Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৩

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৩

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৩
জেরিন আক্তার

স্নিগ্ধ প্রাণেশার সাথে কথা বলছিলো। তাই হামিমের নাম্বার থেকে আসা কলটা স্নিগ্ধ ইগনোর করলো। হামিম রাগে আর কলই দিলো না।
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল,
“ভাইয়া কি তারপর আপনার সাথে কথা বলেছিলো?”
“না। সময় যেতে যেতে নিজে থেকেই কথা বলবে চিন্তা করো না।”
প্রাণেশা বলল,
“কালকে শপিংয়ে যাবো। নাহলে পরে সময় পাবো না।”
“তুমি দুপুরের পরপর রেডি হয়ে থেকো আমি ভার্সিটি থেকে ফিরে এসে নিয়ে যাবো।”
“ঠিক আছে।”
“আচ্ছা প্রাণেশা তোমার ভাইকে বললে যাবে?”
“আমিই ভাইয়াকে বলবো, না করবে না।”
“ঠিক আছে।”
প্রাণেশা নরম গলায় বলল,

“ভাইয়ার সাথে আপনি কথা বলিয়েন। মনে হচ্ছে ভাইয়া অতটাও খুশি না। যতটা দেখাচ্ছে তা শুধু আমাকে খুশি রাখতে।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে বলল,
“আমার উপরে বিশ্বাস রাখো। একদিন তোমার ভাই নিজেই বলবে, স্নিগ্ধ তোমার সাথে আমি আমার বোনকে বিয়ে দিয়ে ভুল করিনি।”
“হুমম।”
কিছু কথা বলার পরে স্নিগ্ধ টাইম দেখলো রাত ১১ বাজে প্রায়। ও প্রাণেশাকে বলল,
“প্রাণ তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হলো।”
প্রাণেশা শয়তানি করে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়তে বলে কি আবার অন্য কারো সাথে কথা বলবেন নাকি?”
স্নিগ্ধ বাকা হেসে বলল,
“বলতেও তো পারি।”
“মানে? যদি দেখি কারো সাথে কথা বলছেন তাহলে আপনার খবর আছে।”
“কি করবে শুনি?”
“বিয়েতে না করে দিবো।”
স্নিগ্ধ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“ব্ল্যাকমেইল করছো জান?”
“হুমম, করছি।”
“আচ্ছা আপনি কি এর আগে কাউকে ভালোবাসতেন?”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে জেলাস ফিল করাতে বলল,
“না। তবে প্রেমের থেকে বিয়ের অনেক অফার পেয়েছি। কিন্তু কাউকে মনে ধরেনি। আমার খালাতো বোন রাইসা ওর সাথে বিয়ের কথাবার্তাও হচ্ছিলো, কিন্তু না করে দিয়েছি।”
প্রাণেশা কৌতূহল নিয়ে বলল,
“রাইসা নামের মেয়েটা কি সুন্দরী?”
“হুমম সুন্দরীই তো।”
“তাহলে আমি সুন্দরী না?”
স্নিগ্ধ তৎক্ষণাৎ বলল,
“না না, তুমিও ভালো, সুন্দরী।”
প্রাণেশা হেসে বলল,

“এখন ঠিক আছে। এরপরে আমাকে ছাড়া যদি কোনো মেয়েকে সুন্দরী বলতে শুনি আপনার খবর আছে।”
এদিকে রাত ১১ টার দিকে সুবহা কল দিলো সৌরভকে। অনেক কষ্টে নাম্বারটা জোগাড় করেছে। সেদিন হসপিটালে থেকে আসার পর থেকেই সুবহা সৌরভকে ভালোবেসে ফেলেছে। এই কথাটাও পেটে রাখতে পারছে না, ইচ্ছে করছে এখনই বলে দিতে।
সুবহা প্রথমবার কল দিতেই সৌরভ রিসিভ করে বলল,
“কে?”
“আমি সুবহা।”
“ওহ, তুমি আমার নাম্বার কোথায় পেলে?”
“পেয়েছি একটু কষ্টে। আচ্ছা একটা কথা বলবো?”
“হুমম।”
“আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এসব আবার কি কথা। যে জন্য কল দিয়েছো তা বলো, ঘুমাবো।”
সুবহা চোখ বন্ধ করে একদমে বলে দিলো,
“ভাইয়া আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনাকে ছাড়া কিছু চিন্তা করতে পারছি না।”
সৌরভ শক্ত কণ্ঠে বলল,
“এসব ফাইজলামি আমার পছন্দ না। রাত অনেক হয়েছে, রাখছি।”
বলে কলটা কেটে দিয়ে সুইচ অফ করে রাখলো। সৌরভ এটাকে ফাইজলামি ভেবে মাথা ঘামালো না।

দুপুরের পরপর সুবহা এলো খান বাড়িতে। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই সামনে পড়লো সৌরভ। ফোন স্ক্রল করতে করতে বের হচ্ছে। সুবহা সামনে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
“কেমন আছেন ভাইয়া?”
সৌরভ চোখ তুলে তাকিয়ে সুবহাকে দেখে বলল,
“হুমম ভালো। তুমি?”
“ভালো।”
“কোথাও যাচ্ছেন?”
“না।”
সুবহা সৌরভের সাথে কথা বলে উপরে চলে এলো। প্রাণেশা শাওয়ারে ঢুকতে গিয়ে সুবহাকে দেখে হেসে বলল,
“সুবহা একটু বস না, আমি এক্ষুনি আসছি।”
সুবহা হেসে বলল,
“সমস্যা নেই যা।”
প্রাণেশা শাওয়ারে ঢুকলো। সুবহা এই সুযোগে রুম থেকে বেরোলো। সিঁড়ির উপরের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সৌরভকে খুঁজছিলো। সৌরভ বাড়িতে ঢুকে উপরে এসে নিজের রুমে চলে এলো। সুবহা তার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো,

“ভাইয়া, আসবো। একটা কথা ছিলো।”
“এসো!”
“এখন কি করবেন?”
সৌরভ একটু অবাকই হলো। এই মেয়ে এতো প্রশ্ন করে কেনো? এখন উত্তর না দিলেও তো খারাপ দেখা যায়। তাই হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কিছুনা। তুমি যেনো কি বলতে এসেছো বলো!”
সুবহা সৌরভের সামনে এসে শুকনো ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করে বলে উঠল,
“সেদিনের হসপিটালে থেকে আসার পরে আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
সৌরভ ঠান্ডা স্বরে বলল,
“দেখো প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ফাইজলামি করা একদম পছন্দ না আমার। প্রথম বলেছো কিছু মনে করিনি এখনও বলছো তাও কিছু বললাম না, নেক্সট টাইমে এসব কথা বলতে এসো না।”
সুবহা সৌরভের হাত ধরে বলল,
-“মজা করছি না। আমি সিরিয়াস। অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।”
ব্যাস, সুবহার গালে ঠাস করে থাপ্পড় মারলো সৌরভ। সুবহা গালে হাত দিয়ে মুখটা শুকনো করে তাকিয়ে রইলো।
সৌরভ হাত ঝাড়া দিয়ে তির্যক কণ্ঠে বলল,
“সামনে একটা অনুষ্ঠান সেটা মাথায় নিয়ে অন্তত এসব চিন্তা বাদ দাও। অনুরোধ রইলো, আমার সাথে আর কথা বলো না তুমি।”
সুবহা মাথা নত করে ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। সৌরভ পাশ থেকে টাওয়ালটা নিয়ে গট গট করে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
ঘটনাটা দুজনের মধ্যে ঘটলেও আরশাদ খান দরজার বাহিরে থেকে ঠিকই দেখেছেন। তিনি চলে গেলেন। সুবহাও চোখ মুছে নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে রুম থেকে বেরোলো।
এরপরে প্রাণেশার রুমে এসে বসলো। প্রাণেশা শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে এসে বলল,

“কিরে, এখন বল কেমন আছিস?”
“ভালো।”
“মন খারাপ নাকি?”
“না।”
প্রাণেশা আর প্রশ্ন করলো না। রেডি হওয়া শুরু করলো। রোকেয়া বেগম এসে সুবহাকে নাস্তা পানি দিয়ে গেলেন।
দুজনই বের হলো, বিয়ের শপিংয়ে যাবে। স্নিগ্ধ গাড়ি নিয়ে এলো। এরপরে তিনজনে এক হয়ে চলে গেলো। সৌরভ পরে যাবে।
স্নিগ্ধ শপিং মলের পার্কিং জোনে এসে গাড়ি পার্ক করলো। প্রাণেশা আর সুবহা আগে গাড়িতে থেকে নেমে একটু এগিয়ে এলো। স্নিগ্ধ ৩-৪ কদম পেছনে। হুট্ করে প্রাণেশাকে দেখে একটা ছেলে বলে উঠল,
“ম্যাডাম নাম্বারটা কি পাওয়া যাবে?”
প্রাণেশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কেনো কি হবে নাম্বার দিয়ে?”
পাশ থেকে আরেকটা ছেলে বলল,
“একটু কথা বলতাম। প্রেম হলেও হতে পারে সমস্যা কি?”
স্নিগ্ধ হুড়মুড়িয়ে এসে ছেলেটার কলার চেপে ধরে বলল,
“কি বলছিলি? বল!”
ছেলেটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“ইয়ে মানে!”

স্নিগ্ধ ইচ্ছে মতো ছেলেটাকে থাপড়াতে শুরু করলো। পাশের ছেলেটা এগিয়ে আসতে নিলে স্নিগ্ধ ওকে ঘুষি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। এরপরে ওই ছেলেকে মারতে শুরু করলো। স্নিগ্ধর রাগ এখন চরম পর্যায়ে।
প্রাণেশা, সুবহা এগিয়ে এসে স্নিগ্ধকে থামাতে চাইলে পারে না। অনেক কষ্টে স্নিগ্ধর হাতটা ধরে ছাড়িয়ে আনলো। ছেলেটা দৌড়ে চলে গেলো। স্নিগ্ধ ওর পিছু নিতে চাইলে প্রাণেশা স্নিগ্ধর হাত ধরে মুখোমুখি এনে বলল,
“থাক না। থামুন এবার।”
স্নিগ্ধ রাগী কণ্ঠে আওড়ালো,
“তুমি সরো ওকে আজ মেরেই ফেলবো ওর সাহস কত বড় ও তোমাকে বলে প্রেম করবে। দেখি ওর কলিজা কত বড়।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে ধরে বলল,
“ওরা চলে গিয়েছে আর কিছু বলতে হবে না।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার হাত ধরে বড় বড় শ্বাস ছাড়লো। রাগে মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছে। পর মুহূর্তে সৌরভ এসেছে। স্নিগ্ধ সৌরভকে জানালো না এসব নিয়ে।
বিয়ের ৪ দিন আগেই প্রাণেশার একমাত্র ফুফু নাহার বেগম, তার স্বামী আনোয়ার হোসেন ও তাঁদের একমাত্র মেয়ে ইভা এলো খান বাড়িতে। ইভা আর প্রাণেশার অনেক দিন পরে দেখা হওয়ায় দুজনেই খুশি। দুজনই সমবয়সী। বন্ডিংও ভালো।
গায়ে হলুদের দিনের প্রাণেশাকে হলুদ ছোঁয়াতে স্নিগ্ধর বাড়ি থেকে লোক এলো। ওদের সাথে সুবহাও এসেছে। এসেই সৌরভের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইভাকে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে জেলাস হলো। ইভাও সৌরভকে পছন্দ করে। কিন্তু ও বলেনি।

এদিকে সুবহা শুধু তাকিয়েই আছে। বুক ফেটে কান্না চলে আসছে। নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের সাথে কথা বলতে দেখে মোটেও কেউ স্বাভাবিক থাকবে না। কিন্তু সৌরভ আবার ইভাকে ভালোবাসে না।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটা প্রাণেশাদের বাড়ির বাগানেই হচ্ছে। স্নিগ্ধদের বাড়ির সবাই চলে গিয়েছে। রাত তখন ১০ টা, তখনি খান বাড়ির সবাই খাওয়া-দাওয়া করতে ওইদিকে প্যান্ডেলে গিয়েছে। প্রাণেশা আর একটা মেয়ে বসে আছে স্টেজে। তখন প্রাণেশার ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এলো।
—প্রাণেশা, তুমি একটু তোমাদের বাড়ির পেছনের দিকটায় আসবে। কথা আছে।
প্রাণেশা অবাক হয়ে লিখলো,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১২

—কে আপনি?
—কে আবার তোমার হবু বর। স্নিগ্ধ। আসলে মোবাইলে চার্জ নেই তাই অন্য একজনের ফোন দিয়ে মেসেজ দিলাম। এখন এসো।
প্রাণেশা কোনোকিছু চিন্তা না করে সম্মতি জানিয়ে উঠে একা চলে গেলো বাড়ির পেছনের দিকটায়। এও ভাবলো না যে ওইটা আদৌ স্নিগ্ধ নাকি অন্য কেউ মেসেজ দিয়েছে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here