Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১
রাফিয়া জান্নাত রিফা

তালুকদার বাড়ির বড় ছেলে আলবান তালুকদার ও তার বিশ্বস্ত বন্ধু আর্দ্রয়ান আদ্র ৮ বছর পর বাংলাদেশে নিজের শিকরে পদার্পন করছে।
সেজন্যই তালুকদার বাড়িতে আয়োজনের বেশ হুড়োহুড়ি লেগেছে। বাড়ির তিন গিন্নিরা তো বিদু্ৎ বেগে চলাচল করে কাজ করছে।
এইতো একটু আগেই, বাড়ির দুই গিন্নি বিদ্যুৎ বেগে হাঁটায় দুজন দুজনের সাথে সংঘর্ষণের ফলে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল,তাও দমে যাই নি তারা, তড়িৎ বেগে উঠে নিজেদের কাজে আবার মনোনিবেশ করলো,এমন প্রতিক্রিয়া দেখালো যেন কিছুই হয়নি,অথচ কাজের ফাঁকে ফাঁকে কোমড়ের মাজায় হাত দিয়ে ব্যথাটানাশক জায়গাটিতে অনবরত মালিশ করছে।

আলবান তালুকদার এতো বছর দেশে না ফেরার কারণ হলো বাড়ির লোকদের প্রতি অতিসয় বিরক্তিবোধ,তার ভাষ্যমতে এ বাড়িতে তিন ধরনের এমন কিছু পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ আছে যাদের সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।তাই রাগ, অভিমান, নানান অভিযোগ, তিক্ততা, ও বিরক্তি নিয়ে পাড়ি জমায় USA এর ক্যালিফোর্নিয়ায় ছোট বেলার একমাত্র কাছের বিশ্বস্ত বন্ধু আদ্রয়ান আর্দ্রকে নিয়ে।
আর্দ্রয়ান আর্দ্রের বেড়ে ওঠা এই তালুকদার বাড়িতেই তার নিজ স্বজন বলতে কেউ নেই তালুকদার বাড়ির লোকজনই তার আপনজন।তালুকদার বাড়ির সবাই তাকে আলবানের মতো করেই স্নেহ ও ভালোবাসেছে।আলবানের মা আলিফা বেগম, কেউ যদি ওনাকে বলেন _আপনার কতজন সন্তান” তবে উনি ডিরেক্ট বলে দিবেন _দুজন সন্তান আমার আলবান ও আর্দ্র”। দুই সন্তানই রাগ হয়ে দেশ থেকে চলে যাওয়ায় দিনের পর দিন রাতের পর রাত কত চোখে পানি বিসর্জন দিয়েছেন তা বলা বাহুল্য,রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে লুটিয়ে পড়ে কেঁদে কুটে সন্তানদের মঙ্গল কামনা করেছেন।

আলবান তালুকদার এই ছেলে আবার একটু বেশিই খুঁতখুঁতে স্বভাবের, গম্ভীর,রাগী,উগ্র।তাইতো বাড়ির গিন্নিরা দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করছে।নিজেদের কোমড়কে দুই টাকার ও তোয়াক্কা করছে না। বরং ধপ ধপ করে পা ফেলছে,আর কাজ করছে।
আলবান তালুকদার বয়স ২৯। আদ্রয়ান আর্দ্র তার বয়স ও ২৯ দুজনেই পড়াশোনা করে bachelor of science/B .tech in software engineering computer science.
USA দেশের নামকরা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া টেকনোলজি(কেল্টেজ) ৪ বছরে কোর্স শেষ করে সেখানের গুগল সফটওয়্যার এ এল,এম এল ইঞ্জিনিয়ার বড় কোম্পানিতে চাকরি করে।
এখন তাদের বাড়ি ফেরার একটাই কারণ সেটা হলো তাদের মা জননী আলিফা বেগমের আর্তনাদ ও ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের জন্য।

আলিফা বেগম আবার একটু বেশিই ইমোশনাল লেডি,একটু কিছু হলেই আঁচলে মুখ লুকিয়ে ননস্টপ কান্না শুরু করে দেন।অনেক আকুতি মিনতি ও জোরাজুরির ফলে তালুকদার বাড়িতে ফিরছে আলবান ও আর্দ্র।আর্দ্রের আসার ইচ্ছা থাকলেও আলবান চায় না বলে এতদিন আসা হয় নি।
আলবান আসার আগেই একগাদা শর্ত দিয়েছে আর বলেছে এই শর্তের যদি নড়চড় হয় তাহলে এক মুহূর্তও থাকবে না তালুকদার বাড়িতে।সবাই শর্ত মেনেও নিয়েছে। যদিও শর্ত গুলো নড়চড় হয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে, তাও মুখে মুখে সবাই মেনে নিয়েছে।

ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে তিন কন্যা, তিন জনেরই গায়ে গোলাপি রঙের সুক্ষ্ম বুননে কাজ করা জামা।দুজন জমজ কন্য একজন ভিন্ন।তিনজনই সবসময় একই জামা, একই জুতো, পরিধান করে।
নাম ইতি,বিথী,নীধি বয়স ১৮ , পড়ালেখা এককথায় ঘোড়া ডিম, এইচএসসি পরীক্ষাটা অনেক কষ্ট, ক্লেশ , আর্তনাদ করে দিলো, এইচএসসি পরীক্ষার একদিন আগে সে কি মারাত্মক পড়ালেখা , সারারাত এমন পড়া পড়েছিল যে পরীক্ষা দিতে গিয়ে লেখার সময় নিভু নিভু চোখ নিয়ে পরিক্ষা দিতে হয়।চোখ খোলা রাখাটাই কষ্টসাধ্য ছিল।হাতে প্রশ্ন পেয়ে শতশত গালি দিয়েছে শিক্ষামন্ত্রীকে,সাথে অভিশাপ তো ফ্রি ছিলই,না জানি এখন শিক্ষা মন্ত্রির কি অবস্থা।
কত শত দোয়া দরুদ যে পড়েছে পরীক্ষার জন্য তার হিসাব নেই। পরীক্ষার অনেক বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে আল্লাহ রহমতে কাল এইচএসসি পরীক্ষার অবসান ঘটলো।এখন রেজাল্টের টেনশনে মাথা মস্তিষ্কে ফাটল ধরছে।
এই তিন কন্যা একে অপরের টাল,এক সুতেগাথা তাদের প্রাণ। এদের তিনজনের একটা ভালো গুণ হলো এরা চোখের ইশারা ইঙ্গিতে তিনজন তিনজনের সাথে বেশ সুন্দর করে কথা বলে সবার আগোচরে। আরো একটা ভালো গুণ হলো যেকোনো মানুষকে তাদের ইচ্ছায় নাচিয়ে নাচিয়ে নাজেহাল অবস্থাও করে দিতে পারে। এককাথায় দুষ্টু বুদ্ধির সব ধরনের পিএইচডির সার্টিফিকেট আছে এদের কাছে। কখনোই কারো মধ্যে মনোমালিন্যতা, হিংসা, বিদ্বেষ লক্ষ্য করা যায়নি।

ইতি মাঝে মাঝে হাই তুলছে, বিথী মাথায় হাত দিয়ে রাজ্যের সব চিন্তা ভাবনায় ডুবে আছে,আর নীধি টিভি দেখছে কিন্তু কিছু ভালো ভাবে দেখছে না শুধু চ্যানেল গুলোর চেঞ্জই করছে, সোফার আর এক পাশে গুটি শুটি হয়ে অসহায় মুখে বসে আসে মুহিন ইতি,বিথী, নীধির ৬ মাসের ছোট ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। বেচারা মুহিন সেই কখন থেকে বলছে T SPORTS চ্যানেলটায় দিতে বেচারার কথা শুনলে তো।
মূলত তারা চারজনই একটি দল। বাড়ির যত অবাধ্যকতা,জ্বালাতন কাজ আছে সব এদেরই করা।বাড়ির গিন্নিরা তো এদের জ্বালায় অতিষ্ঠ। চারজনকেই ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রেখেছে তাদের মা সিদ্দিকী বেগম, যাতে কোন প্রকার তুচ্ছ কার্য হাসিল করতে না পারে, এমনিতেই আজ মহা খুঁতখুঁতে রাগি এক পুরুষের আগমন ঘটবে।
ইতি মহা বিরক্তির সহিত বললো,,

~কোন বাল আসবে রে?
বিথী হাই তুলতে তুলতে বলে,,
~বাড়ির বড় পাটা দুইটা নাকি!
~তো এর জন্য মায়েদের এতো দৌড়াদৌড়ির কি আছে??
নীধি বলে,,,
~পাঠায় নাকি খুব খুঁতখুঁতে।
তাদের কথার মাঝখানে ফোড়নকেটে মুহিন বলে,,
~উনি আমাদের বড় ভাই সম্মান করে কথা বল।
ইতি মুহিনের দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বলে,,,
~অবশ্যই অব্যশই, সম্মান করবো।আগে একটা ওয়েল কাম
পার্টির ব্যবস্থা তো করি নাকি?
বিথী বলে,,
~প্লান কি??
ইতি বলে,,
~প্লান রেডি, চল চল??
নীধি বলে,,
~চল,চল।
মুহিন অনেক অনুরোধ করলো যে ও আর এমন কোন কাজ করবে না,গুড ছেলে হবে এখন থেকে। এমনিতেই মুহিনকে তার মা খোঁটা দেয় আর বলে”তুই মেয়ে হতে ধরে ছেলে হয়েছিস” শেষে কিনা তার মা তার লিঙ্গকে নিয়ে এমন বলছে,সি সি বড্ড অপমানজন কথা।এই তিনজনের জোরাজুরি ও হুমকিদুমকীকে পেরে উঠলো না মুহিন।
চুপিচুপি পায়ে চারজনই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো ।

আলবান তালুকদার ও আর্দ্রয়ান আর্দ্র কে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে আলবানের বাবা নাজিম তালুকদার ও চাচা নাইম তালুকদার গেছেন।
এয়ারপোর্টে দেখা গেল আলবান তালুকদার ও আর্দ্রয়ান আর্দ্র, সাথে একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যাক্তি কেও দেখা গেল, রেম্পের মতো করে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাটছে।
আলবান তালুকদার কালো পোশাক পড়নে, শার্টে ২টি বোতম খুলে রেখেছে ফর্সা বক্ষ অর্ধেকাংশ উন্মুক্ত, তাতে একটা কালো চশমা গুজে রেখেছে।গম্ভীর মুখে হনহনিয়ে হাঁটছে। ফর্সা মুখে যেন কালো মেঘ ছড়িয়ে আছে।
আদ্রয়ান আর্দ্র হাতের বাহুতে কালো কোর্টটি খুলে রেখেছে। শার্টের দুটি বোতাম খুলে রেখেছে।শ্যামলা বর্ণের এক সুন্দর সুদর্শন পুরুষ, বলিষ্ঠ পেশিবহুল চেহারা। আর্দ্রের চোখে মুখে হাসির ঝিলিক উপচে পড়ছে নিজ দেশে ফেরার আনন্দে।

আলবান তালুকদার ও আর্দ্রয়ান আর্দ্রের সাথে তাদের আরো একজন বন্ধু এসেছে।
নাম পেটোটা পিকি, USA এর একজন বড় ফ্যাশন ডিজাইনার,পিকির জন্ম USA, তৃতীয় লিঙ্গের হলেও আলবান ও আর্দ্রের খুব কাছের বন্ধু।বাংলাদেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য ঘেরা মণিলতাকে দেখার তার খুব ইচ্ছে।পিকি অনেক কষ্টে বাংলা ভাষা শিখেছে, কিন্তু এখন যদি একবার বাংলা ভাষায় কথা বলতে শুরু করে তাহলে নিশ্চিত বাংলা ভাষার ইজ্জত নষ্ট করে তবেই ছাড়বে, পিকির যেটা সবচেয়ে নজর কাড়বে সেটা হলো,ওর চালচলন, ওআচার-আচারণ এবং নানা ধরনের মেয়েলি অঙ্গ-ভঙ্গি প্রদর্শন করা।, মুখে হালকা মেকআপ তো ওলয়েজ, ঠোঁটে লিপস্টিক তো মাস্ট বি। এককথায় বাংলাদেশের সুদর্শন পুরুষ এডলফ খানকেও হার মানাবে পেটাটো পিকি।
আর্দ্র দৌড়ে এসে নাজিম তালুকদারকে জরিয়ে ধরে বলে,,

__ আসসালামুয়ালাইকুম বাবা। কেমন আছেন?
__ আলহামদুলিল্লাহ বাবা, তুই কেমন আছিস?
__ আলহামদুলিল্লাহ।
আলবান গম্ভীর মুখে নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদারকে বলে,,,,
__ কেমন আছেন আপনারা?
দুজনেই বলে,,,
__ আলহামদুলিল্লাহ ভালো।

নাজিম তালুকদার বুঝলেন “এখনো আলবান অতীতের সেই স্মৃতিগুলোকেই মনে পুষে রেখেছে,এখনো অভিমান যায় নি। আলবানের যখন ২১ বছর বয়স তখন তার বাবা তাকে মেরেছিলেন, কারণটা হলো আলবান তার ভার্সিটির পুলিশের ছেলেকে কোন কারণে মেরে হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছিল, এবং সেই ছেলেটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল,এ কথা নাজিম তালুকদারের কানে আসলে তিনিও রাগে বশে আলবানকে থাপ্পড় মারেন এবং অনেক বকাঝকা ও করেন,এতেই আলবানের মেজাজ আরো গরম হয়,বরাবরই আলবানের অধিক জেদী ছেলে আর রাগি তার সাথে পেরে ওঠা একে বারে অসম্ভব, তেমনি সেদিন ও জেদের বশে আর্দ্রকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যায়।এসব ভেবে নাজিম তালুকদার একটি দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।
এখন দেশে যে ফিরেছে এটাই অনেক। নাজিম তালুকদার আর কথা বাড়ালেন না।পিকি সাথে পরিচিত হয়েই।সবাই তাদের নির্দিষ্ট গাড়ির দিকে যেতে লাগলো।
আর্দ্র আলবানের হাতে চাপটি মেরে বলে,,,

__ আলবান তোর পেঁচার মতো মুখটা দয়া করে ঠিক কর।আগে যা হয়েছে হয়েছে এখন ও সব বাদ দে। মায়ের সামনে এমন মুখ করে থাকবি না বলে দিলাম?
__ তো কি ৩২ টা দাঁত কেলিয়ে হাঁসতে বলছিস?
__ তবে তাই কর?
__ পাবো না?
আর্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,,,
__ অতীতকে ভুলে যা প্লিজ।
__ চুপ কর তুই।
আর্দ্র আর কথা বাড়ালো না।সবাই এক এক করে গাড়িতে বসে পড়লো। গাড়ি চলতে লাগলো নিজ গন্তব্যে।
দরজায় কলিং বেল বাজার সাথে সাথে রান্না ঘরে থাকা তিন গিন্নিদের উত্তেজনা দুইগুণ থেকে চারগুণে রুপ নিলো। তিনজনেই রীতিমতো ছুটাছুটি করছে আর হাত ছুড়া ছুড়ি করছে ,কিন্তু কোন দিকে দৌড় দিবে বা যাবে তা তাদের মস্তিষ্ক জানে না।আলবানের মা বলেন,,,

__ছোট রাস্তাটা ছাড়।আমি গিয়ে দরজাটা খুলি?
সরে গিয়ে যাওয়ার রাস্তা দিলেন মুহিনের মা মিলি বেগম তালুকদার বাড়ির তিন নম্বর ছেলে নাফিস তালুকদারের স্ত্রী হোন।
আলিফা বেগম দরজা খুলতেই ভয়ে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গিয়ে ভূত ,ভূত, বলে চেঁচাতে লাগলেন।এনার এমন আকস্মিক চিল্লানিতে রান্না ঘরে থাকা দুই গিন্নি ও চলে আসলেন সিদ্দিকা বেগম ইনি চোখে দেখেন ঠিকই, কিন্তু দেখলেও ভুলভাল দেখে তাই চশমা ব্যবহার করেন, তিনি হাতে ঝাড়ু নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শুধায়,,,
__কোথায় ,কোথায় ,ভূত কোথায়?
আলিফা বেগম হাত দিয়ে দরজা দিকে দেখিয়ে দেয়। সিদ্দিকা বেগম ও দেখে একটু ভয় পান কিন্তু তাও সুক্ষ চোখে ভালো করে দেখার চেষ্টা করেন, কারা এরা,চশমাটা চোখ থেকে খুলে শাড়িতে মুছে আবার পড়েন,এবার দেখেন সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি যুবক তিনজনের গায়েই গোবরের পানির মতো কিছু একটা লেগেছে, নাকি এটা কোন রঙ তিনি ঠিক বুঝতে পারলেন না।তিনি তাদের একটু কাছে গিয়ে বললেন,,,

__বাবা তোমাদের পোশাকের রংটা তো দারুন, কিন্তু মুখে আর মাথায় এটা কেমন রঙ, আর গন্ধটাও চেনা চেনা লাগছে??
আলবানের রাগ যেন আরো তিরতির করে বাড়তে লাগলো,রাগে দুঃখে চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে। সুঠাম দেহের বলিষ্ঠ পেশিবহুল সুদর্শন পুরুষকে গোবরের পানিতে ভিজে জুবুথুব অবস্থা। সিদ্দিকী বেগমকে আর্দ্র বলে,
__ মেজো মা চশমা টা সোজা করে পরো??
সিদ্দীকা বেগম এখনি বুঝলেন যে কেন তিনি ঝাপসা দেখছেন, চশমাটা আবার সোজা করে পড়লেন।
এদিকে আলিফা বেগম উত্তেজিত হয়ে পিকির কাঁধে দিকে হাত দেখিয়ে বললেন,,,,

__বাবা তোমার কাঁধে ওটা কি??
পিকি গোবরের গন্ধে নাক মুখ কুঁচকে ফেলছে আলিফা বেগমের কথায় সে একটু ঘাবড়ে গিয়ে নিজের কাঁধের আস্তে করে তাকালো দেখলো একটা টিকটিকি আরামদায়কভাবে ভাবে বসে আছে, দেখেই পিকি একটা শুকনো ঢোক গিললো।ভয়ে বেচারা নড়চড় করতেও ভুলে গেছে ,সাথে বাকরুদ্ধ ও হয়ে গেছে।
নাজিম তালুকদার ও নাইম তালুকদার ভিতরে প্রবেশ করে আলবানদের এমন অবস্থা দেখে ১০০ ভোল্টের বিদ্যুৎ শক্ট খেলেন।তারা কিছু বলতে যাবে তখনি পিকি মেয়েলিভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বলে,,,
~আমাকি টকটকি টা খেয়ি ফেললো,এটাকি ধোরো কেউ।
দিলো বাংলা ভাষাকে আহত করে।পিকির এমন বাংলা ভাষা শুনে নাজিম তালুকদার হাঁসি পেলেও হাসিকে দমিয়ে রেখে বললেন,,

~বাবা ওটা টকটকি না টিকটিকি??
পিকির গাঁয়ে টিকটিকি টা গলার ভিতরে দিয়ে ঢুকতে যাবে এমন সময় পিকি সেটাকে ঝাড়তে ঝাড়তে দৌড়াতে লাগলো,দৌড় তো নয় এ যেন এক ফ্যাশন রেম্প ওয়ার্ক ।হাত দুটো উপরে তুলে পিকি রেম্পের মতো সুন্দর করে দৌড়াতে দৌড়াতে ভয়ার্ত স্বরে বলে,,,
~সামবডি ,হেল্প মি,সেভ মি,বাতাও ভাতাও!!
সিদ্দিকা বেগম বলেন,,
~বাবা ভাতাও হবে না,বলো বাঁচাও।
ড্রয়িং রুমে সোফার চারপাশ দৌড়াতে দৌড়াতে পিকি বলে,,
~ওকে।এখন হেল্প মি প্লিজ??
অবশেষে টিকটিকি টা চলেই গেল পিকির শরীরের ভিতরে,ছটফটানি আরো বেড়ে গেল পিকির।বেচারা ভয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে আর্দ্রের দিকে ভো দৌড় দিয়ে তার কোলে উঠলো। আর্দ্র বেচারার কথা আর কি বলি, এমনিতেই তো গায়ে গোবরের পানি পড়ায় গন্ধ মরে যায় যায় যায় অবস্থা তা উপর আবার পিকি কোলে ওঠলো, রাগে,দুঃখে,কষ্টে কাঁদো কাঁদো স্বরে আর্দ্র বলে,,,

~পিকি আমার ইয়ে থেকে পা টা সরা ভাই??
পিকি বলে,,,
~কিয়ে থেতে??
এবার আর্দ্র বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,,,,
~private part (গোপন অঙ্গ)
পিকি এবার বুঝতে পারে,তার পা টা আটকে গেছে আর্দ্রের ওই গোপন জায়গায় , মূলত কোলে ওঠার সময় ফেঁসে গেছে আরকি।
আলবান আর সহ্য করতে পারলো এমনিতেই রাগের সেলসিয়াচের সব মাএা পাড় করে ওভার হয়ে গেছে। রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ক্রুধিত কন্ঠে জোরে চেঁচিয়ে বলে ,,,,

~এসব কাদের কাজ এটা আমি বুঝে গেছি, আমি বারবার বলছি যে তারা যেন এমন উদ্ভট কাজ না করে। তাও আমার শর্তের নড়চড় কেন হলো।কেনো? কোথায় তারা ?কোথায়? আমার সামনে আসতে বলো তাদের?তাদের কত সাহস আমি দেখি?
শেষের কথাটা এতো জোরে বললো যে পুরো তালুকদার বাড়ি ও মানুষ গুলো সহ সকল ইট ও কেঁপে উঠল। এমন চিৎকার শুনে রুম থেকে বের হলেন আসিয়া বেগম (এনি হলেন বাড়ির সবার বড়ো আলবান ও আর্দ্রের দাদিমা।এনার স্বামী অনেক আগেই গত হয়েছেন।কানে কম শুনেন তাই হিয়ারিং এইড সবসময় ব্যবহার করেন। এনার একটা নিত্যদিনের অভ্যাস আছে তা হলো ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রতিদিন সাজুগুজু করে এবং তার প্রাণোনাথ স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে কথা বলে, কখনো কাঁদে, আবার কখনো হাসে, স্বামীকে নিজে প্রশ্ন করে নিজেই উওর দেয়।বুড়ির এসব কর্মকাণ্ড খাটের তল থেকে দেখে ফেলা ও ধরে ফেলা ইতি, বিথী, নীধি।এ নিয়ে দাদির সাথে তাদের মেলা ঝামেলা হয়েছে।এ নিয়ে আছিয়া বেগমের সে কি কান্না,তার ভাষ্যমতে তার নাকি কোন প্রাইভেসি নেই???)
তিনি আলবানদের দিকে এগিয়ে এসে বলেন,,,,

~কারা এ ছেমড়ারা??
সিদ্দিকা বেগম বলেন,,,,,
~আলবান আর্দ্র ও তাদের বন্ধু??
তিনি অবাক হয়ে বলেন,,,,
~নাহ আমি বিশ্বাস করতাম না, আমার হিরোর মতো দাদুভাইয়ের এ কি দশা।কে করলো এমন???
আলবান আরো রাগ দেখিয়ে বললো,,,
~কে করতে পারে বুঝো না,ওহহ বুঝবে কেমনে তাদের দোষ তো তোমাদের কারো চোখে পড়বেই না??
হঠাৎ আদুরি কন্ঠে আর্দ্র আছিয়া বেগমকে বলে,,,,

__ জান আই লা বু।
আছিয়া বেগম ও কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,,
__ আই লাউবু টু,আই মুস ইউ বেবি।
__ মিস ইউ টু জান? কোবরা টুইস্টরা আমাদের কি অবস্থা করেছে দেখো জান?
আলবান আবার রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ দাদি কাল নাগিনী গুলো রে আমার সামনে আসতে বলো? ওদের মজা বের করছি?
আছিয়া বেগম ভালো করেই বুঝলেন ইতি, বিথী, নীধি কেন এমন করছে।
নাজিম তালুকদার এবার একটু রাগ দেখিয়েই বলেন,,,
~আলবান তুই কাকে বোঝাতে চাচ্ছিস?
~কাকে আবার কোবরা টুইস্টদের।
~ইতি,নীধি, বিথীর কথা বলছিস?
~তো এমন কাজ আর কে করবে শুনি।
~আমার লক্ষী মায়েরা এমন করেনি।
আলবানের রাগ আরো বেড়ে গেল।তার বাবাকে আর কিছু না তার মাকে বলে,,,,,
~মা আমি ফোনে কি বলেছি?
আলিফা বেগমের একটা টোক গিলে বললেন,,,,

~সোনা বাবারা আমার , এখন এসব কথা থাক বাবা,আগে বাইড়ে গিয়ে শরীরের সব গোবর পরিষ্কার করে, রুমে যা।
আলবান আর কথা বাড়ালো না কারণ এই কোবরা টুরিস্টদের নামে কোন কথা বলা, আর কুকুরের মতো হুদাই একা ঘেউ ঘেউ করা একই কথা। মনে মনে বললো,,,,
~কোবরা টুইস্ট তোদের তো আমি পরে দেখছি, সিংহের গুহায় হাত দিয়ে মোটেও ঠিক কাজ করিস নি।এটা যে ইতির কাজ তা ভালো করেই বুঝে গেছি।,বি রেডি আলবান কাম ব্যাক।
মোকলেছ সাহেব ইনি তালুকদার বাড়ির দেখভাল করেন এবং বাগানের মালি।তিনি পানির সেচ দিয়ে তিনজনেরই শরীরের গোবর গুলো ধুয়ে দিলেন।আলবান আর কাউকে কিছু না বলে ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে যায় তার পিছনে পিছনে আর্দ্র ও পিকি ও চলে যায়।

উপরে সিঁড়ির কাছে নিচু হয়ে চুপটি করে জড়েসড়ো হয়ে বসে সব দেখে ও খিলখিল করে হাসছে তিন আলোকছটা আর বার বার খুশি হয়ে তিনজন তিনজনের সাথে হ্যান্ড ক্লাপ করছে। মূলত তারা বেলকনিতে গিয়ে এই অকাজ করে নাস্তানাবুদ করলো আলবানদের।
যখনি দেখলো আলবান উপরে আসছে তখনি তিন বোনেই নিজের রুমে ভো দৌড় দেয়। দৌড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়, মুহিন বেচারাকে আবার ফাঁসিয়ে দিয়ে চলে গেল, মুহিনের সাথে সবসময়ই এমন করে,দোষ না করেও দোষী হয়ে তার বাবা বড় বাবাদের কাছে বকা খেতে হয়,মুহিনের মা তো ননস্টপ বকে বকে কানের পোকা নাড়িয়ে দেয়।
নিশ্চিত আজ আলবানদের গায়ে গোবর পানি ফেলার দোষটাও মুহিনেরই হবে। কিন্তু মুহিন তো কিছুই করেনি সব ওই তিন আলোকছটাদের কাজ।এখন মুহিন ও সাহস করে পিছন ফিরে ছাদের দিকে মার এক দৌড়, দৌড়াতে দৌড়াতে বলে,,,,

~ভাইয়ার সামনে পড়লে নিশ্চিত আমি আজ শেষ, পালা মুহিন পালা!!
আর্দ্র পিকিকে তার বরাদ্দকৃত রুমটা দেখিয়ে দিয়ে,নিজের রুমে যায়। গোবরের গন্ধ পুরো শরীরে ছড়িয়ে আছে, আর্দ্র নাসাঃরন্ধ চেপে ধরে ওয়াস রুমে রিতিমত দৌড়ে গেল আর বলল,,,
__এমন করার কোন মানে হয় কোবরা টুইস্ট?কবে যে ভালো হবে তোমরা,না জানি এর জন্য আলবান তোমাদের কি অবস্থা করে।
আবার কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসতে থাকে, পরিপূর্ণ তৃপ্তির হাসি ছিল।
আলবান তো রুমে এসেই ধুপধাপ শব্দ করছে, ইচ্ছা করছে ঘরের সব জিনিস ভেঙ্গে ফেলতে।মাএাতিক্ত রাগে ওয়াস রুমের দরজাটা জোরে শব্দ করে লাগিয়ে গোসলে গেল।
ইতি, বিথী, নীধি নিজেদের রুমের ভিতরে মাঝারি ভলিউম দিয়ে ইংরেজি গান ছড়ে ইচ্ছে মতো নাচছে।গানটা হলো,,,,,,

Girl we are my chammak challo ,,,,
Where are you Go girl I am gonna follow ,,,,,
What you want girl just late me know,,,,
Ooh ooh ohh ooh
Chammak challo

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২