তিমিরে ফোটা গোলাপ শেষ পর্ব
Taniya Sheikh
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়। তাপমাত্রার পারদ ষাট এর কাছাকাছি নেমে গেছে। তীব্র ঠান্ডার সাথে মাঝে মাঝে গায়ে কাঁটা দেওয়া বাতাস বইছে। কখন না আবার দানবীয় তুষারঝটিকা শুরু হয়!
“আজ আবহাওয়া বেশ খারাপ। সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হলে ভালো হতো। সব কাজে ঢিলেমি তোমার। পথে ঝড়ের কবলে পড়লে কী হবে?” অনুযোগ মাতভেইর। দৃষ্টি এখনও গাড়ির বাইরে। পাশে বসা তাতিয়ানা তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলে,
“দোষ কার শুনি? তুমি আর তোমার মেয়ে মিলে সারা সকাল কিচেনে কাটালে। কত করে বললাম ওকে কিচেনে যেতে দিয়ো না। না, উনি শুনলে তো! মেয়ের যাতে খুশি তিনি তাই করেন। মেয়েটাও বাপের মতো হয়েছে। একটা কথা যদি শোনে আমার। এমনিতেই হুইলচেয়ারে বসে। তারওপর এত নড়াচড়া দেহে সহ্য হয়? অসুস্থ হয়ে পড়ল না? ভাগ্যিস রেইনি ছিল। নয়তো এই অবস্থায় একা সামলে উঠি তোমাদের দুটোকে নিয়ে!”
গলা ভিজে আসে তাতিয়ানার। মাতভেইর ইচ্ছে হচ্ছে কপাল চাপড়াতে। কেন যে কথাগুলো বলতে গেল। প্রেগন্যান্ট তাতিয়ানার মুড চেঞ্জ হলে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় এমনিতেও মেয়েদের মুড চেঞ্জ হয় সেকেন্ডে সেকেন্ডে। তারপর যা ঘটে! মাতভেই কান ধরে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“সব দোষ আমার। এই দেখো কানে ধরছি।”
“ঢং করবে না। সরে বসো আমার পাশ থেকে।” তাতিয়ানা মুখ ঘুরিয়ে নেয় জানালার দিকে। মাতভেই আরও কাছে সরে এলো। আবৃত্তির ঢঙে বলে,
“তোমা থেকে সরলে দূরে
মন আমার কেমন কেমন জানি করে।
এই যে তোমার দেহের উষ্ণতা, চুলের ঘ্রাণ
আমার শ্বাস বায়ুতে মিশে থাকা অক্সিজেন।
প্রিয়তমা, জায়া,
তোমার মন খারাপের অপরাহ্ণে পড়ুক প্রফুল্লতার ছায়া।
ছাড়ো মান, হাসো না জান!
ডার্লিং প্লীজ! ফেরাও না ও চাঁদমুখখান।”
মাতভেই আস্তে আস্তে তাতিয়ানার থুতনি ধরে নিজের দিকে ঘুরালো। সলজ্জে তাকালো তাতিয়ানা। মাতভেইর ঠোঁটে সেই নির্মল, মুগ্ধ করা হাসি। গাঢ় চুম্বনে শুষে নিলো স্ত্রীর মান। গোলফ্রেমের চশমা পরা চোখে তাকালে আজও হৃদয়ে কাঁপুনি ধরে তাতিয়ানার।
মাতভেই আঁজলা ভরে ওর মুখ তুললো।
“প্রেমে পড়লে?”
“সেই কবেই তো।”
গাড়ি এসে থামল আলেক্সিভ মহলের সামনে। ঝিরিঝিরি তুষার পড়ছে। ক্রমে ক্রমে বাড়ছে আবহাওয়ার ক্ষুব্ধভাব। সারা রাস্তা মাতভেই প্রার্থনা করেছে ঝড় না উঠুক। নিরাপদে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্রথমে নামল ও। তারপরে হাত ধরে নামালো তাতিয়ানাকে। সামনে তাকালো দুজন। কত স্মৃতিতে মোড়া এই বাড়িটি! এত বছরে খানিক পরিবর্তন এসেছে। অনেকদিন পর পিত্রালয়ে এলো তাতিয়ানা। মাতভেই ব্যবসার কাজে খুব ব্যস্ত ছিল। তবে শ্বশুরবাড়ির খোঁজ খবর নিয়মিত রাখে। হাত ধরে দুজনে এগোতে লাগল।
“আমার না চিন্তা হচ্ছে মাতভেই। হঠাৎ এমন জরুরি তলব করল কেন মা?”
“হয়তো অনেকদিন যাই না বলে।”
“আমার তেমন মনে হচ্ছে না।”
“তুমি খামোখা চিন্তা করছো। এই তো চলে এসেছি। এখনই সব জানা যাবে।”
সদর দরজা ভেজানো ছিল। ওরা ঢুকতে ভ্লাদিমির স্ত্রী ইলিয়া হলঘর থেকে এগিয়ে এলো। সোনালি চুল, লাল মুখশ্রী, কটা চোখের মণি। আন্তরিকতায় স্বতঃস্ফূর্ত থাকে যেন সব সময়। ভ্লাদিমি ওর পেছনে এলো। ইলিয়া তাতিয়ানার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মাতভেই ওর কুশলাদি জেনে ভ্লাদিমির সাথে কথা বলতে বলতে আগে আগে চললো। একটু পিছনে ইলিয়া তাতিয়ানার বাড়ন্ত পেটে চেয়ে বলল,
“কেমন আছো তোমরা?”
“ভালো।” মুচকি হেসে বলল তাতিয়ানা। এদিক -ওদিক তাকিয়ে বলল,
“তোমার বিচ্ছুটি কই?”
“ঘুম থেকে এখনও জাগেনি। সন্ধ্যার আগে উঠবে না। ছেলেটা ভীষণ দুষ্টু হয়েছে। শাশুড়ী মা বলে বড়ো ফুপির মতো। তুমি না কি ছোটোবেলা দুষ্টু ছিলে?”
“আরে ধুর! মা ওমন আমার নামে বাড়িয়ে বলে। যত দোষ এই নন্দ ঘোষের। বড়ো হওয়ার এই জ্বালা বুঝলে? মায়ের কাছে ভালো ছেলে তাঁর ভ্লাদিমি আর সবচেয়ে ভালো মেয়েটি ইসা..বেলা। ইসাবেলা!” ইসাবেলার নামটা ফিসফিস করে বলতে বলতে মুখ বিমর্ষ হয়ে যায়। ইলিয়ার মুখেও পড়ল সেই ছায়া। ইসাবেলাকে ও সরাসরি দেখেনি। কিন্তু ওর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো বড়ো ছবিটা দেখেছে। শুচিস্মিতা, মায়াবী মুখ! বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে অব্দি ওর নামটা শুনেছে আর ঠিক এভাবে বিমর্ষ হতে দেখে এদের। শাশুড়ী ও শ্বশুরকে কতবার ছোটো মেয়েকে স্মরণ করে চোখের জল ফেলতে দেখেছে! কারণ জিজ্ঞেস করলে ভ্লাদিমি গম্ভীর হয়। অপরাধবোধ ফুটে ওঠে চোখেমুখে। স্পষ্ট কারণ আর জানা হয় না।ইসাবেলা না থেকেও যেন আছে এ বাড়িতে। ইলিয়া চট করে প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলল,
“সরাসরি মায়ের ঘরে যাবে না একটু বিশ্রাম নেবে?”
হাঁপ ছেড়ে তাতিয়ানা বলল,
“মায়ের ঘরেই যাই।”
“চলো।”
“বাবার শরীর কেমন এখন? মায়ের বুকে ব্যথা কি খুব হয় এখনও?”
“বাবার শরীর আগের মতোই। খুব বেশি হাঁটা-চলা করলে অসুস্থ হয়ে বিছানা নেন। মায়ের বুকে ব্যথা কমেছিল। চিঠিটা পেয়ে বেজায় বেড়েছে।”
সিঁড়ির দু’ধাপ উঠে থামল তাতিয়ানা,
“চিঠি!”
খুব সতর্কে চাপা গলায় ইলিয়া বলল,
“হ্যাঁ, তোমাকে তো বলতেই ভুলে গেছি। মস্কো থেকে চিঠি এসেছে।”
“মস্কো থেকে! এই জন্য জরুরি তলব! চিঠি পড়েছে মা?” আবার ওপরে উঠতে লাগল তাতিয়ানা। ইলিয়া বলল,
“জানি না। কাওকে কিছু বলেনি চিঠি সম্পর্কে। বললেন সকলে এলে একবারে বলবেন। তোমার কী মনে হয়? কী হতে পারে?”
“কী জানি! ঠিক বুঝতে পারছি না।”
বাকি সিঁড়ি বেশ ভাবতে ভাবতে পার করলো তাতিয়ানা। মস্কোর সাথে এ বাড়ির সম্পর্ক শেষ হয়েছে নয় বছর আগে। প্রথম দু এক বছর বাপের বাড়ি থেকে টুকটাক চিঠি বা টেলিগ্রাম এলেও জবাব দেননি আন্না মেরিও। তারপর আর আসেনি। বাপ-মেয়ের মধ্যে শীতল লড়াই চলছিল। হঠাৎ এত বছর পর চিঠির আসার কারণ কী! সেই চিঠির কারণে আবার এমন জরুরি তলব! নানা বাড়ি মানেই আতঙ্ক ওদের কাছে। অতীত ক্ষত এখনও যে শুকায়নি।
আন্না মেরিওর কক্ষের দরজা খোলা ছিল। মাতভেই সামনের সোফাতে বসে আছে। বাইরে ঝড়ো বাতাস বইছে। এই কক্ষের জানালায় আঘাত করছে সেই বাতাস। ভ্লাদিমি জানালা ঠিক করে লাগিয়ে সোফার অপরপাশে বসল। ইলিয়া গিয়ে স্বামীর পাশে বসে। তাতিয়ানা কক্ষে ঢুকে প্রথমে বাবাকে দেখতে পেল। বিছানায় আধশোয়া তিনি। কথা বলছেন জামাতার সাথে। অথচ, তাঁর মুখে সেই আগের প্রসন্ন হাসি নেই। অসুস্থ দেখাচ্ছে। ওর উপস্থিতি টের পেয়ে তাকালো। হাসি দীর্ঘ হলো,
“কে, অ্যানা এলি মা?”
“হ্যাঁ, বাবা। তোমার শরীর তো আরও খারাপ হয়েছে দেখছি।”
“ও কিছু না। বয়স তো কম হলো না। আয় বাবার কাছে এসে বস। নানা ভাইকে নিয়ে এলি না? কতদিন দেখি না ওকে।”
তাতিয়ানা বাবার পাশে বসল।
“ওর চেকাপের ডেট আজ। একটু পর ডাক্তার আসবে বাড়িতে। রেইনি আছে বলে ভরসা করে একা রেখে এলাম।”
ওলেগ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন,
“মেয়েটার পা দুটোতে হঠাৎ কী যে হলো। ডাক্তার কী বলে? ঠিক হবে তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি ও নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করো না।” মিথ্যা বলল তাতিয়ানা। বাবাকে নতুন করে দুশ্চিন্তা করার উপলক্ষ্য দেয় না। মস্কো থেকে আসার বছরখানেক পরে একটা এক্সিডেন্ট হয় তাশার। তারপর থেকে পা দুটো প্যারালাইজড। ডাক্তার ওদের নিশ্চিত করে কিছু বলেনি। নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বলেছে। তাই করছে। এক ঈশ্বরই এখন ভরসা। বাবার সাথে কথা বলতে বলতে মা’কে দেখল তাতিয়ানা। কক্ষে ঢুকলেন। চিঠি হাতে বিছানার অন্য পাশে বসলেন। মেয়ের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। তাতিয়ানা জবাব দিতে দিতে খেয়াল করল মায়ের বয়স যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে এই ক’বছরে। কিছুটা কুঁজো হয়ে গেছেন। চোখের নিচে কালো, ফোলা। চামড়ার কুঞ্চন বেড়েছে। বেদনার নিগূঢ় ছাপ তাঁর মুখে। গম্ভীর মুখ তুলে বড়ো মেয়ের পর্যবেক্ষণীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিলেন। মৃদু গলা ঝেড়ে বললেন,
“তোমাদের সবাইকে এখানে ডেকেছি একটা বিশেষ কারণে। গতকাল মস্কো থেকে চিঠি এসেছে। তিখন লিখেছে, ম্যাক্সিম নিখোঁজ। বাবা হঠাৎ শয্যা নিয়েছেন।”
“তোমার ইচ্ছে হলে তুমি যেতে পারো মা। আমাকে এসবে টানবে না।”
ভ্লাদিমির সাফ জবাব। জবাবটা যেন তৈরি ছিল। ইলিয়ার চোখ রাঙানিকেও উপেক্ষা করে। আন্না মেরিও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গেলে তাতিয়ানাও একই জবাব দেয়। যাদের কারণে বোনকে হারিয়েছে। তাঁদের মুখ দেখার প্রয়োজনীয়তা মনে করে না। ওলেগ স্ত্রীর অসহায় মুখ চেয়ে সন্তানদের বলেন,
“মা’কে কথা শেষ করতে দাও তোমরা। অর্ধেক কথা শুনে আগেভাগে মতামত দিয়ো না।”
ভ্লাদিমি কিছু বলতে যাচ্ছিল। ইলিয়া হাত চেপে চোখে শাসায়। সুতরাং ও চুপ করল। তবে ক্ষোভ দেখা গেল চেহারায়। আন্না মেরিও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন,
“তোমার নানা তিখনকে দিয়ে লিখে পাঠিয়েছেন, ইসাবেলা যেন তাঁর সাথে শীঘ্রই দেখা করে। খুব প্রয়োজন এখন ওকে তাঁর।”
মুহূর্তে কঠিন নীরবতা নামল ওই কক্ষে। তারপর লাফিয়ে ওঠে ভ্লাদিমি।
“বুড়োর সাহস হয় কী করে আমার বোনের নাম নেওয়ার। আবার বলে খুব প্রয়োজন। কেন? ফের মারার প্লান করছে? একবার শেষ করে মন ভরেনি?”
“ভ্লাদিমি! সংযত হও।” ওলেগ সতর্ক করেন ছেলেকে। রাগে লাল ভ্লাদিমি। বাবার ওপর কথা বলা চলে না। কিন্তু যেই লোকের সরাসরি হাত রয়েছে ইসাবেলার জীবন নষ্টে তাঁর নাম শোনার পর নিজেকে তো শান্ত বা সংযত রাখা যায় না। আন্না মেরিও মুখ নুয়ে একদৃষ্টে চিঠিটা দেখছেন। তাতিয়ানা রাগ চেপে মা’কে বলল,
“তুমি কী বলো মা?”
সময় নিলেন আন্না মেরিও। তারপর সজল চোখে চেয়ে বললেন,
“একবার ওকে বলেই দেখো কথাটা।”
“খবরদার,অ্যানা।” চোখ রাঙায় ভ্লাদিমি। তাতিয়ানা সে দৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁতে দাঁত কামড়ে বলে,
“তুমি ভেবে বলছ? জানো না কী করেছে ওরা? ওদের কারণে আমাদের মুখ দেখতে চায় না ইসাবেলা। তার পরেও? ওর অতীত ক্ষত কেন ঘাটতে চাইছ মা? ছেড়ে দাও না। বাঁচতে দাও ওকে। বহুকষ্টে ওইটুকু বেঁচে আছে। নতুন করে আর কষ্ট বাড়িয়ো না।”
“তোমরা বুঝতে পারছ না। ওর ওখানে যাওয়াটা হয়তো জরুরি। নয়তো বাবা এত করে অনুরোধ কেন করবেন?”
“আবার নতুন কোনো ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে হয়তো। খবরদার কেউ যদি ওর কাছে এই চিঠি নিয়ে গেছ।”
ছেলের চিৎকারে আন্না মেরিও আচমকা হু হু করে কেঁদে উঠলেন। বেশ অবাক হলো সকলে। মা’কে এভাবে কাঁদতে দেখেনি ওরা। সন্দেহজনক লাগল। মা নিশ্চয় আরও কিছু বুঝেছেন। কী? ইসাবেলার বিপদ হবে এমন কিছুতে এত জোর দেবেন না তিনি।জিজ্ঞেস করলে জবাব মিলবে না। বলার মতো হলে কান্নার ছল করতেন না। ওলেগ স্ত্রীকে কাছে টেনে ছেলেকে ধমকের সুরে বললেন,
“চুপ করে বসো ওখানে, ভ্লাদিমি। জিজ্ঞেস না করলে আর একটা কথা বলবে না। বসো।”
ভ্লাদিমি বসল। মা’কে কাঁদতে দেখে মোটেও ভালো লাগল না। তাতিয়ানা কী যেন ভাবছে। মাতভেই এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার ও বলল,
“সবই বুঝলাম। কিন্তু ওর পর্যন্ত পৌছাবে কে এ খবর? ও তো আমাদের কারও সাথে দেখা করতে চাইবে না।”
“সে উপায় আছে।” চোখ মুছলেন আন্না মেরিও।
“কী?” তাতিয়ানার ভুরু কুঁচকায়। সকলের মনে একই প্রশ্ন। ইলিয়ার আরও বেশি। ও পুরো ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছে। আন্না মেরিও উজ্জ্বল মুখে বলেন,
“পিটার। একমাত্র ওই পারবে আমার বেলার কাছে খবরটা পৌঁছে দিতে।”
পরদিন গির্জার সামনে অপেক্ষারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় পিটারকে। পরনে ওভারকোট আর মাথায় টুপি। হাত দুটো পকেট বন্দি। নাক পর্যন্ত টুপিতে ঢাকা। তার নিচে অনেকদিনের না কামানো দাড়ি। তাতে শ্রী নেই। বেশ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল গির্জার সামনের বারান্দায়। গির্জার ভেতরে গেল না। সামনে খোলা মাঠ। গত কয়েকদিনের তুষার ঝড়ে তুষারের পুরু আস্তরণে ঢেকে আছে। গির্জার সামনের পথে এক হাঁটু জমেছে। চলাচলে ব্যাঘাত ঘটছে পথচারীদের। একজন প্রৌঢ় ফাদার জমে থাকা তুষার সরাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে পিটার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। টুপিটা রেলিঙের ওপর রাখে। অবিন্যস্ত সোনালি চুলে হাত বুলিয়ে নেয়। চশমা ঠিক করে দৌড়ে ফাদারকে সাহায্য করতে ছুটল। ফাদারকে দাঁড় করিয়ে একাই রাস্তা পরিষ্কার করছে।
“পিটার!”
হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে ওঠা প্রিয় গলা শুনে ঘুরে তাকায়। হাসি ওর চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়।
“ইসাবেল!”
ফাদার বাকিটা একলা পারবেন বলে আশ্বস্ত করতে পিটার ফের বারান্দায় উঠে এলো, ইসাবেলার সামনে।
বিয়ের আগে যেই পবিত্র, সৌন্দর্যের প্রতিমা মুখ হৃদয়ে করে ফেরারি হয়েছিল তা আর অবিকল নেই। বিষাদে বিবর্ণ সেই সৌন্দর্য। ওকে খুঁজতে গিয়ে পিটার বন্দি হলো জার্মান সৈন্য কর্তৃক। দীর্ঘ কারাবাসের প্রতি মিনিটে হৃদয়ে আঁকা প্রিয় মানবীর নিষ্পাপ মুখ মনে করে দিনরাত অতিবাহিত করেছিল। কেমন আছে? কোথায় আছে? ভেবে ভেবে অস্থির ছিল। দুঃশ্চিন্তা ও অপরাধবোধে জর্জরিত। ওর কারণে ইসাবেলাকে ঘর ছাড়তে হয়েছে। মন ভেঙেছে, কাঁদিয়েছে। এই পাপ দগ্ধ করে। ওর কিছু হলে পিটার বাঁচবে কী করে? সময় কত বদলে দিয়েছে এই মেয়েটিকে। শুধু সময়? ওর নিজের দায় কি কম। খুব আছে, খুব। নিজেকে ভর্ৎসনা করে মনে মনে পিটার। ইসাবেলার পরনের সাদামাটা ধূসর কালো লম্বা স্কার্ট, মাথায় সাদা স্কার্ফ। পায়ে সাধারণ একজোড়া চপ্পল। চেহারার স্নিগ্ধতায় সন্ধ্যার মলিন আলো পড়েছে। ওর উদাস, নির্মোহ চোখে তাকাতে পারে না পিটার। বুক মথিত হয়।
“কেমন আছো?”
মুচকি হাসল ওর প্রশ্ন শুনে ইসাবেলা। যে হাসিতে নিস্পৃহতা বেশি। এই হাসি ফের পিটারকে বুঝিয়ে দেয় ও আজ সেই বান্ধবী, ভালোবাসার মানবীর সামনে দাঁড়িয়ে নেই। এই ইসাবেলার ওপর ওর কোনো হক নেই।
পিটারের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না ইসাবেলা। কত চেষ্টা করে জাগতিক সকল বন্ধন মুক্ত হওয়ার, ফেলে আসা অতীত ও সেই অতীতস্মৃতি জড়ানো মানুষগুলোর জন্য সৃষ্ট অনুভূতি চাপা রাখতে, ভুলে থাকতে। এদের চোখে তাকালে সেসব গোপন করতে কষ্ট হয়। এই জন্য তো কারো সাথে দেখা করতে চায় না। কিন্তু পিটার বরাবরই একরোখা। দেখা না করে যায়ই না। একসময়ের ভালোবাসা অস্বীকার করতে পারে ইসাবেলা, কিন্তু বন্ধুত্ব? বন্ধুত্বে জোড়া লাগাতে আসে পিটার। একজনের প্রচেষ্টায় কি হয় তা? ইসাবেলার সংকল্প ভাঙতে চায়। ফিরিয়ে নিতে চায় আগের জীবনে। ওরটা কি ভাঙতে পেরেছিল ইসাবেলা? মনে মনে হাসে। পিটারকে এবার বুঝিয়ে দেবে ও আর সেই ইসাবেলা নেই। যে কিশোরী ওকে ভালোবেসেছিল। ওর চলে যাওয়ার আঘাত সহ্য করতে না পেরে কেঁদে কেঁদে দিনরাত এক করেছিল। এই ইসাবেলা কাঁদে না। কান্না মানুষকে দুর্বল করে। নিঃস্বের আবার দুর্বলতা কীসের?
“আজও জবাব দিলে না।” বলল পিটার।
এসে ওর পাশে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ায়। এককালে পিটারের নাম শুনলে, দেখলে বা পাশে দাঁড়ালে ইসাবেলার বুক ঢিপঢিপ করত। লজ্জায় লাল হতো যৌবনে প্রেমের ছোঁয়া পাওয়া কিশোরীর মতো। আজ ও কিশোরী নেই। আবেগের আতিশয্য নেই। প্রথম প্রেমিকের সান্নিধ্যে মন দোলে না। বড়ো অস্বস্তি হয়। কিন্তু বুঝতে দেয় না।
দৃষ্টি সামনে স্থির রেখে বলে,
“অনর্থক প্রশ্নের জবাব তো দিই না আমি মি.মিখায়লোভ। তুমি যা সহজে দেখতে পাচ্ছো তা মুখ থেকে জানতে চাওয়া অর্নথক।”
“উফ! আবার মিখায়লোভ। এই সন্ন্যাসিনীদের সাথে থাকতে থাকতে ওদের মতো হচ্ছো। উদাসীনতা বাসা বাঁধছে পাকাপোক্তভাবে। নয়তো সামান্য একটা জবাবে এমন হেঁয়ালি করবে কেন?”
কথাটা অভিমানের। কাষ্ঠ হাসল ইসাবেলা,
“উদাসীনতা? কী যে বলো না। ওসবের সময় কই। তাছাড়া উদাসীনতা তোমাকেই মানায়।”
খোঁচাটা নীরবে হজম করল পিটার। হেসে বলল,
“খুব ব্যস্ত বুঝি আজকাল?”
“গতকাল পেরনাউ থেকে ফিরলাম। মানুষগুলো ভালো নেই পিটার। চারিদিকে এত দুঃখ, জরা। পেটের দায় মানুষদের খারাপ পথে ঠেলে দিচ্ছে। ঈশ্বর নিছক কল্পনা হয়ে আছে ওদের কাছে। যুদ্ধ শেষের দশ বছর গত হলো। কিন্তু এখনও দেশ ও দেশের মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে সেই ক্ষত। দুর্বিষহ জীবন তাদের। আমাদের অনেক কাজ পিটার। এই ক্ষত আমরাই সৃষ্টি করেছি। একে সারিয়ে তোলাও আমাদের কাজ। সমাজের দুঃখী, বঞ্চিত, শোষিত মানুষগুলোর প্রতিনিধি হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তুমি হয়ে দেখিয়েছ। অনেক কিছু শিখি আমি তোমার থেকে। একসময় তোমার কাজগুলো বুঝতাম না। এখন বুঝি।”
“আর আমাকে?” মুখ ফসকে বলে ফেললো পিটার। যতই সে বিপ্লবী হোক, সংসারধর্ম না করার পণ নিয়ে থাক। কিন্তু ইসাবেলাকে দেখলে হৃদয় গহিনে লুকানো প্রেম প্রদীপ জ্বলে ওঠে। সেই শিখা জ্বালিয়ে মারে। এ পাপ। তবুও তাই করে বারেবারে। ইসাবেলা বিস্ময়ে তাকায়,
“তোমাকে?”
“হ্যাঁ, আমাকে। বুঝতে চেষ্টা করেছ ধোঁকাবাজ, ভীরু-কাপুরুষ, হৃদয় ভেঙে দেওয়া নিষ্ঠুর পিটার ছাড়া আমাকে?”
ইসাবেলা ওর ভাসা ভাসা চোখে তাকায়। দৃষ্টি সরিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
“তোমাকে বুঝতে গেলে যে কত কী বুঝতে হবে আমায় পিটার। কত ব্যথা, কত কী হারানোর শোক! থাক না। থাক ওসব।”
বিড়বিড় করে বললেও পিটার শুনতে পায়। এই কত কী কথার আড়ালে ইসাবেলার অতীত শোক রয়েছে। অতীত! কিছু মানুষ অতীতকে বর্তমান করে বাঁচে। পিটার নিজেকে মনে করাতে গিয়ে ইসাবেলার আহত হৃদয়কে খোঁচা দিয়ে দগদগে করল। ওর চোখের ওই শূন্যতা, ওই ব্যথা নিকোলাসের শোক তাজা করে। ঈর্ষা কি হয় না পিটারের? ইসাবেলার মন থেকে যে ওর ভালোবাসা মুছে দিয়ে নিজেরটা পোক্ত করে গেছে তাকে একটু ঈর্ষা না করে পারে না। তবুও নিকোলাসের প্রতি ক্ষোভ নেই, রাগ নেই। একরাশ কৃতজ্ঞতা। ওর অনুপস্থিতিতে ইসাবেলাকে আগলে রেখেছে। অবশ্যই ওর চেয়ে বেশি ভালোবেসেছে। পিটার ভালোবাসা বিসর্জন দিয়েছিল। নিকোলাস নিজেকেই বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসা বাঁচিয়েছে। ওর প্রতি শ্রদ্ধা জন্মে পিটারের। ওর পিশাচরূপ সেখানে একটুও বাধা হয় না।
ইসাবেলা আকাশের দিকে তাকায়। শূন্য চোখের কার্ণিশ জল টলমল করে। মুহূর্তে সময় যেন দ্রুত পিছিয়ে যায়। দশ বছর আগে। স্বামী ও সন্তান হারিয়ে মুমূর্ষুপ্রায় ইসাবেলা। আন্দ্রেই নিজের রক্ত ওর মুখে না দিলে সেদিন মরে যেত। ভালো কি হতো না? বাঁচতে তো চায়নি। কিন্তু আন্দ্রেই যখন বলল,
“বাঁচতে হবে তোমাকে ভাবি। সন্তানের জন্য অপেক্ষা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
সব হারিয়েও ইসাবেলা সন্তানের পথ চেয়ে বেঁচে আছে এত বছর। আগাথা একদিন ক্ষমা করবে। ফিরিয়ে দেবে ওর মেয়েকে। সেই একদিন আসতে আর কত দেরি! ঈশ্বরের সেবায়, তাঁর সৃষ্টির সেবায় নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করতে গিয়ে থমকে গেছে শুধুমাত্র মেয়ের জন্য। দশ বছরে কত বড়ো হয়েছ ও! বাবার মতো কতটা দেখতে হয়েছে! এসব ভাবলে ইসাবেলার ব্যাকুলতা বাড়ে। একটু একটু করে চাপা যন্ত্রণা বেড়ে কষ্টের পাহাড় হয়েছে। এই ভার কেমন করে যে বইছে একমাত্র ওই জানে।
“তোমারই জিত হয়েছে। আমার সকল চেষ্টা বিফল হলো। আমার সকল দুঃখ আজ জাগ্রত, মুখের ওপর তার প্রকাশ ঘটেছে। এই তো দেখতে চেয়েছিলে? দেখো। খুশি হও। কিন্তু এও জেনে রাখো, ইসাবেলা তোমাদের আর কোনোদিন হবে না। তোমরা বহু আগেই মেরে ফেলেছ সেই ইসাবেলাকে। এই যেটুকু আছি তা একজনের জন্য।” বলতে বলতে ওর চোখের জল শুকিয়ে গেল। ফিরে এলো সেই গম্ভীর নির্মোহ মুখাভাব। পিটার দুঃখ পেল। বলল,
“আমি জিততে আসি না। তোমাকে হারিয়ে জিতে যাওয়া আমারই হার ইসাবেলা। শুনলে হাসবে। তবুও বলি, আমি আজও তোমাকে ভালোবাসি। সেই আগের মতো। কিন্তু তোমাকে নিজের করে পাওয়ার অধিকার আমার নেই। কোনোকালেই ছিল না। বুঝিনি এই অধিকার না করতে পারার অক্ষমতা তোমাকে এমন করে ব্যথা দেবে। বুঝলে নিজের অক্ষমতাকে হারিয়ে দেওয়ার শেষ প্রচেষ্টাটুকু করতাম। তোমার এই মলিন মুখ, নির্বেদ চোখ আমায় বড়ো অপরাধী করে ইসাবেলা। মনে হয় তোমার সকল কষ্টের কারণ একমাত্র আমি। খুব কঠিন শাস্তি আমার পাওনা। ঈশ্বর আমায় শাস্তি দিন, তোমার কষ্ট দ্বিগুণ করে আমাকে দিক। আর আমার সকল ভালো কাজের প্রতিদানে তোমাকে সুখী করুক। আবার তুমি হাসো। না, এই নিস্পৃহ হাসি নয়। উচ্ছ্বাস খেলে যাক তোমার ঠোঁটে, চোখে জ্যোৎস্না ঝরুক।”
ইসাবেলার বুকের ওপর চাপা পাথরটা কেমন গলতে শুরু করে। ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে আছে। চট করে ঘুরে দাঁড়ায় গির্জার দরজার দিকে। পিটার ভীত গলায় বলে,
“চলে যাচ্ছ?”
“অনেক কাজ আমার পিটার। আজ বরং তুমি যাও।”
পিটার জানে কাজ দেখানো অজুহাতের কথা। পিটারের সান্নিধ্য ও আর চায় না। বেহায়া মন বোঝে না। ইসাবেলার কাছে এসে নিজের কথা শুধু তোলে। ভুলেই গেল এখানে আসার আরও একটা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু সেটা ওর সামনে তুললে কীভাবে নেবে তাই ভেবে চিন্তা শুরু হয়। ইসাবেলা দরজার দিকে আরও দু কদম বাড়ায়। পিটার কোথা থেকে শুরু করবে ভেবে অস্থির। কিন্তু বলতে যে হবেই।
“তোমার নানা চিঠি পাঠিয়েছেন ইসাবেলা। শয্যাশায়ী তিনি। চিঠিতে খুব করে অনুরোধ করেছেন একটিবার মস্কোতে তোমায় যাওয়ার জন্য।”
দরজার বেদীতে এসে থমকে দাঁড়ায় ইসাবেলা। চকিতে ঘুরে তাকায়। এখনও আগুন ঠিকরে বেরোয়নি চোখে। কিন্তু রোষের তাপ খানিক বোঝা যায়।
“ওহ! তাহলে এই জন্য আসা তোমার?”
“এই চিঠি অছিলামাত্র। তোমাকে দেখতে আমি ঠিক আসতাম। দুঃখী মানুষগুলো ছাড়া একমাত্র তুমিই আছো যাকে আপন ভাবি। আমায় ভুল বুঝো না তুমি।” এগিয়ে এলো পিটার। ইসাবেলা শ্লেষের সাথে বলে,
“ভুল! সেটার মধ্যে তো এতক্ষণ আমি ছিলাম। মা তোমাকে পাঠিয়েছে না? সব জানার পরও কেন তাঁর কথাতে এই চিঠি নিয়ে এখানে আসতে পারো তুমি পিটার?”
ওর শেষ কথায় ক্ষোভ ঝরল। পিটার বলল,
“বিশ্বাস করো আমাকে তুমি। তোমাকে দুঃখ দেওয়া অভিপ্রায় আমার কোনোকালেই ছিল না।”
“এক ঈশ্বর ছাড়া আর কাওকে বিশ্বাস করি না। চলে যাও আমার সামনে থেকে। কোনোদিন আসবে না।”
পিটার আহত মুখে দাঁড়িয়ে ওকে গির্জার ভেতরে চলে যেতে দেখল। এ ছাড়া কিছু করার নেই ওর। ইসাবেলা দৃষ্টিসীমার আড়ালে যেতে ঘুরে সামনের উর্ধ্ব গগনে তাকিয়ে বলল,
“মানুষের প্রতি ওর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনো। সুখী করো। শান্তি দাও প্রাণে প্রাণে। তবেই আমি তোমার কাছে আবার আত্মসমর্পণ করব।”
গির্জার বাইরে এসে হঠাৎ পকেটের চিঠিটার কথা মনে পড়ল। আন্না মেরিও মার্কোভিকের লেখা চিঠিটা দিয়েছিলেন ইসাবেলাকে দেওয়ার জন্য। এতক্ষণে মনে পড়ল সেটা। ইসাবেলার নাগাল আজ আর পাবে না। কী করবে? একজন সিস্টার এদিকেই আসছিলেন। পিটার তাঁর কাছে চিঠিটা দিলো। তারপর যে পথে এসেছিল সেই পথেই রওনা হয়। পথটা দীর্ঘ। একা চলতে চলতে হাজারো মানুষের আশার প্রতীক হয়। একা থাকে না আর। শোষিত, দলিত মানুষগুলোকে বিপ্লবের গান শুনিয়ে বৈষম্যহীন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শেখায়। এই স্বপ্ন পূরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওকে ঘরছাড়া করে, কেবল একজনে আবদ্ধ হতে দেয় না। ও তো একজনের নয়। সমগ্র নিপীড়িত মানুষের।
সিস্টার মারির হাত থেকে না চাইতেও চিঠিটা গ্রহণ করল ইসাবেলা। হাতে নিয়ে তেমনই ফেলে রাখে নিজের টেবিলের ওপর। ওটা যেন অস্পৃশ্য কিছু। সিস্টার আসতে যেতে ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন। একদিন বললেন,
“তুমি জানো ওতে কি লেখা?”
ইসাবেলা মাথা নাড়ায় ওপর নিচে। সিস্টার মারি বললেন,
“আমাকে বলা যাবে? জোর করছি না। বন্ধুর মতো জানতে চাচ্ছি। ক’দিন ধরে বেশ অশান্তি লক্ষ্য করছি তোমার মাঝে। জানি এর কারণ ওই চিঠিটা। বলবে?”
ইসাবেলা ইতস্তত করে প্রথমে তারপর সব খুলে বলল। আশ্রমে আসার পর সিস্টার মারি ওর বৈরাগ্যতার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। এই একজনের সাথে অল্প সময়েই ভাব হয়েছে ইসাবেলার। ও ধোঁয়াশা করে নিজের জীবনের দুঃখ গাঁথা শুনিয়েছিল। আজ খোলাখুলি ভাবে বলল। কেবল নিকোলাসের পিশাচ হওয়ার সত্যিটা লুকায়। সব শুনে সিস্টার সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বললেন,
“আমার মন বলে নানাকে দেখতে যাওয়া উচিত তোমার। নানা বলে না হলেও একজন মৃত্যুশয্যায় শায়িত মানুষের শেষ ইচ্ছে মনে করে যেতে পারো। ঈশ্বর খুশি হবেন। তাঁকে খুশি করলে নিরাশ হবে না তুমি। আর যদি তোমার মন সায় না দেয় তো যেয়ো না। কিন্তু রাগ বা ক্ষোভে সিদ্ধান্ত না নেওয়াটাই উপযুক্ত। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। সহায় হোন।”
সিস্টার মারির কথা ভাবালো। মনেও হাজারো প্রশ্ন। পরিবারের এত মানুষ থাকতে নানা ওকেই কেন যেতে বললেন? কোন মুখে? নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করছেন? আবার কেন? না কি ড্যামিয়ান ফিরে এসেছে! তা কী করে সম্ভব। ওর সামনেই তো খাদে হারিয়ে গেল ড্যামিয়ান। ওত গভীর খাদে পড়ে বেঁচে ফেরার কথা নয় ওর। তাহলে কেন ইসাবেলাকে যেতে বলেছেন নানা মার্কোভিক। কী এমন জরুরি কথা তাঁর? ক্ষমা চাইবেন? ক্ষমা চাইলেই পাওয়া যায়? দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলো যাবেই না। কিন্তু স্থির থাকতে পারছে না কেন যেন। মন বলছে যাওয়া উচিত। নানার প্রতি মায়া? একটুও নেই এখন। দায়বদ্ধতা। তাও না। বাইবেলে আছে,
“Be kind and compassionate to one another, forgiving each other, just as in Christ God forgave you.”
এই বাণীই ওর বিবেককে নাড়া দেয়। হয়তো এই কারণেই ঈশ্বর ওকে ক্ষমা করবে। ফিরিয়ে দেবে সন্তানকে ওর কোলে৷ দ্বিধাদ্বন্দে ঠিকটাক কাজ করতে পারে না, প্রার্থনায় মন বসে না। সিস্টার মারি আবার বুঝায়। গসপেলের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্ষমা ও দয়াশীলতার মহত্ত্বের বাণী শোনায়। ইসাবেলা রাজি হয় মস্কো যাওয়ার জন্য। পরদিন সকাল সকাল রওনা হলো।
আজ সকালটা রৌদ্রস্নাত। সাদা তুষারে বিকিরিত রোদ হিরের মতো ঝলমলে। পথের দু’ধারের কিছু বরফ ঢাকা, কিছু শিশির পড়া ঘাসের সমতল পেরিয়ে পাইন বনের মাঝ দিয়ে ছোট্ট গাঁয়ের পথ ধরে চললো ফিটন। বেলা শেষে একটা সরাইখানার সামনে থামিয়ে গাড়োয়ান বলল,
“সামনে আর জনপদ নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আজ রাতটা এখানেই বরং থাকার ব্যবস্থা করি।”
“ঠিক আছে।” সম্মতি দেয় ইসাবেলা।
গাড়োয়ান নেমে একাই সব ব্যবস্থা করল। সরাইখানার মালিককে বলে ওর জন্য একটা রুম ভাড়া নেয়। ইসাবেলা রুমে ফ্রেশ হয়ে বসেছিল। পঞ্চাশ বর্ষীয় গাড়োয়ান কুর্নিশের ঢঙে এসে বলে,
“খাবার এখানে পাঠাব, জনাবা?”
রুমে বসে খেতে ইচ্ছে করছে না ইসাবেলার। বলল, আজ সরাইখানার খাবার ঘরে গিয়েই খাবে। উঠে গাড়োয়ানের পিছু পিছু সম্মিলিত খাবার ঘরের এককোণে আসন নেয়। বেকন, পাউরুটি আর এক কাপ চা সামনে নিয়ে একটু একটু করে খেতে লাগল। গাড়োয়ান আসছি বলে পানশালার দিকে গেল। মস্কো থেকে এই জায়গা বেশি দূরে নয়। সেই দশবছর আগে এসেছিল আর এই এলো। বুকের ভেতর ভার ভার লাগে। খেতে খেতে ইসাবেলার মনে হলো কেউ ওকে দেখছে। চোখ তুলতে সামনে ওরই কাছাকাছি বয়সীর একজন নারীকে দেখতে পায়। প্রথমে চিনতে পারেনি। মেয়েটি আসন ছেড়ে সহাস্যে উঠে এলো ওর কাছে।
“ইসাবেলা?”
“হ্যাঁ, তুমি?”
নিজ থেকে বসল মেয়েটি। তারপর নিজের পরিচয় দিলো। নিকোলাসের সাথে দূর গাঁয়ে গিয়ে যেই গর্ভবতী মেয়েটির গর্ভপাত দেখেছিল এ হচ্ছে সেই মেয়ে। ওর গর্ভের পিশাচ সন্তানটির করুণ পরিণতি ইসাবেলাকে কাঁদিয়েছিল একদিন। মেয়েটির জন্যও দুঃখ কম ছিল না। মেয়েটি বাঁচবে কি না, সন্তান হারানোর শোক কী করে কাটাবে ইত্যাদি ভয় পেয়েছিল সেদিন। আজ জলজ্যান্ত মেয়েটি বেঁচেবর্তে ওর সামনে বসে আছে। শোকতাপ নেই৷ সময় হয়তো ভুলিয়ে দিয়েছে। সবার ক্ষেত্রে কথাটা যায় না। এই যেমন ইসাবেলার। সময় ওকে কিছুই ভোলাতে পারেনি।
নিকোলাস আর নেই এ কথা মেয়েটি জানে। কী করে ইসাবেলা জানতে চায় না। ও উঠে গেলে বরং খুশি। পুরোনো স্মৃতিজড়ানো মানুষগুলো দেখলে বড়ো কষ্ট হয়। ইসাবেলার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে থাকে মেয়েটি। কিছু বুঝতে চাইছে যেন। কী? অস্বস্তি হয় ইসাবেলার। মেয়েটি মুখটা এগিয়ে এনে চাপা গলায় বলল,
“একটা গোপন কথা বলব? বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার।”
ইসাবেলা সপ্রশ্নে তাকায়। মেয়েটি আবার সতর্কে এদিক ওদিক চেয়ে বলল,
“আমার গর্ভের সন্তানটিকে কেন ওরা বাঁচতে দেয়নি জানো?”
“তোমার মৃত্যু হবে তাই।”
“ওটা আসল কারণ নয়।”
“তাহলে?” ভুরু কুঁচকায় ইসাবেলা। মেয়েটি গলা আরও খাদে নামিয়ে বলে,
“ওরা চায়নি ও ফিরে আসুক। ওই সন্তানের রক্তসূত্র ধরেই ও যে আবার ফিরে আসত। ও ফিরলে আমি, আমার পরিবার সবাই মারা পড়তাম।”
“ও? ও-টা কে?কী বলছ তুমি?” দ্বিধাগ্রস্ত ইসাবেলা। মেয়েটি বলে,
“যার কারণে ওই সন্তান গর্ভে এসেছিল। আমার সেই পিশাচ প্রেমিক। ওকে হত্যা করলেও ওর রক্ত যে আমি বহন করছিলাম গর্ভে। একদিন এই সূত্র ধরে ও আবার ফিরে আসত। এমনই হয় ওদের ক্ষেত্রে। ওরা শেষ হয়েও শেষ হয় না।”
হকচকিয়ে তাকায় ইসাবেলা। শেষ হয়েও শেষ হয় না মানে! এই মেয়েটি কেন এসব বলছে? কী প্রমাণ করতে চাইছে ও? ওর বিমূঢ়তা দেখে মেয়েটি বলল,
“তোমার সন্তান হয়েছিল?”
ইসাবেলার চোখ করুণ হয়ে উঠল। মেয়েটি বুঝল।স্মিত হেসে বলে,
“আশা করি সে বেঁচে আছে। যদি তাই হয় নিকোলাস ফিরবে। দেখে নিয়ো।”
ইসাবেলা চমকে তাকায়। হঠাৎ হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেল। মেয়েটি নিশ্চয় পাগল হয়েছে। এমন অবিশ্বাস্য অথচ, মধুর কথা গত দশবছরে কেউ ওকে বলেনি। মেয়েটি ওর বিস্ময়াহত মুখ চেয়ে মুচকি হাসল। রহস্যময় হাসি। গাড়োয়ান এদিকেই আসছে। ওকে দেখে মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়,
“আজ চললাম। শীঘ্রই আবার দেখা হবে আমাদের। সেদিন হাসিমুখে অভ্যর্থনা পাব বলে আশা রাখি৷”
মেয়েটি ওর দৃষ্টির বাহিরে যাওয়ার পরও সেখানে ভূতের মতো বসে রইল ইসাবেলা। নিকোলাস ফিরবে! কী করে? সবকিছু এত জটিল আর দুর্বোধ্য কেন? মেয়েটি ওর গোপন ব্যথা বাড়িয়ে দিয়ে গেল। সারারাত ছটফট করেছে ইসাবেলা। ঘুম হলো না। পাগলের মতো মনে মনে বিড়বিড় করল, “নিকোলাস ফিরবে, নিকোলাস ফিরবে!” মেয়েটি ওর মনে মধুর এক জ্বালা ধরিয়ে গেছে৷ নিরাসক্ত জীবনে আশার আলোর দেখা পায়।
পরদিন ভোরে আবার রওয়ানা হলো। মেয়েটির সব কথা একে একে জোড়া লাগাচ্ছে। সন্তান, রক্তসূত্র তারপর শেষ হয়েও শেষ হয় না.. এসবের মধ্যে হঠাৎ দশবছর আগে বলা ড্যামিয়ানের কথাও স্মরণে এলো। ওর গর্ভের সন্তানকে নিয়ে কত ভয় ছিল ড্যামিয়ানের মনে। মেরে ফেলতে চেয়েছিল। বার বার বলছিল,”পিশাচটাকে ও ফিরিয়ে আনতে চাইছে।” মিথ্যা মনে করেছিল কথাগুলো। কিন্তু একইরকম কথা এই মেয়েটি বলল। তবে কি নিকোলাসের ফেরার সম্ভবনা আছে? ওর সন্তানই কি সেই পথ? কিন্তু সেই সন্তান কোথায়? ইসাবেলার দিশেহারা অবস্থা। আচমকা ফিটন ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। ধাতস্থ হয় ইসাবেলা। সামনের ঘোড়াগুলো চিৎকার তুলে লাফিয়ে উঠল। গাড়োয়ান কিছুতেই ওদের বশে আনতে পারছে না। ঠিক তখনই ইসাবেলা খেয়াল করল, একটা নির্জন পথে এসে থেমেছে ফিটনটা। ঘোড়াগুলো অস্বাভাবিক আচরণ করছে। ভয় পেয়েছে যেন। কাছাকাছি নেকড়ের গর্জন শোনা গেল। ঘোড়াগুলো আগের চাইতে বেশি অশান্ত। গাড়োয়ান বোধহয় এমন কিছু আশা করেননি। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে সে। নেকড়ের গর্জন ক্রমশ কাছে আসছে। ঘোড়াগুলো এক পর্যায়ে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে গেল কোথায়। মালিক তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না।
“আপনি এখান থেকে বেরোবেন না। চারপাশ অনিরাপদ। এক্ষুনি ঘোড়াগুলো খুঁজে নিয়ে আসছি আমি।”
গাড়োয়ান নেমে গেলে ইসাবেলা সভয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইল সেখানে। বহু বছর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। আগের মতো সেই সাহসই বা কই? মা বলেছিল, ওর মধ্যে নেকড়ে মানবের রক্ত বইছে। তাহলে নেকড়ে দেখে ভয় পাচ্ছে কেন? ভীরু ও সঙ্গিহীন বলে? তবে এটা ঠিক মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে ওর সাথে। ঠিক বুঝানোর মতো না। ইসাবেলা এড়িয়ে যায় সেসব। এই যেমন এখন ভয় ভয় করছে আবার ভেতরে ক্ষুব্ধতা টের পাচ্ছে। কিন্তু অভ্যস্ত সাধারণ মানব জীবনকেই প্রাধান্য দেয়। ক্ষুব্ধতা নয় ভয়টাই প্রকট হয় তখন।
চারপাশ হঠাৎই নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণ এমন করে কেটে যায়। গাড়োয়ান ঘোড়া নিয়ে আর ফিরে আসে না। ইসাবেলার বুক ঢিপঢিপ করছে। ঈশ্বরের নাম জপছে অনবরত। আচমকা নিস্তব্ধতা ভেঙে গাড়োয়ানের মৃত্যু চিৎকার এই নির্জনতায় হালচাল ফেলে দিলো। ইসাবেলা কাঠ হয়ে বসে আছে। কী করবে এখন? কিছু একটা জানালায় আছরে পড়তে আতঙ্কিত হলো ও। চেয়ে দেখল ফিটনের চারপাশে হিংস্র নেকড়ের দল ঘিরে ধরেছে। মুখে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ গাড়োয়ান ও ঘোড়াগুলোর তাজা রক্ত। ইসাবেলার রক্ত হিম হয়ে যায়। নেকড়েগুলোর গর্জন তীব্র হচ্ছে। কান ফাটিয়ে দিতে চায় যেন। ফিটনের ওপর আছরে পড়তে পড়তে ফিটনটা উলটে ফেলে দেয়। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে ইসাবেলা। ফিটন উলটে পড়াতে বেশ আঘাত পায় ও। ওকে না মেরে শান্ত হবে না ওরা। ফিটনের জানালার কাঁচে ধারালো নখারাঘাত করছে। ফেটে যেত লাগল কাঁচ। ওদের হিংস্র গর্জনে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। ইসাবেলা দুহাতে কান বন্ধ করে, কুঁজো হয়ে চোখ বুঁজে পড়ে রইল ফিটনের ভেতর। খালি হাতে এদের সাথে লড়বে কী করে ও? আজ ওর মৃত্যু অনিবার্য।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও হায়েনাগুলোর আক্রমণের স্বীকার হলো না দেখে চোখ খুললো। কোথায় হায়েনা! কিছুই নেই আশেপাশে। কানের ওপর থেকে হাত সরিয়ে অবাক হয়। গর্জনের শব্দ নেই। আরও ভালো করে শুনলো ইসাবেলা। সত্যি নেই। তবুও চুপচাপ কিছুক্ষণ সেভাবেই রইল। এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার পথে। এভাবে নির্জন পথে একা থাকা নিরাপদ নয়। সাবধানে ফিটন ছেড়ে বেরিয়ে এলো। আশেপাশে কোনো প্রাণীর চিহ্ন নেই। শুধু এদিক-ওদিক ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পেল। নেকড়েগুলো ওকে শিকার করতে গিয়ে নিজেরাই শিকারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কে সেই শিকারি? সতর্ক হয় ইসাবেলা। হাতের কাছে আত্মরক্ষা করার মতো তেমন কিছু পেল না। একটা মোটা ডাল তুলে নেয়। এটা দিয়ে জীবনরক্ষা! না হোক, তবুও থাক। সেই গহিন নির্জন পথে একা একা চলতে লাগল ও। মাঝে মাঝে মনে হলো কেউ ওকে অনুসরণ করছে। ছোটো ছোটো পায়ে। শুনতে পায় একটা ব্যাঙের ঘ্যাঙরঘ্যাঙ। ও থামলেই আবার নিশ্চুপ৷ দ্রুত পা চালায়। চলতে চলতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। তেরাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায়। কোনোদিকে যাবে এখন? এমন সময় দমকা বাতাস উঠল। রাস্তার দু’পাশের গাছ পর্যন্ত দুলে ওঠে। পাতায় পাতায় তান্ডব নৃত্য। দিক নির্ধারণে স্থির হতে পারে না ইসাবেলা। চোখের ওপর হাত রেখে ডান দিকে পা বাড়ায়। দু’পা যেতে থমকে যায়। শিউরে ওঠে ওর সমস্ত শরীর। বাতাসে ভেসে এলো পরিচিত সুবাস। সোঁদা মাটির গন্ধ! এক মুহূর্তের জন্য ইসাবেলা দম নিতে ভুলে গেল। পরক্ষণেই ওর চিত্তেচাঞ্চল্য শুরু হয়। চকিতে এদিক-ওদিক ঘুরে তাকায়।
“নিকোলাস, নিকোলাস।”
নির্জন পথে প্রতিধ্বনিত হয় তারপর মিলিয়ে যায় নামটা। কিন্তু জবাব আসে না। ইসাবেলার শ্বাস ভারি হয়। বড়ো চেষ্টায় স্বাভাবিক ভাবেই শ্বাস নিলো। হতাশার মেঘ নামে মুখ জুড়ে। নেই সেই সুবাস। তবে কি মনের ভুল! ইসাবেলা মানতে নারাজ। মনের ভুল কিছুতেই না। এত বছরে তো হয়নি এই ভুল। আজ কেন? মেয়েটার কথা মনে পড়ে। “নিকোলাস ফিরবে। দেখো।”
অস্থির হয় ও। এদিক-ওদিক ছোটে পাগলের মতো। অশ্রুরুদ্ধ গলায় চিৎকার করে,
“নিকোলাস, আর বিরহ দিয়ো না। দেখা দাও। দেখা দাও।”
সেখানেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে পড়ে ইসাবেলা। ওর পা আর চলে না। ওই সুবাস চলন শক্তি দুর্বল করে দিয়ে গেছে। সন্ধ্যা উতরে রাত নামে। ইসাবেলা তেমনই বসে থাকে সেখানে। কান খাঁড়া করে শুনতে পায় একটু দূরে আবার নেকড়ের গর্জন। ভয় পায় না এখন হিংস্র সেই গর্জন শুনে। ওঠে না। মরবে আজ। মরলে এত আশা-নিরাশা রইবে না, বিরহ, বিচ্ছেদের দহনে পুড়বে না। কিন্তু মেয়ের কথা মনে পড়তে বুকটা খা খা করে উঠল। নেকড়ের গর্জন কাছে আসছে। টের পাচ্ছে ওটা ওর সামনে দাঁড়িয়ে। প্রস্তুতি নিচ্ছে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। ইসাবেলা ধীরে ধীরে মুখ তোলে। নেকড়েটার বুভুক্ষু দৃষ্টি বিচলিত করে না ওকে। শিকারের চোখে ভয় নেই। দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে নেকড়েটা। তারপর লাফিয়ে পড়ে ওর দিকে। এবার ভয়ে অসাড় হয়ে যায় ইসাবেলা। দু’হাতে হাঁটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। চিৎকার বেরিয়ে আসে গলা দিয়ে। চোখ বিস্ফোরিত। নেকড়ের থাবা ওর মুখ স্পর্শ করবে তখনই চোখ বন্ধ করল ইসাবেলা। টের পেল নেকড়েটাকে কেউ ঝড়ো গতিতে ওর সামনে থেকে ছুঁড়ে ফেললো। বাতাসের দাপটে চিৎ হয়ে পড়ল ও। নেকড়েটার মৃত্যু গোঙানি শুনতে পায়। আর, আর.. নাক টানছে বারবার। এবার স্পষ্ট এবং খুব কাছে টের পেল সোঁদা মাটির গন্ধ। চোখ খুললো না। একপাশে কাত হয়ে মড়ার মতো পড়ে রইল। অশ্রুপাত হয় গাল বেয়ে। ভয় করছে। চোখ খুললে যদি আবার সব মিথ্যা হয়ে যায়? আবার মিলিয়ে যায় সুবাসটা।
“বেলা।”
ইসাবেলার সর্ব শরীর হিম হয়ে গেল। বিপরীত কেবল হৃদয়। ভীষণ তার গতি। মিথ্যা নয়। ওই যে ডাকছে নিকোলাস। কত বছর পর ওর কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছে নিজের নাম। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ইসাবেলা। পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে ওর সামনে এসে শেষ হয়। সোঁদা মাটির গন্ধ তীব্র হয়ে নাসিকাপথ ভেদ করে ভেতরটা উতালপাতাল করে দিচ্ছে।
“বেলা, চোখ খোলো। দেখো এসেছি আমি। তোমার নিকোলাস ফিরে এসেছে।”
কী কাতরতা ওই গলায়! জোরে কেঁদে ওঠে ইসাবেলা। ধীরে ধীরে সিক্ত চোখের পাতা খুললো।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সেই আলোতে বহুবছর পর দু জোড়া তৃষ্ণিত চাহনি এক হয়। বিরহ হৃদয়ে মিলন গীতের বীণা ঝংকার তোলে। ইসাবেলা উঠে বসে। মুখোমুখি ওরা। একটুও বদলায়নি নিকোলাস। ঠিক দশবছর আগের মতোই সুদর্শন। সেই নীল চোখের অতল সমুদ্রে আজও হারালো ইসাবেলা। সভয়ে কম্পিত হাতটি বাড়ায়। ভয় হয় স্পর্শ করলে যদি হাওয়া হয়ে উড়ে যায়! কিন্তু হলো না তেমন। মরীচিকা নয়, নিকোলাস সত্যি ওর সামনে বসে আছে। মানবীয় শরীরে। তবে কি ফিরে এলো ও? আনন্দ আর কান্না মিলে শব্দ তৈরি হয়। নিকোলাসের বুকের ওপর আছরে পড়ে। দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। স্বপ্নে নয়, কল্পনায় নয়। এই তো সত্যি সত্যি দু হাতের মাঝে নিকোলাসকে পেয়েছে আবার। নিকোলাস ওর মুখটা দু’হাতে তুললো। চোখের পানি মুছে বলল,
“মন ভরে দেখতে দাও তোমায়।”
“নিকোলাস!” অস্ফুটে বলল ইসাবেলা। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। নিকোলাসের ঠোঁটে সম্মোহনী হাসি। অনিমেষ তাকিয়ে বলল,
“এইতো আমি।”
“আর ছেড়ে যাবে না তো?”
“কোনোদিন না প্রিয়তমা। কোনোদিন না।”
গভীর চুম্বন করল ইসাবেলার ঠোঁটে। জানিয়ে দিলো নিজের অস্তিত্বের সত্যতা। দুজনের হুঁশ ফেরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজে। ইসাবেলা সলজ্জে তাকাতে নিকোলাসের সেই ঘোড়ার গাড়ি দেখল অদূরে। সামনের সিটে পল ও নোভালি বসে। কী সুন্দর মানিয়েছে ওদের! ওকে দেখে হাত নেড়ে হাসল ওরা। কোলে দুটো শিশু বসে আছে। বাবা-মায়ের কার্বন কপি দুটোই। ইসাবেলার মন আনন্দে ভরে গেল। ঘোড়ার গাড়ির পেছনের সিটে তাকাতে ওর হাসিমুখ বদলে যায়। দশ-বারো বছরের বালিকা বসে আছে। কোলের ওপর একটা সবুজ ব্যাঙ। বালিকার মুখ যে খুব চেনা ওর। ওই তো এঁকেছিল দশবছর আগে। স্বপ্নে দেখা সেই শিশুটি! সেই বাদামি কোঁকড়া চুল, নীল চোখ। ঠোঁটে নিকোলাসের হাসি বাঁধায় করা।
অদূরে আগাথার প্রেতাত্মাকে দেখছে। রাগ নেই ও মুখে। ক্ষমা করে দিয়েছে। শূন্যে হাত তুলে আশীর্বাদ করল ওদের। তারপর বালিকাটিকে কিছু ইশারা করেন। ইসাবেলার দিকে হেসে তাকায় ও। আকাশ কাঁপিয়ে ডেকে ওঠে,
তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৯৭+৯৮
“মা!”
ইসাবেলা আনন্দে ফের অশ্রু বিসর্জন দিলো। নিকোলাসের দিকে তাকায় সজল চোখে। নিকোলাস মুচকি হাসে। মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আমাদের মেয়ে।”
“আমাদের মেয়ে!”
ইসাবেলা মেয়ের হাসিমাখা পবিত্র মুখে পুনরায় তাকায়। ওর শূন্য মাতৃহৃদয় কানায় কানায় ভরে ওঠে। নিকোলাস ওকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে। মেয়ের হাসিমুখে চেয়ে থাকে দুজনে। মেয়ের নাম জানতে বড়ো ইচ্ছে হলো ইসাবেলার। তখনই নিকোলাসকে বলতে শোনে,
“ওফেলিয়া, ওফেলিয়া।”
