তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৩৭+৩৮
Taniya Sheikh
ডিসেম্বর মাস, বরফে মোড়া পুরো গাঁ। পায়ের নিচ, গাছের শাখা, পত্র আর বাড়ির ছাঁদে পুরু বরফের আস্তরণ পড়েছে। ঘরে ঘরে চলছে ক্রিসমাসের প্রস্তুতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ক্রিসমাসের আমেজে খানিক ভাটা ফেলেছে। গ্রামের অনেক গৃহের কর্তা যুদ্ধে, কেউ বা যুদ্ধাহত হয়ে কষ্টে পার করছে দিন। তাদের সংসারের বেহাল দশা। অনেকে আবার প্রিয়জন হারিয়ে শোকে কাতর। শোকটাকে বুকে করে প্রতিবাদ জানাতে ছোটে হিল অফ ক্রসেসে। মাদাম আদলৌনা যুদ্ধে শহিদ হওয়া স্বামী এবং আহত পুত্রের স্মরণে বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে এই হিল অফ ক্রসেসে এসেছেন। শুধুমাত্র স্বামী শোকেই নন, আর সবার মতো তিনিও মৌন প্রতিবাদ জানান এখানে এসে। পুরোটা স্থান জুড়ে বড়ো বড়ো ক্রস। মাদাম আদলৌনা সাথে আনা ক্রসটা বেঁধে দেন সেখানে। এরপর নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। টের পান পেছনে দাঁড়ান মেয়েটার স্থির দৃষ্টি তাঁরই দিকে। বিনয়ী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। মাদাম আদলৌনা বসা থেকে উঠতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। বয়স হয়েছে তাঁর। হাড় দুর্বল, সহজে উঠতে বসতে পারেন না এখন। মেয়েটি এগিয়ে এসে হাতটা ধরে তাঁকে দাঁড়াতে সাহায্য করে। খুব কম হাসেন মাদাম আদলৌনা। কিন্তু এই মেয়েটির আদব তাঁকে বড়ো বিমুগ্ধ করে। বিমুগ্ধতা ঠোঁট হাসি এনে ছাড়ে। দুজন পাশাপাশি হেঁটে অন্যদিনের মতো বাড়ি ফিরছে। ক্রিসমাসের আগে আগে প্রয়োজনীয় বাজার করে নেবেন বলে ভাবলেন মাদাম আদলৌনা। মেয়েটার জন্য একটা ভালো পোশাক কেনার ইচ্ছে হলো তাঁর। হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
“কোন রঙটা পছন্দ তোমার ইসাবেল?”
ইসাবেলা হয়তো বুঝল পছন্দের রঙ জানতে চাওয়ার কারণ। বলল,
“আমার তো যথেষ্ট পোশাক আছে মাদাম আদলৌনা। অযথা নতুন পোশাকের দরকার কী?”
“ক্রিসমাসে পুরোনো পোশাক পরতে দেবো তোমাকে আমি? না!”
“ওগুলো তো অতটাও পুরোনো নয় মাদাম আদলৌনা। আমার বেশ চলবে।” মুচকি হাসল ইসাবেলা। মাদাম আশাহত গলায় বললেন,
“তবে নেবে না নতুন পোশাক?”
মাথা নাড়ায় ইসাবেলা। তারপর বলে,
“একটা অনুরোধ রাখবেন মাদাম আদলৌনা?”
“আগে শুনি তো।”
“নতুন পোশাকের টাকা দিয়ে আমরা কিছু খাবার কিনি। গাঁয়ের অনেকে এই সময় না খেয়ে আছে। খাবারগুলো পেলে ওরা বরং খুশিই হবে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাদাম আদলৌনা থেমে যান। ইসাবেলা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কথাগুলো বলে ঠিক করল কি না তাই ভাবছে। মাদাম আদলৌনা মুচকি হাসতে ঠিকবেঠিকের হিসেব চুকে গেল। হাসল ও। মাদাম আদলৌনা ইসাবেলাকে আশ্রয় দিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগেছিলেন একসময়। বড্ড করুণ অবস্থায় ওকে জঙ্গলে পেয়েছিলেন তিনি। ছেলের জন্য প্রায়ই জঙ্গলে বিশেষ এক ঔষধি পাতা সংগ্রহ করতে যান। বাড়ির পাশের জঙ্গলের পাতাগুলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। একজন বলল মাইল কয়েক দূরের দক্ষিণের বড়ো জঙ্গলে অনেক রয়েছে পাতাগুলো। মাদাম চাইলে কয়েকটা গাছও এনে লাগাতে পারেন। চারিদিকে তখন সোভিয়েত সৈন্যের টহল। কিন্তু একমাত্র সন্তানের সুস্থতার জন্য যে কোনো রিস্কই তিনি নিতে পারেন। আত্মরক্ষা করে জঙ্গলে গিয়েছিলেন। খুব ঝড়-বৃষ্টি ছিল সেদিন। ছাতাটা ঝড়ের দাপটে উড়ে যায়। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বেশ বড়ো একটা গাছের নিচে আশ্রয় নেন। ঝড় থামল। বৃষ্টিও কমে গিয়েছিল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে পাতাগুলো খুঁজে কয়েকটা গাছ সমেত তুলে নিলেন।
বাড়ি ফিরবেন এমন সময় কান্নার শব্দ কানে এলো। কৌতূহলে সাবধানে এগিয়ে গেলেন। কাঁদায় মাখামাখি করে পড়ে ছিল ইসাবেলা। সাহস করে কাছে গিয়ে দেখলেন ততক্ষণে মূর্ছা গেছে ও। ওই অবস্থায় তো আর বাড়িতে আনতে পারতেন না। জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করলেন। ইসাবেলার জ্ঞান ফিরতে মাদাম আদলৌনাকে দেখে প্রথমে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যায়। ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছিল ও। চোখ- মুখ ছিল ফ্যাকাশে। মাদাম আদলৌনা ওকে অভয় দিয়েও কোনো কথা মুখ থেকে বের করতে পারলেন না। বেশ মায়াও হলো ওর ওই দুরবস্থা দেখে। সঙ্গে নিতে চাইলে রাজি হলো না। মাদাম আদলৌনা বুঝলেন, কারো অপেক্ষা করছে ও। তিনি অনেকক্ষণ বসলেন ওর পাশে। অথচ, তিনি নিজেও সন্দিহান ছিলেন মেয়েটাকে সাথে নেওয়ার ব্যাপারে। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো।
কেউ এলো না দেখে মাদাম ওকে বুঝিয়ে রাজি করলেন। একা জঙ্গলে থাকাটা নিরাপদ নয়। ইসাবেলা নিরুপায় হয়ে রাজি হলো। ওকে দাঁড় করাতে গিয়ে মাদাম আদলৌনা টের পেলেন এক পা আহত ওর। কোনোরকমে ধরে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে এলেন। সেখানে মাদামের ঘোড়া গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। ইসাবেলা গাড়িতে উঠেও পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল। মাদাম কারণ জিজ্ঞেস করলে মাথা নত করে ফুঁপাতে লাগল। তিনি ভাবলেন ওর পায়ের কারণে হয়তো আপনজন ফেলে চলে গেছে। সান্ত্বনা দিলেন। তাঁর সন্তানের কষ্ট ইসাবেলার মধ্যে দেখে করুণা আরো যেন বেশি হলো। বাড়িতে আনার কিছুদিন পরেই মাদাম আবিষ্কার করলেন ইসাবেলা রাশিয়ান। কিছু কারণে লিথুনিয়া আর রাশিয়ার সম্পর্ক ভালো নয়। দু দেশের জনগনের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। মাদাম আদলৌনা একবার ভেবেছিলেন ইসাবেলাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলবেন। কিন্তু তাঁর ছেলে মাতভেই মায়ের মনের খবর টের পেয়ে নিষেধ করে এমন কাজ করতে। একটা অসহায় মেয়েকে কেবল ওর জাতিগত কারণে এভাবে বিপদের মুখে ছেড়ে দেওয়া অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা বলে মনে করে মাতভেই। তাছাড়া ইসাবেলার প্রতি ওর বিশেষ মায়া আছে বলে ধারণা মাদাম আদলৌনার। দুজনের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। পঙ্গু ছেলের মন রক্ষার্থে ইসাবেলাকে বাড়িতে রেখে দিয়েছিলেন। মাতভেই প্রায় ইসাবেলা নিয়ে বলে,
“ইসাবেল, খুব ভালো মনের মেয়ে মা। খুব সরল আর পবিত্র ওর মন। ঠিক একটা ফুল যেন। ওর সান্নিধ্যে গেলে অপবিত্রতা দূর হয়ে যায়। ওকে তুমি তাড়িও না মা। আমি কথা দিয়েছি আমার পা’টা একটু ভালো হলে রাশিয়া পৌঁছে দিয়ে আসব ওকে।”
ছেলের কথা শুনে প্রথম প্রথম বিরক্ত হতেন। কিন্তু এখন তিনি নিজেও মানেন ইসাবেলা ভালো মেয়ে। নিজেকে রেখে অন্যকে নিয়ে যে ভাবে সে খারাপ হয় কী করে?
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের পার্শ্ববর্তী রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।
“চলো কিছু বাজার করে নিই।” বললেন মাদাম আদলৌনা। ইসাবেলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। বাজার ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাড়ির পথে রওনা হলেন। মাদামের হাতে একটা ব্যাগ আর ইসাবেলা নিয়েছে দুটো। ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে অনেক কিছু কিনেছেন মাদাম। ইসাবেলার অনুরোধে অতিরিক্ত ময়দা এবং বাটারও কেনা হয়েছে। সাথে কিছু মাংস। উদ্দেশ্য অনাহারে থাকা মানুষগুলোকে অন্তত একবেলা খাওয়ানো। বাড়ির কাছাকাছি ব্রিজের কাছে এসে থেমে গেল ইসাবেলা। সূর্যের তেজ বাড়াতে বরফ গলতে শুরু করেছে। ঝিলের পাড়ের বরফ গলে দুটো হলুদ টিউলিপ দেখা যাচ্ছে।
“মাদাম, আপনি বাড়িতে যান আমি আসছি।” হাতের জিনিসগুলো রেখে দৌড়ে গেল সেদিকে। ফুল দুটো দেখে ওর হৃদয় এবং চোখ প্রশান্তিতে ভরে যায়। ছিঁড়বে কি না ভাবতে লাগল। পেছন ফিরে বলল,
“মাদাম?”
“হ্যাঁ, বলো।”
“ফুলদুটো ভীষণ সুন্দর।”
“ছিঁড়ে আনো।”
“সত্যি ছিঁড়ব?”
“তাই তো করতে ছুটে গেছো।”
“না, থাক।” মনমরা হয়ে উঠে দাঁড়ায় ইসাবেলা। ফুল গাছেই সুন্দর। হাতে এলে মূর্ছে যাবে। মাদাম ব্রিজের ওপর থেমে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ছাগলে খেয়ে নেবে দেখলে। তুমি বরং ছিঁড়েই আনো ইসাবেলা।”
“এত সুন্দর ফুল ছাগল খেয়ে নেবে!”
“ছাগলের তো আর তোমার আমার মতো সৌন্দর্য জ্ঞান নেই। ওরা যা দেখে খাদ্য হিসেবেই দেখে। আর কথা বাড়িও না। চলে এসো তাড়াতাড়ি। ঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে। মাতভের গোসলের সময় হলো।”
ফুল ছিঁড়া নিয়ে এতক্ষণ দোনোমোনো ছিল। মাতভেইর কথা মনে পড়তে ফুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে রেখে যাওয়া ব্যাগ তুলে চললো বাড়ির দিকে। মাদাম আদলৌনা হাতের ব্যাগ সহ কিচেনে ঢুকেছেন। পরনের সোয়েটার খুলতে খুলতে বললেন,
“মাতভেই কী করছে দেখে এসো তো ইসাবেলা।”
“এক্ষুনি যাচ্ছি।”
হাতের ব্যাগ নামিয়ে সোয়েটার খুলে ফুলদুটো নিয়ে চলে এলো দোতলায়। মাতভেইর দরজায় নক করতে ভেতর থেকে জবাব এলো,
“এসো ইসাবেল।”
আহত পা মেলে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসেছিল মাতভেই। হাতে নতুন বই। ইসাবেলা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওর সামনে বসে বলল,
“দেখো কী এনেছি!”
হাতের বইটা কোলের ওপর রাখল মাতভেই। গোল চশমা নাকের ওপরে ঠেলে ইসাবেলার হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকাল।
“হলুদ টিউলিপ!”
“সুন্দর না?”
“খুব। তা কোথায় পেলে এই সুন্দরীদের?”
খিলখিল করে হেসে উঠল ইসাবেলা।
“ব্রিজের পাশে। তোমার পছন্দ হয়েছে?”
“অনেক।”
মাতভেই বইটা পুনরায় খুললো। ইসাবেলা উঠে বেডের পাশের ছোট্ট টেবিলের ফুলদানির পাশে রাখল টিউলিপ দুটো। ফুলদানির ফুলগুলো নেতিয়ে পড়েছে। ওগুলো নিয়ে নিচে এলো। মাদাম কিচেনে নেই। ইসাবেলা ফুলদানি পরিষ্কার করে নতুন পানি ভরে আবার ওপরে উঠে এলো। আগের স্থানে ফুলদানিটা রেখে টিউলিপ দুটো ওতে রাখল। মাতভেই বই থেকে মুখ তুলে ওর হাসিমুখ দেখে মুচকি হাসল। ইসাবেলা ওর দিকে ফিরতে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো মাতভেই। মুখোমুখি বসল ইসাবেলা।
“কী পড়ছ?”
“বই।” বিদ্রুপের সুরে বলল মাতভেই। ঠোঁট উলটে ফেলে ইসাবেলা। ওর গাল টেনে দিয়ে মাতভেই বলল,
“তুমি এত কিউট কেন?”
“উঁহু, মাতভেই!” গাল ডলতে ডলতে রেগে তাকাল ইসাবেলা। মাতভেই বইটা রেখে পাশ থেকে নতুন একটা বই বের করে বলল,
“এটা ধরো।”
“আমার জন্য?”
“হুম, এটা পড়লে বাল্টিক ভাষা আরো ভালো বলতে পারবে। যদিও অনেক স্পষ্ট এখন তোমার উচ্চারণ। তবে আরো চর্চা করতে হবে। কোথাও সমস্যা হলে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, ঠিক আছে?”
“ইয়েস, স্যার।” স্যালুট করতে মাতভেই হাসল আবার। ওর সাথে ইসাবেলাও। ইসাবেলার হাসি মুখে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইল মাতভেই। এই মেয়েটার মুখ কারো কথা মনে করিয়ে দেয়। কত স্মৃতি তখন ভাস্বর হয় হৃদয়পটে! ইসাবেলার মাথার স্কার্ফ থেকে কয়েকটা চুল বেরিয়ে এসে কপালে পড়েছে। ঝুঁকে তর্জনী দিয়ে ছুঁয়ে কানের পাশে গুঁজে দিলো মাতভেই। ইসাবেলার হাসি থেমে যায়। একদৃষ্টে চেয়ে আছে মাতভেইর চোখে।
“বেল?” ইসাবেলার গালের একপাশে হাত রাখল মাতভেই। ইসাবেলা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে। এই নৈকট্য ওকে অস্বস্তি দেয়। সরে বসতে গিয়েও জড়তা জাগে।
“বেল?”
“হুঁ?”
“তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?”
“হ্যাঁ।”
মাতভেই মুচকি হেসে ওর কপালে চুমু দিয়ে আগের মতো সরে বসল। ইসাবেলা কিছুই যেন বুঝল না। ভুরু কুঁচকে বলল,
“কেন বললে ওকথা?”
“কোন কথা?” বইয়ে ফের মনোযোগ দিলো মাতভেই।
“বিশ্বাস করি কি না।”
“আমি কাছে যাওয়াতে অস্বস্তি হচ্ছিল তোমার। ভেবেছিলে কিছু বোধহয় করে ফেলব, তাই না?”
লজ্জিত হয় ইসাবেলা। মাতভেই শব্দ করে হাসল।
“তোমাকে মাস দুই আগে কী বলেছিলাম মনে আছে?”
“হ্যাঁ, তুমি আমাকে বন্ধু ভাবো।”
“এক্সাক্টলি, তাহলে আমার সাথে এখনো সহজ হও না কেন তুমি? এত জড়তা কীসের? তুমি কি অন্যকিছু ভাবো__”
“না, না। আমি বন্ধু আর বড়োভাই ছাড়া আর কিছু ভাবি না তোমাকে। কসম করে বলছি।”
গলা ছুঁয়ে বলল ইসাবেলা। ওর আতঙ্কিত মুখ দেখে না হেসে পারে না মাতভেই।
“বোকা মেয়ে, আমি তো এমনিতেই বলেছি। আয়নায় তাকাও কেমন আতঙ্কিত হয়ে আছে তোমার মুখ। সামান্যতেই ঘাবড়ে গেছো। এসব কিন্তু ভালো লক্ষণ নয় ইসাবেল।” দুষ্টু চোখে ভুরু নাচাতে লাগল মাতভেই। ইসাবেলা রুষ্ট মুখে উঠে দাঁড়ায়। হাতের বইটা দিয়ে মাতভেইর বাহুতে বাড়ি দিয়ে বলে,
“তুমি সবসময়ই এমন ফাজলামো করো মাতভেই। ধ্যাৎ! ভালো লাগে না। আর কখনো ফুল এনে দেবো না তোমাকে।”
“আচ্ছা, সরি। এই নাকে ধরেছি।”
“লাগবে না তোমার সরি। অসভ্য কোথাকার।”
গাল ফুলিয়ে বেরিয়ে যায় মাতভেইর ঘর থেকে। মাদাম আদলৌনা কিচেনে দুপুরের খাবার তৈরি করছিলেন। চুলায় মাতভেইর গোসলের পানি গরম হচ্ছে। ইসাবেলার গোমড়া মুখ এসে বসল চুলার পাশে।
“আবার কী হয়েছে?” জানতে চাইলেন মাদাম আদলৌনা। ইসাবেলা বলল,
“কিছু না।”
হাঁপ ছেড়ে আটা গুলতে লাগলেন মাদাম।
“তোমার কারণে ছেলেটার মুখে একটু হাসি দেখি। না হলে পায়ের কারণে ছেলে আমার ডিপ্রেশনে ভুগছিল। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিল মাতভেই। দিনরাত বন্ধ ঘরে বসে দুশ্চিন্তা করত। কথা বলাও ছেড়ে দিয়েছিল। তোমার কারণে ছেলেটা আমার আবার আগের মতো হয়েছে। কোনোদিন ওর পা ঠিক হবে কি না জানি না, কিন্তু ও বাঁচার আশা আর ছাড়বে না। তুমি ওকে সেই মনোবল জুগিয়েছ। কৃতজ্ঞ আমি তোমার কাছে ইসাবেলা।”
“এসব বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না মাদাম। কৃতজ্ঞ তো আমি আপনাদের কাছে। অচেনা একটা মেয়েকে আপন সন্তানের মতো গৃহে আশ্রয় দিয়েছেন। মাতভেই ছোটোবোনের মতো ভালোবাসা দিয়েছে। আপনাদের এই ঋণ আমি কিছুতেই পূরণ করতে পারব না।”
মাদাম হাত ধুয়ে ইসাবেলাকে কাছে ডাকেন। ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলেন,
“সৃষ্টিকর্তা তোমার দুঃখ কষ্ট লাঘব করে দিন। সুখী হও জীবনে মা।”
ইসাবেলা সরে এসে মাদামের হাতটা ধরে অশ্রুসজল চোখে বলে,
“মাতভেই আবার হাঁটবে। আবার আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরবে ও। আপনি চিন্তা করবেন না ওকে নিয়ে।”
“হুম, তাই যেন হয় মা।”
মাদাম আবার ব্রেড বানানোর কাজে লেগে যান। ইসাবেলা স্যুপ তৈরির প্রস্তুতি নেয়। স্যুপ তৈরির সামগ্রীর মধ্যে গাজর খুঁজে পেল না।
“মাদাম গাজর তো আনা হয়নি।”
“আহ! ভুলে গেছি।”
“এখন গিয়ে নিয়ে আসব?”
“ঠিক আছে। সাথে দু হালি ডিমও এনো।”
পার্স থেকে টাকা বের করে দিলেন ইসাবেলাকে। ব্রিজের পথে গেলে সময় বেশি লাগে। সময় বাঁচাতে পুব দিকে জঙ্গলঘেরা হাঁটু সমান বরফের ওপর দিয়ে রওনা হয়। এই পথে যেতে ওর ভালোয় লাগে। পাখির কূজন শুনতে শুনতে এগিয়ে যায়। দুপুর হতেই সূর্যের তেজ ম্লান হয়। মৃদু বাতাসে উড়ে আসা বরফের ছাঁট বাড়িয়ে দেয় ওর গায়ের কাঁপুনি। শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে মুখ থেকে ধোঁয়া ওড়ে। বাজারে পৌঁছে কেজি খানেক গাজর আর দু হালি ডিম নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয় আবার। ডিম আর গাজর একটা ব্যাগে ভরে বা’বাহুর সাথে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে। ডান হাতে চিকন লম্বা একটা গাজর। ওটা এক এক কামড়ে চর্বণ করতে করতে জঙ্গলের পথ ধরে এগোচ্ছিল। হঠাৎ একটা পরিচিত গন্ধে পা জমে গেল। সেই সোঁদা মাটির গন্ধ! ডান হাতের অর্ধ খাওয়া গাজর ঠোঁটের কাছের থেমে আছে। বা’বাহু শক্ত হয় ব্যাগের ওপর। ঘুরে তাকায় বা’দিকে। না কেউ নেই।
ধীরে ধীরে ডান দিকে ঘুরতেই চমকে ওঠে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিকোলাস। পরনে সেই কালো আলখেল্লা। হুডি ঘাড়ের ওপর পড়ে আছে। চট করে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় ইসাবেলা। কান্নার তরঙ্গ ওর বুকে আছড়ে পড়ে। চোখ দু’টো ভীষণ জ্বলছে। হাত- পা জমে যাওয়ার উপক্রম। ডান হাতের গাজর মাটিতে পড়ে যায়। ব্যাগটাও হয়তো পড়ত, ইসাবেলা বাহু শক্ত করে। এতদিন বাদে নিকোলাসকে দেখে বুকের বা’পাশে গোপন ব্যথাটা নড়ে উঠল। প্রকাশ্যে আসার জন্য বেপরোয়া। আর দুর্বল হতে চায় না ইসাবেলা। যে নির্দয়ভাবে ছেড়ে গেছে তার প্রতি কোনো আবেগ জাহির করবে না। দ্রুত পদে হাঁটতে লাগল সামনে। যত এগোচ্ছে সেই পরিচিত গন্ধটা ততই হারিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ইসাবেলার। চেপে রাখা কান্নাটা বানের জলের মতো ফুঁসে ফেঁপে বেরিয়ে এলো চোখ দিয়ে। চোখ মুছতে মুছতে ছুটল বাড়ির দিকে। পেছন ফিরে তাকাবে না ও। নিকোলাসের জন্য ওর মনে আর কোনো স্থান নেই। কিন্তু মন যে সেকথা মানতে চাইল না। এত উপেক্ষা আর ব্যথার পরেও নিকোলাসকে আরেকবার দেখার সাধ জাগে। থেমে যায় ইসাবেলা। ঘুরে দাঁড়ায় জঙ্গলের দিকে। নিকোলাসের ছায়াও এখন আর নেই সেখানে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ব্রিজে ওঠে। বিড়বিড় করে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলে,
“কেন নিকোলাস? কেন? আর যে সহ্য হয় না আমার। হৃদয় ভাঙার ব্যথা কত সাংঘাতিক যদি জানতেন আপনি নিকোলাস! যদি বুঝতেন সেদিন কতটা আঘাত আমায় দিয়েছেন! বোকা আমি, ভুলে যাই কারো দুঃখে আপনার কিছু এসে যায় না। ভুলে যাই আপনার কাছে কিছু আশা করা বোকামি। এত কিছু জেনেও আমার মন বার বার একই ভুল, একই বোকামি করে। কী করব এই মনকে নিয়ে আমি? কী করব!”
থমথমে রাত। গহীন অরণ্যের মাঝে একদল নর -নারী হাঁটু ভেঙে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে আছে। সামনে বহু পুরোনো মদভর্তি বোতল, ক্রন্দনরত পাঁচটা শিশু আর ভীতবিহ্বল অর্ধ নগ্ন দুজন তরণী। প্রার্থনারত নর -নারীর মুখে অদ্ভুত শব্দ। অশুভ শক্তিকে আহ্বান করছে ওরা। অদূরে জ্বলছে তিনটে মশাল। সেই মশালের আলোতে অস্বাভাবিক ওদের চাহনী। রাত গভীর হতেই অশুভ শক্তির প্রতি আহ্বান আরো জাগ্রত শোনায়। অশুভ এক আবহাওয়া চারিদিকের ঘন কালো অন্ধকারে জড়িয়ে যায়। ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে নেকড়ের গর্জন। একটা দুটো এমন করে অসংখ্য নেকড়ের গর্জনে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। ধীরে ধীরে মানুষগুলোর দিকে অগ্রসর হয়। প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে থাকা নর-নারীরা কাঁপছে থরথর করে। শীতে নয়, আতঙ্কে। কিন্তু সেই আতঙ্ক চোখ ওদের পর্যন্ত পৌঁছাছে না। চোখে তখন কেবল লোভ আর লালসা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। চাপা গোঙানির শব্দ শুনতেই ঠোঁটের হাসি দীর্ঘ হলো ওদের।
“প্রভু, প্রভু।” আগের চাইছে জোর গলায় ডাকল ওরা। হঠাৎ অনেকগুলো কালো বাদুড় উড়ে এসে ঘিরে ধরল। তারপর সেই বাদুড় একটা মানুষের অবয়ব নেয়। দু-হাত শূন্য তুলে উঁচু গলায় পিশাচ বন্দনা করে। ঝুঁকে পড়ে মূর্তিটির সামনে। আবেগ ঢেলে পড়ল ওদের গলায়,
“প্রভু, প্রভু।”
আপাদমস্তক কালো আলখেল্লা পরা দীর্ঘদেহি এক মানব মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ওদের সামনে। চোখ দুটো এবং নাক হুডির আড়ালে। চাঁদের আলোয় চকচক করছে ওর রক্তিম ঠোঁটের দু’পাশের সাদা দাঁত। জ্বলন্ত বুভুক্ষু চোখে এক পাল নেকড়ে এসে থামল দু’পাশে। সদর্পে পায়চারি করতে করতে মূর্তিটি বলল,
“আমি খুশি হইনি তোদের কাজে। সন্তুষ্ট করতে পারিসনি আমাকে তোরা।”
রাগে ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে। সামনে বসা এক মধ্যবয়সী নারী থুতনি তুলে সরাসরি চেয়ে বলে,
“খুশি হননি? আপন স্বামী-পুত্রের শেষ রক্ত পান করেছি আপনাকে সন্তুষ্ট করতে। গোরু- ছাগল, পাখি কিছুই বাদ রাখিনি। আর কী করব বলুন প্রভু। আর কী করলে অমরত্ব পাব আমি?”
আলখেল্লা পরিহিত মূর্তিটি এগিয়ে এসে রমণীর চোয়াল চেপে নিকটে এনে বলে,
“ব্যস এইটুকু! এখনো এই গাঁয়ে জীবন্ত মানুষের হাসি শোনা যায়, ঘরে ঘরে পবিত্র মানব শিশু জন্মায়, ঈশ্বরের আরাধনায় গির্জার ঘণ্টা বাজে। আমি চাই এসব বন্ধ হোক। গাঁয়ে জীবন্ত নয় জীবন্মৃতের হাসি শোনা যাবে, মানব শিশু জন্মাবে পিশাচের গোলামি করতে, গির্জায় ঘণ্টা ঈশ্বরের নয় আমার আরাধনায় বাজবে। তোরা সবকটা অকর্মা। তোদের দিয়ে এসবের কিছুই হয়নি। গোলামিটাও ঠিকমতো করতে পারিস না তুচ্ছ মানুষ। আবার অমরত্ব চাস? গোলাম, অমরত্ব নয় তোকে মৃত্যু দেবো।”
ঠোঁটের পাশের সাদা সুচালো দাঁত দু’টো মুহূর্তে নারীর নগ্ন কাঁধে গেঁথে যায়। অসহ্য যন্ত্রণা ছটফট করতে লাগল। খানিক পরে নারীর আর্তনাদ থেমে যায়। মাটিতে পড়ে গেল ওর নিথর, প্রাণহীন দেহ। বাকিরা আতঙ্কিত। নত মাথায় ক্ষমা প্রার্থনা করছে। কিন্তু ওরা জানে না, ক্ষমা শব্দটা পিশাচের অভিধানে নেই। এরা কেবল আপন স্বার্থে চলে। ওই নারীর মতোই দশা হয় বাকিদের। নেকড়েদের রাতের খোড়াকে পরিণত হতে হয়। ওদের আহাজারি, নেকড়ের গর্জন আর পিশাচটার পৈশাচিক হাসিতে কেঁপে ওঠে রাতের নির্জনতা। শিশু আর তরুণীদের তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় পিশাচ মূর্তিটি। মুহূর্তে আবার সেই নিশুতি নিস্তব্ধতা।
গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন ইসাবেলা। গলা অব্দি কম্বল টানা। ঘুমের ঘোরে বা’কাঁত হলো। বন্ধ ঘরে আচমকা দমকা হাওয়া বইতে লাগল। জানালার পর্দা উড়ে একপাশে সরে যায়। বাঁকা চাঁদ আকাশে। চাঁদের আলো এসে পড়ল ঠিক ইসাবেলার শিওরে। মাথার কাছের জানালার ফাঁক গলে একটু একটু করে ঘরে ধোঁয়া ঢুকল। স্বরূপে আবির্ভূত হলো নিকোলাস। নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় ইসাবেলা মাথার পাশে। অনিমেষ চেয়ে আছে চন্দ্রালোকিত ইসাবেলার মুখশ্রীতে। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেও একটা শব্দ ওর কানে এসে লাগল। ঢিপ, ঢিপ, ঢিপ। হাত রাখল বুকের বা’পাশে ওপর। শব্দটার উৎপত্তি এখান থেকে। শব্দ বেজে ওঠে কেবল এই ঘুমন্ত তরুণীর কাছাকাছি এলে। ও নিকোলাসের সব এলোমেলো করে দিয়েছে। ঘৃণা করে ম্যাক্স এবং তাঁর বংশধরদের। কিন্তু ইসাবেলাকে কেন ঘৃণা করতে পারছে না? মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এতদিন দূরে থাকার পরেও আবার এই মেয়ের সামনেই এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে আসার পূর্বে পণ করেছিল ইসাবেলার খোঁজ নেবে না। দুদিন না যেতেই সে পণ ভেঙেছে। পাবে না জেনেও গিয়েছিল সেই জঙ্গলে আর লিভিয়ার বাড়িতে। কোথাও ছিল না ইসাবেলা। গত চারমাস মনকে বুঝিয়েছে ও ইসাবেলার পরোয়া করে না। যা করেছে তাতে একটুও অপরাধবোধ নেই। কিন্তু সেদিন ইসাবেলাকে না পেয়ে, ওর সাথে কিছু ঘটেছে এই ভয়ে পূর্বের সব কথা অর্থহীন হয়েছে। ওর নির্মমতা ওকেই শতগুণে আঘাত করেছে। ক্ষুব্ধ হয় নিজের ওপর। কেন এত নিষ্ঠুর হলো সে? কেন? ভেতর থেকে জবাব এলো,
“এই নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতাকে একদিন স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিস তুই। ধ্বংস ছাড়া এ স্বভাব থেকে তোর নিষ্কৃতি নেই।”
নিকোলাস জানে এ সত্যি। জানে বলেই নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি। ইসাবেলাকে বলেনি কতটা পছন্দ করে ওকে। অপ্রকাশিত অনুভূতি যত সহজে উপেক্ষা করা যায় প্রকাশ্যে এলে তা কঠিন হয়। তাছাড়া ম্যাক্সের বংশধরদের সাথে কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় না। এই ম্যাক্স নাম নিকোলাসের ভালোলাগাকে ক্রোধে পরিণত করে। সেই ক্রোধের স্বীকার হয়েছে ইসাবেলা। বার বার এমনই হবে। কষ্ট পাবে ইসাবেলা। এই একজন মানুষকে কষ্ট দিয়ে শান্তি পায় না নিকোলাস। নিজের শান্তির জন্য হলেও ইসাবেলাকে কষ্ট দিতে নারাজ। এ নিয়ে স্বভাব আর মনে চলে তুমুল লড়াই।
“আমি তোমায় ব্যথা দিয়েছি বিনিময়ে ঘৃণা, ক্ষোভ আমার প্রাপ্য। এই প্রাপ্য আমি অস্বীকার করি না, বেলা। কিন্তু আজ যখন দেখেও মুখ ফিরিয়ে চলে গেলে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল আমার। অস্বীকার করতে ইচ্ছে হলো তোমার এই রাগ, ক্ষোভকে। বেলা, এখন কি তুমি আমাকে ঘৃণা করো? হয়তো করো। এটাই তো স্বাভাবিক। অথচ, আমার মন চাইছে কিছু অস্বাভাবিক হোক। নিষ্ঠুর হওয়ার সাথে সাথে কেমন স্বার্থলোভীও আমি, তাই না বেলা?”
বিদ্রুপের হাসি নিকোলাসের ঠোঁটে। ইসাবেলার শিওর থেকে উঠে জানালার কাছে যায়। পেছন ফিরে শেষবার ওর মুখটা দেখল।
“জানি না, কোন তীব্র আকর্ষণ আমার সকল নিয়ন্ত্রণে ধ্বস নামায়! চঞ্চল হয় মন। আসব না, দেখব না ভেবেও গন্তব্য শেষ হয় তোমার দুয়ারে। আমি চাই না আবার চাই তোমায়, বেলা। এই চাওয়া না চাওয়ার দ্বিধাদ্বন্দ্ব কোনোদিন শেষ হবে কি না জানি না, শুধু জানি তোমাকে ভুলে থাকা আমার দ্বারা আর হবে না। আমি চাইলেও সেটা এখন অসম্ভব। এই অনুভূতির যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝত!”
যেভাবে এসেছিল সেভাবেই বেরিয়ে গেল নিকোলাস। মিনিট বাদে ইসাবেলা ডান পাশ ফিরল। ধীরে ধীরে সিক্ত চোখ মেলে তাকায়। বালিশের কোণাটা দুহাতে চেপে ধরে মুখ গুঁজে কান্নার শব্দ গোপন করার চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবে, একি স্বপ্ন ছিল? নিকোলাস কি স্বপ্নে এসেছিল? যা শুনল সব কি ওর স্বপ্ন? কিন্তু সেই সোঁদা মাটির গন্ধ যে স্পষ্ট পেয়েছিল ও। নাক টানল আরেকবার। এখনো এই ঘরে গন্ধটার রেশ রয়ে গেছে। তবে সত্যিই এসেছিল ওর ঘরে নিকোলাস? ওই কথাগুলো স্বপ্নে নয় বাস্তবেই বলেছে? ইসাবেলার সর্ব শরীর অসাড় হয়ে এলো। অস্থির হয়ে ওঠে চিত্ত। নিকোলাসের মনের কথা জেনে কীভাবে প্রতিক্রিয়া করবে ভেবে পেল না। কাঁদতে কাঁদতেই হেসে উঠল, পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে হয়ে গেল। এভাবে বিক্ষিপ্ত মনে নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো ঘণ্টা পর ঘণ্টা। রাত ভোর হওয়ার পথে। ইসাবেলা আবার বা’পাশে ফিরে শোয়। সামনের অন্ধকারে নির্নিমেষ চেয়ে রইল। একসময় জলে ভরে উঠল আঁখি।
“আপনাকে ঘৃণা করতে পারলে বুঝি ঠিক হতো, কিন্তু সেই ঠিক আজ আমার কাছে বেঠিক নিকোলাস। আপনাকে ঘৃণা করা ইহজীবনে আমার হবে না। পিটারকে আমি ভালোবাসতাম, ভেবেছিলাম এই অনুভূতি কখনো বদলাবে না। আজ দেখুন, ভালোবাসি কথাটা ভালোবাসতাম হয়ে গেল। বেঈমান, বেহায়া হলো আমার মন আপনার কারণে নিকোলাস।” দু-হাত বুকে জড়ো করে বলে,” ঈশ্বর, আর দেখিয়ো না তাঁকে। এ মন বড়ো দুর্বল। একবার একজন ভেঙেছে, জোড়াতালি দিয়ে বেঁচে আছি। এবার ভাঙলে যে আর বাঁচতে পারব না। যা আমার হবে না তাতে আর মন মিশিয়ো না। দয়া করো প্রভু, এই দুর্বল মনের ওপর করুনা করো।”
ইসাবেলার রাত ভোর হলো অশ্রু বিসর্জন দিয়ে। ভোরের দিকে আবার ঘুমে তলিয়ে যায়। ঘুম ভাঙে মাতভেইর ডাকে। ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুলে আবার ফিরে এলো বিছানায়। কম্বল টেনে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। মাতভেইর ক্রাচের ঠক ঠক শব্দ বিছানার পাশে এসে থামে। বিছানার একপাশ দেবে যায়। ইসাবেলার রাতের কান্না হঠাৎ ফিরে আসে। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে মাতভেই।
“বেল, কী হলো তোমার? কেন কাঁদছ?”
কোনো জবাব নেই। ফুঁপিয়ে কাঁদছে ইসাবেলা। মাতভেই আর প্রশ্ন করল না। ইসাবেলা ওকে নিজের জীবনের অনেক কিছুই বলেছে। নিজের পরিবার পরিজনের কথা, পিটারের কথা। অসুস্থতার কারণে বায়ুবদলে বাড়ি থেকে দূরে আসা। আততায়ীর হাতে ভ্যালেরিয়ার মৃত্যু তারপর সেখান থেকে পালিয়ে একের পর এক বিপদ কাটিয়ে এই পর্যন্ত লিভিয়ার আশ্রয়ে থাকা ইত্যাদি। মাতভেই বিশ্বাস করেছিল ওর কথা। মেয়েটার প্রতি করুণা জন্মেছিল। কথা দিয়েছে পা’টা চলার মতো ঠিক হলেই বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“বাড়ির কথা মনে পড়ছে, বেল?”
ইসাবেলা মাথা ঝাঁকাল হ্যাঁ সূচক। হাঁপ ছেড়ে আহত পায়ের দিকে তাকায় মাতভেই। পা’টা যে কবে ঠিক হবে! কবে পৌঁছে দেবে আপন দেশে মেয়েটাকে!
ক্যাম্প এবং যুদ্ধ স্থলের অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় পায়ের টিস্যু অকেজো হতে থাকে। অসহনীয় ব্যথা হতো। ওর সাথের কয়েকজন সৈন্যের মৃত্যু ঘটেছিল এই রোগে। মাতভেই মরেনি কিন্তু ওর ডান পা’টা প্রায় অকেজো হয়ে যায়। ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বলেছেন এ পা আর ভালো হবে না। পঙ্গু দিয়ে তো যুদ্ধ হয় না। ফিরতে হলো বাড়িতে ওকে। মাদাম আদলৌনা আশা ছাড়েননি। আধুনিক ঔষধ যা পারেনি ভেষজপাতা দিয়ে তাই চেষ্টা করছেন। আজকাল মাতভেই সামান্য অনুভব করে পায়ে। হতাশা ভুলে নিজেও মনে মনে আশা করে একদিন দুপায়ে দাঁড়াবে। ইসাবেলা সেই আশায় জোর বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মেয়েটাকে দেওয়া কথা ওর মনোবলে শক্তি জোগায়। মাত্র পঁচিশ বছরের জীবন। কত কী দেখার, করার বাকি আছে। ওই যে মেয়েটা- যাকে মাতভেই মন দিয়ে বসে আছে। যে মাতভেইর জীবনের প্রথম প্রিয়তমা। পরপর দুটো রাতের সঙ্গীনি ছিল মেয়েটি। ওই দুই রাতই শ্রেষ্ঠ রাত মাতভেইর জীবনে। এরপর আর দেখা হয়নি, বলা হয়নি মনের কথা। ইসাবেলাকে রাশিয়া নিয়ে যাওয়ার পর সে আরেকবার ওই ক্লাবে যাবে। খুঁজবে মেয়েটাকে। প্রায় দু’বছর হতে চললো। এতদিনে মেয়েটার নিশ্চয়ই নতুন সঙ্গী হয়েছে? অথবা প্রেমিক? এখন কি মাতভেইকে চিনবে? মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে এসব ভেবে।
ইসাবেলা চোখ মুছে উঠে বসল। এতক্ষণ কেঁদে বড্ড হালকা লাগছে। মাতভেইর প্রশ্ন এড়াতে বিছানা ছেড়ে নেমে সোয়েটার পরে নেয়। অবিন্যস্ত চুলগুলোর ওপর স্কার্ফে পরতে পরতে বলল,
“নাস্তা করেছ মাতভেই?”
“না, একসাথে নাস্তা করব বলেই ডাকতে এলাম।”
“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তুমি রুমে গিয়ে বসো।”
“রুমে নয়, আজ লনে বসে নাস্তা করব।”
“লনে! মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? এত ঠাণ্ডার মধ্যে লনে বসলে পায়ে সমস্যা হবে তোমার।”
“হবে না। পায়ে একসাথে তিনটে গরম মোজা আর বুট পরে নেবো।”
“না।”
“প্লিজ বেল। একসপ্তাহ ঘরে বসে বোর হয়ে গেছি। শুধু আধঘণ্টা বসব।”
“মাদাম রাগ করবেন।”
“করবে না। আমি মানিয়ে নিয়েছি।”
“সত্যি?”
“শতভাগ।”
“আমার বিশ্বাস হয় না।”
মাতভেইকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল ইসাবেলা।
“এই না সেদিন বললে আমায় বিশ্বাস করো?”
“সে আলাদা কথা ছিল। এখন আমি মাদামের ঘরে গিয়ে নিজের কানে শুনে আসব।”
“অবিশ্বাসী নারী।”
মেকি ক্ষোভ প্রকাশ করে মাতভেই। ইসাবেলা চোখ পাকিয়ে মুচকি হেসে মাদামের ঘরে গেল। মাদাম আদলৌনা ঘরে নেই। নিচে খুঁজেও পেল না। মাতভেই প্রস্তুতি নিয়ে ততক্ষণে নিচে নেমে এসেছে। লনের দিকে যাবে অমনি পেছন থেকে ওর সোয়েটারের টেনে ধরে ইসাবেলা।
“না, আর এক পা এগোবে না।”
“প্লিজ বেল!”
“মাদাম রাগ করবেন মাতভেই।”
“মা গির্জায় গেছে। আসতে দুপুর হবে। মাত্র আধঘন্টার ব্যাপারই তো। মা জানবে না।”
“আমি মাদামের থেকে কিছু লুকাব না। বাইরে কি পরিমাণ তুষার পড়েছে দেখছ? তোমার পায়ের জন্য লনে বেরোনো ঠিক হবে না এখন।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসার ঘরে এসে বসল মাতভেই। ইসবেলার খারাপ লাগল ওর বিমর্ষ মুখ দেখে। একটুখানি ভেবে কিচেনে গেল। ফিরে এলো প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে।
“চলো আমার সাথে।”
“না, এখানেই বেশ আছি।”
“বাব্বাহ! কী রাগ। ওঠো বলছি।”
জোরপূর্বক দাঁড় করিয়ে নিয়ে এলো পুর্ব দিকের বড়ো জানালার পাশে। খোলা জানালা দিয়ে বাইরের বরফ আচ্ছাদিত গাছ, বাড়ি সবই দেখা যাচ্ছে। অদূরের সাদা বরফে মোড়া জঙ্গলের খানিকটাও চোখে পড়ে। হিম বাতাস বইছে। মাতভেই জানালা ঘেঁষে হাত বাড়ায় বাইরে। তুষার বৃষ্টিতে ভিজে গেল ওর হাত। হাসি মুখে সামনে চেয়ে রইল। বন্ধ ঘরে বসে এই খোলা হাওয়া, শীতল বাতাস ও মিস করছিল। প্রাণভরে শ্বাস নিলো।
ইসাবেলা ভেতরের ঘর থেকে ছোট্ট টেবিল আর দুটো চেয়ার এনে রাখল। টেবিলের ওপর চকলেট রোল, গরম কফি, কুকিজ আর প্যান কেক দিয়ে সাজিয়েছে। মাতভেই বসল চেয়ার টেনে। ইসাবেলা বসার ঘরের ফায়ারপ্লেস থেকে কয়েক টুকরো উত্তপ্ত কয়লা একটা লোহার পাত্রে এনে মাতভেইর পায়ের নিচে রেখে হাত ঝাড়া দিয়ে বলল,
“শেষ।”
ঘুরে দাঁড়ায় মাতভেইর দিকে।
“এবার খুশিতো?”
সানন্দে মাথা নাড়ে মাতভেই। ইসাবেলা সবটা দেখে নিয়ে বলে,
“একমিনিট, আরেকটা জিনিসের অভাব। আমি যাব আর নিয়ে আসব।”
এক ছুটে দোতলায় উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর নেমে এলো একটা বই হাতে। মাতভেইর সামনে নিবেদনের ভঙ্গিতে বইটা দিয়ে বলল,
“মহারাজ, আজকের এই ব্রেকফাস্টটা আরো একটু চমৎকার করতে কবিতার বইটা পাঠ করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।”
বইটা হাতে নিয়ে রাজার ভঙ্গিতে মাতভেই বলল,
“অনুরোধ রক্ষা করা হলো বালিকে।”
তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৩৫+৩৬
তারপর দুজনে হো হো করে হেসে ওঠে। ইসাবেলা মাতভেইর সামনের চেয়ারে গিয়ে বসে। একটুকরো প্যান কেক মুখে দিয়ে ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিতে দিতে বই থেকে কবিতার লাইন আওয়াতে লাগল মাতভেই। চকলেট রোল চিবুতে চিবুতে দুহাতের মাঝে গাল রেখে মুগ্ধ হয়ে শুনছে ইসাবেলা। ঠোঁটের হাসি দেখে কে বলবে এ কেবল নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখার ছল।
