Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪২

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪২

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪২
আশফিয়া হিয়া

সূর্যের তাপ কমে এসেছে, আকাশে মেঘগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে হয়তো বা বৃষ্টি নামবে। আরু নিজের ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে৷ নাস্তা খাওয়ার পরপরই রুদ্ধ তাকে প্রয়োজনীয় ঔষুধ খাইয়ে দিয়েছে৷ এখন সে বন্ধুদের নিয়ে বাইরে গেছে। আরু চোখ দুটো বন্ধ করে আছে তবে ঘুমায়নি। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ জরিয়ে ধরায় মেয়েটার চেতনা ফিরল। প্রিয় পুরুষের ঘ্রাণ ও স্পর্শ চিনতে তার একটুও বিলম্ব হয়নি। রুদ্ধ তাকে নিজের সাথে একেবারে চেপে ধরেই পেছন থেকে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে৷ আরু কিছুটা কেঁপে উঠল। রুদ্ধ তার কানে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

– ‘ এখনো কাঁপা-কাঁপি দূর করতে পারিনি?’
– ‘ অভ্যাস হয়ে যাবে। আরু এবার রুদ্ধর দিকে ঘুরে
বলল,
– ‘ চাচ্চু তখন আমাদের ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বলছিল না? চলুন না আমরা কোথাও একটা যাই?’
রুদ্ধ তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
– ‘ কোথায় যেতে চাচ্ছিস?’
– ‘ আপাতত কক্সবাজারে যাই?’
– ‘ ওকে।’
– ‘ হু তবে সবাই মিলে গেলে খুব মজা হবে তাই না? রুহা আপু আহি ইয়াজ আপনি আমি। চলুন না সবাই একসাথে যাই?’
রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ‘ হানিমুনে ভাই বোনদের নিয়ে যায় কখনো শুনেছিস?’
আরু থতমত খেয়ে বলল,

– ‘ আরেএ আমি তো ঘুরতে যাবার কথা বলছি, ইয়াজ তো কিছুদিন পর চলেই যাবে চাইলেও এভাবে সবাই একসাথে হতে পারব না। তাছাড়া ফারিশ ভাইয়ার সাথে রুহানি আপুর বিয়েটাও কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যাবে, তখন চাইলেও আপু আমাদের সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাতে পারবে না। তাই তো বলছিলাম, আপনি সাদমান, তুষার আর ফারিশ ভাইয়াকেও বলুন না আমাদের সাথে যেতে তাহলে তো আরও অনেক বেশি মজা হবে তাই না?’কথাগুলো এক নাগাড়ে গড়গড় করে বলে ফেলল। শেষের কথাগুলো বলার সময় আরুর মুখ খুবই উচ্ছাসিত দেখাল। রুদ্ধ সেই মুখ দেখে না বলার সাহস পেল না। তাছাড়া একদিকে ঠিকই আছে সকলে মিলে গেলে তাদের এই যাএা আরোও বেশি আনন্দের হবে। রুদ্ধ সম্মতি দিল। আরু খুশি হয়ে রুদ্ধকে দু হাতে জাপটে ধরল। রুদ্ধও তাকে দু হাতে আগলে নিল। কামিজ ভেদ করে পেটে হাত বুলিয়ে বলল,

– ‘ পেট ভরে খেয়েছিস?’
আরু কেঁপে উঠে বলল,
– ‘ হুম।’
– ‘ শাওয়ার নিয়েছিস?’
– ‘ সকালেই তো নিলাম, এখন আবার শুধু শুধু শাওয়ার নিতে যাব কেনো?’
– ‘ তাহলে শাওয়ার নেওয়ার ব্যবস্থা করি?’
রুদ্ধর ইঙ্গিত বুঝতে পেরেই আরু চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলল। তৎক্ষনাত রুদ্ধকে নিজের থেকে ঠেলে সরিয়ে পালিয়ে যেতে চাইল। তবে রুদ্ধর শক্তির সাথে কি মেয়েটা পেরে উঠে। রুদ্ধ আরুকে টেনে বেডে ফেলে দিল। নিজের ওপর রুদ্ধর অস্বিত্ব টের পেতেই আরু চোখ বন্ধ করে নিল। কিছুক্ষণ বাদেই তার গলায় ঠোঁটের স্পর্শ পেল। ধীরে ধীরে স্পর্শ গুলো তার সম্পূর্ণ শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। আরু আবেশে চোখ জোড়া বন্ধ করে নিয়েছে।

ঘড়িতে এখন সন্ধ্যা সাতটা। আরু ও রুদ্ধর বিয়ে উপলক্ষে সকলেই বাড়িতেই আছে। শুধু আত্মীয় – স্বজনরা যে যার মতো চলে গিয়েছে। রুদ্ধ সকলের সামনেই তাদের যাবার ব্যাপারটা বলল। কেউই তাতে অমত করেনি সঙ্গে যেগুতু রুদ্ধ থাকছে সেখানে চিন্তার কোনো বিষয় নেই। ছেলে – মেয়েগুলোও এখন বড় হয়েছে তাদেরও এইদিক – সেদিক যেতে ইচ্ছে করে তাদের তো ব্যস্তটার কারণে কোথাও নিয়েও যাওয়া হয় না। তবে মিতা বেগম আমতা আমতা করে বললেন,
– ‘ আহি বরং বাড়িতেই থাকুক। রুদ্ধকে তো আরুকেও সামলাতে হবে, আমার দুটো মেয়েই তো হয়েছে একই রকম এক দন্ড স্থির নেই, ওখানে গিয়ে যদি কোনো বিপদ – আপদ হয়?’
আহির মুখটা চুপসে গেল। সবাই যাবে আর সে কি বাড়িতে বসে থাকবে নাকি? মা একটু বেশিই চিন্তা করে। ইয়াজ আরেকটু উস্কে দিতে বলল,

– ‘ তাইতো আরু এক বাচ্চা আবার এই পিচ্চি দুটোকে একসাথে সামলাব কি করে?’
আহি কটমট করে তাকাল। আরু মুখ কুঁচকে বলল,
– ‘ আমি আর বাচ্চা নই ওকে? আমার তো এখন বিয়ে হয়ে গেছে কিছুদিন পর বা… কথাটা বলেই জ্বিভে কা*মড় দিল সে ছি্হ ছিহ্ সকলের সামনে কি বলে ফেলছিল। রুহানি ও ইয়াজ মিটিমিটি হাসছে, রুদ্ধ তার দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। আরু মুখটা কাচুমাচু করে বসে রইল। রুদ্ধ মিতা বেগমকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
– ‘ তুমি চিন্তা করো না মেঝো মা আমি দুজনকেই দেখে রাখব। আমার ফ্রেন্ডসরাও যাচ্ছে আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না। ‘ মিতা বেগম আর কিছু বললেন না। আহি লাফিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। ঘুরতে যাচ্ছে তার সব জামা কাপর গোছ- গাছ করতে হবে না।

পরেরদিন ভোর ৬ টায় বাড়ির সকলের থেকে বিদায় নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল। রুদ্ধ প্লেনের টিকিট বুক করতে চেয়েছিল। কেউই এতে মত দেয়নি। সকলের একই কথা বাসে করে গেলে যেই মজাটা পাওয়া যাবে সেটা কি প্লেনের আধঘন্টার জার্নিতে আদও পাওয়া যাবে। তাই সবার জন্য একটি বাস ভাড়া করা হয়েছে সেই বাসেই তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্য রওনা দিবে। বাড়িতে থেকে রুদ্ধরা গাড়িতে করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসেছে, এখান থেকেই সবাই একএিত হবে। তুষার আগেই চলে এসেছিল সঙ্গে বউ ও বোনকেও এনেছে। রুদ্ধদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল। তুষারের বিয়েতেই তার বউ ও বোনের সঙ্গে সবার পরিচয় হয়েছিল তাই আরুদের মিশে যেতে সময় লাগল না। চারজন একএিত হয়ে গল্পগুজব করতে লাগল। রুদ্ধ বলল,
– ‘ সাদমান ফারিশ এখনো আসেনি?’
– ‘ শালারা কি করছে কে জানে? আমাদের মতো বিবাহিত হলে বুঝতাম রাতে জেগে ছিল তাই ঘুমাতে পারেনি, আমরা বিবাহিত হয়ে চলে এসেছি আর এদের এখনো খবরই নেই?’
রুদ্ধ তাকে সামনের দিকে ইশারা করল, তুষার তাকাতেই দেখল ফারিশ ও সাদমান দুজনে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে হেঁটে আসছে। সাদমানের চোখ দুটো ফুলে ঢোল হয়ে আছে তাকাতেই পারছে না। রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলল,

– ‘ এমনভাবে ঢুলছিস যেন রাতে ঘুমাতেই পারিসনি?’
সাদমান ফারিশের দিকে ইশারা করে বলল,
– ‘ এই হারামির জ্বালায় রাতে ঘুমাতে পারিনি, কাল ওর ফ্যাটে ছিলাম ঘুমের ঘরে বউ ভেবে শুধু জড়িয়ে ধরতে আসছিল, শালা অনেক কষ্টে রাতটুকু পার করেছি।’
তুষার শব্দ করে হেসে বলল,
– ‘ এইবার বিয়েটা করে নে আর কতকাল বউ ছাড়া থাকবি।’
রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বলল,
– ‘ আমি রুহানির বড় ভাই ভুলে যাস না।’
ফারিশ সাদমানের দিকে কটমট করে তাকিয়ে পায়ে খুব জোড়ছে এক পারা দিল। তুষার বলল,
– ‘ অনেক হয়েছে এবার গাড়িতে উঠে আমাদের ধন্য করুন। তুষারের কথায় দুজনেই সরাসরি বাসে উঠে গেল।

সাদমান পেছনেরদিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে বাসে উঠে পড়ল। রুদ্ধ ও তুষার সবাইকে একে একে বাসে উঠিয়ে দিল। আরু মাঝের দিকে একটা সীটের জানালার ধারে বসে পড়ল। ভোরের সিগ্ধ বাতাস তার সাথে আজ রুদ্ধ পুরো জার্নিতে তার পাশে থাকবে ভাবতেই ভালো লাগায় পুরো মন ছেয়ে যাচ্ছে৷ আরুদের ঠিক পাশের সীটেই আহি বসেছে, আরুই তাকে বসিয়েছে যাতে পুরোটা রাস্তা বোনকে দেখে শুনে রাখতে পারে। বাড়িতে থাকতেই কথা হয়েছিল রুহানি আহির সঙ্গে বসবে তবে ফারিশ তাকে জোর করে নিজের সঙ্গে বসিয়েছে৷ আহি মনে মনে ফারিশকে বকা – ঝকা করল। কোথায় ভাবল পুরো রাস্তা রুহা আপুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাবে তার প্ল্যানটাই নষ্ট হয়ে গেল।

তুষারের বোন তিশা। মেয়েটা রুহানির সমবয়সী। সাদমান প্রায়ই তুষারদের বাড়িতে যাতায়াত করে সেই সূএেই দুজনেই প্রণয়ে আবদ্ধ হয়ে পরে। তুষার তাদের ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও কখনো এই বিষয়ে কিছু বলেনি, তারাও কেউ কখনো তুষারকে সরাসরি এই বিষয়ে কথা বলেনি। সাদমান ভেবেছে একেবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়েই সে তুষারদের বাড়িতে হাজির হবে।
সাদমান তিশাকে তার পাশে টেনে বসিয়ে দিল। তিশা বসতে না চাইলেও তারদিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। আহি ব্যাগ থেকে ব্ল্য – ট্রুথ বের করছিল গান শুনবে বলে, লং জার্নিতে তার গান শুনতে ভীষণ ভালো লাগে। ইয়াজ ধপ করে এসে তার আশের সীটে বসে পড়ল। আহি কপাল কুঁচকে বলল,

– ‘ তুমি এখানে বসেছো কেনো?’
– ‘ আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই বসেছি তোর কোনো সমস্যা।’
– ‘ অবশ্যই সমস্যা এইটা আমার সীট এখানে শুধু আমি বসবো তুমি বসতে পারবে না।’
ইয়াজ এদিকে – সেদিকে কিছু খোঁজার ভান করে বলল,
– ‘ এখানে কোথাও তো তো নাম লেখা দেখতে পাচ্ছি না, তাহলে এটা তোর সীট কি করে হয়।’
আহি দমে গেলেও ঝগড়া থামাল না,তার কথা সে এই সীটে একাই বসবে। ইয়াজও তো চাইছিল না সে আসুক, তাহলে এখন পাশে বসে কি বোঝাতে চাইছে? পাশের সীট থেকে এদের ঝগড়া শুনে আরু অতিষ্ট হয়ে বলল,
– ‘ উফফ তোরা চুপ করবি, যেখানে যায় সেখানেই শুরু করে দেয় ফাজিলগুলো।’
তুষার ও সাদমান অবাক হয়ে বলল,
– ‘ এরা সারাদিন এইভাবে ঝগড়া করে নাকি?’
ফারিশ হাসতে হাসতে বলল,
– ‘ ছোটবেলা থেকে এরা ঝগড়া করতে করতেই বড় হয়েছে। আমি এদের একসঙ্গে কখনো ঝগড়া ছাড়া দেখিনি।’
সাদমান বলল,

– ‘ বিষয়টা কিন্তু খুবই ইন্টারেস্টিং ঝগড়া থেকেই কিন্তু প্রে.. রুদ্ধকে আসতে দেখে বেচারা চুপ হয়ে গেল। রুদ্ধ এই কথা সম্পূর্ণ শুনতে পেলে তাকে ক্যালানি খেতে হত। রুদ্ধ হাতের প্যাকেটগুলো তাদের পেছনের সীটে রেখে দিল। কিছু শুকনো আছে প্যাকেটগুলোতে ক্ষিদে পেলে খাওয়ার জন্য।
বাস চলতে শুরু করেছে নিজ গতিতে। ধুলো উড়িয়ে গাড়ির চাকাগুলো চলছে নিজস্ব গন্তব্যে। রুদ্ধ ফোণ স্কোল করছে আরু তার দিকে পলক তাকিয়ে বলল,
– ‘ আপনি বরং আমার কাধেঁ মাথা রেখে একটু ঘুমিয়ে নিন।’
রুদ্ধ তার কথার জবাব না দিয়ে উল্টো আরুর মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিয়ে বলল,
– ‘ ঘুমা।’
আরু উঠতে চাইলেও রুদ্ধ মাথা উঠাতে দিল না। এক হাতে চেপে রাখল। আরু বলল,
– ‘ এইটা কিন্তু উচিত নয়, এখন আপনি ঘুমাবেন এরপর আমি ঘুমাব।’
– ‘ আমার এখন ঘুম আসছে না, বেশি কথা নয় চুপচাপ ঘুমা।’

আরু আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। ঘুমে তার চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে সে রুদ্ধর কাঁধে মাথা দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। আরু ঘুমিয়ে পড়তেই রুদ্ধ ফোণ পকেটে ভরে আরুর মাথাটা টেনে নিজের বুকে টেনে দুহাতে জরিয়ে নিল। কপালে গভীরভাবে ঠোঁট ছুইয়ে নিজেও চোখ বন্ধ করে ফেলল। এক সময়ে আরুর মাথার সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
আহি বাইরের দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত ইয়াজ নিজের মতে কানে হেড ফোণ লাগিয়ে গান শুনছে। আহির নজর আরুদের দিকে পড়তেই মনে মনে মাশাল্লাহ বলে উঠল। ইশ্ এদের দুজনে কি সুন্দর মানিয়েছে, কারোর নজর না লাগুক। ইয়াজ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪১

– ‘ এইভাবে হা করে তাকিয়ে থাকিস না তোরই নজর লেগে যাবে। ‘
আহি ভেংচি কেটে মুখ ফিরিয়ে নিল। ইয়াজ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– ‘ কেউ চাইলে এই মোমেন্টটুকু আমার ক্রিয়েট করতে পারি।’
আহি অবুঝ ভঙ্গিতে তাকাতেই ইয়াজ নিজের কাঁধ আহির দিকে ঠেলে দিল। আহি কিছুক্ষণ কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল। নিজে থেকেই ইয়াজের কাঁধে মাথা রাখল। ইয়াজও মেয়েটার মাথার সঙ্গে নিজের মাথা মিলিয়ে দিল।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here