তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২২
আতিয়া আদিবা
জোন জিরোর সেই রক্তাক্ত অধ্যায় সাময়িক স্থগিত রেখে শেহজাদ যখন স্কাইলাইন ভিলায় ফিরে এলো তখন বেলার অন্তিমকাল চলছে। সে সোজা কমন ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার অন করে দিল। বরফশীতল জল তার মাথা বেয়ে নেমে যাচ্ছিল। তার বন্ধ চোখের সামনে তখনো ভাসছিল জোন জিরোর সেই কংক্রিটের রক্তাক্ত মেঝে। জামিলের ভাঙা হাঁটু আর নিজের শার্টে লেগে থাকা সামান্য রক্তের ছোপ।
কিন্তু সেই সব বীভৎসতাকে ছাপিয়েও তার মগজে বারবার হাতুড়ি পিটছিল ডাইনিং টেবিলে বসা সামাইরার ওই শান্ত তৃপ্ত মুখখানা। চুক্তিপত্রে সই করার পর তার বুক থেকে বেরিয়ে আসা ওই স্বস্তির নিঃশ্বাসটা শেহজাদের ভেতরের পুরুষালি সত্তাকে প্রতিনিয়ত উপহাস করছে।
শাওয়ার শেষ করে সে একটা কুচকুচে কালো ক্যাজুয়াল শার্ট আর ট্রাউজার পরে বাইরে এলো। ভেজা চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলাই রইল। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সে এক মুহূর্ত থমকাল। তার চোখের নিচের কালচে দাগ! এই দাগগুলো যেন স্পষ্ট বলছে, বিগত কয়েকটা রাত সে এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। তার মনে নেই বিন্দুমাত্র শান্তি।
নিজের কিং পরিচয় ঝেড়ে ফেলে বেডরুমের দরজার সামনে এসে শেহজাদ থমকে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল। ভেতর থেকে হালকা বাতাস ভেসে আসছে। আর সেই বাতাসের সাথে ভেসে আসছিল সামাইরার প্রিয় পারফিউমের সুবাস। এই সুবাসটা শেহজাদের বড্ড চেনা। বড্ড প্রিয়!
আবার একই সাথে বড্ড যন্ত্রণাদায়ক।
সামাইরা তখন বিছানার এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। দুপুরের সেই ভারী পোলাও-কোরমা খাওয়ার পর থেকেই তার শরীরটা কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে। মাত্র গতকালই সে জানতে পেরেছে সে মা হতে চলেছে। এই খবরটা তার জীবনের সমস্ত সমীকরণ কেমন ওলটপালট করে দিয়েছে। একদিকে বোধহয় মুক্তির আনন্দ, অন্যদিকে নিজের ভেতরে গড়ে ওঠা এক নতুন প্রাণের অস্তিত্ব। সব মিলিয়ে সে মানসিকভাবে মারাত্মক ক্লান্ত আবার উত্তেজিত।
হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন উথাল-পাথাল করে উঠল। তীব্র এক বমিভাব দলা পাকিয়ে ঠেকল গলায়। সামাইরা নিজের মুখটা চেপে ধরে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল।
বেসিনটা আঁকড়ে ধরে সে কয়েকবার শুকনো বমি করল। শরীরটা একদম ছেড়ে দিয়েছে তার। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখ দুটো পিটপিট করে যখন সে সোজা হওয়ার চেষ্টা করল, ঠিক তখনই বিশালাকার আয়নায় নিজের পেছনের প্রতিবিম্ব দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
শেহজাদ!
সে কখন ওয়াশরুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে, সামাইরা টেরও পায়নি। শেহজাদের চোখ দুটোতে এখন এক অদ্ভুত অতলান্ত ব্যাকুলতা। সে কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে সামাইরার একদম পেছনে এসে দাঁড়াল। তার একটা বলিষ্ঠ হাত আলতো করে সামাইরার কপালে এসে ঠেকল। আর অন্য হাতটা পরম মমতায় সামাইরার পিঠে বৃত্তাকারে বুলাতে লাগল।
শেহজাদের এই আকস্মিক ছোঁয়া সামাইরার সারা শরীরে এক তীব্র বিদ্যুচ্চমকের মতো খেলে গেল। সে এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। দুর্বল গলায় বলল,
-ছাড়ুন আমাকে! খবরদার আমাকে ধরবেন না। আমাকে ধরার সাহস কী করে হলো আপনার? আমাদের মধ্যে কি নিয়ে আইনি চুক্তি হয়েছে ভুলে গেছেন?
শেহজাদ তার এই অবাধ্যতাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সে সামাইরাকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিল। তার গলার স্বর বড্ড ভারী শোনাল,
-এক টুকরো কাগজের জন্য আমার দায়িত্ব কেড়ে নিও না। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস। শান্ত হও। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দাও ভালো লাগবে।
সামাইয়া ভ্রুঁ কুঁচকে বসে রইল।
শেহজাদ নিজেই বেসিনের ট্যাপটা অন করে ঠাণ্ডা পানি নিজের হাতে নিয়ে সামাইরার ফর্সা, ফ্যাকাশে মুখে আলতো করে ছিটিয়ে দিতে লাগল। সামাইরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু শেহজাদের তার এই জেদকে তোয়াক্কা করল না। শেহজাদের একরোখা যত্নের সামনে সামাইরার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল! সে বাধ্য হয়েই শেহজাদের চওড়া বুকে নিজের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিল।
শেহজাদ আলতো করে সামাইরাকে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। বিছানায় তাকে শুইয়ে দিয়ে সে নিজে খাটের একপাশে বসল। সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে সামাইরার ঠোঁটের কাছে ধরল সে।
-একটু পানি খাও। শরীরটা হাইড্রেটেড থাকবে।
সামাইরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
-আপনি যান এখান থেকে।
শেহজাদ গ্লাসটা টেবিলে সশব্দে নামিয়ে রাখল। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল। সে সামাইরার দুই কাঁধ নিজের শক্ত মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে ঘোরাল। তার চোখের সেই শান্ত ভাবটা এক পলকে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক চিলতে হিংস্র অভিমান উঁকি দিল,
-কেন এত অবাধ্যতা, সামাইরা? আমার ওপর রাগ আছে, ক্ষোভ আছে সব মানলাম। কিন্তু তা আমার ওপর উগরে দাও। কিন্তু নিজের শরীরের সাথে এই হেলাফেলা কেন? কি প্রমাণ করতে চাইছো তুমি? ভুলে যেও না আমি তোমার সব খবর রাখি।
সামাইরা শেহজাদের চোখের দিকে তাকাল। তিক্ত হাসি হেসে বলল,
-তাই নাকি! খবর রাখেন? তা তো রাখবেনই। এই স্কাইলাইন ভিলার প্রতিটা কোণায় তো আপনার সিসিটিভি আর স্পাই ক্যামেরা বসানো। আমি কখন শ্বাস নিচ্ছি, কখন ফেলছি সবই তো আপনার নখদর্পণে। কিন্তু আপনার এই সস্তা কেয়ারিং আমার বড্ড ভণ্ডামি মনে হয়।
‘ভণ্ডামি’ শব্দটা শেহজাদের বুকে তপ্ত সীসার মতো লাগল। সে সামাইরার কাঁধের ওপর নিজের গ্রিপটা আরও কিছুটা শক্ত করল। কিন্তু পরক্ষণেই সামাইরার মুখমন্ডলের ফ্যাকাশে ভাব দেখে সে নিজের হাতটা আলগা করে নিল। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল।
-তুমি আমাকে ভুল বুঝলে আমার কিচ্ছু করার নেই। আই ডোন্ট গিভ এ ফা*ক! তবে এই বাড়িতে যতদিন আছ, আমার চোখের সামনে যতদিন আছো, তোমাকে নিজের যত্ন নিতেই হবে। আমার কথা শুনতেই হবে।
সামাইরা উঠে বসল শেহজাদের মুখোমুখি হয়ে বসল। দুজনের মাঝখানের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির।
– এখন এই মেকি অধিকার দেখানোর মানে কী বলবেন? আপনি কি চান আমি আপনার এই ঘরোয়া মায়ায় আটকে যাই? সংসারের মায়ায় আটকে যাই? নাকি আপনার পুরুষালি ইগো সহ্য করতে পারছে না যে একটা মেয়ে আপনার কোটি টাকার সাম্রাজ্যকে লাথি মেরে চলে যেতে চাইছে?
সামাইরার প্রতিটি কথা শেহজাদের মনের ভেতরের ক্ষতগুলোকে কাঁচের টুকরোর মতো কুচি কুচি করে কাটছিল। সে জানে, এই মেয়েটি তার নিজের রক্তকে নিজের পেটে ধারণ করেও তাকে ছেড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এই সত্যটা শেহজাদকে ভেতরে ভেতরে কতটা পাগল করে তুলছে, তা সে মুখে প্রকাশ করতে পারছে না। সে শুধু দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করল।
-তুমি চলে যেতে চেয়েছো। আমি রাজি হয়েছি। আমি কি তোমাকে আটকেছি? সই তো করে দিয়েছি। কিন্তু সামাইরা, আমার সন্তান ভূমিষ্ট হবার আগে কোনো অঘটন ঘটালে তা আমি বরদাশত করব না।
শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। সে ঘরের জানালার দিকে এগিয়ে গেল। ভারী পর্দাগুলো টেনে দিতে দিতে সে চারপাশের পেরিমিটারটা আরেকবার পরখ করে নিল।
আরসালানের লোকরা কাল রাতে এখানে এসেছিল এই চিন্তাটা মনে আসতেই তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে জানালার লকটা শক্ত করে আটকে দিয়ে আবার সামাইরার দিকে ফিরল।
-আজ থেকে এই ঘরের জানালা কখনো খোলা থাকবে না। আর তুমি ভুলেও ভিলার বাহিরে যাবে না। দিস ইজ মাই অর্ডার।
সামাইরা বিছানা থেকে নেমে শেহজাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন চরম বিস্ময় আর রাগ।
-অর্ডার? আপনি আমাকে এখনও বন্দি করে রাখতে চান? পৃথিবীর মিষ্টি বাতাসটুকুও আমি গায়ে লাগাতে পারব না? আপনার এই সাইকোপ্যাথিক স্বভাবের জন্যই আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আপনি একটা জানোয়ার সেটা জানেন তো?
কথা বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল সামাইরা।
শেহজাদের ঠোঁটের কোণে বিষাদগ্রস্ত হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে সামাইরার দিকে এগিয়ে গেল। সামাইরা পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেল তার।
শেহজাদ দুই হাত দেয়ালের ওপর রেখে সামাইরাকে আবার অবরুদ্ধ করল। তার শরীরের উত্তাপ সামাইরা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল। শেহজাদ নিচু হয়ে সামাইরার কানের কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে গেল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস সামাইরার ঘাড়ের চামড়ায় এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাল।
-হ্যাঁ, আমি জানোয়ার, সামাইরা। আমি এক ভয়ংকর জানোয়ার। আর এই জানোয়ারটা নিজের খাঁচার ভেতরের পাখিকে কীভাবে আগলে রাখতে হয়, তা খুব ভালো করেই জানে। আমি চাইলে তোমাকেও খাঁচায় রেখে দিতে পারতাম কিন্তু…
শেহজাদ থেমে গেল। পুনরায় হেসে বলল,
-তুমি আমাকে যত খুশি ঘৃণা করতে পারো, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু আমায় ঘৃণা করতে গিয়ে আমাদের সন্তানের ক্ষতি করার চিন্তাও করো না। জানে মেরে ফেলব।
সে তার ডান হাতটি আলতো করে সামাইরার গালের ওপর রাখল। আঙুল দিয়ে সামাইরার ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে মৃদু চাপ দিল। সামাইরা চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো।
শেহজাদ এবার ফিসফিস করে বলল,
-আমার চেয়ে বেশি দুনিয়া দেখ নি, সামাইরা। বাইরের পৃথিবীটা বড্ড নোংরা। সেখানে কিছু শকুন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি বেঁচে থাকতে সেই শকুনের ছায়া তোমাদের ওপর পড়তে দেব না।
শেহজাদ সামাইরার কপাল থেকে কয়েকটা অবাধ্য চুল আলতো করে সরিয়ে দিল। তার চোখ দুটো তখন সামাইরার পেটের ওপর গিয়ে থমকে দাঁড়াল। শেহজাদের তীব্র ইচ্ছা করছিল নিজের হাতটা ওখানে রেখে তার সন্তানের স্পন্দন অনুভব করতে। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতার কারণে তা পারল না।
-যাও রেস্ট নাও।
শেহজাদ ধীর পায়ে সামাইরাকে ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার আগে সে পেছন না ফিরেই বলল,
-রাতে স্যুপ খাবে?
সামাইরা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইল।
শেহজাদ মুচকি হাসল। নীরবতার প্রত্যুত্তরে সেও নীরব রইল। ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল। সামাইরার বুকটা তখন দুরুদুরু করে কাঁপছে। সে নিজের পেটের ওপর হাত রেখে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল।
ধানমন্ডির সেই নিরিবিলি গলির ভেতরের হাই-প্রোফাইল সাইক্রিয়াটিক ক্লিনিকটাতে তখনো একটা মৃদু আলো জ্বলছিল। ডা. নাফিস আহমেদ তাঁর চেম্বারে বসে একদৃষ্টে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
ঠিক তখনই, কোনো রকম নক বা অনুমতি ছাড়াই চেম্বারের ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা এক তীব্র ঝটকায় খুলে গেল।
ডা. নাফিস চমকে সোজা হয়ে তাকালেন। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তাঁর হাতের দামি কলমটা হাত থেকে ফস্কে টেবিলের ওপর পড়ে গেল।
“শেহজাদ…?”
ডা. নাফিসের গলা দিয়ে বিস্ময়ের ঘোর জড়ানো স্বর বের হলো।
শেহজাদ কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে চেম্বারের ভেতরে এগিয়ে এলো। তার হাঁটার মধ্যে এক ধরনের অবশ ভাব। সে ডক্টরের সামনে এসে টেবিলের ওপর নিজের দুই হাত সজোরে চেপে ধরে ডা. নাফিসের দিকে ঝুঁকে দাঁড়াল। টেবিলের কাঁচটা তার হাতের ভারে মৃদু কেঁপে উঠল। শান্ত গলায় বলল,
-আমাকে মেডিসিন দিন, ডক্টর নাফিস। হাই ডোজের অ্যান্টি-সাইকোটিক লিখে দিন। এখনই। ওয়ান্স মোর… আই জাস্ট নিড টু বি নাম্ব।
ডা. নাফিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তিনি শেহজাদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
-বসো শেহজাদ। শান্ত হও। অলমোস্ট পাঁচ বছর পর তুমি আমার চেম্বারে পা রাখলে, আর এসেই ওষুধের দাবি করছ? তোমার প্রেশার আর পালস রেট এখন নরমাল নেই। আগে চেয়ারটায় বসো, একটু পানি খাও।
-আমি এখানে পানি খেতে আসিনি, ডক্টর!
শেহজাদ আচমকা টেবিলের ওপর সজোরে এক ঘুসি মারল। ঠাস! শব্দে টেবিলের পুরু কাঁচের এক কোণ ফাটল ধরে গেল। তার হাতের পোড়া চামড়াটা ফেটে গিয়ে সেখান থেকে সামান্য রক্ত বেরিয়ে এলো। কিন্তু তার মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-আমি যা চেয়েছি, তা দিন। প্রেসক্রিপশন লিখুন।
-আমি এভাবে ওষুধ লিখতে পারি না, শেহজাদ। তুমি খুব ভালো করেই জানো।
ডা. নাফিস সোজা হয়ে বসলেন। তার চোখে একাধারে পেশাদারিত্ব আর গভীর উদ্বেগ।
-যখন তুমি শেষবার এখানে এসেছিলে, তখন আমরা থেরাপির মাধ্যমে তোমার প্যানিক অ্যাটাক আর হাইপার-প্যারানয়া নিয়ন্ত্রণে এনেছিলাম। তুমি প্রমিজ করেছিলে তুমি নিজেকে কন্ট্রোল করবে। আজ হঠাৎ কী এমন হলো যে তুমি আবার সেই চাইল্ডহুড ট্রমার রাজ্যে ফিরে গেছ? তোমার চোখ-মুখ বলছে, শৈশবের সেই ভয়ংকর অতীত তোমাকে আজ নতুন করে গ্রাস করেছে।
-“চুপ করুন!” শেহজাদ দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরল। তার কপাল বেয়ে ঘামের ধারা নামল।
শেহজাদ টেবিলের ওপর দিয়ে প্রায় অর্ধেকটা ঝুঁকে এসে ডা. নাফিসের শার্টের কলারটা নিজের দুই শক্ত মুঠোয় খপ করে চেপে ধরল। তার গলার রগগুলো ফুলে নীল হয়ে গেছে। চোয়ালের হাড়গুলো যন্ত্রণায় মটমট করছে।
তার চোখ দুটো থেকে অবাধ্য অশ্রু টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে ডক্টরের টেবিলের ওপর। এক মাফিয়ার চোখ দিয়ে আজ ঝরছে এক নিঃস্ব, অবোধ শিশুর জল! ডক্টরের কলারটা আরও শক্ত করে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
– আমি আমার ভেতরের এই জ্বলন্ত নরকটাকে নেভাতে এসেছি! ও আমাকে ঘৃণা করে… ও আমাকে জানোয়ার বলেছে! ও বলেছে আমি অবিকল আমার বাবার মতো। আই এম জাস্ট লাইক মাই ফাদার! আমার নিজের শরীরে বইতে থাকা এই রক্তকে আমার ভয় করছে! আমার মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই যন্ত্রণা!
শেহজাদ ডক্টরের কলারটা ছেড়ে দিয়ে নিজের বুকের বাম পাশটা খামচে ধরল, যেন তার হৃৎপিণ্ডটা এখনই ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। সে ডক্টরের সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝের ভাঙা ফাইলের ওপর বসে পড়ল। তার মাথাটা ডক্টরের টেবিলের প্রান্তে ঠেকিয়ে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
-জাস্ট রাইট দ্য ড্যাম প্রেসক্রিপশন! আমাকে শুধু ওষুধ দিন… এমন ওষুধ দিন যা খেলে আমার এই মগজের ভেতরের সামাইরার কণ্ঠস্বরটা বন্ধ হয়ে যাবে! ও যেন আর বলতে না পারে আমি আনলাভেবল! আমি কিচ্ছু ফিল করতে চাই না, ডক্টর। কোনো কষ্ট না, কোনো স্মৃতি না, কোনো ভালোবাসার কাঙালপনা না। আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বি আ লিভিং ডেড বডি! গিভ মি দ্য ফাকিং মেডিসিন, ডক্টর! প্লিজ… গিভ ইট টু মি!
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২১
চেম্বারে ক্ষমতাবান পুরুষটির এই চরম অসহায় ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ আর ওষুধের জন্য পৈশাচিক আকুতি দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ডা. নাফিস স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন শেহজাদের দিকে। শেহজাদ যে এক জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়েছে!
