Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৬

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৬

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৬
আশফিয়া হিয়া

আরু নিচের ঘরে শিফট হয়েছে আজ সাতদিন হলো । এর মাঝে রুদ্ধর সাথে তার আলাদা করে কোনো যোগাযোগ হয়নি। আগে কারণে অকারণে সে রুদ্ধর রুমে ছুটে যেতে পেরেছে। তবে বাড়িতে এখন বেশ কড়াকড়িতে রাখা হচ্ছে তাদের। আসলাম শেখে কড়া নির্দেশ বিয়ের আগে ছেলে মেয়ের একসাথে কোনো কথা নেই যা হবে সব বিয়ের পর। আরুর সাথে রুদ্ধর দেখা করার একমাএ মাধ্যম খাবার ঘর। যখন সবাই একসাথে খাবার খেতে বসে তখনই তাদের একবার দুবার চোখাচোখি হয় তাও সেটা রাতে। এই বাড়িতে রাত ছাড়া সবাইকে একএে ড্রাইনিং টেবিলে পাওয়াও যায় না। আগের আরু হলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে রুদ্ধর জন্য অপেক্ষা করে থাকত কখন মানুষটার সাথে দেখা হবে তার, তবে সকলের সামনে অসস্তি ও লজ্জার কারণে সেটাও পারে না সে।

এখন বিকেল চারটা বাজে রুদ্ধ আজ অফিস থেকে দ্রুত বাড়ি চলে এসেছে। বাড়িটা আপাতত নিরব হয়ে রয়েছে । দুপুরের খাবার খেয়ে যে যার ঘরে বিশ্রাম করছে। রুদ্ধর কাছে গেটের চাবি সবসময় থাকে সেটা দিয়ে সে ভেতরে এল। নিজের ঘরে যেতে নিয়েও কি মনে করে আবার উল্টো ঘুরে আরুর দরজায় টোকা দিল। আরু বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইল দেখছিল। দরজায় মৃদ্যু টোকা পড়তেই আর ভেতরটা ধ্বক করে উঠল এভাবে দরজায় টোকা তো রুদ্ধ ভাই ছাড়া কেউ দেন না। সে ছটফটে ভঙ্গিতে গায়ে ওড়না জড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। সাতদিন পর আরুর মুখটা ভালো করে দেখতে পেরে রুদ্ধ তৃষ্ণার্তের মতো চেয়ে রইল। রুদ্ধ আরুকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা চাপিয়ে দিল। আরুকে বেডে বসতে ইশারা করল আরুও তার ইশারা অনুযায়ী বেড এ গিয়ে বসল। বাইরে প্রচুর রোদের তাপ, রুদ্ধর চুলগুলো হালকা ঘামে লেপ্টে আছে, কপাল থেকেও কিছু ঘাম চুইয়ে পড়ছিল। আরু চিন্তুিত হয়ে বলল,

– ” এত ঘেমে গেছেন কি করে গাড়িতে আসেননি। বলেই সে রুদ্ধর উওরের অপেক্ষাও করল না নিজের ওড়না দিয়ে আরুর ঘাম মুছিয়ে দিল।
– ” বাইকে এসেছি।”
আরু খুব যত্ন নিয়ে রুদ্ধর মুখের ঘামটুকু মুছিয়ে দিচ্ছিল,
রুদ্ধ তখন এক ধ্যানে আরুর ছোট মুখটার দিকে চেয়ে আছে। এই ছোট মেয়েটা কিছুদিন পর তার বউ হবে। তাকে এক নজর দেখার জন্য তার মনটা ছটফট করে সেই মেয়েটাই আর কিছুদিন পর তার ঘরের রাণী হয়ে আসবে। কথাটা ভাবতেই রুদ্ধর মুখে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল। আরু হাত থামিয়ে বলল,
– ” কি হয়েছে! হাসছেন কেনো?”
– ” দেখছি।”
– ” কি দেখছেন?’
– ‘ সেদিনের সেই পিচ্চি মেয়েটা যে কথায় কথায় ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদত অবশ্য এখনও সেটায় করে , সেই মেয়েটা কিছুদিন পর আমার বউ হবে, আমার বাচ্চাদের মা হবে।”

আরু কথাটা শুনে লজ্জা পেল খুব। মুখ লুকাতে মাথা নিচু করে রাখল। রুদ্ধ তার থুতনি ধরে মুখ উঁচু করল। আরুর মুখে ফুঁ দিতেই আরু চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে আরুর কপাল থেকে সাইড করতে করতে ঠোঁটের কাছে গিয়ে থামল।ঠোঁটে আলতো হাতে সাইড করে বলল,
,- ” আর মাএ কিছুদিন এরপরে তুই সম্পূর্ণ রুপে আমার হবি।”
তৎক্ষনাৎ আরুর বিরবির করে বলা শব্দ তার কানে পৌছাল,
– ” আমি তো আপনারই।”
রুদ্ধ নিশব্দে হেসে ফেলল। তবে আরুকে বুঝতে দিল না কিছুই।

আহির স্কুলে কিছু অ্যাসাইমেন্ট দিয়েছে। অ্যাসাইনমেন্ট সে হাতেই লিখেছে শুধু ওপরের কভার পেইজটা কম্পিউটারে টাইপ করে পিন্ট করতে হবে। তাই সে ইয়াজের রুমে এল। এই বাড়িতে ইয়াজের রুমেই এসব রয়েছে। ইয়াজের প্রয়োজনীয় কাজসহ বাড়ির সবার কাগজপএ সব সেই বের করে দেয়।ইয়াজের ঘরের দরজাটা হা করে খোলা। ইয়াজ কম্পিউটারে কি সব ইংরেজীতে লিখছে। আহি ভেংচি কাটল একটা এমনভাবে ইংরেজী লিখছে যেন সে কতটা পটু অথচ আহি নিজেই তো ঠিক মতো এখনো ইংরেজীটা শিখতেই পারল না। বলতে গেলেই থতমত খেয়ে যায় । আহি ইয়াজের দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
– ” আসবো?”
ওপাশ থেকে ইয়াজের কোনো জবাব নেই সে নিজের কাজে ব্যস্ত। আহি আবারও টোকা দিল, এবারোও ইয়াজের সারাশব্দ না পেলে সে রেগে মেগে ঘরে ডুকে গেল। ইয়াজের সামনে কোমরে দুহাত রেখে বলল,
– ” আমি তোমাকে ডাকছি তুমি শুনতে পারছো না?”
– ” না।”
আহি তার পিঠে এক কিল দিয়ে বলল,

– ” শুনতে না পেলে জবাব দিলে কি করে?”
ইয়াজ তার হাত টেনে ধরে বলল,
– ” হাত খুব লম্বা হয়ে যাচ্ছে তাই না? যখন তখন আমার গায়ে উঠে যাচ্ছে।”
আহি ভীত স্বরে বলল,
– ” ছাড়ো আমি একটা জরুরি কাজে এসেছি।”
– ” কি কাজ?”
আহি হাতের কাগজ দেখিয়ে বলল,
– ” এই লেখাগুলো টাইপ করে প্রিন্ট করে দাও।”
– ” এখন হবে না আমি জরুরি কাজ করছি, রেখে যা পরে করে দিচ্ছি।”
আহি তার পাশের চেয়ার টেনে বসে বলল,
– ” কি এমন কাজ করছো শুনি?”
– ” ইতালি যাওয়ার কিছু প্র‍্য়োজনীয় ডকুমেন্টস রেডি করছি।”

আহির মুখটা চুপসে গেল।চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল ইয়াজ চলে যাবে বিষয়টা সে একদম মেনে নিতেই পারছে না। কথাটা ভাবলেই তার কান্না পেয়ে যায়। আহি মাথাটা নিচু করে রাখল যাতে ইয়াজ সেটা দেখতে না পায়। ইয়াজ ব্যস্ত হাতে টাইপ করছিল আহিকে চুপ করে থাকতে দেখে তার দিকে তাকাল। নিজের কাজ থামিয়ে চেয়ার নিয়ে সম্পূর্ণ আহির দিকে ঘুরে বসল। আহির ছোট মুখটা নিজের দু হাতের আজলায় এনে কন্ঠে খুব স্নেহ ঢেলে বলল,
– ” মন খারাপ হয়েছে?”
আহির চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল। ইয়াজ মন দিয়ে দেখল সেই দৃশ্য। পিচ্চিটা যখন কান্না করে দেখতে বেশ কিউট লাগে না? মন চাই গালগুলো ইচ্ছে মতো টিপে দেউ। আহি এক হাতে চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলল,

– ” তুমি সত্যি চলে যাবে?”
– ” হুহ।”
– ” তোমার মন খারাপ হবে না?”
– ” মন খারাপ তো হবেই সবাইকে মিস করবো খুব। তবে নিজের ফিউচারের কথা ভেবে তো যেতেই হবে। পাঁচটা বছর চোখের পলকে কেটে যাবে। ”
– ” ওখানে গেলে তোমার অনেক বন্ধুবান্ধব হবে তাই না? অনেক মেয়ে বন্ধুও হবে নিশ্চয়?”
– ” হ্যাঁ আমার মত হ্যান্ডসাম ছেলের অনেক মেয়ে বন্ধু থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
আহি ভেংচি কেটে বলল,
– ” অনেক গার্লফেন্ডও হতে পারে তাই না?”
ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,
– ” হতেই পারে।”

আহি চোখ রাঙাল। মেয়েটার চোখ ভর্তি পানি, নাকের ডগা লাল হয়ে আছে। সেই অবস্থায় চোখ রাঙানোর দৃশ্যটা ইয়াজের চোখে আহিকে বিষণ সুন্দর দেখাল। আহি নাক ফুলিয়ে বলল,
– ” হ্যাঁ এটা তো স্বাভাবিকই যেমন আমারও অনেক বয়ফেন্ড হবে।”
তৎক্ষনাৎ ইয়াজ তার হাত শক্ত করে চেপে রাগে হিসহিসিয়ে বলল,
– মে*রে ফেলবো একদম।”
আহি বিরবির করে বলল,
– ” নিজে বললে কিছু না আমি বললেই দোষ, যত দোষ এই আহি ঘোষের। ”
ইয়াজ আজ তার বিরবির করে বলা কথাগুলো শুনেও কান দিল না। সে অনেক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
– ” তুই আমার জন্য অপেক্ষা করবি তো?”
আহি বুঝেও না বুঝার ভান করে বলল,

– ” কেনো?”
– ” জানিস না?”
– ” কখনো জানতে দিয়েছো যে জানবো?”
– ” ঠিক আছে এখন জানতে হবে না পাঁচ বছর পর আমি ফিরে এলেই না হয় জানতে পারবি?”
– ” পাঁচবছর পর এলে কি হবে?”
– ” ভাইয়ার বাচ্চার চাচ্চু আর আরুর বাচ্চার মামা হব হয়েছে?”
আহি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
– ” কি বলছো!’
– ” তোর কি মনে হয় এই পাঁচ বছরে ভাইয়া আরুকে বুঝি ছাড়বে ততদিনে তো ও দু তিন বাচ্চার মা হয়েই যাবে। আগে মামা চাচ্চু হয়ে নিই তারপর নাহয় বাবা হওয়া যাবে কি বলিস?”
আহি বিরক্তিতে উঠে দাঁড়াল। ইচ্ছে করছে এর চুল টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলতে সব। সে শুনতে চাইল কি আর বললটাকি ফাজিলটা। না বললে নেই সেও শুনতে আসবে না। তার বয়েই গেছে পাঁচ বছর ওর জন্য অপেক্ষা করতে। সে রাগে গটগট করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার তালে দরজা দেয়ালের সাথে বারি খেল। ইয়াজ শব্দ করে ফেলল। হঠাৎ হাসতে হাসতেই চুপ হয়ে গেল সে। এই বাড়ি, তার আপন মানুষজনগুলো রেখে সে ঔই দূর দেশে কি করে থাকবে। এই পিচ্চিটার রা*গ, অভিমান, ঝ*গড়া, মা*রপিঠ সবটা সে ভীষণ মিস করবে।

শেখ বাড়ির আনাচে – কানাচে উৎসবের আমেজ বাড়ির ছেলে – মেয়ের বিয়ে বলে কথা। কাজ সব দ্বিগুণ হয়ে গেছে এখন। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির গৃন্নীরা আরু ও রুদ্ধর বিয়ের কেনা – কাটা করে বাড়িতে ফিরেছেন। ড্রয়িং রুমে সেসব দেখতেই ব্যস্ত সকলে। আহি ও রুহানি মিলে আরুকে টেনে নিচে নিয়ে এল সে আসতে চাইছিল না তার নাকি লজ্জা লাগছে ভীষণ। আরুকে দেখে রুমা বেগম তার পাশে এসে বসতে বললেন। আরু বিনা বাক্যে বড় মায়ের পাশে গিয়ে বসল। রুমা বেগম একটা প্যাকেট থেকে বিয়ের জন্য আনা ডার্ক মেরুন রঙের শাড়িটা বের করে আরুর গায়ে মেলে ধরলেন। পুরো শাড়িটাই ভীষণ সুন্দর দেখে সবারই চোখ জোড়া জুড়িয়ে গেল। আরুর ফর্সা শরীরে শাড়িখানা যেন আরো ফুটে উঠেছে। রুমা বেগম বললেন,

– ” মাশাল্লাহ আমার ছেলের পছন্দ আছে বলতে হবে, সে ঠিক জানে তার বউকে কোন শাড়িতে মানাবে।”
মিতা বেগম মুচকি হাসলেন। সে ভাবতেও পারেনি তার আদরের মেয়েটার কপালে এত সুখ হবে। এত ভালো শ্বশুর – শাশুড়ি, রুদ্ধর মতো বর পাবে তার মেয়েটা। তাছাড়া মেয়েটা আর চোখের সামনেই থাকবে সারাজীবন এর থেকে আনন্দের আর কি হতে পারে। রুহানি বলল,
– ” ভাইয়া তোমাদের সাথে কখন গেল মা?”
– ” রুদ্ধ যায়নি তো, তবে আমাকে বার বার করে বলে দিয়েছে আরুর জন্য যেন ডার্ক মেরুন রঙেরই শাড়ি কেনা হয়। সেই হিসেবেই আমরা কিনেছি।’
রুহানি আরুর কাঁধে ধাক্কা দিয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
– ” বাব্বাহ কি প্রেম।”

বড়রা উঠে যেতেই আহিও আরুর পাশে বসল। আরুকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
– ” কোথায় ভাবলাম বিয়ে করে এই বাড়ি থেকে বিদায় হবে ওর সব জিনিসপএ রুম আমি আমার দখলে নেব সেটা আর হচ্ছে না। এখন তো দেখছি সারা জীবনই এই বাড়িতে থাকবে।”
রুহানি শব্দ করে হাসল। আরু তার কান টেনে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৫

– ” তুই কিছুদিন পর এই বাড়ি থেকে বিদায় হবি, আর আমি সারাজীবন এই বাড়িতেই থাকব হুহ্।”
আহিও ভাব নিয়ে বলল,
– ” আমিও সারাজীবন এই বাড়িতেই থাকব। কথাখানা বলে নিজেই থমকে গেল। আসলেই কি সে এই বাড়িতেই থাকতে পারবে৷ আরু রুহানি অতকিছু ধরল না। ওরা ভাবল আহি সবসময়ের মতো মজা করে বলেছে।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here