তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৫
আশফিয়া হিয়া
রুদ্ধ আরুর এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। আরু একবার রুদ্ধর ধরে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধর মুখের দিকে দৃষ্টি আনতেই দেখল রুদ্ধও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেই চোখে আরু নিজের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান, রাগ, অভিমান দেখতে পায়। সেই চোখ আজ অন্য কোনো ইশারা করছে হয়তো বা কিছুর অনুমতি চাইছে, আরু চোখ বন্ধ করে তাতে সম্মতি জানাল। এই মানুষটাকে সে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। ভবিষ্যৎ এ কোনো বিষয় ভাবতে গেলেও সে রুদ্ধ ছাড়া কাউকে কল্পনায়ও আনতে পারে না। তার বহু বান্ধবীরা প্রেম করছে, নানা সম্পর্কে জড়াচ্ছে,তবে আরু কখনো সেসব ভাবতেই পারেনি তার ধ্যান – জ্ঞান শুধুমাএ রুদ্ধই ছিল। তার বিশ্বাস ছিল রুদ্ধও তাকে ভালোবাসে, যার প্রমাণ সে বহুবার পেয়েছে এবং পাচ্ছে। বাড়ির সকলের অবাক দৃষ্টি তাদের দিকেই নিবদ্ধ । আসলাম শেখও হতবাক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন । তিনি ভাবতে পারেননি ছেলে সকলের সামনে সরাসরি আরুর হাত চেপে ধরবে । আসলাম শেখ গম্ভরী স্বরে বললেন,
– ” কি ব্যাপার তুমি ওর হাত এভাবে ধরে রেখেছো কেনো? ওর হাত ছাড়ো।”
রুদ্ধও গম্ভীর স্বরে বলল,
– ” কেনো ধরেছি সেটা তুমি খুব ভালো ভাবেই জানো বাবা। আজ বাড়ির সবার সামনে একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই।”
সবার উৎসুক দৃষ্টি রুদ্ধ দিকেই নিবদ্ধ, রুদ্ধর কথাটা শোনার জন্য যেন অপেক্ষায় আছে তারা। রুদ্ধ আরুর হাত আরোও একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
– ” এই বাড়িতে আমার বিয়ের কোনো প্রস্তাব আসবে না, আমার বউ আমি নিজেই ঠিক করে রেখেছি, এবং আমি তাকেই বিয়ে করবো।”
আজাদ শেখের মুখে হাসির রেখা দিল। সে হাহাহা করে হেসে বললেন,
– “এটা তো ভালো কথা নিজের বউ নিজেই ঠিক করে রেখেছিস, তা কে সেই মেয়ে শুনি?”
আসলাম শেখ ভাইয়ের দিকে কটকট করে তাকিয়ে বললেন,
– ” তুমি চুপ কর, যেটা জানো না সেটা নিয়ে কথা বলবে না।”
আজাদ শেখের মুখটা চুপসে গেল। রুমা বেগম বললেন,
– ” কেনো চুপ করবে, ও তো ভালো কথাই বলেছে, ছেলেটাকে কথাটা শেষ করতে দাও।”
আসলাম শেখ ধমকে উঠলেন এবার, তিনি চাচ্ছেন না রুদ্ধ আরুর নামটা সকলের সামনে বলে দিক।
– ” তোমার জন্যই ছেলেটার এই অবস্থা হয়েছে, কতটা অসভ্য, বেয়ারা হয়ে গেছে আমি ভাবতেই পারছি না।”
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” আমি এখানে অসভ্যতামির কি করেছি বাবা? আমি তো কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে আসিনি।”
আসলাম শেখ হতাশার শ্বাস ফেলল, এই ছেলের সাথে কথা বলে কোনো লাভ আছে? মুখের ওপর তর্ক করেই যাচ্ছে। মিতা বেগম রুদ্ধকে বললেন,
– ” তুই কি কাউকে ভালোবাসিস বাবা?”
রুদ্ধ মুখে জবাব দিল না, মিতা বেগমের দিকে তাকিয়ে ওপর নিচ মাথা দোলাল। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
– ” আমি বিয়ে করলে একমাএ আরুকেই বিয়ে করবো, নয়তো এ বাড়িতে কোনো বিয়ে হবে না।” রুদ্ধর কথায় বাড়িতে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটল। আরু তৎক্ষনাৎ নিজের চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে। মিতা বেগম মুখে শাড়ির আচঁল চেপে ধরলেন। সুমিতা বেগমের চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল। রুমা বেগমের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রয়েছে, তিনি আগে থেকেই সবটা জানতেন। আসলাম শেখ মুখটা থমথমে করে সোফায় গিয়ে বসে পড়লেন। আজাদ শেখের মুখ ভঙ্গি বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে যেন সে অবাকই হননি বিষয়টিতে। আজাদ শেখ আরু ও রুদ্ধর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের হাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে গলার স্বর গম্ভীর রেখে আরুকে বললেন,
– ” তুমিও রুদ্ধকে বিয়ে করতে চাও?”
আজাদ শেখের গম্ভীর মুখখানা দেখে আরু কিছুটা ভীত হলো। তার বাবা ভীষণ শান্তশিষ্ট ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। খুব সহজেই তিনি রেগে যান না। বড় চাচ্চু যেখানে অল্পতেই রেগে যান সেইদিন দিয়ে তার বাবা ভীষণ ঠান্ডা মাথার মানুষ। তবুও আজ বাবার সামনে এই প্রশ্নের জবাব দিতে তার ভীষণ লজ্জা ও অস্থত্বিবোধ হচ্ছে। আরুকে চুপ করে থাকতে দেখে রুদ্ধর আজ ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে এক অজানা ভয় তাকে আষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। রুদ্ধ আরুর হাতের বাঁধন আগলা করতে নিলে আরু শক্ত করে সেই হাত চেপে ধরল। লম্বা শ্বাস ফেলে বাবার দিকে তাকিয়ে উপর – নিচে মাথা দোলাল। আজাদ শেখ বললেন,
– ” মুখে বলল।”
– ” হ্যাঁ। ”
আজাদ শেখ দুজনের দিকে গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শব্দ করে হেসে দিলেন। রুদ্ধ ও আরু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে আজাদ শেখের এমন প্রতিক্রিয়া তারা একদমই আশা করেনি। রুদ্ধ আরুর হাত ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিল ভাবে দাঁড়াল। আসলাম শেখ আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকাতেই তিনি বড় ভাইয়ের পাশে বসে বললেন,
– ” আপনি সবটা আগে থেকেই জানতেন তাই না ভাইজান?”
আসলাম শেখ মাথা নিচু করে বললেন,
– ” হ্যাঁ। ”
– ” এটা তো খুশির খবর ভাইজান তাহলে আপনি অমত করছেন কেনো?”
আসলাম শেখ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
– ” তুমি খুশি হয়েছো এই সম্পর্কে?
– ” হ্যাঁ খুশি কেনো হবো না বলুন তো? আমার মেয়েটা সারাজীবন আমার কাছে থাকবে, এই বাড়িতে এরচেয়ে খুশি আমার জন্য কি হতে পারে। মেয়েরা বড়রা হচ্ছে এক সময় তারা পরের ঘরে যাবে আমার মেয়েদের আমি চাইলেও তেমনভাবে কাছে পাব না এসব ভেবে কতরাত আমি নিশব্দে চোখের পানি ফেলেছি আপনাকে বোঝাতে পারব না। তাছাড়া আমাদের রুদ্ধর মতো ছেলেকে জামাই হিসেবে পাওয়াটা তো আমার ভাগ্যের ব্যাপার। আপনি অমত কেনো করছেন ভাইজান আরুকে কি আপনার ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ নয়?”
বাবার কথা শুনে আরুর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। সত্যিই তো রুদ্ধকে ভালো না বাসলে একদিন না একদিন তো তাকে এই বাড়ি ছেড়ে যেতেই হত। বুঝ হওয়ার পর থেকেই তার ধ্যান – জ্ঞান সবটা জুড়েই শুধুমাএ রুদ্ধ ছিল তাই এসব তার কখনো ভাবনাতেই আসে নি।
আসলাম শেখ বললেন,
– ” না না কি বলছো এইসব, আরু আমার মেয়ে তাকে আমার অপছন্দ কেনো হবে? আরুর জন্য তোমাদের অন্য পছন্দ থাক থাকতে পারে এইসব ভেবেই তো আমি….
– ” এসব নিয়ে আপনার এত ভাবনা – চিন্তা করতে হবে না ভাইজান রুদ্ধকেই আমার মেয়ের জামাই হিসেবে পছন্দ। আপনি আর অমত করবেন না। এরপর মিতা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– ” কি মিতা তোমার কোনো আপওি আছে?”
মিতা বেগম হেসে বললে,
– ” আমার এমন ফাজিল মেয়ের জন্য এমন সোনারটুকরো জামাই পাচ্ছি এই তো আমার সৌভাগ্য।”
রুমা বেগম বললেন,
– ” কিসের ফাজিল মেয়ে শুনি?” তিনি আরুকে হাত ধরে টেনে তাদের সামনে নিয়ে এলেন আরুর থুতনি ধরে বললেন,
– ” আমাদের আরু ভীষণ লক্ষি মেয়ে, আমার কত কাজ করে দেয় মেয়েটা।”
ইয়াজ বলল,
– ” কেনো তোমার কাজ করে দেয় সেটা এখনো বুঝলে না বড় মা, আরেএ আগে থেকে শাশুড়ি পটাতে হবে না এই জন্য।”
বাড়ির সকলে একযোগে হেসে উঠল তার কথা শুনে। আরু চোখ রাঙিয়ে ইয়াজের দিকে তাকাল। আসলাম শেখ বললেন,
– ” তোমরা সবাই যখন রাজি হয়েই গিয়েছো, আমি বিয়ের কাজটা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে চাইছি। রুহানির বিয়েটাও তো এবার দিতে হবে ফারিশ ছেলেটা আর কতকাল অপেক্ষা করে থাকবে।”
সকলেই একমত হলেন। আরু লজ্জা পেয়ে এক পলক রুদ্ধর দিকে তাকাল। রুদ্ধ আরুকে তাকাতে দেখে এক চোখ মারল আরু থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নিল। আজাদ শেখ বললেন,
– ” তাহলে আগামী মাসে একটা তারিখ ঠিক করি ভাইজান।বিয়েটা তো বাড়ির ছেলে – মেয়ের হচ্ছে কাজও দ্বিগুণ। এই মাসেই কাজগুলো গুছিয়ে ফেলতে হবে।”
– ” ঠিক আছে যা ভালো মনে হয় তাই করো। তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
রুমা বেগম বললেন,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৪
– ” তোমার আবার কিসের শর্ত রয়েছে?”
– ” যতদিন না ওদের বিয়ে হবে আরু নিচের ঘরে থাকবে।”
কথাটা শুনে আরু ও রুদ্ধ একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। দুজনের মুখটাই চুপসে গেল। তবে কেউই কিছু বলল না।
