Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১
জেরিন আক্তার

বান্ধবীর বড় ভাইয়ের ওয়ালেটে নিজের ছবি দেখে রীতিমতো চমকে উঠল প্রাণেশা। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। নিজেকে যেনো বিশ্বাস করাতে পারছে না ছবিটা ওরই। ঠাই স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। হঠাৎ এদিকে নুপুর পায়ে কারো হেটে আসার শব্দ পেয়ে প্রাণেশা ওয়ালেটটা রেখে বিছানায় এসে বসলো। ওরই বান্ধবী সুবহা এসেছে।
আজকে সুবহার জন্মদিন ছিলো। সেই সুবাদে প্রাণেশা এসেছে এই বাড়িতে। বাড়িতে এতো লোকের আনাগোনা থাকায়, সুবহা ওর বড় ভাই সোহরাব চৌধুরী স্নিগ্ধর রুমে প্রাণেশাকে বসিয়ে রেখে কোথাও একটা গিয়েছিলো। আর প্রাণেশা এই রুমে স্টাডি টেবিলের নিচে একটা ওয়ালেট পায়। ওয়ালেটটা তুলে রাখতে গিয়েই সেখানে ভাসমান হয় নিজের ছবিটা। প্রাণেশা সুবহাকে জিজ্ঞাসা করলো রুমটা কার। সুবহা জানালো এইটা ওর বড় ভাই স্নিগ্ধর।

এই মুহূর্তে প্রাণেশা সুবহাকে ছবিটার বিষয়টা জানালো না। সুবহা প্রাণেশাকে নিয়ে বাহিরে বের হলো। এরপরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে এসে ড্রইং রুমে এলো। সব গেস্টরা এখানে। সুবহা নিজের মা রাজিয়া বেগম এবং বাবা সাঈদ রেজা চৌধুরীর সাথে প্রাণেশাকে পরিচয় করিয়ে দিলো।
প্রাণেশার দুটো চোখ খুঁজছে সুবহার ভাইকে। অচেনা, অজানা একটা মানুষকে। খুব আগ্রহ জাগছে কে সে। যে ওর ছবিটা যত্ন করে রেখেছে। এমন তো নয় যে ওর যমজ বোন আছে একই রকম দেখতে। আর এটা প্রাণেশার নিজেরই তোলা একটা ছবি। অন্য কারো হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
এর কিছুক্ষন সুবহা নিজের রুমে প্রাণেশাকে নিয়ে এসে এসিটা অন করে বসলো। রাজিয়া বেগম খাবার নিয়ে এলেন প্রাণেশার জন্য। প্রাণেশা হেসে বলল,
“আন্টি আমার জন্য এখানে খাবার আনার কি দরকার ছিলো। সবার সাথেই বসতাম।”
রাজিয়া বেগম বললেন,
“তুমি আমাদের স্পেশাল গেস্ট। তোমাকে স্পেশাল ভাবেই আপ্পায়ন করতে হবে বুঝলে। নাও খাওয়া শুরু করো।”

প্রাণেশা প্লেটটা নেওয়ার আগেই সুবহা প্লেটটা নিয়ে প্রাণেশাকে বলল,
“হাত কেটে গিয়েছে খাবি কি করে? এদিকে আয় আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
রাজিয়া বেগম প্লেটটা নিয়ে বললেন,
“আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
প্রাণেশাকে খাইয়ে দিচ্ছে রাজিয়া বেগম। প্রাণেশা রাজিয়া বেগমের দিকে মনভরে তাকিয়ে দেখছে। তিনি কিছুক্ষন পরে জিজ্ঞাসা করে বসলেন,
“ওভাবে তাকিয়ে আছো কেনো মেয়ে?”
প্রাণেশা মলিন হেসে জিজ্ঞাসু সুরে বলল,
“মায়েরা বুঝি এমন যত্ন করে খাইয়ে দেয়।”
কথাটা রাজিয়া বেগমের বুকে তীরের ফলার মতো গিয়ে বিধলো। সুবহার কাছে শুনেছে প্রাণেশার মা নেই তাই হয়তো এমন কথা বলেছে।
প্রাণেশা আগের ন্যায় বলল,
“আমার মা নেই। কোনোদিন দেখিনি। আপনাকে দেখলাম তাই বললাম। কিছু মনে করবেন না আন্টি।”
রাজিয়া বেগম হেসে বললেন,
“না না কি মনে করবো। তুমি তো আমার মেয়ের মতোই। আচ্ছা তুমি বড় হয়েছো কার কাছে, ”
প্রাণেশা বলল,

“বাবা, ভাইয়া আর বাসার কাজের আন্টির কাছে।”
রাজিয়া বেগম বললেন,
“ওহ। তোমার বাবা আর বিয়ে করেনি?”
প্রাণেশা ছোট করে জবাব দিলো, “উহু।”
রাজিয়া বেগম প্রশ্ন করলেন,
“তোমার বাসার সবাইকে তো ইনভাইট করা হয়েছিলো এলো না কেনো?”
“বাবা অফিসের কাজে ব্যাস্ত আর আর ভাইয়া ৩ মাস হলো ভাইয়া ব্যাবসায়িক কাজে লন্ডন গিয়েছে, এই সপ্তাহেই ফিরে আসবে। তাই আমিই এসেছি।”
প্রাণেশা যতক্ষণ ছিলো ততক্ষনই ও সুবহার বড় ভাইকেই খুঁজেছে। শেষে সুবহাকে জিজ্ঞাসা করলো,
“আচ্ছা তোর বড় ভাইকে তো দেখলাম না।”
সুবহা বলল,

“ভাইয়া। ও ওর বন্ধুকে বাসায় দিতে গিয়েছে। চলে আসবে। তু্ই দাড়া আমি কল দিচ্ছি।”
সুবহা সদর দরজার সামনে এসে ওর ভাইকে কল দিলো। স্নিগ্ধ কল ধরতেই সুবহা বলল,
“ভাইয়া তুমি কোথায়? প্রাণেশা এসেছে। একটু পরে নাকি চলে যাবে।”
স্নিগ্ধ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে রাগী কণ্ঠে আওড়ালো,
“আর বলিস না তো গাড়ির চাকা পাংচার হয়েছে। আর সময় পায়নি। এতোদিনের আশা এই গাড়ির জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। ইচ্ছে করছে গাড়িটা জ্বালিয়ে দেই। কি আর বলবো, কি যে রাগ উঠছে। আর তু্ই কল দিয়েছিস কেনো? ফোন রাখ ভালো লাগছে না।”
সুবহা কল কেটে দিলো। স্নিগ্ধ এমনই, রাগে কি বলে নিজেও জানে না। তবে রাগ উঠাই স্বাভাবিক। যাকে সামনে থেকে আজ দেখার কথা ছিলো তার থেকেই দূরে আছে। ঝটপট যে বাড়িতে যাবে কিন্তু তা আর হলো কই গাড়ির চাকা পাংচার হয়েছে।
রাজিয়া বেগম প্রাণেশাকে অনেকবার থাকতে বললেন। কিন্তু প্রাণেশা অনীহা জানালো। বলল, অন্য কোনো সময় এসে থাকবে।

এরপরে প্রাণেশাকে নিতে এলো ওদের ড্রাইভার। সাঈদ রেজা চৌধুরী, রাজিয়া বেগম আর সুবহা সবাই মিলে প্রাণেশাকে সাথে নিয়ে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। প্রাণেশা বারবার রাজিয়া বেগমের দিকে তাকাচ্ছিলো। তার উপরে এবং এই বাড়ির সবার প্রতিই ওর মায়া জন্মে গিয়েছে।
প্রাণেশা গাড়ির কাছে যাচ্ছে না। আশেপাশে তাকিয়ে সুবহার ভাইকে খুঁজছে। যাকে কোনোদিন দেখেনি, সে কেমন তাও জানে না তবুও তার মুখটা দেখার অস্থিরতা হচ্ছে। কিন্তু তার আসার নামগন্ধই নেই।
হঠাৎ বেশ শব্দ করে বাড়িতে ঢুকলো ৩ টা বাইক। সামনের বাইকেই স্নিগ্ধ। আর পেছনের দুটোতে ওর বন্ধুরা। স্নিগ্ধ ওই সময়ে গাড়ি রেখে বন্ধুদের কল দিয়ে আসতে বলেছিলো। আর ওর বন্ধুরা বাইক নিয়ে গিয়েছিলো বলেই এতো তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে পারলো। সুবহা প্রাণেশাকে একটু ধাক্কা দিয়ে বলল,
“আমার ভাইকে দেখতে চেয়েছিলি না। ওই যে এসেছে। সামনের টাই।”
লম্বা, ফর্সা গায়ের গরণ, পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট পড়া, যুবকটাই তাহলে স্নিগ্ধ। প্রাণেশা কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। আর কারো দিকে ওর নজর নেই।
স্নিগ্ধ ওর বন্ধুদের ভিতরে যেতে বলে, সাঈদ রেজা চৌধুরীর পাশে এসে দাড়ালো। সুবহা স্নিগ্ধকে বলল,
“ভাইয়া ও আমার বান্ধবী প্রাণেশা।”

স্নিগ্ধ কি বলবে ওর জানা নেই। এতদিনের ইচ্ছে ছিলো প্রাণেশাকে কোনো একটা বাহানায় সামনে থেকে দেখবে। আজ সামনাসামনি দুজনে দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধর ভিতরে থেকে কোনো আসছে না। বুকের ভিতরটা ধুকবুক করছে কাঙ্খিত মানুষটাকে দেখে।
স্নিগ্ধ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে হালকা করে হেসে প্রাণেশাকে বলল,
“ভালো আছো প্রাণেশা?”
প্রাণেশার ধ্যান ভাঙ্গলো ওর কথায়। মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হুমম। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো। তো তোমার কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
“না ভাইয়া।”

প্রাণেশার মস্তিষ্কে নানান রকম প্রশ্ন জাগছে। কিন্তু সবার সামনে এসব নিয়ে প্রশ্ন করাটা বোকামি হবে। তবে আলাদা করে যে কথা বলবে এখন তো সময় নেই। ওকে বাড়িতে ফিরতে হবে।
স্নিগ্ধর ডাক পড়তেই ও বাড়িতে ঢুকলো। এরপরে প্রাণেশা স্নিগ্ধর সাথে কথা বলার জন্য বাহানা দিয়ে রাজিয়া বেগমকে বলল,

“আমার ফোনটা মনে হয় ভিতরে, একটু দাঁড়ান নিয়ে আসছি।”
এই বলে প্রাণেশা একটু তাড়াতাড়িই ভিতরে ঢুকলো। স্নিগ্ধ ওর দুটো বন্ধুর গলা ধরে দাঁড়িয়ে হাসছে আর কেক খাচ্ছে। অবশ্য খুশি কিনা, পছন্দের মানুষটা এসেছে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here