তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৭০
জান্নাতি আক্তার জারা
তাকবীর বুকের সামনে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করলো, আরাত কে বিছানায় শুয়ে থেকে নিজের ভাবনার জগতে ডুবে থাকতে দেখে, তাকবীর নিজের উপস্থিত জানান দিতে গলা খাঁকারি দিয়ে আরাত কে ডেকে উঠলো ,
___” রাত?
আরাত তাকবীরের কন্ঠে প্রথমে চমকে বিছানায় ওঠে বসে, তাকবীর কে দেখে স্বাভাবিক হয়ে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,
___” ও আপনি, এসেছেন তাহলে?
বলতে বলতে তাকবীরের হাত থেকে কোটটা নিজের হাতে তুলে নিল, ধীরপায়ে কোট নিয়ে বেলকনির দিকে এগোতেই হটাৎ তাকবীর পেছন থেকে আরাতের হাত ধরে ফেলে, মুহূর্তের মধ্যে এক টানে নিজের বুকের কাছে এনে ফেলল, আরাত কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকবীর আলতো করে আরাতের থুতনিতে হাত রেখে আরাতের মুখ ধীরে ধীরে নিজের দিকে ফেরাল, তবুও আরাতের চাহনি নিচু, ঠোঁটের কোণে জমে থাকা অভিমান স্পষ্ট, তাকবীর কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো বউয়ের অভিমানি মুখ পানে, বউয়ের অভিমান বুঝতে পেয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর স্বর টেনে বলল,
___” মন খারাপ?
___” কেনো হতে যাবে?
তাকবীর প্রশ্ন করার সাথে সাথে আরাত কে উত্তর করতে দেখে পুনরায় হাসলো,আরাতের চোখ এখনো নিচু, তাকবীর টুপ করে আরাতের কপালে ভালোবাসার পরশ রেখে দিয়ে বলল,
___” অভিযোগ নেই?
আরাত ঠোঁট ফুলিয়ে খুব আস্তে উওর করলো,
___” অনেক আছে।
তাকবীর ভ্রু তুলে মৃদু হেসে বলল,
___” এত অভিযোগ কেনো?
আরাত এতক্ষণে তাকবীরের চোখে চোখ রাখলো, সেই চাহনিতে ছিলো জমে থাকা অভিমান, গলায় অভিযোগ মিশিয়ে বলল,
___” আপনি ভিষণ অবাধ্য যে।
তাকবীর কিছুক্ষণ নীরব চোখে আরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে ওর কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নরম স্বরে বলল,
___“ এবার একটু বাধ্য হওয়া উচিত?
আরাত চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাকালো,
___” হুম।
___” বাধ্য হতে কী করতে হবে?
আরাতের মাঝে পরিবর্তন দেখা গেলো, মলিন মুখটা উল্লাসে পরিনত হলো, আহ্লাদি কন্ঠে বলে উঠলো,
___” প্রথমে আপনার গোমড়া মুখে হাসি আনতে হবে!
তাকবীর মাথা ঝাকালো, ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মৃদু হাসি,
___” আনলাম ।
___” দ্বিতীয় বাড়ির সবার সাথে টাইমস্পেন্ড করতে হবে!
তাকবীর ভাবুক মুখে বলল,
___” টাইমস্পেন্ড করতেই হবে, আমার তো তুমিই এনাফ ?
___” নো এক্সকিউজ, করতেই হবে ।
আরাত চোখ রাঙিয়ে বলল কথাটা, আরাতের রাগী চাহনি দেখে তাকবীর মুহূর্তেই সিরিয়াস হয়ে গেল, ঠোঁটে আঙ্গুল ছুঁইয়ে, চোখমুখ ঝাঁকিয়ে বাধ্য ছেলের ভঙ্গিতে বলল ,
___” ওকে ডান।
তাকবীরের পাগলামি দেখে আরাত মুখে হাত চেপে ধরে শব্দ করে হেঁসে উঠল, হাসতে হাসতেই আলতো ভাবে তাকবীরের বুকে মাথা ঠেকাল, তাকবীর নিজেও হাসলো এবার, মুখে হাসি রেখেই নিঃশব্দে আরও একটু কাছে টেনে নিল আরাত কে, এভাবেই কেটে গেলো কিছু নীরব মুহূর্ত, আরাত তাকবীরের উন্মুক্ত বুকে নখ দিয়ে এলোমেলো আঁকিবুঁকি করতে করতে নীরবতা ভেঙ্গে বলল,
___” শুনুন না?
তাকবীরের ভারী কন্ঠ ভেসে এলো,
___” হুম শুনছি ?
আরাত তাকবীরের বুক থেকে মাথা তুলে তার মুখের দিকে তাকালো, নরম হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাকবীরের হালকা বেড়ে ওঠা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গুলো স্পর্শ করল, তাকবীর ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করছে বলার জন্য, আরাত বুড়ো আঙুল দিয়ে তাকবীরের হালকা বেড়ে ওঠা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গুলো স্লাইড করতে করতে মৃদু স্বরে বলল,
___” বাবা, বড়বাবা, মা, বড়মা, সবার তো বয়স হয়ে যাচ্ছে, আমাদেরও বয়স বেড়ে যাচ্ছে, সময় তো আর কারও জন্য অপেক্ষা করে না, কখন কার ডাক আসে বলা যায় না, আমরা কী পারি না তাদের সাথে প্রতিটা সন্ধ্যা উপভোগ করতে?
তাকবীর আরাতের মুখের দিকে অদ্ভুত ভাবে চেয়ে রইলো, তাকবীর হয়তো এতটা প্রত্যাশা করেনি যতটা আরাত ভেবেছে, কখনো এমন ভাবে ভাবা হয়নি, সত্যি কারো মৃত্যু বলে কয়ে আসে না, একবার এই মিশে মায়ার দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে আপনজন দের কাছে ফিরার কেনো অপশন থাকে না, আজকে তাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পরলে আড্ডা দিতে না পারলে হয়তো বা আগামীকাল বলে দিনটা আর আমাদের জীবনে ফিরে পেলাম না, মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে এই দুনিয়ায়র জন্য বড্ড আফসোস হয়, আপনজন দের থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া চিরসত্য ভালো থাকতে দেয় না, তাকবীর বুঝতে পেয়েছে তার পাগল বউয়ের কথার মানে, তার বউটা চাইছে তাকবীর নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটাক,তাকবীর মনে মনে স্থীর করলো,এবার থেকে নিজেকে সবার মাঝে হাসিখুশি ভাবে প্রজেন্ট করবে, নিজ হাতে অফিস বাড়ি দুটোই মেইনটেইন করবে, ছেলেমেয়ের যত্ন নিবে, অফিস থেকে ফিরে বাড়ির সবার সঙ্গে হল রুমে আড্ডা দিবে, তাকবীর কে কিছু বলতে না দেখে আরাত পুনরায় বলল,
___” কী হলো কিছু বলছেন না যে?
তাকবীর এবার আরাত কে বাহুডোরে শক্ত করে জরিয়ে ধরে বলল,
___” তুমি অনেক ম্যাচিউর হয়ে গেছো রাত।
___” তাই?
___” হুম ।
আরাত দুষ্টু হেসে বলল,
___” তাহলে চলুন না আরেকটা বেবির প্লান করি?
তাকবীরের কপালে ভাঁজ পরলো, কয়েক সেকেন্ড আরাতের কথা বুঝার চেষ্টা করে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
___” ম্যাচিউরিটি আর বেবির মাঝে রিলেশন কী?
আরাত দুষ্টু হাসিমুখ রেখেই দু’হাতে তাকবীরের গলা জরিয়ে ধরে বলল,
___” আমি ধৈর্যশীল?
___” হ্যাঁ!
___” আপনার বুঝদার বউ?
তাকবীর এবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ!
___” আমি আপনার বেবিকে ঠিকঠাক সামলাতে পারি?
___” অফকোর্স, অলরেডি দুইটা বড় হয়ে গেছে।
___” তো আমার আরো বেবি চাই, মিমিমাম আমার
আরও ডজনখানেক বেবি তো চাই।
তাকবীর চোখমুখ কুঁচকে নাক সিটকে বলল,
___” নো ওয়ে।
তাকবীর কে নাক সিটকাতে দেখে আরাত ঠোঁট ফুলিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
___ ” আপনি খুবই স্বার্থপর মানুষ, আমার এত সুন্দর একটা স্বপ্ন, আর আপনি একদমই সাপোর্ট দিচ্ছেন না?
তাকবীর হেসে ফেলল। আরাতকে একটু কাছে টেনে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
___” ম্যাডাম, স্বপ্ন দেখা শেষ হলে একটু বাস্তবে ফিরে আসেন, ডজনখানেক মানে জানেন তো?
আরাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,
___” হুম, জানবো না কেনো, বারোটা, আর আমি তো ওদের লিস্ট বানিয়ে রাখছি।
তাকবীর অবাক হয়ে বলল,
___” কিসের লিস্ট?
___” বেবিদের নামের লিস্ট।
তাকবীর এবার হেসে ফেলল জোরে, আরাতও মুখ লুকিয়ে হেসে উঠল, পুনরায় নাটকীয় ভঙ্গিতে আঙুল গুনে গুনে বলতে শুরু করল,
___” মেয়ে হলে নাম রাখবো মাহার বোন মেহরীন, আয়রা, ইনায়া, আর ছেলে হলে নাম রাখবো আয়ান, সামীর, রাইয়ান……
তাকবীর সাথে সাথে আরাত কে থামিয়ে দিল,
___” এই দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি তো পুরো ক্রিকেট টিম বানানোর প্ল্যান করে ফেলেছ?
আরাত গর্বিত মুখে বলল
___” শুধু টিম, সাথে রিজার্ভ বেঞ্চও থাকবে।
তাকবীর মাথায় হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
___ ” ইয়া আল্লাহ।
আরাত এবার শব্দ করে হেসে উঠল,তাকবীরের কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
___ ” আচ্ছা ঠিকআছে, ডজনখানেক না, তাহলে আর একটা, মোট তিনটা বেবি হবে ?
তাকবীর হেসে আরাতের নাক টেনে দিল,
___” ওকে ডান, তাহলে আমি পুরো সাপোর্ট দিব।
দু’জনেই এবার হেসে উঠলো, তাদের দুজনের খুনসুটির মধ্যে তাকবীর অফিসের ঝামেলা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে, এই মেয়েটার সঙ্গ পেলে তাকবীরের মতো বুঝদার ছেলেটাও অবুঝ হয়ে যায়, তাকবীর অফিসের ড্রেস চেঞ্জ করে ফর্মাল ড্রেসআপ নিল, তখনই দরজায় বাহিরে থেকে আনাস এর কন্ঠ ভেসে এলো ,
___” ভাইয়া আসবো?
তাকবীর আরাত দু’জনেই চমকিত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালো, কারণ শুধু আনাসের কণ্ঠ নয়, ছোট মাহার কান্নার আওয়াজও ভেসে আসছে, তাকবীর আনাস কে রুমের ভিতর প্রবেশের পারমিশন দিতেই আনাস রুমে প্রবেশ করল, আনাসের পিছনে আইরা, আর আইরার কোলে মাহা অবনত কাঁদতে কাঁদতে হিচকি তুলে ফেলছে, ফর্সা গালে হাতের ছাপ স্পষ্ট, আনাস ও আইরা রুমে প্রবেশ করতেই আরাত উদ্বিগ্ন হয়ে ব্যস্ত হাতে আইরার কোল থেকে মাহাকে নিজের কোলে নিয়ে বলতে লাগলো,
___” কী হয়েছে আমার মাম্মার, এমন করে কাঁদছো কেন, মানুষ পচা বলবে তো, মাম্মা?
তাকবীর মেয়ের গালের দিকে তাকাতেই শীতল মাথাটা হটাৎই দাউদাউ করে জলে উঠলো, চোখ বন্ধ করে স্বাভাবিক হয়ে আনাস এর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
___” ওর মুখে এই হাতের ছাপ কেন, কে আমার মেয়েকে কাঁদিয়েছে?
আনাস চুপ করে আছে, একবার তাকবীরের দিকে তো আরেকবার আরাতের দিকে তাকাচ্ছে, আইরা নিজেও চরম বিরক্ত, খাইখাই কন্ঠে আনাসের উপর চেঁচিয়ে উঠলো,
___” কী হলো, এখন চুপ করে আছো কেন, খুব তো ছেলেকে মাথায় তুলে রাখো, এবার ভাইয়া কে বলো, তোমার এতটুকু ছেলের গুনের কথা?
আইরার কথায় আরাত তাকবীরের মুখ স্বাভাবিক হয়ে এলো, মাহা মায়ের উষ্ণ আদর পেয়ে কান্না করতে করতে মায়ের গলা জরিয়ে ধরে ঘুমে গেছে, আরাত তাকবীর দু’জন দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আরাত মাহা কে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলো, আইরার কথায় এতক্ষণে দু’জনের বুঝা হয়ে গেছে এরান মাহা কে থাপ্পড় দিয়েছে, কিন্তু কেনো, আরাত মাহা কে বিছানায় শুয়ে দিতে দিতে বলল,
___” আপু থাক না ছোট বাচ্চা, বড় হয়ে…..
___” আরাত তুই চুপ কর, ছোট বাচ্চা তাইনা, তোদের এই আদরেই ছেলেটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে, আজ সামান্য একটা বিষয়ে মেয়েটা কে থাপ্পড় দিয়েছে, কাল যদি এর থেকে আরও বড় কেনো ক্ষতি করে বসে, তখনও কি ছোট বাচ্চা বলবি হ্যাঁ?
আরাত কে সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে না দিয়ে আইরা তেতে উঠে বলল কথাগুলো, আইরার কথায় আরাত পুনরায় বলল,
___” একদম না আপু, আমাদের এরান কখনোই মাহার কোনো ক্ষতি করবে না, তুমি দেখো, বড় হয়ে গেলে ও ঠিক হয়ে যাবে, তুমি কিন্তু এরানকে একদম বকবে না, বলে দিলাম।
___” ভুল ধারণা তোর, আরাত আমি ওকে বকছি না, কিন্তু ভুলটাকে ভুলই বলতে হবে, আজকে ইশান (আরিশার ছেলে) (আশিক-মায়ার মেয়ে মহুয়া) মহুয়ার কপাল থেকে টিপ খুলে নিয়ে মাহার কপালে পড়িয়ে দিয়েছে, শুধু এইটুকু কারণের জন্য মাহাকে থাপ্পড় দিয়েছে,শুধু এতেই ক্ষান্ত হয়নি, ইশানকে মারতে মারতে ইশানের নাক-মুখ থেকে র*ক্ত বের করছে, ভাগ্য ভালো ছিল আরশ-রাফি এখানেই ছিল, নয়তো ইশানকে নিয়ে এত রাতে হাসপাতালে ছুটতে হতো, তুই বল, মাহা কী ওর একাই কাজিন? ইশানও তো ওর কাজিন, এমন চলতে থাকলে এই ছেলে বুঝবেই না কী ঠিক আর কী ভুল।
আইরার মুখে লেগে আছে, বিরক্ত আর চিন্তার ছাপ, আরাতও সেম, আনাস কিছুক্ষণ সময় নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো,
___” ভাইয়া আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি।
তাকবীর রুম থেকে বাহিরে বের হওয়ার পরিস্থিতি নিচ্ছিল, আনাস এর কথায় শান্ত চোখে আনাস এর দিকে তাকালো, আনাস নিজের দিকে তিন জোড়া কৌতূহলি চোখ দেখে কিছুটা সময় নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
___” আমি ডিসিশন নিয়েছি, ইরা, আর এরানকে নিয়ে লন্ডনে সেটেল হবো, কোনোভাবেই দীপ্ত চৌধুরীকে জিততে দেওয়া যাবে না, আমি নিজে বিজনেসটা হ্যান্ডেল করবো, এরান মাহার থেকে দূরে থাকলে এরানের কোনো ব্যাড ইমপ্যাক্ট মাহার ওপর পড়বে না, বড় হয়ে গেলে নিজেরাই বুঝতে শিখবে, দ্যাটস বেটার।
তাকবীর কে উত্তর করতে দেখা গেল না, ফোন হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার আগে শুধু গম্ভীর গলায় বলল,
___” এটা শুধু তোর আমার ডিসিশন না, বড়দের সাথে আলোচনায় বসে সবকিছু ফাইনাল করতে হবে, বড়দের সিদ্ধান্ত আমাদের ভবিষ্যত।
সকাল বেলা বিয়ে বাড়িতে ধুম লেগে গেছে, বাড়ির উঠানে গরু জবাই করা হয়েছে, গ্রামের বউজিরা সবজি কেটে নিচ্ছে, বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে, বিয়ের বাড়ির উঠানে বিয়ের ধুম চললেও বিয়ের বাড়ির ভিতরে চলছে শোক, একদল তরুণী তাদের বরদের খোঁজে পাচ্ছে না, সোফায় চিন্তিত মুখে বসে আছে, মায়া, সন্ধ্যা, হানিয়া, সোফায় বিপরীত পাশে আরাত, বীরাত আর মাহা কে খাবার খাওয়াচ্ছে, এরান কে গতরাত থেকে দেখা যাচ্ছে না, বলতে গেলে ছেলেটা রাগ করে ঘর থেকে বের হয়নি, গতরাতের বিষয়টি নিয়ে আইরা ভিষণ কড়া গলায় বকা দিয়েছে, আনহা শেখ অনেক জোর করেও নাতি কে ঘর থেকে বের করতে পারেনি, শেষে বাধ্য হয়ে ঘরেই খাবার দিয়ে এসেছে, আরিশা রুমে তার ছেলে অর্থাৎ ইশান কে সকালের খাবার খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিচ্ছে, তাকবীর আজ আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার এর সাথে কাজে হেল্প করছে, আর বাদবাকি ছেলেদের বিয়েবাড়ির আশেপাশে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এই নিয়ে মেয়েদের মাঝে তুমুল আলোচনা চলছে, কারণ বিয়ে বাড়ি থেকে এক সাথে সবার বর উধাও, এটা কেনো কাকতালীয় তো হতেই পারে না, সন্ধ্যা সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চিন্তিত মুখে বলল,
___” সকাল আটটা বাজতে চলল, এখনো তো কাউকে চোখে পড়ছে না, ওরা কোথায় যেতে পারে?
হানিয়া গালে হাত রেখে বলল,
___” ভাবি টেনশন করো না, আছেই হয়তো বাইরে কোথাও, চলে আসবে।
সন্ধ্যা হানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আপু আমি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে তোমার ভাইকে দেখতে পায়নি, ফোনটাও ধরছে না, এর আগে কখনো এমন হয়নি, তারউপর অচেনা জায়গা।
মায়া সোফার কিনারে কনুই রেখে, মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলল,
___” সন্ধ্যা, হাবীব ভাইয়া তো আর একা না, আনাস ভাইয়া, আদিল ভাইয়া, আমান ভাইয়া, আহিন আলভী কেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর আমার লুচ্চার কথা কী বলব, আমি ড্যাম সিওর এতকিছুর পিছনে এই লুচ্চার কুবুদ্ধি আছে।
তাদের আলোচনার মধ্যে আইরা সবার জন্য চা নিয়ে এলো, সবার হাতে হাতে চায়ের কাফ দিতে দিতে বলল,
___” আশিক ভাইয়ার দোষ একা দিচ্ছিস কেনো, এখানে সবাই সমান দোষী, বিয়ে বাড়িতে কাজে সাহায্য না করে সবাই মিলে কাউকে কিছু না জানিয়ে আমাদের টেনশনে ফেলে দিয়ে, কোথায় একটা উধাও হয়ে গেছে।
সবাই চা নিলেও চিন্তিত হানিয়া চা নিলো না, তার স্বামীর প্রতি চিন্তাটা একটু বেশিই হচ্ছে, নতুন দম্পতি বলে কিনা, আরিশা রুম থেকে বের হয়ে এসে আরাতের পাশে বসতে বসতে বলল,
___” কীরে ওদের কেনো খবর পেলি?
___” না আপু, তোমাদের বর দেখো গিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
আরাত তার ছেলেমেয়ে কে খাওয়ানো শেষ করে সবাই কে একনজর দেখে নিল, সবার মুখে চিন্তার ছাপ দেখে প্লেটে এঁটো হাত ধুতে ধুতে হাসি মুখে বলল কথাটা, আইরা আরাত কে চোখ রাঙিয়ে বলল,
___” আরাত, এই সময়ে মজা করবি না।
___” উফ আপু, মজা করতে যাব কেন, আই অ্যাম সিরিয়াস।
আরিশা বলল,
___” জানিস তো, আরাত, তুই তাকবীর ভাইয়াকে বিয়ে করে জিতে গেছিস, যদি অন্য কারও সঙ্গে তোর বিয়ে হতো, বিশ্বাস কর বোন, তোর বরকে আমরা আচ্ছামতো ধুয়ে দিতাম, বাট আফসোস, তা সম্ভব না।
আরাতের দাঁত কেলানো হাসিটা আরও গাঢ় হলো, সত্যিই তাই, তাকবীর যদি সবার বড় না হতো, আর এতটা গম্ভীর স্বভাবের না হতো, তাহলে হয়তো আরাতের মতো ফাজিল মেয়ের বর হওয়ার অপরাধে তাকে অনেক কিছুই পোহাতে হতো, আরাত এই যাত্রায় বেঁচে গেছে, কাজিন আর বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়ে হয়েও, তাদের মধ্যকার সবচেয়ে বড় এবং গম্ভীর ছেলেটাকেই বিয়ে করেছে, যতটুকু সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তার চেয়েও অনেক বেশি সম্মান পেয়ে গেছে সে, মাঝখান থেকে বড় বোন, কাজিন আর বন্ধুদের বরদের নিয়ে নির্দ্বিধায় খোঁচা মেরে কথা বলতে পারে, আর এতে করে সবার বড় ভাইয়ের বউ হিসেবে আলাদা একটা সুবিধাও পেয়ে যায়, সবার কথা বলার মাঝেই হানিয়ার ফোনটা হঠাৎ ভাইব্রেট করল, হানিয়া চটজলদি ফোনের স্ক্রিনে তাকাল,আদিলের মেসেজ,
___” আমাকে নিয়ে টেনশন করো না, আমি ঠিক আছি, আমরা এখন আরশের বাড়িতে, আর বাকি সবাই ঠিকঠাক আছে, ওদের বলে দিও।
সবার নজর হানিয়ার উপর, হানিয়া মেসেজ টা পড়ে সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে টাইপিং করতে লাগলো,
___” আরশদের বাড়িতে কী করছো, আর তোমরা গেলে কখন ?
হানিয়ার মেসেজ সিন হতেই পুনরায় বিপরীত পাশ থেকে টাইপিং হলো,
___” ভোর রাতে, আর আমরা এখান থেকে বর যাত্রী হয়ে যাবো।
আদিলের মেসেজটা পড়তেই হানিয়ার মেজাজ বিগড়ে গেল, এখানে সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে রেখে এরা কিনা বরযাত্রী হতে গেছে, জমে থাকা সব রাগ গিয়ে পড়ল মেসেজটার ওপর,
___” তোমরা সেখানে এনজয় করছ, আর আমরা এখানে তোমাদের টেনশনে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বসে আছি, এই তুমি কার পারমিশনে গেছ, বলে যাওনি কেনো ?
মেসেজটা পাঠিয়ে হানিয়া রাগী স্বরে চিৎকার করে বলল,
___” এই আইরা, চা দেও তো।
হঠাৎ হানিয়ার মুখের ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হতে দেখে সবাই বেশ অবাক হলো, ফোনের ওপাশ থেকে পুনরায় টাইপিং হচ্ছে, আর মেয়েরা হানিয়ার হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল,আইরা দ্রুত এক কাপ চা হানিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে অবাক নয়নে সোফায় বসে পড়ল, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে আদিলের আবার মেসেজ এলো,
___” বিশ্বাস করো বউ, আমি আসতে চাইনি, ভোররাতে আশিক ভাই আর হাবীব ভাই আমাকে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে।
এবার হানিয়ার মুখ কিছুটা স্বাভাবিক দেখা গেলো, সন্ধ্যা অবাক কন্ঠে বলল,
___” কী হয়েছে আপু, কার মেসেজ?
হানিয়া টাইপিং করতে করতে বলল,
___” ভাবী ওরা সবাই আরশের বাড়িতে, বর যাএী হয়ে আসবে।
কথাটা বলতে বলতে মেসেজে টাইপিং করল,
___” আগে মেসেজ দিলে এত টেনশন করতাম না, তোমাদের জন্য পুরো বাড়ির পরিবেশ গুমোট হয়ে আছে।
ওপাশ থেকে আদিলের মেসেজ,
___” সরি বউ, রাগ করো না, ফোন দেওয়ার মতো সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
___” ইটস ওকে, সাবধানে ফিরো ।
হানিয়া মেসেজ শেষ করে সামনে তাকাতেই দেখলো, কিছুক্ষণ আগে হানিয়ার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ এখন বাকি সবার মধ্যে জেগে উঠেছে, সন্ধ্যা রাগী গলায় দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,
___” ফার্দার যদি তোমার ভাই এমন কিছু করে, সত্যি বলছি হানিয়া আপু, তোমার ভাইকে আমি ছেড়ে দেব না।
হানিয়া হেসে বলল,
___” ছেড়ে দিতে কে বলছে ভাবি, একদম শক্ত করে শাড়ির আঁচলে বেঁধে রেখে দিবে ।
আরাত দুজনের কথোপকথনের মধ্যে শয়তানি হেসে আফসোসের সুরে বলে উঠল,
___” বাট সন্ধ্যা তো শাড়ি পরে না?
আইরা আরাত কে সোফার কুশল ছুড়ে মেরে বলল,
___” তুই চুপ করবি ফাজিল, দুই বাচ্চার মা হয়েছিস এখন অন্তত ফাতরামি বাদ দে।
আরাত নাটকীয় মুখ করে কুশনটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
___ ” দুই বাচ্চার মা হয়েছি বলে কি ফাতরামি করার লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে নাকি?
___” তোর লাইসেন্স তো অনেক আগেই এক্সপায়ার হয়েছে, আমরা শুধু সহ্য করে যাচ্ছি।
আরাত ঠোঁট ফুলিয়ে কুশনটা নিজের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
___ ” হিংসুটে মানুষজন, আমার মতো প্রতিভাবান মানুষকে কেউই বুঝল না।
আরিশা চোখ উল্টে সোফার পেছনে হেলান দিয়ে বলল,
___“হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই তো এই দেশের অবহেলিত প্রতিভা।
কথাটা শুনে ঘরে চাপা হাসির রোল পড়ে গেল, আরাত সঙ্গে সঙ্গে গর্বিত মুখ করে বলল,
___ ” অবশেষে কেউ আমার ট্যালেন্ট বুঝতে পারল।
মায়া বলল,
___” গাইজ এসব বাদ দেও, চলো ওদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
আরিশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
___” কাদের?
মায়ার মুখে বাঁকা হাসি,
___” পাত্রপক্ষের।
মায়ার কথা এবার সবাই বুঝতে পারল, সবার মুখেই শয়তানি হাসি খেলে গেলো, একি অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সবাই একসঙ্গে উচ্চ স্বরে বলে উঠলো,
___” হুম,বেয়াইদের জন্য একটু স্পেশাল আপ্যায়নের ব্যবস্থা তো করতে হবে।
আইরা দুই হাত ঘষে দুষ্টু হেসে বলল,
___” আজকে বেয়াইদের এমনভাবে রিসিভ করব, যেন ওরা আজীবন এই দিন ভুলতে না পারে।
সন্ধ্যা শয়তানি হেসে বলল,
___ ” রিসিভের সাথে সাথে আপ্যায়নের দিকটা দেখতে হবে, যেন আর কোনোদিন বউ কে রেখে পালানোর সাহস করতে না পারে ।
সময়টা বিকেলের দিকে গড়াচ্ছে, বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এসে মিশে যাচ্ছে রঙিন লাইটের ঝলমলে আলোয়, গাছের ডালে ডালে রঙিন বাতি জ্বলছে,পুরো গ্রামজুড়ে যেন আজ উৎসব নেমেছে, কাঁচা রাস্তার দুই পাশে রঙিন কাগজের ঝালর টাঙানো, আর বিয়েবাড়ির উঠানজুড়ে বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে সামিয়ানা টানানো হয়েছে, সামিয়ানার মাঝে টাঙানো রঙিন বাতি মৃদু বাতাস দোলায় টিপটিপ করে জ্বলছে, রান্নাঘরের পাশ দিয়ে গেলেই ভেসে আসছে গরম মসলার তীব্র ঘ্রাণ, বড় বড় ডেকচিতে রান্না হয়েছে কাচ্চি, গরুর মাংস আর মুরগির রোস্ট, সেই ঘ্রাণে পুরো পরিবেশটাই আরও মুখর হয়ে উঠেছে, গ্রামের বউ-ঝিরা কেউ সালাত কাটছে, কেউ প্লেট ধুচ্ছে, আবার কেউ ব্যস্ত হাতে অতিথিদের খাওয়ানোর প্রস্তুতিতে নেমেছে, উঠানের এক পাশে কয়েকজন চাচা-মামা বসে চায়ের কাপ হাতে গল্পে মেতে আছে, আত্মীয়-স্বজনেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গল্পে মেতে আছে, কারও মুখে হাসি, কারও ঠোঁটে পুরোনো স্মৃতির গল্প, গ্রামের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে সবাই আজ এক হয়েছে বলে কিনা, এদিকে বাচ্চারা নতুন জামাকাপড় পরে পুড়ো বাড়িজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করে হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছে, নানা রঙের ফুল, ঝাড়বাতি আর আলোকসজ্জায় সাজানো বিয়ে বাড়ির পুড়ো পরিবেশজুড়ে আনন্দ, ব্যস্ততা আর উৎসবের উচ্ছ্বাস একসঙ্গে মিশে এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছে,
মিমকে বারোটার দিকে গ্রামের কিছু ভাবি-দাদি মিলে গীত গাইতে গাইতে হলুদ লাগিয়ে গোসল করিয়ে দিয়েছে, তাদের মধ্যে আইরা, আরাত, মায়া, সন্ধ্যা, হানিয়া আর তিশাও ছিল,মিমকে গোসল করিয়ে দেওয়ার পর তারা নিজেরাও একে অপরকে হলুদ লাগিয়ে অনেক মজা করেছে, এরপর তারাও বিয়ের জন্য গোসল সেরে রেডি হয়েছে, বর্তমানে সবাই নিজেদের দিক থেকে ভীষণ ব্যস্ত, মিমকে গোসল করিয়ে দেওয়ার পর তাকে ঘিরে গ্রামের দাদি, কাকি আর ভাবিরা আবারও গীত ধরেছে, নিয়ম মেনে সবাই হাসি-আনন্দে ফতুয়া তুলেছে, ফতুয়া তুলা শেষে শহরের কয়েকজন মেকআপ আর্টিস্ট ধীরে ধীরে মিমকে বিয়ের সাজে সাজিয়ে তুলছে, সবাই যেন একটাই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে মিমকে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের জন্য সাজিয়ে তোলা,মিমের শ্যামবর্ণ মুখশ্রীতে খুব ভারী কিছু না করে তারা মিমের স্বাভাবিক সৌন্দর্যটাকেই তুলে ধরেছে, ত্বকে হালকা গ্লোয়িং বেস, যেন ভেতরের উজ্জ্বলতাটাই বাইরে ফুটে উঠছে, চোখে গোল্ডেন শিমার ছোঁয়া, পাতলা আইলাইনার আর ঘন মাসকারা মিমের চাহনিতে একটা আলাদা মায়া ফুটে উঠেছে,
গালে হালকা পিচ টোনের ব্লাশ, আর ঠোঁটে নিউড পিঙ্ক শেড, সব মিলিয়ে মুখে এক শান্ত, মিষ্টি উজ্জ্বলতা নেমে এসেছে, মেকআপ আর্টিস্টরা বারবার আয়না দেখে নিশ্চিত করেছে, যেন কিছুই অতিরিক্ত না হয়ে যায়, সবকিছুই নিখুঁত ভারসাম্যে থাকে, শ্যাম বর্ণ মিমকে অফ-হোয়াইট কাতান শাড়িতে বিয়ের সাজে সাজিয়েছে, সোনালি জরির কাজ আর লাল পাড়ে মোড়া আঁচল, তার সাথে লাল নেটের ওড়নাটা মাথার উপর হালকা করে রাখা, গলায় সোনার চিকন গহনা , কানে ঝুমকা, আর কপালে টিকলি, চুল খোঁপা করে সুন্দরভাবে বাঁধা, তাতে মিমের ফুল বাগানে আরশের যত্ন করা বেলি ফুলের গাছ থেকে তোলা টাটকা বেলি ফুলের গজরা বসানো, হাতে লাল-সোনালি চুড়ি আর সুন্দর মেহেদি থাকায় যখন সব সাজ সম্পূর্ণ, ন্যাচারাল লুকে মিম কে এক বিয়ের কনের পূর্ণ রূপে পাওয়া গেল, তার শ্যামবর্ণ ত্বক যেন মায়াবী এক নতুন বউয়ের ফুটে উঠলো, সব সাজ শেষ করে মেকআপ আর্টিস্টরা ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল, পুরো রুম ফাকা, মিম একাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে কিছু মুহূর্ত মোহময় দৃষ্টিতে আয়নার মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে লাগলো, বিয়ে নিয়ে প্রতিটা মেয়ের সপ্ন থাকে,
ভালোবাসার মানুষ টার জন্য শাড়িতে নতুন বউ সাজার তীব্র ইচ্ছা সব মেয়ের মধ্যে থাকে, মিম তো হয়েছিল বউ, তবে সেই বিয়েতে ছিলো না কেনো ভালোবাসা, না কেনো সাজসজ্জা, ছিলো শুধু একিউপরের প্রতি ঘিন্না, আর আজ বহুবছর পড়ে ঠিক সেই মানুষটার জন্যই বউ সেজেগুজে বসে আছে তার অপেক্ষায়, আজকে আর তাদের মধ্যে নেই কেনো দ্বন্দ্ব অবহেলা ঘিন্না, আছে শুধু একিউপরের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা, সময়ের ভাঁজে জমে থাকা সব অভিমান গলে গিয়ে হয়েছে শান্ত এক নীরব অনুভূতি,যেখানে শুধু আছে অপেক্ষা, আর একে অপরকে আবার নতুন করে পাওয়ার স্বপ্ন, মিম আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, ইস সে বউ সেজেছে, ভালোবাসার মানুষটার জন্য আজ নতুন করে বউ সেজেছে, বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত কাঁপন সৃষ্টি হলো, আয়নার ভেতরকার নতুন বউ রুপি নিজেকে দেখে মিম নিজেই একটু লজ্জা পেল, ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফোনটা নীরব রুমটাকে কাঁপিয়ে তুলে শব্দ করে বেজে উঠলো, মিম নিজের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ফোনে আবদ্ধ করল, ফোনের স্ক্রিনে ঝলমল করছে ‘শহরের পন্ডিত মশাই ‘ মিমের বোধহয় হৃদয়ের কম্পন বেড়ে গেলো, লজ্জা পেয়ে এক হাতে লাল বউ-ওড়না খামচে ধরল, কাঁপা কাঁপা আরেক হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলো, ধুকপুক বুক নিয়ে ফোন রিসিভ করে নিজের সামনে ধরল,
ফোন রিসিভ হতেই বিপরীত পাশ থেকে আরশের থমকে যাওয়া মুখটা ভেসে উঠল, কয়েক সেকেন্ড সে কোনো কথা বলতে পারল না, যেন স্ক্রিনের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই মুখটাকেই খুব গভীর ভাবে অনুভব করতে ব্যস্ত, বরের সাজে আরশকে আজ একেবারে আলাদা লাগছে, সবসময় ঢিলেঢালা পোষাকে সচ্ছন্ন বোধ করা আরশের পরনে আজ নিখুঁতভাবে ফিট করা ঝকঝকে সাদা শার্ট, তার ওপর গাঢ় কালো কোট-প্যান্ট, গলায় টাইয়ের নিখুঁত গিঁট, যা তার ব্যক্তিত্বে এনে দিয়েছে আরও শৃঙ্খলা আর পরিপক্বতার ছোঁয়া, আরশ মিম কে ফোন দিয়ে কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটা ঠিক করে নিচ্ছিল , হটাৎ ফোনের স্ক্রিনে ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের জন্য বউ সাজতে দেখে, ঘড়ি ঠিক করা হাতের আঙুলের ভঙ্গিতে অস্থিরতা ফুটে উঠলো, মিম নিজেও লাজ লজ্জা ভুলে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো , আরশের মাথার চুলগুলো হালকা সেট করা, মুখে হালকা ক্লিন শেভের পরিচ্ছন্নতা, চোখের দৃষ্টিতে গভীরতা, তো আবার চাপা ব্যাকুলতা, যেন এই মুহূর্তটাকে সে নিজের ভেতরে গেঁথে রাখতে চাইছে, মিম লাজুক হেঁসে গলা খাঁকারি দিলো, আরশ নিজের হুঁশে ফিরলো যেন, মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠলো, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে মাধুর্য কন্ঠ বলল,
___” মাশাআল্লাহ, কবুল, কবুল, কবুল।
মিম ভড়কালো, এই ছেলে পাগল হয়ে গেলো নাকি, বিয়ে পড়ানোর আগেই সে কবুল বলছে, তবে মিমের মুখে এবার লাজুক হাসি দেখা গেলো, লাজুক হেঁসে চোখ নামিয়ে নিলো, আরশ ‘হায়য়’ বলে বুকের বা পাশে হাত রেখে খালি গলায় গেয়ে উঠলো,
“আমার মনের আগুন, বাড়ে দ্বিগুন
বন্ধুরে হায় দেখিলে..
গভীর রাইতে ঘুম আসে না
বলিবে হায় কে তারে?
আমার দিলে লাগে টান
সে যে মুশকিলে আসান,
আয় হায়,মনটা চায়, তারেই হায়,
বোঝানোর কেউ নাই।
মিম চোখ বড় বড় করে ফোনের দিকে তাকিয়ে আরশের পাগলামি দেখছে, আরশ প্রায় গান বলতে বলতে নাচতে শুরু করছে,
আমার সোনা বন্ধে….
আমার সোনা বন্ধের গায়
যেমন আগুনে ঝলকায়, আয় হায়, হায়
রুপেরই একি ঝালয়া দেখায়, পোড়াইলো আমায়।
আরশ নাচতে নাচতে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিলো, আর মিম হাসতে হাসতে যেন আরশের দেওয়া ফ্লাইং কিসটা ক্যাচ ধরে নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে দিল,আরশ হাসি মুখে বলল,
___” কনগ্র্যাচুলেশন্স বউ , আজ থেকে তোর রাজত্ব শুধু এই আরশের বুকে চলবে।
মিম লাজুক হেসে ছোট করে বলল,
___” কনগ্র্যাচুলেশন্স টু ইউ।
আরশ ভ্রু কুঁচকে বলল,
___” শুধু এটুকুই?
মিম মুচকি হেসে,
___” তো?
আরশ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, পর মুহূর্তে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” নো প্রবলেম সুইটহার্ট, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা, তারপর তুই আমার জীবনে ফিরবি ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার নিয়ে, তোকে আমি আমার করে নিবো পাখি, খুব যত্নে রাখবো আমার এই হৃদয়ে।
আরশ নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে কথাগুলো বলল, মিম মোহনীয় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, আরশ পুনরায় বলে উঠল,
___” তুই জানিস তো? তুই আমার বিশ্বাস ছিলি, তুই একদিন ঠিকই আমার জীবনে ফিরবি, এই আরশের বউ হবি, কীরে হবি তো, আমার নামের পাশে জড়িয়ে থাকা একমাত্র মানুষ, এই নীরব রাতটা সাক্ষী থাকবে আমাদের ভালোবাসার, কীরে করবি তো, তোর ওপর বড্ড বেশি অধিকার ফলানো মানুষটাকে সারাজীবনের জন্য কবুল ?
___” ইনশাআল্লাহ কবুল,এই জীবনে, পরের জীবনেও যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলেও শুধু আপনাকেই কবুল।
কথা বলার সময় মিমের ঠোঁট কাঁপছিল, চোখভরা ব্যাকুলতা, মনে প্রশান্তি, দু’জনেই একিউপরের দিকে নিঃশব্দে অপলক চেয়ে রইলো, যেন সময় টা থমকে গেছে, দুপাশেই নীরবতা, নীরবতা ভাঙলো আরশের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে, হানিফ দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আরশ কে জলদি বের হতে বলছে, আরশ একনজর দরজার দিকে চেয়ে পুনরায় ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফোন কাটতে নিয়ে বলল,
___” দেখা হচ্ছে আল্লাহ হাফেজ।
বলেই ফোন কাটাতে নিয়ে পুনরায় নেশালো চোখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে বলল,
___” রেডি ফর এভরিথিং, বাই।
ফোন কেটে গেল, মিমের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, ধীরে ধীরে ফোনটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল, ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি, আরশের শেষ কথাগুলো এখনো কানে বাজছে, সত্যিই নারী তার প্রেমে পড়া পুরুষের অস্থিরতা দেখে আনন্দ পায়, মিমও পেয়েছে, শান্তিতে চোখ দু’টো বন্ধ করে বিরবির করল,
___” আজ সব অপেক্ষার অবসান ঘটবে, এতদিনের শূন্যতা পূর্ণ হয়ে যাবে, শুধু আপনার ভালোবাসার উষ্ণ আলিঙ্গনে।
মিম গুটিগুটি পায়ে নিজের রুম থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে নিচে নেমে এলো, মিমকে নিচে নামতে দেখে অনেক আত্মীয়-স্বজন মিমের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো, আর তাকাবেই না কেনো, বিয়ের দিন কেনো বিয়ে বাড়িতে যদি মেয়ে বউ সেজে আত্মীয়-স্বজনের মাঝে পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, তাহলে তো মানুষ বাঁকা চোখে তাকাবেই, মিম সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে গেস্ট রুমের দিকে হাঁটতে লাগলো, মাঝপথে আদিবা তালুকদার ভাস্তিতে আটকে ব্যস্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, “নিচে কেনো? আর কিছু লাগবে কি না, মিম প্রতি উত্তরে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বুঝালো, কিছুই লাগবে না তাঁর, আদিবা তালুকদার ভাস্তির উওর পেয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল, মিম সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পুনরায় গেস্ট রুম, অর্থাৎ মিমের ডাফার এর রুমের দিকে পা বাড়ালো, পার্থর কাছে যাওয়ার একটাই লক্ষ, সব ছেলেরা আরশের বাড়িতে গেলেও পার্থ যায়নি, কিন্তু কেনো যায়নি এটাই জানতে যাচ্ছে, মিম সকাল থেকে পার্থর দেখা পায়নি, আর পাবে কিভাবে, সকাল থেকে গ্রামের দাদি ভাবি দের চাপে একটার পর একটা বিয়ের রিচুয়াল পালন করতে করতে পার্থর সাথে দেখা করার সুযোগ হয়ে উঠে নি, মিম লক্ষ করেছে, আজকাল পার্থ তাকে ইভয়েড করে চলছে, কিন্তু কেনো? মিমের জানা নেই, মিমের বিয়েতে তো সবচেয়ে আনন্দেয় থাকার কথা তার ডাফার এর, কিন্তু মিম সেই আনন্দ পার্থর মধ্যে দেখতে পাচ্ছে না, মিম ভাবতে ভাবতে পার্থের রুমের সামনে এসে দাড়ালো, দরজাটা হালকা চেপে দেওয়া, মিম প্রথমে ভাবলো পার্থ কে ডাক দিবে,পর মুহুর্তে ডাকতে গিয়ে ভাবলো, না থাক, দরজা খুলে পার্থ কে চমকে দিবে, পার্থ নিশ্চয়ই মিম কে বউ সাজে দেখে সারপ্রাইজ হবে,
মিম হাসি মুখে দরজা খুলতেই অবাক চোখে সামনে তাকালো, পার্থ চেয়ারে বসে কিছু একটা করছিলো, খট করে দরজা খুলার শব্দ শুনে চমকে ওঠে হাতের কাগজ লুকাতে লাগলো, মিম বুঝতে পারলো না, পার্থ কী লুকাচ্ছে, জায়গায় দাঁড়িয়ে হাতে হাত ভাজ করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
___” কী লুকাচ্ছিস?
পার্থ মিমের কন্ঠ শুনে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো, এই অসময়ে মিমকে তার রুমে একদমই আশা করেনি পার্থ, পিছনে ফিরে তাকাতেই মুহূর্তের মধ্যে তার সব ব্যস্ততা থেমে গেল, হাতে থাকা কাগজটা মাঝপথেই স্থির হয়ে রইল, পার্থর উদাসীন আঁখিযুগল বধূবেশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কন্যার ওপর, মিম পার্থর থামকে যাওয়া দৃষ্টি দেখে পার্থর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে কাগজ টা পার্থর থেকে কেড়ে নিতে নিতে বলল,
___” দেখি, কী লুকাচ্ছিস?
মিম কাগজটার ওপর চোখ বুলানোর আগেই পার্থ দ্রুত মিমের হাত থেকে কাগজটা কেড়ে নিল, তারপর তাড়াহুড়ো করে কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বলল,
___” নট ইম্পর্ট্যান্ট, জাস্ট টাইমপাস।
মিম এবার মুখে চওড়া হাসি নিয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে বলল,
___” আচ্ছা বাদ দে, দেখতো আমাকে কেমন লাগছে, লাগে তো আরশের বউ বউ?
পার্থর মন মস্তিষ্ক দুটোই স্তব্ধ হয়ে গেলো, মিমের মুখে আরশের বউ শব্দটা শুনে, হ্যাঁ শুনতে বুকে ব্যাথা হলেও এটাই চির সত্যি, মন না মানতে চাইলেও মন কে কষ্ট দিয়ে হলেও মানাতে হবে, মিম এবার নিজের থেকে চোখ উঠিয়ে উৎসাহ দৃষ্টিতে পার্থর দিকে তাকালো উওর শোনার জন্য,
___” কীরে বল, ওর পাশে মানাবে তো আমাকে?
পার্থের চোখ থেকে বুঝি এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো, পার্থ নিজের হুঁশে ফিরলো, দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে মিমের আড়ালে সেই পানিটুকু মুছে ফেলল, ঠোঁটের কোণে জোর করে এক চিলতে হাসি টেনে শান্ত স্বরে বলল,
___” হুম, হুম সুন্দর।
মিম হতাশা ভরা কন্ঠে বলল,
___” শুধু সুন্দর, বল দুজন কে পাশাপাশি কেমন লাগবে, আমি তো টেনশনে আছি, দেখ না ও কতটা সুন্দর, ফর্সা আর আমি শ্যাম বর্ণের, আমি তো ভাবছি দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালে কেমন দেখাবে?
কথাটা বলেই মিম আনমনে হেসে ফেলল, পার্থ হাজারো কষ্ট বুকে মাটিচাপা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার লেডি গুগুলের হাসিমাখা মুখখানা, মেয়েটা কতটা খুশি, তার ভালোবাসার মানুষ টাকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পাবে, যে ছেলেটার কাছে তার সুখ ভাগ করতে এসেছে, সেই ছেলেটা মন খুলে হাসতে পারছে না, নিজের ভিতরকার ফিলিং বুঝাতে পারছে না, বুকটা ফেটে যাচ্ছে মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না, পার্থর মুখ দেখে মিমের হাসি মিলিয়ে গেল,অবাক হলো মিম, পার্থ মুখ ফুটে বলতে পারলো না, তোদের জুটি পারফেক্ট, তোর পাশে আরশ কে মানায়, কথাগুলো মুখে আসলো না, হতাশায় মলিন মুখে একটা শুকনো ঢোক গিলল, পুরো রুমটা থমথমে হয়ে উঠল, মিমের চোখে চোখ রেখে কৌতুহলী কন্ঠ প্রশ্ন করল,
___” মিস করবি আমাকে ?
মিম সন্ধিহান কন্ঠে বলল,
___” তোকে এমন লাগছে কেনো, তুই ঠিক আছিস?
___” কই আমি একদম পারফেক্ট, বল না, মিস করবি আমাকে?
পার্থ হালকা হেসে সেই উদ্বেগটা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করল, কিন্তু হাসিটায় কোথাও একটা কৃত্রিমতা ছিল বিধায় মিম খুব সহজে ধরে ফেললো হয়তো, গলায় সামান্য রাগ মিশিয়ে বলল মিম,
___” মিথ্যা বলবি না ডাফার, তোকে আমি খুব ভালো করে জানি, সো আমার সামনে মিথ্যা বলার চেষ্টা করবি না, আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, তোর মনে এমন কিছু চলছে, যা আমাকে বলতে পারছিস না?
পার্থ আহত দৃষ্টিতে মিমের দিকে তাকালো, সেই দৃষ্টিতে ছিলো অভিযোগ, বলতে না পাড়া মনের হাজারো অনুভূতি, পার্থ হটাৎই মিমের কাছে একটা আবদার করে বসলো,
___” শেষবারের মতো একটু হাক করবি?
পার্থ বলতে দেরি হাক করতে দেরি করল না, মিম কিছু বালার আগেই পার্থ আচমকা মিম কে জড়িয়ে ধরলো, মিম অস্বস্তিতে পড়ে গেল, কারণ তাদের মধ্যে কেনো দিন আলিঙ্গন হয়নি, তারা দুজন যতই ফ্রি হোক না কেন, দুজনের মধ্যে সবসময় যথেষ্ট দূরত্ব ছিল, মিম বুঝতে পারছে না পার্থর কী হয়েছে, এর আগে কখনো এমন আচরণ করেনি সে, মিমের হাত এখনো আগের ন্যায়, পার্থ একাই জরিয়ে ধরে রাখলো মিম কে, কয়েক সেকেন্ড যেতেই বাহিরে থেকে মিমের ডাক পরল, আরিশা ডাকছে, পার্থ এবার মিম কে ছেড়ে দিয়ে অন্য দিকে ফিরে তাকালো,মিম আঁড়চোখে পার্থ কে দেখে ছোট করে বলল,
___” পড়ে দেখা হচ্ছে।
পার্থ মিমের দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকি হাসি উপহার দিলো, মিম রুম থেকে গুটিগুটি পায়ে বের হয়ে গেল, মাথা পুরো ফাঁকা লাগছে, পার্থর আচরণে সে কিছুই বুঝতে পারল না, পার্থ মুখে মলিন হাসি রেখে মিমের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো, আসলে কী তাদের আর দেখা হবে, হয়তো বা না, এটাই হয়তো শেষ দেখা,
বর এসেছে, বর এসেছে, গেটের দিক থেকে ছোট বাচ্চাদের কন্ঠে ভেসে আসা সেই ডাক যেন পুরো বাড়িটাকে এক মুহূর্তে রঙে রঙে রাঙিয়ে দিল, চারপাশে হঠাৎই একরকম উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল, মিম বিছানার উপরে বসে ছিল, হানিয়া মিমের পাশে এসে চোখের ইশারায় বাহিরের দিকে দেখিয়ে দুষ্টুমি করল, মিমের মুখে লাজুক হাসি, আরিশা
জানালার সামনে এসে পর্দা সরতেই দেখা গেল ফুলে ভড়া সাজানো গাড়ির সারি, গাড়ির চারপাশে নতুন বর দেখতে হাসি মুখে ঘীড়ে দাড়িয়ে আছে লোকজন, আরিশা জানালার কাছে দাড়িয়ে নিচে দেখতে দেখতে মিম কে হাতের ইশারায় জানালার পাশে আসতে বলল,মিম হানিয়া দুজনেই জানালার পাশে এসে দাড়ালো, এখান থেকে সুন্দর ভাবে গেটটা চোখে পরছে, আরিশা বর কে নামাবে, সেজন্য দ্রুত মিমের রুম থেকে বের হতে হতে আইরা সন্ধ্যা কে ডেকে উঠলো,
___” তোদের রেডি হওয়া হয়েছে, আর কতক্ষণ লাগাইবি, দ্রুত চল।
মেয়েরা একপ্রকার ঘরের ভিতরে দৌড়াদৌড়ি শুরু করছে, আইরা শাড়ির আঁচল ঠিক করছে, মায়া শেষবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিচ্ছে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি-না, সন্ধ্যা তিশা কে সাথে নিয়ে আগেই রেডি হয়ে হাতে হাত লাগিয়ে বর নামানোর জন্য মিষ্টি শরবত রেডি করছে, সবার মুখে লেগে আছে হাসি আনন্দ , কারও চোখে চাপা উত্তেজনা, সবশেষে তিশা মিমের সাথে রুমেই থেকে গেল, আর সবাই নিচে নেমে এলো, আরিশার হাতে মিষ্টির প্লেট, আইরার হাতে ঠান্ডা পানির গ্লাস, আর সন্ধ্যার হাতে জুসের ট্রে, মায়ার হাতে গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজানো ট্রে, ট্রেতে আছে ‘ব্রেগেৎ ওয়াচ’ নতুন বর কে বরণ করতে তাদের পাশে রাবেয়া তালুকদার, সবাই মিলে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই চারপাশে মানুষের চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে,
আরে বর কই, গাড়ি তো এসেছে, কিন্তু বর গেল কোথায়, নিশ্চয়ই পথে কিছু হয়েছে, চারপাশে এমনই ফিসফাস শোনা যাচ্ছে, বর নেই, বর গেল কোথায়, কৌতূহলী ভিড়ে পুরো এলাকা জমে উঠল, ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়ে এসে গাড়ির চারপাশে ভিড় করল, আরিশা রাবেয়া তালুকদার এর দিকে তাকালো, কেউ এখনো কিছুই বুঝতে পারছে না, মায়া আর সন্ধ্যা পিছন থেকে মাথা হেলিয়ে গাড়ির মধ্যে উঁকি দিল, কিন্তু গাড়িতে বর নেই, বাকি পাত্রপক্ষ অর্থাৎ গাড়িতে শুধু পাত্রপক্ষের মেয়েদের দেখা যাচ্ছে, এক মুহূর্তে আনন্দের পরিবেশ বদলে গেল বিস্ময়ে, মিম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বার বার উঁকি দিচ্ছে বর কে দেখতে, অথচ বর নেই, হানিয়া তিশা কে মেসেজ করল, গাড়িতে বর যাএী থাকলেও বর নেই, সাথে তাদের হাসবেন্ডেরও দেখা যাচ্ছে না, তিশা আশ্চর্য ন্যায় মেসেজ টা মিম কে দেখালো, মিম মেসেজ টা দেখে চিন্তিত মুখে আরশের ফোনে ফোন দিতে লাগলো, তিশাও সেম কাজটা করলো, হানিফের নাম্বারে ফোন দিতে লাগলো, কিন্তু তাদের ফোন সুইচড অফ দেখাচ্ছে, এবার মিমের মাঝে দুশ্চিন্তা এসে ভর করল, ঘন্টা দেড়েক আগেই তো দুজনের কথা হলো, হটাৎ কী হলো যে ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে, কিন্তু আরশ তো একা না, আরশের সাথে বাকি ছেলেদের ফোন সুইচড অফ দেখাচ্ছে,
বরের গাড়ি থেকে একে একে নামছে, নূরফিহা, নূরপ্রিয়া, মিরা, রশ্মি, আর আরশের মা ভদ্রমহিলা, এভাবেই একে একে অন্য গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো বাকি বরযাত্রী, কিন্তু তাদের সকলের মুখে চওড়া হাসি, তাদের দেখেই বুঝা যাচ্ছে তারা কতটা হ্যাপি, বাট তাদের ছেলে, অর্থাৎ যার বিয়ে সেই উধাও , তাদের মাঝে কোনোরুপ দুশ্চিন্তা দেখা যাচ্ছে না, রাবেয়া তালুকদার আরশের আম্মুর কাছে জানতে চাইলো,
— ” আরশ কোথায় ?
ভদ্রমহিলা কিছু বলবে, ঠিক তখনই রাস্তার উপরে একদল বাইকের হর্ন শোনা গেল,সবাই কৌতূহলী হয়ে গেটের দিকে তাকাল,ধুলো উড়িয়ে কয়েকটা বাইক এসে থামতেই মানুষের ভিড় যেন আরও ঘন হয়ে গেল, এতে করে রঙিন লাইটে সাজানো পুরো রাস্তা যেন মুহূর্তের মধ্যে জীবন্ত হয়ে উঠল, দু’পাশে ঝুলানো ঝাড়বাতি আর টিমটিম করা ফেয়ারি লাইটে পথটা, দূর থেকে খুব নীরব লাগছে, ফুলের তোড়া আর রঙিন কাপড়ে সাজানো প্রবেশপথ দিয়ে বাইকের হেডলাইটগুলো ধীরে ধীরে কাছে আসতেই পুনরায় মানুষের ভিড় গেটের সামনে জমে গেল, সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, হ্যাঁ অবশেষে বর এসেছে, মিনিমাম চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টা বাইক নিয়ে, সেই বাইকের মধ্যে নতুন বরও আছে, কথা ছিলো কাজিন বন্ধবান্ধর রা বাইক নিয়ে বিয়েতে আসবে, কিন্তু শেষ প্রহরে এসে বিয়ের গাড়িতে পরিবার কে তুলে দিয়ে, বর নিজেই বন্ধু কাজিন দের সাথে বাইক নিয়ে বিয়ে করতে এসেছে, গ্রামে এই কথাটা একপ্রকার হই পড়ে গেল, কেউ কেউ তো বিষয়টা নিয়ে বাঁকা কথা বলতে ছাড়লো না,
___” আজকালকার জমানায় কত যে রঙঢঙ দেখমু খোদাই জানে।
আবার কেউ কেউ বলছে,
___” গ্রামে এই প্রথম কেনো বিয়ে ইতিহাস হয়ে থাকবে, বড় ভাই মেয়ে দেখে গিয়েছে একজন কে, বিয়ে করেছে মেয়ের বান্ধবী কে, আবার ছোট ভাই গত সাত বছর মেয়ের বাড়িতে অপেক্ষা করেছে, অথচ মেয়ে বাড়িতেই নেই, অবশেষে বিয়ে ঠিকঠাক তো হটাৎ বিয়ের গাড়ি থেকে বর উধাও।
এমনই হাজারো কথা নিয়ে গ্রামের মানুষেরা আলোচনা সমালোচনা করতে লাগলো, কেউ ভালো ভাবে তো কেউ বাজে ভাবে, আত্মীয়-স্বজন রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললোও মেয়েরা রাগে কাঁপতে লাগলো ,
সবার সামনে থাকা বাইক থেকে ধীরে ধীরে আরশ নামল, হেলমেট খুলতে খুলতে মাথা উঁচিয়ে মিমের ঘরের জানালার দিকে তাকালো আরশ, রঙিন আলোয় ভেসে থাকা বাড়িটার ভিড়ে সবার চোখ তখন আরশের দিকে, কিন্তু তখন আরশের দৃষ্টি আটকে ছিল শুধু সেই জানালায়, আরশ কে উপরের দিকে তাকাতে দেখে জানালার পাশ থেকে সরে গেল মিম, বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠল তার, এতক্ষণ পর্দার আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছিল, কিন্তু আরশ কে উপরের দিকে তাকাতে দেখে মনের অজান্তেই দূরুদূরু বুকে সরে গেল, বাইরে তখনও মানুষের হইচই, বাইকের শব্দ আর হাসাহাসি চলছে, পাতলা পর্দার আড়াল থেকে মিমের ছায়া নড়ে উঠল, কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের হইচই, মানুষের ফিসফাস, বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ, সবকিছু যেন থেমে গেল আরশের কাছে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, হাজার ঝামেলার শেষে অবশেষে সে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে তার জন্য তার ভালোবাসার মানুষ টা বধূ বেসে অপেক্ষা করছে, আরশের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা ক্লান্তিমাখা হাসি ফুটে উঠল, হেলমেট টা নূরফিহার হাতে দিয়ে রাবেয়া তালুকদার এর সামনে দাঁড়ালো, আরশের একপাশে মাহির আরেক পাশে রাফি, বাইক থেকে সবাই নেমে পরছে, মাহির রশ্মি দু’পক্ষে থেকেই দাওয়াত পেয়েছে, কিন্তু তাদের আগমন ঘটলো আজকে, সবার সাথে তাদের দুজনের দুরত্ব অনেক আগে থেকেই, হয়তো ভবিষ্যতেও এমনই দুরত্ব থেকে যাবে, মানুষ বলে না, কিছু সম্পর্কের মাঝে দুরত্বই সুন্দর, আসলেই সুন্দর, আজকে দুজন এসেছে ফর্মালিটি পূরণ করতে,
তবে ছেলেরা বাইক জার্নি করে বেশ ক্লান্ত, প্রায় দু’ঘন্টার রাস্তা বাইক জার্নি করা মুখের কথা না, তবুও এটাই তাদের ইচ্ছা ছিল, বিয়ের আমেজ তাদের ক্লান্ত হতে দেয়নি, আরশ কে রাবেয়া তালুকদার বরণ করছে, আর আমান, আনাস,আশিক,হাবীব, আলভী, আহিন, আদিল, হানিফ, বাইকে বসে বর বরণ দেখছে, বর কে ভিতরে নিয়ে গেল, বাকি সবাই পিছনে পিছনে যেতে নিলো,কিন্তু তাদের বাঁধ সাজলো মেয়েরা, তবুও হানিফ আলভী আহিন আমান ভিতরে চলে গেলো, থেকে গেল শুধু আশিক, হাবীব, আদিল, আনাস, চারজন ভিতরের দিকে পা তুলতে পরলো না, সন্ধ্যা মায়া আইরা তিনজনের হাতে ট্রে, সন্ধ্যার হাতে জুস, মায়ার হাতে শরবত, আইরার হাতে পানি, হানিয়া আদিলের সামনে দাঁড়িয়ে রাগী গলায় বলল,
___” ফোন বন্ধ কেনো ছিল?
বউয়ের কথায় আদিল কাচুমাচু করে আশিক হাবীবের দিকে তাকালো, কারণ তাদের দুজনের জন্য এতকিছু, আদিল কে আশিক হাবীবের দিকে তাকাতে দেখে দুজন একিউপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে দ্রুত বউদের পাশ কাটিয়ে ভিতরে যেতে লাগলো, সন্ধ্যা মায়া মুখে জোরপূর্বক হাসি এনে বলে উঠলো,
___” আরে বিয়াই কই যান, শরবত টা খেয়ে যান রিফ্রেশিং লাগবে।
এবার আশিক হাবীব গ্লাসের দিকে তাকালো, দুজনের মনে সন্দেহ, আশিক হাবীবের দিকে চাপে নিচু স্বরে ফিসফিস করল,
___” বিষয়টা এত সোজা মনে হচ্ছে কেন?
হাবীব গ্লাসটা একটু ঘুরিয়ে দেখল, তারপর কপাল কুঁচকে বলল,
___” কিছু তো গড়বড় আছে, বউরা কি এত সহজে সব মেনে নিচ্ছে?
আশিক ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে নিজের সন্দেহটা আরও গাঢ় করল , দু’জন কে ফিসফিস করতে দেখে মায়া ভ্রু কুঁচকে রাগী গলায় বলল,
___” এই তোমরা ফিসফিস করে কী বলছো?
“গোলাপ ফুল লাল টুকটুক,
তোমার হাসি মিষ্টি খুব।
আশিকের ছন্দে সবাই মুখ চেপে হাসতে লাগলো,
মায়া সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে কাঁচুমাচু করতে করতে তেজি গলায় বলল,
___” মা..মা..মানে?
আশিক যেন মায়ার দুর্বলতা লুটে নিতে চাইলো,
“রাত জাগা ওই চাঁদের আলো,
তোমার মুখটাই লাগে ভালো।
মায়া এবার সত্যি সত্যি লজ্জা পেলো, সবার সামনে স্বামীর এমন ছন্দময় কথায়, আশিক মায়ার আরেকটু কাছে এসে পুনরায় বলল,
” হালকা হাওয়ায় দোলে মন,
তোমার নামেই সারাক্ষণ।
___” বউ কে যখন এতই ভালোবাসেন, তাহলে বলে যাননি কেনো?
“বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা নামে,
তোমার স্মৃতিতে হৃদয় থামে।
মায়া বলল,
___” বুঝলাম না?
আশিক,
___” মানে তোমার কথা হৃদয়ে সবসময় থাকে, এজন্য বলার প্রয়োজন মনে করেনি।
মায়া এবার লাজুক হাসলো, এই প্রথম হয়তো স্বামীর কথায় মেয়েটা এত লাড্ডু হচ্ছে, আর তাদের নাটক গুলো, তিন কাঁপল নাক সিটকে কপাল কুঁচকে দেখছে,
চুলার পানি গরম,
তোমার মনটা খুব নরম,
আমার বলতে লাগছে শরম,
এই শরবতে আছে কী কারণ?
মায়া এতক্ষণে নিজের ফর্মে এলো, আশিক যে মায়া কে নিজের কথায় জালে ফাঁসাচ্ছে মায়া এতক্ষণে ঢের বুঝতে পেয়েছে, মায়া দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে আশিকের পাঞ্জাবির কলার ঠিক করতে করতে নিজেও ছন্দের তালে তালে বলল,
তোমার চোখে মায়ার ছোঁয়া,
দেখলেই মনে হয় সব ভোয়া।
তোমার কথার মিষ্টি সুর,
শুনলেই মনে হয় বাটপারি ফুল।
আশিক মায়ার ছন্দ শুনে মায়া কে বুঝানোর মতো করে হাতের ইশারায় বলতে লাগলো,
বৃষ্টির ফোঁটা টাপুর টুপুর,
তোমার কথা শুনি আবালের মতো ভরপুর।
হাওয়াটা আজ দখিন দিক,
তোমায় ভাবলেই লাগে সব ঠিক।
কলম হাতে লিখি নাম,
তোমায় ভাবি সকাল-বিকাল।
চুপিচুপি মনটা বলে,
তোমায় দেখলে দিনটা ভালোই চলে।
মায়া এবার আবেগপ্রবণ হয়ে গেলো, আদুরে গলায় শাড়ির আঁচল টেনে আশিকের ঘামান্ত মুখশ্রী মুছে দিতে দিতে বলল,
___” ইশ রে আর বরটা ঘেমে একাকার, নিন ঠান্ডা জুস টা খেয়ে নিন, ভিতর টা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
আশিক এতকিছু করেও শরবতের হাত থেকে বাঁচতে পারলো না, জুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল,
___” এতে কিছু মিশানো নেই তো?
মায়া এবার নাকে কান্না করার ন্যায়, অবুঝ গলায় অভিযোগের ন্যায় বলল,
___” মুই কি মোর স্বমী রে দুঃখ দিতে পারুম স্মমী?
আশিক ও সেম ভাবে মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো, মায়া এবার হাসি মুখে নিজের হাতে আশিক কে ঠান্ডা জুস খাওয়াতে লাগল, আশিক বিশ্বাস করে গ্লাসে চুমুক বসালো,মায়ার মুখে শয়তানি হাসি, আইরা সন্ধ্যা হানিয়া যেন এবার বমি করে ফেলবে,আইরা চোখ-মুখ কুঁচকে এক হাত গলায় চেপে ধরল, যেন ভেতর থেকে কিছু উগলে আসছে, সন্ধ্যা ঠোঁট বাঁকিয়ে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল, আর হানিয়া তো সরাসরি দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে নাক মুখ সিটকে বলল,
___” ভাইয়া খাইয়েন না।
তাদের এমন অবস্থা দেখে আশিক নিজেই ভয় পেয়ে গেল, হাতে ধরা গ্লাসটার দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে রইল সে, আনাস আদিল হাবীব কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলো, আদিল সন্দেহভরা কন্ঠে প্রশ্ন করল,
___” কেনো, খাবে না কেন?
হানিয়া নাকে ওড়না গুঁজে বলল,
___” তোমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য জুসে গোবর মিশানো ছিল।
হানিয়ার কথা শুনে মুহূর্তেই আশিকের চোখ বড় হয়ে গেল, হাত থেকে গ্লাস প্রায় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, মায়া গ্লাস টা ধরে বাঁকা হাসি দিলো, আশিক দু’হাতে গলা চেপে ধরে কাশতে কাশতে বমি করার মতো মুখ থেকে শব্দ বের করল, আদিল আর হাবীব দৌড়ে এসে আশিকের পাশে দাঁড়ালো, দুজনের মুখে রাগ স্পষ্ট, হাবীব পাশে চেয়ার থেকে পানির গ্লাস নিয়ে রাগী গলায় আশিক কে পানি খাওয়াতে খাওয়াতে বলল,
___”তোমাদের মাথা ঠিক আছে, এসব নোংরা মজা করতে ভালো লাগে, এটা একটু বেশি বেশি হয়ে গেলো না?
হাবীবের কথার মধ্যেই আশিক পুনরায় মুখ থেকে গ্লাস সরিয়ে কাশতে লাগল, কাশতে কাশতে হাবীবের পিঠে কিল বসিয়ে বলল,
___” শালা হারামি, তুই বন্ধু নামে শত্রু , এই পানি এত লবণাক্ত কেন?
হাবীব তৎক্ষণাৎ গ্লাসের দিকে বিস্মিত মুখে তাকাল, অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি মুখে নিতেই সে চোখ-মুখ কুঁচকে মুখ থেকে পানিটুকু ফেলে দিল, রাগী চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
___” পানির ভেতরে কী মেশানো ছিল?
সন্ধ্যা দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
___” লবণ।
এদিকে আদিল আশিকের মুখের লবণাক্ত স্বাদ দূর করতে ব্যস্ত হাতে বরের জন্য সাজানো মিষ্টির প্লেট থেকে একটা লাল মিষ্টি তুলে নিয়ে আশিকের মুখে পুরে দিতে দিতে বলল,
___” ভাই মিষ্টিটা খাও, মুখ মিষ্টি হয়ে যাবে।
মেয়েরা এতক্ষণ মজা নিলেও এবার যেন প্রায় কেঁদেই দেবে, সবার জন্য স্পেশাল আয়োজন শুধু মাত্র একজনের ওপর দিয়েই যাচ্ছে সব, প্রথমত জুসের ভিতরে কোনো প্রকার গোবর মেশানো ছিলো না, এটা মূলত মেয়েদের একটা প্র্যাঙ্ক ছিল, শুধু খালি পানিতে ছিল লবণ মেশানো, আর বরের বন্ধুদের জন্য লাল মিষ্টির ভিতরে গুঁড়া মরিচ দেওয়া ছিল, আশিক লবণাক্ত মুখ মিষ্টি করতে মিষ্টিটা চিবাতেই পুনরায় মুখ থেকে মিষ্টিটা ফেলে দিয়ে ঝালে শ্বাস নিতে লাগল,ঝালের চোটে বেচারার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, এবার আশিকের সঙ্গে ব্যাপারটা অতিরিক্ত হয়ে গেছে ভেবে মেয়েরা মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে, মায়া আশেপাশে তাকিয়ে মিনারেল ওয়াটার খুঁজলো, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এখানে লবণাক্ত পানি ছাড়া বর্তমান কিছুই নেই, আনাস এতক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল, আশিককে ঝালে বড় বড় শ্বাস নিতে দেখে, তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা কোকাকোলা ক্যান বাড়িয়ে দিল, আশিক ক্যান না নিয়ে রাগী স্বরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল,
___” এখনই সত্যি বলবে, কে এই বাজে আইডিয়া দিয়েছে, আর কে কে ছিল এতে ?
আশিকের কণ্ঠ শুনে আইরা হানিয়া আর সন্ধ্যা এক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল, একে অপরের দিকে তাকাল তারা, মায়া অপরাধী মুখ করে হাত কচলাতে লাগলো, আশিক পুনরায় রাগী গলায় বলল,
___” আমি আবার জিজ্ঞেস করছি, কে এই বাজে আইডিয়া দিয়েছে?
আশিকের ধমকে মায়া চমকে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, চারপাশে নীরবতা টের পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাতেই দেখল, তিনটা হাতের আঙুল তার দিকেই তাক করা, মায়া ততক্ষণে হকচকিয়ে পাশে আশিকের দিকে তাকাল, মায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগাম বার্তা ছাড়া আশিক মায়ার ঠোঁটে ঝাঁপিয়ে পড়ল, মুহূর্তেই মায়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো,এদিকে আশিকের এমন কান্ডে আইরা, হানিয়া ও সন্ধ্যা এক মুহূর্তে হতভম্ব হয়ে গেল, তারা আগে থেকেই মায়ার দিকে আঙুল তুলে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু আশিকের এই আচমকা কান্ডে সবাই যেন জমে গেল, পর মুহূর্তেই তারা এক হাত সামনে আঙুল তুলে রাখা অবস্থায় আরেক হাত দিয়ে নিজেদের চোখ ঢেকে ফেলল, লজ্জা আর অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে বউদের সামনে বন্ধুর এমন উদ্ভট কাজে আনাস, হাবীব, আদিল, তিনজন একিউপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৯
তারপর বিরক্ত মুখে দ্রুত পায়ে যে যার বউয়ের সামনে এসে নিজেদের বউকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে চলে গেল, মায়া আশিকের বুকে অগণিত কিল-ঘুষি দিচ্ছিল, আশিক নিজের কাজ শেষ করে মায়া কে ছেড়ে দিল, মায়া রাগী চোখে আশিকের দিকে তাকিয়ে আছে, আশিক বাঁকা হেসে বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছতে মুছতে বলল
___” আর একবার এমন ফালতু কাজ করলে সোজা দ্বিতীয় বাচ্চার মা বানিয়ে ছাড়ব।

Amar onnotomo priyo uponnash…. Taqbir er moto chupchaap, por meyeder sathe kotha na bola abong dindar husband chai… Ar next part taratari den api please….