Home তিমিরে ফোঁটা গোলাপ তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৫+২৬

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৫+২৬

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৫+২৬
Taniya Sheikh

রুপোলী থালার মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। শরতের শেষের এই ঝকঝকে রাতের আসমান সেজেছে অজস্র তারার তারায়। সন্ধ্যার পরপরই যে গাঢ় অন্ধকার প্রকৃতির ওপর চেপে বসেছিল তা এখন ম্লান। প্যালেস ছেড়ে শহরের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে নিকোলাস। শহরজুড়ে যুদ্ধের থমথমে ভাব। মনে কিছুতেই শান্তি আর স্বস্তি নেই। আবার একা না বলে পালিয়েছে ইসাবেলা। একবার বিপদে পড়েও ওর শিক্ষা হয়নি। নির্বোধ মেয়ে! সেদিন গাঁয়ের বাজারে খুব করে নিকোলাসের ভেতরের পিশাচটা ওর ওপর ক্ষমতা খাটিয়েছিল। প্রায় মানিয়ে নিয়েছিল ইসাবেলাকে সাহায্য না করতে। কিন্তু মনের গহীনে তীব্র জ্বালা অনুভব করে মেয়েটার কান্না দেখে। শান্ত হয়ে থাকা নেকড়েটাও ক্ষিপ্ত, বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলতে চায় ওই মানুষদের যারা ইসাবেলাকে কাঁদিয়েছে, ব্যথা দিয়েছে। পিশাচটা তখন বিদ্রুপ করে,

“তবে তো তোমাকেও সেই শাস্তি গ্রহণ করতে হবে। ব্যথা তো তুমিও দিয়েছ।”
“আমি! না, আমি ওকে ব্যথা দিইনি। তুমি দিয়েছ, তুমি।” মনটা প্রতিবাদ করে। পিশাচ রেগে বলে,
“বোকার মতো কথা বলো না। আমি আর তুমি অভিন্ন। আমার দিকে আঙুল তুললে সেটা দর্পণ হয়েও তোমারই মুখ দেখাবে। তাই বলছি চুপচাপ উপভোগ করো। আমি পিশাচ। আর আমি তুমি আলাদা নই। পিশাচের মন থাকতে পারে কিন্তু তাতে অনুভূতি যা আছে সব এক একটা থিয়েটার করা পাকা অভিনেতা। সব মেকি, ছদ্মবেশী।”
“তাই যদি হয় তবে ওর কান্না আমাকে কেন পীড়া দেয়?”
“ওসব ভ্রম। ওর প্রতি মায়ার কুপ্রভাব। মরুক ও। মরলেই তোমার ভ্রমটা কেটে যাবে। মরুক ও, মরুক।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নিকোলাস শক্ত হয়ে বসেছিল। পেটমোটা লোকটা ইসাবেলার গায়ে অশালীনভাবে হাত দেয়। লজ্জায়, অপমানে কাঁদছিল ও। নিকোলাসের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। অসহ্য হতে লাগল মনের পীড়া। পিশাচটা প্রাণপণে চেষ্টা করছে বিকল্প উপায়ে পীড়া উপশমের। বার বার বলছে,”মরুক ও, মরুক।” কিন্তু সব ব্যর্থ হলো পলের অনুরোধে। পিশাচটা খানিক অবাক আর ক্ষুব্ধ, মনটা খুশি। বাইরে তপ্ত সূর্যালোক। এরমধ্যে ওখানে পিশাচরূপে যাওয়া মৃত্যুঝুকির সমতুল্য। কিন্তু বসে থাকার উপায় নেই। শরীরটা আল্লখেল্লায় ভালো করে ঢেকে ইসাবেলাকে উদ্ধারে গেল। সূর্যের তেজে জ্বলছে ওর ত্বক৷ সে কী যন্ত্রণা! তার ওপর পেটমোটা লোকটার বিদ্রুপ। রাগের মাথায় স্থান ক্ষণ মনে ছিল না। এমনটা সচারাচর হয় না। সে রাজা। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবেচিন্তে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো। কারণটা আবারো ইসাবেলা।

এই মেয়ের কারণে একটার পর একটার নিয়ম, সংযম লঙ্ঘন হচ্ছে। লোকটা ওর বুকের কাপড়ে ফের হাত দিতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে নেকড়ে সত্ত্বা। সাধারণত নেকড়েরূপটাকে পরিহার করে সে। মানবরূপী পিশাচ থেকে নেকড়েতে পরিবর্তন খুবই কষ্টদায়ক। শরীরের রগে রগে, ভাঁজে ভাঁজে টান খায়। পুনরায় মানবীয় রূপে ফিরতেই দূর্বল হয়ে পড়ে। অবশ হয়ে আসে অঙ্গ প্রতঙ্গ। ইসাবেলাকে বাঁচাতে, উঁহু! তা কেন হবে? ইসাবেলাকে কেন এত কষ্ট করে বাঁচাতে যাবে? সে এসেছে কেবল পলের অনুরোধে। এই প্রথম কিছু আবদার করেছে। সেই আবদার ফেলবে কী করে? প্রিয় দাস বলে কথা। কিন্তু আজ তো কেউ আবদার করেনি। কেন দিশেহারা হয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে মেয়েটাকে? কেন? এই কেন’র জবাব নিকোলাসের কাছে নেই। পূর্বে এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়নি। নতুন এই অনুভূতির সব যেন বেপরোয়া। ভেতরে-বাইরে কেবল চলে স্নায়ুযুদ্ধ। শেষমেশ কে হারবে আর কে জিতবে তা ভাবার অবসর এই মুহূর্তে নেই। নাক টানতে টানতে চলল ইসাবেলার ঘ্রাণের খোঁজে। ওটা পেলেই ওকে পেয়ে যাবে। শহর ছাড়িয়ে বনের প্রান্তে এসে থামল। ইসাবেলার ঘ্রাণটা একটু যেন মিশে আছে এখানকার বাতাসে। খুব করে শ্বাস টানে। শুকতে শুকতে সেই টানেলের মুখে এসে দাঁড়ায়। এক টুকরো ছেঁড়া নীল কাপড়। গতরাতে এমন একটা ফ্রকই পরেছিল ইসাবেলা। কাপড়টা হাতে নিয়ে নাকের কাছে আনে। এই তো পাচ্ছে ঘ্রাণ। দু’চোখ মুদে গভীর শ্বাস টানল। মনটা পূর্বের চেয়ে বেশি আকুলিবিকুলি করে ওঠে। নেকড়েটা চাপা গর্জন করে ভেতরে। ইসাবেলাকে ফিরে পাবার বেজায় তাড়া। এই একটা ব্যাপার নিকোলাসকে বেশ অবাক করে। তার জোড়া মার্গারেট ছিল। ভেতরের নেকড়েটা স্বয়ং সেটা প্রকাশ করেছিল তখন। কিন্তু এমন করে কোনোদিন মার্গারেটের জন্য অস্থির হতে দেখা যায়নি। ইসাবেলা তো ওর জোড়া নয়। তাহলে এমন করছে কেন?

“দ্রুত চলো, এক্ষুনি খুঁজে বের করো।”
“তোমার এত জলদি কেন?” প্রশ্ন করে পিশাচসত্ত্বা। একটু আমতা আমতা করে নেকড়েটা জবাব দেয়,
“আমি ঠিক জানি না কেন।”
সত্যিই সে জানে না কীসের মোহ তাকে ইসাবেলার সান্নিধ্য পাবার জন্য টানে৷ মার্গারেটের মৃত্যুর পর বিমর্ষ, নিঃসঙ্গ জীবন সাচ্ছন্দ্যে কাটিয়েছে নেকড়ে সত্ত্বা। খারাপ একেবারে লাগেনি তা নয়। মেয়েটার প্রতি ভালো লাগা ছিল। খুব কেয়ার করত ও নিকোলাসকে। ইসাবেলা তেমন কিছুই করেনি। বরঞ্চ খিটখিটিয়ে থাকে সর্বক্ষণ। আর তারই অনুপস্থিতিতে সে অস্থির হয়। অন্যদিকে পিশাচসত্ত্বার চোখের বালি ইসাবেলা। মেয়েটাকে দেখলে বলে ওঠে, “মেরে ফেল, মেরে ফেল।” নিকোলাস দুই সত্ত্বার ভিন্ন মতে বিব্রত, বিরক্ত। মাথা দু’হাতে চেপে দাঁড়িয়ে রইল। সব কিছুর মূলে ওই ইসাবেলা। মেয়েটা কেন চুপচাপ ফিরে গেল না? কেন ওকে জ্বালাচ্ছে? একবার হাতের কাছে পেলে হয়। টানতে টানতে নিয়ে যাবে রাশিয়া। ছুঁড়ে ফেলবে ওর পৈতৃক ভিটার সামনে। হঠাৎ গান ফায়ারিংএ ভাবনায় ছেদ পড়ে। অদূরে গরলিটজ আর পোলান্ডের সীমান্ত। সৈন্যদের ক্যাম্পে জ্বলছে তেলের বাতির আলো। জায়গাটা নিরাপদ নয়। এত এত স্থান থাকতে ইসাবেলার ঘ্রাণ সে এখানেই পেল। এই বিপজ্জনক স্থানে। বিদ্রুপাত্মক মুচকি হাসে ও।

“নির্বোধ তো আর এমনিতেই বলিনি। নির্বোধ, নির্বোধ!”
নিকোলাস দাঁত কামড়ে ফের হাওয়ায় মিশে গেল।
“আগাথা, আর কতক্ষণ হাঁটতে হবে? আর যে পা চলে না।”
গহীন বনের ঝোপঝাড়ের মাঝ দিয়ে হেঁটে চলছে ইসাবেলা। ফ্রকের স্থানে স্থানে ছিঁড়ে গেছে। শুকনো ডাল, কাঁটাযুক্ত ঝোপের আঘাতে হাতে-পায়ের কয়েক জায়গায় আচর লেগেছে। জ্বলছে খুব। আগাথা চুপচাপ সামনে এগোচ্ছেন। তিনি প্রেতাত্মা। পা মাটিতে পড়ছে না এগোনোর সময়। ঘন্টার পর ঘন্টা এমনি হাঁটছে দুজন। কত বড়ো এই জঙ্গল? এখান থেকে বেরোনোর পথ আর কত দূর? পা লেগে এসেছে। বসে পড়ল বড়ো মোটা একটা বার্চ গাছের তলে, পিঠ লাগিয়ে।

“আমি আর পারছি না আগাথা। একটু জিরিয়ে নিই।”
“ঠিক আছে।” আগাথা জবাব দিলো। কিন্তু থামলেন না।
“কোথায় যাচ্ছেন আমাকে ফেলে?”
“একপাকে গিয়ে এখান থেকে বেরোনোর পথটা দেখে আসি। ততক্ষণ অপেক্ষা করো এখানে।”
ইসাবেলা আশপাশের ভূতুড়ে নির্জনতা দেখে শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“একা বনের মধ্যে বসে থাকতে হবে? আমি পারব না।”

উঠে দাঁড়াতে পায়ে ভীষণ ব্যথা অনুভব করল। নগ্ন পায়ের তল ক্ষত বিক্ষত। তবুও খুঁড়িয়ে যাবে বলে মনস্থির করে। আগাথা রাজি হলেন না। আশ্বাস দিলেন ভয়ের কিছু নেই। খারাপ কিছু ঘটার পূর্বে ফিরে আসবেন। ইসাবেলাকে একপ্রকার জোর করে রেখে সামনের গাছের সারির আড়ালে মিলিয়ে গেলেন। ইসাবেলা ভীত চোখে চেয়ে দেখল চারপাশ। বড়ো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে গলে পড়া চাঁদের ক্ষীণ আলোতে খুব সামান্যই দেখা যায়। কর্ণকুহর ব্যস্ত ঝিঁঝি পোকা আর পেঁচার ডাকে। হাঁটু মুড়ে মুখটা তার ওপর রেখে বসে রইল। বুক দুরুদুরু করছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি অশরীরী কিছু এসে হামলে পড়ল কিংবা ভয়ানক কোনো জন্তুর থাবার তলে পিষ্ট হলো। অসহনীয় হয়ে ওঠে ভয়ে ভয়ে এভাবে বসে থাকাটা। জঙ্গলে কত শব্দ হয়। এই মুহূর্তে সব যেন বিপদ আর ভয়ের নামান্তর। ক্লান্ত রাত ভয়, ডর উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন ডাকছে। কে ডাকছে? ঘুমের ঘোরে গলার স্বরটা চিনতে একটু সময় লাগল। নিকোলাস! ইসাবেলার ঘুম তখনও ভাঙেনি। ওর মনে হতে লাগল ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে। নিকোলাস কোথা থেকে আসবে? সব স্বপ্ন! শয়তানটা ওর জাগ্রত মুহূর্ত দখল করেছিল এবার স্বপ্নে এসেও হানা দিয়েছে।

“বজ্জাত নিকোলাস।”
গালে টের পাচ্ছে একটা ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ। হাতটা রুক্ষ । মৃদু চাপড় দিলো। কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভাঙানোর এতই সোজা? বিরক্ত মুখে হাতটা দিয়ে সেই ঠাণ্ডা রুক্ষ হাতটা সরিয়ে দেয়। ঘুমটা আরেকটু গভীর হয় আর কোনো ব্যাঘাত না পেয়ে। আচমকা মনে হলো হাওয়ায় ভাসছে ও। ঢুলুঢুলু চোখ মেলে তাকাতে ঝাপসা একটা মুখ দেখে। মুখও নয় ঠিক। চকিতে তাকাল। তারপর আর্তচিৎকার করে ওঠে। কালো হুডি ডাকা মুখটা সম্পূর্ণ দেখতে পেল না। কেবল লাল টুকটুকে ঠোঁট আর লম্বা নাকের কিয়দংশ। ইসাবেলার চিৎকার আরো বাড়ে নিচে তাকাতে। শূন্যে ভাসছে, জমিন থেকে বেশ খানিকটা ওপরে।

“কে আছো বাঁচাও। আগআ_”
“চুপ”
নিকোলাসের ধমকে চুপ হয়ে যায় ইসাবেলা। ওর চিৎকারে রাত্রির নিস্তব্ধতায় যে অশান্তি শুরু হয়েছিল পুনরায় তা আবার শান্ত হলো। আর্ত বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে আছে ইসাবেলা। হাত দু’টো অসতর্কে নিকোলাসের গলায় জড়িয়ে আছে। নিকোলাস সেদিকে তাকাতে এমন ভাবে হাত দুটো সরিয়ে নিলো যেন আগুন ছুঁয়েছে।
“আমাকে নামান।”
“নামান! এত সম্মান?”

নিকোলাস জমিনে নেমে আসে। চোখ বন্ধ করল ইসাবেলা। কেন যে এই শয়তানটার সাথে কথা বলতে গেল? ইচ্ছে করে রাগাবে তারপর ইসাবেলা রেগে কিছু বললে দ্য গ্রেট পিশাচ রাজা নিকোলাসের অসম্মান হবে। তিনি শাস্তি নির্ধারণ করবেন। ছেড়ে দেবেন নেকড়ের দলের সামনে অথবা কোনো পিশাচের। নিকোলাস ভুরু কুঁচকায়। এই মেয়ে তুই তুকারি ছাড়া কথা বলেনি। কালেভদ্রে একটু সম্মান দেখিয়ে হয়তো তুমি বলেছিল। আজ একেবারে আপনি বলে সম্মানের চূড়ায় তুলল? বাহ! মনে মনে খুশিই হয় নিকোলাস। সম্মান পেতে কার না ভালো লাগে? এদিকে ইসাবেলা কথা না বলে কীভাবে ওর বাহু ছাড়িয়ে নিচে নামবে সেটাই ভাবছে। নিকোলাসের এত কাছে এসে কোনো কিছু ভাবার অবস্থায় নেই। সোঁদা মাটির গন্ধ তীব্রভাবে নাসারন্ধ্র ভেদ করে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা স্থবির করে দিচ্ছে। না, এভাবে কোলে ঝুলে থাকলে চলবে না। শরীরের সমস্ত শক্তি ছেড়ে দেয় নিকোলাসের হাতে। তাতেও কোনো সমস্যা দেখাল না নিকোলাস। এবার নড়েচড়ে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেষ্টা করে সে নামতে চায়। নিকোলাস প্রথমে ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। ইসাবেলার সান্নিধ্য তাকে সব ভুলিয়ে দেয় যেন। আরো নিবিড় করে বেষ্টনী। ইসাবেলা ভড়কে গেল।

“কী করছেন? নামান বলছি।”
“হুশ”
নিকোলাস নাক ঠেকায় কপালে। মন ভরে নেয় ঘ্রাণ। কী সুমিষ্ট ঘ্রাণ! নিজেকে যেন প্রানবন্ত মনে হয়। কিছু উৎকট গন্ধ নাকে লাগতে সতর্ক হয়ে কান খাড়া করল। শুকতে লাগল আরো। আগুন, বারুদমাখা গায়ের গন্ধ। ক্রমশ সেগুলো এদিকেই আসছে। ইসাবেলাকে মাটিতে নামিয়ে হুডি ফেলল। দেখল অদূরে আলো। হাতে মশাল নিয়ে এদিকেই আসছে নাৎসি সৈন্য। সম্ভবত ইসাবেলার চিৎকার শুনেছে ওরা।
“শিট! দ্রুত আমার পিঠে ঝুলে পড়ো।”
“কী?”

“কানে খাটো মেয়ে, বলেছি দ্রুত আমার পিঠে ঝুলে পড়ো। তাড়াতাড়ি করো।” নিকোলাস ঘুরে দাঁড়ায়। ইসাবেলা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রয় বোকার মতো। পিঠে উঠবে? পাগল হয়ে গেছে না কি? ইসাবেলা কোনোদিন ওর পিঠে উঠবে। সে উলটো ঘুরে দাঁড়ায়। কদম বাড়ায় সামনে। অনেকক্ষণ পরও যখন পিঠে ইসাবেলার ওঠার লক্ষণ পেল না, নিকোলাস রেগে তাকাল। পাঁচ ছ কদম এগিয়ে গেছে ইসাবেলা তখন। নিকোলাস হাওয়ায় মিলে ওর সামনে গিয়ে তাকায়। রেগে আছে। ওর রাগী চেহারা বড্ড ভয়ানক হয়। ইসাবেলার ভয় করে। আরো দু কদম পিছিয়ে যেতে বাহু চেপে ধরে নিকটে নিয়ে এলো। নিকোলাসের নিঃশ্বাস পড়ছে ইসাবেলার গালে। তারপর নাকটা হালকা ঘষল চোয়ালে। দেহে সামান্য কাঁপুনি দিয়ে স্থির হয় ইসাবেলার দৃষ্টি। নিকোলাসের হাতটা বাহু ছেড়ে কব্জির দিকে নামছে। ইচ্ছে করে স্পর্শ দিয়ে প্রলুব্ধ করছে ওকে। সহজেই বশে এসে যায় ইসাবেলা। দুচোখ বন্ধ করে আরো যেন স্পর্শ কামনা করে। নিকোলাস সেই সুযোগ কাজে লাগায়। এই মেয়েকে কিছু বলা বৃথা। যা বলবে তার উলটো করবে। তবু কেন যে বলতে যায় সে! ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর হাতটা পেছন থেকে গলায় জড়িয়ে পিঠে তুলে নিলো। কাজটা এত দ্রুত করল যে ইসাবেলার বুঝে উঠতে সময় লাগল। যখন বুঝল চেঁচাতে লাগল,

“ছাড়ুন বলছি। নামান আমাকে।”
ঠিক তখনই একটা গান ফায়ারিং হলো। একদম পাশ দিয়ে গেল বুলেট। ইসাবেলার কন্ঠরোধ হয় ভয়ে।
“চিৎকার করো। আরো জোরে করো। নির্বোধ কোথাকার।”
দাঁত কিড়মিড় করে বলল নিকোলাস। একটার পর একটা গান ফায়ারিং হচ্ছে। ইসাবেলা শক্ত করে ধরে আছে নিকোলাসের গলা। মুখটা কাঁধে লুকিয়ে ঈশ্বরের নাম নেওয়ার ফাঁকে অনুযোগ করে বলল,
“আমার সাথেই বারবার কেন এমন হয়? ঈশ্বর রক্ষা করো। এই পিশাচকে না মেরে মরলে আমার আত্মা যে শান্তি পাবে না। রক্ষা করো এবারকার মতো।”

“কতবড়ো অকৃতজ্ঞ মেয়ে তুমি। আমি তোমাকে বাঁচাচ্ছি আর আমাকেই মারার ইচ্ছে আমারই সামনে ব্যক্ত করছ?”
“হু”
“হু কী?”
“বলব না। আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না। একদম বলবেন না।”
“কেন?”
“আবার কথা বলছেন? নিরাপদ কোথাও নামিয়ে দিন আমাকে। এক্ষুনি।”
“আর যদি না নামিয়ে দিই?”
“আমি আবার চিৎকার করব। আবার ওরা ফায়ারিং করবে। চিন্তা কী? আমি একা মরব না। আপনাকেও সাথে নিয়ে মরব।”
“ওসব গুলিটুলিতে নিকোলাসের মৃত্যু হবে না।”
“তাহলে কীসে হবে?” আগ্রহের সাথে ঝুঁকে তাকায় নিকোলাসের মুখপানে। নিকোলাস নিঃশব্দে হাসল। তিক্ত গলায় বলল,
“মৃতকে আবার মারতে চাও?”
“হু, মৃত না ছাই। জীবন্মৃত, পিশাচ কোথাকার।”
মুখ অন্যদিকে ঘুরালো ইসাবেলা। নিকোলাস পিঠে করে হাওয়ায় ভেসে ছুটছে। গতি যেন একটু শ্লথ হলো। আশপাশের ঘন অন্ধকার আরো ঘন লাগছে দেখতে। চোখের নিমিষে সব যেন পেছনে সরে যাচ্ছে। ঠিক চলন্ত ট্রেনের বাইরের দৃশ্য যেন। ইসাবেলার শেষ কথাতে ছিল একরাশ ঘৃণা। আজ যা ভীষণভাবে আঘাত করে নিকোলাসকে। পিশাচসত্ত্বা রাগত গলায় বলছে,

“বেশ হয়েছে। আরো যা ওর ভালো করতে। ওর মন তুই কোনোদিন পাবি না। তোকে ঘৃণা করে ও। পিশাচকে ভালোবাসে না কোনো মানুষ, কেবল ঘৃণা করে।”
ঘৃণা আর ভালোবাসার পার্থক্য নিয়ে শেষ কবে ভেবেছিল নিকোলাসের মনে নেই। আজ এই পার্থক্য ওকে বেজায় অশান্তি দিলো। ইসাবেলার ঘৃণা কষ্টের ছাই হয়ে মন আকাশে উড়ে বেড়ায়।
প্যালেসে ফিরে যাওয়ার পথ রুদ্ধ। ওদিকটাতে নাৎসি সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। অন্য কোনো দিক দিয়ে ফেরার আর উপায় নেই। নিকোলাস একা হলে সমস্যা হতো না। ধোঁয়া হয়ে বাতাসে মিশে সে যে কোনোখানে চলে যেতে পারে। কিন্তু ইসাবেলা মানুষ। লোকচোখে সে পড়বেই। এদিকে রাতও শেষ হওয়ার পথে। ভোরের সূর্যোদয়ের আগেই অন্ধকার নির্জন স্থান খুঁজতে হবে। হাতে সময় কম।

“পিঠে ওঠো।”
“আবার!”
“হ্যাঁ।”
“না, আর উঠব না। হেঁটে যেখানে যাওয়ার চলুন।”
ইসাবেলা রুষ্ট মুখে বলে হাঁটা ধরলো। চাঁদের আলোতে ঝোপেঝাড় পাশ কাটিয়ে সামনে এগোয়। নিকোলাস রাগটা দমিয়ে শুধায়,
“ওদিকে কোথায় যাচ্ছ শুনি?”
“জানি না।” এদিক ওদিক তাকিয়ে আগাথাকে খোঁজার চেষ্টা করল ইসাবেলা। দেখা দিয়ে একটু সংকেত টংকেতও তো দিতে পারে। এই পিশাচটার সাথে থাকতে ওর একটু ইচ্ছে করছে না। বিড়বিড় করে বারকয়েক ডাকল,”আগাথা, আগাথা।”
না! কোনো চিহ্নই নেই তাঁর। রাগে জোরে জোরে পা ফেলে এগোয়। পেছন থেকে নিকোলাস ধমকে ওঠে,
“বেলা, থামো বলছি।”

ইসাবেলা উপেক্ষা করল সেই ধমক। নিকোলাস মুহূর্তে ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। রেগে আছে। মুখটা আর হুডির আড়ালে ঢাকা নেই। জ্বলন্ত লাল চোখ দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। শ্বদন্ত বেরিয়ে এসেছে এবার। ইসাবেলার বাহু সজোরে চেপে ধরে মুখটা খুব কাছে এনে বলল,
“তোমাকে থামতে বলেছিলাম আমি, বেলা। কেন শুনছ না আমার কথা তুমি? বার বার অসম্মান করছ আর বার বারই তোমাকে ক্ষমা করতে হচ্ছে। ধৈর্যের একটা সীমা আছে।”
“কে চেয়েছে ক্ষমা? মেরে ফেলুন। শেষ করে ফেলুন আমাকে।” শান্ত স্বরে বেশ স্বাভাবিক মুখে বলল ইসাবেলা। পরস্পরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওরা। নিকোলাসের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে ইসাবেলার চোখের স্থিরতা দেখে। ভয় নেই তাতে। নিকোলাস কিছুতেই এই ঔদ্ধত্য বরদাস্ত করবে না। বাহু ছেড়ে ইসাবেলার চোয়াল চেপে ধরে।

“মরার খুব শখ তোমার তাই না? হবেও বা না কেন? বিয়ের দুদিন আগে যার হবু স্বামী পালিয়ে যায় সে বেঁচে থাকতে চাইবে কোন মুখে? তোমাকে কেন মারছি না জানো বেলা? বড্ড করুনা হয় তোমার ওপর। যাকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসলে সেই ছেড়ে পালিয়ে গেল। বেচারী!”

ঠিক হৃদয়ের পুরোনো ক্ষতটাতে ফের একচোট খোঁচা দিলো নিকোলাস। ইসাবেলার চোখ আগুনের ফুলকি ন্যায় জ্বলছে। দু’হাতের শক্তি দিয়ে নিকোলাসের বুকে আঘাত করে সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু পারে না। চোয়াল শক্ত করে ধরেছে নিকোলাস। এই ব্যথা কিছুই না ওর কথার আঘাতের চেয়ে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে ইসাবেলার। দাঁতে দাঁত কামড়ে কান্না চেপে রেখেছে। কোনো কথায় আর বলবে না নিকোলাসের সাথে। কীভাবে বলবে? কান্না ছাড়া আর যে কিছু আসছে না। শত চেষ্টার পরও ওর চোখ দুটো বেঈমানী করল। অশ্রু বিসর্জন দিলো আঁখিজোড়া। নিজেকে আজ সেই দুর্বল ইসাবেলা মনে হলো, যে পিটারের নিরুদ্দেশ হওয়ার পর বিরহে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল।ভগ্নহৃদয়ের সেই ব্যথা পুনরায় আজ একইভাবে ফিরে এলো। ইসাবেলার বন্ধ ভেজা নেত্রপল্লবের দিকে চেয়ে নিকোলাসের ভেতরের পিশাচসত্ত্বার পৈশাচিক হাসি উবে যায়। ছেড়ে দিলো ওর চোয়াল। ঠিক সাথে সাথে ধপ করে হাঁটু ভেঙে নিচে বসে পড়ে ইসাবেলা, নিকোলাসের পায়ের কাছে। দু’হাতে মুখ ঢেকে উবু হয়ে কাঁদতে লাগল। ভালো যে বেসেছে সেই জানে ব্যর্থতায় কত জ্বালা! কত গভীর এর ব্যথা। ইসাবেলাকে নত করতে সেই ব্যথা নিয়ে উপহাস করেছে নিকোলাস। ভালো তো কোনোদিন কাওকে বাসেনি, বুঝবে কী করে বিরহের ব্যথা কতখানি! ইসাবেলার কান্না নিকোলাসের পিশাচসত্ত্বাকেও স্তব্ধ করে দেয়। নিজের ওপর খুব রাগ হলো নিকোলাসের। নির্দয়, পাষাণ! তিরস্কার করল নিজেকে। ইসাবেলার সোজাসুজি বসল সে। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো পরম আদরে। ইসাবেলা চুপচাপ ওর বুকে মাথা রেখে কাঁদছে। নিকোলাস অনুতাপের সাথে নরম গলায় বলল,

“আ’ম সরি বেলা। আ’ম সরি।”
ইসাবেলার যেন ঘোর কাটল। সাথে নিকোলাসেরও। ছিটকে সরে বসল দুজন। রাগে ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে ইসাবেলার। তাকাচ্ছে না নিকোলাসের দিকে। নিকোলাসের ছায়াও দেখতে রাজি না এই মুহূর্তে। নিকোলাস উঠে দাঁড়ায়। আ’ম সরি বলেছে! শব্দ দুটো ফিরিয়ে নেওয়া গেলে তাই করত হয়তো। দূর্ভাগ্য তা আর সম্ভব না। ওরা এই মুহূর্তে জঙ্গলের কোনদিকে আছে ঠিক জানে না। আশেপাশে কোথাও ঝরণা আছে। রাতের নিস্তব্ধতার সাথে বড়ো ভাব করে ঝরছে ঝরনার জল। সকরুণ তার সুর। গাছ, গুল্মলতায় ছড়াছড়ি চারিদিক। থেকে থেকে দু একটা পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে। ইসাবেলা উঠে কাপড় ঝেড়ে নেয়। এখনও কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর দেহ। নিকোলাস শান্ত গলায় বলল,

“ভোর হতে বেশি সময় নেই। আমাকে নির্জন অন্ধকার একটা জায়গা খুঁজতে হবে। চলো আমার সাথে।”
কোনো উচ্চবাচ্য না করে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল ইসাবেলা। নিকোলাস একদৃষ্টে ওর অবনত মুখটা দেখল। তখন চোয়াল চেপে ধরায় আঙুলের ছাপ পড়ে আছে ওর সুন্দর মুখে। খারাপ লাগল বড্ড নিকোলাসের। ঘুরে দাঁড়ায় সে।
“পায়ে হেঁটে জায়গাটা ভোরের আগে খুঁজে বের করা অসম্ভব। পিঠে চড়ো।”
এবারো নিকোলাসকে অবাক করে একটু ইতস্তত করে পেছন থেকে গলা জড়িয়ে ধরে ইসাবেলা। মুচকি হাসল নিকোলাস। ওর গায়ের ঘ্রাণ লম্বা শ্বাস টেনে নিলো। ইসাবেলা অবশ্য তা টের পেল না। খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর। চিৎকার করে আবার কাঁদতে ইচ্ছে করছে অথবা এক ছুটে নিকোলাসের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে পারলে শান্তি পেত।
“পা তোলো।”

ইসাবেলা সময় নেয় পা তুলতে। পা দিয়ে নিকোলাসের কোমড় জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে দু ফোটা অশ্রু ফেলে। না, এ কষ্টের অশ্রু নয়। ক্রোধ ক্ষয়ে ক্ষয়ে নোনাজল গড়াচ্ছে। দূর্ভাগ্য! ও পিশাচ শেষ করার কৌশল জানে না। জানলে আজ এই মুহূর্তে নিকোলাসকে শেষ করত। এই অসহায়ত্বের অবসান ঘটাত। ঘৃণা করে নিকোলাসকে, প্রচণ্ড ঘৃণা করে। নিকোলাস ইসাবেলাকে পিঠে করে বনের ওপরের দিকে যেখান থেকে ঝরনার জল পড়ার শব্দ আসছে সেদিকে ছোটে। ঝরনার আশেপাশে তেমন নিরাপদ স্থান খুঁজে পেল না। ওরা আরো ওপরে উঠল। রাত শেষ হতে বেশি সময় বাকি নেই। নিকোলাস বিচলিত হয়ে পড়ে। ইসাবেলা এখনও বুঝে উঠছে না কেন এখানে নিকোলাস? সেই তাকে প্যালেস ছেড়ে যেতে বলেছিল। তাহলে আবার কী চাই? খুব ইচ্ছে করছে প্রশ্নটা করতে। কিন্তু না, সে ওর সাথে কোনো কথায় আর বলবে না। মুখ খুললেই আঘাত করবে নিকোলাস তাকে। হয় শরীরে নয় মনে। একেবারে মেরে ফেলে না কেন?

“বলল না তোকে করুনা করে। বেচারী ভাবে।”
দ্বিতীয় সত্তা বলল। আবার কান্না পায় ইসাবেলার। ক্রোধ বাড়ে নিকোলাসের ওপর। কাঁধে ইসাবেলার হাতের চাপ বাড়তে গতি শ্লথ করে নিকোলাস। কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই ইসাবেলা বলে ওঠে,
“ওই যে একটা গুহা দেখা যায়।” বলেই জিহবা কামড়ে ফেলল। নিকোলাসকে সাহায্য করছে সে! ইচ্ছে হলো নিজের গলা নিজে টিপে ধরতে। নিকোলাস ওর অবস্থা বুঝে মুচকি হাসল। গুহার সামনে যেতে তাড়াতাড়ি গলা ছেড়ে দেয়। কোমর ছেড়ে মাটিতে পা রাখে ইসাবেলা। নিকোলাস একপলক তাকালেও কিছু বলল না। গুহার দিকে এগোতে থেমে গেল। বলল,
“তুমি এখানেই দাঁড়াও। আগে গিয়ে ভেতরটা দেখে আসি। এসব গুহার ভেতরটা সচরাচর নিরাপদ হয় না।”

ইসাবেলা মাথা নাড়িয়ে আশপাশে তাকানোর ভান করে। নিকোলাস চোখের পলকে গুহার ভেতর ঢুকে গেল। গুহার সামনে বেড়ে উঠেছে ঝোপঝাড়। চাঁদের আলো স্নাত এদিক। ঝোপঝাড় থেকে আগত ঝিঁঝিপোকার ডাক থেমে গেল হঠাৎ। ভীত চোখে এদিক ওদিক তাকায় ইসাবেলা।
“ইসাবেলা”
ডাকটা ঠিক বা’পাশ থেকে এলো। আগাথা ডাকছেন। বেঁটেমতো অজানা এক বুনো গাছের আড়াল থেকে। গাছটাকে জড়িয়ে ধরেছে অনেকগুলো গুল্মলতা। আগাথা গুহার দিকে চেয়ে একটু যেন ভেবেচিন্তে এগিয়ে এলেন।
“আগাথা! কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? নিকোলাস আমাকে_”
“হুশ, আমি সব দেখেছি।”
“এখন আমি কী করব? কিছু একটা উপায় করুন এখান থেকে যাওয়ার।”
“এখান থেকে যাবে না তুমি।”
“কী বলছেন? ওই পিশাচটার সাথে গুহায় থাকতে বলছেন আমাকে?”
“হ্যাঁ”
“তবে ওকে শেষ করার কৌশল বলে দিন।”

“এখনই না।”
“এখনই না?”
আগাথা মাথা নাড়ায় দুদিকে।
“মনে নেই আমি কী বলেছি? আগে সেসব করতে হবে তোমাকে। তারপর__” আগাথা থেমে গেলেন। সতর্ক হয়ে তাকালেন গুহার মুখের দিকে। ইসাবেলা অধৈর্য হয়ে বলল,
“তারপর?”
“আমি পরে আবার আসব ইসাবেলা। এখন আর কোনো কথা নয়। নিকোলাস যেভাবে বলবে তাই করবে। আপাতত এই তোমাকে উপদেশ দিলাম। চলি।”
চোখের নিমেষে উধাও হলো আগাথা। ইসাবেলা হতাশ, বিরক্ত গলায় বলল,
“আবার উধাও হলো।”
“কে আবার উধাও হলো?”
নিকোলাসের গলা শুনে চকিতে তাকায়। আগাথার উধাও হওয়ার কারণ তাহলে এই! প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিকোলাস। ইসাবেলা দৃষ্টি সরিয়ে মাথা নাড়িয়ে বুঝাতে চাইল, কেউ না। নিকোলাস অপলক চেয়ে রইল। হঠাৎ ওর ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি জেগে ওঠে। গুহার মুখের দিকে ঘুরে বলল,
“ভেতরে সব ঠিক আছে। এসো।”

মাকড়সার অভয়ারণ্য, শ্যাওলা ধরা গুহার চতুর্দিক, বন্য প্রাণীর বিষ্ঠাভরা উৎকট গন্ধ গুহার ভেতরে। পেট উগলে বমি আসার উপক্রম হলো ইসাবেলার। এ পর্যন্তই চাঁদের আবছা আলো পৌছেছে। গুহার আরো ভেতরে ঘুটঘুটে আঁধার। থেমে দাঁড়ায় ওরা। নিকোলাস ঘুরে বলল,
“তুমি দুপুর পর্যন্ত এখানেই থাকবে। এখানে মানে এখানে।” তর্জনী তুলে ওদের দাঁড়ানোর স্থানটা নির্দেশ করে। এই বিশ্রী গন্ধভরা, পোকামাকড়ের অভয়ারণ্যে কী করে থাকবে ইসাবেলা? সবাইকে নিজের মতো অমানুষ, জানোয়ার ভেবেছে নিকোলাস? দেখছে নাক মুখ চেপে আছে সে তারপরও বলছে এখানেই থাকতে হবে। নেহাৎ কথা বলবে না বলে পণ করেছে নয়তো ঝগড়া হয়ে যেত।

“হুম, তারপর আবার তোমাকে আচ্ছা মতো দিতো।”
“সেই কারণেই চুপচাপ সয়ে যাচ্ছি।” দাঁত কিড়মিড় করে মনকে জবাব ইসাবেলা। একবার নিকোলাস ঘুমিয়ে যাক। তারপর গুহা থেকে বেরিয়ে যাবে। দুপুরে ও জেগে ওঠার আগে এখানে ফিরে আসবে। আগাথার পরামর্শে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে থাকতে হচ্ছে নিকোলাসের সাথে। ভ্যালেরিয়ার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে সে। এর জন্য যা সহ্য করা হয় করবে, মরতে হয় মরবে।

নিকোলাস অন্ধকারে মিলিয়ে যাবার আগে পুনরায় ফিরে আসে। ভেবেছিল খুব কড়া করে চূড়ান্তভাবে সাবধান করবে। ভয় দেখাবে যেন ওর অনুপস্থিতিতে গুহা ছেড়ে না বেরিয়ে যায়। এই মেয়ের ভরসা নেই। দেখা গেল আবার নতুন একটা বিপদের মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সকল কথায় নিকোলাস ভুলে গেল ইসাবেলার ঠোঁটে তাকাতে। ভাবুক মুখে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে আছে ইসাবেলা। গুহার ছোট্ট ছিদ্র গলে চাঁদের আলো পড়েছে ওর মুখে। নিজের ওপর যেন নিয়ন্ত্রণ হারালো নিকোলাস। প্রসঙ্গ ভুলে গেল। ইসাবেলা ভুরু কুঁচকে তাকাতে ঝুঁকে যায় ওর মুখের দিকে। এতটা ঝুঁকে যায় যে ওদের ঠোঁটের মাঝে অতি সামান্য ফাঁক থাকে। ইসাবেলা সম্মোহিত হয় নিকোলাসের চোখে চোখ রাখতে। চাপা সম্মোহনী গলায় নিকোলাস বলে,

“তোমার পাতলা গোলাপি ঠোঁটদুটো বড়ো প্রলুব্ধ করে আমায়। যেন বলে, এসো প্রিয়, দখল করো আমাকে। স্বৈরাচারের মতো অধিকার করো আমায়।” থামে নিকোলাস। গভীর নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো নাক টানে। আরো ঝুঁকে আসে। ইসাবেলা টের পাচ্ছে ওর বুকের বা’পাশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। সে সরে দাঁড়াতে চায়, ঠেলে সরাতে চায় নিকোলাসকে। কিন্তু কীভাবে করবে? সমস্ত শরীর ওই নীল সিন্ধু আঁখির মোহে মোহাচ্ছন্ন। চেতনা থেকেও তা যেন অসাড়। আজ যদি নিকোলাস ওকে চুমু খায় ও ছাড়বে না নিকোলাসকে। কঠিন শাস্তি দেবে। ভেতরটা ক্রোধে ফেটে পড়ছে। প্রার্থনা করছে নিকোলাস দূর হয়ে যাক, এই মোহে কেটে যাক। কিন্তু তা এত সহজে নিকোলাস হতে দেবে না বোধহয়। ঠোঁট দু’টো ঈষৎ ফাঁক করতে ওর মুখের শীতল বায়ু আছড়ে পড়ে ইসাবেলার ঠোঁটে। না চাইতেও ঠোঁট জোড়া খুলে যায়। দুজনের শ্বাসবায়ু একসাথে জড়াজড়ি করে দু’জোড়া ঠোঁটের মাঝে। ইসাবেলা সব ভুলে যায়। চোখ মুদে ফেলে। বশীভূতের ন্যায় সমর্পণ করে। ঠিক তখনই উপলব্ধি করে মুখে আর সেই শীতল বায়ু পড়ছে না। নেমে এসেছে কানের লতিকায়। চাপা স্বরে নিকোলাস ওর কানে কানে বলল,

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৩+২৪

“আমাকে প্রলুব্ধ করার শাস্তি কত ভয়ানক হয় জানে না তোমার ওষ্ঠ জোড়া। সাবধান করে দিয়ো তাকে। অঘটন ঘটে গেলে দোষী করতে পারবে না তোমার প্রথম চুমু চুরির দায়ে।”
ইসাবেলা স্তম্ভিত। মুখে রা নেই। নিকোলাস ঘুরে দাঁড়াতে দু’হাতে ঠোঁট ঢেকে ফেলল। সত্যি কী ওর ঠোঁট প্রলুব্ধ করেছে? কখন? কীভাবে? হতবুদ্ধি হয়ে গেল। একটু আগে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যা বলেছিল তা কতকটা নিকোলাসের দূর্বলতাকে প্রকাশ করে। নিজের সেই দুর্বলতা ঢাকতে বলল,
“বেলা, আমি চোর নই ডাকাত। ডাকাতেরা বড়ো নিষ্ঠুর হয়। কোনো দায়ের ধার ধারে না। সুতরাং এমন কিছু করবে না যেন ডাকাতির পর্যায়ে নামতে হয় আমাকে। ক্ষতি কিন্তু তোমারই হবে। তাই ভালো মেয়ের মতো যা বলেছি শুনবে আশা করি।”
ইসাবেলা কিছু বলার বা ভাবার আগেই নিকোলাস সামনের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৭+২৮