তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৮
জান্নাতি আক্তার জারা
অক্টোবরের শেষ দিকে হালকা শীত পড়তে শুরু করে। নতুন ঋতুর আগমন হওয়া এই মাসটা অন্যসব মাসের চেয়ে একটু বেশিই আলাদা। অক্টোবরের হাওয়া সবসময় কিছু গল্প নিয়ে আসে। ঝড়ে যাওয়া পাতা, ভোরের কুয়াশার চাদরে মোড়ানো শীতের সকাল, কোকিলের মোহনীয় জাদুভরা কন্ঠে কু কু আওয়াজ, কখনো রোদ কখনো মেঘ, কখনো শরীর হীমকরা শীতল ঠান্ডা আবহাওয়া। আরাত মনের মধ্যে হাজারো কথা সাজিয়ে নিয়ে ভয়ে ভয়ে দুতালা সিড়ি ঢেঙ্গে দু-এক পা করে উপরে ওঠতে ওঠতে নিজের রুমের সামনে এসে দাড়ালো। নিজের রুমে সামনে এসেই যেনো মনের মধ্যে গুছানো কথাগুলো ওগুছালো হয়ে বিষন্ন সন্ধ্যায় মৃদু ঠান্ডা বাতাসে সঙ্গে বিলিম হয়ে গেলো। আরাত দুতালা থেকে নিচে দিকে তাকালো, ড্রয়িং রুমে বড়রা আরিশা বিয়ে নিয়ে অলোচনা করছে। আরিশা আইরা, আরাত কে নিচের দিকে তাকানো দেখে হাতের ইশারায় অনুরোধে সুরে দেখিয়ে বলল,
” প্লিজ বোন দাঁড়াস না, তাকবীর ভাইয়া কে যেকোনো ভাবে রাজি করা প্লিজ!
আরাত দুইবোনের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মনে সাহস জুটিয়ে বড়ো করে একটা স্বাস নিলো, থ্রিপিসের সঙ্গে ব্রাউন জর্জেট রওনা টা মাথায় ভালোভাবে জরিয়ে নিয়ে দুরুদুরু বুকে পা বাড়ালো তাকবীরের রুমে দিকে। রুমের সামনে এসে দু সেকেন্ড অপেক্ষা করার পর দরজায় হাত দিয়ে নক করলো, কয়েকবার নক করার পরে কোনো রেসপন্স না পেয়ে দরজাটা হালকা ধাক্কা দিতেই দরজা একা একা খুলে গেলো, আরাত রুমের ভিতরে গিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকবীর খুজতে লাগলো তাকবীর কে রুমে না পেয়ে, রুম থেকে বের হতে যাবে তখনই বেলকনি থেকে একটা ঠান্ডা নীরব কন্ঠ ভেসে এলো ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“অনাকাক্ষিত মানুষটাকে না খুঁজে চলে যাচ্ছো?
আরাত থেমে যায় বুঝতে পারে, যার খোঁজে এসেছিলো সেই মানুষ টার বর্তমান অবস্থান বেলকনিতে। আরাত পিছন ঘুরে ধীর পায়ে নিজের মনে পুনরায় কথাগুলো সাজাতে সাজাতে সেদিকে এগিয়ে এসে বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো,
“এদিকে এসো রাত…..!
আরাত ধরা পড়ে যাওয়া মুখে আমতা আমতা করে সোজা হয়ে তাকবীরে পাশে এসে দাড়ালো, কোথায় থেকে কথা শুরু করবে ভেবে না পেয়ে ওরনার কোন দু-হাত দিয়ে পেচাতে শুরু করলো। তাকবীর তখনও সোফাতে বসে ল্যাপটপে অফিসের কাজগুলো দেখছিলো। তাকবীর আরাতের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সরাসরি চোখ রাখলো আরাতের উপর, বা হাত দিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে আরাত কে পুনরায় প্রশ্ন করে
” কী চাই?
“গায়ে হলুদ, মেহেদী!
“হোয়াট?
আরাত এবার চোখ তুলে তাকালো তাকবীরের দিকে। তাকবীর কে পূর্বে থেকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ দুটো নিমেষেই নেমে নিলো আরাত। নিজের উপর রাগ লাগলো মনের মধ্যে গুছিয়ে রাখা কথা গুলো এখন আর মনে আরছে না। এবার আরাত শান্ত নরম গলায় তাকবীর কে বলে উঠলো,
” বীর ভাইয়া…!
জ্বিব দিয়ে ঠোঁট ভিজে নিয়ে পুনরায়,
“আরিশা আপুর বিয়েতে বড়আব্বু, বাবা,গায়ে হলুদ নিতে চাইছে না, আপনি একটু বড়আব্বু কে বলে দিবেন প্লিজ?
নিজের মধ্যে সাহস জুটে কথাগুলো বলে আশাভরা চাওনিতে তাকবীরের দিকে তাকালো আরাত,
” এই নিয়ম গুলো আমাদের হাদিসে নেই, তুমি জানো না?
“হ্যাঁ।
” তারপরও?
আরাত মাথা নিচু করে দাঁড়ালো, কী উওর দিবে সত্যি তো এই আনুষ্ঠান গুলো মানতে হয় না,এটা আরাতের জানা আছে। আত্মীয়সজনের বিয়ে’তে এমন অনুষ্ঠান অনেক দেখছে, ছোট থেকে এখন পর্যন্ত কখনো নিজের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান দেখে নাই। পুরো কাজিন মহলের মধ্যে আরিশা’র বিয়ে দিয়ে শুরু। এজন্য সবার মধ্যে বিয়ের আনন্দ টা একটু বেশিই, আরাত কে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে তাকবীর, ঠান্ডা নরম কন্ঠ বলে উঠলো,
“ওকে আমি বলে দিবো।
কথাটা শুনা মাএ আরাতের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, খুশি হয়ে তাকবীরের সামনে লাফাতে না পেড়ে, মুখে যেনো খুশির উৎফুল্লতা ছেড়ে গেলো, তাকবীর আরাতের অগোচরে সেই উৎফুল্লতা ভরা মুখটা মুগ্ধ চোখে দেখে নিয়ে। গম্ভীর মুখে সোফার পাশে থেকে হাতে ফোনটা তুলে নিয়ে আরাত কে উদ্দেশ্য করে বলল,
” আর কীছু ?
আরাত মাথা ঝেকে না বুঝিয়ে বেলকনি থেকে পা বাড়াতেই, কিছু একটা মনে পরর সাহস জুটিয়ে পুনরায় বলল,
“বীর ভাইয়া?
” হুম বলো….!
“আপনি কিভাবে বুঝলেন , আমি আপনার রুমে এসেছি?
” কাঁচের চুড়ির ঝনঝন মনোমুগ্ধকর আওয়াজে।
“আপনার কাঁচের চুড়ির আওয়াজ পছন্দ?
” উহুম।
আরাত তাকবীরের কথার অর্থ বুঝতে না পেয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করতে যাবে, তাকবীর আরাত কে বলল,
“এখন আসতে পারো।
তালুকদার বাড়িতে পুরো দমে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে, আরমাএ হাতেগুনা তিনদিন, বিয়ের আয়োজন নিয়ে সবাই খুবই ব্যাস্ত আদনান তালুকদার আর আহাদ তালুকদার ওনাদের পরিচয় ফ্রেন্ড আত্মীয়সজন দের ইনভাইট করতে ব্যাস্ত। এদিকে আতিফ শেখ মেয়ের বিয়ে তে হাতে সময় পাওয়া তার দায়। আনহা শেখ থেকে বাড়ির গিন্নিদের মধ্যে একধরনের বাড়িঘর নতুন করে সাজিয়ে তুলার ধুম লেগে গেছে। বাদ পরেনাই রাহিমা সুলতানাও। পরিবারের বড়ো মেয়ের বিয়ে বলে কথা, সবার মধ্যে ব্যাস্তা তো থাকবেই। আতিফ শেখের ভাইবোন আত্নীয়সজন নেই বললে চলে। তারউপর শেখ বাড়িটা ছোট্ট হওয়ায় আদনান তালুকদার নিজের বাড়িতে ভাগিনী বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করার ডিসিশন নেয়। আদনান তালুকদারের কথায় উপর তালুকদার বাড়ি বিয়ের সাজে সাজিয়ে তুলতে ব্যাস্ত সবাই।
আরাত আইরা আরিশা তিনজন সোফাতে বসে আদিবা তালুকদারের হাতের চিকেন পাকোড়া খেতে খেতে মা কাকীদের ব্যাস্ত হাতে কাজগুলো দেখতেছিলো। আরাতের পড়াশোনার প্রতি আগে থেকেই আগ্রহ নেই তারউপর বিয়ের সূচনায় আরিশার বিয়ের ডেট ফিক্স হওয়ার পড়ের দিন কলেজে গিয়ে। বিয়ের উপলক্ষে প্রিন্সিপালের কাছে বলে টানা দশদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। আহিন আলভী স্কুলে গিয়েছে। আনহা শেখ ব্যাস্ত পায়ে ডয়িং রুম থেকে আনাস কে ডাকতে লাগলেন,
” আনাস? আনাস? কই তুই জলদি নিচে নেমে আয়?
আনাস তাকবীরের রুমে, তাকবীরের সঙ্গে অফিসের কাজগুলো গুছিয়ে রাখছিলো, বিয়ের ব্যাস্ততায় আদনান তালুকদার অফিস বন্ধ রাখবেন বলছে।যদিও তাকবীরের কাছে অফিস বন্ধ খুলা মেটার করে না। দেখা যাবে আরিশার বিয়ের দিনও নিজের কাজ নিয়ে বিজি রয়েছে। আনাস আনহা শেখের ডাকে তাকবীর কে বলে রুম থেকে নিচে নেমে এলো,
“হ্যাঁ ফুপি?
“হাতে সময় খুব কম, এখনো কত আয়োজন বাকি,শপিং করা বাকি জুয়েলারি বাকি। আশিক হাবিবের নাম্বার টা বল তো বাবা!
” কেনো ফুপি?
“ওদের ইনভাইট করতে হবে তো, তোদের ফ্রেন্ড না!
“ফুপি ওদের আলেদা ভাবে ইনভাইট করতে হবে না, আমি ওদের বলে দিয়েছি। তুমি ওদের আলেদা ভাবে ইনভাইট করলে দেখা যাবে একমাসের জন্য গাট্টি নিয়ে হাজির হয়ে যাবে।
আনহা শেখ আনাস সের কথায় হেসে উঠলো,আনাস কে আদরের গলায় ধমক দিয়ে পুনরায় ব্যাস্ত পায়ে কিচেনের দিকে যেতে যেতে বললেন
” পাগল ছেলে একটা, এভাবে বলতে হয় না বাবা। আর শুনো হাবীব কে বলে দিও হানিয়া কে সঙ্গে নিয়ে আসতে।
আনহা শেখের অদুরে বলা কথায় আনাস মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে হানিয়াকে হাবীবের সঙ্গে নিয়ে আসতে বলবে, বুঝালো। আনাস নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই কী মনে করে সোফার দিকে তাকালো,
আইরা পূর্বে থেকেই পাকোড়া খেতে খেতে আনাস আর আনহা শেখের দিকে তাকিয়ে দুজনের কথাগুলো শুনছিলো,আনাস তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো। আরিশা আনহা শেখের পিছন পিছন চলে গেলো। আর আরাত ফোনে কাকে যেনো ফোন করার ট্রাই করছে বারংবার। সেদিক থেকে আনাস চোখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। আইরা আনাস সের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা মনে মনে ভেবে মুচকি হাসি দিলো।
আরাতের ফোন দুইবারের মাথায় রিসিভ করলো ওপারের ব্যাক্তি
“হ্যালো মিম!
” হ্যাঁ আপু বলো?
“কই ছিলি এতক্ষণ, ফোন দিতেছি দেখোস না?
” সরি আপু বাহিরে ছিলাম, বলো আপু কিছু বলবে?
“আমাদের বাড়ি থেকে কারো ফোন যায়নাই মামা’র কাছে?
” হ্যাঁ আপু আব্বা’র কাছে ফুপা ফোন করেছিলো। আরিশা আপুর বিয়েতে ইনভাইট করতে।
“মামা তোদের নিয়ে কবে আসতে চাইছে?
” আব্বা তো বললো, বিয়ের দিন যাবে।
“তুই আজকে চলে আয়। বীর ভাইয়ার মামাতো বোন সন্ধ্যা আছে না, ও আজকে আসবে, আইরা আপুর ফ্রেন্ড কে চিনিস না মায়া আপু?
” হ্যাঁ একবার দেখছিলাম, তুমি পরিচয় করে দিয়েছিলে।
“হ্যাঁ, মায়া আপু, আইরা আপু, সন্ধ্যা, আবার আনাস ভাইয়ের ফ্রেন্ডের বোন, নাম হানিয়া তুই তাকে দেখিস নাই, চলে আয় তাড়াতাড়ি সবাই একসঙ্গে অনেক মজা হবে।
মিম ফোনের ওপাশ থেকে খুশিতে গদোগদো হয়ে আরাত কে বলল,
” হ্যাঁ আপু আমি যেতে চাই, কিন্তু আব্বা যেতে দিবে না, তুমি একটু ফুপি’কে দিয়ে আব্বার সঙ্গে কথা বলে দেও প্লিজ।
“আমি মা’কে দিয়ে মামা’র সঙ্গে কথা বলে দিবো,মামা তোকে গাড়িতে ওঠায়ে দিবে।
” ওকে আপু আল্লাহ হাফেজ,
আরাত আল্লাহ হাফেজ বলে ফোন কেটে দিলো। সোফায় মাথাটা এলিয়ে দিয়ে মন খারাপ নিয়ে বিরবির করলো,
“এত আনন্দ এত মজার মধ্যে তুই নেই, আজকে যদি বাংলাদেশে থাকতি তাহলে আমার আনন্দটা আরেকটু বেশি গাড়ো হতো।সবসময় হাসি খুশির মধ্যে তোর কমতি টা অনুভব করি। থাক তুই ভালো থাক, তোর ভালো থাকাতেই আমার সুখ।
সকাল দশ-টা বেজে সতেরো মিনিট, সকাল সকাল আশিক তালুকদার বাড়িতে উপস্থিত। তালুকদার বাড়ির ছোট্ট বড়ো সবাই মিলে আজকে বিয়ের শপিং করতে যাবে। দুটো গাড়ি তো লাগবেই, সবগুলো কে একা সামলাতে আনাস হিমশিম খেয়ে যাবে বিধায় আশিক কে ফোন করে ডেকে নেওয়া। আশিক তালুকদার বাড়িতে এসে সকালের ব্রেকফাস্ট করলো আরাত আরিশা আইরা আহিন আলভী, রাহিমা সুলতানা, আদিবা তালুকদার,সবাই শপিংয়ে যাওয়ার জন্য এডি হয়ে ড্রয়িং রুমে রাবেয়া তালুকদারের জন্য অপেক্ষা করছিলো। রাবেয়া তালুকদার আশিক কে খেতে দিয়ে নিজের রুমে এডি হতে গিয়েছে। এদিকে রাবেয়া তালুকদারের রুম থেকে বের হতে লেট হচ্ছে বিধায়। আশিক আনাস তাড়া দিয়ে সবাইকে বলে গার্ডেন যাওয়ার উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলো। তালুকদার বাড়ির সদর দরজায় আসতে আশিক সামনে আগন্তুকের সঙ্গে খেলো এক ধাক্কা। হটাৎ ধাক্কা লেগে যাওয়ার তাল সামলাতে না পেয়ে তরুণী কে দরজা থেকে পেড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে কমোর চেপে ধরলো আশিক।
সবাই অবাক হয়ে দু’জন কে দেখেছে, মনে হচ্ছে এখানে কোনো মুভির শুটিং চলছে। মায়া নিজের বাবা মিস্টার জাহাঙ্গীর আলম কে মানিয়ে বিয়ের দুইদিন আগে চলে আসলো তালুকদার বাড়িতে। জাহাঙ্গীর আলম প্রথমে মেয়েকে একা ছাড়তে চাইনি। আইরা আতিফ শেখ কে দিয়ে কথা বলানোর পড়ে জাহাঙ্গীর আলম মেয়েকে তালুকদার বাড়িতে আসতে দিলেন। মায়া এক হাতে টলি’ব্যাগটা নিয়ে প্রবেশ করতে যাবে ঠিক ওইসময় মেন গেইট কারো সঙ্গে ধাক্কা লেগে গেলো। নিজের কোমরে পুরুষালী ছোঁয়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমোর থেকে হাতটা ঝাটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে সোজা হতেই সামনে আনাস সের পাশে অচেনা এক ছেলেকে দেখে রাগী গলায় বলে,
“এটা কেমন বেয়াদবি, মেয়ে মানুষ দেখলেই শুধু চিপকাকে মন চায় হ্যাঁ!
“মেয়ে মানুষ যদি চিপকানোর জিনিস হয়, তাহলে চিপকালে প্রবলেম কী মিস?
“চুপ করুন লুচ্চা বেডা, মেয়েদের জিনিস বলতে লজ্জা করে না?
” না!
“পরিবার থেকে শিক্ষার অভাব আপনার, এজন্য কথাবার্তা নির্লজ্জ মার্কা!
” আমাকে ভদ্র বানানোর জন্য পরিবারের কাছে সময় ছিলো না। আপনি চাইলে আমাকে ভদ্র বানানোর দায়িত্বতা নিতে পারেন, কী নিবেন মিস?
” উফফ অসয্য লুচ্চা বেডা,আইরা এই লুচ্চাটা কে রে?
হেই গার্লস,
কারো কাছে আমি রোমিও, কারো কাছে দেওয়ানা, কারো কাছে আশিক,তো কারো কাছে প্লেবয়, কারো কাছে ফ্লার্টিং মাস্টার, কারো কাছে জানেমন, তো কারে কাছে বেবি,জানু, জান,তো কারো কাছে পাগল প্রেমীক…….
“আর আমার কাছে লুচ্চা!
মায়া’র কথাটা কানে আসা মাএ আশিক থেমে গেলো। আশিক মায়ার দিকে হেলে কথাগুলো চোখেমুখে দুষ্টুমি ফুতে তুলে বলছিলো। এতক্ষণে আইরা আরাত রা সদর দরজায় এসে দাঁড়াসে। আইরা মুখে হাসি টেনে বলে উঠলো,
” ভাইয়া ও আমার ফ্রেন্ড, ওর সঙ্গে অন্তত ফ্ল্যাট করবেন না ও খুব সিরিয়াস, যখন তখন আপনার উপর দু’চারটা বসিয়ে দিতে পারে।
“ও তোমার ফ্রেন্ড আর আমার গার্লফ্রেন্ড দারুণ তো ব্যাপারটা।
” মানেননননন…..?
সবাই আশিকের কথায় অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ার চিৎকারে কানে হাত রাখলো, আশিক হাত দিয়ে কান নাড়াতে নাড়াতে পুনরায় বলে উঠলো,
“উফফ ছাগলের মতো মে মে, করে কানের পর্দার বারোটা বেজে দিলো। আইরা ফ্রেন্ড মানে আমার গার্লফ্রেন্ড, অর্থাৎ আমার মেয়ে ফ্রেন্ড।
“আরাত তুই মায়ার ব্যাগটা নিয়ে তোর রুমে রেখে আয়। মায়া বাড়িতে একা থেকে কী করবে চলো আমাদের সঙ্গে শপিংয়ে যাবে, আর আশিক দু’চার টা না খেতে চাইলে মেয়েটার সঙ্গে দুষ্টুমি বন্ধ করো, বড় আপা আসতে আসতে চলো গাড়ি তে গিয়ে বসে পড়ি।
আদিবা তালুকদার কথায় আশিক হালকা হেসে একবার মায়ার দিকে তাকালো, তখনও মায়া রাগী লুকে আশিকের দিকে চেয়ে আছে, আরাত মায়ার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে উপরে চলে গেলো রাখতে, আদিবা তালুকদার রাহিমা সুলতানা আহিন আলভী,আর আইরা মায়ার হাত টেনে নিয়ে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো গাড়িতে বসার জন্য। সবার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আশিক আনাস সের দিকে তাকালো। আনাস কে বিরক্তি চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাড়ির বাহিরে যেতে যেতে বলল,
” কী সমস্যা এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?
“সব জায়গায় তোর এই সো কল্ড ফ্লাটিং শুরু হয়ে যায় তাইনা?
” সব যায়গায় শুরু হবে কেনো, শুধু মেয়েদের সামনে শুরু হয় আমি কী করতে পারি।
আশিক সামনে দিকে এগুলো এগুলো বলল,আনাস আশিকের পিছনে যেতে যেতে পুনরায় বলল,
“তোকে আমি ওয়ার্নিং করছি, তুই আজ থেকে মায়া কে বোনের নজরে দেখবি!
” তোর বউ’কে খুব কষ্ট করে বোনের নজরে দেখলেও তার বেস্টফ্রেন্ড কে বোনের নজরে দেখা আমার জন্য জুলুম হয়ে যাবে। সরি দোস্ত আমি নিজের সঙ্গে এতো বড় জুলুম করতে পারবো না মাফ কর।
“সালা তোর প্লেবয় গিরি বের করছি দাঁড়া।
আশিকের মুখ থেকে কথাটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনাস পায়ে থেকে জুতা খুলতে খুলতে বলে উঠলো। আশিক পিছন ঘুরে আনাস কে জুতা খুলতে দেখে আতালেপাতালে দৌড় দিলো গাড়ির উদ্দেশ্য যাওয়ার জন্য। সবাই আশিক কে দৌড়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আশিক কাউকে দৌড়ের কারণটা বুঝতে না দিয়ে গাড়ির সামনে এসে দৌড় ব্রেক করে মাথার চুল আর নিজেকে পরিপাটি করতে লাগলো। ভাবটা এমন এখানে কিছুই হয়নাই নিজেকে পরিপাটি দেখানো তার মূল উদ্দেশ্য।
দুটো গাড়ি এসে থামলো শপিংমলের সামনে, প্রথম গাড়ি থেকে নামলো, আরাত আরিশা আইরা মায়া আর আলভী, মেয়েদের গাড়িতে ডাইভিং করছিলো আনাস। আশিক কে ডাইভিং করতে দিয়েছে মা কাকীদের গাড়িটা। বন্ধুর প্রতি একবিন্দু বিশ্বাস নেই দেখা যাবে গাড়ির মধ্যে ফ্ল্যাট শুরু করে দিছে। দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামলো, রাহিমা সুলতানা রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার আর আহিন। গাড়ি থেকে নেমে শপিং মলে গিয়ে আগে মেয়েদের ড্রেস চুজ করতে লাগলো। মেয়েদের মেহেদী জন্য,সবুজ কাজকরা স্কার্ট থ্রি পিস আর নতুন বউয়ের জন্য সবুজ লেহেঙ্গা। বাড়ির মেয়েদের জন্য কাটান সবুজ শাড়ি। ছেলেদের জন্য ব্যান্ডের সবুজ পাঞ্জাবি।
গায়ে হলুদের জন্যও সেম বাট রংটা হলুদ এবং কালেকশন ভিন্ন। বিয়ের ড্রেজ মেয়েরা নিজেদের জন্য ইচ্ছা মতো লেহেঙ্গা চুজ করে নিলো। আর নতুন বউয়ের জন্য জর্জেটের উপর পাথর বসানো ক্রিমি সাদা রংগের শাড়ি। এদিকে আমান দের পরিবারের মানুষগুলো এসে পড়েছে দুই পরিবারের বড়োরা মিলে, বিয়ের যত প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারতে লাগলেন। এদিকে আমান রা এসে প্রায় দু’ঘন্টা মতো সময় করে দুপরিবারের ছেলেদের শপিং করলো। তাও বড়োদের আসার নাম নেই মেয়েরা এবার বৌভাতের জন্য ড্রেজ চুজ করতে লাগলো। বৌভাত জন্য মেয়েদের শাড়ি নেওয়ার সিন্ধান্ত নিলো। আরাত সন্ধ্যা মিম হানিয়া দের জন্য তিনটা সিম্পল কাজকরা জর্জেট শাড়ি চুজ করে এক সাইটে বসে। সিম্পল শাড়ি চুজ করতে এত সময় নেওয়ার আরাত আইরা দিকে বিরক্তি চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
আইরা শুধু শাড়ি নড়েচড়ে দেখছে আর বারবার আনাস সের দিকে আঁড়চোখে তাকাচ্ছে।
এই আশায় আনাস হয়তো নিজের পছন্দের কালারে শাড়ি সিলেট করে দিবে, কিন্তু আনাস কে নিজের মতো ফোনে আবদ্ধ থাকতে দেখে আইরা মন খারাপ হইলো। আমান আরিশা দুজন মিলে প্রয়োজনীয় ড্রেজ চুজ করছে। অন্যদিকে মায়া আর আরাত শাড়ি দুজন নিজেরদের শাড়ি দেখতে ব্যাস্ত। রাফি সবাইকে লক্ষ করে চোখ রাখলো আইরা উপর। আইরা মন খারাপ নিয়ে চুপিসারে শাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। রাফি চোখ ঘুড়িয়ে শাড়ির দিকে রাখলো হটাৎ একটা শাড়িতে চোখ আটকে গেলো।সামু সিল্কের উপর জিরো স্টোনের উপর কাজ করা সাদা কালারের শাড়ি। রাফি এক নিমেষেই শাড়িটাতে আইরা কে কেমন লাগবে কল্পনা করতে লাগলো। কল্পনা করে রাফি মুখে ছোট্ট করে মাশাল্লাহ বলে শাড়িটা তে হাত রাখতে যাবে ঠিক তখনই কে একজন শাড়ি টা হাতে তুলে নিলো। রাফি মাথাটা ঘুরিয়ে তাকিয়ে আনাস কে শাড়ি টা নিতে দেখে হেঁসে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আনাস শাড়ি টা দোকানদার কে আলেদা ভাবে প্যাক করতে বলল। রাফি হতাশা মুখে আনাস কে বলে,
“ব্রো শাড়ি টা স্পেশাল কারো জন্য?
” নো অবহেলিত একটা নিবোর্ধ মেয়ের জন্য।
কথাটা বলেই আনাস এক পলক আইরা কে দেখে নিয়ে সবাইকে তাড়া দিতে লাগলো। রাফি আরেকটা শাড়ি পছন্দ করে আইরা’র সামনে ধরলো। আইরা শাড়ির দিকে ভ্রুকুচকে চেয়ে থাকতে রাফি হাসি মুখে বলল,
“বেয়াইন সাব লাক্সারি পার্ট শাড়ি টা আপনার শ্যাম বর্ণ চেহারায় খুব মায়াবী লাগবে, গিফটটা না করবেন না প্লিজ।
রাফির কথায় সবাই রাফি আর আইরার দিকে তাকালো,আরিশা ইশারায় ছোট বোন কে শাড়ি টা নিতে বলল,আইরা একবার আনাস সের দিকে তাকালো, আনাস পুনরায় ফোনে মগ্ন হয়ে আছে। এদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। আইরা মুচকি হেসে রাফির থেকে শাড়ি টা নিয়ে নিলো। শপিং শেষে বিল পে করে সবাই শপিংমলের বাহিরে বের হইলো। আনাস আশিক কে ফোন করে জানতে চাইলো ওদিকে মা কাকীদের শপিং হয়ে গেছে। মূলত বড়োদের সঙ্গে রাফি গিয়েছে, সবাই মিলে শপিংমলের বাহিরে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতেই বড়োরা এসে পারলো।
সবার সারাদিনের ক্লান্তিমাখা মুখটা শুকিয়ে ছোট্ট ছোট্ট লাগছে। আনাস সবাইকে নিয়ে রেষ্টুরেন্টে নিয়ে গেলো, রেষ্টুরেন্টেই লাঞ্চ শেষ করে পুনরায় চলল জুয়েলারি শপে। বড়োরা নতুন বউকে নিয়ে জুয়েলারি দেখছে। আইরা সন্ধ্যা একপাশে সারাদিনের ক্লান্তমাখা মুখ নিয়ে লাঞ্চ করার পর কেমন একটা ঝিমমেরে বসে আছে। আরাত এক সাইটে জুয়েলারি দেখতে দেখতে চোখ গেলো একটা রুপার ব্রেসলেটের উপর।
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ১৭
আরাত ব্রেসলেট টা হাতে নিতে মনে হইলো ব্রেসলেট টা শুধু তার বীর ভাইয়ার লোমময় ফর্সা হাতের জন্য তৈরি হইছে। আরাত খুব যত্ন সহকারে ব্রেসলেট টা নিজের জমানো টাকা দিয়ে সবার অগোচরে নিয়ে নিলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে গাড়ির মধ্যে যে যার মতো কে ঘুমিয়ে পড়ছে আইরা আরিশার ঘারে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে। আনাস গাড়ি স্টিয়ারিং হাত রেখে একবার পিছন ফিরে একনজর দেখে নিয়ে পুনরায় কার ড্রাইভিং এর মনোযোগ দিলো।
