”
এবার একটু কঠোর হয়ে বলল,,

“তোর জেদ রাতে শুনব, ইতি। এখন চুমু দে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অবশেষে গম্ভীর মুখেই ইতি আলবানের দুই গালে চুমু দিল।আলবান আর কিছু না বলে বাইকের চাবি আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে গেল।
যেতে যেতে পিছন ফিরে বলল,,
“রাতে ঠিক করে চুমু দিতে শেখাবো তোকে… তবে জানি, তুই তো কালনাগিনীর মতো চুমুর চেয়ে ছোবল দিতেই বেশি পারিস!”
কথাটা শুনে ইতির রাগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
মেজাজ পুরো বিগড়ে গেল তার।তবে এটাও নতুন কিছু নয়,এই ঝগড়া, এই অভিমান, আর তার মাঝেই লুকিয়ে থাকা গভীর ভালোবাসা…এটাই তো তাদের প্রতিদিনের গল্প।

ইদানীং নিধির শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
সময়-অসময়ে মাথা ঘোরে, অকারণে বমি বমি ভাব আসে। কিন্তু এসব কিছুই সে নিজের মধ্যেই চেপে রেখেছে। আর্দ্রকে কিছু জানায়নি জানাতে চায়ও না।
সে জানে, এসব বললেই আর্দ্র অস্থির হয়ে উঠবে, সব কাজ ফেলে তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। অযথা দুশ্চিন্তা বাড়বে।তাই সবকিছু চুপচাপ সহ্য করছে নিধি।এই মুহূর্তে সে গালে হাত দিয়ে বসে আছে গভীর চিন্তায় ডুবে।
ওদিকে আর্দ্র ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছে। পুরো প্রস্তুত হয়ে আয়নার দিকেই তাকিয়ে হালকা হাসি নিয়ে বলল,,,

“চড়ুই পাখি, বলো তো আমাকে কেমন লাগছে?”
অন্যদিন হলে এই কথা শুনেই নিধি রেগে যেত।
তার মতে, পুরুষদের এত সাজগোজের কী দরকার? স্ত্রী তো বাড়িতেই আছে তাহলে আর কার জন্য এত আয়োজন!আর্দ্রও বিষয়টা জানে। ইচ্ছা করেই নিধিকে খেপানোর জন্য এসব বলে।কিন্তু আজ
কোনো উত্তর এলো না।আর্দ্র ভ্রু কুঁচকে আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিধির দিকে তাকাল।
নিঝুম, চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখে সে হকচকিয়ে গেল। দ্রুত এসে নিধির পাশে বসে তার হাত ধরে কপালে আলতো চুমু দিয়ে বলল,,

“কী হয়েছে, চড়ুই? এত অন্যমনস্ক কেন লাগছে?”
নিধি চমকে উঠল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে হালকা হাসল,,
“আমি একদম ঠিক আছি। আপনার অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে যান।”
আর্দ্র গম্ভীর হয়ে গেল,,
“তোমার থেকে বড় কিছু হতে পারে না আমার কাছে। কী হয়েছে, বলো।”
নিধি এবার একটু জোর করেই হাসল,,
“আরে কিছু হয়নি। এত চিন্তা করবেন না।”
আর্দ্র বিশ্বাস করতে পারল না। সে নিধির কপালে হাত রাখল, তারপর গলায় শরীরের তাপমাত্রা বুঝতে চেষ্টা করল।
“জ্বরও নেই… তাহলে সমস্যা কী?”
নিধি বুঝল এভাবে এড়ানো যাবে না।
তাই সে অন্য পথ বেছে নিল।
হঠাৎ করে এগিয়ে এসে আর্দ্রের কপালে গভীর চুমু এঁকে দিল। তারপর তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে নরম গলায় বলল,,

“আমি একদম ঠিক আছি। আপনি যান দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তবুও আর্দ্রের মন মানল না।তার ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে।সে নিধির গলায় মুখ ডুবিয়ে গভীর শ্বাস নিল, তারপর ধীরস্বরে বলল,,
“নিজের প্রতি এত অবহেলা করো না… এটা কিন্তু তোমার স্বামীর জন্য খুব ক্ষতিকর হবে।”
নিধি হেসে ফেলল,,
“ঠিক আছে, বুঝেছি। এখন যান।”
অবশেষে কিছুটা অনিচ্ছা নিয়েই আর্দ্র উঠে দাঁড়াল।
নিধির কপালে আরেকবার চুমু দিয়ে বলল,,
“আল্লাহ হাফেজ।”
তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।নিধি চুপচাপ বসে রইল।মুখে হাসি থাকলেও
মনের ভেতরটা অদ্ভুত এক অজানা অনুভূতিতে ভরে উঠছে…

বিথী বারান্দায় বসে ডায়েরি খুলে চিঠি লিখতে শুরু করেছে মনটা আজ অদ্ভুতভাবে নরম।ঠিক তখনই
হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন দৌড়ে এলো মুহিন।
হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে উঠল,,
“বিথী আপুউউ!”
এত জোরে ডাক শুনে বিথী প্রায় চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
বিরক্ত হয়ে বলল,,
“এই! এত জোরে চিল্লাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে?”
মুহিন হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,,
“আপু… তাড়াতাড়ি চল!”
বিথী কপাল কুঁচকে বলল,,
“কেন? কী হয়েছে?”
মুহিন শ্বাস সামলে নিয়ে বলল,,
“পিকি ভাপুকে… কয়েকটা ছেলে মিলে তুলে নিয়ে গেছে!”
কথাটা শুনে যেন মুহূর্তেই বিথীর মাথায় বাজ পড়ল।
“কী বলছিস এসব?”
মুহিন এবার একটু জোর দিয়ে বলল,,
“সত্যি বলছি!”

বিথী অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল,,
“আজব কথা! কেউ পিকি ভাপুকে তুলে নিয়ে যাবে কেন? ওর তো কোনো শত্রুই নেই!”
মুহিন একটু থেমে গম্ভীর গলায় বলল,,
“আমার মনে হয়… ওরা পিকি ভাপুকে মেয়ে ভেবে তুলে নিয়ে গেছে…”
এক সেকেন্ড নীরবতা,,
তারপর হঠাৎ করেই বিথী হেসে ফেলল।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,,
“তাহলে পিকি ভাবুর কিছুই হবে না। দেখবি একটু পর নিজেই হেঁটে বাড়ি চলে আসবে।”
মুহিন চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।তারপর ধীরে বলল

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৪

“আর যদি… বড় কিছু করে ফেলে?”
কথাটা শুনে বিথীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
চোখের ভেতর এক ঝলক দুশ্চিন্তা নেমে এলো।
আর দেরি না করে সে হাত থেকে ডায়েরিটা টেবিলে রেখে তাড়াতাড়ি ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল।
পিছন পিছন দৌড়াতে লাগল মুহিন।
মুহূর্তেই বাড়ির শান্ত পরিবেশটা যেন অজানা এক আতঙ্কে ভারী হয়ে উঠল…

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৬